Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৩

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৩

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৩
সাবা খান

গড়িয়ে গেছে প্রায় অর্ধমাস। এই অর্ধমাসে সময় যেন নিজ দায়িত্বে সবকিছুর ওপর ধুলোর আস্তরণ চাপিয়ে দিয়েছে। যে ঘটনাগুলো কিছুদিন আগেও মানুষের বুকের মধ্যে আতঙ্কের মতো কাঁপন তুলেছিল, সেগুলো আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নতুন দিনের ব্যস্ততার ভিড়ে। পৃথিবী বোধহয় এমনই, এখানে শোকও দীর্ঘস্থায়ী নয়, আতঙ্কও নয়। সময় নামক নিষ্ঠুর স্রোত একসময় সবকিছুকেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় বিস্মৃতির গভীরে।
একসময় দেশের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে, প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে উচ্চারিত হতো দুইটি নাম, সোফিয়া জাওয়ান এবং দিলরুবা খানম। মানুষ বিস্ময়ে, ঘৃণায়, আতঙ্কে তাদের নিয়ে আলোচনা করত, রাতভর চলত বিতর্ক। কেউ তাদের অভিশাপ দিত, কেউ ষড়যন্ত্র খুঁজত, কেউবা সত্য মিথ্যার হিসাব মিলাতে গিয়ে নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু আজ?

আজ সেই নামগুলো যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের গহ্বরে। এখন আর চায়ের দোকানের আড্ডায় তাদের প্রসঙ্গ ওঠে না। টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজেও নেই তাদের মুখ। সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং তালিকা থেকে বহু আগেই মুছে গেছে তাদের অস্তিত্ব। কী অদ্ভুত পৃথিবীর নিয়ম!
যে মানুষটিকে নিয়ে গতকাল সমগ্র বিশ্ব উত্তাল ছিল, আজ তাকে নিয়েই আর কারও কোনো আগ্রহ নেই। সময়ের চাকা কেবল সামনে এগিয়ে চলে কাউকে নিয়ে থেমে থাকে না। কারও পতনে পৃথিবী থামে না, কারও কান্নায় আকাশ ভেঙে পড়ে না। সবকিছুই ধীরে ধীরে মিশে যায় নতুন কোনো ঘটনার কোলাহলে।
তবে এই দীর্ঘ সময়টুকুতে সমগ্র দেশের বুকে আরেকটি খবর যেন আনন্দের ঢেউ তুলে দিয়েছে, বলা যেতে পারে একটা সুখবর, একটা বহু প্রতীক্ষিত উচ্ছ্বাস। তা হলো, “সুপারস্টার আরজে আবারও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলেছে নিজের স্ত্রী সানার সাথে”

আর এই একটি সংবাদ যেন মুহূর্তেই বিষণ্ন দেশের আকাশে রঙিন উৎসবের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। টেলিভিশনের বিনোদন চ্যানেল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র এখন শুধুই তাদের বিয়ের আলোচনা। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ মানুষ পোস্ট করছে তাদের ছবি, ভিডিও, এডিট, ফ্যানপেজগুলোতে চলছে উন্মাদনা।
শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এই খবরে উন্মাদনা। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো পর্যন্ত এই রাজকীয় আয়োজন কাভার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেননা প্রথমবার তারা সবার আড়ালে বিয়ে করেছিল, নিভৃতে, গোপনে। কিন্তু এবার? এবার আরজে সমগ্র পৃথিবীকে সাক্ষী রেখে নিজের স্ত্রীকে আবারও নিজের করে নিতে চলেছে। আর এই আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে আরও তিনটি জোড়া, এসপি ও সানিতা, ঈশানী ও রিজভী, জ্যাক ও ইবেলিনা। একসাথে চার চারটি জোড়া বসতে চলেছে বিবাহের আসরে। যেন পুরো ব্ল্যাক ম্যানশনটাই পরিণত হয়েছে প্রেমের কোনো রাজ্যে।

গত কয়েকদিন ধরে ম্যানশনের প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি কক্ষ, প্রতিটি বাগানজুড়ে শুধুই প্রস্তুতি আর প্রস্তুতি চলছে। দেশ বিদেশের নামকরা ডিজাইনাররা এসে পুরো ম্যানশনকে নতুন রূপে সাজাচ্ছে। সানার পছন্দমতো প্রতিটি ডেকোরেশন নিজ হাতে নির্বাচন করেছে আরজে। হলুদের জন্য আলাদা থিম, মেহেদির জন্য আলাদা সাজ, বিয়ের জন্য আলাদা রাজকীয় আয়োজন, আর রিসেপশনের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্বপ্নময় পরিবেশ।
চার দিনের এই অনুষ্ঠান কোনো সাধারণ বিয়ে নয় যেন কোনো রাজপরিবারের মহোৎসব। এমনকি ব্ল্যাক ম্যানশনের দরজাও খুলে দেওয়া হয়েছে সংবাদমাধ্যমের জন্য। দেশি বিদেশি সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, মিডিয়া টিম সবাইকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে এই মহোৎসব কাভার করার। আর বিয়ের মূল দিনে সাধারণ মানুষও প্রবেশ করতে পারবে ম্যানশনের নির্দিষ্ট অংশে। তাদের জন্য থাকছে আলাদা খাবার, সংগীত, আলোকসজ্জা এবং বিনোদনের ব্যবস্থা।
সমগ্র দেশ যেন অপেক্ষা করছে সেই দিনটার জন্য। আর আজ থেকেই শুরু হচ্ছে সকল আচার অনুষ্ঠান। আর সেই উপলক্ষেই আজকের সকালটা যেন অন্যসব সকালের চেয়ে আলাদা। শীতশেষের কোমল ভোরের আকাশে ফ্যাকাশে সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে ধীরে ধীরে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গোলাপ আর রজনীগন্ধার মিশ্র সুগন্ধ। এই সুন্দর সকালের মধ্যেই ব্ল্যাক ম্যানশন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

