Naar e Ishq part 34
তুরঙ্গনা
“কাশিফ! বাবা, কতবার তোমায় বারণ করেছি ওকে ওভাবে সম্বোধন করবে না। মেয়েটা সরল,কিছুটা অবুঝ, হয়তো খানিকটা বোকা… কিন্তু দিনশেষে ও তো তোমার বউ!”
—“মাম্মাম,হোয়াট এভার ইউ সে—ও আমার কাছে অলওয়েজ একটা গাধা হয়েই থাকবে।”
—“আবার?”, সরু কন্ঠে ধমক দিলেন নারীটি।
মায়ের চোখ রাঙ্গানো দেখে এবার আর কেকে কোনো প্রত্যুত্তর করল না। সে কেবল ট্রাউজারের পকেট থেকে একহাত বের করে, ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে তাতে হাতের তালুটা ঘঁসে নিয়ে, অদ্ভুতপূর্বক তাচ্ছিল্যের সহিত হাসল। পরক্ষণেই আরো দু-পা এগিয়ে যেতে যেতে অকপটে বলল,
—“চাইলে তুমি আমায় বকতে পারো, কিন্তু সত্যিটা হলো—রাফায় আঙ্কেল হয়তো মস্তবড় একটা ভুল করেছিল। যার আউটকাম হিসেবে ওর মতো একটা গাধা দুনিয়ায় এসেছে। বাট ট্রাস্ট মি, আমি এই ভুলটা করব না। একদম ফ্রেশ, ইউনিক আর আমার মতোই কয়েকটা মাস্টারপিস প্রোডিউস (উৎপাদন) করব।”
ছেলের এহেন কথা শুনে নারীটির ভ্রু-কপাল কুঁচকে গেল। ভ্রু উঁচিয়ে চাপা স্বরে তিনি বললেন,
“কাশিফ! কি বলতে চাচ্ছো তুমি?”
—“তুমি যা ভাবছো, তাই!”
আবারও নির্লিপ্ত প্রত্যুত্তর; নারীটি ভারী শ্বাস ফেলে বললেন,
“মা হই তোমার। একটু হলেও তো মুখে লাগাম টানো। না কি, আমি যে তোমার মা সেটাও ভুলে গিয়েছ?”
—“আহ-হাহ! ইউ আর নট জাস্ট মাই মম, ইউ আর মাই কুলেস্ট বাডি অ্যাজ ওয়েল।”
অকপটে কথা দুটো আওড়িয়ে, মায়ের দিকে এগিয়ে গেল কেকে। বিশাল আকৃতির ধবধবে সাদা রঙের রাজকীয় সোফাটায় বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে ধপ করে বসে পড়ল সে; মাথাটা এলিয়ে দিল সোফার পেছনের কুশনে। টমিও তার মনিবের এই ক্লান্তিটা বুঝতে পেরে কেকের পায়ের আশেপাশে এসে মৃদু লেজ নেড়ে ঘুরঘুর করতে লাগল।
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে কেকে সম্মূখে দৃশ্যমান ইজেলের ওপর ক্যানভাসটার দিকে তাকাল। চাঁদের আলো আর রঙের অদ্ভুত এক মায়াবী খেলা চলছে সেখানে। সে ক্যানভাসের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল,
“দ্যাটস সো গুড, মাম্মাম! লাস্ট উইক ধরে এটা এঁকে যাচ্ছো?”
এই বলে কেকে তার নজর মায়ের দিকে ফেরাল। চাঁদের আলো তখন সরাসরি এসে পড়েছে সেই নারীটির স্নিগ্ধ মুখাবয়বের ওপর। মোনালিসা ভেঞ্চি—যার সৌন্দর্যকে ইতালিয়ান কিংবদন্তি অভিনেত্রী মনিকা বেলুচির চিরযৌবনা, ক্লাসিক রূপের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবেই তুলনা করা যেতে পারে। নারীটির চোখে-মুখে এক অদ্ভুত রহস্যময় আভিজাত্যের আভাস; ঠোঁটের কোণে সর্বদা বিদ্যমান এক চিলতে বিষণ্ণ মোহনীয় হাসি। বয়সের কোনো ছাপই তার এই ধ্রুপদী ইতালিয়ান সৌন্দর্যকে ছুঁতে পারেনি।
মোনালিসা ছেলের দিকে চেয়ে এক চিলতে স্নিগ্ধ মুচকি হাসি হেসে বললেন,
“এইতো, প্রায় শেষের দিকে। আর সামান্য একটু কাজ বাকি।”
মায়ের এই প্রশান্তিময় কণ্ঠস্বর শুনে কেকের ভেতরের বন্য অস্থিরতা যেন ক্ষণিকের জন্য থিতিয়ে এল। সে হুট করেই সোফায় পা দুটো উঠিয়ে বসল; অতঃপর মায়ের কোলের ওপর মাথাটা রেখে সোজা গা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। একজন নিষ্ঠুর হৃদয়ের অদ্ভুত বেপরোয়া ব্যাডওল্ফ থেকে সে যেন এক নিমেষে মায়ের সেই ছোট্ট কাশিফ এ রূপান্তর হলো। সে মায়ের কোলের উষ্ণতাটুকু অনুভব করে ক্ষীণ, শুষ্ক হেসে বলল,
“তুমি চাইলে, আমি তোমায় টুকটাক হেল্প করতে পারি, মাম্মাম। যদিও তা তোমার মতো পারফেক্ট হবে না।”
মোনালিসা ছেলের অবিন্যস্ত ঝাঁকড়া চুলে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে মৃদু হাসলেন। গভীর স্নেহ মিশিয়ে বললেন,
“তা কেন হবে! তুমি নিজেই তো আমার চেয়ে যথেষ্ট ভালো আঁকতে পারো।”
মোনালিসা আবারও আঙুলের ডগায় পেইন্টিং ব্রাশ তুলে নিলেন। তিনি সম্মুখের উত্তাল ভূমধ্যসাগর আর তার ওপর ঝকঝক করতে থাকা বিশাল চাঁদকে ক্যানভাসের মাঝে ফুটিয়ে তুলতে, আলতো করে রঙ বসাতে লাগলেন। কেকে মায়ের কোলে শুয়ে শুয়েই মুখটা কিঞ্চিৎ পাশে ফিরিয়ে জানালার ওপারে উন্মুক্ত আকাশ আর চাঁদের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে মুখ উঁচিয়ে মায়ের মুখটাকে দেখল। সাদা রঙের সিল্কের গাউন,সাথে জড়ানো সিল্কের স্কার্ফ। গলায় আর কানে জ্বলজ্বলে মুক্তর ক্যাজুয়াল অর্নামেন্টস্। চাঁদের আলোয় মোনালিসার অপরূপা, লাবণ্যময়ী মুখের দিকে কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর সে নিজের চোখদুটো সরু করল; নিখাদ গম্ভীর সুরে বলল,
”আই মিন, সিরিয়াসলি মাম্মাম! এই চাঁদের ছবি না এঁকে তুমি তো নিজের সেলফ-পোর্ট্রেটই আঁকতে পারো। দ্য মুন ইজ নাথিং ইন ফ্রন্ট অব ইউ; চাঁদের চেয়ে তো তোমায় অনেক বেশি সুন্দর দেখায়!
