আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮৩+৮৪+৮৫
ফারজানা মনি
কেডা? কেডা ওই হানে ?
কুদ্দুস চাচার কণ্ঠস্বর শুনে মিমের ঘোর কাটলো। হঠাৎ করেই ভাবলো : কি করছিলাম আমি! এত বড় পাপ কি করে করতে চেয়েছিলাম!
তৎক্ষণাৎ ড্রয়িং রুমের লাইটটা জ্বলে উঠলো। মিমের বেহাল অবস্থা দেখে কুদ্দুস চাচা চিৎকার করে বললেন: বড় কর্তা, ছোট কর্তা, আবির বাবা তোমরা জলদি আহো।
মিম মামুনির মাথা খারাপ হইয়া গেছে।
কুদ্দুস চাচার চিৎকারে মুহূর্তেই নিচতলা থেকে দোতলা সকল রুমে লাইট জ্বলে উঠলো।
সবাই হন্ততন্ত হয়ে বাহিরে বের হলো। মিমকে দেখে ছুটে গেল সবাই সেদিকে।
সবাই সব জেনে গেছে, সবার এত প্রশ্ন, আরিফকে না পাওয়ার বেদনা সবকিছু ভেবে মিম আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ল ফ্লোরে।
তানভীর, আবির ছুটে গিয়ে মিমকে ধরল। কিন্তু এতক্ষণে ফ্লোরে পরে অজ্ঞান হয়ে গেছে। মেঘ তাড়াহুড়া করে পানি নিয়ে আসলো। বন্যা সেই পানি ছিটিয়ে দিল মিমের মুখে।
আলী আহমেদ খান গম্ভীর মুখে বললেন: আবির.. মিমকে উঠিয়ে সোফায় শুয়ে দাও।
আবির মিমের দিকে তাকায়—চেহারায় মায়া, কিন্তু শান্ত।
দীর্ঘ এক ঘন্টা পর…
মিম ধীরে ধীরে চোখ খুলল। দেখল ও সোফায় শুয়ে আছে। পাশেই দাড়িয়ে আছে আবির, তানভীর, মেঘ,বন্যা। একটু দূরে পাগলের মত বসে আছে তার মমতাময়ী মা আকলিমা খান। তাকে ঘিরে বসে আছে মালিহা খান ও হালিমা খান। আরেকটা বড় সোফাতে গম্ভীর মুখ নিয়ে বসে আছে, আলী আহমেদ খান ও মোজাম্মেল খান।
মিম আস্তে আস্তে উঠে বসল। দেখলো দূরে এক কোনায় অস্থির কিন্তু অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে আরিফ।
আরিফকে দেখে মিম যেন ছটফট করে উঠল।
আবির ধীরে ধীরে বলল—
“তোমার কিছু বলার আছে?”
মিম ফিসফিস করে বলে—
“ভাইয়া, আমি পারছি না আর… আমি আরিফ ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারব না। আমি সত্যিই ভালোবাসি ওকে। আমি কিছু করব না, কসম… কিন্তু প্লিজ… আমাকে কোথাও পাঠিয়ে দিও না।”
বলতে বলতে মিমের কন্ঠ যেন ভেঙে আসছে।
আবির মিমের মাথায় হাত রাখে। চোখ ভিজে আসে তারও। তারপর বলল
“তোমার আর কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই মিম।”
“তোমার বিয়েটা যার সাথে ঠিক হয়েছে, তার নাম আরিফ।”
মিম থমকে যায়।
চোখ বড় হয়ে যায়। ঠোঁট কাঁপে— কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বললো
“কি বললে ভাইয়া…?”
