হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৪
সাবা খান
ভোরের প্রথম প্রহর তখন ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে তার কোমল আলোর আঁচল বিছিয়ে দিচ্ছে। পূর্বাকাশে সূর্য এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, তবু তার সোনালি আভা দিগন্তরেখার গায়ে লেগে এক অপার্থিব রঙের সৃষ্টি করেছে। নদীর জলরাশি সেই আলোকে নিজের বুকে ধারণ করে কখনো সোনালি, কখনো রুপালি, আবার কখনো হালকা নীলচে বর্ণে ঝলমল করে উঠছে। সেই নদীর ধারে, ভেজা ঘাসের উপর নীরবে বসে আছে সিতারা আদিল।
রমণীর গায়ে জড়ানো হালকা রঙের উলের শালটা সকালের বাতাসে বারবার কেঁপে উঠছে। মুখে কোনো প্রসাধনী নেই, নেই চোখে কোনো উজ্জ্বলতা। বরং তার চেহারার প্রতিটি রেখায় যেন জমাট বেঁধে আছে এক অদৃশ্য ক্লান্তি। সকালটা এত সুন্দর, এত নির্মল, অথচ সেই সৌন্দর্যের সামান্যতম ছোঁয়াও যেন তার হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নদীর বুকে। কেন জানি আজ নদীটার সঙ্গে নিজের জীবনের অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাচ্ছে সে।
নদীও তো একা, চারপাশে হাজারো মানুষ, হাজারো প্রাণ, হাজারো গল্প থাকলেও শেষ পর্যন্ত সে নিজের স্রোত নিয়েই বেঁচে থাকে। সিতারার জীবনটাও কি তেমন নয়?
তেমনি তো, মানুষে ভরা পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও কখনো কখনো সে নিজেকে ভীষণ একা অনুভব করে। এমন এক নিঃসঙ্গতা, যার কোনো শব্দ নেই, কোনো রং নেই, অথচ যার ভারে বুকটা ধীরে ধীরে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে সেই স্বার্থপর মামব জেনেও তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। আর সেই কারণেই হয়তো যখনই তার মনটা খুব ভারী হয়ে ওঠে, যখনই পৃথিবীটাকে অসহনীয় মনে হয়, তখনই সে এই নদীর কাছে চলে আসে।
সিতারা ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের সামনে নদী বয়ে চলেছে, অথচ তার মন ভেসে যাচ্ছে বহু দূরে, বহু পেছনে। হঠাৎ এক ঝটকা ঠান্ডা হাওয়া এসে তার গাল ছুঁয়ে গেল। সে কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে শালটা আরেকটু শক্ত করে নিজের শরীরের চারপাশে জড়িয়ে নিল। আর ঠিক তখনই তার মানসপটে ভেসে উঠল সেই রাতের স্মৃতি। সেই রাত…যেদিন আচমকা পিছন থেকে তার কাঁধে কেউ হাত রেখেছিল তালহা। নিজের ভাইকে দেখে জীবনে প্রথমবারের মতো নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে নি। ভাইকে জড়িয়ে ধরেই কেঁদেছিল প্রচুর। তালহা তার মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে সারহাদের পিছনে যেতে বলেছিল। সিতারা বেশ অবাক হয়েছিল বটে কেননা তালহা আরজে বা সারহাদ কাওকেই স্বচক্ষে দেখতে পারে না। তার মতে ভুল করেই হোক দুজনেই অপরাধী আর তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ খুঁজে ফেলেই সে এক মুহূর্ত দেরি করবে না এরেস্ট করতে। আর ঐদিন সেই তালহাই একমাত্র বোনের চোখের জলের সামনে অসহায় হয়ে নিজের সমস্ত ঘৃণা কে ভুলে তাকে ঠেলে দিয়েছিল সারহাদের দিকে।
সিতারা গিয়েছিল, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিল সে।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে সে দেখেছিল সম্পূর্ণ খালি, নিস্তব্ধ এক বিমানবন্দর। না কোনো মানুষের কোলাহল, না কোনো পরিচিত মুখ, না কোনো অপেক্ষা, শুধু ছিল একরাশ শূন্যতা। ঠিক তার জীবনের মতো। আরেকটি ঠান্ডা হাওয়া এসে তার মুখে আছড়ে পড়তেই স্মৃতির ঘোর ভেঙে গেল। সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। আজকের দিনটার কথা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠে।
আজ তাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। তার নিরামিষ, জেদি, অনুভূতিহীন ভাইটাকে অবশেষে একটা ডেটে পাঠাতে হবে। ভাবতেই হাসি খেল গেল তার ঠোঁটে। তালহাকে রাজি করাতে তাকে যে কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয়েছে, সেটা সে নিজেই জানে। প্রথমে তো কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিল না। তার নাকি রাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশন আছে। দেশ, দায়িত্ব, মিশন এসবের বাইরে মানুষটার যেন আর কোনো জীবনই নেই। শেষ পর্যন্ত বহু অনুনয় বিনয়, তর্ক বিতর্ক আর আবেগী ব্ল্যাকমেইলের পর সে রাজি হয়েছে, তাও রাত নয় সকাল, একটা সাধারণ সকালের ব্রেকফাস্ট। যেখানে তালহা আর রত্না অন্তত কিছুক্ষণ একসাথে বসে কথা বলতে পারবে। একজন আরেকজনকে বুঝতে পারবে। আর রত্নাকেও সে এখনও পুরো সত্যিটা বলেনি। শুধু বলেছে, তার সঙ্গে একজন স্পেশাল গেস্ট থাকবে।
ভাবতেই সিতারার হাসিটা আরেকটু গভীর হলো। সম্ভবত জীবনে প্রথমবারের মতো সে নিজের জন্য নয়, অন্য কারও ভবিষ্যতের জন্য এতটা ব্যস্ত, সম্ভবত এটাই তার শেষ বড় দায়িত্ব। তার ভাইয়ের জীবনটা গুছিয়ে দেওয়া। তারপর…তারপর কী হবে, সে জানে না। হয়তো সে নিজের মতো করে বাঁচবে, হয়তো হারিয়ে যাবে কোনো অজানা পথে, হয়তো আবারও ফিরে আসবে এই নদীর ধারে। কে জানে?
