Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯
তোনিমা খান

ছেলের জীবনের একটা দিন সুখময় করে তুলতে পারা তপোবনের কাছে বিশ্বজয়ের মতো আনন্দের। রাতের বেদনাগুলো ভুলে ভরা মানুষের মাঝে ছেলেকে হাসতে দেখে সে বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলল।
ছেলেকে সর্বদা খুশি দেখতে চাইলেও, সে মোটেই চায় না তানশানের তার মায়ের প্রতি যে অনুভূতি তা কখনো লুকাক। হয়তো বয়সের সাথে সাথে দুঃখগুলো কম যন্ত্রনা দেবে কিন্তু সে চায় মায়ের প্রতি তীব্র টান তার সবসময় থাকুক।
সে ব্যস্ত কদমে অতিথিদের যেখানে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে যায়। পথিমধ্যে পকেটে থাকা যন্ত্রটি ভাইব্রেট করে উঠল। সে ব্যস্ততার সাথেই আননোন নাম্বারটি রিসিভ করে ফোন কানে ঠেকিয়ে বলে,

–“আসসালামুয়ালাইকুম, কে বলছেন?”
তৃশান চমকে কান থেকে ফোন নামায়। কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“আপনি কে বলছেন?”
তপোবন বেজায় বিরক্ত হতে গিয়েও কপাল কুঁচকালো। এটা তৃশানের কণ্ঠ। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“তৃশান?”
–“তপোবন ভাই?”, তৃশান শঙ্কিত কণ্ঠে শুধালো।
–“হ্যাঁ, কিন্তু তোমার কাছে আমার ব্যক্তিগত নাম্বার এলো কোত্থেকে? , তপোবন চলতে চলতে শুধায়। তৃশান দাঁতে দাঁত চেপে ফোন নাম্বারটির দিকে তাকায়। তারমানে নির্বোধ ফেইরিটেইল তার সাথে চালাকি করেছে! সে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বিগলিত হেসে বলল,

–“পাপা…পাপার থেকে নিয়েছি তপোবন ভাই।”
–“না, তোমার পাপার কাছেও আমার এই নাম্বার নেই। এই নাম্বার শুধু ফ্যামিলি মেম্বারদের জন্য।”, তপোবনের স্পষ্ট কথায় তৃশান অপ্রস্তুত কথা ঘুরিয়ে বলল,
–“শুনলাম আজ শানের জন্মদিন ভাই। তাই ফোন দিয়েছিলাম। তানশানকে আমার পক্ষ থেকে অনেক শুভকামনা আর ভালোবাসা দেবেন ভাই।”
–“সে নাহয় দেবো কিন্তু তুমি আজ আসোনি কেন? তোমার বাবা একা এসেছে।”
–“ঐ আসলে ভাই, কলেজে একটু জরুরী প্রয়োজন ছিল তাই আসতে পারিনি।”
–“ওহ্, আচ্ছা। পরে কখনো সময় করে এসো।”
–“জি ভাই, এখন তবে রাখছি হ্যাঁ? আসসালামুয়ালাইকুম!”
বলেই সে খট করে ফোন কেটে দিলো।
কান থেকে ফোন সরিয়ে তপোবন কপাল কুঁচকে নিলো। ছেলেটার মতিগতি একদম ঠিক নেই। দূরন্ত বয়সের কাঠগড়ায় থাকলেও, একটু বেশিই দূরন্ত!
রুম্মান, মৃদুল আর মৃদুলা সরু চোখে বন্ধুকে পর্যবেক্ষণ করছে। তৃশান সেই থেকে রাগে গজগজ করছে। তাদের সরু দৃষ্টি উপেক্ষা করে ফের রাগ ঝেড়ে বলল,

–“কি চালাক মেয়ে দেখ! নাম্বার চেয়েছি, তপোবন ভাইয়ের নাম্বার দিয়ে দিয়েছে। কলেজেও আসেনি।”
–“তাদের ঘরে অনুষ্ঠান না? আসবে কী করে?”
–“কলেজ করেও তো অনুষ্ঠানে এটেন্ড করা যেতো। সে কি অনুষ্ঠানের মুল আকর্ষণ? তানশান থালকেই হলো!”
ফের তৃশানের রাগান্বিত কণ্ঠে রুম্মান এবার মুখ খুলল। দাঁত খিচে বলল,
–“এর চেয়ে সোজাসাপ্টা বল, মেয়েটা এসে তোকে নিজের মুখ দেখালেই তোর শান্তি হতো!”
–“এই মেজাজ খারাপ করবি না।”
–“তাহলে তুই ঐ মেয়ের জন্য এমন করছিস কেন?”
–“এর আগেও কতদিন কলেজে আসেনি। একদিন এসেছে আজ আবার আসেনি। মেজাজ খারাপ হবে না?”
–“না মেজাজ খারাপ হবে না। সে কি তোর গার্লফ্রেন্ড যে তোর মেজাজ খারাপ হবে?”
রুম্মানের রাগান্বিত কণ্ঠে তৃশান ও পাল্টা রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,

–“হতে কতক্ষণ!”
–“বাহ্! এই তো এবার সঠিক কথা বলেছিস। আমি প্রথম দিন ই সন্দেহ করেছিলাম।”
–“এবার তবে নিশ্চিত হয়ে নে।”, তৃশান তিরিক্ষি মেজাজে বলেই গটগট করে বেরিয়ে গেল।
বিকাল চারটা নাগাদ সরোবরের সব মেহমান একে একে চলে যায়। বাগেরহাটে থেকে আসা আত্মীয়রা পাঁচটার দিকে বেরিয়ে যাবে। নিজের কাজ কোনরকমে গুছিয়ে, তপোবন চারটার দিকে স্ত্রী, সন্তান আর শুকতারাকে নিয়ে বের হয়‌। কোথায় যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছে এই নিয়ে রূপকথা বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছে তপোবনকে। কিন্তু তপোবন কিছু বলেনি। স্বল্প সময়ের মাঝে তপোবন শুকতারাকে খুলনার বিশেষ বিশেষ কিছু জায়গায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। অতঃপর শপিং মলে নিয়ে গিয়ে অনেকগুলো জামা, জুতা সহ কসমেটিকস। শুকতারা পছন্দনীয় অনেক খাবার, যা যা সে পছন্দ করেছে সুপার শপ থেকে সব কিনে দিলো তপোবন। সে অনুরোধ করেছিল নিলীমাকে আজ থাকার জন্য, নয়তো শুকতারাকে রেখে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কোনটাতেই নিলীমা রাজি হয় নি।
নির্জনা বেগমের থেকেও খুব ভালো আচরণ পায়নি নিলীমা। এতে তার মন খারাপ হয়নি। এমনটাই তো হয়ে আসছে তাদের সাথে। বোনের বাড়িতে এসে শুকতারার একটুও অযত্ন হতে দেয়নি তপোবন বরং তাকে বিশেষ অনুভব করানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। রূপকথার দিনটা শেষ হয় শুকতারার মুখের এক ফালি হাসি দেখে। যেই হাসি রূপকথার দিনটাকে বিশেষ করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