আবির হেসে বলে—
“তোমার ভালোবাসা আজ আমাদের জয় করল। তুমি পেরেছ মিম। তুমি পেরেছ।”
মিম স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই প্রথম, সেই চোখে আনন্দের জল।
তারপর মিম প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো আবিরের দিকে। আবির বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ালো।
মেঘ পাশে এসে দাঁড়িয়ে আবিরের এক হাত ধরে বলল: আহিয়ার আব্বু.. এবার তো অন্তত সবটা খুলে বলুন। আপনি আমাদের সবাইকে বলেছেন, আপনারা যা করছেন মিমের ভালোর জন্যই করছেন। আপনাদের ভরসায় আমরা বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু এবার সবকিছু জানতে ইচ্ছা হচ্ছে। দয়া করে আমাদের সবকিছুই স্পষ্ট করে বলুন।
আবির আস্তে ধীরে বলা শুরু করলো।
(১সপ্তাহ আগের ফ্ল্যাশব্যাক)
🕰 সময় : ২৫ জুন, বিকেল ৫টা
স্থান: আলী আহমেদ খানের অফিসের কনফারেন্স রুম।
রুমের মধ্যে বসে আছেন তিন কর্তা—
আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান, আর ইকবাল খান। আর তাদের সামনে বসে আছে আবির ও তানভীর।
আরেক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ—চোখে ভয়, তবুও সাহসী— সে হলো আরিফ।
আলহাদী বাতির নিচে আলোটা কিছুটা ম্লান, রুমে তৈরি হয়েছে একটা থমথমে পরিবেশ।
আলী আহমেদ খান ধীর গলায় বললেন —
“তুমি বলছো, তুমি আর মিম—পাঁচ বছর ধরে একসাথে আছো?”
আরিফ মাথা নিচু করে বলল—
“জ্বি, মামা। আমি ওকে ভালোবাসি। আজ না, অনেকদিন ধরে। আমি ওকে হারাতে চাই না।”
আলী আহমেদ খান মুখ শক্ত করে বললেন—
“ভালোবাসা অনেকেই দাবি করে। কিন্তু দায়িত্ব নিতে পারা, কষ্টের দিনে পাশে থাকা, চুপ করে থেকেও ভালোবাসা বোঝাতে পারা—এসব কি তুমি জানো আরিফ?”
আরিফ মাথা তুলল। সাহসের সঙ্গে বলল:
“আমি জানি। আর মিমের মুখে কিছু না শুনেও আমি তার চোখে সেই ভালোবাসা প্রতিদিন দেখেছি।”
তখনই আবির বলল: আব্বু, আমি বলছি আরিফ সত্যিই মিমকে ভালোবাসে। আরিফের হাতে মিমকে তুলে দিলে আমাদের মিম ভালো থাকবে।
আলী আহমেদ খান শক্ত কণ্ঠে বললেন: তুমি চুপ থাকো। খান বাড়ির পাঁচ ছেলে-মেয়ে খান বাড়ির পাঁচ রত্ন। এই রত্ন আমি যার তার হাতে তুলে দিতে পারি না। আমার পাচ রত্নের মধ্যে একজন হল মেঘ। আর তুমি নিজেই জানো কত কঠিন পরীক্ষার পর আমি তাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। আমি সর্বদা ই তাদের সুখ নিশ্চিত করতে চাই।
আবির থমথমে মুখে ইকবাল খানের দিকে তাকালো।
এবার ইকবাল খান মুখ খুললেন। বললেন: দেখ আবির মেয়েটা আমার হতে পারে, কিন্তু সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ভাইজানের। তাই আমি তার বিরুদ্ধে যেতে পারবো না। ভাইজান যেভাবে চায় সেভাবেই সবকিছু হবে।
আবির হতাশ দৃষ্টিতে আলী আহমেদ খানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: তাহলে আপনি কি চান আব্বু, দুটো ভালোবাসার মানুষ আলাদা হয়ে যাক?
আলী আহমেদ খান বললেন —
যদি সত্যি সত্যি দুজন দুজনকে ভালোবাসে তাহলে তারা কখনোই আলাদা হবে না । মিম ছোট মানুষ। হতে পারে এটা তার আবেগ। তাছাড়া আরিফ মিমের যোগ্য কিনা তা নিয়েও আমার মনে প্রশ্ন থেকে যায়।
আলী আহমেদ খানের কথা শুনে আবির বলল: মানে! আপনি কি বলতে চান দয়া করে স্পষ্ট করে বলুন।
আলী আহমেদ খান বললেন: ওদের দুজনকে ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে হবে।
আবির ব্রু কুচকে জবাব দিল— আব্বু.. ভালোবাসা কি পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করা যায়? ভালোবাসা হলো মনের ব্যাপার।
আলি আহমেদ খান বললেন: ওরা দুজন দুজনকে যদি সত্যিকারের ভালোবেসে থাকে তাহলে তোমার এত ভয় কিসের?
