অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৮
তোনিমা খান
একটু বেলা হতেই সরোবরে জনসমাগম বাড়তে লাগলো হুড়মুড়িয়ে। মা-বাবা দু’দিক থেকেই বিত্তশালী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত তপোবন। নির্জনা বেগম বিত্তশালী এক একান্নবর্তী পরিবারের মেয়ে। খুলনাতে বেশ নাম ডাক তাদের। তবে নির্জনা বেগমের বাবা-মা মারা যাওয়ার পর, এই নাম ডাকে খানিকটা ভাটা পড়ে। তারা চার বোন। সে সবার বড়।
বাকি সবাই নিজ নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত,সংসারী। আজ তারাও সকলে আসবে। শুধু নির্জনা বেগমের পরের বোনটি এবং ছোট বোন নিঝামের বর ছাড়া।
বাড়ির সব পুরুষরা আজ বাসাতেই রয়েছে। সকাল আটটা তখন। সরোবরের গেট থেকে দুইটা গাড়ি ঢুকতেই জবা ছুটতে ছুটতে রান্নাঘরে যায়। উচ্চ স্বরে বলে,
–”আরো দুই গাড়ি মেহমান আইছে ভাবিজান’রা। নাস্তা রেডি করেন তাড়াতাড়ি।”
জবার কথায় রোজ দাঁতে দাঁত চেপে বিদ্রুপ করে বলল,
–”যথা আজ্ঞা মালকিন! আপনি সোফায় গিয়ে বসুন আমরা নাস্তা পাঠাচ্ছি।”
সেই সকাল থেকে জবা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু কোন মেহমান আসছে, কতজন আসছে এগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো কাজে আর হাত দিচ্ছে না। এদিকে তারা তিন ননদ ভাবি খাটাখাটুনি করতে করতে শেষ।
জবা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
–”রোজ আফা, আফনে খালি আমার পেছনে লাগবেন না।”
–”এই আমি আপনার পেছনে লেগেছি কোথায়? আমি তো আপনার সামনে।” , রোজ তেতে উঠে বলে।
মৌনতা ধমকে উঠলো দু’জনকে,
–”আহ্ রোজ, জবা কি করছো দু’জনে? রোজ তুমি গিয়ে দেখো কারা এসেছে!”
জবার দিকে শানিত দৃষ্টি ফেলে রোজ গায়ের ওড়না ভালো করে জড়িয়ে বেরিয়ে যায় রান্নাঘর থেকে। তবে সদর দরজা দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির আগমনে তার অন্তঃস্থল উদগ্রীব হয়ে পড়ল। সে পুনরায় রান্নাঘরে ছুটে এসে প্রফুল্ল কণ্ঠে বলল,
–”এবারের নাস্তা তুমি নিয়ে যাবে, বড় ভাবি।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। দুষ্টুমির সুরে বলে,
–”আপু ফাঁকি বাজি করছো? নাস্তা বানানোর দায়িত্ব আমাদের, পরিবেশন করার দায়িত্ব তো তোমার।”
রোজ এক গাল হেসে বলল,
–”ফাঁকিবাজি ছাড়া জীবন চলে না, ভাবিজান। যাও যাও, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন তারা।”
তার চোখেমুখে উপচে পড়া আনন্দ দেখে পাশে দাঁড়িয়ে সেমাই রান্না করতে থাকা পারমিতা জিজ্ঞাসা করে,
–”আমার আম্মাজান এত খুশি কেন?”
রোজ তৎক্ষণাৎ আঙুল চাপলো পারমিতার ঠোঁটের উপর। ফিসফিসিয়ে বলে,
–”চুপ চুপ সুন্দরী! একটু পরেই দেখবে কেন এত আনন্দ।”
পারমিতা নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ভদ্র বাচ্চার মতো মাথা নাড়ে। রোজ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে তা দেখে। আহ্লাদের সাথে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে গায়ের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে থাকে। এটা তার আরেকটা মা। যার কাছে কি–না নিজের মায়ের থেকে বেশি আহ্লাদ, আস্কারা, আদর পায় সে। তার মা ছোটবেলা থেকেই তার প্রতি কঠোর, নির্দয়! এর কারণ অজানা।
কিছুক্ষণ বাদ রূপকথা নাস্তার ট্রে হাতে বসার ঘরে যায়। নত মস্তকে মেহমানদের সামনে ট্রে’টা রাখতেই পরিচিত কণ্ঠে সে তড়াক মাথা তুলে তাকায়।
–”বুবু!”
শুকতারার হাস্যোজ্জ্বল মুখটি দেখতেই রূপকথা চমকে পাশে তাকায়। নিলীমা অশ্রুসিক্ত মুখটি দেখে আকস্মিক রূপকথা দিক দিশেহারা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের বুকে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে মাকে জাপ্টে ধরে। হেঁচকি তুলতে তুলতে বলে,
–”আম্মা…আম্মা তুমি এসেছো?”
নিলীমার আঁখিদ্বয় তখন বাঁধ ভাঙা। দীর্ঘ একমাস পর মেয়েটিকে দেখল। কি সুন্দর লাগছে!
চেহারার কোথাও কোনো মলিনতা নেই, আছে উজ্জ্বলতা। স্বাস্থ্য ও একটু ফিরেছে। সে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
–”এসেছি তো।”
সদর দরজা থেকে সদ্য ঢোকা তপোবনের ওষ্ঠকোনা বেঁকে যায় প্রশান্তিদ্বায়ক দৃশ্যে।
নির্জনা বেগম বিতৃষ্ণা ভরা নিঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে,
-“আদিখ্যেতা!”
