নূর ই মহব্বত পর্ব ৮
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
নওমি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আযলান আবার ওর সামনে এসে দাঁড়াল।
– কোথায় পালাচ্ছো?
নওমি একবার আশপাশ দেখে বললো,
– রাস্তা ছাড়ুন।
– ছাড়বো না। আগে বলো আমার সাথে কথা বলবে।
– আপনার সাথে বলার মতো কিছু নেই! আমি আপনাকে চিনি না! আর একজন অপরিচিত লোকের সাথে কিছু নেই কথা বলার!
“আমি আপনাকে চিনি না” কথাটা আযলানের কোথাও যেন বিঁধলো! সে মলিন মুখে একবার আড়চোখে আদনানের দিকে তাকালো। বাচ্চাটা বড় বড় চোখ করে ওকে দেখছে। বোধহয় বুঝতে চাইছে এটাই ওর বাবা কি না! কিন্তু সেদিন মা তো বললো এটা বাবা নয়!
আযলান ওকে ইশারা করে বললো,
– বাচ্চাটা… মানে আদনান কার ছেলে?
নওমি চমকে তাকাল। এই লোক কি বুঝাতে চাইছে? ইন্ডিরেক্টলি ওর চরিত্রের দিকে আঙুল তুলছে? সে র’ক্তাভ চোখে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো,
– আমার বা আমার ছেলের পার্সোনাল কিছু বাইরের কারো সাথে শেয়ার করতে অনিচ্ছুক! প্লিজ রাস্তা ছাড়েন।
আযলান আকুল কন্ঠে বললো,
– বলো না নওমি? আদনান আমার ছেলে, তাই না? একবার বলো প্লিজ!
নওমির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বি’ষাক্ত আর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। অবাকের ভান করে বলল,
– আপনার? আপনার ছেলে কেন হতে যাবে ও? ও তো আমার ছেলে! হি ইজ মাই সান! অনলি মাইন! আই এম হিজ মাদার অ্যান্ড এভরিথিং! এই দুনিয়াতে আমি ছাড়া ওর কেউ নেই, কেউ না! সো আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে প্লিজ রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ান।
আযলান সরলো না বরং এগিয়ে আসলো এক কদম আর তা দেখে দুই কদম পিছিয়ে গেল নওমি। আঁতকে উঠে আশেপাশে তাকালো। স্কুলের কেউ দেখে নিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে! এমনিতেই অনেকে তার দোষ খুঁজার জন্য ওতপেতে থাকে। কম কথা খোঁটা শুনেনি সে। একে তো সুপারিশে কম যোগ্যতা নিয়ে চাকরি পেয়েছে অন্যদিকে সিঙ্গেল মাদার! এখন যদি আযলানের সাথে দেখে তাহলে কথা অনেক দূর গড়িয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। অজানা ভয়ে তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
– প্লিজ আমাদের থেকে দূরে থাকুন।
– কেন থাকবো? তুমি আমার জবাব দাও আগে!
এবার রাগ দেখিয়ে বলে উঠল নওমি,
– একজন ডক্টর হয়ে রাস্তায় একটা মেয়েকে একা পেয়ে হ্যারাস করতে আপনার লজ্জা লাগছে না? ভদ্র ঘরের ছেলে হলে কখনো মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে একটা বাচ্চাসহ মেয়ের রাস্তা আটকে দাঁড়াতেন না!
নওমির চোখ দুটো লাল হয়ে আসছে। আযলান অবাক কণ্ঠে বললো,
– নওমি আমি তোমায় হ্যারাস করছি? আমি তো…
– হ্যারাস নয়তো কি? এভাবে মাঝরাস্তায় জেরা করছেন কেন? আপনি আমাকে চিনেন না আমি আপনাকে চিনি হ্যাঁ? আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই তাহলে এটাকে কি হ্যারাস বলে না?