সিতারা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সে শেষবারের মতো নদীটার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
—”আমারও একটু শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে… খোলা আকাশের নিচে… নিজের মতো করে”
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা নেমে এলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে সেটাকে আড়াল করে ফেলল। মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।
সকাল গড়াতেই আবারও জেগে উঠেছে ব্ল্যাক ম্যানশন। গত রাতের মেহেদির সমস্ত সাজসজ্জাকে যেন নতুন করে জন্ম দেওয়া হচ্ছে আজ। রাতারাতি বদলে যেতে শুরু করেছে পুরো প্রাসাদের রূপ। গতকালের সবুজ আর সোনালি আবহ সরিয়ে আজ চারদিক রাঙানো হচ্ছে হলুদ আর লালের উৎসবী বর্ণে। বিশাল বাগানজুড়ে টাঙানো হচ্ছে গাঁদা ফুলের মালা। লাল গোলাপ আর হলুদ গাঁদার মিশ্রণে তৈরি করা হচ্ছে বিশাল বিশাল ফ্লোরাল আর্চ। ফোয়ারার চারপাশ জুড়ে ভাসানো হচ্ছে হাজারো ফুলের পাপড়ি। মাটির ছোট ছোট প্রদীপগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে রাতের অপেক্ষায়। বাগানের মাঝখানে নির্মাণ করা হচ্ছে সুবিশাল হলুদ-মঞ্চ। মঞ্চের পেছনে ঝুলছে লক্ষ লক্ষ গাঁদা ফুলের ঝাড়, যেন সোনালি ঝর্ণাধারা নেমে এসেছে আকাশ থেকে।
চারপাশে শত শত কর্মচারী, ডিজাইনার, ডেকোরেটর আর কেয়ারটেকার ছুটে বেড়াচ্ছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ লাইট বসাচ্ছে, কেউ আবার মঞ্চের শেষ মুহূর্তের কাজগুলো সম্পন্ন করছে। এই সমস্ত বিশাল আয়োজনের কেন্দ্রে আজও দাঁড়িয়ে আছেন খুশদিল ফারুকী। আজকের পুরো হলুদের দায়িত্ব তার কাঁধে। কিন্তু বাস্তবে তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যেন আর কোনো ডেকোরেশন নয় বরং এসপিকে ভেন্যুর আশেপাশে ঘেঁষতে না দেওয়া। সকাল থেকে তিনবার ছেলেটার সাথে ছোটখাটো যুদ্ধ হয়ে গেছে। প্রতিবারই সে ধরা দিতে দিতে অদৃশ্য হয়ে গেছে। যার ফলাফল হলো, এই মুহূর্তে খুশদিল ফারুকীর মুখের অবস্থা এমন যেন পৃথিবীর সমস্ত ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু তিনি জানেন না তার খোঁজা মানুষটি ঠিক এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে ব্ল্যাক ম্যানশনের ছাদের এক কোণায়। উপরে দাঁড়িয়ে এসপি নিচের দৃশ্য দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে। খুশদিল ফারুকীকে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে দেখে তার হাসি আরও চওড়া হয়ে ওঠে। তবে বেশিক্ষণ নয়, পরক্ষণেই সে পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও কল দেয়। দুবার কল হওয়ার পর ফোন রিসিভ হতেই মুহূর্তেই স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে সারহাদের শ্যদমবর্ণ আদল। আর এসপিকে দেখেই সারহাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। এসপিও ঠোঁটে হাসি টেনে আওড়ায়,
—”হোয়াট’স আপ, ব্রো?
কখন আসছো তুমি বিডিতে?”
বিপরীতে সারহাদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে প্রতুত্ত্যর করে,
—”এসপি আমি…..”
সারহাদ আর বাকিটা বলার আগেই এসপি হাত তুলে থামিয়ে দিল কেননা সে জানে সারহাদ বাকিটা কি বলতে পারে। এসপি কিছুটা অভিযোগের সুরে বলে,
—”ব্রো, এবার কিন্তু আমি তোমার কোন কথাই শুনব না। তুমি আমার প্রথম বিয়েতে ছিলে না, ওকে। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েতেও থাকবে না, এটা হবে না। সত্যি করে বলো, তুমি কি আমাকে ভাই মানো তো?”
রুক্ষ স্বরে গর্জে উঠে সারহাদ,
—”এসপি…”
কিন্তু আজ আর এসপি তার ভাইয়ের রাগের সামনে মাথা নোয়াল না বরং জেদ ধরে বলল,
—”না, আজ উত্তর দিতে হবে’
সারহাদ নিজের রাগ সামলে হেসে মাথা নাড়ে,
—”আমার কালকে ইম্পর্ট্যান্ট মিটিংয়ে আছে”
—”মিটিং, মিটিং, মিটিং, পৃথিবীর সব মিটিং কি তোমার একার?”
—”অনেক গুরুত্বপূর্ণ….”
—”আমার বিয়ের থেকে গুরুত্বপূর্ণ?”