সে মগ্ন হয় মেজো জা এর সাথে গাল গপ্পে। তপোবনের দৃষ্টি এড়ায় না মায়ের আচরণ। গতকাল ছেলের কথাটিও ভোলেনি। মা কি চাইছে? জোরপূর্বক একটা মানুষকে তার জীবনে এনে আবার অপমান করার মধ্যে কি আনন্দ রয়েছে? এর জবাব দিতে হবে। সবসময় সে মাতৃস্নেহ দেখিয়ে চুপ থাকবে না। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো ছেলেকে। অদূরে ক্লাস ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলছে। আজকের দিনে সে কাউকে বাদ রাখে না ছেলের দিনটাকে বিশেষ করে তুলতে। সে ছেলেকে ডেকে আনে। ছেলের হাত ধরে নিয়ে যায় নীলিমার কাছে। তাকে দেখিয়ে বলে,
–”তোমার আরেকটা নানুমনি। সালাম দাও, তার কাছে দোয়া চাও।”
নিলীমা প্রগাঢ় হাসল তপোবনের কথায়। স্নেহের কণ্ঠে বলে,
–”আমার কাছে দোয়া চাইতে হবে না। আমার দোয়া সবসময় নানুভাইয়ের সাথে আছে।”
তানশান মৃদু হেসে তাকে সালাম দেয়। নিলীমা সাদরে আগলে নেয় তাকে। রূপকথা ভেজা নয়ন মুছতে মুছতে তাকায় সম্মুখের বিশাল দেহি মানুষটার দিকে। দৃষ্টিতে তার কৃতজ্ঞতা। বাড়ির বউদের সকলের মায়েরা যখন আসছিল, তখন মনে একটু সাধ জেগেছিল, এখানে কি তার মা আসতে পারত না? কিন্তু বলার সাহস পায় নি। অথচ লোকটা কেমন করে বুঝে গেল তার মনের কথা। চোখে চোখ পড়ে যেতেই তপোবন ভ্রু নাচায়। রূপকথা এক পা এগিয়ে আসে তপোবনের নিকট।
মেয়েটিকে তপোবন বগলদাবা করে নিতে পারবে উচ্চতায় এতোটাই পার্থক্য! রূপকথা চাপা স্বরে বলে,
–”ধন্যবাদ।”
তপোবন মাথা নুইয়ে একই ভাবে খানিক চাপা স্বরে বলল,
–”ধন্যবাদে তো কাজ হবে না, তানশানের মিমি।”,
রূপকথা ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে,
–”তবে কি চাই? আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু নেই।”
–”আছে, সংসারের টানাপোড়েন জয় করে একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হয়ে দেখাও। তাহলেই হবে। অন্তত ভেতরের গিল্টিগুলো একটু কমবে। দিনশেষে আমার একটাই ইচ্ছা তুমি প্রতিষ্ঠিত হও নিজের পায়ে দাঁড়াও।”, তপোবন লহু স্বরে বলল।
রূপকথার ওষ্ঠকোনে হাসির উজ্জ্বলতা দেখাগেল। সে ঘাড় দুলিয়ে বলে,
–”আর আপনার ইচ্ছা পূরণ করা আমার দায়িত্ব।”
তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–”আম্মা আর শুকতারাকে নিয়ে তোমার ঘরে যাও। সকাল সকাল জার্নি করেছে, রেস্ট হয়নি। খাবার সেখানেই পাঠিয়ে দাও। এখানে অনেক মানুষ কম্ফোর্ট ফিল করবে না।”
রূপকথা কথা বাড়ায় না। সে বারংবার মুগ্ধ হয় ঘরের এই বড় ছেলে নামক অভিভাবকটিকে দেখে। যে কি-না খুঁটিনাটি সব বিষয়ে সুক্ষ্ম নজর রাখে। নিলীমা পিঠা বানিয়ে এনেছে তানশানের জন্য, বাড়ির সকলের জন্য। তবে তানশানকে দেয়ার মতো আকর্ষণীয় কিছুই নেই। সে কি দেবে ভেবে পায় না। তপোবনকে যখন জিজ্ঞাসা করে তানশানকে কি দিলে তার উপকার হবে। তখন তপোবন বলে,
–”দোয়া করবেন। আর তার নানুভাইয়ের দেয়া সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাই তো এখন তানশানের কাছে। আর কি প্রয়োজন!”
নিলীমা ম্লান হাসল। হ্যাঁ, মানুষটার থেকে যাওয়া ঐ একটা স্মৃতি তাদের কাছে খুব মূল্যবান।
ধীরে ধীরে অতিথিদের আগমনে ভরে উঠল সরোবর। তকদির সিকদার সকাল থেকে ছুটছে। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত সকলেই আজ যোগদান করবে মিলাদে।
অন্যদিকে দশটা বেজে গিয়েছে মৌনতা ব্যস্ততা সামলে নায়েলকে খাওয়াতে গেলে পুরো রান্নাঘর খুঁজে ড্রাই ফ্রুটস পেল না। নায়েল ড্রাই ফ্রুটস খুব আগ্রহ নিয়ে খায়। সে চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“জবা, ড্রাই ফ্রুটস কোথায়?”
জবা কাজ করতে করতে বলল,
–“ড্রাই ফ্রুটস তো শেষ ভাবিজান।”
–“নায়েল এখন কি খাবে? সে তো এখন ড্রাই ফ্রুটস ছাড়া কিছু মুখে তুলবে না।”, মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলে ছুটলো ইমরোজের কাছে।
ইমরোজ কানে ফোন ঠেকিয়ে সতর্ক দৃষ্টি ফেললো খোলা দরজা পানে। ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“সামান্য একটা টপিক নিয়েও তুমি ইদানীং এমন করছো কেন সৃজা?”
–“কেন করব না, ইমরোজ? আজ সিকদার বাড়িতে এত বড় অনুষ্ঠান। অফিসের সব কর্মকর্তা সহ নামীদামী অতিথিরা আসবে। কিন্তু সেখানে আমি কোথায়?”
–“তোমাকেও ইনভাইট করা হয়েছে কিন্তু তুমি আসবে না বলছো।”
–“কেন আসব? সামান্য একজন কর্মচারী হিসেবে ইনভাইট করেছে আর সেখানে আমি যাব? আমি নিজের সবটা দিয়ে তোমায় ভালোবাসছি আর পরিবর্তে তুমি আমায় কি দিচ্ছো? অপমান আর লাঞ্ছনা? আর মৌনতা? সে তো তোমার স্ত্রীর পরিচয়ে রাজরানী হয়ে ঠিকই ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো দুনিয়ার সামনে।”
ইমরোজ বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“তো তুমি কি চাও আমি তোমায় নিজের প্রেমিকর পরিচয় দিয়ে এখানে আনবো? বুঝেশুনে কথা বলো সৃজা।”
–“আর কত বুঝেশুনে কথা বলব ইমরোজ? আজ প্রায় দেড় বছর তুমি আমায় ইউজ করছো। কিন্তু আমার প্রাপ্য সম্মান আমায় দিচ্ছো না।”
–“আমায় একটু সময় দাও সৃজা।”
–“কিসের?”
–“মৌনতা মায়ের চোখের মনি সৃজা। আমি কি বলে ওকে ডিভোর্স দেবো সেই সলিড রিজনই তো দেখাতে পারছি না।”
সৃজা তাচ্ছিল্য হাসল।
–“মৌনতাকে ডিভোর্স দেয়ার মতো সলিড রিজন তোমার কাছে নেই অথচ তুমি তার সাথে সংসার করতে চাও না। আমায় নাকি ভালোবাসো। আসলে কি জানো? তুমি নিজেই একটা কাপুরুষ! যে কি-না ঘরে বাইরে শুধু মজা লুটছো। এরপর থেকে আমায় আর কখনো ফোন দেবে না। যেদিন আমায় আমার প্রাপ্য সম্মান দিতে পারবে সেদিন নিজের মুখ দেখাবে।”
মুখের উপর ফোন কেটে দিলো সৃজা। কপালে হাত ঘষতে ঘষতে ইমরোজ অস্থির নিঃশ্বাস ফেললো। গভীর চিন্তায় ডুবে যায় সে! কি করবে ভেবে পায় না! মৌনতা বাড়ির সবার চোখের পানি। কেউ মানবে না তার কোনো প্রকার কথা! বরং সব উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখাবে তার উপর। যেটা তার ক্যারিয়ার, জীবনব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলবে।
–“শুনছেন, নায়েলের ড্রাই ফ্রুটস শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন সে ড্রাই ফ্রুটসই খাবে, একটু এনে দিন না তাড়াতাড়ি। সকাল থেকে তেমন কিছু খায়নি।”
ইমরোজ কপাল কুঁচকে তাকায় রুগ্ন কালচে হয়ে পড়া মুখপানে। বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলে,
–“নায়েলের খাবার নেই তা খাওয়ার সময় মনে পড়েছে তোমার?”
–“সবসময় তো মাথায় সব থাকে না। আর গতকাল জবা ড্রাই ফ্রুটস দিয়েছিল নায়েলকে। আমি দেখিনি যে শেষ!”