আযলান কিছু বলতে যাবে তখনই দেখলো নওমি আড়চোখে অন্যদিকে তাকাচ্ছে। সে সেদিকে অনুসরণ করে তাকাতেই দেখলো দু একজন স্টাফ মাত্রই বের হচ্ছে। নওমির বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি তখন চরমে। সে জানে, এই শহরে একজন ‘সিঙ্গেল মাদার’ হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকাটা কতটা কঠিন। তার ওপর কম যোগ্যতা আর সুপারিশের খোটা তো প্রতিদিনের চায়ের কাপে ঝড় তোলে। এখন যদি এই বিলাসবহুল গাড়ির মালিকের সাথে তাকে কেউ এভাবে তর্ক করতে দেখে, তবে কালকেই স্কুলের স্টাফরুমে মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়বে। আযলান বোধহয় বুঝলো নওমির চাহনি। সে নরম গলায় নিচু স্বরে বলল,
– আমরা কোথাও বসে কথা বলি?
– বললাম তো আপনার সাথে কোনো কথা নেই! প্লিজ আমাদের পিছু ছাড়ুন!
– নওমি প্লিজ! বেশি সময় নেবো না।
একটু ভেবে বলল,
– আচ্ছা চলো তোমাদের আমি বাসায় পৌঁছে দিই তখন নাহয় কথা বলা যাবে?
নওমি কঠোর চোখে তাকাল। হিসহিসিয়ে বললো,
– আমি নূরজাহান নওমি, আপনার দয়া নিবো না। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে খুব ভালোভাবেই পৌঁছে যেতে পারবো! কোনরকম আলগা দরদের দরকার নেই আমাদের।
বলেই হনহনিয়ে আযলান থেকে কিছুটা দূরে চলে গেল। একটা রিকশা পেতেই সেখানে উঠে হাফ ছেড়ে বাঁচল। স্কুলের দিকে একবার চোখ বুলালো। না! কেউ খেয়াল করেনি ওদের। সে আদনানকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। এতক্ষণ আযলানের সামনে যে শক্ত পাথরের মতো নওমি দাঁড়িয়ে ছিল, রিকশাটা একটু দূরত্বে আসতেই তার সেই বাঁধ ভেঙে গেল। হুডের আড়ালে নিজের মুখটা লুকিয়ে সে নীরবে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। চোখের পানিতে নিকাব ভিজে যাচ্ছে কিন্তু নওমি কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। অতীতের সেই অপমানের দিনগুলো, আযলানের সেই নীরব অবজ্ঞা, বি’ষাক্ত কিছু সত্য! সব আবারও মন মস্তিষ্কে ভেসে উঠছে।
ওদিকে পেছনে যে একটা গাড়ি তাদের পিছু পিছু আসছে সেটা তারা টেরই পেল না। নওমি ভাবেনি আযলান ওকে হন্য হয়ে খুঁজবে। আযলান তো ওকে ভুলে যাওয়ার কথা তার তো অন্য কেউ ছিলো…!
আযলান গাড়ি নিয়ে নওমির রিকশাকে ফলো করতে করতে ওর বাসা অব্দি আসলো। নওমি বাসার সামনে রিকশা থামাতেই দূরে গাড়ি দাঁড় করালো আযলান। গাড়ি থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সবটা পর্যবেক্ষণ করলো। নওমি বাড়ির গেট পেরোতেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো আযলান। গেটের কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। ততক্ষণে নওমিরা চোখের আড়াল হয়েছে। আযলান আশপাশ দেখে একটু এগিয়ে দেখল দারোয়ান বসে আছে। ওকে দেখেই দাঁড়িয়ে বললো,
– কাকে চাইতাছেন?
আযলান একটু থতমত খেলো। তবুও হেসে বললো,
– এখন যে একজন গেল না? বাচ্চা নিয়ে? ওনার বাসা কোন ফ্লোরে?
দারোয়ান সন্দেহের দৃষ্টি তাক করলো আযলানের উপর। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেমন করে তাকিয়ে বললো,
– ওই আফার খোঁজ আপনি চাইতাছেন কেন?
