Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৩

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৩

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৩
নুসরাত ফারিয়া

-“আধাররররর!”
বড় ছেলের মুখে এমন ভয়ানক কথা শুনে তাহমিনা খান কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান। পর মূহুর্তে চিৎকার করে উঠলেন। কতবড় সাহস ছেলেটার, তার সামনে দাঁড়িয়ে তার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলছে। এখন কি উনার মা হওয়ার বয়স? যেখানে দাদী, নানি হওয়ার কথা, সেখানে এমন জঘ’ন্য অপবাদ শুনে লজ্জায় ম’রে যেতে ইচ্ছে করছে। অথচ এই মানুষটাই একটু আগে ছেলের বউমার চরিত্রের দিকে আঙুল তুললো। আর এখন নিজের বেলায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। কথায় আছে, অন্যের বেলায় চার আনা, আর নিজের বেলায় ষোলো আনা! ঠিক তেমনটাই তাহমিনা খান।
ছোট বউমার গর্জন শুনে নিচের রুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন সোবহান খান। তিনি এশারের নামাজ পড়ে একটু শুয়ে ছিলেন। ড্রয়িংরুমে এসে পরিবেশ যথেষ্ট গরম দেখলেন।

-“এখন চিৎকার করছেন কেন? এসব বলার আগে ভাবার দরকার ছিল। যেখানে আমি নিজেই বললাম, এখন এমন কিছু হওয়ার চান্স নেই! তবুও আপনি ত্যাড়ামি করছেন। আমি নাকি আপনি ওর স্বামী, হুম?”
আধার দাঁত কিড়মিড় করে বলে। যেখানে সে গত রাতেই মেয়েটাকে নিজের করে নিয়েছে, সেখানে এত তাড়াতাড়ি প্রেগন্যান্ট হওয়া অসম্ভব! তারওপর সে মেডিসিনও খাইয়ে দিয়েছিল। তাহলে কি এখন বাচ্চা আকাশ থেকে পড়বে? নাকি জমিন থেকে বেরোবে?
ছেলেটার কথা শুনে তাহমিনা খান চিল্লিয়ে বললেন,
-“তাহলে এই কীট কোথায় থেকে এ বাড়িতে এল? নিশ্চয়ই তোমারই বউ পরীক্ষা করেছে! আর তোমার অজান্তেই মেয়েটা এমন কিছু করেছে, যার ফল এখন নিজের পেটে নিয়ে ঘুরছে।”
একথা শুনে আধারের চেহারা ভয়ংকর লাল হয়ে যায়। তাহমিনা খানের জায়গায় যদি এখন কোনো পুরুষ হতো, তাহলে এতক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছে যেত!

-“তাহমিনা!! তুমি এসব কি বলছো?”
সোবহান খান ধমকে উঠলেন। মেয়েটা কিসব আবোলতাবোল বলছে আশ্চর্য! অন্যদিকে, আধার যথেষ্ট নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“এটার পিছনে যে আপনার হাতপা নেই, তার প্রমাণ কী?”
-“এখানে আমার কোনো মতলব নেই। যা সত্যি, এবং দেখছি, সেটাই বললাম। আর কিছুদিন ধরে খেয়াল করছি, এই মেয়েটা হুটহাট বমি করছে আর টক জাতীয় খাবারও খাচ্ছে। তুমি কি মেয়েটার শারীরিক পরিবর্তন বুঝতে পারোনি? হুট করেই এত সুন্দর হওয়ার মানে কি? একটা মেয়ে যখন মাতৃত্বের স্বাদ পায়, তখনই এমন পরিবর্তন হয়।”

আধার চোখ বুজে শ্বাস নিল। মেয়েটা দেড় বছর অসুস্থ ছিল, এক বছর তো কোমায় ছিল। কড়া কড়া ঔষধের জন্য শরীরটা পাটকাঠির মতো হয়ে যায়। একদম নেতিয়ে পড়েছিল। কিন্তু! সে তো এ বাড়িতে নিয়ে এসেই মেয়েটাকে একটু একটু করে সুস্থ করেছে। গাইনি ডক্টর থেকে শুরু করে সবকিছু দেখিয়েছে। সাথে পুষ্টিকর খাবার তো ছিলই। এমনকি ভিটামিন, ক্যালসিয়ামও খেয়েছে মেয়েটা। কারণ ভেতর থেকে খুবই দূর্বল ছিল। এত এত যত্ন নেওয়ার পর মেয়েটা পুরোপুরি সুস্থ হয়, এবং শারীরিক পরিবর্তনটাও মারাত্মকভাবে হয়! তাই বলে এমন জঘ’ন্য চিন্তাভাবনা করবে? মানুষ কি সবসময় এক থাকে? সময়ের সাথে সাথে সবকিছু পরিবর্তন হয়। সেখানে তো এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, অথচ এটাকেই ঘৃ’ণিত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