বিশাল ম্যানসন জুড়ে ছুটোছুটি করছে শত শত কর্মচারী। সামনের সুবিশাল বাগানজুড়ে তৈরি হচ্ছে মেহেদির মঞ্চ। পুরো বাগানটাকে সাজানো হচ্ছে রাজকীয় আরবীয় থিমে। চারপাশে টাঙানো হচ্ছে সবুজ আর সোনালি রঙের ঝালর। মাথার ওপরে ঝুলছে অসংখ্য ফেয়ারি লাইট, যেগুলো রাত নামলেই জোনাকির মতো জ্বলে উঠবে। মাঝখানে গোলাকার কাঠের স্টেজ, তার চারপাশে ফুলের খিলান। সাদা, হলুদ আর গাঢ় সবুজ ফুলের সমাহারে পুরো পরিবেশটা যেন রূপকথার কোনো প্রাসাদে পরিণত হয়েছে।
একপাশে বসানো হচ্ছে লাইভ মেহেদি স্টেশন। বড় বড় পিতলের বাটিতে রাখা হচ্ছে তাজা মেহেদি। অন্যপাশে মিষ্টির কাউন্টার, যেখানে সারি সারি সাজানো বিদেশি ডেজার্ট। কর্মচারীরা ব্যস্ত হাতে টেবিলক্লথ বিছাচ্ছে, ফুল সাজাচ্ছে, লাইট ঠিক করছে। আর এই সমস্ত কিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন খুশদিল ফারুকী।
ওনার হাতে বড় একটা ফাইল, আর মুখভর্তি বিরক্তি। চোখেমুখে স্পষ্ট চটে থাকা ভাব ফুটে ওঠেছে। তিনি আবারও রুক্ষ স্বরে বুলি ছুঁড়েন,

—”এই ফুলগুলো এদিকে কে রাখছে? আমি কি বলিনি বাম পাশে সাদা গোলাপ যাবে? নাকি সবগুলো কালা”
—”ওই লাইটটা সোজা করো, সোজা, এভাবে বাঁকা থাকলে অতিথিরা কি ভাববে?”
—”এই যে তোমাকে বলছি, ওই টেবিলের কাপড়ে ভাঁজ কেন?
যাও গিয়ে আগে ঠিক করো”
তার বজ্রকণ্ঠে পুরো বাগান থরথর করে কেঁপে উঠছে। আসল সমস্যা অবশ্য অন্য জায়গায়। আজ সকাল থেকেই চারবার এসপির সাথে তার ছোটখাটো যুদ্ধ হয়ে গেছে। আর প্রতিবারই সেই ছেলেটা এমনভাবে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে যে খুশদিল ফারুকীর রাগ এখন সপ্তম আকাশে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে কর্মচারীদের উপর।
প্রথমবার খুশদিল তাকে ফুলের সাজসজ্জা দেখতে বলেছিলেন, আর সে উল্টো ফুলওয়ালাদের নিয়ে নাচ শুরু করে দিয়েছিল, সে আবারও বিয়ে করতে চলছে তাই। খুশদিল ফারুকী এসে দেখে রাগে গর্জন করে উঠতেই দূরে দেখা গেল এসপি দৌড়ে পালাচ্ছে। হাতে একটা আধখাওয়া আপেল, মুখে বিশাল হাসি,

—”শশুরজি….”
এই বলে সে এক লাফে বাগানের অপর পাশ দিয়ে উধাও হয়ে গেল। খুশদিল ফারুকীর রাগে প্রায় শিরা ফুলে উঠছে। তিনি দন্ত পাটি পিষে আওড়ান,
—”এই আওয়ারাগিরি করা ছেলের কাছে আমি আর মেয়ে দিব না”
ফলে এখন তিনি যাকে সামনে পাচ্ছেন, তাকেই ধমকাচ্ছেন,
—”তোমরা সবাই আজ আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে”
একজন কেয়ারটেকার ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে, —”স্যার, আমরা তো কিছু করিনি…”
খুশদিল ফারুকী দাঁত চেপে বলেন,
—”করোনি? তোমাদের চেহারা দেখলেই আমার রাগ বাড়ে”
চারপাশের কর্মচারীরা মাথা নিচু করে দ্রুত কাজ করতে থাকে। আর দূরে কোথাও, ম্যানশনের এক কোণে দাঁড়িয়ে এসপি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে সবকিছু দেখছে। তার চোখেমুখে সেই চিরচেনা দুষ্টুমি ঝিলিক দিচ্ছে।

এদিকে ব্ল্যাক ম্যানশনের বিস্তীর্ণ অন্দরমহল আজ যেন এক অদৃশ্য প্রাণচাঞ্চল্যে স্পন্দিত হচ্ছে। বাইরে প্রস্তুতির ধ্বনি, ভিতরে মানুষের ব্যস্ত পদচারণা সব মিলিয়ে পুরো প্রাসাদটিই যেন এক মহোৎসবের অপেক্ষায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আছে। আর এই বিশাল আয়োজনের ভেতর, ম্যানশনের এক নিরিবিলি অংশে, আরভির কক্ষটি আজ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য দামী খেলনা, লেগো সেট, রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, ছোট ছোট মডেল বিল্ডিং, আর এক কোণে ঝলমল করছে লেটেস্ট গেমিং কনসোল। পুরো ঘরটিই যেন এক শিশুর কল্পনার রাজ্য, যেখানে বাস্তবতার কোনো ভার নেই।
আরভি নিজের মতো করে গভীর মনোযোগে খেলছে, তার চারপাশে যেন পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেমে গেছে। পাশে বসা কিয়ান আর তার মধ্যে চলছে তীব্র ভিডিও গেম প্রতিযোগিতা, আঙুল দ্রুত গতিতে কন্ট্রোলারের বাটনে ছুটে চলেছে দিজনের। কিয়ান আগে কখনো এমন গেমিং অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল না, কিন্তু আরভির সঙ্গ পেয়ে মাত্র দুই সপ্তাহেই সে যেন এক প্রো লেভেলের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে এখন চলমান প্রতিযোগিতা কখনো হাসি, কখনো ক্ষণিকের হতাশা, আবার পরমুহূর্তেই নতুন উদ্যমে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় চলছে। যদিও কিয়ান জানে শেষ পর্যন্ত আরভি-ই উইনার হবে কেননা এছাড়া খেলা শেষ হবে না।