ছেলের এমন চমৎকার প্রশংসায় মোনালিসা শব্দ করে মৃদু হাসলেন। ইতালির আর্ট কালচার আর আভিজাত্য তাঁর রক্তে। বহু আগে থেকেই ছবি আঁকার প্রতি রয়েছে তাঁর এক প্রচণ্ড তীব্র নেশা; আর সেই ছবি আঁকার নিখাদ জিনটাই যেন কেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। ছেলের ভেতরের এই শিল্পীসত্তা নিয়ে তিনি মনে মনে বেশ গর্বিতও বটে।
হাসির রেশটুকু মিলিয়ে যেতেই কেকে মায়ের কোলে শুয়ে থেকে একসময় চোখ দুটো বুঁজে ফেলল। তার চেহারায় এক চরম ক্লান্তি আর ভেতরের যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠল। সে মায়ের তুলিহীন অন্য হাতটা টেনে নিল নিজের হাতের মুঠোয়; তারপর সেটা নিজের মাথার ওপর রেখে অত্যন্ত অসহায় আর ক্লান্ত স্বরে বলল,
“মাম্মাম! একটু চুলে হাত বুলিয়ে দাও না প্লিজ… ইদানীং অনেক বেশি হেডেক হচ্ছে আমার।”
ছেলের কণ্ঠে যন্ত্রণার আকুতি মোনালিসার তুলি ধরা হাতটাকে মাঝপথেই স্তব্ধ করে দিল। মুহূর্তের জন্য তিনি থমকে গেলেন, চোখদুটো মেঘে ঢাকা আকাশের মতো বিষণ্ণতায় ভরে উঠল। একহাতে ক্যানভাসে রঙের আলতো ছোঁয়া রেখে, অন্য হাতটি আলতো করে বুলিয়ে দিলেন ছেলের এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলে। গভীর এক আনমনা ভাব নিয়ে, ভারী গলায় শুধালেন,
“বাবা… এত কীসের অশান্তিতে থাকো তুমি বলতো? কেন নিজেকে এভাবে পুড়িয়ে মারছো?”
কেকে চোখ বুজে থাকা অবস্থাতেই গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠস্বর শোনাল বড্ড ভারী, বড্ড ভাঙা; যা পূর্ববর্তী কোনো সময়েই তার এরূপ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত কারো নজরে পড়েনি,
“জানি না মাম্মাম… ভেতরে অসহ্য এক যন্ত্রণা। কেন, তা আমি জানি না। তবে ইদানীং আমি আর সহ্যও করতে পারছি না।”
মোনালিসা ছেলের কপালে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে আলতো সুরে জিজ্ঞেস করলেন,
“সারাক্ষণ এত কি ভাবো তুমি?”
কেকে কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল। পুরো ঘরটাতে তখন কেবল সমুদ্রের গর্জন আর আগ্নেয়গিরির ন্যায় তার ভেতরের নেপথ্য আগুনের গমগমে শব্দ। সে চোখ না খুলেই অস্ফুট স্বরে বলল,
“হয়তো… ওকে নিয়ে!”
মোনালিসা বুঝতে পারলেন ছেলে কার কথা বলছে। তিনি ক্যানভাস থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“মেয়েটা কি খুব অবাধ্য?”
কেকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রুপাত্মক মোহনীয় হাসি ফুটে উঠল। সে চোখ বুজেই চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
“ভীষণণণণণ!
মোনালিসা অজান্তেই নিঃশব্দে হেসে ফেলল। চোখ না খুলেই, কেকে বিষয়টা টের পেল। ভ্রু কুটি করে বলল,
“হাসছো কেনো?”
কেকে চোখ খুলল। দৃষ্টির সম্মূখে মায়ের হাসিভরা মুখটা দেখে তার কপালের ভাজগুলো আরেকটু দৃঢ় হলো। মোনালিসা ওষ্ঠকোণে হাসির সুস্পষ্ট ভাজ রেখেই বললেন,
“ওকে ভালোবাসো?”
কেকে দুদণ্ড চুপ রইল। পরক্ষণেই মায়ের নজর হতে দৃষ্টি সরিয়ে, গম্ভীরমুখে কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে বলল,
“নাহ্!”
মোনালিসা নিঃশব্দে আবারও হাসলেন,
“আচ্ছা, ভালোবাসো না! তাহলে আমায় এটা বলো, গত একবছর আগেই যেখানে তুমি ওকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলে, সেখানে আজও কেনো তুমি তা করতে পারছো না?”
কেকে দুদণ্ড চুপ থেকে, পরক্ষণেই মায়ের দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে রুক্ষ গলায় বলল,
“কারণটা তো তুমি ভালো করেই জানো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি ওকে পুরোপুরি ছেড়ে দেবো। একবার যখন ওকে চেয়েছি, দ্যান শী ইজ অনলি ফা কিং মাইন ফর আ লাইফটাইম।”
কেকের চোয়াল শক্ত হলো; চোখদুটো বুঁজে নিল। মোনালিসা মুচকি হেসে বললেন,
“বুঝলাম, ভালোবাসো না অথচ সারাজীবন নিজের করে আগলে রাখতে চাও। অথচ ওকে নিজের আশেপাশেও বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারো না; ইচ্ছে হলেই কষ্ট দাও। তোমার কি মনে হয়, তোমার এই উন্মাদনার ফল কি খুব একটা ভালো হবে?”
কেকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে অকপটে বিড়বিড় করল,
“আমার কি দোষ? গাধা একটা, দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়।”
—“গাধা নয় বোকা!”
—“ঐ একই কথা।”
মোনালিসা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো। বউকে কে সারাক্ষণ ‘গাধা’ ‘গাধা’ বলে ডাকে? এই ছেলে কি কখনো শুধরাবে না?”
—“কেকে! এবার কিন্তু তুমি আমার মেজাজ খারাপ করছো।”
—“সরি!”, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এক প্রত্যুত্তর। মুখে সরি বললেও, ভাবভঙ্গি এমন যেন দুনিয়া উল্টে গেলেও তার কিছু যায় আসে না।
মোনালিসা কিছু একটা ভেবে নিয়ে বললেন,
“তুমি কি আমায় বলবে, তোমার এই উদ্ভট কার্যকলাপ শেষ হবে কবে? তোমার কি মনে হয়, সুহিন তোমার আশায় সারাজীবনই বসে থাকবে? এমনও তো হতে পারে, ডিভোর্স ছাড়াই ও অন্য কারো সাথে সংসার পেতে বসল। তখন তুমি কি করবে?”
কেকে তৎক্ষনাৎ চোখদুটো মেলে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
—“আর ইউ কিডিং উইথ মি? আমি ওকে তালাক না দিলে ও কিভাবে অন্য কোথাও বিয়ে করবে?”
—“উঁহু আমি মজা করছি না। ধর্মীয় ভিত্তিতে স্বামী তালাক না দিলে ওর অন্য জায়গায় বিয়ে করা সম্ভব নয়। কিন্তু তুমি যা করছো এটাও তো ঠিক নয়। তুমি তো ওর জীবন নিয়ে খেলছো। এখন আইন-কানুন বলেও তো অনেক কিছু আছে৷ ও যদি এবারও ডিভোর্সের ব্যাপারে তোমার হেলাফেলা দেখে সোজা কেস করে বসে, তখন তো সবকিছু বিবেচনায় তুমি ওকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য। এবার বলো, তুমি তখন কি করবে?”
কেকে ঠোঁট চেপে দুদণ্ড ভেবে নিয়ে বলল,
“ব্যাপার না, প্ল্যান বানাতে দু সেকেন্ড লাগবে। কিছু একটা করে নেবো।”
মা হয়েও এবার আর মোনালিসা ছেলের এসব কথা সহ্য করতে পারলেন না। চোখ দুটো সরু করে বললেন,
“তুমি বিশ্বাসও করতে পারবে না, তুমি দিন দিন কতটা অসহ্যকর হয়ে উঠছো।”
কেকে আবার গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“মাম্মাম, তুমি তো অন্তত আমায় বোঝো। আমি মোটেও তোমাকে রাগাতে চাইনি।”
—“আর কি বুঝতে বলছো আমায়? মেয়েটাকে সহজ-সরল পেয়ে এতো বড় সর্বনাশ করছো কেনো? ভালোবাসো না অথচ ছাড়তেও পারবেনা। কথায় কথায় বউকে ডাকো গাধা বলে, বিহেভিয়ার এমন করো যে মেয়ে এমনিতেই দৌড়ে পালায়৷ তোমার কি মনে হয়, এসব করে তোমার মাস্টারপিস দুনিয়াতে আসবে?”