–“তোমার নিজের দিকে খেয়াল থাকে না, নায়েলের দিকে খেয়াল থাকে না, আমার কাছে আসলে তুমি অসুস্থ থাকো—তুমি আসলে সারাটাদিন করো কি? সারাদিন থাকো ঘরে, চাওয়ার আগে সব এসে যায় তবুও জাগতিক সব সমস্যা তোমার কাছেই।”
ইমরোজের তিরিক্ষি কণ্ঠে মৌনতা ম্লান দেহে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। বলল,
–“ভরা একটা সংসার, একেক জনের একেক চাহিদা পূরণ করতে আমিও তো ক্লান্ত হই ইমরোজ। অসুস্থতা তো আর আমার হাতে নেই। জরুরী নয় সব দিকে আমার খেয়াল রাখতে হবে। আপনিও একটু খেয়াল রাখতে পারেন নায়েলের।”
–“হ্যা, সেটাই বলো। বাইরে কাজ করে এখন শাড়ি চুড়ি পড়ে ঘরের কাজগুলো ও করে দেই। তারপর তোমার গিয়ে শান্তি হবে।”
–“এমনটা কখন বললাম?”
–“তুমি এমনটাই চাও। রানীর হালে থেকেও তুমি এমন ভান করো যেন জগতের সব কাজ তোমার একার করতে হয়।”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“এসেছিলাম মেয়েটার খাবার আনতে বলার জন্য অথচ আপনি আমায় নিয়ে পড়ে গেলেন। আমায় নিয়ে কি জীবনটা দুঃসহ হয়ে গিয়েছে ইমরোজ?”
ইমরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তোমায় নিয়ে নয় তোমার আচরণ নিয়ে। নিজের আচরণ ঠিক করো।”
বলেই সে গটগট করে চলে যায়। মৌনতা শুকনো ঢোক গিলে দাঁড়িয়ে রইল। দেহ বারংবার ভরশূন্য হয়ে আসে তবুও উঠে দাঁড়ায়, নিজেকে গড়ে তোলে যেমন ইমরোজ চায়। তার উপর থেকে যাই যাক না কেন অন্তত দিনশেষে নায়েল একটা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবারে বেড়ে উঠুক। বাবা মায়ের ছায়াতলে বেড়ে উঠুক।
তপোবন বাবার ব্যস্ত মুখশ্রী এক পলক দেখে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে বের হতে নিলে মৌনতা ছুটে আসে।
–“ভাইজান, একটু শুনুন।”
তপোবন পিছু ফিরে কৃত্রিম হেসে বলল,
–“মৌন কিছু বলবে?”
মৌনতা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে বলল,
–“ভাইজান, নায়েদের ড্রাই ফ্রুটস শেষ। ও এখন ওটাই খাবে। আপনি একটু আনিয়ে দিতে পারবেন?”
তপোবন চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
–“আনাতে তো বেশ কিছুক্ষণ লাগবে মৌন। ড্রাই ফ্রুটস শেষ তা কেউ জানাবে না? এক কাজ করো, তানশানের ঘরে যা আছে আপাতত সেটা থেকে খাওয়াও আমি ড্রাইভার দিয়ে পাঠাচ্ছি।”
–“আচ্ছা, ভাইজান।”, মৌনতা ছুটলো তানশানের ঘরে। তপোবন সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে দ্রুত কদমে বেরিয়ে গেল।
মৌনতা তানশানের ঘরে যেতে যেতে দেখলো এরোজ কড়িডরে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয় তাকে ঘরে দেখে। তবে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সেদিনকার ব্যবহারের পর তার আর ইচ্ছা করে না ভাবি হিসেবে এই লোকটার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে।
এরোজ চোয়াল শক্ত করে টলটলে নেত্রে তপোবনের গমনের পথে চেয়ে থাকে।
“এই জায়গা আমার স্বামীর। কিন্তু ওনারা জোরজবরদস্তি নিজেদের নামে লিখে নিয়েছে এই জায়গা। আমার স্বামী সজ্ঞানে তাদের এই জায়গা লিখে দেয়নি। এই জায়গার রেকর্ড এখনো আমার স্বামীর নামেই আছে। ওনারা জোরপূর্বক দখল করতে চাইছে এই জায়গা।”, ভরা শালিস বৈঠকে, বয়স্ক এক নারী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল। ওমনি একজন বয়স্ক লোক খলবলিয়ে বলতে লাগল,
–”এইসব ন্যাকা কান্নায় ভুলবেন না কেউ। তোমার স্বামী যে ম/দ খাওয়ার জন্য আমগো থিকা টাকা নিতো তা—কি ফেরত দিতে পারছে? একটা দুইটা টাকা না। সেই টাকা কি দিয়ে ফেরত দিবে? আয় ইনকাম ছিল? তাই তো এই জায়গা আমগো নামে কইরা দিছে।”
–”এসব মিথ্যা কথা। সে কখনো তার শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে চাইত না। আমি বেশ ভালোকরে জানি ওনারা জোরজবরদস্তি করেছে।”, যুবতী দুই মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে বয়স্ক মহিলা ক্রন্দনরত গলায় বলে। এই দুইটা মেয়ে আর থাকার জন্য এক তলা বাড়ি সমেত এই জায়গাটুকুই তার সম্বল।
কিন্তু শক্তিশালী শত্রুপক্ষের ক্ষমতায় আজ সেটুকুও হারানোর জো। কিন্তু তিনজন নারী প্রতিপক্ষের এতজন ক্ষমতাধর পুরুষের সাথে বলে, ক্ষমতায় পেরে ওঠে না। শালিস বৈঠক ঠিক বয়স্ক মহিলার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছিল। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে পথে বসে যাওয়ার ভয়ে তখন বয়স্ক নারীটি ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর অনুনয় করছে।
তখনি সেই শালিস ব্যবস্থায় শত্রুপক্ষের সকল ক্ষমতাকে নস্যাৎ করে দিয়ে আগমন ঘটে তপোবনের। পুলিশ সহ আরো কিছু ক্ষমতাধর পলিটিক্যাল ব্যক্তি নিয়ে তপোবন ঢুকলে নারীটি চমকালো।
তপোবন সিকদারের আরেকটা পরিচয় রয়েছে যেই পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করতে সে কখনো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। রাজনৈতিক বিষয়ে তেমন একটা না ঢুকলেও, বাবার প্রয়োজনে বেশ নাক গলাতে হয়। তাই এইসব বিষয়ে একটু আধটু ক্ষমতা রাখে সে। কিন্তু কখনো নিজের স্বার্থে এই ক্ষমতা ব্যবহার করেনি। গাম্ভীর্যতায় আচ্ছাদিত মুখশ্রী নিয়ে সকলের মাঝে দাঁড়াতেই একজন সালাম জানাতে জানাতে চেয়ার এগিয়ে দিলো। তপোবন এক হাত জাগিয়ে বাঁধা দেয়। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে গলায় বলে,
–”আমি বসতে আসিনি। অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে আর কত বিত্তবান হবেন ভুঁইয়া সাহেব? আসেন বোঝাপড়ায় বসি।”
ভুঁইয়া সাহেব আশ্চর্য হয়ে গেল তপোবনের আগমনে। ঘেমে উঠলো তার বদন। রাগ ভর করে মুহুর্তেই নিজের দলের ক্ষমতা ফিকে পড়ায়।
ভেবেছিল তিনটা মেয়েমানুষ তার কিছু করতেই পারবে না। আর চুটকিতে সে এই জায়গার মালিক হয়ে যাবে। মূলত এটাই তার কাজ। মানুষকে টাকা দেয় সুদে, ফেরত না দিতে পারলে দ্বিগুণ হারে তা ছিনিয়েআনে। কিন্তু তপোবন সিকদার? ঐ তকদির সিকদারের আরেক ধুরন্ধর রূপ। তাদের হাতে খুলনার সকল ক্ষমতাধর ব্যক্তি রয়েছে।
ভুঁইয়া সাহেবের সকল ভয়কে সত্য প্রমাণিত করে এক ঘন্টার মাঝে তপোবন শালিস ব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে আনে বৃদ্ধ মহিলার পক্ষে। ভুঁইয়া সাহেব নত মস্তকে দাঁত কিড়মিড় করে স্বীকার করে, সে জোরপূর্বক এই জায়গা নিজের নামে করেছিল। বৃদ্ধ মহিলার স্বামী তার থেকে অল্প কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। যা সে অর্ধেক শোধ করতে পেরেছিল আর অর্ধেক পারেনি।
তৎক্ষণাৎ জায়গাটুকু বৃদ্ধ মহিলার নামে করার সব ব্যবস্থা করে তপোবন। আর তার স্বামীর কাছে পাওনা অর্ধেক টাকা গুলো ও সে শোধ করে দেয়।
দীর্ঘ একটা সময় পর বৃদ্ধ মহিলা চোখ তুলে তাকায় তপোবনের দিকে। এই পুরোটা সময় একটাবার ও তাকায়নি। আর না তাকিয়েছে তপোবন। সব কাজ শেষ হতেই তপোবন পেপারস সহ এগিয়ে আসে বৃদ্ধ মহিলার দিকে। হাতের পেপার্স গুলো এগিয়ে দিয়ে বলে,
–“মিসেস নিম্রিত! আজকের পর থেকে আর কোনো সমস্যা হবে না আশাকরি। যদি সমস্যা হয় এটা আমার নাম্বার। ফোন করবেন, অবশ্যই সমস্যা হলে। সমস্যা ব্যতীত নয়।”
তপোবনের শেষের কথায় ছিল কঠোরতা। নিম্রিত আহমেদের চোখের কার্নিশ বেয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নম্র কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
–“কেমন আছো আব্বু?”