-“আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েন না। নয়তো এর ফল খুবই খারাপ হবে। আমার বউয়ের চরিত্রের দিকে যেই ব্যক্তি আঙুল তোলার চেষ্টা করবে, ওই আঙুলই কিন্তু আমি কেটে ফেলবো। আই রিপিট…কেটে ফেলবো।”
তাহমিনা খানের চোখমুখ শক্ত হয়। ওইদিকে আলো স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে রাখা অবস্থায় চোখের জলে শার্ট ভেজাচ্ছে। আধার চোয়াল শক্ত করে একহাতে অর্ধাঙ্গিনীকে জড়িয়ে ধরে আছে। সোবহান খান শক্ত গলায় বললেন,
-“তুমি একজন মেয়েকে হয়ে অন্য একটা মেয়েকে এতবড় নোংরা অপবাদ কীভাবে দিতে পারলে, তাহমিনা? সোজা চরিত্রের দিকে আঙুল তুললে? সামান্য কিছু বিষয় নিয়ে এমন জ’ঘন্য অপবাদ না দিলেও পারতে। শুধু শুধু মেয়েটাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করছো!”
তাহমিনা খান শ্বশুরের দিকে এগিয়ে এসে কীট দেখিয়ে বললেন,
-“তাহলে এটা কার বাবা?”
সোবহান খান কিছু বলতে যাবেন, তখনই দোতলা থেকে ভেসে এল কিছু অপ্রত্যাশিত বাক্য—
-“আমার! ওটা আমার…আম্মু!”

অফিসের পার্টি শেষ হতে হতে অনেকটাই রাত হয়ে যায়। আর আজ আকাশটাও ভালো নেই। যেকোনো সময় মুষলধারে বৃষ্টি আসতে পারে। তাই সকলেই ডিনার করে বেরিয়ে পড়েছে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। রাত একহাতে ব্যাগ ও আরেক হাতে কাঁধে কোট ঝুলিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে পার্কিং প্লেসে। নিজের বাইকের কাছে এসে খেয়াল করল, একটা মাতাল মেয়ের বাহু চেপে ধরে টেনেটুনে গাড়ির ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করছে যুবক। এই দৃশ্য দেখে রাতের কপাল কুঁচকে গেল। কারণ সে মেয়েটাকে একটু হলেও চেনে। তাই ব্যাগ, কোট বাইকে রেখে এক হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে, অন্য হাতে গলার টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে এগিয়ে গেল।
-“এক্সকিউজ মি!”
হঠাৎই পেছন থেকে পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে যুবক চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। সুদর্শন পুরুষটিকে দেখে ঈশিতা একগাল হেঁসে বাম হাত নাড়িয়ে মাতাল কণ্ঠে বলল,

-“হাই নটি বয়…!”
রাত একপলক মেয়েটার হাস্যজ্জল চেহারার দিকে তাকিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। কারণ মেয়েটার হাসিমাখা মুখ একদম তার বোম্বাই মরিচের মতো। সাথে কিছুটা স্বভাবও এক! সারাক্ষণ ফটরফটর করতেই থাকে। সে পাশে দাঁড়ানো যুবকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি মেয়েটাকে চেনেন?”
ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হ্যাঁ,ও আমার কাজিন। আর ভুলবশত ড্রিংক করেছে। তাই বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু…আপনি তার কে হোন?”
রাত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে জবাব দিল,
-“কেউ না!”
একথা বলে বড় বড় পা ফেলে চলে যেতে শুরু করল। তখনই ঈশিতা পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
-“আ…আমাকে রেখে যাবেন না! আমার কোনো কাজিন নেই। শুধু ছোট ভাই আর একটা ছোট বোন আছে। আর মা ছাড়া কেউ নেই, কেউ নেই!”
মেয়েটার কথা শুনে রাতের পা জোড়া থেমে যায়। মূহুর্তেই তার যা বোঝার তা বুঝা হয়ে গেল। সে পিছনে ঘুরে হনহনিয়ে এসে যুবকের কাছ থেকে এক ঝটকায় মেয়েটাকে
ছিনিয়ে নিল। ঈশিতা এসে আছড়ে পড়ল শক্ত বুকের মাঝে। ভয় পেয়ে দু’হাতে খামচে ধরল বুকের কাছটায় শার্টের অংশ।