অন্যদিকে কিয়ারা একটু দূরে বসে একা একা নিজের খেলনার জগতে মগ্ন। সে ছোট ছোট পুতুল সাজাচ্ছে, তাদের জন্য অদৃশ্য রাজ্য বানাচ্ছে, কখনো হাসছে আবার কখনো নিজের মতো করে গল্প বানিয়ে নিচ্ছে। আর এই পুরো দৃশ্যটি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছে আয়ান। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো মৃদু হাসি জমে আছে। আয়ানের মানস্পটে খেলে যায় সেই প্রথম দিনের কথা যেদিন সানা কিয়ান ও কিয়ারাকে এখানে নিয়ে এসেছে।
এখানে আসার পর কিয়ারা প্রথম তিন চার দিন কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে যেত, আর কিয়ান চুপচাপ কোণায় বসে থাকত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, বিশেষ করে সানার উপস্থিতি তাদের জীবনে এক অদ্ভুত উষ্ণতা এনে দিয়েছে। এখন তারা আর আগের মতো রাতভর কান্না করে না, শুধু মাঝে মাঝে মায়ের নামটা মুখে আসে, তাও ক্ষীণভাবে, অনেকটা অভ্যাসের মতো। কিয়ারা ধরতে গেলে এখন সারাক্ষণ সানার পিছু পিছু ঘোরে, আর কিয়ান যেন আরভির ছায়া হয়ে গেছে।

আয়ানের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই প্রথম দিন আরভি যখন কিয়ান ও কিয়ারাকে দেখেছিল তখনই তার ভ্রু কুঁচকে গিয়েছিল। আবার যখন সানা তাকে ছেড়ে তাদের সাথে বেশির ভাগ সময় কাটাতো তখন তার ছোট্ট মন এক অদ্ভুত অধিকারবোধে ভরে উঠেছিল,
“তার একমাত্র সুইট মম, কেন অন্যদের আদর করবে?”
এই ঈর্ষার দথেকে সে একবার কিয়ান কে ধাক্কা মেরে ফেলেও দিয়েছিল। আর এদের দুজনকেই সে সিরাতের ধারে কাছেও যেতে দিত না। পরবর্তীতে সানা সময় নিয়ে তাকে বোঝায়, ভালোবাসা ভাগ করলে কমে না, বরং বাড়ে। অনেকটা সময় নিয়ে সে আরভির ছোট্ট মনটাকে শান্ত করে। তারপর ধীরে ধীরে একদিন সেই দূরত্ব ভেঙে যায়। আর ঠিক চার দিন পর সে নিজে থেকে তাদের সাথে কথা বলতে যায়। তবে তাকে দেখেই ছোট্ট কিয়ারা তড়িঘড়ি করে সানার পিছনে লুকিয়ে পড়ে। আরভি ঘাড় কাত করে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”সো… ইউ আর হিজ এন্ড মাই লিটল সিস্টার, রাইট?”

কিয়ারা একটু ভয় মিশ্রিত হাসিতে মাথা নাড়ে কিন্তু মুখে কিছুই বলে না বরং কিয়ান পাশ থেকে জবাব দেয়,
—”আরে ও এক নাম্বারের ভীতুর ডিম। কারো সাথে ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না”
আরভি একপলক তার দিকে তাকিয়ে পর মুহূর্তে একহাত পকেটে ঢুকিয়ে ছোট্ট শরীর টা টানটান করে ভাব নিয়ে বলে,
—”ওকে লিসেন, আ’ম আরভি, এই বাড়ির না এই ম্যানশনের জুনিয়র বস। অ্যান্ড ফ্রম নাও অন, ইউ গাইজ আর মাই ফ্রেন্ডস। কজ মাই মম সেইড, ফ্রেন্ডস মিনস শেয়ারিং। সো….”
কিয়ান তার কথা কেটে জিজ্ঞেস করে, —”শেয়ারিং?”
—”ইয়েস, টয়েস, গেমস, চকলেট এভরিথিং”
কিয়ারার ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে হাসি ফুটে ওঠে। সে হাতে তালি দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে,
—”ইয়েহহহ,,, আত্তা আমি কি তোমাল রুমেল খেলনা গুলো ধরতে পারবব”
—”হ্যাঁ, তবে একটা শর্ত আছে”
কিয়ানের ছোট কপালে ভাঁজ ফেলে শুধায়,
—”কি শর্ত?”
আরভি এবার দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে আওড়াল,

—”আমার মন কে মম বলা যাবে না, সিরাতকে রাত ডাকা যাবে না, রাতের সাথে বেশি খেলা করা যাবে না। আর তোমরা আমার সাথে খেলবে। বাট খেলা হবে আমার রুলসে। মানে,
আমি জিতলে গেম ওভার হবে,
আমি হারলে গেম আবার হবে”
কিয়ান সঙ্গে সঙ্গে কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,
—”এটা তো চিটিং”
আরভি একই সুরে আওড়ায়,
—”নোপ, দ্যাটস কল্ড বস রুলস….আর আমি এখানে বস”
এদিকে সানা তার কথা শুনে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। সে কী করববে? ছেলেকে এটুকু বুঝিয়েছে অনেক কষ্টে। সে বুঝতে পারছে না, তার ছেলেটা দিন দিন এতটা জেদি, একরোখা কেন হয়ে যাচ্ছে। পরমুহূর্তে মাথায় আসল, সবই আরজের দোষ। রমণী কিছু না বলে কিয়ারাকে নিয়ে চলে যায়।
এদিকে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এসপি সবেমাত্র আপেলে একটা কামড় বসিয়েছে কিন্তু আরভির শর্তগুলো শুনতেই তার আর আপেল গলদঃকরণ করা হলো না, সেটা মুখ থেকেই নিচে পড়ে গেছে। সে বিস্মিত চোখে আরভিকি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত লক্ষ্য করে বিড়বিড় করে,