কখনো ফল, কখনো জুস, কখনো কফি তো কখনো ভাত হাতে রূপকথা ঠিক ষষ্ঠ বারের ন্যায় তানশানের দরজায় টোকা দিলো।
বইয়ের পাতা থেকে গম্ভীর মুখটি তুলে তানশান এবার বিরক্তি মিশ্রিত চাহনিতে তাকায়। বিরক্ত হয়ে বলে,
–“কি সমস্যা আপনার?”
দরজার কপাট আঁকড়ে রূপকথা মিহি স্বরে বলল,
–“দুপুর থেকে তেমন কিছু খাওনি। কিছু একটা খাও। এখন তো দশটা বেজে গিয়েছে, ভাত খাও।”
তানশান বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না। বাড়িতে সব হ্যাভি খাবার আর তার গন্ধ। ভালো লাগছে না।”
–“তবে সবজি দিয়ে দুই লোকমা ভাত খাও।”
–“নো।”
–“চোখমুখ কেমন শুকনো লাগছে, এতক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে।”
–“আশ্চর্য! এমন কত না খেয়ে থেকেছি, কিছু হবে না।”
–“আজ থেকে আর পারবে না এমন না খেয়ে থাকতে। তাই বলো, কি খাবে?”
রূপকথার গুরুগম্ভীর কণ্ঠে তানশান ফের কলম রেখে কপাল কুঁচকে তাকায়। বলে,
–“আপনি আমার পেছনে এভাবে পড়েছেন কেন? যান, আমার চিন্তা না করে গিয়ে পড়তে বসুন। সারাদিন ফাঁকিবাজি!”
–“একেবারে কাল থেকে পড়তে বসবো। আজ ঘরে অনেক কাজ আছে।”
ছোট্ট ছেলেটির কাছে কৈফিয়ত দিয়ে বলল রূপকথা। তানশান নিরুদ্বেগ বলল,
–“তবে সেগুলো করুন।”
রূপকথার মুখশ্রী পুনশ্চঃ গম্ভীর হলো। বলল,

–“তোমায় কিছু না খাইয়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না, তানশান।”
তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আচ্ছা, পিজ্জা খেতে ইচ্ছে করছে, খাওয়াতে পারবেন? যদি না পারেন তবে আর একবার ও বিরক্ত করবেন না।”
রূপকথা মিইয়ে গেল অজানা অচেনা এক খাবারের নাম শুনে। নাম শুনেছে কিন্তু বৃত্তান্ত কিছুই জানে না‌।
শুধায়,
–“এটা হালকা খাবার?”
–“হালকা বিফ, হালকা চিজ আর সবজি দিয়ে বানালে তা হালকাই হয়।”, ফাস্টফুড খাওয়ার জন্য সকল প্রকারের যুক্তি তৈরি থাকে তানশানের কাছে।
ছেলেটির বাকি জীবনের প্রতিটি লহমা সুস্থ সুন্দর করার পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন রূপকথা নিরুপায় হয়ে ছুটলো মৌনতার কাছে‌। মৌনতা সব বলে বলে দিলো। সে সকল নির্দেশনা অনুসরণ করে দীর্ঘ এক ঘন্টা পর কিছু একটা বানাতে সফল হলো। আর সেটা হলো রুটির উপর বিফ, ভেজিটেবল আর চিজের কয়েক প্রলেপ।
পছন্দের পিজ্জার সেই বেহাল দশায় তানশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে,
–“আজকের পর থেকে হয়তো সারাজীবনের জন্য পিজ্জার টেস্ট-ই ভুলে যাব।”
উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে থাকা রূপকথা শুধায়,

–“কি বললে?”
তানশান জোরপূর্বক না বোধক মাথা নাড়লো। বলল,
–“আপনি সত্যি সত্যি পিজ্জা বানিয়েছেন?”
–“হ্যাঁ, তুমি তো খেতে চাইলে।”
–“আমি এমনিই বলেছিলাম। অতিরিক্ত কিছু করার প্রয়োজন ছিল না।”
–“অতিরিক্ত নয় এটা প্রয়োজনীয় আর আমার দায়িত্ব।”
–“আপনার দায়িত্ব নয়।”, তানশান পিজ্জা মুখে তুলে বলল।
–“এটা আমার-ই দায়িত্ব।”, রূপকথার দৃঢ় কণ্ঠে তানশানের মুখ থমথমে ধারণ করলো। হুটহাট এই পরিবর্তন অধিকারবোধ তার ভালো লাগছে না।
তবে তানশানের ভালোলাগাকে অগ্রাহ্য করে রূপকথা প্রতিটি লহমা তার মা হওয়ার প্রয়াসে লেগে থাকে।
ঘুমাতে যেতে গিয়েও পুরো ঘরময় সেই এক রমনীর কোলাহলে তানশান অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
–“এখন আবার কি করছেন?”
গিফট বক্সগুলো একে সাজিয়ে রেখে পুরো ঘর গুছিয়ে ফেলল রূপকথা। বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
–“বিছানা গুছাচ্ছি। আগামীকাল নায়েল, রোজ আপু তাদের নিয়ে গিফট খুলো। তারা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।”
বিছানার পাশে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তানশান। বলল,
–“ঠিক আছে, কিন্তু এগুলো আপনাকে করতে হবে না। আপনি এখন যান।”
রূপকথা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“পিচ্চি ছেলে বেশি কথা বলো! আমার ছেলের কাজ আমি ছাড়া কে করবে?”
তানশানের খুব ইচ্ছে হলো রূপকথার মতোই জেদ দেখিয়ে জোর গলায় বলতে, আমি আপনার ছেলে নই। কিন্তু সে বলতে পারল না। নানুমনি, পাপা, মাম্মার রেখে যাওয়া পথনির্দেশনাগুলো তাকে বলতেই দিলো না। তাই নিজের ঘরে কারোর আধিপত্য সে নীরবে গলাধঃকরণ করে নিলো।

রাত তখন একটা ত্রিশ। তপোবন শ্রান্ত বদনে নিজের ঘরে ঢোকে। রিসেন্ট প্রজেক্ট এক্সিকিউটিভ করার জন্য ইমরোজের সাথে আলোচনায় বসেছিল। আগামী সপ্তাহে সে যশোরে যাবে। কিন্তু ইমরোজ চাইছে, সে নিজে যাবে। তবে মৌনতার আবদার তার মাথায় আছে, সে এবার কোনভাবেই ইমরোজকে কন্সট্রাকশন সাইটে যেতে দেবে না।
ড্রিম লাইটের আলোয় স্পষ্ট নারী অবয়ব। তবে ঘুমের ধরণ বরাবরের মতোই হতাশ করে তপোবনকে। একটু কাত ফিরলেই সোজা মেঝেতে। আবার মাঝে কোলবালিশ ও দিয়েছে। তপোবনের ভ্রু উঁচিয়ে গেল!
সে হাতমুখ ধুয়ে পোশাক বদলে বিছানায় বসে।
কোলবালিশটা মাঝখান থেকে সরিয়ে ফেলে এবং রোজকার অভ্যাস অনুযায়ী মেয়েটির পেট জড়িয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে। মেয়েটি ভীষণ ঘুমকাতুরে তাই তার চোখেমুখে এত নির্লিপ্ততা। তবে তার নিদারুণ নির্লিপ্ততা ভেঙে যায় যখন ঘুমন্ত নারীটি মৃদু চিৎকার করে উঠল।