-“চোখের সামনে থেকে যাবি? নাকি বসকে কমপ্লেইন করব? সাথে ধোলাই কিন্তু ফ্রি!”
-“নেশার কারণে মেয়েটা ভুলভাল বকছে, আর আপনিও সেটা সত্যি ভেবে নিয়েছেন?”
-“আমাকে দেখে কি তোর ফিডার খাওয়া বাচ্চা মনে হয়? যেটা বোঝালি আর বুঝে গেলাম? নেশা করার ফলে পেটের ভেতরের সব সত্য বেরিয়ে আসে, আর তুই বলছিস কিনা মেয়েটা মিথ্যে বলছে? এই ড্রিংক করার জন্যই আমি আমার ভাইয়াকে সব সত্য কথা বলে দিতাম, তারপর কেলানি খেতাম। আর শালা তুই! উল্টো আমাকে এসে টুপি পরানোর চেষ্টা করছিস?”
-“দেখুন, আপনি কিন্তু ঝামেলা করছেন। আমি বসকে বলে দিবো, আপনি ঈশিতাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছেন।”
রাত হেঁসে ছেলেটার সামনেই ঈশিতার শাড়ির আঁচল ভেদ করে কোমর চেপে ধরে আরো ঘনিষ্ঠ করে নিল। তারপর হিসহিসিয়ে বলল,
-“শুধু জোর করে নিয়ে যাওয়া কেন? তোর বসকে গিয়ে এটাও বল আমি ওকে ছুঁয়েছি।”
ছেলেটা কিছুটা দমে গেলেও জোর গলায় বলল,
-“ও যে আপনার কাছে সেইফ, সেটার কি গ্যারান্টি?”
রাত ভ্রু চুলকিয়ে জবাব দিল,
-“তোর থেকে হাজারগুন আমার কাছে সেইফ থাকবে। বিকজ…এই রাত কখনো কোনো মেয়ের সুযোগ নেয়নি, আর না কাউকে জোর করেছে।”

এটা ঠিক যে, রাত কখনোই কোনো মেয়ের সাথে জোরজবরদস্তি করেনি। আর না নিজ থেকে কোনো অফার দেয়। বিদেশে থাকার ফলে খারাপ হয়ে গেছিল, তাও বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। সে একসময় ড্রাগও নিয়েছে। তারপর থেকেই এসবের মধ্যে থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। যেখানে রমণীরাই তাকে কাছে টেনে নিয়েছে, সেখানে সেও বাঁধা দেয়নি। তবে দেশে এসব খুব বেশি চলে না। আর ধীরে ধীরে তার নারীর বাজে নেশাটাও কমে গেছে। বোম্বাই মরিচকে দেখার পর তো সে আর কোনো মেয়ের কাছেই যায়নি। একটু হলেও মেয়েটাকে চেয়েছিল, তবে সেটা নিজের বউ হিসেবে। কিন্তু…দিনশেষে মেয়েটা তার ভাবী হিসেবে বের হলো।
রাত আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে সত্যিই মন থেকে চেয়েছিল বোম্বাই মরিচকে! কিন্তু…বড় ভাইয়ের জন্য নিজের লিমিট ক্রস করেনি। আর এখন তো মেয়েটাকে চাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ওই একটা মেয়েই তার ভাইয়ের সুখ! ছেলেটা কখনো কাউকে ভালোবাসবে না বলতে বলতে ঠিকই তার অপছন্দের ছাত্রীকেই ভালোবেসে ফেললো। সবকিছু জেনেশুনেও সে কীভাবে ওই মানুষটার বুক থেকে মেয়েটাকে কেঁড়ে নিবে? যেখানে মেয়েটাও তাকে ভালোবাসে! এমন সহজ-সরল মেয়েটার সুন্দর সংসার সে কিছুতেই ভাঙতে পারবে না। তারচেয়ে বরং তার ভাইয়ের সাথে সুখে-শান্তিতে জীবন পার করুন। মাঝেমধ্যে সে বড় ভাইকে একটু জ্বালাবে এই!
এসব ভেবে আনমনে হাসল রাত। ছেলেটাকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোয়াল শক্ত করে বলল,