খানিকটা বিরক্তি ও তিক্ততা নিয়েই মোনালিসা কথাগুলো উগড়ে দিল। কেকে চুইংগাম চিবোনোর ভঙ্গিতে মুখ নাড়িয়ে বলল,
—“আমি মোটেও ওর সর্বনাশ করছি না। মাত্র অল্প কয়েকদিনের ব্যাপার, কিংবা কয়েক মূহুর্তের। আমি চাইলে ওকে এখনই পুরোপুরি নিজের খাঁচায় বন্দী করতে পারি, কিন্তু ও যখন উড়তে চাইছে তবে না হয় উড়তে থাকুক; ঘুরেফিরে তো আমার কাছেই আসতে হবে।”
কেকে থেমে চোখদুটো বুঁজে নিল; আবারও আওড়াতে লাগল,
“আর বারবার আমাকে বলছো ওকে ভালোবাসি কিনা? ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো—ঐ গাধা তো ভালোবাসা কি ওটাও ঠিকমতো বোঝে না। তবে আমার ভালোবাসা বা না বাসায় কি এসে যায়? ও এমনিতেও আমার, ওমনিতেও আমার। ও বাঁচলেও আমার, মরলেও আমার। আমার, আমার, আমার, শুধুই আমার।”
ছেলের রাগ-ক্ষোভ মিশ্রিত পাগলামি কথাবার্তা শুনে মোনালিসা বললেন,
“বাচ্চাদের মতো পাগলামি করছো না?”
—“না, তবুও যদি তুমি এটাকে বাচ্চাদের মতো পাগলামি ভাবো তাহলে আমার কিছুই করার নেই। হয়তো এখন সবটা অগোছালো লাগছে, কিন্তু আমি যা করছি তা কোনো না ভাবে ওর জন্য ভালো কিছুই বয়ে আনবে। ওর জীবন নিয়ে খেলে ওর সর্বনাশ করছি কিনা জানিনা, কিন্তু আমি চাইনা আমার জন্য ও পুরোপুরি ধ্বং’স হয়ে যাক।”
মোনালিসার ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল। কেকে মূলত কি বোঝাতে চাইছে? সে খানিকক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর বলল,
“তুমি কি নিশ্চিত যে, তুমিই ঠিক?”
—“অফকোর্স!”
—–“কিন্তু সময় যে থেমে থাকে না বাবা, তোমার পরিকল্পনার জেরে যদি সময় ফুরিয়ে যায় তখন কি করবে?”
—“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
—“বারবার এটাই বলছি আমি, সময় থাকতে সময়ের মূল্য দাও। মেয়েটা ভেজা মাটির মতো। তুমি যেমন ওকে ইচ্ছে মতো কখনো গড়ছো তো কখনো ভাঙছো—এমনও তো হতে পারে, তোমার আর সুহিনের মাঝের এই দূরত্বে অন্যকেউ প্রবেশ করে নিজের স্থানটুকু পরিপক্ব করে নিল; তোমার খেলনাটাকে সেই আগুন্তক নিজের মতো করে গড়ে তুলল। তখন কিন্তু তোমার আর কিছুই করার থাকবে না!
ভেজা মাটি একবার শক্ত হয়ে গেলে তাকে সহজে ভাঙা যায় না। আর যদি ভেঙেও ফেলো, তবে তাকে আগের পর্যায়ে কখনো ফিরে পাবে না। চুরমার হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে—কিন্তু সে আর কখনো তোমার হবে না।”
—“তার মানে তুমি বলতে চাইছো, আমি নই বরং গাধাটাকে ঐ দানিয়েল নিজের মতো গড়ে তুলবে, আর গাধাটাও নাচতে নাচতে ওর সাথে সংসার পেতে বসবে? সিরিয়াসলি? এটা হওয়ার হলে তো এই এক বছরে ঠিকই হয়ে যেতো। তা যখন হয়নি, তার মানে গাধা গাধাই আছে, ওকে আর কেউ চে’ঞ্জ করতে পারবে না।”
চরম বিরক্তিতে কথাটুকু আওড়িয়ে, কেকে আবারও দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বিড়বিড় করল,
“আসলেই একটা গাধা। ইচ্ছে করে ঠাস ঠাস করে মেরে গাল ফা*টিয়ে দিতে। ভালোবাসেন উনি—তাও আবার পুরো গুষ্টিকে!”
সকালের ঘটনাটাই ভেবে কেকে’র চোয়াল আবারও শক্ত হলো। ততক্ষণে মোনালিসা ছেলের এই আচরণ লক্ষ করে অজান্তেই ক্ষীণ হেসে ফেলে বললেন,
“কাশিফ! মানলাম ও ভালোবাসা কি তা বোঝে না; আর তুমি সবটা জেনেও ভালোবাসতে চাও না। কিন্তু তোমার কি উচিত ছিল না—যে ভালোবাসতে জানেনা না, তাকে নিজের মতো যত্ন করে ভালোবাসাটা শিখিয়ে দেওয়া? তাকে নিজের কাছে আগলে রাখা? কিন্তু তুমি কি করছো, বলোতো? প্রতিনিয়ত ওকে ভয় দেখাচ্ছো, অবহেলা করছো, ওকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো।”
মোনালিসা থামলেন। বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে বললেন,
“বাবা! একটা কথা মাথায় রেখো, কেউ যদি কখনো অন্য কারও হাত ধরে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ চিনে ফেলে—তাকে কিন্ত আর কখনোই তোমার এই জটিল জীবনে ফেরাতে পারবে না।”
কেকে চোখ দুটো বুঝে নিল। মায়ের কথাগুলো একনাগাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তার কর্ণধার কিংবা মন-মস্তিষ্কে। গভীর এক ভাবনার অতলে ডুবে গেল সে। বেশ খানিকক্ষণ পর হঠাৎ টমির আওয়াজে সে চমকে উঠল; তৎক্ষনাৎ চোখদুটো মেলতেই চিরন্তন এক বাস্তবতার সম্মূখীন হলো কেকে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল, চারপাশে নজর ফিরিয়ে দেখল, কিন্তু কোথাও আর তার মা নেই। তিনি চলে গিয়েছেন; আবারও কেকে’কে একা করে বাস্তবতার মুখে ফেলে গিয়েছেন তিনি।
কেকে ক্যানভাসের দিকে তাকাল। ছবিটা এখনো অসমাপ্ত। অবশ্য হওয়ারই কথা। এখানে প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে এসেছিল সে। ফলে সময়-সুযোগের অভাবে নিজের আঁকা ছবিটা অসমাপ্তই রয়ে গিয়েছে।
এগুলোকে পুরোপুরি তার নিজের আঁকা ছবি হিসেবে গন্য করা যায়না। বরং এগুলো তার মা ‘মোনালিসা ভেঞ্চি’র এঁকে যাওয়া ছবিগুলোরই রিক্রিয়েশন।
কেকে ক্যানভাস হতে নজর সরিয়ে নিল; পুনরায় গা এলিয়ে দিল সোফায়। নীলাভ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের উপর বিস্তৃত সেই জ্বলজ্বলে চাঁদের দিকে দুদণ্ড তাকিয়ে থেকে, ক্ষীণকন্ঠে বিড়বিড় করল,
“বড্ড তাড়াহুড়ো করো তুমি,মাম্মাম! আর দুদণ্ড ছেলের কাছে বসে থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো? অন্যদের মতো আমিও কি তোমার কাছেও এতোটাই অসহ্যকর?”