–“ছাড়ুন ছাড়ুন, কি করছেন?”
তপোবন হতচকিত ছেড়ে দিলো রূপকথাকে। রূপকথা তড়াক উঠে বসে। মেয়েটির আশ্চর্য দৃষ্টি দেখে তপোবন অপ্রস্তুত খুক খুক করে কেঁশে উঠল।
রূপকথা আশ্চর্য কৌতুহলী নয়নে তাকায় তার পানে। তপোবন বোকাসোকা হেসে মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
–“না মানে…ঐ আরকি…আসলে তুমি পড়ে যাচ্ছিলে তাই এদিকে নিয়ে আসলাম। এখন আর তুমি পড়বে না। আর কোলবালিশটা মাঝে নয় তোমার ঐ পাশে দেবে।”
রূপকথা সরু চোখে তাকায় তপোবনের দিকে। সে কোথায় পড়ে যাচ্ছিল? লোকটা মিথ্যা কথা বলছে কেন? সে জেগেই ছিল, মাত্রই বিছানায় শুয়েছিল। কাজ শেষ করে পড়তে বসেছিল, একটু আগে পড়া শেষ হয়েছে।‌ সে ভুতে আর একা থাকতে ভয় পায়। তাই যতক্ষণ না তপোবন আসে ততক্ষণ সে ঘুমায় না। সে চট করে শুধালো,
–“আমি কোথায় পড়ে যাচ্ছিলাম?”
তপোবন বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,

–“পড়ে যাচ্ছিলে না? না গেলে তো ভালো। শুয়ে পড়ো, শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।”
বলেই তপোবন তড়িঘড়ি করে কম্ফোর্টার টেনে দিয়ে শুয়ে পড়ল। রূপকথা তখনো অবুঝপানে তাকিয়ে রইল তার দিকে। শাড়ি ঠিক করে পুনরায় বিছানার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। কামড়ায় তখন গা ছমছমে নীরাবতা। সে ঘাড় কাত করে এক পলক পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে থাকা লোকটিকে দেখে বলল,
–“খাবার তো খাননি।”
–“দুপুরে অত হ্যাভি খাবার খেলাম না! আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।”
বাবা ছেলের সেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথায় রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ঘুম জড়ানো নেত্র বুজে বলল,
–“ধন্যবাদ।”
বদ্ধ নেত্রে তপোবন কপাল কুঁচকালো। সেভাবেই শুধায়,
–“কেন?”
–“শুকতারার জন্য অতকিছু করার জন্য। ও অনেক খুশি হয়েছে।”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“তবে তো আমায় তানশানের মিমিকে উঠতে বসতে ধন্যবাদ দিতে হয়।”
–“কেন?”
–“শুনলাম তানশানের মিমি আজ তানশানকে পিজ্জা বানিয়ে খাইয়েছে, তাও আবার রাত এগারোটায়।”
রূপকথা বিষন্ন কণ্ঠে বলল,

–“পিজ্জা খেতে ভালো হয়নি।”
–“প্রথমবার একটু খারাপ হবে স্বাভাবিক, দ্বিতীয়বার হয়ে যাবে।”
একে অপরের দিকে পিঠ দিয়ে দু’জনে সেভাবেই মৃদুমন্দ কথোপকথনে মগ্ন হয়। কথোপকথনের মাঝে কেউ খেয়ালই করলো না তারা কতটা সহজ একে অপরের সাথে। রূপকথা খেয়াল করলো না, নিখুঁত এই দুনিয়ায় সে কি করে মুখিয়ে থাকে সারাদিনের গল্পগুলো এই খুঁত যুক্ত লোকটির কাছে বলার জন্য।
কথোপকথনের এক পর্যায়েই সে প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে ফিরে তাকায়। ডেকে ওঠে,
–“শুনছেন?”
সেই মিষ্টিমধুর উৎকণ্ঠা ভরা ডাকে তপোবন মৃদু হেসে ফিরে তাকায়। গালের নিচে হাত দাবিয়ে আবছা আলোয় দু’জনে একে অপরের পানে তাকায়। তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“শুনছি মুরুব্বি, বলুন।”
–“ঐ যে প্রিন্সিপালের বেয়ারা ছেলেটা আছে না? সে গতকাল আবার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল।”
তপোবনের হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীতে ভাটা পড়ল। গম্ভীর গলায় শুধায়,

–“আবারও বিরক্ত করেছে?”
–“নাহ, কলেজে আসিনা কেন তাই খবরদারি করছিল। রোজ কলেজে না গেলে না-কি ফেইল করিয়ে দেবে।”
–“খাতায় প্রশ্নের জবাব লিখে আসতে পারলে কে ফেইল করায় তা আমি দেখে নেবো, চিন্তা করো না।”
–“কিন্তু সে জোরপূর্বক আমার নাম্বার নিয়েছে।”
রূপকথা রাগ ঝেড়ে বলল। তপোবনের দৃষ্টি সরু হয়ে আসে। গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“নাম্বার দিয়েছো?”
–“নাহ, পাগল আমি? আমি তাকে ঘোল খাইয়ে দিয়ে এসেছি। আপনার নাম্বার দিয়ে এসেছি।”, বলেই রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ভীষণ গুরুগম্ভীর মুখেও তপোবন হেসে ফেললো মেয়েটির কথার সুর আর হাসির শব্দে। মিহি স্বরে বলল,
–“গুড! এরপর থেকে বিরক্ত করলে সোজা আমায় ফোন দেবে নয়তো প্রিন্সিপালের কাছে চলে যাবে। সে দেখে নেবে, আমি জানিয়েছিলাম তৃশানের বাবাকে। কিন্তু ছেলেমানুষ তো, জেদি।”
রূপকথা কিছু বলল না। নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু হাসল। লোকটাকে বলতে পেরে শান্তি লাগছে, তার থেকেও শান্তি লাগছে সে প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলেছে শুনে। এই বিশাল দুনিয়ায় মায়ের পরে, এই শক্ত ছায়াতলে থাকতে তার ভালোলাগে।
বক্ষজুড়ে যে অব্যক্ত কিছু অনুভূতি ধীরে ধীরে বীজ বুনছে তা টের পেল না রূপকথা। টের পেল না লোকটার একটু যত্ন, ভালোবাসার জন্য সে মুখিয়ে থাকে।
কিন্তু তপোবনের মুখশ্রীতে চিন্তা ছুঁয়ে যায়। তৃশান রূপকথার থেকে তার ব্যক্তিগত নাম্বার পেয়েছে তবে তাকে মিথ্যা বলল কেন? আর কেনই বা ফোন দিলো? এটা কি শুধুই ফাজলামো নাকি অন্যকিছু?