-“একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে কিন্তু শুধু শুধু নিজের ক্যারিয়ার হারাবি। সাথে বিনা পরিশ্রমে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকবি।”
ছেলেটা আর কথা বাড়াল না। রাগে গজগজ করতে করতে চুপচাপ কার নিয়ে চলে গেল। রাত মেয়েটাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। তখনই ঈশিতা ঘটিয়ে ফেললো এক অঘটন।
পার্কিং প্লেসের পিনপতন নীরবতা ভাঙল থাপ্পড়ের শব্দে। রাত নিজের বাম গালে হাত রেখে অবিশ্বাস চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মেয়েটাকে রক্ষা করল, আর এই মেয়েটাই কিনা তাকে চড় মা’রল? তাহলে এটাই কি ভালো কাজের প্রতিদান?”
-“ইউউউ….লম্পট!”
ঈশিতা টালমাটালের মতো হেলতে দুলতে বাক্যটি বলল। রাত দাঁত কিড়মিড় করে জানতে চাইল,
-“কি করেছি আমি?”
প্রতিত্তোরে মেয়েটা নিজের শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলে কোমরের দিকে ইশারা করে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,

-“এখানে ছুঁয়েছেন আপনি।”
রাত নিজের কপাল চেপে ধরল। সে তো ওই ছেলেটার জন্য কোমর ছুঁয়েছিল। আর এর বিনিময়ে যে নরম হাতে গরম থাপ্পড় খেতে হবে, সেটা বুঝতে পারেনি। সে চোখমুখ মুছে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“সরি ম্যাম! ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দিন।”
একথা বলে রাত চলে যেতে লাগল। ঈশিতা চমকে তড়িঘড়ি করে পিছু পিছু ছুটে আসার সময়, ভুলবশত জুতার নিচে শাড়ির কুঁচি পরায় মূহুর্তেই শাড়ি খুলে গেল।
মেয়েটার আর্তনাদ শুনে রাত ঘুরে তাকায়। এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গায় জমে গেল।
-“ওইভাবে তাকিয়ে না থেকে আমাকে এসে সাহায্য করুন।”
রাত অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

-“নিজে খুলেছেন, এখন নিজেই ঠিক করুন। নয়তো আবারো আমাকে লম্পট উপাধি দিবেন!”
ঈশিতা বিপাকে পড়ে গেল। তার শরীর টলছে আর মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে। ঠিকমতো দাঁড়িয়েও থাকতে পারছে না। হয়তো নেশাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে! তবুও সে কোনোমতে শাড়িটা শরীরে পেঁচিয়ে নিল। মেয়েটার কান্ড দেখে বেশ বিরক্ত হয় রাত। এমন করে সাপের মতো পেঁচিয়ে রাখলে, হাঁটবে কীভাবে? আর যেকোনো সময় খুলেও যেতে পারে। অগত্যা সে নিজে গিয়েই মেয়েটাকে সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে দিল।
-“নাউ পারফেক্ট!”
নিজের কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায় রাত। ঈশিতা নিজেকে দেখতে দেখতে মাতাল কণ্ঠে বলল,
-“আপনি তো সবকিছুই পারেন।”
-“আই নো! এখন অহেতুক আমার মাথা না খেয়ে চলুন। আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিই।”

ঈশিতা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। রাত বিরক্তিতে মেয়েটার মাথা চেপে ধরে নিজের সাথে নিয়ে যায়। কোনোমতে ঈশুকে বাইকের পিছনে বসিয়ে রেখে সেও উঠে পড়ল। গায়ের কোট দিয়ে মাতাল মেয়েটাকে নিজের সাথে বেঁধে রাখল। যেন ভুলবশত পরে না যায়। তারপর হেলমেট পরে বাইক স্টার্ট দিয়ে ছুটে যেতেই মেয়েটা ওর পিঠের ওপর সব ভার ছেড়ে দিয়ে, দু’হাতে কোমরসহ মেদহীন পেট খামচে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে রাখল। রাতের এখন ইচ্ছে করল, তাকে ছোঁয়ার জন্য মেয়েটার মতোই থাপ্পড় মা’রতে। কিন্তু সে তেমনটা করল না! কারণ মেয়েটা নিজের হুঁশে নেই।
শহরের বুকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ব্যস্ত রাস্তার বুক চিঁড়ে যানবাহন ছুটে চলেছে নিজেদের গন্তব্যে। অদূর থেকে বিমান যাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। হালকা শীতল বাতাসে এক রমণীর শাড়ির আঁচল বেখেয়ালে উড়ছে। খোলা মেঘালয় আকাশের নিচে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে নিজ গতিতে ছুটছে একখানা বাইক। সচ্ছ জলবিন্দুগুলো যুবক-যুবতীকে অনায়াসে ছুঁয়ে দিচ্ছে এবং সর্বাঙ্গে ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে রমণীর পাতলা শরীর শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছে। বৃষ্টির মাঝে একটু উষ্ণতার খোঁজে সামনে বসা ব্যক্তিকে আরো দৃঢ় ভাবে জড়িয়ে ধরল৷ অথচ যুবকের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। সে তো মনোযোগ সহকারে বাইক রাইডিং করতে ব্যস্ত!