বলতে বলতেই চোখদুটো বুঁজে নিল কেকে। নিমিষেই তীক্ষ্ণ দু’চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। এই দৃশ্য পুরো পৃথিবীর মানুষগুলোর কাছেই বোধহয় খানিকটা অবিশ্বাস্যকর। কারণ সাধারণত কেকে তো কখনো কাঁদে না। বরং সে অন্যদের কাঁদায়, কষ্ট দেয়—শিকারের কান্নাতেই সে তৃপ্ত হয়।
অথচ লোকারণ্যের আড়ালে এই অদ্ভুত প্রকৃতির অমানুষটাও মাঝেমধ্যে নিজের অশ্রুজল বিসর্জন দেয়। তবুও সেটা কেবল একজনের জন্য। আর কেকের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান এই ব্যক্তিটিই হলো—তার মা ‘মোনালিসা ভেঞ্চি’। এক জটিল জীবন গল্পের রহস্যময় নারী। যার জীবনের শুরুটা হয়েছিল ইতালীয় পারিবারিক নাম ‘মনিকা বেলুচি’ হিসেবে; খুব অল্প কিছুদিনের মাঝেই তার সম্পূর্ণ শৈশব হারিয়ে যায় এক নিকষিত অন্ধকারে।
শৈশব পেরিয়ে কৈশোর কেটে যায়; আর সেই অন্ধকারের মাঝেই চাপা পড়ে যান তিনি। অতঃপর যৌবনের শুরুতে আলোর দিশা নিয়ে আসে এক ভিনদেশী পুরুষ। ছবি আঁকাআকির প্রতি ফ্লোরেন্স কন্যা মনিকার তীব্র এক নেশা দেখে, সেই আরাধ্যের পুরুষ ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন তার ‘মোনালিসা ভেঞ্চি’। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নতুন জীবনের গল্প। অন্ধকার কাটিয়ে নানান কল্পনা-জল্পনার স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিয়ে হয়, সংসার হয়; একসময় ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্ম নেওয়া দরিদ্র ঘরের মেয়েটি পাড়ি জমায় বাংলার মাটিয়ে। নতুন পরিবেশ, নতুন পরিবার, সবটাই হয় তার। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে শ্বশুর তার ভিনদেশী নামটা খানিক বদলে দিয়ে নাম রাখেন ‘কিঞ্জল কাহসান’ কিংবা ‘কিঞ্জল কাহসান চৌধুরী’। এক জীবনে কতগুলো নাম হয়েছিল তার, হাসিমুখে সংসার-পরিবারও গড়েছিল, বিয়ের পর বছর না পেরোতেই ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিল অদ্ভুত সৌন্দর্য মিশ্রিত এক রাজপুত্রের ন্যায় ছেলে। হিসেবের খাতাটুকু মেলাতে নিলে, জীবনের এই অধ্যায়টুকুতে কোনোকিছুরই কমতি ছিল না তার।
কিন্তু অতীতের অন্ধকার অধ্যায়ের একটি কঙ্কলের দাগ যেন কোনোভাবেই তার পিছু ছাড়ছিল না৷ ক্রমশই সেই দাগ ঘনীভূত হয়ে তার সম্পূর্ণ জীবনটাকে পুনরায় অন্ধকারে ছেয়ে ফেলল। ফলাফলস্বরূপ কলঙ্কের সেই দাগটাকেই মুছতে গিয়ে, চিরতরে অজানায় হারিয়ে গেলেন তিনি। মানুষের ভিড়ে আজ হয়তো তিনি নিখোঁজ, কিন্তু তার ছেলের দৃষ্টিতে আজও তিনি আকাশের জ্বলজ্বলে দাগযুক্ত এক চাঁদের অবয়বের মাঝেই রয়ে গেছেন।
নানান ভাবনাচিন্তা শেষে কেকে চোখদুটো মেলল। ঝাঁকড়া চুলগুলো আরো বেশি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। সোফায় গা ছেড়ে শুয়ে থেকেই, চারপাশের নানান ক্যানভাসের পেইন্টিংগুলোর দিকে তাকিয়ে সে ভারী শ্বাস ফেলল। এই গ্লাস-হাউজের অধিকাংশ ছবিই তার মায়ের আঁকা। সমুদ্রকূলের নির্জন এই প্রান্তে মায়ের জন্য বাড়িটাও বানিয়েছিল তার বাবা; বাবা-মায়ের সংসার জীবনের বেশ কয়েকটা বছর তারা এখানেই কাটিয়েছে। চারপাশে হাজারো স্মৃতি জড়িয়ে আছে; অথচ সর্বক্ষণ সে যাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে, তাদের কেউই তার আশেপাশে নেই।
কেকে যখনই এখানে আসে তখনই অদ্ভুত এক ঘোরে সর্বক্ষণ ডুবে থাকে। যদিও তার মাথায় কি চলছে তা বোঝা মুশকিল, কিন্তু প্রকৃতঅর্থে এটাও সত্য যে—তাকে বোঝার মতো এই দুনিয়াতেও বোধহয় আর কেউ অবশিষ্ট নেই। যতটা জটিল তার জীবন, ততটাই জটিল তার ভাবনা।
সময় গড়িয়ে যায়, রাত আরো ঘনীভূত হয়। ক্লান্তিতে একটা সময় টমিও ঝিমিয়ে পড়ে, কিন্তু কেকে জ্যান্ত মূর্তির মতো সোফায় পড়ে থাকে। একটা সময় তার কন্ঠস্বর হতে ক্ষীণ স্বরে নির্গত হয়,
“ফিরতা রহুঁ দার-বাদার
মিলতা নাহীঁ তেরা নিশাঁন
হোকে জুদা কাব ম্যায় জিয়া____
তু হ্যায় কাঁহা, ম্যায় কাঁহা
তেরী ইয়াদোঁ মেঁ, খোয়া রাহতা হুঁ
মুঝকো দস্তী হ্যায় তনহাইয়াঁ____!
