আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৫
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
পাহাড়ের কোল ঘেষে এঁকেবেঁকে চলা পিচ ঢালাই রাস্তাগুলো একদম ঝকঝকে। বাড়তি ধুলোবালির চিহ্ন অবধি নেই। সময় অসময়ের বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে ছাপ থাকে প্রকৃতি। শীতল আবহাওয়ায় পরিষ্কার বাতাস বুক ভরে টেনে নেওয়া যায়।
আকাশের ঘুম ভেঙেছে আজকে ভোর পাঁচটায়। ভাঙেনি যদিও, এলার্মের শব্দ জোর করে ভাঙিয়েছে আরকি। কয়েকদিন হলো বড্ড অনিয়ম চলছে শরীরের ওপর। রোজ সকালে ঘন্টাখানেক না দৌড়ালে দিনকাল বড্ড এলোমেলো লাগা শুরু করে আকাশের। বলা যায় স্বাস্থ্য সচেতন একজন পুরুষমানুষ সে। অথচ গত সাতদিনে জগিংয়ের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারেনি সে। পাশাপাশি ঘুমও নিয়মিত হচ্ছে নাই বলা যায়। এই যেমন গতরাত পুরোটা কেটেছে ল্যাপটপে খুটখাট করতে করতে। জ্বর ভর্তি শরীরে সারারাতের ক্লান্তি,মাথা ব্যাথা –পুরো যা তা অবস্থা।
দিনের আলো সবে ফুটছে। সূয্যিমামা সবে দিগন্তে মাথা উঁচিয়ে দিয়েছে। একটু একটু উত্তাপ বুঝতে পারা যাচ্ছে। কয়েকদিন হলোই এখানকার ঝড় বৃষ্টি, আবহাওয়া অধিদপ্তরের বাণি মিথ্যা প্রমান করতে মরিয়া। এই যেমন সেই দিন থেকেই বলা হচ্ছে ঝড় হবে। বৈশাখের সবচেয়ে বড় কালবৈশাখীর হানা পরবে। অথচ দিব্যি সূয্যিমামা দাঁত বের করতে হাসতে হাসতে সে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কটাক্ষ করে যাচ্ছে।
আকাশ জগিং শেষে ঘেমে নেয়ে যখন কটেজে ফিরলো তখনো কেউ ঘুম থেকেই ওঠেনি। অবশ্য আর ঘন্টাখানেকের মাথায় শিয়া উঠবে। তারপর একে একে বাকিরাও।
আকাশের আঁধার রঙা ঘরে বিছানার ওপর একটুকরো চাঁদ- শোভা বর্ধন করতে ব্যাস্ত। ঘরের পর্দাগুলো টেনে রাখা। দিনের আলো সে বেরঙের কালো পর্দা ভেদ করে কিছুতেই ঘরের ভিতরে ঢুকে পরতে পারেনি। আকাশের ঘর এই মূহুর্তে তাই রাতের মতোই অন্ধকার। শুধু ওদিকের ভেন্টিলেটর দিয়ে যে একটু আলো মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে আরকি। গোটা বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে প্রিয়া। প্রিয়ার ঘুমের এ দশার সাথে বহু আগে থেকে পরিচিত আকাশ। হাসলো দু’দিকে মাথা নেড়ে। ঝটপট শাওয়ার নিয়ে বের হলো।
এক কাপ কফির দরকার ছিলো। তবে দোটানায় পরলো, কফি খেয়ে মাথার যন্ত্রনা কমাবে? নাকি বউকে জড়িয়ে একটা শান্তির ঘুম দিয়ে যন্ত্রণা সারাবে! বুঝে উঠলো না।