–“তপোবন! তপোবন আমার নাম। নাম ধরে ডাকলে খুশি হবো।”, শক্ত কণ্ঠে বলে তপোবন। চোখেমুখে অদম্য কাঠিন্যতা। পরপরই হাঁক ছেড়ে নিজের ড্রাইভারকে ডাকে। ড্রাইভার কয়েকটি প্যাকেজ হাতে ছুটে আসে। নিম্রিত আহমেদের অশ্রুর গতিবেগ বাড়লো যেই চোখেমুখে কোনো একসময় ভালোবাসা ছিল আজ সেই চোখে যে ভরপুর ঘৃণা।
তপোবন প্যাকেজগুলো হাতে নিয়ে এগিয়ে দেয় তার দিকে। নত দৃষ্টিতে গম্ভীর গলায় বলে,
–“আজ আমার ছেলের জন্মদিন। দোয়া করবেন তার জন্য। সে যেন সবসময় হাসিখুশি থাকে।”
নিম্রিত আহমেদ আর কথা বাড়ায় না। মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করে,
–“কত বড়ো হয়েছে দাদুভাই? দেখতে কার মতো হয়েছে?”
–“পনেরো বছরে পড়েছে আজ।”, বলেই তপোবন পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ছবি বের করে। সেটা নিম্রিত আহমেদের মুখের সামনে তুলে ধরে। নিম্রিত আহমেদ স্নেহের হাসলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে হাসিমুখে বলে,
–“দাদুভাই তো একদম তোমার মতো তপোবন।”
–“হুঁ, দোয়া করবেন। আসি।”, গম্ভীর গলায় বলেই তপোবন গটগট করে চলে যায়। নিম্রিত আহমেদ সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কত বছর পর ছেলেটাকে দেখেছে! ইচ্ছে করে বুকে জড়িয়ে নিতে কিন্তু কোন সাহসে নেবে? সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ করেই তার দৃষ্টিতে এক জোড়া অগ্নি দৃষ্টি এঁটে যায়। বক্ষস্থল খামচে ধরে নিম্রিত আহমেদের। অস্ফুট স্বরে ডেকে ওঠে,
–“এরোজ?”
লালচে নেত্রে এরোজ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় অত্যাধিক রূপবতী নারীটির দিকে। বয়সের ছাপ উপচে বেরিয়ে আসছে যৌবন কালের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য! এই সৌন্দর্যের অহমিকাই হয়তো একদিন তার থেকে তার মাকে কেড়ে নিয়েছিল।
নিম্রিত আহমেদ ছুটে আসতে নিলেন এরোজের দিকে। কিন্তু এরোজ আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না সেথায়, কঠোর দৃষ্টি ফেলে চলে যায় তার দৃষ্টি সীমার বাইরে।
তপোবন গাড়ির দরজা খুলতেই কেউ ক্ষিপ্র গতিতে এসে তার গতিরোধ করে। তপোবন চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ভাইয়ের অগ্নি দৃষ্টি চোখে বিধলো। শুকনো ঢোক গিলে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখেই বলে,
–“এটা কোন ধরণের আচরণ, এরোজ?”
এরোজ তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে কঠিন গলায় শুধায়,
–“তুমি ঐ মহিলাটিকে সাহায্য করলে কেন?”
–“মানবতার খাতিরে।”, তপোবন থমথমে মুখে বলে।
সহসা এরোজ চিৎকার করে উঠল,
–“মানবতা? মানবতা মাই ফুট! তুমি ঐ মহিলাটির চোখের জলে গলে গিয়েছ সেটা বলো। তুমি ঐ চরিত্রহীন মহিলাটিকে সাহায্য করছো না, আরো ক’টা মহিলাকে উস্কে দিচ্ছো একই কাজ করতে। তারপর চোখের পানি দেখিয়ে মানুষের সহানুভূতি নেবে। আর আমরা? আমাদের মতো কিছু বাচ্চা? যারা একটু মায়ের আদর পাওয়ার জন্য ছটফট করেছিলাম? মা ডাকার জন্য ছটফট করেছিলাম, তাদের কষ্টের কোনো মূল্য নেই?”
তপোবন চাপা স্বরে ধমকে উঠল,
–“শাট আপ, এরোজ! রাস্তায় বসে চিৎকার করবি না।”
–“কেন করবো না? সকলের জানা উচিৎ ঐ মহিলা কতটা ঘৃণ্য।”, এরোজ আরো দ্বিগুণ গর্জে উঠল। লালচে নেত্রদ্বয় যেকোনো সময় সিক্ত হয়ে উঠবে। ‘মা’ নামক শব্দটি আর এই মানুষটিকে সবচেয়ে অগাধ ঘৃণা করলেও তার ব্যপারে কৌতুহল তার মেটে না। অস্পৃশ্য টান থেকেই যায়!
মা নামক মানুষটিকে দেখার তার বিষয়ে জানার আগ্রহ কমে না। তাই তো তার এক একটা খবর নিজের কাছে রাখে। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয় জিজ্ঞাসা করতে, স্বামী সন্তানের থেকে কি প্রেমের জ্বালা বেশি? আর আজও খোঁজ নিতে গিয়েই এই ঘটনা জানতে পারে। জানতে পারে তার দয়ালু ভাইয়ের কৃতকর্ম ও।
তপোবন তাকে জোরপূর্বক টেনে গাড়িতে বসায়। এরোজ ফোঁস ফোঁস করতে করতে ছিটকে সরে যায়। তপোবন জোর করে না। গাড়ি লক করে দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করলে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করে। মিহি স্বরে বলে,
–“এরোজ? তার কাছে আমি কোনো ঋণ রাখে চাই না। কিন্তু আমি, ইমরোজ, তুই—তার কাছেই সবচেয়ে বেশি ঋণী। মায়ের দুধের ঋণী। তবে কি করে এত অকৃতজ্ঞ হই বলতো? একটু ঋণের বোঝা হালকা করতে পারলেও তো শান্তি!”
