কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৭
তন্ময়ী তিতিক্ষা
চোখের পাতায় ভারি চাপ অনুভব করল আর্শি। যেন কেউ জোর করে চোখ দুটো বন্ধ করে রেখেছে। মাথাটা ভারী লাগছে, শরীরটাও কেমন ঝিমঝিম করছে। ধীরে ধীরে চক্ষুদ্বয় মেলতেই প্রথমে ঝাপসা হয়ে এল সবকিছু। কয়েক সেকেন্ড পর পরিষ্কার হলো সবটা । চারপাশটা অদ্ভুত শান্ত। শহরের সেই কোলাহল নেই। আর না আছে মানুষের ভীর। আর্শি খানিকটা অবাক হলো। চক্ষুদ্বয় কয়েকবার পিট পিট করতেই মনে পড়ে গেলো সবটা। তবে সে এখানে কি করছে? বিস্ময়ে হতবাক আর্শি। মাথায় হাত চেপে ধীরে ধীরে উঠে বসল আর্শি। মাথাটা এখনো ঘোরাচ্ছে সামান্য। পাশ ফিরে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল। আযরান বসে। চোখে মুখে সেই চিরচেনা শান্তভাব। আর্শিকে উঠতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকাল আযরান। বলে উঠল,
“বেঁচে আছিস তাহলে আমি ভাবলাম মরে টরে গেলি৷ অন্তত চল্লিশাটা কপালে জুটবে।”
আযরানের কথায় আঁড়চোখে চাইল আর্শি। কেমন বেয়াদব ছেলে দেখো। তবে হুট করে কিছু মাথায় আসতেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল আযরানের পানে। মৃদুস্বরে বলে উঠল,
“আমি এখানে কিভাবে?”
আযরান ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল ওর দিকে। হালকা গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“মাঝরাস্তায় ভেটকাইয়া পড়ে ছিলি বেয়াদব। সেখান থেকে তোর মতো বস্তাকে তুলে নিয়ে এসেছি।”
আর্শির বুকটা কেঁপে উঠল। লজ্জা, অস্বস্তি একসাথে এসে ভিড় করল মনে। নিচের দিকে তাকিয়ে রইল আর্শি। কিছু বলতে পারল না। আযরান এবার পাশে রাখা একটা প্যাকেট তুলে আর্শির দিকে বাড়িয়ে দিল। মাথা উঁচিয়ে চাইল আর্শি।
“কি এটা?”
“খাবারের প্যাকেট। চোখে দেখিস না?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল আর্শি। একটু ইতস্তত অনুভব করল অভ্যন্তরে। এমনভাবে কেউ তাকে শেষ কবে খেতে দিয়েছে মনে পড়ছে না। হাত বাড়িয়ে আবার থেমে গেল। আযরান ভ্রুঁ কুঁচকাল। গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল,
“এই নাটক বন্ধ কর। না খেয়ে টিউশনি করতে যাচ্ছিলি কেন। নিজেকে কি মনে করিস? সুপারউইম্যান?”
আর্শি হকচকাল। বিস্ময় না হয়ে পারল না। একরাশ বিস্ময় এসে জমলো চক্ষে। আযরান জানলো কি করে? সে তো বলেনি।
“তুই কি করে জানলি?”