—”এসপি…”
—”না, এবার কোনো অজুহাত চলবে না”
সারহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছোট ভাইয়ের জেদের সামনে অবশেষে হার মানল,
—”আচ্ছা, আমি চেষ্টা করব”
—”চেষ্টা না, আসতেই হবে”
—”ওকে”
সারহাদ রাজি হতেই মুহূর্তেই এসপির মুখে শিশুসুলভ উজ্জ্বলতা নেমে আসে। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শুধালো,
—”লাভ ইউ, ব্রো…আর হ্যাঁ, আমি মেহেদীর সব ছবি পাঠাচ্ছি তোমাকে। তুমি তো মিস করে গেলে”
সারহাদ মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে ফোন কেটে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর একের পর এক ছবি এসে জমা হতে শুরু করে সারহাদের ফোনে। কালকের মেহেদির ছবি, সাজসজ্জার ছবি। সারহাদ নিঃশব্দে ছবিগুলো স্ক্রল করতে থাকে একটার পর একটা।
কিন্তু হঠাৎ আচমকা তার আঙুল থেমে যায় একটি ছবির উপর। সে ধীরে ধীরে ছবিটা জুম করে। আর পরমুহূর্তেই স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে সানার হাসিমাখা আদল। সময় যেন আচমকা থমকে দাঁড়ায়। সারহাদ আর চোখ সরাতে পারে না। ছবির ভেতরে থাকা মানুষটা প্রাণখোলা হাসছে। কিন্তু সেই হাসিই যেন তার বুকে হাজারটা ছুরি হয়ে বিঁধতে থাকে। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে সাথে অজানা ভয়ে কণ্ঠ শুকিয়ে যায়। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে ওঠে। যেন বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা এক সমুদ্র হঠাৎ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অজান্তেই এক ফোঁটা উষ্ণ অশ্রু কার্ণিশ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ে সানার ছবিটার উপর। সারহাদ ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন কেউ নখ দিয়ে খামচে ধরে ছিঁড়ে ফেলছে। ঠিক তখনই হাতে তীব্র জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।
সে নিচে তাকাতেই নজরে আসে জলন্ত সিগারেটের আগুন তার আঙুল ছুঁয়ে গেছে। চোখে হঠাৎ অদ্ভুত এক ঝড় নেমে আসে সাথে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। এক অজানা ক্রোধে সে জ্বলন্ত অংশটা ফোনের স্ক্রিনের উপর চেপে ধরে ঠিক সানার ছবির উপর। কিয়ৎকাল পর দেখল, নাহ, ছবির সেই হাসি বদলায় না। যা তার জন্য নয় বরং অন্য কারো জন্য। সারহাদ অস্থির হয়ে ওঠে। পকেট থেকে আরেকটি সিগারেট বের করে একটার পর একটা জ্বালাতে থাকে। আর স্ক্রিনের উপর পড়তে থাকে সিগারেটের পোড়া অংশ। ধীরে ধীরে ফোনের গ্লাস কালচে হয়ে ওঠে।অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ যেন তার ঘোর কাটে।
তৎক্ষনাৎ সে নিচে তাকায় আর মুহূর্তেই তার মুখের রঙ উধাও হয়ে যায়। সানার ছবিটার উপর ছড়িয়ে আছে পোড়া দাগ, কালো ছাই আর ধোঁয়ার চিহ্ন। সারহাদ তড়িঘড়ি করে হাত দিয়ে সেগুলো সরিয়ে ফেলে। তারপর শার্টের হাতা দিয়ে স্ক্রিনটা মুছতে থাকে বারবার কিন্তু দাগ আর যায় না, কিছুতেই যায় না। সে অস্থির ভাবে ঘষতে থাকে আর বিড়বিড়ায়,
—”আ’ম সো সরি, সানাম…আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। আম সো… সো সরি…’
কিন্তু কিছুই ঠিক হয় না। একটা সময় সে অসহায় হয়ে ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ সমস্ত সংযম ভেঙে গেল অতঃপর এক ঝটকায় ফোনটা ছুঁড়ে মারে দেওয়ালের দিকে। মুহূর্তেই ফোনটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়ে। সারহাদ দুহাতে নিজের চুল মুঠো করে ধরে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে। চারপাশে আলো আছে, লোক দলবল সব আছে কিন্তু তার ভেতরে যেন শুধুই দীর্ঘ, অবসন্ন, অন্তহীন এক অন্ধকার।
সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই পুরো ব্ল্যাক ম্যানশন যেন নতুন এক রঙে রঙিন হয়ে উঠে। চারদিকে হলুদের সাজ অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা। সারা বাগান জুড়ে গাঁদা ফুলের মালা ঝুলছে সারি সারি করে। হলুদ আর সোনালি ফেয়ারি লাইটের মিশ্র আলোয় পুরো পরিবেশটাকে মনে হচ্ছে যেন কোনো রূপকথার রাজ্য। বাড়ির প্রতিটি মেয়ে আজ নিজেদের সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত। কেউ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে, কেউ আবার গয়না মিলিয়ে দেখছে। আর এদিকে সানা বসে আছে নিজের রুমে।
আজকের ড্রেসকোড অনুযায়ী সেও সেজে ফেলেছে অনেক আগেই। তার পরনে হালকা হলুদ রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা লেহেঙ্গা। পুরো পোশাকজুড়ে সোনালি সুতোয় ফুলের নকশা ফুটে উঠেছে। ওড়নাটা একপাশ দিয়ে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে নিচ পর্যন্ত নেমে গেছে। কানের ছোট্ট ঝুমকা দুটো আলোয় ঝিকমিক করছে। গলায় ভারী কিছু নেই, শুধু একটা সরু সোনালি চেইন। চুলের অর্ধেক খোলা, অর্ধেক আলতো করে পেছনে আটকানো। সেই খোলা চুলের ফাঁকে গুঁজে রাখা হয়েছে কয়েকটি সাদা বেলি ফুল। গর্ভধারণের পর তার চেহারায় যেন এক অন্যরকম কোমলতা এসে বসেছে। মুখে সবসময় মৃদু প্রশান্তির হাসি লেগেই থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজের সাজ নিয়ে ব্যস্ত নয়। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে সামনে বসে থাকা ছোট্ট কিয়ারার উপর।
আজ সে নিজ দায়িত্বে কিয়ান আর কিয়ারাকে জাগিয়ে রেখেছে। গতকাল সন্ধ্যা হতেই দুজন ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে পুরো অনুষ্ঠানটাই মিস করেছে তারা। তাই আজ কোনোভাবেই তাদের ঘুমাতে দেবে না সে। কিয়ারা আজ ছোট্ট একটা হলুদ লেহেঙ্গা পরেছে। গোলগাল মুখটা আরও মিষ্টি লাগছে। সানা খুব যত্ন করে তার চুল আঁচড়ে ছোট্ট ছোট্ট ক্লিপ লাগিয়ে দিচ্ছে। মজার বিষয় হলো যে কিয়ারা সাধারণত এক সেকেন্ডও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না, সে আজ অবিশ্বাস্যভাবে শান্ত। সানা যেভাবে বলছে, ঠিক সেভাবেই বসে আছে, একটুও নড়াচড়া করছে না। সানা হেসে বলল,
—”ওয়াও, আজকে আমার রাজকুমারী এত ভদ্র হলো কিভাবে?”