-“হঠাৎ নেশা করার কারণ?”
যুবকের কথা শুনে ঈশিতা ঝিমাতে ঝিমাতে বলল,
-“আ….আমি আপনার মতো নেশাখোর নই।”
-“সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। আপনি কত ভদ্র!”
-“হেই রাতের বাচ্চা….মে’রে কিন্তু দাঁত ভেঙে দেবো।”
একথা শুনে রাত জোরে ব্রেক মা’রল। ঘাড় পিছনে বাকিয়ে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“কী বললেন?”
ঈশিতা ছোট বাচ্চাদের মতো ভেজা ঠোঁট গোল করে বলল,
-“বললাম….চুমু দিবো।”
রাত কপাল কুঁচকে বিরবির করল,
-“আপনি তো দেখছি, বেচারা গিরগিটিকেও হার মানিয়ে দিবেন।”
-“আপনার ওই বেচারা গিরগিটিকে কেটেকুটে, স্যুপ বানিয়ে আপনাকে খাওয়াবো।”
-“ইয়াক, থু!”

রাত চোখমুখ কুঁচকে সোজা হয়ে বসল। এই মাতাল মেয়েটার মাতলামি দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে গেল। ইচ্ছে তো করছে, রাস্তায় ফেলে যেতে। কিন্তু এত রাতে একটা মেয়েকে এইভাবে রেখে যাওয়াও সেইফ না। তারওপর সে ভালো মানুষ হতে চাচ্ছে। সেখানে এমন জ’ঘন্য কাজ করার কোনো মানেই হয়না। মেয়েটা আবার নিজের হুঁশেও নেই। অগত্যা এই মাতালের অত্যাচার এখন সহ্য করতে হবে।
-“এটা আমার পেট, কোনো ময়দা মাখানো ডো নয় যে, এইভাবে খামচে ধরবেন।”
রাত নিজের পেটের মাঝে থাকা কোমল হাত জোড়ার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল। এই মেয়েটা হাতের বড় বড় নখ দাবিয়ে দিয়েছে তার পেটে। এমনভাবে খামচে ধরে আছে যেন মনে হচ্ছে মাংস তুলে নিবে, আর না-হয় সে পালিয়ে যাবে।
-“আপনি এমন করছেন কেন? একটুই তো ধরেছি।”
রাত প্রতিত্তোরে কিছু না বলে বাইক স্টার্ট করে, মনে মনে বিরবির করল,
-“ভাগ্যিস, আগের রাতের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি আপনার।”

খান বাড়ির বিশালবহুল ড্রয়িংরুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে আছে। তিথির বলা সামান্য বাক্যটি এক মূহুর্তের জন্য সবাইকে পাথর বানিয়ে দিয়েছে। তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল এমনকি শুনতে পাবে। আধার তো ভেবেছিল, তাহমিনা খান প্রেগ্ন্যাসির কীট অন্য কোথাও থেকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন? এখন বোনের মুখ থেকে এটা কি শুনল সে? তারমানে তিথিই প্রেগন্যান্ট? কিন্তু…এটা কি করে সম্ভব?
মেয়ের কথা শোনা মাত্রই তাহমিনা খানের হাত থেকে কীট পড়ে গেল। তিনি অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধালেন,
-“কি বললে তুমি?”
পরিবারের সামনে এমন জঘ’ন্য পরিস্থিতিতে পড়ে, তিথির ইচ্ছে করল মাটি ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে যেতে। সে তো চায়নি সবাই এটা জানুক, তাই তো কীট লুকিয়ে ফেলে দিয়েছিল ডাস্টবিনে। কিন্তু ওটা কীভাবে তার মায়ের হাতে পৌঁছাল ঠিক বুঝতে পারছে না। তারওপর তার মা অযথা ওই নির্দোষ মেয়েটাকে দোষারোপ করছে, এমনকি চরিত্র নিয়েও কটু কথা বলতে বাদ রাখেননি। সেই জায়গায় সে কীভাবে চুপ থাকত? নিজের ভুলের শাস্তি অন্য কেউ পাক, সেটা মোটেও চায় না। তাই সে চোখের পানি মুছে শান্ত গলায় বলল,