আকাশ ধ্যান ধরে দাড়িয়ে রইলো কতক্ষণ। ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। এখন ঘুমালে অফিসে যাবে কখন! তারওপর গত রাতে কাজের চাপে, সাথে প্রিয়ার শরীরের কথা ভেবেও মেয়েটাকে বিরক্ত করেনি। ঘুমাতে দিয়েছে। সকাল সকাল এখন নিজের বুকের ভিতর উথাল-পাতাল শুরু হয়ে বসে আছে।
কমফোর্টার টা উঁচিয়ে আলগোছে শুয়ে পরলো আকাশ। প্রিয়ার কোমড় টেনে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। ঘুমই দরকার। নতুন বউ বিয়ের একদিন পরেই একা কটেজে রেখে অফিসে গিয়ে সে নিজে একটুও শান্তি পাবে না। তা সে দিব্যি বুঝতে পারছে।
ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠলো প্রিয়া। একে তো এসিতে ঠান্ডা লাগছে, তার ওপর শীতল একটা শরীর তার শরীরে লেপটে আসতেই ঘুম পাতলা হয়ে এলো। পিটপিট করে তাকাতেই চোখে পরলো একজোড়া গভীর দৃষ্টি গভীর ভাবে তার ওপর এই মূহুর্তে। নিভু নিভু চোখ বন্ধ করে ফেললো প্রিয়া। আরও একটু কাচুমাচু করে ঢুকে গেলো আকাশের বলিষ্ঠ শরীরের মাঝে। আকাশ মৃদু হেসে জড়িয়ে নিলো মেয়েটাকে, হাত বাড়িয়ে এসি অফ করে কমফোরটারে ঢেকে দিলো শরীর। শুকনো চুমু আকলো প্রিয়ার কপালে।
কটেজ একপ্রকার ফাঁকাই বলা চলে। সকলেই অফিসে বেড়িয়ে গিয়েছে। আকাশ প্রিয়ার বিয়ে নিয়ে দু তিনদিন অনিয়ম হয়েছে সকলেরই।
সৌমি গতকাল সন্ধ্যার ফ্লাইটে ঢাকা ব্যাক করেছে। রাকা, তুশি এ সপ্তাহ গোটাটা কাটিয়ে যাবে এখানটায়। আজকে কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজের ওখানে ওদেরও নিয়ে গিয়েছে রাকিব,রেদোয়ান। বাড়িতে বসে আকাশ প্রিয়ার মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হওয়ার থেকে ওদের নিয়ে যাওয়াই ভালো। শহরটাও ঘোরা হবে, বোরিংও লাগবে না।
এবারে ঘুম ভাঙলো প্রিয়ারই আগে। বাইরের কড়া রোদ এখন খানিকটা ঘরের আলো বাড়িয়েছে। তবে তা দেখে বেলা কত হলো, সেটা বোঝার অবস্থা হয়নি। এদিক ওদিক নিজের ফোনটাও দেখতে পেলো না। আকাশের হাতের দৃঢ় বাধন থেকে নড়েচড়ে সরাও গেলো না। বরং আকাশের ঘুমে ব্যাঘাত হলো খানিকটা।
—’ ঘুমাতে দাও। সকাল সকাল নড়াচড়া কিসের এতো?’
আকাশের ঘুম জড়ানো কন্ঠে শান্ত হয় প্রিয়া। শিরদাঁড়া ব্যাথা হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ এক ভাবে শুয়ে থাকার কারণে।
—’ উঠতে দিন। সকাল কত হয়ে গেছে কে জানে! অফিসে যাবেন না?’
—’উমমম ঘুমাও।’
প্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। খানিক মাথা উচিয়ে আকাশের মাথায় পাশ থেকে তার ফোনটা হাতে নিলো। চক্ষু ছানাবড়া হলো প্রিয়ার। বেলা বারোটা বেজে এগারো মিনিট! কি আশ্চর্য কথা। লোকটা অফিসে যাবেনা নাকি! সকাল গড়িয়ে দুপুর এখন। তাছাড়া কেউ ডাকেনি কেনো?