কিয়ারা ছোট ছোট হাত নেড়ে বলল,
—”কারণ আমি আজকে বিউটিফুল হবো”
—”তুমি তো এমনিতেই বিউটিফুল।”
কিয়ারা চোখ বড় বড় করে বলল,
—”না, আজকে আমি মামুনির মতো বিউটিফুল হবো।”
কথাটা শুনে সানার হাসিটা আরও গভীর হলো। সে আলতো করে কিয়ারার চিবুক তুলে ধরে কপালে একটা চুমু খায়। তারপর চুলে শেষ ক্লিপটা লাগাতে লাগাতে বলল,
—”এই যে, হয়ে গেল”
কিয়ারা আয়নার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বলল,
—”ওয়াও”
তারপর হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
—”মামুনি, তুমি এসব কোথা থেকে শিখেছো?”
সানা কয়েক মুহূর্ত থমকে গেল। প্রশ্নটা শুনেই অদ্ভুত এক স্মৃতি এসে ধাক্কা মারল তাকে মস্তিষ্কে। সে মৃদু হেসে শুধালো,
—”আমাকে এসব আমার মা শিখিয়েছিল, ওনি এসবে অনেক এক্সপার্ট ছিলেন”
কিয়ারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হলো ছোট্ট মাথার ভেতর কোনো একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ সে নিচু গলায় ডেকে ওঠে,
—”আচ্ছা মামুনি…”
—”হুম?”
—”তুমি কি আমাকে আমার মাম্মামের কাছে নিয়ে যেতে পারবে?”
বাক্যটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই সানার হাতটা থেমে গেল। কিয়ারা ফের আওড়ায়,
—”আমি প্রমিস করছি, আমি মাম্মামকে একদম বিরক্ত করব না।”
সে নিজের দুই হাত জড়িয়ে ধরার ভঙ্গি করল।
—”শুধু টাইট করে একটা হাগ করব, আর একটা কিস দিব। তারপর বলব আমি গুড গার্ল হয়েছি। আর বলব আমি এখন আর কান্না করি না। আর বলব আমি নিজের খেলনা নিজেই গুছিয়ে রাখি। আর…”
কিয়ারা থেমে ভাবতে শুরু করল আর কি কি…। কিন্তু এই ছট মেয়েটা কি জানে তার এমন সব নিষ্পাপ কথা, যা শুনে পাথরের হৃদয়ও গলে যেতে পারে। সানার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। হঠাৎ করেই তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। এই ছোট্ট মেয়েটাকে সে কিভাবে বোঝাবে, সে যার কাছে যেতে চায়, তাকে আর পৃথিবীর কোনো রাস্তা দিয়ে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিয়ারার মা এমন এক দূরত্বে চলে গেছে, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না। সানা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে চোখের কোণে জমে ওঠা জলটুকু আড়াল করে ফেলল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে কিয়ারার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল,
—”তুমি জানো তোমার মাম্মাম কোথায়?”
কিয়ারা মাথা নাড়ল।
—”জানি তো। পাপা সব সময় নিয়ে যায় ওখানে। কিন্তু মাম্মাম সবসময় ঘুমায়”
ছোট্ট মুখটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল,
—”একবারও আমার সাথে কথা বলে না”
সানার বুকটা আবার কেঁপে উঠে। সে নিজেও একজন মা আর সে নিজেও মা বাবা উভয়কে হারিয়েছে। রমণী কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে বলল,
—”না, মাম্মাম আরেকটা জায়গাতেও আছে”
কিয়ারার চোখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আনন্দের সহিত জানতে চাইল,
—”কোথায়?”
সানা জানালার দিকে তাকায় নজরে আসে বাইরল রাত নেমে এসেছে পুরোপুরি। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা জ্বলছে। সে কিয়ারাকে কোলে তুলে জানালার কাছে নিয়ে গেল। তারপর আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে শুধালো,
—”ওই যে দেখছো… সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা?”
কিয়ারা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পর উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
—”ওইটা?”
—”হ্যাঁ, ওই স্টারটাই তোমার মাম্মাম।”
কিয়ারা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল,
—”সত্যি?”
—”হুম।”
—”তাহলে মাম্মাম এত দূরে কেন?”
সানা মৃদু হেসে তার ফোলা ফোলা গালে চুমু খেয়ে বলে,
—”কারণ তুমি এখন খুব ছোট। যখন বড় হবে তখন মাম্মাম কাছে চলে আসবে”
কিয়ারা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—”তাহলে আমাকে আরও অনেক বড় হতে হবে মাম্মামের কাছে যেতে হলে?”