এরোজ জবাব দেয় না। তবে ক্রোধে ছটফট করতে থাকা তার বদন ম্লান হয়ে আসে।
তপোবন ম্লান হেসে ভাইয়ে্য এক হাত নিজের কোলের মাঝে নিয়ে আসে। নিজের কাছে টেনে আনে, কিন্তু এরোজ আসে না। তপোবন রাগান্বিত ভাইকে জোরপূর্বক টেনে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নেয়। ছোটবেলা থেকে এই এক প্রশস্ত বক্ষস্থলে আশ্রয় পেতেই সহসা এরোজের চোখ বেয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
উষ্ণ পানির ছোঁয়ায় তপোবন তার পিঠে আলতো হাতে চাপড় দিয়ে তাকে শান্ত করে বলে,
–“সে তার পাপের শাস্তি পাচ্ছে, এরোজ। সৃষ্টিকর্তা নিজেই দিচ্ছে। কেন আমরা নিজেদের পাপের বোঝা বাড়াব!”
এরোজ শোনেনা বরং হু হু করে কেঁদে উঠল। জীবনের অপ্রাপ্তীগুলো এতটাই বাজেভাবে আঘাত করে তাকে। ক্রন্দনরত গলায় বলে,
–“সৃষ্টিকর্তা সবসময় আমাদের কেন বেছে নেয় দুঃখ দেয়ার জন্য? ভাইজান, আমার খুব ইচ্ছা হয় তাকে মা ডাকতে। কিন্তু সে কেন এই ডাকটাকে এভাবে অসম্মান করে পায়ে পিষে ফেলল? কি হতো সে এরোজের মা হয়ে থেকে গেলে?”
তপোবন জবাব দেয় না। নিরুত্তর ভাইয়ের পিঠে হাত চাপড়াতে থাকে। মনে মনে আওড়ায় ভাগ্য! চরম সত্য একটি শব্দ।
শুকতারা বোনের পেছনে পেছনে হাঁটছে আর অবাকপানে সব অবলোকন করছে। আর বিস্ময় নিয়ে বলছে,
–”বুবু তুই কত বড়োলোক বাড়িতে থাকিস রে! তোকে একদম বড়লোকদের মতো লাগছে। এই তো আরেকটা রাজমহল। শহর এমন হয়? এখানে কত মজার মজার খাবার পাওয়া যায়! আর ঐ মিষ্টি যেগুলো দিলি, এত রঙ বেরঙের নরম তুলতুলে মিষ্টি এখানে পাওয়া যায়?”
বোনের উচ্ছ্বাস দেখে রূপকথার মুখ পাংশুটে বরন ধারণ করে। বোনের চোখেমুখে যে আফসোস, আক্ষেপেরা ভরপুর। সে বোনের সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়ায়। দু গালে হাত চেপে কপালে চুমু দিয়ে বলে,
–”এসব তো আমর নয়, তারা। কিন্তু তুই মন খারাপ করিস না, আমরাও একদিন এমনভাবে ভালো থাকব। এমন নরম তুলতুলে মিষ্টি সবসময় খেতে পারবি। বুবু শিঘ্রই সেই ব্যবস্থা করব। আর আজ যাওয়ার সময় আমি তোকে অনেক মিষ্টি দিয়ে দেবো। তুই যত ইচ্ছা তত খাবি।”
শুকতারা মৃদু হাসল বোনের কথায়। বিজ্ঞদের মতো করে বলে,
–”আমার তো এগুলো চাই না বুবু। কিন্তু আমার খুব ভালোলাগে তোকে এমনভাবে থাকতে দেখ। আমি খুব খুশি বুবু, তোকে এই বড় বাড়িতে থাকতে দেখে। আগে কত কষ্ট করতি আমাদের বাসায় বসে। মা বলে তুই এখানে খুব ভালো আছিস। আমি তাতেই খুশি। এগুলো আমার ভালোলাগে না। এখানে মানুষ মুরগির মতো ঘরে ঝিমিয়ে বসে থাকে। খেলাধুলা করা যায় না। ছোটাছুটি করা যায় না। আমি আমার ওখানেই ভালো আছি। কিন্তু তোকে এভাবে শহরে দেখতেও আমার ভালো লাগে। আমি সকলকে বলে বেড়াব আমার বুবু শহরের বিশাল দালানে থাকে।”
রূপকথা অবাকপানে তাকিয়ে থাকে। ছোট্ট মেয়েটি কি সন্তপর্ণে নিজের আক্ষেপ গুলোকে লুকিয়ে নিলো তার থেকে। তার বোনটা যে তার থেকেও বুঝদার। অবশ্যই পরিস্থিতি তাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ম্যাচিউরিটির কারণ। যার পরিস্থিতি যত কঠিন তার ম্যাচিউরিটি তত বেশি। সে স্মিত হেসে বলে,
–”কিন্তু আমার তো দম বন্ধ লাগে এখানে। তুই কত ভালো আছিস বল! বাইরে ছোটাছুটি করতে পারিস, মায়ের হাতের রান্না খেতে পারিস, মায়ের কোলে ঘুমাস। আর আমি কতদিন হলো মায়ের কোলে ঘুমাই না, মায়ের হাতের রান্না খাওয়া হয় না। আটার রুটি আর চা খাওয়া হয় না।”
–”দুলাভাইকে বলে আমাদের সাথে চল বুবু। বিয়ের পর কি আর মেয়েরা বাপের বাড়ি যায় না?”, শুকতারার অবুঝ কণ্ঠে রূপকথা মলিন মুখে বলে,
–”আমার তো বাবাই নেই। বাবার বাড়ি যাব কোথায়? এই বাবার কারণেই তো আজ আমি এখানে। বাবা থাকলে তো আমায় পড়াত, বড়ো ডাক্তার বানাত। এখন তো বুবুর সংসার হয়েছে, তার ছেলে আছে। তার খেয়াল রাখতে হয়। হুটহাট চলে গেলে তাদের খেয়াল রাখবে কে?”
–”অত বড় একটা ছেলে তোর?”, শুকতারা চোখমুখ কুঁচকে শুধায়। রূপকথা হেসে মাথা দোলায়।
–” হুঁ, তোর বুবু বুড়ি হয়ে গিয়েছি। এখন চল, তোকে আইসক্রিম আর কেক খাওয়াই। এখানে মজার মজার আইসক্রিম পাওয়া যায়।”
শুকতারা বোনের হাত ধরে নাচতে নাচতে যায়। রূপকথা শুকতারা আর নায়েলকে আইসক্রিম আর কেক খেতে দিয়ে রোজের ঘরে বসিয়ে দেয়। পুরো বাড়ি মানুষে ভরে গিয়েছে। তার নানা শশুর বাড়ি থেকেও সকলে এসে পড়েছে।
সে মাথায় কাপড় টেনে বসার ঘরের দিকে যায়। নিলীমা, পারমিতার সাথে রান্নাঘরে রয়েছে। ভদ্রমহিলা নিলীমাকে পেতেই বগলদাবা করে চারিদিকে ঘুরছে আর গল্প করছে। মাসুমা আর নির্জনা বেগম বসে ছিলাম বসার ঘরে। সাথে আরো অনেক মধ্যবয়স্ক সহ বয়স্ক মহিলা ছিল। যাদের আপাদমস্তক আভিজাত্য আর শো অফে ভরপুর ছিল।
সেখানে রূপকথা একটা লাল জামদানি গলায় একটা লকেট সহ চেইন, হাতে বালা কানে একজোড়া ছোট ঝুমকা। নির্জনা বেগমের মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল রূপকথার বেশভূষায়। সে ইশারায় ডাকতে লাগল রূপকথাকে। রূপকথা শাশুড়ির ইশারা বুঝতে পারল না। তার আগেই ভেসে আসে সূচালো এক কণ্ঠ,
–”ছেলেদের বউ পছন্দ করতে আপা বরাবরই প্রশংসিত। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে প্রশংসিত হওয়ার থেকে বিতর্কিত বেশি হচ্ছো। তপোবনের একটা মেয়ের কমতি ছিল তুমি কি সেটাই পূরণ করলে আপা?”
বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে নিঝাম। নির্জনা বেগম সরু চোখে তাকায় ছোট বোনের দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–”সবসময় সবজায়গাতে হাসাহাসি করা বোকামি, নিঝাম। ও রূপকথা, তপোবনের স্ত্রী। সেভাবেই ওকে সম্মান করবে। অতিরিক্ত বাড়তি কোনো কথা আমি পছন্দ করি না।”
বোনের রাগান্বিত স্বরে নিঝাম আরো জোরে জোরে হাসতে লাগল। নির্জনা বেগম শানিত দৃষ্টিতে তাকায়। নিঝাম হাসতে হাসতে বলে,
–”আরে আপা হাসি আসছে, কি করব!”
–”তবে তপোবনের বউ মাশাআল্লাহ। কিন্তু রুচি আরেকটু উন্নত হলে ভালো হতো। বাড়িতে এত বড় অনুষ্ঠান অথচ গায়ে এমন অল্পকিছু গহনা পড়ে তপোবনকে সহ আমাদের ছোট করছে। ছেলের বউদের আমার কিছু দেইনি?”, নিঝামের কথায় রূপকথা মিইয়ে গেল, অবাক হলো! এখানে কি মানুষকে তার বেশভূষা অলংকারের দ্বারা গন্য করা হয়?
–”গা ভরতি গহনা পরিয়ে স্ত্রীকে সোনার দোকানের মডেলের মতো শো পিস বানিয়ে রাখা আমার পছন্দ নয়, ছোট খালাম্মা। তা তো তুমি জানো! তবে বারবার সোনা দিয়ে রুচি যাচাই করা কি বোকামি নয়?”
তপোবনের হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে নিঝাম থমথমে মুখে তাকায় পিছু ঘুরে। তপোবন আর এরোজ সদ্যই নিজের গতিরোধ করে বসার ঘরে। এরোজ পথ ঘুরিয়ে রান্নাঘরের কেবিনেটের উপর হাতে করা আনা ব্যাগটা রেখে চলে আসে। তপোবন আড়চোখে এক পলক দেখলো ভাইকে। দীর্ঘশ্বাসে বুকটা ভরপুর হয়ে ওঠে!
–”এক মাস হতে না হতেই বউয়ের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছো, ভাগ্নে? বউকে পিচ্চি বলে মহা ভুল করলাম মনে হচ্ছে।”
তপোবন ফিরে তাকায়। নিঝাম বয়সে তপোবনের থেকে ছোট। কিছুটা রসিকতা করেই তপোবন তাকে ছোট খালাম্মা ডাকে।
বোনদের মধ্যে নিঝাম একটু কুটনী, ছুঁকছুঁক, সংকীর্ণ মনোভাবের। খোঁচা মেরে কথা না বললে তার হয় না। তপোবনের সাথে তার খুব একটা বনিবনা ভালো নয়। আর না তার বউয়ের সাথে। কেননা পূর্ব ছিল নিঝামের থেকেও দ্বিগুণ দূরন্ত, চতুর। তাকে একটা কথা বললে সে তিনটা কথা ফিরিয়ে দিত।
তবে তপোবন এতদিনে এতটুকু বেশ বুঝতে পারছে রূপকথা কোন ধরনের মেয়ে। কেউ দুটো কথা শুনিয়ে দিলেও সে চুপচাপ গলধঃকরন করে নেয়। আর মেয়েটির রুচি আটকায় সব সিদেসাধা পোশাক আর ছোট ছোট মনোমুগ্ধকর কিছু গহনাতে। যেই অল্পকিছু আভুষনে মেয়েটিকে স্নিগ্ধ লাগে!
তপোবন পাঞ্জাবি ঝেড়ে এগিয়ে যায়। চোখেমুখে গাম্ভীর্যতার ছোড়াছুড়ি। গম্ভীর কণ্ঠেই বলে,
–”ভুল তো করছো! কিন্তু বউকে পিচ্চি বলে না—আমার বয়সটা বিবেচনা না করে কথা বলাটা তোমার ভুল। এই যে সময়গুলো পার করছি, তাতে আমি অভিজ্ঞ। নতুন বিয়ে করার আনন্দে বিবেক বুদ্ধি খুইয়ে বসা নিব্বি কেউ নই আমি। কারোর আগমন আমার ব্যাক্তিত্ব নাড়াতে পারেনি, আর না পারবে। তাই তো বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে কথা বলাটা এত বছরেও তোমায় শেখাতে পারলাম না। বয়স হয়েছে তোমার, ছোট নেই আর। সম্মানটা ধরে রাখো।”
নির্জনা বেগম ধমকে উঠল দু’জনকে,
–”ঘরভর্তি মানুষ! তোমরা শুরু করে দিও না। নিঝাম সব বিষয়ে খোঁচা মেরে কথা বলার অভ্যাস ত্যাগ করো। আর তপোবন, নিঝাম তো ভুল কিছু বলেনি। সে নতুন বউ, তার তো একটু সেজেগুজে বসা উচিৎ। সবাই তো তাকে দেখতে চাইবে। সে কি এভাবে যাবে সবার সামনে? তোমার কোনো সম্মান নেই? আমাদের কোনো সম্মান নেই? নাকি সে দেখাতে চাইছে তার কোনো লোভ লালসা নেই। সে চরম দুঃখি, নির্লোভ মানুষ!”
–”আম্মা মানুষটা যতটুকু তাকে ততটুকুর মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে দেয়া উচিৎ। জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতেই থাকবেন, নিতে পারার সামার্থ্য তো থাকা লাগবে। আপনিই তো বলেন মেয়েদের সবচেয়ে বড় অলংকার তার স্বামী। সেই অনুযায়ী তার সৌন্দর্য আমি। আর আমি তার সাথে আছি, এতেই যথেষ্ট। এটা নিয়ে বাড়তি কথা না বললে খুশি হবো। আনন্দ করো সবাই, আসছি।”
গুরুগম্ভীর আওয়াজ বাতাসে মিলিয়ে যায়। তপোবন লম্বা লম্বা পা ফেলে রান্নাঘরে যায় এক গ্লাস পানি খেতে।
মৌনতা রান্নাঘরে ব্যাগের মাঝে তিন কৌটা ড্রাই ফ্রুটস দেখে কৌতূহলী গলায় শুধায়,
–“ভাইজান, এগুলো আপনি এনেছেন? এতগুলো আনলেন কেন?”