–”কি বুঝিছো কথা’র মা, বোরখার নিচে মুখ লুকাইয়া চলিবা আর আমরা চিনিবো না? আইজকা তোমারে কে বাঁচাইব? কচি মাইয়াটারে তো খাতি দিলা না। আমরা নাহয় তোমারে দিয়াই তৃষ্ণা মিটাই।”
গজা’র কথায় মেঝেতে পড়ে থাকা নিলীমা দরদর ঘেমে উঠল। অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা বদ্ধ ঘর। তাকে ঘিরে রয়েছে সাত আটজন। এতদিনের আ’ত’ঙ্কগুলো বাস্তবায়ন হতে দেখে গলা শুকিয়ে আসল নিলীমার। এই পশুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো পন্থা না পেয়ে অঝোরে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ল কিছু অশ্রূকনা। হাত জোড় করে অনুনয় করে বলে,
–”আমায় ছেঁড়ে দিন। আমার মেয়ে দুটোর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। দয়া…”
নিলীমার কথার মাঝেই গর্জে উঠল গজা, মিন্টু।
হুঙ্কার ছেড়ে হিসহিসিয়ে বলল,

–”এই কথা বাড়াবি না। চুপ! একদম চুপ! এতদিন যাবৎ আমরা তরপাইছি, আইজকা তোরে তরপাইতে দেখিবো। আইজকা আর তুই ছাড়া পাবি না। এই জন্মে মানুষেরে আর মুখ দেখাতি পারবি না।”
বলেই গজা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিলীমার উপর। বদ্ধ ঘর জুড়ে আর্তনাদ, গুমড়ে গুমড়ে মরার হাহাকারে মুহুর্তেই বাতাবরণ ভ্যাঁপসা ভ’য়’ঙ্ক’র থমথমে হয়ে উঠল। দৈহিক যন্ত্রনা মন্থর গতিতে নিয়ে যাচ্ছে নিলীমাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।
–”আম্মা…আম্মাকে ছেঁড়ে দিন। আম্মা তুমি এমন করছ কেনো? আম্মা আমি আছি তো! তোমার কিছু হবে না। আম্মা? আম্মা কথা বলছো না কেনো? ও…ওরা আমার আম্মাকে মেরে ফেললো! আমার আম্মা!”
ছটফট করতে করতে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল রূপকথা।
–”কিছু হয়নি রূপকথা, শান্ত হও। তোমার আম্মা ঠিক আছে। কেউ কিছু করতে পারবে না তাকে। আমি আছি তো!”, অনবরত পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে তপোবন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল।
আর দুঃস্বপ্ন দেখে ঘেমে ওঠা মেয়েটি তখনো বদ্ধ নেত্রে ছটফট করতে করতে বলছে,
–”না নেই, কেউ নেই। আম্মাকে মেরে ফেলেছে ওরা। আম্মা..”
–”কিছু হয়নি, আম্মার। আম্মা ঠিক আছে, রূপকথা। তুমি স্বপ্ন দেখছো। চোখ খোল, দেখো।”
তপোবন পুনরায় শান্ত স্বরে বলল। বক্ষমাঝে মেয়েটি মুখ ডুবিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে এবার মেয়েটির গালে আলতো হাতে চাপড় দেয়। ক্ষণকাল বাদেই মেয়েটি দিকভ্রান্ত পথিকের ন্যায় চোখ খুলে তাকায়। অস্থিরপানে এদিক ওদিক তাকায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরটি দেখে পুনশ্চঃ আর্তনাদের সুরে ডেকে ওঠে,

–”আম্মা?”
তপোবন এক হাত বাড়িয়ে ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিলো। রূপকথা হতচকিত এদিক ওদিক তাকালো মুখের সামনে ভেসে ওঠা ভারী ফর্সা মুখটি দেখতেই। আম্মা কোথায়? কিয়ৎকাল বাদ মস্তিষ্ক সচল হতেই সে অবাকপানে তাকায় নিজের অবস্থান দিকে। তাকে হতভম্ব করে দিয়ে অক্ষীপটে ভেসে উঠল অতি মোহনীয় এক দৃশ্য!
নিজের অবস্থান দেখে সরব লজ্জা, আড়ষ্টতা, ভয়ে মিইয়ে গেল মেয়েটি।
সে হন্তদন্ত হয়ে তপোবনের থেকে সরে যেতে যেতে অযুহাতের সুরে হড়বড়িয়ে বলল,
–”দুঃখিত! দুঃখিত! আসলে ঘুমের মাঝে বুঝতে পারিনি। আমার ঘুমের ধরণ খারাপ। আমি ইচ্ছা করে করিনি। ক্ষমা…”
রূপকথার কণ্ঠনালী রোধ হয়ে আসলো পৃষ্ঠদেশে পুরুষালী হাতের এক বৃহৎ থাবায়, সাথে রোধ হয়ে আসে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টাও।
পৃষ্ঠদেশে মৃদু চাপ প্রয়োগ করতেই রূপকথা পুনরায় লেপ্টে গেল প্রশস্ত বক্ষমাঝে। মেয়েটির হতচকিত বিব্রত মুখপানে চেয়ে তপোবন স্মিত হাসল। হাত বাড়িয়ে চোখের পানিগুলো মুছিয়ে দিতে দিতে বলে,
–”সমস্যা নেই, এভাবেই ঘুমাও। আমার অভ্যাস আছে। তানশান আর তানশানের…”, তপোবনের কণ্ঠনালী থমকায়। বাক্যটি সংশোধন করে পুনরায় বলে,

–”তানশান ও এমন চার হাত পায়ে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো আমায়। আমি বিরক্ত হই না। এভাবেই ঘুমাও।”
বলতে বলতেই মেয়েটিকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। আর জড়তা, আড়ষ্টতায় চুপসে যাওয়া রূপকথা চুপটি করে পড়ে রইলো প্রশস্ত বুকটিতে।
দেহ অসাড় হয়ে আসছে কেন? কেন বিরোধ করতে পারছে না? পুরুষালী এই প্রথম নৈকট্য যে অসহনীয়। অজানা অনুভূতিতে হাঁসফাঁস করে উঠল রূপকথা। আতরের মিষ্টি সুগন্ধ , পুরুষালী দেহের উম আর উন্মুক্ত উদরে পুরুষালী হাতের উষ্ণ স্পর্শ অনুভব হতেই মেয়েটি কিয়ৎকাল স্বকীয়তা হারিয়ে বসল।
অসহ্য সেই নৈকট্য সহ্য করতে না পেরে মিনমিনে স্বরে বলল,
–”আমার শাড়ি খুঁজে পাচ্ছি না। ছেঁড়ে দিন।”
সাথে সাথেই ভেসে আসে তপোবনের ভারী জড়ানো কণ্ঠ,
– “আমি তো একদিন ও খুঁজে পাই না তোমার শাড়ি। তবে আজ মনে হয় আমার পিঠের নিচে আছে। খোঁজার দরকার নেই। প্রতিদিন এর থেকেও বাজে অবস্থায় থাকো।”
বলেই তপোবন কম্ফোর্টার দিয়ে নিজেদের পুরোপুরি ঢেকে নিলো। অন্যদিকে রূপকথা হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইল তড়াক বুক সুপ্ত হাসির উজ্জ্বলতায় উজ্জ্বল পুরুষালী মুখটির দিকে। হতভম্ব হয়ে শুধায়,
–”প্রতিদিন এর থেকেও বাজে অবস্থা মানে?”