-“ভাবী নয়, আমি প্রেগন্যান্ট!”
সকলের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। তাহমিনা খান আর্তনাদ করে উঠলেন,
-“তুমি এত নিচু কাজ কীভাবে করতে পারলে? পরিবারের সম্মানের কথা একবারও ভাবলে না? আর কয়েকদিন পর তোমার এনগেজমেন্ট! আর এখন বলছো, তুমি প্রেগন্যান্ট? ছিহঃ! এমন ঘৃ’ণিত কাজ করার সময় লজ্জা করল না? তোমাকে তো আমার মেয়ে ভাবতেও ঘৃ’ণা করছে।”
তিথি মাথা নিচু করে নিল। সোবহান খান ছোট বউমার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
-“অন্য একজনের চরিত্রের সমস্যা খুজতে ছিলে তুমি, অথচ তোমার গর্ভের সন্তানদের-ই চরিত্রে সমস্যা!”
তাহমিনা খান ছলছল নয়নে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি ভাবতেই পারেননি, উনার মেয়ে এমন কিছু করে বসে থাকবে। এটা যদি সমাজ জানে, তাহলে তো তার মেয়েকে চরিত্রহীন বলে মানবে। সাথে তাদের এতদিনের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আর এটা তিনি কিছুতেই হতে দিবে না।

-“আহ…আম্মু লাগছে।”
চোখের পলকে তাহমিনা খান দোতলায় ছুটে গিয়ে মেয়ের মাথার পিছনের চুল খামচে ধরে টেনেহিঁচড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামাতে লাগলেন। চুলের ব্যথায়, মেয়েটা আর্তনাদ করে উঠল। তবুও থামলেন না তাহমিনা খান।
-“বল! কার সন্তান পেটে ধরেছিস তুই? আজকের এই দিনটা দেখার জন্য তোকে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিলাম? আজ থেকে তোর সব পড়াশোনা বন্ধ! আর এই অংশকেও তুই নষ্ট করবি।”
শেষের কথাটা শুনে তিথি আঁতকে উঠল। তাহমিনা খান মেয়েকে নিচে নিয়ে এসে সামনের শক্ত ফ্লোরের উপর ছুঁড়ে মা’রলেন। তিথি “না” বলে চিৎকার করে উবুড় হয়ে পড়ল। কিন্তু তার শরীর ফ্লোর স্পর্শ করল না, বরং সে তার ভাইয়ের বুকের মাঝে গিয়ে পড়ে। আলোকে সোফায় বসিয়ে রেখে ছুটে এসে বোনকে আগলে নেয় আধার। তিথি বড় ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আধার চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“এটা তিহানের অংশ?”
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বোঝায়। আধার গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“কেন করলি এমনটা? তিহান জোর করেছে?”
-“ন…না! ও আমাকে জোর করেনি ভাইয়া৷ আ..আসলে কয়েকমাস আগে ওর কাজিনের বার্থডে পার্টিতে গেছিলাম। ও…ওখানে ভুলবশত নরমাল ড্রিংক ভেবে ওয়াইন খেয়ে নিই। সেসময় তিহানও ড্রাংক ছিল। তারপর….তারপর….!”
আর কিছু বলতে পারল না তিথি। কাঁদতে কাঁদতে তার হেঁচকি উঠে গেছে। তবুও ভাঙা ভাঙা গলায় বলার চেষ্টা করল,
-“আ…আমরা ইচ্ছে করে কিছু করিনি ভাইয়া। যা হয়েছে ওটা একটা এক্সিডেন্ট। প্লিজ….তুমি আমাকে ভুল বুঝো না!”