ক্ষণিকের জন্য পুনরায় সবকিছু স্তব্ধ। দু’হাতে নিজের ভেজা চোখদুটো মুছে নিয়ে কেকে উঠে দাঁড়াল। পৃথিবীতে বেশ কিছু মানুষ আছে যারা নিজেদের অনুভূতির পরোয়া করতে পছন্দ করেনা। যখন যা ইচ্ছে হয় তখনই তাই করে ফেলে; অথচ একবারও ভাববার প্রয়োজন বোধ করে না যে, তার পদক্ষেপের আগে-পিছে ঠিক কি যৌক্তিক কারণটা রয়েছে। সবটাই তাদের খেয়ালখুশি, সবটাই নিজেদের মনমর্জি। সমাজের দৃষ্টিতে এই অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষগুলোর মাঝে কেকে নিজেও একজন। যার জীবনে ভালো লাগা, খারাপ লাগার কোনো কিছুরই সুনির্দিষ্ট কারণ মেলে না। সে কখনো সেসব খুঁজতেও যায় না; জীবন যেভাবে যাচ্ছে সেও একইধারায় এগিয়ে যাচ্ছে, তবুও খানিকটা বেপরোয়া, বিচ্ছিন্ন ভাবে।
কেকে আরো দুদণ্ড সোফায় বসে থাকার পর উঠে দাঁড়াল। একনাগাড়ে ঐ চাঁদের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে না সে। ভীষণ অস্তিত্ব লাগে, দমবন্ধকর লাগে। ভেতরের হিংস্রতা জেগে ওঠে, চারপাশের সবকিছু ধ্বংস করে দেবার প্রবল ইচ্ছে জাগে। অথচ সেই দাগযুক্ত কলঙ্কিত চাঁদের মাঝেই সে নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি খোঁজে।
টমি ঘুমিয়ে পড়েছে বিধায় সে আর তাকে বিরক্ত করল না। একাই ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বাড়ির ভেতরের দিকে। যতদূর চোখ পড়ে সর্বত্রই কেবল নানান পেইন্টিং, ক্যানভাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সবকিছু অতিক্রম করে সে ধীরে ধীরে একটি ঘরের দরজার সামনে এসে দাড়াল। কালচে কাঠের দরজাটা দেখেই মনে হচ্ছে, এটা এই নির্জন প্রান্তের গ্লাসহাউজের মাঝে অবস্থিত আরো এক সিক্রেট রুম।
তবে বিশেষ কোনো পাসওয়ার্ডের প্রয়োজন পড়ল না; সাধারণ ভাবেই কেকে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। চারপাশ নিকষকালো অন্ধকারে ছেয়ে আছে। কেকে টাউজারের পকেটে একহাত গুঁজে, অন্যহাতে সুইটবোর্ডটা অন করে লাইট জ্বালালো।
বিশাল বড় এক হলরুমের মতো ঘরটার ঠিক মাঝবরাবর কেবল একটিমাত্র হলদেটে টিউবলাইট জ্বলে উঠল। অথচ সেই সামান্য আবছা আলোতেই উন্মোচন হলো এক অনন্য দৃশ্য। একটা নয় দুটো নয়, অর্ধশত খানেক ছোট হতে বড় নানান আকৃতির ক্যানভাস দেয়াল হতে ফ্লোরে অব্দি মিছিলে সাজিয়ে রাখা। সবগুলো ক্যানভাসে কেবল একজনেরই ছবি; পারস্যে জন্মানো এক বাদামী চুলের, সমুদ্র নীলাভ চোখের অধিকারী মায়াবী রমণী। অতিরঞ্জিত চাকচিক্যের কোনো অস্তিত্ব নেই, কেবল সাধাসিধা সরল-সোজা ছোট্ট একটা মুখ। কোনো ক্যানভাসে সে প্রাণখুলে হাসছে তো কোনোটায় বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। একইসাথে রয়েছে তার নানান অঙ্গভঙ্গির প্রতিচ্ছবি।
কেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় ঘরটাকে বদ্ধ আস্তানায় রূপান্তর করল। সে ধীরে ধীরে সম্মুখের দিকে এগিয়ে গেল। গুনগুনিয়ে কয়েকটা শিস একত্রে নিজের মনর্জিতে সুর মিলিয়ে বাজালো—মে হু না, ব্যাড ওল্ফ বা ডেথ হুইসেল কিংবা Bella Ciao. শিষ সে যেভাবেই বাজায় না কেনো, মূহুর্তের মাঝেই পুরো কক্ষে অদ্ভুত এক গা ছমছমে ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
কেকে শিস বাজানো না থামিয়েই, ধীরে ধীরে সামনের কালো সোফাটার দিকে এগিয়ে গেল। সোফাটার ঠিক মুখোমুখিতে বড় কোনো পেইন্টিং সরূপ কিছু, কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কেকে সোফাটাকে পাশ কাটিয়ে সেই পেইন্টিংটার দিকে এগিয়ে যায়। ধীরস্থিরে একটানে সে ঢেকে রাখা কাপড়টাকে সরিয়ে দিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলল।
নিমিষেই উন্মোচিত হলো কাঠের ক্যানভাসে চিত্রিত, হাতে অঙ্কিত বোকা-হরিণীর বাস্তব পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি। নীল রাঙা দু’চোখের অধিকারী পার্সিয়ান রমণীর বিশাল আকৃতির ছবিটায় তার হালকা কোঁকড়ান বাদামী চুলগুলো চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে; সেই একগোছা চুলের মাঝে ঢাকা পড়েছে তার মায়াবী মুখখানি। নীলচে চোখদুটোতে তীব্র খুশির ঝিলিক; দুগাল ভর্তি হাসির রেশ। নীল-সাদা গাউনের গলার ফাঁকে দুপাশের দুটো তীক্ষ্ণ কলার-বনও স্পষ্ট; বাম পাশের কলারবনের এককোণে ছোট্ট একটা কালচে তিলও দৃশ্যমান। পুরো পেইন্টিংএ সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপকরণও যেন এটাই। দু’হাতের বাহুডোরে আগলে রেখেছে হ্যামস্টার মাফিনকে। সেও তার মনিবের মতোই বিস্তৃত এক হাসিতে মেতে উঠেছে। দুজনের এই উপচে পড়া হাসির প্রতিচ্ছবির দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল কেকে।
পেছনে না ফিরেই ধীরপায়ে পিছিয়ে গিয়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ল। টাউজারের পকেট থেকে একটা ব্ল্যাক এডিশনের সিগারেট আর ম্যাটালিক লাইটার বের করল। সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে তাতে আগুন ধরালো। এক হাতে সিগারেট তো অন্যহাতের আঙুুলের ডগায় লাইটার নিয়ে অদ্ভুত খেলায় মত্ত হলো সে। অথচ তার দৃষ্টি এক পলকের জন্যও পোর্ট্রেট হতে সরলো না। সে আপাদমস্তক নীলচে-সাদা রঙের গাউন পড়া রমণীর দিকে চেয়ে রইল। ধোঁয়া ওঠা সিগারেটটা ঠোঁটের কোণে রেখে, ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে মনে মনে ভাবল,
“ওর হাসিটা সুন্দর, অথচ আমার সামনে একদমই হাসে না।… আশ্চর্য! ও হাসলে আমি কি ওকে খেয়ে ফেলব নাকি? গাধা একটা!”
কেকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল; এক নিমিষেই মেজাজটা বিগড়ে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কেনো সে সুহিনের কথা ভাবতে নিলেই রেগে যায়? তার মা বলেছে যখন তখন একটু স্বাভাবিক হওয়াই যায়। নয়তো গাধাটা এই জন্মেও কিছু শিখবে না।
কেকে ভারী শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল। আবারও ডুব দিল রমণীকে ঘিরে এক স্নিগ্ধ ভাবনায়। এ যেন প্রতিমুহূর্তে তার অনুভূতির উত্থানপতন ঘটছে। একটা পর্যায়ে ঘরের নিস্তব্ধতা বড্ড উদাসীন ভঙ্গিতে ভেঙে গুনগুনিয়ে সে গাইল,
~”চোরাবালি মন তোমার,কেন শুধু লুকিয়ে থাকো?একটু আড়াল হয়ে আমায় দেখো!
যদি কোনো চিত্র আঁকি,পৃথিবীর সবচেয়ে দামী,
সে চিত্রতে তুমি perfectly বসো!
কেন লাগে শূন্য শূন্য বলো,তোমায় ছাড়া এত?
তুমি কি তা বলতে পারো?”~
মাত্র মিনিট পাঁচেক এর ব্যবধান। নিমিষেই দৃষ্টির সীমানায় অদ্ভুত এক পরিবর্তনের দেখা মিলল। আকস্মিকভাবে হুট করেই মনে হতে লাগল, সুহিনের প্রতিকৃতি আঁকা বিশাল আকৃতির পেইন্টিংটায় কিছু একটা অদ্ভুতপূর্বক পরিবর্তন ঘটছে। রমণীর গালভর্তি বিস্তৃত হাসিটুকু মিলিয়ে গিয়ে তা ক্রমশই ভয় ও আতংকে রূপ নিচ্ছে। এমনকি হ্যামস্টার মাফিনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে। তারা দুজন এখন আর পূর্বের ন্যায় হাসছে না বরং, তাদের একনাগাড়ে পরখ করতে থাকা কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সম্মূখে দুজনে ক্রমশই ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। আর তাদের ভয় পেতে দেখে কেকের ওষ্ঠকোণে ফুটে উঠছে এ চিলতে তির্যক হাসি। তার মতে তো এমনটাই হওয়ার কথা। শিকারির সামনে শিকার ভয়ে আড়ষ্ট হবে—এটাই তো নিয়ম!