তপোবন উপচেপড়া হাসি লুকিয়ে মিছে গাম্ভীর্যতার সাথে বলল,
–”হুঁ, প্রতিদিন। তুমি প্রতিদিন এভাবেই আমার বুকের মাঝে ঢুকে ঘুমাও।”
রূপকথা আশ্চর্য হয়ে গেল। কোনমতেই এই লজ্জাজনক মুহুর্ত সামলে উঠতে পারছে না। লোকটা কি রাতের ঐ লজ্জাজনক পরিস্থিতির জন্য এভাবে তাকে লজ্জায় ফেলছে? সে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
–”আপনি মিথ্যা কথা বলছেন। রাতেও মিথ্যা বলেছিলেন।”
–”মোটেই না। আমার কাছে প্রমাণ আছে।”,
তপোবনের দৃঢ় কণ্ঠে রূপকথা মিইয়ে গেল। রাতের সেই লজ্জাজনক পরিস্থিতি তপোবন ভোলেনি। নিতান্তই পিচ্চি একটা মেয়ের কাছে ওভাবে হেনস্থা হয়ে তপোবনের বেজায় রাগ হয়েছিল নিজের উপর।
কেন জোরগলায় বললেই তো হতো আমার স্ত্রী আমি ছুঁয়েছি, কি সমস্যা? তা না, সে বোকা সেজে বসেছিল! কিন্তু তার দুই ঘন্টার ব্যবধানেই রাগ উবে যায় মেয়েটির কান্ডে। এমন মোহনীয় মুহুর্তের ফয়দা না লুটলেই না। সে মিটিমিটি হেসে শুধায়,
–”প্রমাণ দেখাব?”
রূপকথা সরব থমথমে মুখে বলল,
–”না।”

তপোবন হাসি আটকাতে পারে না। হো হো করে হেসে উঠল রূপকথার নিভে যাওয়া আদলে বলা বাচ্চা বাচ্চা কথাটিতে। মেয়েটিকে আজ চরম লজ্জায় ফেলতে ইচ্ছে করছে। সে কোনমতেই নিজেকে দমাতে পারলো না।
হাত বাড়িয়ে বেডসাইড মিনি কাবার্ডের উপর থেকে ফোনটা আনে। অন করে সেটা রূপকথার চোখের সামনে তুলে ধরতেই, লাজে টলমল করে উঠল রূপকথার আঁখিদ্বয়। অর্ধনগ্ন বদনে তপোবনের বুকে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে সে।
রাগে দুঃখে লজ্জায় সে ঘাড় কাত করে তাকায় তপোবনের দিকে। দৃষ্টিতে তার অসহায়ত্ব। মিটিমিটি হাসতে থাকা তপোবন ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–”কী?”
রূপকথা মিনমিনে স্বরে অনুনয় করে বলল,
–”এটা ডিলিট করে দিন।”
সহসা তপোবন ফোনটি সরিয়ে ফেলল। কপাল কুঁচকে বলল,
–”কেন ডিলিট করব? এটা আমার বিপদের সঙ্গী! এটা না থাকলে তো আজ দিয়েছিলে আমার উপর মিথ্যা এলিগেশন লাগিয়ে।”
রূপকথা পুনরায় অনুরোধ করলো,
–”দয়াকরে ডিলিট করে দিন। আর কখনো এমন করব না।”
–”কি করবে না?”, তপোবন ভ্রু নাচিয়ে শুধায়।
–”এই যে, এভাবে আর এলোমেলো হয়ে আপনার উপর ঘুমাবো না।”

–”কেনো ঘুমাবে না? এভাবে না ঘুমালে তারপর পড়ে যাবে। কোমড় ভাঙবে, তারপর আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে ছুটতে হবে। আমার অনেক টাকা খরচ হবে, তোমার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাবে, সংসারের কাজে হাত বাটাতে পারবে না। তোমার মৌনতা ভাবির কত কষ্ট হবে।”, তপোবনের গম্ভীর গলায় বলা কথাগুলোতে এক বিরূপ পরিস্থিতি ভেসে উঠল রূপকথার অক্ষিপটে। তপোবন পুনরায় শুধায়,
–”কি আমি ঠিক বলছি না?”
রূপকথা বোকার মতো সিরিয়াস ভঙ্গিতে ‘হ্যাঁ’ বোধক মাথা নাড়লো। তপোবন মিটিমিটি হেসে শাবাশি জানিয়ে বলল,
–”এই তো, গুড। এখন ঘুমাও।”
বলেই তপোবন রূপকথার মাথাটা চেপে ধরল নিজের বুকে। রূপকথাও জড়তা, লজ্জা আঁকড়ে চুপ করে শুয়ে রইল। অন্তরালে থাকা সদ্য পরিস্ফুটিত যুবতী মনটিতে যে তান্ডব চলছে। এহেন পুরুষালী নৈকট্য যে অনর্থ ঘটিয়ে ছাড়বে। ওষ্ঠকোনে লাজ মাখা হাসি ভর করে মেয়েটির।

তপোবন তপ্তশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে। স্রোতের তালে গা ভাসাতে সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবং ছোটবেলা থেকেই এটাই করে আসছে। জীবনে কম বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন তো হয়নি! সবকিছু এভাবেই নিস্তরঙ্গ, নির্মেঘ, শান্ত ব্যক্তিত্বের সাথে গা ভাসিয়ে গিয়েছে। তবে এই যে স্রোতের সাথে সদ্য যুক্ত হওয়া কচুরিপানা ফুলটি, পথটাকে একটু— না না একটু নয় অনেক বেশি স্নিগ্ধ, উপভোগ্য করে তুলছে।
চোখ বুজতেই যেন ফজরের আজান পড়ে গেল। রূপকথার এই জীবন যুদ্ধে ঘুম খুবই কম দেখা যায়। সংসার, পড়াশুনা, ছেলের সামনে ঘুমকে খুব একটা প্রশ্রয় দেয়া হয় না। তানশান ওজু করে বের হতেই রূপকথাকে কানটুপি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় শব্দ করলো।
রূপকথা নিরুত্তর অগ্রাহ্য করলো সেই বিরক্তি। তানশানের দিকে তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে শুধায়,
–”আজ কয়টায় ছুটি হবে?”
তানশান মুখ মুছতে মুছতে বলে,
–”বারোটা চল্লিশে।”
–”ওহ্, টিফিনে কি দেবো?”
–”আপনার কিছু দেয়া লাগবে না। জবা ফুপি জানে টিফিনে কি দিতে হবে।”, তানশান গম্ভীর স্বরে রূপকথা ত্যাড়া কণ্ঠে বলে,