প্রিয়া বেশ জোর খাটিয়ে ছাড়া পেতে মরিয়া হলো। আকাশ নিভু নিভু চোখ খুলে কয়েক সেকেন্ড কপালে ভাজ ফেলে তাকিয়ে রইলো। অবশেষে বাধন আলগা করলো। প্রিয়া উঠে বসলো। তলপেট খিচে আসলো ব্যাথায়। চোখমুখ কুঁচকে এলো না চাইতেই। কাল রাতে আকাশ কাছে আসেনি, তার শরীরের কথা ভেবেই। অথচ নিজের দুর্বল শরীর এখনো অবধি ঠিক হওয়ার নাম নেই। ব্যাথায় জর্জরিত সর্বাঙ্গ।
—’ ইট স্টিল হার্টিং?’
ঝট করে পাশ ফিরলো প্রিয়া। আকাশ সোজা হয়ে শোয়া। একহাত মাথার নিচে দিয়ে, গভীর ভাবে তার দিকেই তাকিয়ে।
আকাশের আচমকা প্রশ্নে প্রিয়া দৃষ্টি সরিয়ে নতমস্তকে বিরবির করে বললো,
—’হ্যা বললে কি জাদু দিয়ে ব্যাথা কমিয়ে দেবেন?’
প্রিয়ার এলোমেলো সুদীর্ঘ বেণিটা নিচের হাতের মুঠোয় নিলো আকাশ। আলতো করে টেনে নিলো নিজের দিকে। এক হাত বিছানায় দিয়ে হেলে গেলো প্রিয়া। আকাশ ঘুমজড়ানো হাস্কিস্বরে বললো,
—’ জাদু তো জানিনা। তবে চেষ্টা করবো আর বাজে না হওয়ার। একেবারে ভদ্রলোক কিন্তু হয়ে যাওয়ার কথা বলছি না। ওই একটু ভদ্র হওয়ার কথা বলেছি আরকি। ‘
—’ আপনি আর ভদ্র? ‘
আকাশ বিষ্ময়মাখা কন্ঠে বলে উঠলো,
—’নই? আমি ভদ্রলোক?’
—’এই তার নমুনা? ‘
—‘ একদিনের আদরেই এটা বললে? বাকিজীবন তো পরেই আছে।’
—‘ খালি বাজে কথা। ‘
আকাশ হতাশা মাখা শব্দ করলো। মুখের ভাবভঙ্গিতে চরম আক্ষেপ ফুটে উঠলো। নাটকিয় শোনালো তার গলার স্বর।
—’ এটা বলতে পারলে পাখি? কাল কত কষ্টে নিজেকে সামলেছি জানা আছে তোমার? সারারাত কাজের মধ্যে ডুবে থেকেছি। ঘুমাতে বিছানায় আসিনি কার জন্য? তোমাকে যেনো কষ্ট না দিয়ে ফেলি। আর তুমি বললে আমি ভদ্র নই? দ্যাটস নট ফেয়ার!’
খিলখিল করে হেসে উঠলো প্রিয়া। আকাশের দুনিয়া থমকায় এই হাসির শব্দে। শক্তপোক্ত হৃদয়ে ঝড় তুলে দেয় এক নিমিষেই। আকাশের হাত রয়েসয়ে প্রিয়ার এলোমেলো বেণির বাধন থেকে চুলগুলোকে মুক্ত করতে ব্যাস্ত।কয়েক সেকেন্ডেড মধ্যে সিল্কি চুলগুলো বাঁধনহারা হলো। সেই চুলের সুঘ্রাণ এসে বারি দিলো আকাশের নাকেমুখে। চোখ বুঝে শ্বাস টানলো আকাশ।
—’এখন তাহলে অভদ্র হয়ে যাই একটু? আমার মুড আছে কিন্তু। রয়েসয়ে আদর করবো। করি? ‘
প্রিয়া নিজের লজ্জারুণ মুখটা ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফেরালো। ঠোঁট কামড়ে মিনমিন স্বরে বললো,
—’ অফিসে যাবেন না? বারেটার বেশি বাজে তো। অফিসে দেরি হচ্ছে না?’