—”শালা, এখন থেকেই আমার মেয়ের উপর অধিকার দেখাচ্ছে। এ তো দেখছি বড় হয়ে বাপের থেকেও বেশি জাওরা হবে। আমি কোনমতেই মেয়ে দিব না যাই হয়ে যাক না কেন? প্রয়োজনে এই বিষয়ে আমি আমার শ্বশুরজির থেকেও কড়া পদক্ষেপ নিব, কিন্তু মেয়ে দেওয়া যাবে না”
আয়ানের সেই কথা গুলো ভেবেই ঠোঁটের হাসি আরও বিস্তৃত হয়। সে মাথাটা সামান্য ঝাঁকায়, যেন অতীতের ভার নামিয়ে ফেলছে। তারপর ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে মনে মনে বলে ওঠে,
—”কল্পবাসিনী, আপনি দেখছেন তো? আজ এতদিন পর আমাদের বাচ্চারা সত্যি হাসছে… সত্যি খুশি”
তারপর সে এগিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে কিয়ারার সাথে বসে অংশ নেয় খেলায়।

সন্ধ্যার শেষ প্রহরটুকু গড়িয়ে রাতের কোমল আবরণ নামতেই যেন নতুন এক রূপে জেগে ওঠে ব্ল্যাক ম্যানশন। চারপাশে টাঙানো সোনালি ফেয়ারি লাইটগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল অন্ধকারের বুক চিরে অসংখ্য জোনাকি একসাথে আশ্রয় নিয়েছে এই প্রাসাদে। বিশাল বাগানজুড়ে তৈরি করা হয়েছে রাজকীয় প্যান্ডেল সাদা, সবুজ আর সোনালি কাপড়ের মিশেলে গড়া সেই প্যান্ডেলের ছাদ থেকে ঝুলছে তাজা গাঁদা, বেলি আর গোলাপের মালা। চারদিকে আতরের মাদকতাময় সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরে ঢোলকের তাল, নারীদের হাসির শব্দ আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশে পুরো পরিবেশ যেন জীবন্ত কোনো স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
মেহেদির আয়োজন ঘিরে তখন পুরো ম্যানশন সরগরম। দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের ক্যামেরা একের পর এক ফ্ল্যাশ ছুঁড়ে যাচ্ছে। সানিতা ও সিয়ার বাড়ি থেকে আসা মহিলারা ইতোমধ্যেই প্যান্ডেলের অর্ধেক জায়গা দখল করে বসে পড়েছে। কেউ হাসতে হাসতে গানের তালে তালি দিচ্ছে, কেউ আবার কনের সাজ নিয়ে ফিসফিস করছে। সার্ভেন্টরা এক মুহূর্ত দম নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, কারও হাতে শরবতের ট্রে, কারও হাতে ফুলের ঝুড়ি। ঠিক এমন সময় প্রবেশ করে একসাথে পাঁচ নারী।

আর মুহূর্তের মধ্যেই যেন থমকে যায় চারপাশ। সবার দৃষ্টি আটকে যায় তাদের ওপর। সবার সামনে হাঁটছে সানা। রমণীকেে গাঢ় পান্না সবুজ রঙের ঢিলেঢালা জর্জেট লেহেঙ্গায় একদম কোন রাজ্যের রানীর মতো লাগছে। সারা পোশাকজুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি জরি আর পাথরের কাজ। কপালে ছোট্ট টিকলি, চোখে হালকা স্মোকি কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা, খোলা চুলের ঢেউ গড়িয়ে নেমেছে কাঁধ ছুঁয়ে সোজা পিঠে।
তার পাশেই ইবেলিনা, একদম হালকা সিলভার ল্যাভেন্ডার রঙের ঢেউখেলানো গাউনে তাকে যেন লাগছিল কোনো ইউরোপীয় পরী। আর সানিতার পরনে মেরুন রঙের ভারী শারারা। তার পুরো পোশাকজুড়ে সূক্ষ্ম মিরর ওয়ার্ক। চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁটের কোণে চিরচেনা হাসি তাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ঈশানী সেজেছে হালকা হলুদ আর সাদা রঙের ফ্লোরাল লেহেঙ্গায়। আজ সে একদম নিজেকে বাঙালি সাজে সজ্জিত করেছে, চুলে জুঁই ফুলের মালা আর হাতে কাঁচের চুড়ি। আর সিয়া পরেছে রয়্যাল ব্লু রঙের আনারকলি। তাদের পাঁচজনকে একসাথে প্রবেশ করতে দেখেই চারপাশে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। কেউ তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তো কেউ প্রতিহিংসার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যেন থামছেই না। সাংবাদিকরা একের পর এক ছবি তুলছে। কেউ ভিডিও করছে, কেউ লাইভে যাচ্ছে। পাঁচজন ধীরে ধীরে এসে প্যান্ডেলের মাঝখানের সাজানো আসনে বসে পড়তেই মেহেদি আর্টিস্টরা এগিয়ে আসে। কারও হাতে রুপালি কোন, কারও হাতে নকশার খাতা। মুহূর্তের মধ্যেই হাসি-আড্ডায় জমে ওঠে পরিবেশ।
সানিতা হাত বাড়িয়ে বলে ওঠে,
—”দেখো কিন্তু আমার হাতে “ফারাদ” নামটা সবচেয়ে ছোট করে লিখবা। ও যেন খুঁজতে খুঁজতে বুড়া হয়ে যায়”
সানা সাথে সাথে বলে ওঠে,
—”আবে ইয়ার, তুমি বরং পুরো হাতেই ওর নাম লিখে ফেল, তাও খুঁজে পাবে কিনা সন্দেহ”
সানার কথায় চারপাশে হেসে ওঠে সবাই। ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো প্যান্ডেলের আলো ক্ষীণ হয়ে আসে। এক মুহূর্তে চারপাশে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়,