আধারসহ পরিবারের সবাই বুঝতে পারল আসল ঘটনাটা। তবে তাহমিনা খান রাগে গজগজ করেছেন। অন্যের গায়ে কাঁদা ছুড়তে গিয়ে, উনার নিজের গায়েই এসে পড়ল।
-“কাঁদিস না! আগামী সপ্তাহে তোদের এনগেজমেন্ট নয়, বিয়ে হবে। আমি মির্জা পরিবারের সাথে কথা বলে নেবো।”
বড় ভাইয়ার কথা শুনে তিথির কান্না থামে। সোবহান খান ছোট বউমার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
-“নাতবউয়ের কাছে ক্ষমা চাও। পরবর্তীতে আবার যদি মেয়েটার পিছনে লাগার চেষ্টা করো, তাহলে আমি ভুলে যাবো—তুমি এ বাড়ির বউ!”
তাহমিনা খান নিজেও বুঝতে পারলেন, তিনি আজ একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। শুরুতে এতটা রিয়াক্ট না করলেও পারত। এসব নিয়ে ঝামেলা না করলে হয়তো তার মেয়েকে সবার সামনে লজ্জিত হতে হতো না। আজ তিনি একটু হলেও বুঝলেন, অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে সেই গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়। যেমনটা আজ হলো! তিনি আলো ও আধারের কাছে ক্ষমা চেয়ে রুমে চলে গেলেন। লজ্জায়, অপমানে মাথাটা হেঁট হয়ে গেল।
তিথি উপরে চলে যেতেই আধার দাদাজানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“তোমার সো কোল্ড ছেলের সেকেন্ড বউকে ভালো হতে বলো। অন্যথায়, আমি আমার বউকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো!”
নাতির কথা শুনে সোবহান খান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
-“আশা করছি, আজকের এই ঘটনার পর তাহমিনা আর ঝামেলা করবে না।”
-“না করলেই ভালো!”

আধার ফ্রেশ হয়ে এসে রুমে আলোকে দেখতে পেল না। সে কপাল কুঁচকে হাতের আধভেজা তোয়ালে বিছানার উপর রেখে বারান্দায় গেল। মেয়েটা রেলিঙের ওপর দু’হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার খোলা আকাশের দিকে। বৃষ্টির উথাল-পাতাল শেষ হয়ে এসেছে। শুধু শীতল হাওয়া বয়ে চলেছে। মাঝেমধ্যে বিদুৎও চমকাচ্ছে আর গুড়গুড় করছে। এমন শীতল রোমান্টিক আবহাওয়ার মাঝেও আধারের মনটা অজানা কারণে খচখচ করছে। হয়তো তখনকার ড্রয়িংরুমে বলা তাহমিনার কথাগুলোর জন্য। তার ওই মহিলার প্রতি ভীষণ রাগ হচ্ছে। এতগুলো বছরের জমিয়ে রাখা সম্মান এক মূহুর্তেই শেষ হয়ে গেছে। উনাকে এখন ছোটমা ভাবতেও ঘৃ’ণা করছে। কিছু কিছু সৎ মা কখনোই আপন হয় না। সেটা আজ আবারো প্রমাণ পেল।
আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিছন থেকে শক্ত করে অর্ধাঙ্গিনীকে জড়িয়ে ধরে, কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে রাখল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তে করে বলল,

-“সরি! উনার পক্ষ থেকে আমি খুব সরি।”
আলো বামহাত স্বামীর গালে রেখে, মাথায় মাথা ঠেকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“আপনি কেন সরি বলছেন? এখানে তো আপনার কোনো দোষ নেই। আর কে কি বলল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার পাশে শুধু আপনি থাকলেই যথেষ্ট!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আপনি সারাজীবন থাকবেন তো আমার পাশে? নাকি সময়ের সাথে সাথে এই আমিটার উপর আপনারও বিরক্ত এসে যাবে?”
আধার মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে, চোখে চোখ রেখে জবাব দিল,
-“নিজের প্রাণের উপর কেউ কখনো বিরক্ত হয়? তুমি আমার খুঁজে পাওয়া সেই শ্যামা পাখি, যাকে ছাড়া এক মূহুর্তের জন্যও চলবে না। আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস অবধি তোমার পাশে থাকব! মাঝখানে যতই ঝড়-তুফান আসুক না কেন, তবুও কখনো তোমার হাত ছাড়ব না ইনশাআল্লাহ।”
আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ভালোবাসার মানুষটিকে। দিনশেষে শুধু তার এই মানুষটাকেই চাই। এর বাইরে পুরো পৃথিবীর মানুষও যদি তার বিপক্ষে যায়, তবুও তার কোনো যায় আসবে না। বরং সবার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে স্বামীর সাথে সংসার করবে!