আযরান জবাব দিলো না। জোর করে খাবারের প্যাকেটটা গুঁজে দিল আর্শির হাতে। আর্শি ইতস্তত করেই নিয়ে নিলো। খাবার দেখে যেন ক্ষুধাটা দ্বিগুন বেড়েছে। পেট চুঁ চুঁ করতে আরম্ভ করেছে। আর কোনো কথাটা না বাঁড়িয়ে পেটে গপাগপ চালান করতে থাকে সবটা। হুট করে গলায় আঁটকে গেল আর্শির। কাশতে শুরু করলেই আযরান ঝটপট পানি এগিয়ে দিল। বিরক্তির সহিত বলে উঠল,
“আস্তে খা। কেউ নিতে যাচ্ছে না।”
পানি খেয়ে কিছুটা শান্ত হলো আর্শি। সেই সাথে লজ্জাও পেল। ইশশ! এতটা তাড়াহুড়ো করার কি দরকার ছিল? আযরান নিশ্চয়ই তাকে রাক্ষস ভাবছে। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আর্শির। খাওয়া থামিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। এর মাঝেই আকস্মিক শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল আযরানের কন্ঠস্বর,
“আমি কিছু ভাবছি না দ্রুত খাওয়া শেষ কর মুটি।”
আর্শি নাক কুঁচকে চাইল। এই ছেলেটা বার বার তাকে মুটি বলে। নিজে কি? দানবের মতো শরীর এই বয়সেই। সেটা কিছু না তাই না? শুধু তার বেলাতেই যত দোষ। আর্শি কথা বাড়ালো না। পুরো খাবার শেষ করে শান্তিতে দম নিলো। আহ! এতক্ষণে শান্তি লাগছে। খাবার না পেলে হয়তো মারাই যেত সে। হুট করে বিয়ের কথা মাথায় এসে ভীর করল আর্শির। সাথে সাথে দৃষ্টি ঘুরালো আযরানের পানে। ছেলেটা আবার কিছু বলবে না তো তার বিয়ের কথা শুনে? আনমনে ঢোক গিলল আর্শি। মিনমিন করে বলে উঠল,
“আযরান শোন।”
“বল শুনছি।”
“আস…আসলে..মানে হয়েছে কি..!”
“তোতলাবি না সোজা সাপ্টা বল। নাহলে থাপড়ে সত্যি সত্যি তোতলা করে দিব।”
আর্শি চমকে তাকাল। এই ছেলেটা সবসময় এত রুক্ষ কেন! এবার আর তোতলালো না। চোখ বুজে ঠাস করে বলে বসল,
“ভাই! আমি না কাল বিয়ে করছি।”
“আচ্ছা।”
অতি সামান্য বাক্য। এতেই যেন আর্শি অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেল। আযরান এত সহজে মেনে নিবে সে আশাই করে নি। সে তো ভেবেছিল আযরান হয়তো তাকে বকবে। কিন্তু এই ছেলে তো একদম শান্ত। আর্শি অবাক হয়েই প্রশ্ন করল,
“তুই অবাক হোস নি?”
“অবাক কেন হবো?”
আর্শি চক্ষুদ্বয় পিটপিট করল। বলে উঠল,
“এই যে আমি হুট করে বিয়ের কথা বললাম। তুই অবাক হবি না?”
এবার আর্শির পানে ঘুরে চাইল আযরান। কেমন গভীর দৃষ্টি। আর্শি পুরো মুখশ্রীতে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে মাথা নিচু করল। আর্শির হাতটা তার হাতের কাছাকাছি। কি মনে করে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেল নিজের হাতটা। নিজের বিশাল শ্যামলা হাতটার পাশে আর্শি গুলুমুলু ফর্সা হাতটা যেন একদম বাচ্চা। মেয়েটা একদম ছোট সাইজের। সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুঁটে উঠল আযরানের ঠোঁটের কোণে। পরক্ষণেই হাসি সরিয়ে গম্ভীর চোখে তাকাল আর্শির দিকে। শান্তস্বরে বলে উঠল,
“নোমানকে তো ভালোবাসিস তাই না? আর শুনলাম ছোট চাচীও বিয়ে ঠিক করেছে। তাই তুই বিয়ে করার জন্য উঠে পরে লাগবি এটা জানা কথা। তাই আর অবাক হয়নি।”
বাক্যগুলো ঝংকার তুলে শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল তুলির। সে কি নোমানকে বিয়ের কথা বলে ছ্যাচড়ামির পরিচয় দিল? যদিও আযরান তেমন কিছু বলেনি। তবে নিজের কাছে এখন তাইই মনে হচ্ছে। আর্শি জড়তা-সংকোচে আড়ষ্ট হয়ে পড়ল। সে তো ছ্যাঁচড়া না তবে সে নোমানকে হারাতে চায় না। বিয়ে না হলে তো সে নোমানকে হারিয়ে ফেলবে। আড়ষ্টতা নিয়েই আর্শি মিনমিন করে বলে উঠল,
“আমি নোমানকে বিয়ে করে কোনো ভুল করবো না আযরান।”