—”আরে আলো গেল কই?”
—”কেয়ারটেকার”
সানাও বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে চারপাশে তাকিয়ে হাতের দিকে তাকাতেই দেখে, মাত্র অর্ধেক হয়েছে। এমন মুহূর্তেই কারেন্ট যেতে হলো, ধ্যাৎ এমন মুহূর্তেই কারেন্ট যেতে হলো। সে গলা বাড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে,
—”আবে বিটকেল, জেনারেটর অন করররর। না হলে কানের নিচে….ওমমম…..”
রমণী আর বাকিটা বলার আগেই ঈশানী পিছন থেকে তার মুখ চেপে ধরে হিসহিসিয়ে ওঠে,
—”আস্তে ডাইনি, আস্তে। এখন কানের নিচের ডায়লগ বলে সবার সামনে সম্মান খাবি নাকি?”
সানা এক হাতে টেনে তার হাত সরিয়ে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাত কিরমির করে বলে,
—”শালী কালনাগিনী, তোর সাহস কিভাবে হলো আমার মুখ চেপে ধরার। এখন যদি আমি মেহেদি হাতে তোর কানের নিচে বাজাই। বল কেমন লাগবে?”
ঈশানী তরফ থেকে আর কোন বাক্য যাওয়ার পূর্বেই ইবেলিনা পাশ থেকে সতর্ক করে,
—”প্লিজ, আর একটু পর তোমরা বিয়ে করবে আর এখনো তোমরা পাঁচ বছরের বাচ্চার মত ঝগড়া করছো”
—”আমি না, এই কালনাগিনী”
—”আমিও না, এই ডাইনি শুরু করেছে”

দুই রমণীর কথা কাটাকাটি থেমে যায় হঠাৎ আচমকা প্রবেশপথের দিকের আলো একসাথে জ্বলে ওঠায়। আর সেই আলোর রেখা ভেদ করে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে পাঁচজন পুরুষ। মাঝখানে আরজে, তার এক হাতে ছোট্ট আরভি, অন্য হাত পকেটে গোঁজা। সানার সাথে মিলিয়ে কালো আর গাঢ় সবুজের মিশেলে তৈরি ভারী শেরওয়ানিতে তাকে দেখাচ্ছে যেন অন্ধকার থেকে উঠে আসা কোনো রাজপুত্র। বুকজুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ, হাতে কালো ফিতার রোলেক্স ঘড়ি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। যদিও মুখভর্তি বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট, বোঝাই যাচ্ছে এই শেরওয়ানি পরার ইচ্ছা তার একদমই ছিল না। আরজের দৃষ্টি সবার আগে গিয়ে থামে সানার ওপর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার কঠিন মুখশ্রীর ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে নরম এক প্রশান্তি। যেন চারপাশের হাজার আলো ঝলমলের মাঝেও তার পৃথিবী সীমাবদ্ধ শুধু ওই এক নারীতেই।

আরজের ডান পাশে জ্যাক, সম্পূর্ণ কালো শেরওয়ানিতে তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। তবে তার অস্বস্তিও মুখেই স্পষ্ট। চোয়াল শক্ত করে হাঁটছে সে, যেন কেউ তাকে জোর করে এটা পরিয়েছে। তবু তার ব্যক্তিত্বের কারণে তাকেও লাগছিল অসম্ভব অভিজাত। জ্যাকের পাশেই কাইলিন, গাঢ় নীল শেরওয়ানিতে সম্পূর্ণ রাজকীয় ভঙ্গিতে আজ। অন্য পাশে রিজভীর পরনে অফ হোয়াইট শেরওয়ানি। সবশেষে এসপি, আজ তার মুখভর্তি আত্মতৃপ্তির হাসি। তার পরনে সোনালি কাজ করা মেরুন শেরওয়ানি। তাদের প্রবেশের সাথে সাথে আবারও ক্যামেরার ফ্ল্যাশে আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো প্যান্ডেল। চারপাশে বিস্ময়ের চাপা শব্দ।
এদিকে চারপাশের আলোর ঝলকানি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর নারীদের উচ্ছ্বসিত গুঞ্জনের মধ্যেও এক অদ্ভুত দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হলো প্রতিটি রমণীর দৃষ্টি আটকে আছে শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত পুরুষটির উপর। যেন পুরো পৃথিবীর ভিড়ের মাঝেও তারা শুধু একজনকেই দেখতে পাচ্ছে। আবার আশেপাশের অন্যান্য নারীদের উচ্ছ্বাস, মুগ্ধতা আর লুকোনো দীর্ঘশ্বাসগুলোও তাদের বুকের ভেতরে হালকা প্রতিহিংসার রেখা টেনে দিচ্ছে। কারো চোখে বিস্ময়, কারো চোখে আফসোস, আবার কারো মনে চাপা ঈর্ষা। এমন পুরুষদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নারীরা যে অকারণেই গর্ব অনুভব করবে, তা খুব স্বাভাবিক।

এদিকে সিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত সানিতার হাতে মেহেদি আঁকছিল। সানিতা নিজেই জেদ ধরে বলেছিল, তার হাতে মেহেদি শুধু সিয়াই দেবে। সিয়া নিচু হয়ে সূক্ষ্ম নকশা আঁকছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ তার দৃষ্টি অন্যমনস্কভাবে ওপরে উঠে যায়। আর চোখ আটকে যায় কাইলিনের উপর। ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। গাঢ় নীল শেরওয়ানির উপর রুপালি কারুকাজ, চুলগুলো হালকা এলোমেলো, ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা আধখানা বাঁকা হাসি। আলো ছায়ার খেলায় তাকে আজ অদ্ভুত রকমের সুদর্শন লাগছে। সিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে ওঠে। একটা অচেনা ঢেউ এসে যেন নিঃশব্দে তার মনটাকে আছড়ে ফেলে। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলে। মনে মনে বিড়বিড় করে ওঠে, “মালটা চাইনিজ হলেও… অতটাও খারাপ না”

কথাটা মনে আসতেই তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। পরক্ষণেই নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে যায় সে,
—”ধুর, আমি কি পাগল নাকি? যে ছেলে সারাক্ষণ অপমান করে, তাকেই দেখে আমি লজ্জা পাচ্ছি”
সে নিজেকেই মনে মনে কয়েক দফা গালি দেয়। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে সব চিন্তা সরিয়ে আবার মেহেদির নকশায় মন দেয়। কিন্তু মন অকারণেই আজ তার বারবার অবাধ্য হচ্ছে। কিন্তু বিপত্তি হচ্ছে অন্য জায়গায়। যখনই কাইলিনও তার দিকে তাকায়, আর সিয়া সেটা টের পেয়ে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলে।
ওদিকে আরজে, জ্যাক, এসপি আর রিজভী চারজনই নিজেদের নারীদের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন পৃথিবীর বাকি সবকিছু তাদের কাছে অস্পষ্ট। মেয়েদের সাথে চোখাচোখি হতেই তারা সবাই লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে মেহেদির নকশায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