আদতে ঘটনটা বাস্তবিক অর্থে কেকের নিজস্ব ভাবনা নাকি সত্যিকার অর্থেই এটা তার হাতের শৈল্পিক কৌশলে তৈরি এক অনন্য সৃষ্টি—তা বোঝা ভারী মুশকিল। কেকে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
—‘ভালোবাসি না তোকে,তাই না?
একটুও ভালোবাসি না?’
ক্যানভাসে চিত্রিত মায়াবী রমণীর নীলাভ চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে, কেকে তাচ্ছিল্যের সাথে শুধাল। পরমুহূর্তেই বিদ্রুপাত্মক ভগ্ন কন্ঠে কেকে গেয়ে উঠল,
❝তুঝে সোচতা হুঁ ম্যায় শাম-ও-সুবাহ,
ইসে জ্যাদা তুঝে অউর চাহুঁ তো ক্যা।
তেরে হি খ্যায়ালোঁ মেঁ ডুবা রাহা,
ইসে জ্যাদা তুঝে অউর চাহুঁ তো ক্যা!❞
(সকাল হতে সন্ধ্যা কেবল তোকেই ভাবি,
এরচেয়ে বেশি আর তোর চাই বা কি?
তোর খেয়ালেই ডুবে থাকি,
এরচেয়ে বেশি আর তোর চাই বা কি?)
আরেকটু আয়েশ করে সোফায় গা এলিয়ে দিল কেকে। তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা দৃঢ় করে চাপা কন্ঠে বিড়বিড়ি করল,
❝আই ডোন্ট নো হোয়াট ইজ লাভ। আই জাস্ট নো দ্যাট ইউ আর মাই ফা কিং অ্যাডিকশন; অ্যান্ড আই অ্যাম নেভার লেটিং ইউ গো।❞
কেকে দুদণ্ড থেমে পুনরায় দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“ডোন্ট এক্সপেক্ট আ ফেয়ারিটেল ফ্রম মি। আই উইল মেক ইয়োর লাইফ আ ব্লা’ডি হেল!”
বলেই সে নিজের ফোনটা বের করল। মাঝরাতে বিশেষ এক নাম্বারে এসএমএস পাঠাতে ব্যস্ত হলো সে। যে নাম্বারটাকে সে নিজের ফোনে সেভ করে রেখেছে ‘পার্সিয়ান গাধা’ হিসেবে। কেকে একনাগাড়ে বেশ কিছু লিখল, আবার তৎক্ষনাৎই কাটছাঁট করে অনেককিছু মুছে ফেলল। শেষমেশ দুটো লাইনের ছোট্ট একটা এসএমএস পাঠিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করল,
“একবার আয় শুধু, জানে মারব আমি তোকে। ইডিয়ট, গাধা, আহাম্মক!”
হুট করেই রাগটা যেন ফুঁসে উঠেছিল। কারণ; নেই বললেই চলে। জ্বলজ্বলে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে, পা দিয়েই পিষে ফেলল সে। দু’হাতে নিজের ঝাঁকড়া চুলগুলো চেপে ধরে, নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। অনেক হয়েছে, এবার তার মা-ও বলছে সে ভুল রাস্তায় চলছে। যদিও ভুল-ঠিক কোনোটারই পরোয়া সে করে না, কিন্তু এভাবে নিজের শিকার অন্যের কাছে ফেলে রাখারও কোনো মানে হয়না।
কেকে নিজেকে শান্ত করে ভারী ভারী দুবার শ্বাস ফেলল। মূহুর্তেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ছবিটার দিকে পুনরায় নজর দিল। এবার যেন সুহিন আর মাফিন দুজনেই আগের মতো হাসছে। কেকে দুজনের হাসি দেখে বিরক্ত হলেও, নিজেকে সামলে নিল। কেনো যেন মনে হলো, গাধা দুটো তার অস্থিরতায় তাকেই উপহাস করছে। সাহস অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে গেলেও, সে আপাতত মাথা আর গরম করল না। বরং পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে, ঠোঁটে চাপল। ব্ল্যাক ম্যাটালিক লাইটারটাকে আঙুল ডগায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারবার ক্লিক-ক্ল্যাশ শব্দের তালে আগুন জ্বালিয়ে-নিভিয়ে উদ্ভট খেলায় মত্ত হলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টির বিচরণ আরো প্রখরভাবে ছেয়ে গেল সম্মূখের ক্যানভাসে। বহুক্ষণ নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ভাবনাচিন্তার পর, অচিরেই সে এক চিলতে তির্যক হাসল। যেন সে খুব ভালো করেই জানে, সে কি করতে চলেছে। দুনিয়ার ভাবনার প্রতি একপ্রকার তীব্র তাচ্ছিল্য করে, নিজের জেদ ও মনমর্জিকেই সর্বচ্চ প্রাধান্য দিয়ে, গুরুগম্ভীর তীক্ষ্ণ স্বরে কেকে আওড়াল,
“গুনাহ লাগে ইয়া সাওয়াব, ম্যায় ইস নার-এ-ইশক্ মে জালতা রাহুঙ্গা,
খোদা কি কাসাম, তুঝে পানে কে লিয়ে ম্যায় হার হাদ্দ সে গুজারুঙ্গা।
(পাপ হোক বা পুণ্য, আমি এই প্রেমের আগুনেই জ্বলতে থাকব। খোদার কসম, তোকে নিজের করে পাওয়ার জন্য আমি সমস্ত সীমানা পার করে ছাড়ব।)
রাত যতই গভীর হচ্ছে, সুহিনের অভিব্যক্তিতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছে দানিয়েল। মাত্র দুদিনে এতোকিছু হয়ে গেল অথচ সে কিছুই জানে না? নিমরাকে সে রেখেছে কোন কাজে তাই তো বুঝতে পারছে না। সুহিন মানা করেছে বলে, নিমরাও তাকে কিচ্ছুটি জানায়নি।
সুহিন কাচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। সকালের অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ব্যতীত বাদবাকি সবটাই সে বলে ফেলেছে। যার ফলে এইটুকু তো দানিয়েলের কাছে স্পষ্ট যে—কেকে লোকটা আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ। নয়তো সহজ-স্বাভাবিক মানুষ তো এইসব কান্ডকলাপ করতে পারেনা। তবে পরিস্থিতি যেমনই হোক, সুহিনের স্বীকারোক্তি দানিয়েলকে এক দিক থেকে স্বস্তি দিল। সে উপলব্ধি করল,কেকে হয়তো কখনোই সুহিনকে চায় না বরং কোনো এক অজ্ঞাত, রহস্যময় কারণে সে সুহিন আর তার চারপাশের স্বাভাবিক পরিধির মাঝে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। আর এটার একমাত্র সমাধান ডিভোর্স ছাড়া আর কিছুই নয়। এতোদিন না হয় তার খোঁজ পায়নি, কিন্তু এবার তো এই তামাশা শেষ করতেই হবে।
কেকে’র সাথে যতদ্রুত সম্ভব ডিভোর্সের ব্যপারে সরাসরি আলাপ করতে হবে। এবার যদি সে কোনো ভণিতা করে তাহলে হয়তো আইনি সহায়তাও নিতে হবে। সবটাই হবে কেকে কি চায় তার ভিত্তিতে। এভাবে দিনের পর দিন একটা মানুষের জীবন নিয়ে খেলার তো কোনো মানেই হয়না?