আযলান অস্বস্থিতে পড়ে গেল। এভাবে তাকালে যে কেউ অস্বস্থিতে পড়বে! সে সামলানোর চেষ্টায় বললো,
– আসলে… উনি আমার একজন পরিচিত আত্মীয় তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। আমি আসতে আসতে তো ভেতরে চলে গেল!
আযলানের চকচকে চেহারা, দামি শার্ট আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিলাসবহুল গাড়িটা দারোয়ান আগেই লক্ষ্য করেছে। বছরে কেউ খোঁজ নিতে না আসা নূরজাহানের খোঁজ নিতে এমন একজন হাই-প্রোফাইল পুরুষ মানুষের হুট করে আগমন দারোয়ানের চট করে বিশ্বাস হলো না।
সে কণ্ঠে সন্দেহ ঢেলে বললো,
– আত্মীয়? আপনেরে তো কোনোদিন দেহি নাই! আফা এইহানে কতগুলো দিন ধইরা থাকে, ওনার এক বান্দবী ছাড়া আর কাউরে তো আসতে দেহি না। আপনে এখন ওনার খোঁজ দিয়া কী করবেন?
আযলান বিরক্ত হলো কিছুটা। নিজের বউয়ের সাথে দেখা করতে কত জেরার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে! পরক্ষণেই ভাবলো এখন বউ পরিচয় দেওয়া যাবে? মেয়েটা বোধহয় মানে না! আজ তো বলল সে নাকি চিনে না আমাকে!
সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করার ভান করে অত্যন্ত নরম ও ভদ্র গলায় বলল,
– দেখুন চাচা, আমি সত্যিই ওনার খুব কাছের মানুষ। অনেক বছর পর দেখা তো, তাই ওনার ফ্ল্যাটটা চিনতে পারছি না। ওনার নাম নূরজাহান নওমি না? আমি এখন যাবো না জাস্ট জিজ্ঞেস করেই চলে যাবো।
নওমির পুরো নামটা আযলানের মুখে শুনে দারোয়ানের সন্দেহ কিছুটা কমল বটে, কিন্তু সে পুরোপুরি গলল না। আযলান সেটা বুঝতে পারলো। সে আবারও বললো,
– দেখুন আমি মিথ্যে বলছি না। আমি একজন ডক্টর। ওনার ছেলে আদনান, ও অসুস্থ থাকাকালীন আমার কাছেই গেছিলো। আমি জাস্ট ওর কথা জানার জন্য।
দারোয়ান বোধহয় গললো। সে জবাবে বললো,
– হ আদনান বাবা এখন সুস্থ। ওরা তিনতলার দুই নম্বর ঘরটায় থাকে। কিন্তু আমি ওনার অনুমতি ছাড়া কোনো বাইরের মানুষরে ওনার ঘরে যাইতে দিতে পারুম না। আফায় একা একটা বাচ্চা লইয়া থাকে, কত মাইনসে কত কথা কয়! ভালো মানুষ আফাটা কিন্তু মাইনসের মুখ তো আর বন্ধ করন যায় না! আপনে অন্যদিন আইসেন। আর আফারে যেহেতু চিনেন তাই ফোন কইরা আইসেন। মাফ করবেন আমি যাইতে দিতে পারমু না।
আযলান হেসে বললো,
– আমি যাবো না আজ। অন্য একদিন আমি জানিয়ে আসব আমি আজকে খবর নিতে এলাম। ধন্যবাদ চাচা।
দারোয়ানের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে একবার উপরের দিকে তাকিয়ে নিজের গাড়ির কাছে চলে এলো। বুকের উপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল। এট লিস্ট নওমির বাসা তো খুঁজে পাওয়া গেল! সে এবার বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। সে নওমির খোঁজ পেতে গত তিনদিন নাওয়া খাওয়া এক করে ফেলেছে। প্রথমে তুহিকে ফলো করার চিন্তায় ছিলো। কিন্তু প্রথমদিন ফলো করতে গিয়ে দেখলো তুহি নওমির বাসায় গেল না উল্টো ওর এক বান্ধবীর