মেহেদির আসরের একপাশে পুরুষদের জন্য আলাদা করে সাজানো হয়েছে গাঢ় সবুজ আর সোনালি কাপড়ে মোড়ানো বসার স্থান। আরজে, জ্যাক, কাইলিন, রিজভী আর এসপি সবাই গিয়ে সেই পাশে বসে পড়লেও এসপি যেন কোনো নিয়মের ধারই ধারল না। সে দুই মিনিটও নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারল না। ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি টেনে সোজা উঠে মেয়েদের ভিড় ঠেলে চলে গেল সানিতার পাশে। সানিতা তখন হাতভর্তি মেহেদি নিয়ে বসে আছে। মেহেদির গাঢ় নকশার ফাঁকে ফাঁকে তার আঙুলগুলোকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। এসপি ধীরে ধীরে তার কানের কাছে ঝুঁকে পড়তেই সানিতার শরীর হালকা কেঁপে ওঠে। এসপি নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে,
—”সেই যখন দিনশেষে আমারই হবি তাহলে এত সেজেগুজে আমাকে পাগল করার মানে কী?”
সানিতা সাথে সাথে লজ্জায় তার কাঁধে ধাক্কা মারে,

—”চুপ করো, সবাই দেখছে”
এসপি ঠোঁট বাঁকিয়ে আরো নিচু স্বরে বলে, —”দেখুক, আমার কি? আর সবার শশুরজি দেখুক”
সানিতার মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসিটা আর লুকাতে পারে না।
এদিকে আরভি বাবার হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে তার মমের পাশে বসে পড়ে। সানা আদর করে তাকে পাশে টেনে নেয়। তারপর হঠাৎ চোখ তুলে আরজের দিকে তাকাতেই আরজে সাথে সাথে চোখ টিপে দেয়। সানা ঠোঁট কামড়ে হেসে নিচু স্বরে বলে,
—”অসভ্য লোক…”

কিন্তু বিপরীতে আরজের অবস্থা মোটেও স্বাভাবিক নয়। সে এখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সানার দিকে। আজকে সানাকে যেন অবাস্তব সুন্দর লাগছে তার কাছে। মেহেদি রঙা হাত, কপালের টিকলি, ঠোঁটের কোণের লাজুক হাসি সবকিছু মিলিয়ে তাকে এমন লাগছে যেন কোনো নেশাময় স্বপ্ন। আরজে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে, বারবার ঢোক গিলে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছে। মনে মনে বিড়বিড় করে ওঠে,
—”উফ ওয়াইফি… আর আধা ঘণ্টা, শুধু আধা ঘণ্টা। তারপর যদি এইসব শেষ না হয়, আমি কিন্তু সবার সামনে তোকে কোলে করে এখান থেকে তুলে নিয়ে চলে যাবো”
তার দৃষ্টি সানার হালকা গোলাপি লিপগ্লস দেওয়া ঠোঁটে গিয়ে থামে। সাথে সাথে তার গলা শুকিয়ে আসে। সে হাসফাস করে ওঠে, এই মুহূর্তে তার ঐ অধরোর সাধে দরকার। সে ফের চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে,
—”মাই লাভ, আজকে তোমাকে এত সুন্দর লাগছে কেন? খুব খারাপভাবে তোমাকে নিজের কাছে চাইছি আমি… এইসব ফাকিং রিচুয়্যাল না হলে এখনই তোমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রাখতাম। তুমি বুঝতেও পারছো না তোমার এই সাজে আমি কতটা অস্থির হয়ে যাচ্ছি, ওয়াইফি…”

সে শক্ত হাতে নিজের ঘাড় ঘষে বারবার, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। শেষমেষ আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় এবং সোজা সানার দিকেই এগিয়ে যায়।
সানার পাশে বসা ঈশানীর আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে তার থেকে একটু অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানবের দিকে যে কয়েকজন ডাক্তার কলিগের সাথে গল্পে মেতে উঠেছে। কিন্তু রিজভীর মনও পুরোপুরি অন্য কোথাও। সে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে বারবার ঈশানীর দিকে তাকাচ্ছে। দুজনে চোখাচোখি হলেই রমণী লাজুক হেসে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলে। রিজভী শেষমেশ তাড়াতাড়ি কথাবার্তা সেরে ধীরে ধীরে এসে ঈশানীর পাশে বসে পড়ে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলে,
—”সো উড বি মিসেস রিজভী তুৎমিশ… আজকে আপনাকে দেখে আমার সত্যিই মনে হচ্ছে, ডাক্তারি পড়ে জীবনে প্রথমবার আমি ভাষাহীন হয়ে গেছি। মানুষকে হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে কিন্তু আপনাকে গ্রেফতার করা উচিত”

ঈশানী সাথে সাথে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার গাল ধীরে ধীরে রাঙা হয়ে ওঠে।
সবাই যখন হাসি আনন্দে মেতে আছে, সেখানে ইবেলিনার অবস্থা একেবারে বিপরীত। সে বারবার ফাঁকা ঢোক গিলছে। কেননা তার সামনে বসে থাকা জ্যাক তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন চোখ দিয়েই তাকে গ্রাস করে ফেলবে, না কোনো হাসি, না কোনো কোমলতা। শুধু তীক্ষ্ণ, অগ্নিদৃষ্টি ভ্রুক্ষেপহীন তাকিয়ে আছে সে। ইবেলিনা ফাঁকা ঢুক গিলে বারবার নিজের পোশাকের দিকে তাকায়। নাহ, সব তো ঠিকই আছে। শরীরের প্রায় সবটুকুই ঢাকা গাউনের নিচে। শুধু হাতের সামান্য অংশ খোলা, যেখানে মেহেদি লাগানো হচ্ছে। তাহলে জ্যাক এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?
রমণীর বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়, গলা শুকানোর সাথে সাথে হাতও ঠাণ্ডা হয়ে আসে। সে আবার সামনে তাকাতেই দেখে জ্যাক উঠে দাঁড়িয়েছে। আর এখন সোজা তার দিকেই আসছে। ইবেলিনার ভয়ে এবাট গলা শুকিয়ে কাঠ। ততক্ষণে জ্যাক এসে তার পাশে বসে পড়েছে। রমণীর কানে আসে গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর,