দানিয়েলের মাঝে রাগ-ক্ষোভ-বিরক্তি সবটারই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটছে। তবুও সে সুহিনের সম্মূখে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে, তাকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল?”
সুহিন নির্বিকারে মাথা নেড়ে অকপটে বলল,
“হ্যাঁ!”
—“কি বলেছে?”
—“ব…বলল, দিয়ে দিবে ডিভোর্স।”
—“আর কোনো কথা হয়নি?”
দানিয়েলের কন্ঠস্বর রুক্ষ। সুহিন চকিতে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় রমণীর স্নিগ্ধ মুখখানি দেখে, এক নিমিষেই দানিয়েলের সকল রুক্ষতা গলে জল হয়ে গেল। সে শুষ্ক ঢোক গিলে, নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। মাথা নুইয়ে ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভাবতে লাগল। ততক্ষণে সুহিনের ফোনে আসা নোটিফিকেশনের আওয়াজ চারপাশের থমথমে নিস্তব্ধতাকে চিঁড়ে দিল। সুহিন চমকে ফোনটা হাতে নিতেই, দানিয়েলও মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
ততক্ষণে সুহিন নিজের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মেসেজটা দেখে স্তব্ধ হলো। হুট করে তার মুখটা ফ্যাকাসে হতেই, দানিয়েল ভ্রু কুঁচকে পাশ থেকে বলল,
“কি হলো?”
সুহিন দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করতে লাগল। সে কিছু না বলে, নিজের ফোনটা দানিয়েলের দিকে এগিয়ে দিল। দানিয়েল ফোনটা হাতে নিতেই দেখল, একটা আননোন নাম্বার হতে মেসেজ এসেছে,
“kal shondhar age Milane eshe amar shathe dekha korbi. Divorce-er bapare officially discuss korte barite Advocate ashbe….Obviously ekai ashbi.
সবটাই ঠিক ছিল, কিন্তু শেষে ‘অবশ্যই একাই আসবি’ লেখাটা দেখেই দানিয়েলের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল। সে সুহিনের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“একাই আসবি মানে? উনি কি চাইছে বলোতো? অন্যকেউ সাথে গেলে তার কি সমস্যা?”
সুহিন কিছু বলার মতো খুঁজে পেল না। ততক্ষণে দানিয়েল ভেবেচিন্তে চাপা স্বরে বলল,
“ব্যাপার না, কাল তোমার সাথে আমি যাব। বাদবাকি যা কথা বলার, তা না হয় আমার সাথেই হবে।”
দানিয়েলের ত্যাছড়া কন্ঠস্বর শুনে সুহিন থতমত খেয়ে গেল। দানিয়েল ভাবগতিক দেখে তো মনে হচ্ছে, কাল দুই পাগল একসাথে হলে হট্টগোল বাঁধিয়ে ছাড়বে। কেউই তো কারো চেয়ে কম নয়। এই একবছরে সুহিন অন্তত এইটুকু বুঝে গিয়েছে, দানিয়েল যতটা সহজ-সরল দেখতে সে ততটাও তেমন নয়। প্রয়োজন পড়লে বড়সড় একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলতেও সে দুপা পিছে হটবে না।
এরিমধ্যে সুহিনের কিছু একটা মনে পড়তেই,তড়িঘড়ি করে সে বলল,
“কি…কিন্তু…আপনার তো ভার্সিটি থেকে এমনিতেই এক্সট্রা প্রেশার নিতে হচ্ছে, নিমরারও পরীক্ষার ঝামেলা, এরিমধ্য কিভাবে কি…তার চেয়ে ভালো হয় আমিই না হয়…!”
সুহিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই,দানিয়েল তার কথা কেড়ে নিল,
“একদমই না, দেশেই আমি ঐ পরিবার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। আগে ভাবতাম এসব লোকমুখের আজেবাজে কথা। কিন্তু এই কেকে-কে দেখার পর অন্তত আমার চিন্তাভাবনা বদলে গিয়েছে। এই বান্দা আসলেই ভেজালজনক। তুমি চাইলেই তো আর আমি তোমাকে একা যেতে দেবো না।”
সুহিনের মনে হচ্ছে সে মাইনকার চিপায় ফেঁসে যাচ্ছে। বড্ড অসহায় ভঙ্গিতে সে বলে উঠল,
“তাহলে এবার কি করব?”
দানিয়েল সুহিনের ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ওনাকে বলো যে, কাল নয় বরং আগামী রবিবার ডেট ফিক্সড করতে। ততদিনে আমার ভার্সিটির ঝামেলা মিটিয়ে নেবো।”
সুহিন আর বেশি না ভেবে, দানিয়েল যা বলল তাই করল। টুপ করে আননোন নাম্বারটাতেই এসএমএস পাঠাল,
“কাল সম্ভব না, আগামী রবিবার সম্ভব হলে যাব।”
সম্ভবত রমণীর এই সাধাসিধা মেসেজটা দেখেই, ওপর প্রান্তের উন্মাদটা চেঁচিয়ে বলল,
“গাধা,তুমি আয় শুধু। আমি যদি তোকে জ্যান্ত চিবিয়ে না খেয়েছি, দেখিস তবে!”
অথচ অপ্রত্যাশিত ভাবে মিনিট দশেক পেরিয়ে গেলেও, মেসেজের কোনো প্রতুত্ত্যর এলো না। সুহিনের পাশাপাশি দানিয়েলও হতাশ হলো। কিন্তু দানিয়েল বেশ কড়া গলাতেই বলে উঠল,
“যত যাই হোক, তুমি আর একা কোথাও যাবে না। এ ক’দিন নিমরাকে সাথে পাঠিয়েছিলাম, অথচ এখন মনে হচ্ছে ও কোনো কাজেরই না।”
দানিয়েলের অভিব্যক্তিতে সুহিন ভ্যাবাচ্যাক খেয়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই, দানিয়েল ত্যাছড়া গলায় আবারও বলল,
“আমাদের পুরো একটা বছর ধরে উনি ঘুরিয়েছেন। এবার না হয়, আর কয়েকটা দিন আমরা ওনাকে অপেক্ষা করাবো। আমরা যখন এতোদিন অপেক্ষা করতে পেরেছি, তবে উনিও পারবে আশা করি।”
দানিয়েল থেমে সুহিনকে আশ্বস্ত করে বলল,
“যত যাই হোক, তুমি বেশি বুঝতে যেও না৷ ঐ লোক যে সুবিধার নয় তা আমার চেয়ে তোমার ভালো বোঝার কথা।”
—“না…মানে…হ্যাঁ।”, সুহিন মনে মনে ভাবতে লাগল এবার কি করবে। ততক্ষণে দানিয়েল আচমকা বলে উঠল,
“এতো কি ভাবছো বলোতো? আমি আছি তো!”
চকিতেই সুহিন দানিয়েলের দিকে মুখ ফেরাল। দানিয়েল হুট করেই উর্দু সায়েরি ভঙ্গিতে বলে বসল,
“ফিকার না কারে, বউপাখি!
তাজমাহল কি কেয়া অওকাত,
ম্যায় তো তুমেহ্ দিল মে ছুপা লুঙ্গা/
ইস নার-এ-ইশক্ মে, ম্যায় তুমহে
হার শায়তান কা নাজার সে বাঁচা লুঙ্গা।”
বেচারী সুহিন ফ্যালফ্যাল করে দানিয়েলের দিকে চেয়ে রইল। স্বল্প মস্তিষ্কের হিসেব না মেলায়, সে চোখের পাপড়ি ঝাপটে বলল,
“এটা হিন্দি না উর্দু?”