সানার বুকের ভেতরটা যেন আবারও কেঁপে উঠে। তবু ঠোঁটে হাসি ধরে রেখে তার ছোট্ট মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—”হ্যাঁ, তোমাকে অনেক বড় হতে হবে, অনেক সাহসী হতে হবে, অনেক ভালো মেয়ে হতে হবে তারপর মাম্মাম চলে আসবে”
কিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। সানা তার হাতটা নিজের হাতে শক্ত করে ধরে নিয়ে তারপর মমতাভরা কণ্ঠে বলল,
—”এখন আমার সাথে চলো, সবাই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য”
কিয়ারা শেষবারের মতো আকাশের সেই উজ্জ্বল তারাটার দিকে তাকায়। তারপর ছোট্ট হাতটা সানার হাতে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। একজন মায়ের শূন্যতা বুকে নিয়ে বড় হতে থাকা শিশু আর মাতৃত্বের আলোয় আলোকিত এক নারী দুজনেই ধীরে ধীরে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেল। পিছনে রয়ে গেল খোলা জানালা আর সেই জানালার ওপারে অসীম আকাশের বুকজুড়ে জ্বলতে থাকা এক উজ্জ্বল তারা, যেন দূর আকাশ থেকে নীরবে নিজের ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে।
সন্ধ্যার আবছা আলো ধীরে ধীরে রাতের গাঢ় রূপ ধারণ করছে। সেই রাতকে স্বাগত জানিয়ে আজ ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয়েছে এক স্বপ্নপুরীতে। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, শুধুই হলুদের রাজত্ব। গাঁদা ফুলের অগণিত মালা ঝুলে আছে বাগানের প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি খুঁটি, প্রতিটি তোরণের গায়ে। মাথার উপর ঝুলছে শত শত ঝাড়বাতি, তাদের সোনালি আলো ফুলের পাপড়ির উপর পড়ে এক মোহময় আবহ তৈরি করছে। মাঝখানের বিশাল মঞ্চটি গড়ে তোলা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিকে চারপাশে গাঁদা ফুলের ঝর্ণাধারা, পেছনে ফুল দিয়ে তৈরি বিশাল ব্যাকড্রপ, যেখানে সোনালি আলোয় ঝলমল করছে চার জোড়া নামের আদ্যাক্ষর।
দেশি বিদেশি অসংখ্য সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যেই তাদের ক্যামেরা, ট্রাইপড আর সম্প্রচার সরঞ্জাম প্রস্তুত করে ফেলেছে। সবাই অপেক্ষা করছে সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্তটির জন্য, অপেক্ষা বর কনেদের আগমনের জন্য। হঠাৎ করেই ভেন্যুর প্রধান প্রবেশপথের আলো কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চারপাশের গুঞ্জন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সব ক্যামেরা একসাথে ঘুরে যায় সেই দিকেই। আর তারপর একসাথে প্রবেশ করে চার জোড়া। সবার সামনে রয়েছে সানা ও আরজে। সানার এক হাতে কিয়ারা, আর আরজের এক হাতে আরভি।
আজ আরজের পরনে গাঢ় হলুদ রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত পাঞ্জাবি। বুকের উপর সোনালি সুতোয় করা নকশা আলোর ছোঁয়ায় ঝিলমিল করছে। সাদা পায়জামা ও কালো বুটের সঙ্গে তার সমগ্র ব্যক্তিত্বে এক অদ্ভুত রাজসিকতা ফুটে উঠেছে। যদিও তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই পাঞ্জাবি তার নিজের ইচ্ছায় পরা নয়। সম্ভবত যথেষ্ট চাপ, অনুরোধ ও হুমকির শিকার হয়েই আজ সে এই পোশাকে আবির্ভূত হয়েছে। আর সেই চাপে ফেলা রমণীটি যে সানা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবুও সত্যি বলতে, তাকে আজ অবিশ্বাস্য রকম সুদর্শন দেখাচ্ছে। তার পাশে সানাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন দুজনকে একসাথে ভেবেই কোনো শিল্পী এই সন্ধ্যার রঙ নির্বাচন করেছে।
তাদের পেছনে প্রবেশ করে জ্যাক ও ইবেলিনা। তবে জ্যাক এমনভাবে ইবেলিনার হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে যে তাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। যেন পৃথিবীর সমস্ত দৃষ্টি থেকে নিজের মানুষটাকে আড়াল করে রাখতে চায় সে। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, কিন্তু তার শক্ত করে ধরা হাতই বলে দিচ্ছে সে কাউকেই বিশেষ গ্রাহ্য করছে না।
তাদের পর প্রবেশ করে ঈশানী ও রিজভী। ঈশানীর মুখে লাজুক হাসি, আর রিজভীর চোখে প্রশান্ত মুগ্ধতা। তারপর আসে সানিতা ও এসপি। এসপির মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি, আর সানিতা ইতোমধ্যেই তাকে কয়েকবার কনুই মেরে সতর্ক করেছে যেন কোনো কাণ্ড না ঘটায়। তার মা কালকের মতো আজও আসতে পারে নি সিরাতের জন্য। সিরাত সন্ধ্যা নামতে না নামতেই ঘুমিয়ে পড়ে আর সারারাত জেগে থাকে।
সবশেষে আসে সিয়া ও কাইলিন। সিয়া আজ নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলছে, কাল যা হয়েছে আজ তার একাংশও সে কোন মতে হতে দিবে না। তাদের কিছুক্ষণ পরই আয়ান প্রবেশ করে কিয়ানকে নিয়ে। সে আরো আগেই আসতো কিন্তু কিয়ানের একটি জুতা নিখোঁজ হওয়াতে সে তা খুঁজতে গেছে। কওয়ান দুষ্টুমি করতে করতে কোথায় যে সেটি ফেলে এসেছে, তা সে নিজেও জানে না। সেই জুতা খুঁজতেই আয়ানের এতক্ষণ সময় লেগেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর কিয়ানও এছাড়া অন্য কোন জুতা পরবে না কেননা এগুলো তার মামুনি দিয়েছে। এখন কিয়ান এক পায়ে জুতা পরে গম্ভীর মুখে হাঁটলেও তাকে দেখে চারপাশে হাসির রোল পড়ে যায়।
অবশেষে দীর্ঘ প্রস্তুতি, হাসি ঠাট্টা আর ফ্ল্যাশ, ক্যামেরার পর সবাই নিজেদের নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসে পড়ল। পুরো আঙিনাজুড়ে তখন উৎসবের আবহ। মধ্যখানে সাজানো হয়েছে বড় এক মঞ্চসদৃশ আসর। রঙিন কুশন, ফুলের পর্দা আর হলুদের বাটিতে সাজানো চারপাশ। অনুষ্ঠান অনুযায়ী আজ সবাইকে একসাথে হলুদ লাগানো হবে। সকলের মুখে উচ্ছ্বাস, বিশেষ করে বাড়ির ছোট সদস্যদের উৎসাহ দেখার মতো। কিয়ান আর কিয়ারা তো শুরু থেকেই হলুদের বাটির দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে আছে। তাদের দেখে বারবার সবাইকে সতর্ক হতে হচ্ছে, না হলে তারা অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই সব হলুদ শেষ করে ফেলবে।
একসময় আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ পর্ব শুরু হলো। প্রথা অনুযায়ী প্রথমে সবাই এগিয়ে গেল সানার দিকে। কারণ আজকের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সে-ই। তার সামনে রাখা হলুদের বাটি থেকে প্রথম একজন হাত বাড়িয়েছে ঠিক তখনই সকলের কানে আসে গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
—”স্টপ”
মুহূর্তে সবাই থমকে গেল আর দৃষ্টি ঘুরে গেল আরজের দিকে। সে শান্তভাবে বসে থাকলেও চোখেমুখে স্পষ্ট রাগের ঝিলিক। আরজে এক হাত তুলে সে সবাইকে থামিয়ে দিল। ফের একবার সকলের কানে আসে আরজের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
—”কেউ আমার ওয়াইফ কে হলুদ লাগাবে না”
চারপাশে মুহূর্তেই ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। সানা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল জিজ্ঞেস করে,
—”মানে?’