—”মোরনি জান… এখন যদি আমি সবার সামনে তোকে কোলে তুলে নিয়ে চলে যাই, কেউ আমাকে থামাতে পারবে বলে মনে হয়?”
ইবেলিনা তার ঝং ধরা কণ্ঠে কেঁপে ওঠে। জ্যাক ধীরে ধীরে তার চুলগুলো সামনে থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে আবার নিচু স্বরে ফিসফিস করে,
—”ইউ নো মোরনি জান… আজকে রাতে তোমাকে পানিশমেন্ট পেতে হবে”
যন্ত্রমানবের মুখে এ কথা শুনেই ইবেলিনা হতভম্ব হয়ে তাকায়। কণ্ঠ থেকে আধো আধো বুলিতে বের হয়,
—”পা…পানিশমেন্ট, কে…কেন?”
জ্যাকের চোখদুটো আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। সে নিজের দন্ত পাটি চেপে ধরে শুধালো,
—”হুম জান, পানিশমেন্ট। কেননা, আমার জিনিসের দিকে অন্য কেউ তাকাবে, এটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। অ্যান্ড ইউ নো দ্যাট ভেরি অয়েল”
বিপরীতে রমণীর চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে জ্যাকের কথার আগা মাথা কিচ্ছুটি বুঝে নি। জ্যাক তার দৃষ্টি বুঝে তাকে কিছু বলতে না দিয়ে হঠাৎ শক্ত হাতে তার কেমড় চেপে ধরে। সাথে সাথে রমণী ব্যথাতুর শব্দ করে ওঠে। জ্যাক তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে বরং তার তরে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আওড়ায়,

—”নিজেকে পর পুরুষদের দেখানো অনেক শখ তাই না? আই সয়ার লিনা, আজ রাতে তুমি এক টুকরো কাপড়ও পরতে পারবে না। আর সারারাত তুমি আমাকে দেখাবে, ঠিক কতটা দেখাতে পারো তুমি”
বাক্যটা শুনে ইবেলিনার চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। সে কিছু বলবে তার আগেই একটা গার্ড এসে জ্যাকের হাতে একটা কালো কোট দেয়। জ্যাক কোনো কথা না বলে সেটা ইবেলিনার কাঁধে জড়িয়ে দেয়। আর তখনই রমণীর মাথায় আসে। তার পোশাকের পিছনের অংশটা একটু বেশি খোলা। সে তাড়াতাড়ি পিছনে তাকায়। নজরে আসে অদূরে দুইটা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, সম্ভবত কোনো মিডিয়ার লোক হবে হয়তো। আর জ্যাক?
সে এখনো ঈগলের মতো চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন দৃষ্টি যেটা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে, আজকের রাতটা ওই দুই ছেলের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। ইবেলিনা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার নিজের মেহেদির দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করে কেননা সে জানে, জ্যাক আর তাদের পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে দিবে না।
অন্যদিকে মুরুব্বিদের নির্দেশে ঘোষণা আসে ছেলেরা মেয়েদের হাতে নিজের নাম মেহেদি দিয়ে লিখবে। ঘোষণামাত্রই চারপাশে এক ধরনের হাস্যরস আর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছেলেরাও বলতে দেরি রাজি হতে দেরি হয়নি কিন্তু বিপত্তি বাঁধে মেহেদী দিতে গিয়ে। আরজে নিজের নাম লিখতে গিয়ে বেশ কয়েকবার থমকে যায়। তার আঙুলে মেহেদির নকশা যতই সহজ দেখাক, বাস্তবে তা যেন যুদ্ধের মতো কঠিন। সানা তার কান্ড দেখে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে,

—”এগিলো কী করছেন আপনি?”
আরজে বহু কসরতে শেষমেশ নিজের নাম লিখে সানার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
—”ওয়াইফি… এই মেহেদির চেয়ে বরং একটা চুমু দেওয়া অনেক সহজ। চলো, এইসব বাদ দিয়ে এখনই চুমু খাই”
সানার চোখ তখনই তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। তার কটমট দৃষ্টির সামনে আরজে সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করে ফেলে, আর নিজের বাকি বেপরোয়া কথাগুলো ক্ষণিকের জন্য গিলে ফেলেছে।
এদিকে আরেক পাশে জ্যাকের অবস্থা দেখে আশেপাশে হাসির ঢেউ উঠে গেছে। তার কঠিন স্বভাবের মাঝেও মেহেদির নকশা যেন আরেো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা দেখে অনেকে চুপিচুপি হাসছে। ইবেলিনা ঠোঁট চেপে হাসি লুকাচ্ছে, আর তা দেখে জ্যাকের চোখ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সে নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”হাসছো কেন? আগে কারও হাতে মেহেদি দেওয়ার অভ্যাস ছিল নাকি?”
ইবেলিনা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়, শুধু চোখ নামিয়ে নেয়।
এদিকে রিজভীর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। তার হাত কাঁপছে, মেহেদি ঠিকমতো ধরতেই পারছে না। সে বহু কসরতে কাঁপতে থাকা হাতে মাত্র তিনটা ফোঁটা বসিয়েছে। কেন বসিয়েছে সে নিজেও জানে না। ঈশানী সেদিকে তাকিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বলে,

—”এগুলো কী আবার, তোমার নামেও কোথাও তো তিনটা ফোঁটা নাই”
রিজভী অসহায়ভাবে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে বলে,
—”ঈশু, আমি তো পেশেন্টের হাতে ইনজেকশন দিতে পারি, কিন্তু এই মেহেদি কেন যেন শত্রু মনে হচ্ছে… ধরতেই পারছি না”
—”দেখো আবার ইনজেকশন মনে করে আমার হাতে ঢুকিয়ে দিও না”
তার এই কথায় চারদিকে হাসির রোল পড়ে যায়।
তবে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজটা করছে এসপি। সে যেন অনেক অভিজ্ঞতা নিয়েই এসেছে। সানিতার হাতে নিখুঁতভাবে নিজের নাম লিখে দিচ্ছে। সানিতা তা দেখে নিজেও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
—”তুমি এত সুন্দর করে কিভাবে দিচ্ছ?”
এসপি চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে দুষ্ট হেসে নিচু স্বরে আওড়ায়,