এসব শুনে পাশ থেকে আরিফ বলে উঠলো: মামা, মিমের জন্য আমি যে কোন পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত। আপনি বলুন আমাকে কি করতে হবে।
আলী আহমেদ খান একনাগাড়ে বলে যায়:
> “আগামী ৪ জুলাই মিমের বিয়ে ঠিক হবে। তবে তাকে জানানো হবে না, পাত্র কে।
যদি সে নিজে থেকেই জানিয়ে দেয় যে সে কাউকে ভালোবাসে, বিয়েতে রাজি না হয়, অথবা নিজের ভালোবাসা আমাদের সামনে প্রকাশ করার জন্য পাগলামি করে—
তাহলে প্রমাণ হবে, সে শুধু আবেগ নয়, সত্যিকারের ভালোবাসে।
আর যদি মুখ বুজে বিয়েতে রাজি হয়—তবে বুঝব, তার অনুভূতি টিকে নেই।
তখন পরিবার যে পাত্র ঠিক করবে, তার সাথেই হবে বিয়ে।”
ঘরে নীরবতা।
মোজাম্মেল খান ব্রু কুঁচকে বললেন —
“আর যদি সে ভেঙে পড়ে? মানসিকভাবে সহ্য না করতে পারে?”
আবির দৃঢ় গলায় বলল —
“আমি তাকে চিনি চাচ্চু। সে দুর্বল না। সে রক্তে খান পরিবারের মেয়ে।
ভালোবাসা ছিঁড়ে ফেলার মেয়ে সে না।”
আলী আহমেদ খান চুপ করে আবিরের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নাড়েন।
“ঠিক আছে আবির। প্রমাণ কর।
যদি সত্যিই মিম এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়—
আমি নিজে হাতে আরিফ আর মিমের বিয়ে দিব।”
আরিফ নিঃশ্বাস ফেলে, চোখ বন্ধ করে।
কনফারেন্স রুম থেকে বের হতেই আবির আরিফের কাঁধে হাত রেখে বলল:
— “সব ঠিক। এবার থেকে তুই দূরে থাকবি ওর থেকে। ওকে বুঝিয়ে দিস না। এমন ভাব দেখাবি যেন তুই আর কিছু চাস না।”
আরিফ চুপ।
আবির আবার বলল:
— “পারবি তো?”
আরিফ ধীরে বলল—
“ভালোবাসা যদি পরীক্ষা হয়, তাহলে আমি প্রশ্নপত্র হই… আর মিম হোক উত্তর।
শুধু দোয়া করো, উত্তরটা যেন সঠিক হয়।”
তারপর আরিফ মনে মনে মিম এর উদ্দেশ্যে বলল:
“মিম, তুমি জানো না .. কি কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
তবে আমি জানি—তুমি পারবে।”
আবির আস্তে আস্তে বর্তমানে ফিরে আসলো। ড্রয়িং রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা। এত কঠিন পরীক্ষার কথা শুনে সবাই তো হা হয়ে গেল।
আবির যখন তার কথা শেষ করল, পুরো ঘর নিঃশব্দ।
সবাই স্থির। কিছুটা শূন্য।
কিন্তু একসময়…
মিম উঠে দাঁড়ালো।
চোখে জলের রেখা, গলা কাঁপছে, তবু কণ্ঠে জেদ…
সে তাকিয়ে আছে পরিবারের সবার দিকে।
এক এক করে… যেন সবার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—
> “তোমরা সবাই বলছো এটা একটা ভালোবাসার পরীক্ষা ছিল… কিন্তু কেউ একবারও আমার সঙ্গে কথা বলেনি!
কেউ জানতে চায়নি আমি কেমন আছি…
কেউ জিজ্ঞেস করেনি আমি কি চাই।
তার কণ্ঠ ক্রমশ ভাঙতে লাগল—
> “তোমরা সবাই শুধু প্ল্যান করেছো… ঠাণ্ডা মাথায় আমার জীবনটা একটা খেলায় পরিণত করেছো।
কারো চোখে পড়েনি, আমি কতটা ভেঙে পড়ছিলাম…
রাতে ঘুম হতো না, দিনের আলো অসহ্য লাগত।
অথচ আমি তো ছিলাম… এই বাড়িরই… সবারই প্রিয়…
তাহলে আমাকে বোঝার কেউ ছিল না কেন?”