আরজে নির্বিকার স্বরে বলল,
—”আমি আমার ওয়াইফকে হলুদ লাগাবো। আর কেউ লাগাবে না”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো আসর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তবে তার স্থায়িত্ব হলো মাত্র কিছুপল তারপরই হাসির রোল উঠে পড়ে চারদিকে। সানা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রমণী বিরক্ত হয়ে বলে,
—”রানভীর, আপনার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? হলুদ সবাই সবাইকে লাগাবে”
আরজে সানার কথার সামান্যতম তোয়াক্কা করল না বরং সে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—”তুমি সবাইয়ের ওয়াইফ না, তুমি শুধু আমার ওয়াইফ। তাই তোমাকে হলুদ লাগানোর অধিকারও শুধু আমার”
চারপাশে আবারও হাসির বিস্ফোরণ ঘটে যায়। কেউ মাথা নাড়ছে, কেউ হাসতে হাসতে কাঁধে মাথা রেখে বসে পড়েছে। কিন্তু আরজে যেন কিছুই শুনছে না। সানা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে ‘হা’ তাকিয়ে রইল। তার এই মুহূর্তে কী রিয়্যাকশন দেওয়া উচিত সে ভেবে ফেলো না। তবে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে সামনে কোনো অস্ত্র থাকলে সেটা দিয়েই এই অসভ্য লোকটাকে আঘাত করত। কিন্তু তার আগেই আরজে হাত বাড়িয়ে তার থুতনিতে আলতো চাপ দিল। সানার বিস্ময়ে খোলা মুখটা বন্ধ করে দিল। তারপর পাশ থেকে হলুদের বাটিটা তুলে নিয়ে অত্যন্ত যত্ন করে আঙুলের ডগায় সামান্য হলুদ নিয়ে ধীরে ধীরে সেটা সানার গালে ছুঁইয়ে দিল। যেন সে কোনো মূল্যবান জিনিস স্পর্শ করছে। সানার গালে হলুদ লাগানোর পর সেই একই জায়গা থেকে নিজের গালেও সামান্য হলুদ মেখে নিল সে।
তারপর ঝুঁকে এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—”বাকিটুকু ভিতরে গিয়ে দেওয়ার জন্য রেখে দিলাম”
সানা তার কথা বুঝে চোখ বড় বড় করে তাকায় পাশে বসা নির্লজ্জ মানবের দিকে। আরজে বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়ে আবারও বলল,
—”তুমি চাইলে এখনই সবার সামনেও দিতে পারি, শুধু আমি আমার জিনিস কাউকে দেখাতে চাই না”
ব্যাস, সানার মুখ মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠল লজ্জায়। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলল। চারপাশের শব্দ, আলো, মানুষ সবকিছু মিলিয়ে গেলেও এই মানুষটার নির্লজ্জতা যেন কোনোদিন শেষ হবে না। মনে মনে রমণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গতকালও ঠিক এমনটাই হয়েছে। সবাই একসাথে কত আনন্দ করেছে, কত হাসাহাসি করেছে, অথচ আরজে তাকে নিয়ে গিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটাই মিস করিয়ে দিয়েছে। আজও একই অবস্থা। এদিকে আরজে দিব্যি নির্লজ্জের মতো তার পাশেই বসে আছে পিছনে একহাত তার কোমড়ে গুঁজে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজটাই করেছে।
অন্যদিকে জ্যাকের অবস্থাও প্রায় একই। ইবেলিনার সামনে কেউ হলুদের বাটি নিয়ে দাঁড়াতেই সে এমনভাবে ধূসর চোখজোড়া দিয়ে তাকিয়েছিল যে, বাকিরা স্বেচ্ছায় পিছিয়ে গিয়েছে। তাকে মুখে আর কিছু বলতে হয়নি, একপলক অগ্নিদৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল। শেষ পর্যন্ত সে নিজেই ইবেলিনার কপাল, গাল, হাত সবখানে হলুদ লাগিয়ে দিয়েছে। এ দৃশ্য দেখে চারপাশে বসা সবাই একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একজন ফিসফিস করে বলে,
—”দুইটা একই কেস”
সঙ্গে সঙ্গে আবার হাসির রোল উঠল। অবশেষে সবাই নিজেদের মনোযোগ ঘুরিয়ে নিল রিজভী আর এসপির দিকে। কারণ এই দুজনকে নিয়ে মজা করার সুযোগ কেউ ছাড়তে রাজি নয়। প্রথমেই রিজভীর সামনে এগিয়ে গেল কয়েকজন। রিজভী শুরুতে যথেষ্ট ভদ্রভাবেই বসে ছিল। কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তার মুখ, গলা, চুল, এমনকি কান পর্যন্ত হলুদে ঢেকে গেল। সে যতই বাঁচার চেষ্টা করুক, কেউ তাকে রেহাই দিল না। এক পর্যায়ে কিয়ান এসে তার নাকে এক চামচ হলুদ মেখে দিয়ে দৌড়ে পালাল। সাথে সাথে রিজভীর হাঁচি উঠে গেল। চারপাশে তখন হাসির বন্যা। ঈশানীও সেই আনন্দ বাদ দিতে পারল না। সেও দুই হাতে একগাদা হলুদ নিয়েছে রিজভীকে মাখানোর জন্য কিন্তু
রিজভী অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,
—”প্লিজ ঈশু, তুমি অন্তত এটা করো না, লক্ষী সোনা আমার”
কিন্তু বিপরীতে রমণী একটুও কর্ণপাত করল না তার কথায়। রিজভী আর কি করবে? নিজের হবু স্ত্রীর হলুদ টাও মাখিও নিল নিজের গায়ে। এরপর পালা এলো এসপির। আর তখনই যেন পুরো অনুষ্ঠান নতুন মাত্রা পেল। এসপি প্রথমে খুব ভাব নিয়ে বসেছিল, তাকে কেউ লাগাতেই পারবে না। কিন্তু তার অহংকার মুহূর্তে গুড়িয়ে গেল যখন প্রথম হামলা টা এলো সানিতার তরফ থেকে। এসপি বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই একযোগে সবাই তাকে হলুদ শুরু করে। এসপি নিজেকে বাঁচানোর সুযোগ টাও ফেলো না। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন দাঁড়াল যে মানুষটার চেহারা চেনাই কঠিন। সানিতা তো সুযোগ পেয়ে দুই হাতে হলুদ নিয়ে সরাসরি তার গালে মেখে দিল। এসপি হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে ওঠে,
—”আমার মা রা, এবার থামেন। আবে ইয়াড ভূত বানিয়ে ফেলেছে সবগুলো একেবারে”