আকাশ, প্রিয়ার কোমড় চেপে নিজের দিকে এনে দুরত্ব ঘোচালো এ যাত্রায়। নিচে আধশোয়া হয়ে বসলো। প্রিয়ার পিঠ এসে ঠেকলো আকাশের চওড়া শক্তপোক্ত বুকে। খোলা একরাশ চুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। সমস্যা শুরু গিয়েছে তার। মেয়েটাকে আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছে। অশান্ত হচ্ছে বুকটা। আকাশ শুকনো ঢোক গিলে হাস্কিস্বরে বললো,
—’ নতুন বিয়ে করেছি। নতুন জামাই হয়ে অফিসে যাওয়া দৃষ্টিকটু। বউটাকে মন ভরে আদর করি নাহয় কয়দিন। বাচ্চা বউ, অনেক কিছু শিখিয়ে পরিয়ে নেওয়ার একটা ব্যাপার আছে তো!’
—’ খালি নির্লজ্জ কথাবার্তা। খিদে পায়নি? আমি খিদেয় মরে যাচ্ছি। ‘
আকাশের খেয়াল হলো একই অবস্থা তার নিজেরও। খিদেয় মাথা ঝিম ধরে গেছে যেনো। এতক্ষণ খেয়াল না হলেও,খেয়াল হওয়া মাত্র উঠে বসলো। সেও সময় দেখলো। এতো বেলা হয়েছে ,বুঝতে পারেনি যদিও।
—’ ফ্রেশ হয়ে নাও। সবাই অফিসে গিয়েছে। আমি তুমিই কটেজে।’
সকাল সকাল শিয়া আর তুশি সব রান্না সেরেই বেরিয়েছে। ডায়নিং এ সব একদম সাজানো গোছানো। একেবারে দুপুরের লাঞ্চের জন্য বসেছে ওরা।
—’ সারাদিন কটেজে কি করবো? বোরিং। চলুন বের হই আজ।’
আকাশ খাবার প্লেট থেকে মুখ তুললো না। শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—’ শরীর ভালো লাগছে এখন?’
—’হুম।’
—’ব্যাথা? হাঁটতে পারবে? ‘
প্রিয়া লজ্জা পায় আকাশের এতো খোলামেলা প্রশ্নে। লোকটার তো আর লজ্জা নেই। তাই বলে কি প্রিয়ারও নেই? প্রিয়া খানিক বিরক্ত স্বরে বিরবির করলো।
—’ না পারার কি আছে! যাবেন কি-না বলুন?’
—’কোথায় যেতে চাও।’
—’যেখানে নিয়ে যাবেন।’
—’এটা তোমার এলাকা। এদিকওদিক নাড়ি নক্ষত্র সব চেনা তোমার। আমিই বরং অতিথি। এখন তো আবার এ এলাকার জামাইও। তাহলে? ঘোরাবে তো তুমি আমাকে।’
—’সে ডিরেকশন তো আমি দিতেই পারি।’
—’তাহলে বউ কোলে নিয়ে গোটা শহর আমিও ঘুরতেই পারি। ‘
প্রিয়া ঠোঁট উল্টালো। আকাশের প্লেটে আরও খানিকটা সালাদ তুলে দিতে দিতে বললো,
—’আমি বাচ্চা নাকি? কোলে নিতে হবে কেনো!’
—’ নও বাচ্চা?’
—’মোটেই না। বিবাহিত আমি এখন।’
—”এই বিয়েটা আরও একটু সময় মতো করতে পারলে গোটা চারেক বাচ্চা থাকতো তোমার কোলে। সেই উদাহরণ দিলে না? অবশ্য সে উদাহরণ এখন সত্যি করে দিতেই পারি। তুমি রাজি থাকলে।’
প্রিয়া ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝুকিয়ে রাখে। আকাশের দুষ্টু হাসি শরীরে কম্পন ধরায় তার। তবে খাবার শেষ করেও উঠতে পারে না। শব্দ করে বেজে ওঠে আকাশের ফোনটা। অয়নের কল। এই মূহুর্তে আকাশকে অফিসে না গেলেই নয়। ঘন্টাখানেকের জন্য হলেও যেতেই হবে। প্রিয়ার হাস্যজ্জল মুখটা মলিন হলো এবারে। কোথায় ভাবলো আজ সারাটাদিন পাহাড়ের মাঝে ঘোরাঘুরি করবে। তা নয়! আবার সদ্য ফাঁকা বাড়িতে একা পরে থাকতে হবে গোটাটা দিন। আকাশ বুঝতে পারছে প্রিয়ার মন খারাপের রহস্য।
—’ আমি জলদি চলে আসবো পাখি। প্রমিজ। এসেই বের হবো আমরা। কেমন?’