–”পছন্দের কোনো খাবার থাকলে বলো। নয়তো করলা ভাজি আর পোড়া রুটি দিয়ে দেবো।”
তানশান চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
–”ইউউ! কি বাজে কম্বিনেশন। করলার সাথে পোড়া রুটি। এগুলো আপনার পঁচা মাথা ছাড়া আর কারোর মাথায় আসতে পারে না।”
রূপকথাও নির্বিকার তাকিয়ে রইল সেই কুঁচকানো দৃষ্টির দিকে। তানশান তার দৃঢ় ,ত্যাদড় চেহারা দেখে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। সে জানে মিমি নামক এই মানুষটা তার কোনো কথা শুনবে না। তাই সে বলল,
–”ক্রিমি পাস্তা আর কাস্টার্ড দিলে হবে।”
গতকালকের পিজ্জা বানাতে দম বেরিয়ে গিয়েছিল আজ আবার এই নতুন কি খাবারের নাম বলল ছেলেটা? রূপকথা অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

–”কিন্তু ক্রিমি পাস্তা তো আমি বানাতে পারি না। এটা কি?”
রূপকথার অসহায় কণ্ঠে তানশান স্মিত হাসল। ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে প্রহসনের সুরে বলল,
–”এর জন্যই বলি বেশি চালাকি না করতে। নিজের চালাকি নিজের উপরই ভারী পড়ল। এখন কিন্তু আমায় পাস্তা বানিয়ে দিতেই হবে। সেটাও আপনার হাতে। না দিতে পারলে আজ আমি টিফিন-ই নেবো না।”
রূপকথা ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। কোমড়ে হাত দিয়ে জেদি কণ্ঠে বলল,
–”মানুষ চেষ্টা করলে পারে না এমন কিছু নেই। আমি পাস্তা বানিয়েই ছাড়ব।”
–”টেস্ট ভালো হতে হবে কিন্তু! গতকালকের মতো হলে হবে না।”, তানশানের কথায় রূপকথা চোখ মুখ কুঁচকে বলল,

–”হ্যাঁ হ্যাঁ টেস্ট, কালার সব ঠিক হবে। দেখে নিও।”
–”চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন?”, তানশান ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়। রূপকথা দৃঢ় কণ্ঠে মাথা নেড়ে বলল,
–”হুঁ।”
–”আচ্ছা যান, শুভকামনা রইল আপনার জন্য। জিতলে আপনাকে একটা উপহার দেবো।”,
তানশানের কথায় রূপকথা কপাল কুঁচকে শুধায়,
–”কি উপহার দেবে?”
–”সেটা আগে জিতুন তারপরে দেবো।”
–”আচ্ছা।”
–”আপনি কি আজও কলেজে যাবেন না?”
রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো।
তানশান তার দিকে ফিরে তাকায়। নম্র কণ্ঠে বলল,
–”তাহলে আপনি পারবেন কি করে? দাদুমনি এখন আর ঝামেলা করবে না। পাপা তার সাথে কথা বলেছে।”
রূপকথা মলিন হাসল তানশানের কথায়। সে মুগ্ধ হয় তানশানের শিক্ষা দেখে। এসেছে থেকে সে একদিন ও সৎ মা হিসেবে, তানশানের থেকে খারাপ আচরণের স্বীকার হয়নি। বরং তার জন্য নিজের দাদির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। গতকাল রাতে বাবা ছেলের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় নির্জনা বেগমকে। সে বলল,
–”তোমার মেজো মায়ের শরীরটা ভালো না। তার উপর সংসারের সব কাজ আমি ফেলে রাখতে পারি না। আর তোমার পাপা আমায় খুব ভালো করে পড়াচ্ছে। ঠিক পারব, চিন্তা করো না।”
তানশান প্রেক্ষিতে কোন জবাব দেয় না। কিয়ৎকাল বাদ বলে,

–”আচ্ছা, আমি আপনার ক্লাসের পড়া আর নোট কালেক্ট করে নিয়ে আসব।”
–”সত্যিই?”, রূপকথার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তানশান উপর নিচে মাথা দোলায়। রূপকথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল,
–”ধন্যবাদ।”
ততক্ষণে তপোবন ছেলের ঘরের সামনে এসে হাজির হয়। বাবাকে দেখতেই তানশান দ্রুত কেটে পড়তে চায়। কিন্তু পারে না। তার আগেই রূপকথা তার পথ আঁটকে দাঁড়ায়। জোরপূর্বক কানটুপিটা পড়িয়ে দিতেই, তানশান নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলে,
–”এটা না পড়লে হয় না?”
–”না হয় না।”, রূপকথার জেদি কণ্ঠে তানশান বাবার দিকে তাকিয়ে রাগ ঝেড়ে বলে,
–”আমায় জেন্টল পার্ক থেকে ক্রোশে’র মাফলার কিনে দেবে। তবুও এই কানটুপি আমি আর পড়ব না। আর মিমি এটা না পড়িয়ে আমার পিছু ও ছাড়ে না।”
তপোবন ছেলের রাগান্বিত কণ্ঠে স্মিত হেসে বলল,
–”তোমার মিমি ওটা না পড়ালেও আমি ঠিকই পড়াতাম। এখন এসো তাড়াতাড়ি।”
তানশান এগিয়ে গিয়ে বাবার হাত ধরে বলল,
–”তুমি কিন্তু আমার জন্য মাফলার কিনে আনবে।”
তপোবন ছেলেকে একহাতে বুকের সাথে আগলে নিয়ে বলল,