চারপাশে আবারও হো হো করে হাসি পড়ে গেল। ধীরে ধীরে পুরো অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। হাসি, ঠাট্টা, গল্প, ছবি তোলা সব মিলিয়ে সময় যেন ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিল। আর সেই বিশৃঙ্খল আনন্দের মাঝেই হঠাৎ আরজের মুঠোফোনটা বেজে উঠে। সে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মুখের অভিব্যক্তি সামান্য বদলে গেল, চোখে ভেসে উঠল গম্ভীরতা। কলটা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার জন্য বেশি কিছু লাগল না। এক মুহূর্ত নীরবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সে কল রিসিভ করল। তারপর সবার আনন্দ-উল্লাস থেকে নিজেকে সরিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সানা একবার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়, আরজে শুধু সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়িয়ে তারপর ফোন কানে নিয়ে আসরের কোলাহল ছেড়ে অন্ধকারের দিকে, একটু নির্জন স্থানের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করল।
কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই আরজে গুরুত্বপূর্ণ ফোনকলটি শেষ করে ধীর পায়ে মূল ভেন্যুর দিকে ফিরে আসে। কিন্তু নিজের আসনের কাছে পৌঁছাতেই তার পদক্ষেপ থমকে যায়, কেননা সানা নেই। মুহূর্তেই তার কপালের ভাঁজ গভীর হয়ে ওঠে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে সে। কিয়ারা ঠিক আগের জায়গাতেই বসে আছে, কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত। আরভিকেও দূরে কোথাও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সানা?
না, তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আরজের চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসে। তার দৃষ্টি ঘুরে যায় চারপাশে, আর তখনই সে লক্ষ্য করে, এসপিও নেই। এক নিমিষে তার মাথার ভেতর সন্দেহের ঝড় বয়ে যায়। সে দাঁত চেপে মনে মনে বিড়বিড় করে,
—”এই বারোভাতারিটাই আমার বউকে নিয়ে কোথাও গিয়েছে। একবার হাতের কাছে ফেলে ঠিক জ্যান্ত পুঁতে ফেলব”
পরমুহূর্তেই ভারী কদমে চারপাশ খুঁজতে শুরু করে সে। কিছুক্ষণ পর ভেন্যুর পেছন দিকের নির্জন অংশে এসপিকে দেখতে পায়। সেও চারপাশে অস্থিরভাবে কিছু একটা খুঁজছে। আরজে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে এক টানে গিয়ে তার কলার চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,
—”শালা কু*ত্তারবাচ্চা, আমার দুইবার বিয়ে করা বউ কোথায়?”
হঠাৎ আক্রমণে এসপি নিজেই হতভম্ব হয়ে যায়,
—”কি?”
—”একটাও উল্টো পাল্টা বলবি না। জাস্ট সানা কোথায় এটা বল?”
এসপি তার কথা শুনে যেন আকাশ থেকে টপকালো। সে আরজের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,
—”আমি জানব কিভাবে? তোর দুইবার না দশবার বিয়ে করা বউ কোথায়, সেটা কি আমার দায়িত্ব? আর শালা, আমি এদিকে হলুদ পরিষ্কার করতে এসেছি সাথে রিজভীও ছিল। ওকে গিয়ে বলনা, তোর বউ কোথায়?”
আরজে তার কথায় একরত্তিও বিশ্বাস করল না। উল্টো আরো জোরে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
—”তুই নিয়ে গেছিস”
—”আরে ধুর, আমি তোর বউকে নিয়ে কী করব? আমি তো ভেন্যুতে ফিরে গিয়ে নিজের বউকেই খুঁজে পাচ্ছি না”
কথাটা শুনে আরজে থমকে যায়। তার হাত ঢিলা হয়ে আসে। এসপি নিজেকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে কলার ঠিক করে। আরজে কপাল ঘষে ফের বলে,
—”মানে?”
—”মানে তুই যেভাবে বউ খুঁজে পাচ্ছিস না, আমিও ঠিক সেভাবেই খুঁজে পাচ্ছি না”
দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে একপলক তাকায়। ঠিক তখনই দুজনের কানে ভেতর থেকে প্রবল উল্লাসধ্বনি ভেসে আসে, তালির শব্দ, হইচই, আর চিৎকার। দুজনেই বিরক্ত হয়ে একবার সেদিকে তাকায়।
তারপর আবার একে অপরের দিকে। হঠাৎ একই সঙ্গে যেন দুজনের মাথায় একই চিন্তা আসে। দুই মানবের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তারা দ্রুত কদম ফেলে ভেন্যুর ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকেই দুজনের পদক্ষেপ থেমে যায় সামনের দৃশ্য দেখে। কেননা স্টেজের মাঝখানে আলোর ঝলকানির মধ্যে, সুরের তালে তালে নেচে চলেছে দুই রমণী, সানা আর সানিতা। দুজনেই নিখুঁত ছন্দে, নিখুঁত তাললয়ে নিজেদের মতো করে আনন্দে মেতে উঠেছে। চারপাশের সবাই হাততালি দিয়ে তাদের বাহবা দিচ্ছে, হাসছে, ভিডিও করছে, উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী দুই ব্যক্তি সম্ভবত এই মুহূর্তে আরজে আর এসপি।
দুজনের মস্তিষ্কে যেন কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আরজের চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে গালের হাড় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার মুঠো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে, বাদামী চোখজোড়া রক্তিম হয়ে উঠেছে তীব্র দহনে। অন্যদিকে এসপির কপালের শিরাগুলো পর্যন্ত টানটান হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে দুজনেই নিজেদের শেষ সীমার ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেরই বুকের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন। এসপি দন্ত খিঁচিয়ে ফিসফিস করে,
—”মনে হচ্ছে, খুশদিলের মেয়ের পৃথিবীতে থাকার সময় ফুরিয়ে এসেছে”
আরজে আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে, কারো পরোয়া না করে সে সোজা স্টেজের দিকে এগিয়ে যায়। তার ভারী পদক্ষেপে আশেপাশের কয়েকজন পর্যন্ত পথ ছেড়ে দেয়। সানা নাচের মাঝখানে হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে খানিকটা থমকে যায়। কিন্তু পরের মুহূর্তেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সম্ভবত সে ভাবছিল আরজেকেও টেনে নাচে যোগ করাবে। কিন্তু তার ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত করে এক ঝটকায় আরজে তাকে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে সানা,
—”রানভীর….”