মাথা নাড়লো প্রিয়া। আকুল স্বরে বললো,
—’ আমার কিন্তু একা ভয় করবে। জলদি আসবেন। ‘
আকাশ অফিসে গিয়েছে ঘন্টাদুয়েক হলো। এক ঘন্টার মাথায় চলে আসার কথা থাকলেও আসতে পারেনি মানুষটা। লন্ডন থেকে এক ক্লায়েন্ট এসেছে। তার সাথে বেশ দরকারি মিটিং এ ব্যাস্ত সকলেই। ফাঁকা বিছানায় গড়াগড়ি করছে প্রিয়া। ভার্সিটির ক্লাস শুরু হবে কিছুদিনের মধ্যেই। ক্লাসটা শুরু হলে তাও একটু মানুষ জনের মধ্যে যাওয়া হবে। তা না হলে এই বদ্ধ কটেজে একা একা দম বন্ধ হয়ে আসে। সেদিন রিয়ানের ঘটানো কাহিনির পর থেকে কেমন যেনো ভয় করে আজকাল।
—’ কাল রিমির বাড়িতে যেতে যাচ্ছি। তুই একবার কথা বলে দেখিস মেয়েটার সাথে। নাকি?’
মিটিং শেষে সবাই মিলে এসে বসেছে আকাশের কেবিনে। এ বেলার দায়িত্ব সব বুঝিয়ে দিচ্ছে আকাশ। সে এখনই বাড়ি ফিরবে। প্রিয়াকে বলে এসেছে। আকাশের প্রশ্নে রাতুল কাগজপত্র ছেড়ে নাথা তুললো। আকাশ ব্যাস্ত হাতে কাগজপত্র গুলো চেক করে যাচ্ছে। রাতুল সায় দিয়ে বললো,
—’ যাবো। কিন্তু ওকে কি বলবো? বলেছিলাম হালকা। ও তো ভয়েই মরে যাচ্ছে।’
—’তাহলে থাকুক। জানানোর দরকার নেই। যা কথা হবে গিয়েই বলবো।’
—’বেশ।’
—’তুশি’রা কটেজে গিয়েছে?’
মাথা নাড়লো রাকিব, রেদোয়ান। জানালো, ওরা কটেজে যায়নি। বরং গিয়েছে শহরে। বিয়েতে প্রিয়াকে কিছু উপহার দিতে পারেনি। ওর জন্য উপহার কিনতে গিয়েছে। আকাশ ফাইলপত্র ঠেলে দিলো রাতুলের দিকে। চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর ভাবে বললো,
—’ রিয়ান কে হসপিটাল থেকে রিলিজ দিয়েছে?’
—’গত রাতে জেলে নেওয়া হয়েছে।’
—’সৌমির সাথে কথা হয়েছে?’