– “স্কুল শেষে ড্রাইভার চাচাকে বলবে, অফিসে নিয়ে যেতে। একসাথে গিয়ে কিনে আনব।”
তানশান খুশি হয়ে যায়। খুশি মনে নামাজের উদ্দেশ্যে বের হয় বাবা, দাদার সাথে।
*****
প্রভাতের অম্বর তখন ধূসর। শৈত্যপ্রবাহে কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা অম্বর।‌ চারিদিকে নিস্তব্ধতা, পবনে পাখিরা নিশ্চিহ্ন। কুয়াশার শীতল বাতাবরণে প্রকৃতি সহ মানবজীবন গুটিয়ে আছে। ভোরের আলো তখন আধো আধো ফুটেছে।
অত্যাধিক পরিমাণে কুয়াশায় তপোবন, তানশান আর তকদির সিকদার বাড়িতে চলে আসে। আজ আর হাঁটতে যায়নি। ধূসর আভায় আচ্ছাদিত ধরণীর বুকে যখন সকলে উষ্ণতার খোঁজে নিমগ্ন, তখন ছোট্ট মেয়েটি স্বল্প কিছু বস্ত্রে কুয়াশার মাঝে উদাসীন চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। অমিয় দৃষ্টি কান্ড জুড়ে সেজে থাকা পাকা পাকা টক বড়ইয়ের দিকে। হাতে একটা বই। থাই গ্লাসের সাথে হেলান দিয়ে নির্মেঘ নয়নে দেখে চলেছে সেই উদাসীন দৃশ্য। প্রকৃতির সাথে সাথে মেয়েটির মুখ অস্বাভাবিকভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন।
কারোর মন খারাপের ওষুধ হতে পারাটা বেশ প্রিয় হওয়ায়, কয়েকপা এগিয়ে যায় তপোবন। ক্ষণপরিচিত তীব্র সেই আতরের সুগন্ধ আরো সন্নিকটে আসতেই মেয়েটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সরব নাকটি ঠেকে যায় প্রশস্ত বক্ষটিতে। পরিস্থিতি উপলব্ধি করার আগেই নিজেকে শূন্যে আবিস্কার করে রূপকথা। চোখের সামনে ভেসে উঠল এক থোকা টক বড়ই।
ওষ্ঠকোনে স্মিত হাসি নিয়ে সে মাথা নুইয়ে তাকায় বক্ষদেশ বরাবর থাকা পুরুষালী মুখটির দিকে। তপোবন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
–”ডোন্ট থিংক দ্যাট আ’ম আ হিরো— যে ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবে শূন্যে তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব! পাঁচ মিনিট সময় তাড়াতাড়ি বড়ই ছেঁড়ো।”
রূপকথার উদাসীন মুখটি ঠিকরে হাসি বেরিয়ে আসে। তপোবন ও স্মিত হাসে। বিলম্বহীন চুলের ভাঁজে ছোট্ট একটি হাত গলিয়ে দেয়া হয়। শক্ত করে এক গোছা চুল মুঠিতে আঁকড়ে নেয়। ফলস্বরূপ পুরুষালী মাথাটা লেপ্টে যায় মেয়েলি বক্ষদেশে। টক বড়ইয়ের দিকে সদ্য বাড়ানো হাতটি কেঁপে উঠল সেই স্পর্শে। হতচকিত এক পলক তাকায় বুকে লেপ্টে যাওয়া মুখটির দিকে। বদ্ধ নেত্রে চুপটি করে লেপ্টে আছে তপোবন। লাজ মাখা হাসি নিয়েই কম্পিত হাতে বড়ই পাড়তে লাগল। বড়ই পাড়া হতেই রূপকথা মিহি স্বরে বলল,

–”হয়ে গিয়েছে।”
তপোবন নামিয়ে দিল রূপকথাকে। রূপথার মুখ জুড়ে তখন হাসির রেখা। এই হাসির করণ যে বড়ই। তপোবন কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“মেয়েরা এত টক কেন পছন্দ করে?”
রূপকথা হেসে বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,
–“কারণ ছেলেরা পছন্দ করে না, তাই।”
তপোবন মিছে অভিভূত কণ্ঠে বলে,
–“আপনার জবাবে আমি অভিভূত।”
রূপকথা ফের খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তপোবন স্মিত হেসে শুধায়,
–“বাইরে যাবে?”
রূপকথা সরু চোখে চেয়ে বলল,
–“আম্মা দেখলে রাগারাগী করবে।”
রূপকথার কথায় তপোবন হেসে ওঠে। রূপকথা জিজ্ঞাসা করে,
–“হাসছেন কেন?”
তপোবন হাসি থামিয়ে বলল,
–“মনে হলো আমি উঠতি বয়সের কেউ—গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বাইরে যেতে চাচ্ছি বলে আম্মা পেটাবে। বউ আমার! যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে যাবো আম্মা কি বলবে? আম্মা কিছু বললে, আব্বুকে বলব তাকে নিয়েও ঘুরতে যেতে।”
তপোবনের কথায় পুনশ্চঃ রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। তপোবন তার হাত আঁকড়ে ধরে, তাড়া দিয়ে বলল,

–“চলো।”
–“এই পোশাকেই?”
–“এটা শহর! কেউ কারোর দিকে তাকানোর সময় হয়না। আর আমরা বাইকে যাব। ভালো করে সোয়েটার পরো আর কানে চাদর পেঁচিয়ে নাও।”
তপোবনের কথামতো রূপকথা সেভাবেই তৈরি হয়ে নেয়। গ্যারেজে গিয়ে তপোবন এরোজের বাইকটা বের করে। তার বাইক নেই। ছিল, বিক্রি করে দিয়েছে। সে উঠে বসে রূপকথাকে বসার জন্য বলে। রূপকথা ভয়ে ভয়ে উঠে বসল।
রূপকথার বসার ধরণ দেখে তপোবন তাকে টেনে কাছে নিয়ে আসে। রূপকথার দুই হাত টেনে নিজের পেট জড়িয়ে নিয়ে বলল,
–“এক্সিডেন্ট করলে পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাবে। তার থেকে কষ্ট করে একটু এই বুড়োকে ধরে বসুন, মুরুব্বি।”
রূপকথা স্মিত হেসে জড়িয়ে ধরে তপোবনের পেট। কুয়াশা মাখা সেই প্রভাতে একটা সুন্দর, শীতল স্বল্প গতিসম্পন্ন বাইক রাইডে দু’জনের মনে প্রশান্তি ছেয়ে গেল।
তপোবন সাত নাম্বার ঘাঁটে গিয়ে বাইক থামায়। নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায় দু’জনে। তপোবন বাইক থামিয়ে ধীরপায়ে গিয়ে দাঁড়ায় রূপকথার পাশে। রূপকথা তখন মগ্ন সতেজ, শীতল বাতাবরণের মাঝে। হাতে হাত স্পর্শ হতেই মেয়েটির বরফের ন্যায় ঠান্ডা হাতটি উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি করে। তপোবন আঁকড়ে ধরে হাতটি। নিজের হাতের মাঝে নিয়ে ঘষতে ঘষতে মৃদু উদ্বিগ্নতা নিয়ে বলে,