বাসায় গেল। দ্বিতীয়দিন ভাবল অন্য উপায় আর সেই মোতাবেক খুঁজে বের করলো আবরারকে। প্রথমে সে আবরারের ফেসবুক আইডি খুঁজে বের করলো। বহু ঘাটাঘাটি করেও কিছু পেল না। হতাশ হয়ে আযলান মনে করার চেষ্টা করল, নওমির সাথে বিয়ের পর যখন ওদের সম্পর্ক ভালো ছিল, তখন নওমি টুকটাক গল্প করার সময় তার খালার বাড়ির কথা বা কিছু বলেছিল? আযলানের আবছা মনে পড়ল, নওমি একবার বলেছিল যখন প্রথম আবরারের ছবি নিয়ে ঝামেলা হয় তখন। আবরার ফার্মেসিতে পড়াশোনা করে বা মেডিক্যাল সেক্টরেই যুক্ত এমন কিছু বলেছিল। পরে সে আবার ফেসবুকে আবরারের আইডি চেক দিল। যেখানে লেখা ছিলো তাদের আশেপাশেরই একটা মেডিকেলের নাম যেখানে সে পড়াশোনা করেছে। আযলান নিজে একজন ডক্টর হওয়ায় মেডিকেল এবং এই লাইনের সিনিয়র-জুনিয়র সার্কেলের সাথে তার যোগাযোগ বেশ শক্ত।
সে আর দেরি না করে ড্রা’গ অ্যান্ড ফার্মেসি বিভাগের এক পরিচিত জুনিয়র ছোট ভাইকে ফোন দিল। তাকে আবরারের নাম “আবরারুল মুক্তাদির” আর ওর আনুমানিক একটা আইডিয়া দিয়ে বলল ও যেখান থেকে পাশ করেছে সেটা বলে দিল তারপর বললো, এই ছেলেটা এখন কোন এরিয়ায় বা কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে যুক্ত আছে, তার একটা খোঁজ এনে দিতে। ফেক পেজ আর এআই গল্প না পড়ে লেখিকার নামে তার পেজে পড়ুন। মেডিকেল লাইনের নেটওয়ার্ক খুব ছোট হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই জুনিয়র আযলানকে খবর দিল, আবরার এখন ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডের মোড়েই একটা বড় কর্পোরেট ফার্মেসি এবং ল্যাবরেটরি চেইনের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বরত আছে। কিন্তু সে কনফার্ম না এই আবরার ওই আবরার কি না!
ঠিকানা পেয়েই আযলান আর দেরি করলো না। সে কনফার্ম না হলেও মন বলছিল কিছু একটা পাবেই সে ওখানে। সে পরদিন সকালেই সেখানে পৌঁছে গেল।
আবরার প্রথমে আযলানকে খেয়াল করেনি। ভেবেছে কোনো পেশেন্ট। সে তার কাজ করতে করতেই ওকে জিজ্ঞেস করলো,
নূর ই মহব্বত পর্ব ৭
– জি বলুন?
আযলান এক পলক আবরারের দিকে তাকাল। ছবির সেই ছেলেটার চেয়ে এখনকার আবরার কিছুটা পরিণত, চোখে-মুখে দায়িত্ববোধের ছাপ স্পষ্ট। সে গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
– আমি ডক্টর আযলান আজওয়াদ। তোমার সাথে আমার কিছু দরকার আছে।
আবরার প্রথমে না বুঝে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আযলানকে দেখে আর নামটা মাথায় খেলে যেতেই সে চমকে দাঁড়িয়ে গেল। মুহূর্তেই চোখের দিকে তাকাতেই আবরারের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তার চোখের মণি দুটো রাগে আর ঘৃণায় ছোট হয়ে এলো। চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
– এখানে কেন আপনি? কি দরকার আপনার আমার সাথে?
– আমরা একটু বসে কথা বলি? বেশি সময় না, অনলি টেন মিনিটস! সময় নষ্ট হবে না। প্লিজ চলো আবরার!