মাথা নাড়লো রেদোয়ান। হয়েছে কথা তার সাথে সৌমির। মেয়েটা গতকাল ফিরে গিয়েছে ঢাকাতে। রিয়ানের সাথে শেষবার দেখা করডে গিয়েছিলো হসপিটালে। রিয়ান দেখা করতে অসম্মতি দিয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো আকাশ।
—’ সৌমির মতো মেয়ে যদি পাল্টাতে পারে, রিয়ান কেনো পারছে না? সৌমির প্রতি ফিলিংস এর কথা থাকুক। কিন্তু বাচ্চাটা? সেটার কথা তো একবার ভাববে! এত অমানুষ আন্দাজ করিনি।’
আকাশের চোখমুখে রাগের সাথে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম একটা মায়া বা আক্ষেপ দৃষ্টি এড়ালো না কারোরই।
রাকিব, রেদোয়ান এর সাথে পরিচয় বা বন্ধুত্বের আরও দু বছর আগে থেকে রাতুল আর রিয়ান এর সাথে বন্ধুত্ব আকাশের। বলা যেতে পারে দীর্ঘ দুই যুগ এর বন্ধুত্ব তাদের। কিন্তু রিয়ান যা করেছে, বা ক্রমাগত করে চলেছে। ক্ষমা করতে পারবে না আকাশ। একদম না। কোনো কিছুর খাতিরেই ওই তিক্ততার সম্পর্ক জোড়া লাগাতে সে চায়না।
—’ আমি উঠবো। প্রিয়াকে বাসায় একা রেখে এসেছি। মেয়েটা ভয় পায় আজকাল একা কটেজে। তোরা সামলে নিস। কেমন? ‘
কটেজের পশ্চিমের বেলকনিতে দাঁড়ালে ওদিকে গোটা শহরের সবচাইতে সুন্দর অংশটুকু সম্ভবত দেখা যায়। অদূরে পাহাড়ের চূড়া, সবুজে সবুজে ছেয়ে থাকা সেসব পাহাড়। ভেসে যাওয়া টুকরো টুকরো মেঘ! মনে হবে কোনো এক মেঘের রাজ্যো বসবাস তাদের। হাত বাড়ালেই ছুয়ে দেওয়া যাবে সেসব মেঘ। আবার একই ভাবে সামান্য বাঁয়ের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যাবে ঘন গাছপালার বহর। কটেজের খানিক দূরেই একটা লেক। সে লেকের ওপাশ থেকে বিশাল খাদ। নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি ভাসে সে লেকের জলে। কি যে মন শান্ত করা প্রকৃতি এদিকটায়!
প্রিয়া ওই লেকের পারে গিয়েছিলো যেদিন প্রথম এই কটেজে পা রাখে। নাকি পরে আরও একবার গিয়েছিলো! খেয়াল হয়ে ওঠে না। না তো সময় করে ওদিকে যাওয়া হয়েছে আর কখনো।
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। আকাশ সেই ঘন্টাখানেকের মাথায় ফিরে আসার কথা বললেও। চার ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে, তবুও আসার নাম গন্ধ নেই।
প্রিয়া অস্থির হয়ে উঠেছে মনে মনে। দম বন্ধ লাগছে। লেকের পার ঘেষা ভৃঙ্গরাজ ফুলের কারবার। ঘন হয়ে এড়িয়ে আছে সেই জঙ্গুলে গাছপালা। আচমকা চোখে পরলো ওখানকার সেই ভৃঙ্গরাজের ঝোপের পাশে পরে থাকা একটা আহত পাখির দিকে। পাথরের ওপর পরে কাতরাচ্ছে একপ্রকার।
প্রিয়ার এই মূহুর্তে মাথা চারা দিয়ে উঠলো একটা নিষিদ্ধ ইচ্ছে। ওই লেকের পারে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। যদিও আকাশ বারংবার নিষেধ করে গিয়েছে। তবে পাখিটার অবস্থা দেখে মন সায় দিচ্ছে না একদম।
দোতলার সিড়ি বেয়ে দ্রুত পায়ে নেমে এলো প্রিয়া। মেইন দরজার চাবির গোছাটা পকেটে রেখে দরজায় লক করে ছুটলো কটেজের পিছন দিকে।
এদিকটায় হাঁটাচলার রাস্তা পাওয়া দুষ্কর। মানুষজনের পায়ের চিহ্ন এদিকটায় পরে বলে তো মনে হচ্ছে না৷ এদিকে যে এত সুন্দর একটা জায়গা আছে তা কি এখনো কেউ আবিষ্কার করেনি নাকি! অবশ্য এখানে আশেপাশের কটেজগুলোতে যারা উঠেছে তাদের সময় কোথায়! সারাদিন তো থাকেই অফিসের কাজে ডুবে।