–“তোমার হাত তো বরফ হয়ে আছে। শীত করছে নিশ্চয়ই!”
–“উঁহু, এমনি হাত ঠান্ডা হয়ে আছে। প্রায়শই, এমন থাকে।”, রূপকথা উদাসীন কণ্ঠে বলল।
তপোবন নিরুত্তর ঘষতে থাকা হাতটি নিজের ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। রূপকথা তার কান্ডে হেসে শুধায়,
–“এক হাত গরম করছেন। আরেকহাত তো সেই বরফ!”
তপোবন মেকি ভাবুক কণ্ঠে বলল,
–“এটাও তো ঠিক! ওয়েট!”
বলেই তপোবন মেয়েটিকে নিজের সম্মুখে টেনে এনে দাঁড় করায়। অতঃপর দু’টো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ট্রাউজারের দুই পকেটে ঢুকিয়ে নিলো।
অসহনীয় নৈকট্যে আড়ষ্ট রূপকথা। মিইয়ে দাঁড়িয়ে রইল বক্ষমাঝে। নদীর অপরপাশ থেকে তখন একটু আধটু সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে। কুয়াশা কাটছে ধীরগতিতে। নদীর পাড়ে তখন এক যুগলের সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য! পথচারীরা দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায়। সেভাবেই নীরবে কেটে যায় কিছুক্ষণ। তপোবন নিরবতা ভেঙ্গে শুধায়,
–“মন খারাপ কেন?”
রূপথার উদাসীনতারা আস্কারা পায়। মনে চেপে রাখা কিছু যাতনা রাখতে চায় কারোর কাছে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে না। এই যে বিশাল শহরটিতে সে চোখ বুজে বিশ্বাস করতে পারে শুধু এই একটা মানুষকে। তবে তার অন্তরালে থাকা সুপ্ত যাতনাগুলো জানার অধিকার ও নিশ্চয়ই রাখে? সে চোখ তুলে তাকায় তপোবনের মুখপানে। ধিমি স্বরে বলে,

–“আমার বাবা চরিত্রহীন নয়।”
–“কে বলল এমন কথা? যেই মানুষটা এত সুন্দর একটা অংশের জনক! সেই মানুষটা কখনো চরিত্রহীন হতেই পারে না।”
নিস্তরঙ্গ, নিরুত্তাল নদীর থৈ থৈ পানির দিকে দৃষ্টি রেখে বলে তপোবন।
–“আর যদি হয়?”, রূপকথার নিরুদ্বেগ কণ্ঠে তপোবন ম্লান হেসে বলল,
–“হলে হবে।”
–“আপনার কোন সমস্যা নেই?”
–“থাকার তো কথা নয়।”
–“কেন নয়? আমি তো আপনার সাথে জুড়ে আছি। আপনার সম্মানে আঘাত হানবে না?”
তপোবন নিরুদ্বেগ ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“যার নিজের গায়ে কলঙ্ক লেপ্টে আছে, তার আবার অন্যের গায়ের কলঙ্ক দেখে সম্মানহানি কি করে হবে?”
“কী বলছেন?”, রূপকথার অবুঝ কণ্ঠে তপোবন তার দিকে তাকায়। মৃদু হেসে পকেট থেকে এক হাত বের করে লালচে নাকটা ছুঁয়ে দিয়ে বলে,

–“এত ভেবোনা। বাবা মায়ের কর্মের ফল সন্তানেরা কেন পাবে? এই প্রশ্নের কখনো যুৎসই জবাব আমি পাইনি। প্রতি ক্ষেত্রে দেখেছি বাবা মায়ের ভুলের শাস্তি সন্তানদেরই পেতে হয়। তাই যতদিন আমি আছি কখনো এই কথাটির প্রভাব তোমার উপর পড়তে দেবো না।”
রূপকথা নিরুত্তর রয়। কিয়ৎকাল বাদ শুধায়,
–“ক্রিমি পাস্তা কি? এটা বানায় কিভাবে?”
–“কি করবে? খেতে ইচ্ছে করছে?” , তপোবনের কৌতুহলী গলায় রূপকথা না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“তানশান টিফিনে এটা চেয়েছে। এটা না বানিয়ে দিতে পারলে সে আজ কোন টিফিন-ই নেবে না। আর বানাতে পারলে উপহার দেবে। আমায় সাহায্য করুন।”
শেষের কথায় অনুনয় ছিল। তপোবন প্রগাঢ় হাসল তার কথায়। মা ছেলের এই বন্ধুত্বপূর্ণ, খোটাখুটির সম্পর্ক তাকে প্রশান্তি দেয়। সে পকেট থেকে ফোন বের করে ইউটিউব থেকে পাস্তার রেসিপি বের করে দেয়। একের পর এক পাস্তার রেসিপি দেখে রূপকথা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলো। বাড়িতে গিয়ে একটা রেসিপি ফলো করে সে পাস্তা বানায়। টিফিন দেয়ার আগে তানশানকে টেস্ট করার জন্য একটু দিলে, সে অবাক হয়ে যায়। প্রসংশা করে বলে,

–“অসাধারণ হয়েছে।”
রূপকথা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শুধায়,
–“টেস্ট হয়েছে?”
তানশান মৃদু হেসে বলল,
–“একদম পারফেক্ট।”
রূপকথা হাসিমুখে বলল,
– “তাহলে আমি তো চ্যালেঞ্জ জিতে গিয়েছি। আমার উপহার দাও এখন।”
তানশান মাথা নেড়ে বলল,
–“ওহ্ হ্যাঁ, আপনার উপহার। আসুন উপরে আসুন, দিচ্ছি।”
রূপকথা উৎফুল্লতা নিয়ে তানশানের পেছন পেছন যায়। তানশান বাবার ঘরে ঢুকে খুঁজে খুঁজে রূপকথার ফিজিক্স সাপ্লিমেন্ট বের করে। সেখান থেকে সদ্য শেষ হওয়া চ্যাপ্টারটা বের করে বলল,
–“আমি স্কুল থেকে আসার মধ্যে এই চ্যাপ্টারের সব সৃজনশীল প্রশ্ন গুলো শেষ করবেন।”
আনন্দিত রূপকথা বোকা বনে গেল। কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধায়,
–“তুমি না বললে আমায় উপহার দেবে?”
তানশান মিটিমিটি হেসে বলল,
–“এটাই আপনার উপহার।”
রূপকথা রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায়। রাগান্বিত স্বরে শুধায়,
–“তুমি আমার সাথে চিট করেছো?”
তানশান জবাব দেয় না। খিক খিক করে হেসে উঠল। রূপকথা তেতে উঠে হাতের কাছের তোয়ালেটা ছুঁড়ে মারলো তার মুখের উপর। তানশান সেটি ক্যাঁচ ধরে হাসতে হাসতে বলল,

–“মিমি বোকা হয়ে গিয়েছে!”
রূপকথা তেড়ে যায় তার দিকে। তানশান তোয়ালে ছুঁড়ে মেরে এক ছুটে নিজের ঘরে দৌড়ে চলে যায়। আর সপাটে দরজা আটকে দেয়। রূপকথা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল,
–“বের হও আজ, পাজি ছেলে!”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৮

সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা নির্জনা বেগম সরু চোখে তাকিয়ে থাকে রূপকথার পানে। যত বোকাসোকা ভেবেছিল তত বোকা নয় মেয়েটি—নিঝাম ঠিক বলে। নয়তো বাবা ছেলেকে এত অল্প সময়ের মধ্যে হাত করে কিভাবে নিলো! সে চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। ছেলের বউ যতই অপছন্দের হোক না কেন! দিনশেষে ছেলে নাতির হাসিমুখ তাকে প্রশান্তি দেয়।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব  ২৯ (২)