সবাই স্তব্ধ।
আকলিমা খান কান্না চেপে ধরে বসে আছেন।
মিম আরও বলল—
> “আরিফ চলে গিয়েছিল, সবাই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল,
বিয়ে ঠিক হয়েছে… অথচ আমাকেই কিছু বলা হয়নি।
আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা—তোমরা সবাই মিলে ঠিক করলে,
অথচ সেখানে আমি ছিলামই না!”
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে… সে বলল—
> “তোমরা বলো এটা ভালোবাসার পরীক্ষা ছিল…
কিন্তু আমি তো শুধু ভালোবাসিনি…
আমি আমার আত্মা দিয়ে আরিফকে চেয়েছি…
আর তবুও… তোমাদের প্রমাণ দিতে হয়েছে?”
তারপর মিম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে।
সবাই চুপ।
আবির এক নিঃশ্বাস ফেলে আরিফের দিকে তাকালো।
এবার আরিফ ও টলোমলো চোখ নিয়ে তাকালো আবিরের দিকে।
আবির একবার মাথা হেলিয়ে ইশারা দিল।
চোখে একটাই কথা— “এবার তুই যা।”
আরিফ দাঁড়িয়ে থাকল।
সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো আলী আহমেদ খানের দিকে।
চোখে এক বিনয়ের আবেদন।
আলী আহমেদ খান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বললো: যাও, উপরে গিয়ে দেখো মেয়েটার রাগ কমাতে পারো কিনা। হয়তো রাগে একটু পর এসে বলবে সে বিয়েটা করতেই চায় না।
আরিফ আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সে ছুটে গেল সিঁড়ি বেয়ে… মিমের রুমের দিকে।
ঘরটা একেবারে নিস্তব্ধ।
মিম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে, চোখের জল মুছছে বারবার।
আরিফ আস্তে আস্তে রুমে ঢুকলো।
মিম পিছন ফিরে তাকাল না, কিন্তু বুঝে গেল কে এসেছে।
আরিফ নিচু গলায় বলল—
“তুমি জানো না মিম, আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম।
ভেবেছিলাম তুমি পারবে না। ভেবেছিলাম… তোমাকে হারাব।”
মিম কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
আরিফ কাঁপা কাঁপা হাতে মিমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আজ তার নিজেকে একজন অপরাধী লাগছে।
আরিফের ছোঁয়ায় মিমের রাগ যেন বরফের মত গলতে শুরু করল।
মিম পেছনে ফিরে আরিফের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর হঠাৎ ঝাপিয়ে করল আরিফের বুকে। হাউমাউ করে কেদে দিল।
আরিফও শক্ত বাহুতে জড়িয়ে নিল তার জান পাখিকে।
মিম কাঁপা গলায় বলল—
” তুমি জানো না, কতোটা ভেঙে পড়েছিলাম।
তোমার সেই চুপ করে থাকা… আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছিল…”
আমি ভাবতাম, তুমি চলে গেছো… চিরতরে।”
আরিফ ধীরে ধীরে মিমের কাঁপা হাতটা ধরল।
“তুমি জানো, আমার কণ্ঠে একটাও শব্দ ছিল না।
কারণ… শব্দ আসলে মিথ্যে হয়ে যেতো।
আমি চুপ করে ছিলাম—তোমার ভালোবাসা যেন নিজেই জবাব দেয়।”
মিম আবারো শিশুর মত মুখ গুঁজে দেয় আরিফের বুকে।
“তুমি জানো না… আমি কত কেঁদেছি…
কত রাত ব্যালকনির কাছে দাঁড়িয়ে ভেবেছি—
তুমি হঠাৎ এসে বলবে, ‘চলো মিম, পালাই!’