পানির গ্লাস হাতে তপোবন শান্ত দৃষ্টি ফেললো মৌনতার পানে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ইমরোজ এনেছে, মৌন।”
মৌনতার মুখের হাসি প্রগাঢ় হয় তপোবনের জবাবে। ঠিক এতটুকুই তো চায় সে ইমরোজের থেকে। অন্তত তার মেয়েটা বাবার স্নেহতলে বড় হোক! সে হাসিমুখে বলল,
–“ওহ আচ্ছা, ভাইজান।”
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিলীমা নিরুদ্বেগ নীরব দর্শকের ন্যায় তাকিয়ে আছে। পারমিতা তার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলে,
–”দেখলেন তো, আমার তপু থাকতে আমার কথা মাকে কেউ একটা কটু কথা ও শোনাতে পারবে না। এখন মেয়ের চিন্তা বাদ দিন। আজ আমার সাথে আমার বাড়ি যেতে হবে। দুই বেয়ান মিলে আড্ডা দেবো, আনন্দ করব।”
নিলীমা মুগ্ধ চিত্তে হাসল। পারমিতার হাত ধরে অসহায়ত্ব নিয়ে বলল,
–”আজ পারব না, বেয়ান। অন্য কোনো একদিন খুব আড্ডা দেবো আপনার সাথে। আমরা বিকালেই চলে যাব।”
পারমিতা নাকোচ করে হৈ হৈ করে উঠল। তবে তার নাকোচ শোনার সামার্থ্য নেই নিলীমার। সে এসেছে তপোবনের অনুরোধ আর তানশানের কথা চিন্তা করে। থাকার জন্য নয়। পারমিতা বেশ দুঃখিত হয়। নিলীমা এক পলক তাকায় নিঝামের দিকে। পারমিতাকে জিজ্ঞাসা করে,
–”উনি কে?”
পারমিতা নিঝামকে দেখে বলে,
–”ও নিঝাম আহমেদ। তপোবনের ছোট খালা।”
–”ওহ্।”, নিলীমা ছোট্ট করে জবাব দেয়। নামটা কেমন পরিচিত পরিচিত লাগছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের ন্যায় কৌতুহল বাড়তে লাগল। এটা যে সেই শহর যেখানে লোকটা উধাও হয়ে গিয়েছিল। কোনভাবে যদি একটু সন্ধান পেত! কথার বাবা যেই কোম্পানিতে চাকরি করতো সেই কোম্পানির নাম ও ঠিক মনে নেই। শুনেছে সেই কোম্পানি ও নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এই নামটা যে পরিচিত লাগছে। তার কি কোন সম্পৃক্ততা ছিল ঐ কোম্পানির সাথে! অজশ্র প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিলীমা। জবাব খোঁজার উপায় নেই। মেয়ের শশুর বাড়ি! উপরন্তু মানুষ গুলো একটু নাক উঁচু খুঁতখুঁতে স্বভাবের। কে কোন কথায় দোষ ধরে বসে!
রূপকথা তানশানকে খুঁজছিল। হাঁটতে হাঁটতেই কেউ ছুটতে ছুটতে এসে তার সাথে ধাক্কা খায়। সে ধরে ফেলল বাচ্চা ছেলেটিকে। মাথায় হাত রেখে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–”ছোটাছুটি করো না। ধীরে ধীরে খেলো।”
–”ওকে, ভাবি।”, বাচ্চা ছেলের মুখে ভাবি ডাক শুনে রূপকথা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। মৃদু হেসে শুধায়,
–”তুমি আমায় চেনো?”
বাচ্চাটি মাথা দুলিয়ে বলে,
–”চিনি, তুমি তপু ভাইজানের বউ।”
রূপকথা হাসল তার কথায়। একটু খেয়াল করে দেখতেই চোখমুখে পরিচিত এক আদল ভেসে উঠল। যেটা নিছকই তার ভ্রম। মানুষটা তার জীবনের একমাত্র চাওয়া দেখেই সবজায়গাতেই শুধু তাকে খুঁজে বেড়ায়। সে জিজ্ঞেস করে,
–”তুমি কে?”
বাচ্চাটি হেসে বলে,
–”আমি নিহাম।”
–”তোমার মা-বাবা কে?”, রূপকথার প্রশ্নে বাচ্চাটি নিঝামের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“আমার মাম্মা। পাপা আসেনি, সে কাজে গিয়েছে বিদেশে।”
–”ওহ্।”, নিঝামের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয় রূপকথা। বাচ্চাটি পুনরায় ছুট লাগায়।
তানশান গোসল করে বের হতেই দেখলো রূপকথা তার কাবার্ড ঘাঁটছে। তার কপাল কুঁচকে যায়। তার কাবার্ড জবা ফুপি, পাপা আর মেজো মা ছাড়া কেউ স্পর্শ করে না। সে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–”আপনি এখানে কি করছেন?”
রুপকথা খুঁজতে খুঁজতে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“তোমার ইনার গেঞ্জি খুঁজছি, আব্বু। পাঞ্জাবির সাথে পড়বে কি?”
–”সেটা পাপা জানে। পাপা আসলে খুঁজে দেবে। আপনার খোঁজার প্রয়োজন নেই।”, তানশান কথায় রূপকথা নিজ কাজে মগ্ন থেকেই বলল,
–”সমস্যা নেই আমি খুঁজে নিতে পারব। তোমার পাপার দরকার নেই।”
রূপকথার কথায় তানশানের মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে গেল। সকাল থেকেই এই হুটহাট অধিকার ফলানো তাকে বিব্রত করছে, অস্বস্তিতে ফেলছে। সে গম্ভীর গলায় বলল,
–”এগুলো আপনার কাজ নয়।”
–”এগুলো আমার’ই কাজ তানশান।”, রূপকথার নির্বিকার দৃঢ় কণ্ঠে তানশান তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–”কেন? কেন এগুলা আপনার কাজ হবে?”
–”কারণ এগুলো মায়েদের কাজ। আর আমি তোমার মা। তাই এটা আমার কাজ।”
তানশান থমকায়। থমথমে মুখে বলে,
–”না এগুলো আপনার কাজ নয়, রাখুন। এগুলো অন্য কেউ স্পর্শ করা আমার পছন্দ নয়।”, তানশানের কথায় রূপকথা তৎক্ষণাৎ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–”তোমার পছন্দ নয় তাতে আমার কি? আমি তো আমার ছেলের আলমারিতে হাত দেবোই।”
–”আলমারিটা আমার। আপনি এমন জোরজবরদস্তি করতে পারেন না।”
রূপকথা এবার হাত থামিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। তানশানের দিকে ফিরে কোমড়ে হাত দিয়ে বলে,
–”এটা আমার ছেলের ঘর, আমার ছেলের আলমারি আর আমি তার মা। তাই এই সবকিছু আমি ধরব। আর কেউ ধরবে না আজকের পর থেকে। আমার ছেলের সব কাজ ও আমি করব। এখানে তুমি বাঁধা দেয়ার কে?”
তানশান বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে মৃদু রাগান্বিত স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–”কারণ আপনার ছেলেটাই আমি। আমি বলব না তো কে বলবে?”
–”এই তো তুমি নিজেই স্বীকার করলে তুমি আমার ছেলে। তবে এখান মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে থাকো। মায়ের কাজে বাঁধা দিলে পশ্চাৎদেশ লাল করে দেব, পাজি ছেলে।”,
তানশান বাঁকহারা হয়ে গেল তার কথায়। এক পলক নিজের পশ্চাৎদেশের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–”হোয়াট দ্যা! এগুলো কি বলছেন আপনি?”