—”আমি আরো অনেক কিছু সুন্দর করে করতে পারি। এখন দেখাব তোকে?”
এসপির দুষ্ট ইঙ্গিত বুঝে রমণীর ঠোঁটের হাসি সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়। সে আর কথা বাড়াল না। কে জানে, এই লোক আবার সবার সামনে কী করে বসে। এদিকে এসপি মনে মনে ভাবে তা এই দক্ষতার পেছনের আসল কারণ। ছোটবেলায় সানা নিজে মেহেদি দেওয়া শিখার জন্য তার দুই হাত পায়ে মেহেদী লাগিয়ে দিত। সে ছেলে বলে মেহেদী দিয়েছে, আর এটা যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে সবাই তার মজা উড়াবে। এজন্য সে লজ্জায় ফুল হাতার জামা পরে থাকতো, যেন কেউ দেখে না ফেলে। শুধু এটুকুই না, সানা তাকে বাধ্য করতো তার হাতেও মেহেদী দেওয়ার জন্য। আর যদি কোন কারণে একটু টুট পাট হয় তাাহলে তো সানার হাতের তালের বড়া একটাও নিচে পড়ে না।
সবাই তখন এসপির প্রশংসায় ব্যস্ত। সানা সামনে ঝুঁকে তার লেখা দেখতে যাবে আরজে সঙ্গে সঙ্গে দাঁত চেপে বলে ওঠে,

—”ডোন্ট ডেয়ার, ওয়াইফি… ওর দিকে তাকালে আমি এখানেই সবার সামনে তোমাকে চুমু খেয়ে ফেলবো”
সানা সঙ্গে সঙ্গে থমকে যায়। রমণী একটা ফাঁকা ঢোক গিলে সে আর তাকায় না। এই লোকের উপর তার একরত্তিও বিশ্বাস নেই। কখন আবার সত্যি সত্যি চুমু খেয়ে ফেলে। এমনিতেই মতিগতি ঠিক লাগছে না।
সবাই যখন সবার প্রেয়সীর হাতে মেহেদী দিতে ব্যস্ত তখনই নিঃসঙ্গ বসে থাকা কাইলিনের দৃষ্টি বারবার নিজের ফোন থেকে সরে সিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। সিয়াকে আজ অন্য দিনের চেয়ে আলাদা লাগছে, ভীষণ আলাদা। রমণীর মুখে হালকা সাজের ছোঁয়া, চোখে কৌতূহল আর লাজুকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণে কোন অপ্সরার থেকে কম লাগছে না। রমণীকে মেহেদী দিতে দেখে সে ফিসফিস করে,
—”এই পিচ্চি মেহেদি দিবে কোথায় আর ধরবে কোথায়? আমার নাম লেখা তো দূর ‘কে’ লিখলে তো আর ‘এ’ এর জায়গাই থাকবে না। দুই হাত একসাথে করলেও তো আমার এক হাতের অর্ধেক হবে না। মনে হচ্ছে হাত বড় করার জন্য এক্সটা হরলিক্স খাওয়াতে হবে”

এই বলে হঠাৎ কাইলিন ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সামনে তাকায়, ঠিক ওই মুহূর্তেই সিয়াও তার দিকে তাকায়। দুজনেরই আকস্মিক চোখাচোখি হয়ে যায়। বিপরীতে রমণী হতভম্ব হয়ে যায়। কাইলিন চোখ না সরিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে। সিয়া তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে চারদিকে তাকিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকাতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়, কেননা তার হাতের মধ্যে স্পষ্ট ‘কাইলিন’ লেখা। এটা কখন লিখল? পর মুহূর্তেই মনে পড়ে, মুরব্বিরা বলার সাথে সাথেই সে এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে থেকে কি থেকে কি লিখে ফেলেছে সে নিজেই বুঝতে পারছে না। সে একটা ফাঁকা ঢুক গিলে সামনে তাকাতেই দেখে তার পাশে বসা সানিতা তার দিকে তাকাবে তখনই সিয়া তড়িঘড়ি করে হাত পিছনে লুকিয়ে ফেলে। এদিকে ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একরাশ চাপা হাসি ভেসে ওঠে তার, যদিও সে দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়।
পুরুষদের মেহেদির কাজ শেষ হওয়ার পর মুরুব্বিরা ঘোষণা দেয় এবার মেয়েদের পালা। মেয়েরাও একে একে নিজেদের নাম সুন্দর করে মেহেদিতে লিখে দেয়, হাসি আনন্দে ভরে ওঠে চারদিক। তবে সানার লিখা শেষ হতে না হতেই আরজে নিচু স্বরে বলে,

—”ওয়াইফি… ফাংশন ওভার”
সানা অবাক হয়ে বলে,
—”না, এখনো তো শেষ হয়নি”
আরজে শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
—”তোমার জন্য সব কিছুই শেষ”
—”কিভাবে….?”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩২

সানার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই আরজে তাকে এক হাতে কোলে তুলে নেয়। হঠাৎ এমন প্রকাশ্য কোলে তোলায় সানা লজ্জায় তার বুকে মুখ গুঁজে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলে। রমণী রাগে গজগজ করে তাকে গালি দিতে শুরু করে। আরজের কান্ড দেখে চারপাশে মুহূর্তেই হাসির রোল বয়ে যায়। আরজে চোখের ইশারায় কাইলিনকে আরভির দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়, তারপর ধীরপায়ে সবার সামনে দিয়ে সানাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। পেছনে রয়ে যায় শুধু হাসির শব্দ আর মেহেদির গন্ধে ভরা এক আনন্দময় সন্ধ্যা যা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায় এক মধুর স্মৃতির মতো।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৪