কিন্তু তুমি আসোনি… কিছুই বলোনি…”
আরিফ ফিসফিস করে বলল—
“আমি বলিনি, কারণ আমি চাইনি তুমি পালাও…
আমি চেয়ে ছিলাম তুমি লড়ো… যুদ্ধ করো তোমার ভালোবাসার জন্য…
আর তুমি পেরেছো মিম। তুমি জিতে গেছো।
তোমার ভালোবাসা হারেনি…
আমিও হারাইনি… আমরা… জিতেছি।”
মিম হালকা হেসে বলল—
“আমরা না… আমাদের ভালোবাসা জিতেছে।”
আরিফ মিমের কপালে চুমু দিয়ে বলল—
“আজ থেকে শুধু তুমি আর আমি।
কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো চোখে জল নেই।
শুধু আমরা… আমৃত্যু একসাথে…”
কোনো আবহ সঙ্গীত ছিল না, তবু ঘরের বাতাস যেন দুলে উঠল এক অদৃশ্য সুরে।
এই প্রথম, তারা সত্যিকার অর্থেই একসাথে।
মঙ্গলবার সকাল।
স্পেরো ড্রিম হাউসে আজ অদ্ভুত এক আমেজ।
আকাশ মেঘলা, হালকা রোদ্দুরে আলো ঝলমল পুরো বাড়ি।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে? একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড!
দরজায় টুং টাং বেল বাজতেই কুদ্দুস চাচা দরজা খুলে দেখলেন—
সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীমের নানীর বাড়ির আত্মীয়রা।
খালাতো বোন: ফাইজা, সানজিদা, তানিয়া
মামাতো বোন: পুতুল, আয়ুশী, সুমাইয়া,
আর সাথে এসেছে দুই ভাই:
সজল আর জিয়াউল— দুইজনই মামাতো ভাই, মজা করতে করতে ঢুকছে। রনির সাথে হাত ধরে আসছে প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কা হল রনির বউ অর্থাৎ মিমের ভাবি।
সানজিদা বলল,
“এই বাড়িটা তো একদম সিনেমার মত! মিম আপু কই?”
সবাই হেসে উঠল।
বাড়ির ভেতরে তখন শুরু হয়ে গেছে নাচের মহড়া।
আলাদা রুমে সাউন্ড সিস্টেম চালু।
আর একে একে এসে পৌঁছাল মীমের বান্ধবীরা—
কয়েকজন হল টিম লিডার। রাজিয়ার টিমে নাচের প্র্যাকটিস করছে নুসরাত, ফারিন, ফারিয়া, মারিয়া, মিমি, সুবহা, জাকিয়া, সিদরা, সুমাইয়া, মুন্নি ,জুই ,মুসকান ও প্রমি।
তামান্নার টিমে নাচের প্র্যাকটিস করছে: এনি, আখি, পিংকি ,তৌফা, চাঁদনী ,ইমা, রাবেয়া, ফারজানা ,নাদিয়া, সায়মা, রুমি ও ঝিলিক।
আর খাদিজার টিমে নাচের প্র্যাকটিস করছে: ইরা, সানজিদা, লিসা, সায়মা ,নিশি, ওমি ,অন্তরা ও আনিসা।
ঋষিতা।
আর শেষে এসে যোগ দিলো আরও কয়েক জন বিশেষ বান্ধবী, যারা গান গাইবে:
তারা হলো: সামিয়া, তাসলিমা, তাইবা, নাফিজা, অনন্যা, রুম্পা ,নিপা মনি ,উশ্মি, তমা, সুরভী ,কেয়া ও ফাইজা।
একপাশে মীম বসে মেহেদির ডিজাইন দেখছে।
প্রিথা হেসে বলল,
“এই মেহেদিতে আরিফ ভাইয়ের নাম লুকিয়ে দেব, বুঝলি?”
মিম এক গাল হেসে বলল:
“ও বুঝবে তো?”
মারজিয়া হেসে ফেলে বলল:
“ বুঝতে পারে কিনা সেটাই তো দেখার পালা?”
একদিকে আবির, তানভীর, রাকিব, রাসেল, মোবারক, সাকিব সবাই ব্যস্ত বাড়ির ক্যাটারিং এর কাজ নিয়ে। সবাই চারদিকে সব খেয়াল রাখছে সব ঠিক আছে কিনা। কোন কিছু যেন কমতি না হয়।
আর অন্যদিকে প্রস্তুতি এগিয়ে যাচ্ছে আরিফের বাড়িতেও। মেহেন্দি অনুষ্ঠান ও হলুদ সন্ধ্যা অনুষ্ঠান ছেলে ও মেয়ের একসাথে হবে স্পেরো ড্রিম হাউসে। আর বাকি সকল অনুষ্ঠান আরিফের নিজের বাড়িতেই হবে।
প্রচন্ড ব্যস্ততার মাঝে কেটে গেল আরিফ ও মিমের পরিবারের আরেকটা দিন।
ঘনিয়ে এলো সেই কাঙ্খিত দিন।
হুম আজ বুধবার
মিমের মেহেন্দি নাইট।
সন্ধ্যা নামে স্পেরো ড্রিম হাউসে।
চারদিক ঝলমলে আলোয় সেজেছে বাড়ি। রঙিন ঝালর, ফুলের মালা, শাড়ির কাপড়ে মোড়ানো গাছ, ঘর— সবকিছু যেন এক স্বপ্নপুরী!