রূপকথার জবাব আসে না। তানশান পুনরায় বলে,
–“আপনার কোনো কাজ নেই? সকালে থেকে এগুলো কেন করছেন? আপনি আমায় বিরক্ত করছেন। আমি এগুলোতে অভ্যস্ত নই। আমার অস্বস্তি বাড়াবেন না।”
–”অস্বস্তিকে অভ্যাসে পরিণত করার দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু একটু কষ্ট করে কদিন সহ্য করে যাও।”, ধিমি কণ্ঠে বলতে বলতেই রূপকথা ইনারের সাদা পাতলা গেঞ্জিটা তানশানের হাতে ধরিয়ে দেয় রূপকথা। প্রগাঢ় হেসে বলে,
–”এমন করেই একদিন খুঁটিনাটি সব আয়ত্তে নিয়ে নেবো। এখন তৈরি হয়ে নাও। বিছানায় রাখা তোমার পোশাক।”
তানশান তাকিয়ে রইল হাতের ইনারের গেঞ্জিটার দিকে।
রূপকথা বেরিয়ে যেতেই কেউ হুড়মুড়িয়ে তার ঘরে ঢুকলো। পাঞ্জাবির কলার ঠিক করতে থাকা তানশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই মুখশ্রী গাম্ভীর্যতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে হাসিমাখা এক চঞ্চল মুখ দেখে। সুনেহরা অতিরঞ্জিত কণ্ঠে বলল,
–“আয় হায় পাঞ্জাবিতে কি সুন্দর লাগছে। একদম সুনেহরার হিরো! শুভ জন্মদিন টমাটু! এমন করেই তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যা, আর আমার বাচ্চাদের বাপ হয়ে যা। এই বছর অন্তত একটু সুবোধ হয় যেন। আর আমার মতো সফট, সুইট মেয়েটাকে এত কষ্ট দিস না। আমার বাচ্চাগুলো সারাদিন আমার কাছে এসে কান্নাকাটি করে। তাদের বাবা কেন মায়ের দিকে একটুও তাকায় না.. এই বলে। তুই এত নির্দয় হতে পারিস না টমাটু!”
ভীষণ লাগাম ছাড়া কথায় তানশান হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা সুনেহরা তা দেখতেই হড়বড়িয়ে বলে,
–“দেখ টমাটু! ভালোবাসলে সবভাবে ভালোবাসতে হয়। মেকাপ ছাড়া বা ন্যাচারাল লুক সবভাবে। তাই আজ আমি ন্যাচারাল লুকে এসেছি সুন্দর না? তোকে আমায় এভাবেও ভালোবাসতে হবে।”
তানশান তার সকল বেহুদা কথা এড়িয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
–“তুমি আমার রুমে এসেছো কেন?”
–“তোর রুম কোথায়? এটা তো আমার ফিউচার রুম। তাই দেখতে এসেছি।”, সুনেহরা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে। তানশান ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“বের হও এখান থেকে।”
সুনেহরা চোখমুখ কুঁচকে পাল্টা রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“অতিথিদের সাথে এমন ব্যবহার করছিস? আমার ছেলেমেয়েরা তার বাবার কাছ থেকে কি শিখবে? দেখ টমাটু! তোর জন্য আমি কটু কথা শুনতে পারব না।”
তানশান হতাশ হয়। এই মেয়ের গায়ে কখনো কোনো কথা লাগে না কেন! সে পুনরায় গম্ভীর গলায় বলে,
–“আমি তৈরি হবো, বের হও এখান থেকে।”
–“ওহ্, আচ্ছা আচ্ছা। কিন্তু তার আগে বল, জন্মদিনে কি উপহার চাই তোর।”
–“কোনকিছু চাই না।”
–“কিন্তু আমি উপহার না দিয়ে তো যাব না।”, সুনেহরার জেদি কণ্ঠে তানশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–“কি উপহার দেবে, দাও।”
–“তোর জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার তো আমি নিজেই। পুরো আমিটাই তো তোর উপহার। তাই আজ থেকে এই আমিটা তোর। তুই শুধু এখন হ্যাঁ বলে দে।”, সুনেহরা এক গাল হেসে বলল।
তানশান রাগে গজগজ করে উঠল। সে ক্রুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সুনেহরার দিকে। অতঃপর সেভাবেই বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
বের হতেই সাজারু কাঁটার মতো কাঁটা কাঁটা চুলগুলো দেখতেই রূপকথা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল,
–“আজ একটু চুলগুলোকে ঠিক করে আঁচড়ে নিতে পারলে না? কেমন ঘাড় ত্যাড়ার মতো খাঁড়া খাঁড়া হয়ে আছে।”
তানশান তাকে পাশ কাটাতে কাটাতে বলে,
–“আমার চুল এমনি।”
রূপকথা তার পথ ধরে বলে,
–“ঠিক তোমার গোমড়া মুখের মতো।”
তানশান কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে বলে,
–“আপনি গতকাল থেকে পড়তে বসেননি। ডাক্তার কেন— আমার তো মনে হয়, আপনার নার্স হতেও কষ্ট হয়ে যাবে। আমি ও লেভেলে পড়ি তাতে সারাদিন পড়াশুনা করি। আর আপনি এ লেভেলে অথচ বইয়ের ধারেকাছেও দেখা যায় না আপনাকে।”
সরব রূপকথার মুখটি ছোট হয়ে গেল। সে নিভে যাওয়া আদল নিয়ে বলে,
–“তুমি তো বাড়ির ছেলে, আমি তো বউ। আমার তো অনেক কাজ থাকে। সেগুলো না করলে তোমার মেজো মায়ের কষ্ট হয়ে যাবে। এগুলো করে পড়ার সুযোগ পাই না।”
তুলে ধরা পার্থক্যটা বুঝতে পেরে তানশান চুপ করে গেল।
সময় গড়ায় যখন পুরো দুই প্লট জমজমাট হয়ে উঠল অতিথি, পরিবার পরিজনদের আনন্দমুখর কোলাহলে তখন দ্বিতীয় তলার সবচেয়ে কিনারার ঘরটিতে থাকা উদাসীন এক অবয়ব মনোযোগ সহকারে অন্তঃস্থলের বেদনা সৃষ্টিকারী শব্দগুলোকে ছেপে যাচ্ছে।
–“তার মলিন মুখ আজ ও আমায় অস্থির করে তোলে। অথচ তার মলিনতা দূর করার ক্ষমতা আমার নেই।”
ঠিক সেই লাইনটিতে এসেই কলমটা থামে। কিন্তু আদৌও কি মন মস্তিষ্কের যন্ত্রণার ভার কমলো? নাকি বাড়লো।
দম বন্ধকর অনুভূতিতে অস্থির এরোজ ছটফটে বদনে উঠে দাঁড়ায়। হাতে থাকা গ্লাসটি ঠোঁটে চেপে ঢকঢক করে নিষিদ্ধ পানীয়ের গ্লাসটি খালি করে।
ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৭
–“এই শহর শুধু কেড়ে নিতে জানে। এই শহর ত্যাগ না করলে, স্মৃতিগুলোও কোনদিন কেউ কেড়ে নেবে।”
বাম হাতে অনলাইন টিকিট বুক করতে যায় কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত একের পর এক ট্রানজিটের জটিলতার কারণে টিকিট কাটতে পারল না। সে রেগে ফোনটা ছুঁড়ে মারে বিছানায়। ফের খালি গ্লাসটা ভরে নিষিদ্ধ পানীয়তে। এক নিমিষেই সেই গ্লাস ও শেষ করে পড়ে রইল বিছানায়।