দেখতে দেখতে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটা চলেই এল। আজ শুক্রবার! এই দিনে তিথি ও তিহানের এনগেজমেন্ট হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পাল্টানো হয়েছে। আর আজ দুজনের বিবাহ! বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে হলেও খুব কাছের আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করা হয়েছে। আলোর পরিবারের লোকজন সকাল বেলায় উপস্থিত হোন। মেয়েটা নিজের ছোট্ট পরিবারকে পেয়ে ভীষণ খুশি! ওইদিনের ঘটনার পর আধার তাহমিনা খানের সাথে একটা কথাও বলেনি, এমনকি একসাথে বসে খাবারও খায় না। একই ছাঁদের নিচে থাকলেও নিজেদের দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে।
-“কিছু বলবে?”
আধার ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তৈরি হচ্ছিল। তখন খেয়াল করল, তার বউ পিছনে ঘুরঘুর করছে। মেয়েটার হাবভাব দেখে স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করল। আলো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মাথা চুলকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

-“শ…শাড়ি পরি?”
একথা শুনে আধার ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। আলো শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করল,
-“না মানে….আপনার শ্বাশুড়ি মা চাচ্ছিল আমি শাড়ি পরি।”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“ঠিক আছে, তবে….শরীরের কোনো অংশ যেন উন্মুক্ত না থাকে। নয়তো এর ফল কেমন হবে, সেটা তো জানোই!”
আলো মনে মনে ভেংচি কাটল। মুখে কিছু না বলে আলমারি খুলে একখানা জামদানী শাড়ি বের করে বিছানার ওপর রাখল। সেটা আবার আধার খুলে ভালো করে চেক করল, পাতলা কিনা। মানুষটার কান্ড দেখে আলো আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইল। পর মূহুর্তে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
-“শাড়িটা আপনাকেই পরিয়ে দিই? তারপর দেখুন, শরীরের কিছু দেখা যায় কিনা!”
আধার শাড়ি পর্যবেক্ষণ করে রেখে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“বেশি কথা বললে কিন্তু শাড়ি পরা ক্যান্সেল।”
আলো আবারো মুখ ভেংচাল! কিছু না বলে হনহনিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। চেঞ্জ করে দরজা দিয়ে একটু উঁকি মে’রে বলল,

-“বাইরে যান। আমি শাড়ি পরব।”
আধার একপলক তাকিয়ে চলে যেতে লাগল৷ আলো মনে মনে ভাবল—যাক ভদ্রলোক আছে। তবে তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আধার দরজা বন্ধ করে, বিছানায় এসে পায়ের ওপর পা তুলে আরামে বসল। পিছনে দু’হাত রেখে হালকা শরীরটা হেলিয়ে দিয়ে, ঘাড় কাত করে বউয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“তোমার এমন কিছু নেই যেটা আমার অদেখা! সো…ঢঙ বাদ দিয়ে, ভদ্র মেয়ের মতো এসে চুপচাপ শাড়ি পরো।”
আলো হতাশ হলো। বাধ্য মেয়ের মতো বেরিয়ে এসে শাড়ি পরতে শুরু করল। সে অনুভব করতে পারছে —অসভ্য লোকটা তাকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে!
ছায়া দোতলায় এসেছিল বড় আপুর কাছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় সে আর বিরক্ত করেনি। তাই নিচে যাচ্ছে। দু’হাতে লম্বা গাউনের অংশ ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল ছায়া। সেসময় হঠাৎই কারোর বাহুর সাথে ধাক্কা খেয়ে আঁতকে উঠল। শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার সময়, খপ করে তার হাতের বাহু চেপে ধরল আগন্তুক! ছায়া নিচতলায় ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থেকে জোরে জোরে শ্বাস নিল। তখন সে শুনতে পেল—আভিজাত্যপূর্ণ পুরুষালী কণ্ঠস্বর,

-“আর ইউ ওকে?”
অপ্রত্যাশিত জায়গায় খুব চেনা কণ্ঠস্বর শুনে ছায়ার হার্টবিট থমকে গেল। সে চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। সুদর্শন যুবকটি কপাল কুঁচকে পিচ্চি মেয়েটাকে একপলক দেখে বাহু ছেড়ে দিল। হাতে থাকা ফোনটা প্যান্টের পকেটে রেখে শান্ত গলায় বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪২

-“হাঁটার সময় শুধু নিচের দিকে নয়, একটুআধটু সামনেও তাকাতে হয়। নয়তো খুব শীঘ্রই আপনি হাসপাতালে পৌঁছে যাবেন!”
একথা বলে আর দাঁড়াল না। মাথার চুলগুলো ঠিক করতে করতে উপরে চলে গেল। আর পিছনে ফেলে গেল—এক স্তম্ভিত রমণীকে! যে কি-না অবিশ্বাস চোখে যুবকের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“গায়ক সাহেব….!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৪