🎉 মেহেদী অনুষ্ঠান শুরু হবার আগে থেকেই একের পর এক গাড়ি এসে থামছে গেটের সামনে। মিমের আত্মীয়স্বজনেরা এসে পৌঁছেছেন।
নানীর বাড়ির দিক থেকে আরো এসেছে— তানহা, রোজা, আরিশা ,মেহরিমা, ইফসা, মাহি ,পুষ্প, ইসরাত, সুভা ও ফাতেমা।ওরা সবাই পরেছে গাঢ় কমলা ও গোলাপি রঙা শাড়ি। সাথে এসেছে দুই কাজিন ভাই: ওয়াহিদ শিকদার ও ফাহিম ভূঁইয়া, পরেছে গাঢ় পিঙ্ক পাঞ্জাবি।
খান পরিবার দাঁড়িয়ে রিসিভ করছে অতিথিদের।
আবির, মেঘ, তানভীর, বন্যা সবাই অভ্যর্থনা করছে হাসিমুখে।
ঠিক তখনই এলো বরপক্ষ!
আরিফের পরিবার— মাহমুদা খান শাড়ি পরে নেমেছেন মার্জিত চেহারায়। বাবার গাম্ভীর্য যেন আলাদা।
বড় ভাই আসিফ আর ভাবি জান্নাত একসাথে হাঁটছেন।
আর ছোট বোন আইরিন দুষ্টু চোখে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
ছেলেরা— আসিফ, আরিফ, আবির, তানভীর— সবাই পরেছে মেহেদি পাতার রঙা পাঞ্জাবি, আর অন্যরা পরেছে গাঢ় গোলাপি রঙা পাঞ্জাবি।
এখন পুরো বাড়ি জমজমাট!
হঠাৎ মিউজিক শুরু হলো—
🎶 “Desi girl… desi girl… sabki favourite desi girl…” 🎶
স্টেজের একদিকে নাচ করছে মেঘ, বন্যা, আইরিন ও জান্নাত। তাদের পিছনে ৫ জন ছেলে ফুলের মালার ছাউনি ধরে রেখেছে। সেই ছাউনির নিচে মিম।
গা ভর্তি গাঢ় সবুজ মেহেদি লেহেঙ্গা, মাথায় ফুলের টিকলি। মুখে ঝলমলে হাসি।
আরিফ উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।
মিম একটু থেমে, চোখ তুলে তাকিয়ে, সেই হাতটা ধরলো হাসিমুখে।
আজ মিমের মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। সম্পূর্ণ ভালোবাসা আর পূর্ণতার ছোঁয়া।
“লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, শুরু হচ্ছে আজকের মোস্ট ওয়েটেড মেহেদী নাইট প্রতিযোগিতা!”
— বলে আইরিন মাইক তুলে নিল।
প্রতিযোগিতা: মেয়ে বনাম ছেলে পক্ষ
প্রথম স্টেজে উঠল—
👯♀️ লামিয়া ও জাকিয়া
🎶 “Radha on the dance floor… Radha likes to party…”
তাদের স্পার্কলিং পারফরম্যান্সে হাততালি পড়ে গেল।
তারপর মঞ্চে এল—
👦 জাহিদুল ও হাবিব
🎶 “Shava shava… khush rehne ka tumko hai daava…”
ছেলেরা যেন রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল!
এরপর একে একে—
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮০+৮১+৮২
👯♀️ আরোহী ও নুসরাত
🎶 “Dola re dola re dola re… dil dola re…”
তাল মিলিয়ে ঘূর্ণায়মান শাড়ি আর মুখে হাসি— পুরো স্টেজ কাঁপিয়ে দিল।