সুহিনের কথা শুনে দানিয়েল না হেসে আর পারল না। সে ফিক করে হেসে ফেলতেই, সুহিন ভ্রু কুঁচকে ফেলল। দানিয়েল নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কপাল ভালো তুমি দুটোর একটাও ঠিকমতো বোঝো না। নয়তো আমার এই উল্টোপাল্টা সায়েরির এক্সপেরিমেন্ট দেখে নিজেই হেসে ফেলতে।”
—“ওহ,সায়েরি… তার মানে তো এটা উর্দু ছিল। হাসবেন না, আপনি সুন্দর বলেন এইসব ছন্দ-সায়েরি।”
—“সে আমি যাই বলি না কেনো, তুমি তো আর কোনোটাই বোঝো না।”
—“তা ঠিক তবে পুরোপুরিও ঠিক না। আমি কিছু কিছু বুঝি, ওতোটাও অবুঝ নই।”
সুহিনের জোরালো অভিব্যক্তিতে দানিয়েল হাসল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“এতো বোঝারও প্রয়োজন নেই। তুমি যত কম বুঝবে ততই ভালো।”
আচমকা দানিয়েল তার মাথায় হাত রেখে, মজার ছলে তার উষ্কখুষ্ক বাদামী চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো করে দিল। সুহিনকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, দানিয়েল বারান্দা হতে বেরিয়ে যেতে যেতে আওড়াল,
“বেশি রাত কোরো না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। নাহলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
দানিয়েল চলে গেল। সুহিন ভারী শ্বাস ফেলে সোফাতেই গা এলিয়ে বসে রইল। মনে হয়না আজ রাতে আর তার ঘুম আসবে। এমনিতেও অদ্ভুত এক অস্বস্তি তাকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
সুহিন বিস্তৃত চাঁদটার দিকে তাকিয়ে, কিছু পুরোনো স্মৃতিতে হারিয়ে গেল। বোকা-সোকা মানুষ হলেও অন্ধকার তার ভালোই লাগে। ছোট বেলায় কতশত রাত এভাবেই অন্ধকারে একা একা কাটিয়ে দিয়েছে সে। আগে হয়তো ভয় হতো আর এখন এই অন্ধকারই তাকে স্বস্তি দেয়। নিকষিত অন্ধকারের মাঝেই সে আজ অভস্ত্য।
অথচ একটিমাত্র অন্ধকার ছায়াই তার জীবনটাকে সম্পূর্ণ উলোটপালোট করে দিয়েছে। লোকটা আসলে কি চায় সুহিন কখনোই আর বুঝতে পারল না৷ কিন্তু তার প্রতি শতভাগ রাগ-ক্ষোভ থাকার পরও, আশ্চর্যজনক ভাবে যখনই সে কেকে’র সংস্পর্শে মিশতে যায়,তখনই সে এক নিমিষেই তার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে। এ যেন আরেক মহা মুসিবত। কোথায় তাকে মন-প্রাণ উজাড় করে ঘৃণা করবে তা না; কোথাও না কোথায় এই ব্যাপারে সুহিন নিজের প্রতিই প্রচন্ড বিরক্ত।
এরিমধ্যে তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল গতবছর নিজের জন্মদিনের কথা। জন্মদিনের পাশাপাশি বিচ্ছেদেরও একবছর পূর্ণ হবে হয়তো। তখন বয়স ছিল উনিশ আর দেখতে দেখতে এখন বয়স হতে চলল কুড়ি। সুহিন কেনো যেন কোনোভাবেই হিসেবটা মেলাতে পারেনা। ঐ সময়টুকুতে লোকটা যেভাবে তার জন্য পাগলামি করতো, সেসব করে সে আদতে কি বোঝাতে চাইত? তাকে ভালোবাসে? আর যদি সত্যিই ভালোবেসে থাকে, তবে এখন সে কি করছে? মাত্র একটা ভুল, আর তার পরিণাম এতো জটিল? সত্যিই কি, ভালোবাসার অর্থ এমন কিছুই হয়? কেউ কাউকে ভালোবাসলে এভাবে অবহেলা করে? দূরে সরিয়ে রাখে? সুহিন জানেনা, এসবের উত্তরও সে খুঁজে পায়না। পুরো জীবনটাই তো সবার অবহেলাতেই কেটে গেল, ভালোবাসার ছোঁয়া আর পেলো কই সে?
চশমার আড়ালে নীলচে চোখদুটো ভিজে উঠতেই, সুহিন চোখ দুটো বুঁজে নিল। ফিসফিস করে গাইতে লাগল,
“I was nineteen in a white dress
When you told me I’m your princess
So I played right in to your fantasy
Was your good girl, so I’d sit tight
And if I don’t speak, then we can’t fight
Looked in the mirror, now I can’t believe…..”
বন্ধ চোখদুটোর কোণে হাসির রেশ ফুটে উঠল। সুহিন ওষ্ঠকোণে বিড়বিড় করল,
“প্রিন্সেস?”, পরক্ষণেই তাচ্ছিল্য ভরা এক হাসি ওর ওষ্ঠকোণে দেখা গেল। ভাবতে ভাবতে আবারও সেই পুরোনো অতীতে হারাল। সে-রাতেও এমন জোছনা ভরা মাঝরাতে লোকটা এসেছিল; তবুও একটা দশটাকার মাফিন কেক নিয়ে,যা সে নিজেই খেয়ে ফেলেছে। অথচ জন্মদিনটা ছিল তার। সেই জন্মদিন, যার কথা কেউ মনে রাখেনি, অথচ সে ঠিকই রেখেছিল। তাকে বার্থডে উইশ কিংবা প্রিন্সেস বলে সম্মোধন করা, সবটাই সে করেছিল। সম্ভবত সেই রাতে সুহিন একটা সাদা রঙের গাউন পড়া অবস্থায় ছিল। কত আশ্চর্য! গানটা যেন তার সাথেই সম্পূর্ণ মিলে যায়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যময় হলো ঐ লোকটাই। খোদা জানে, এই বান্দাকে সে কি দিয়ে বানিয়েছে!
কিন্তু তারপর? জীবনের সবচেয়ে নতুন আর অদ্ভুত এক অনুভূতিকে অনুভব করা। এক দীর্ঘ চুম্বনের তালে মূহুর্তের মাঝেই দুনিয়ার সবকিছু ভুলতে বসেছিল সে। সুহিন আবারও যেন সেই অনুভূতির মায়াজালে ডুবে গেল। একমুহূর্তে জন্য চোখদুটো বুঁজে ফেলতেই, ধড়ফড়িয়ে আবার উঠে বসল সে। শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে ধমকে শুধালো,
” এসব কি অসভ্যতা হচ্ছে, ওটা একটা জা’নো’য়ার। বারবার কেনো ভুলে যাস তুই গাধা!”
নিজের প্রতি তিক্ত বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিয়ে সে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। কিছুটা স্বাভাবিক হতেই, নিজের প্রতি তাচ্ছিল্য করে আবারও সে গাইল,
“I forgot I was a bad bitch, tragic
Breaking all the rules ’cause they were only habits
Cinderella’s dead now, casket
You thought the shoe fit but I….
Da-da-da, da-da-da, da-da-da, da-da-da-da
Naar e Ishq part 33
প্রতিটি শব্দের শেষে সুহিনের বুকভরা তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল। সে ফোনটাকে শক্ত করে চেপে ধরে, জ্বলজ্বলে চাঁদের দিকে চেয়ে চাপা কন্ঠে বিড়বিড়ি করল,
“ঠিক আছে, প্রয়োজনে কাল আমি একাই যাবো। প্রিয় অসভ্য পুরুষ—আমিও দেখতে চাই আপনি ঠিক কতটা নিচে নামতে পারেন!”

Apu plz next part gola taratari dien….
This novel make me very well
Hay beautiful lady. Please taratari next part ta den . Ei 1st kono story te ami ato interested . Story ter kahini just wow . Please late Korben na👄👀