“জানি আমি।”
ব্যাস! চুপ করে গেল ছেলেটা। আর্শিও আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। আর না কথা বাড়াতে চাইল।
“একসাথে জায়গা হবে না তুই চলে যা আযরান আমি হেঁটে চলে যাবো।”
মাথা নিচু করে বলে উঠল আর্শি। সামনেই একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। রিকশাটা আযরানই ডেকেছে। তারা একসাথে ফিরবে বলে। কিন্তু আর্শির মোটা শরীর আর আযরানের বলিষ্ট শরীর দু’টো মিলিয়ে রিকশায় জায়গা হবে না আর্শি ভালো করেই জানে। গরমে অস্বস্থিতে নাজেহাল অবস্থা আর্শির। আযরান রিকশাওয়ালাকে চলে যেতে বলল। পরক্ষণেই আর্শির দিকে ফিরে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ালো। নিমিষেই চোখের পাতায় ধরা দিল ঘামে চিকচিক করতে থাকা আর্শির মুখশ্রী।
আযরান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল আর্শির দিকে। গরমে কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে মেয়েটার। হাতের আঙুলগুলো অস্থিরভাবে জড়িয়ে আছে একে অপরের সাথে।
হঠাৎ করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আযরান সামনে এগিয়ে এল। বলে উঠল,
“রিকশায় জায়গা হবে না এই হিসাবটা তুই করলি, ঠিক আছে। কিন্তু তুই কি ভাবছিস আমি তোকে একা হেঁটে যেতে দিব?”
কথাটা খুব শান্ত স্বরে বললেও তাতে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা ছিল। আর্শি মাথা তুলে তাকাল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আযরান ইতিমধ্যে রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাত তুলেছে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটা সিএনজি থামল তাদের সামনে।
“ওঠ।”
এক কথার নির্দেশ। আর্শি আর কিছু না বলে উঠে বসল । একটু সরে গিয়ে কোণায় গুটিয়ে বসল মেয়েটা। আযরান উঠে বসতেই সিএনজিটা ঝাঁকি দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। মুহুর্তে অদ্ভুত নীরবতায় ছেঁয়ে গেল ভিতরটা। শুধু সিএনজির শব্দ..। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস এসে আর্শির চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। দুইজনেই চুপচাপ বসে। আর্শির দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে বাইরে। চারপাশটা যেন চোখ দিয়ে গিলে নিচ্ছে। হুট করে একটা দীর্ঘ বাতাস টেনে নিলো নিজের মাঝে। নিমিষেই প্রশান্তিতে ভরে উঠল অভ্যন্তর।
হঠাৎ সিএনজি একটা গর্তে পড়ে হালকা ঝাঁকি খেল। আর্শি ভারসাম্য হারিয়ে একটু হেলে পড়তেই আযরান স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাত বাড়িয়ে তার কাঁধটা ধরে ফেলল। ভরকে গেল আর্শি। সমস্ত অঙ্গ কেঁপে উঠল প্রচন্ডভাবে। আকস্মিকতায় শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ল অস্বস্তি। হুট করে কর্ণে প্রবেশ করল আযরানের গম্ভীর কন্ঠস্বর,
“সোজা হয়ে বস মুটি।”
অস্বাভাবিক হয়ে পড়ল আর্শির হৃদস্পন্দন। তড়িৎ গতিতে সরে এল আযরানের নিকট হতে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল লজ্জায়। কীয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে উঠল,
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৬
কথাটা বলেই ছোট্ট একটা ঢোক গিলল আর্শি। কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না। অস্বস্তিতে কাটা দিচ্ছে শরীরে। হুট করে আযরানের কন্ঠ কর্ণপাত হতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পরল যেন।
“আমাদের বিয়ের শপিং করতে।”