দিনের আলো ধীরে ধীরে বিদেয় নিচ্ছে। জঙ্গলের এদিকে আলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। আধার নেমে এসেছে ইতিমধ্যেই। প্রিয়া হাঁটু সমান ঝোপঝাড় পায়ে পিষে যখন এদিকটায় পৌছালো তখনও পাখিটা কাতরাচ্ছে। প্রিয়া হাটু ভেঙে বসে পরলো। ডানায় আঘাত পেয়েছে বেচারা।
কটেজের তালাবদ্ধ দরজার সামনে চোখমুখ অন্ধকার করে দাঁড়িয়েছে আকাশ। সে চাবি নিয়ে বের হয়নি। হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি আরকি। অথচ অফিস থকে এসে দরজায় তালা দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে এলো নিমিষেই। প্রিয়া কি বেড়িয়েছে! তা না হলে…
দু’দিন আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার চিত্র মানসপটে এখনো দগদগে হয়ে আছে। সে ভয়ই কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। পইপই করে মেয়েটাকে বলা হয়েছে একা কটেজ থেকে বের না হতে। সবাই অফিসে, শুধু তাদের কটেজের নয়। আশেপাশের কটেজেও আকাশদের স্টাফরা সকলেই অফিসে গিয়েছে। এর মধ্যে মেয়েটা কথা না শুনে আবার কোন পাকনামি করেছে কে জানে!
আকাশের শরীরে ঘাম ছেড়ে দিয়েছে এরই মধ্যে। ফর্শা মুখটা লাল হয়ে আসছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ছুটে গিয়ে দাড়ালো মেইন রাস্তার ওপরে। প্রিয়ার ফোন ক্রমাগত বেজে কেটে যাচ্ছে। আবার সেইদিনের মতো ঘটনা। কথায় আছে ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আকাশের অবস্থাও এর ব্যাতিক্রম নয়। ভয় পাচ্ছে সে,ভীষন ভয় পাচ্ছে। রিয়ান জেলে থাকলেও নিলয় তালুকদার হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। সে লোক যে আবার কোনো ঝামেলা করবে না তার কি নিশ্চয়তা? কপালো আঙুল চেপে আকাশ শ্বাস নিলো জোরে জোরে। এরই মধ্যে শিয়া, অয়নকে কল করাও হয়ে গেলো তার।
রাতুলদের আবার ফোন করবে,এমন সময় শোনা গেলো কাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বর।
—’ কি মা, কি হয়েছে? খুব ব্যাথা! আমি সব ঠিক করে দেবো। কেমন?’
এতো আহ্লাদ মেয়েটা ঠিক কার সাথে করছে বুঝে এলো না আকাশ। তবে পিছন ঘুরতেই দেখলো ওদিকে কটেজের পিছনের ঝোপঝাড় ঠেলে বেরিয়ে আসছে প্রিয়া। হাতের তালুতে ওড়নার ওপর হলুদ রঙের কিছু একটাা।
চোয়াল শক্ত করে দাড়িয়ে রইলো আকাশ। গাধা একটা মেয়ে। না করা সত্বেও নেচে কুদে বেড়িয়েছেই। ছোট্ট করে মেসেজ করে সবাইকে জানালো প্রিয়া ঠিক আছে। ফোনটা পকেটে পুরে গটগট করে এগিয়ে গেলো প্রিয়ার দিকে।
আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৪
—’ দেখুন আমি কিই পেয়েছিই।’
হাতের তালু ওপর ছোট্ট একটা হলদেটে পাখির ছানা। কি পাখি নাম জানা নেই অবশ্য আকাশের। তবে প্রিয়া মহা উৎসাহের সাথে সেটা আকাশকে দেখাতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
—‘ ওই ঝোপঝাড়ে পোকামাকড়ের মধ্যে বেঁধে রেখে আসবো আর একটাবার পাকনামি করলে।’