আরজে রাগে গড়গড় করে রুক্ষ স্বরে তার কানের কাছে ফিসফিস করে
—”নাচার খুব শখ, তাই না ওয়াইফি? সমস্যা নেই বেইবি, আজ রাতে তোমার সব শখ পূরণ করব। শুধু পরে আমাকে দোষ দিবে না, যদি কাল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু না থাকে”
বিপরীতে রমণী আঁতকে উঠে,
—”আমাকে নামান বলছি….”
সানা নিজের বাক্য সম্পন্ন করার আগেই আরজে নিজের হাতের চাপ আরো শক্ত করল। সানা ব্যথায় কিছুটা কুঁকড়ে যায়। আরজে তার তোয়াক্কা না করে ফের আওড়ায়,
—”একদম চিৎকার করার স্পর্ধা দেখাবে না, সানা। নাহলে শাস্তি আরো কঠিন হবে। তোমার সাহস কীভাবে হলো, আমার জিনিস অন্যকে দেখানোর। পরের বার স্টেজে ওঠার আগে একশবার ভাববে”
সানা আরজের মুখে নিজের সম্পূর্ণ নাম শুনে কিছুটা দমে যায় কেননা আরজে ‘সানা’ শুধু তখনই ডাকে যখন সে অতিরিক্ত রেগে যায়। রমণী আর টু শব্দটিও করল না। মনে মনে ভাবল, সে এমন কী করেছে যাতে আরজে রেগে যায়। শুধুমাত্র একটু শখের বশে সানিতার সাথে তালে তাল মিলিয়েছে এইতো। এতে এতটা রাগার কী আছে? আর এমনিসে খুবই সাবধানে নাচছিল যাতে বেবির কিছু না হয়।
আরজে সানাকে নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে যেতেই সবার কানে আসে আরেকটা গম্ভীর কণ্ঠ,
—”সানির বাচ্চা….আজকে আমি তোকে নিশ্চিত উপরে পাঠানোর ব্যবস্থা করব”
সানিতা তার এমন হুমকিতে মুহূর্তে জমে যায়। এসপি স্টেজে ওঠে সানিতার সামনে দাঁড়িয়ে তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকায় যে আশেপাশের কয়েকজন পর্যন্ত আঁতকে ওঠে। সানিতা বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। রমণী বিপদ বুঝে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায়। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
—”ফারাদ ভা…..”
—”চুপ, একদম চুপ, আর একটা শব্দও যেন তোর গলা থেকে না বের হয়”
এসপির এমন ধমকে সানিতার চোখে জল জমে ওঠে। পরের মুহূর্তেই এসপি সানিতাকে কোলে তুলে নেয়। সানিতা ভয়ে, লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলে। এসপি কোন দিকে না তাকিয়ে তাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। আর চারপাশে আবারও হইহুল্লোড় শুরু হয়ে যায়। তালির শব্দে, হাসির রোলে, ঠাট্টা মশকরায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হলুদের আসর। আর সেই উচ্ছ্বাস, সেই প্রাণবন্ত বিশৃঙ্খলার মাঝেই ধীরে ধীরে শেষ হতে থাকে সন্ধ্যার হলুদের অনুষ্ঠান।
সাতসকালের কুয়াশা তখনো পুরো কবরস্থানটাকে সাদা এক বিষণ্ন চাদরে ঢেকে রেখেছে। দূর আকাশে সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করলেও তার উষ্ণতা এখনো মাটিতে পৌঁছায়নি। শিশিরে ভেজা ঘাসগুলো নিঃশব্দে মাথা নত করে আছে, যেন তারা বহুদিনের জমে থাকা শোকের সাক্ষী। চারদিকে অদ্ভুত এক নীরবতা। সেই নীরবতার বুক চিরে ভেসে আসছে নাম না জানা পাখিদের মিষ্টি কলতান। কিন্তু সেই সুর, সেই সকাল, সেই শান্ত প্রকৃতি কোনোটারই অস্তিত্ব যেন নেই যন্ত্র মানবের কাছে।
কালো কোট গায়ে দিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি কবরের সামনে। তার দৃষ্টি জমাট বেঁধে আছে সাদা মার্বেলের ফলকের উপর। সেই কবর…সেই মানুষটার কবর…যাকে পৃথিবীও তার বাবা বলে চিনত না। আর যাকে জ্যাক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কখনো “বাবা” বলে ডাকেনি। তার ইচ্ছাও ছিল না এখানে আসার। এই কবরের সামনে দাঁড়ানোর চেয়েও কঠিন কাজ তার কাছে খুব কমই ছিল, তবুও সে এসেছে। শুধুমাত্র ইবেলিনার কথা রেখেছে বলে।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবরটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঠান্ডা, অনুভূতিহীন কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
—”আমি যদি পারতাম… এই শরীরে বয়ে চলা আপনার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা আজ এই কবরের উপর ফেলে রেখে যেতাম”
তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়। সে তিক্ত হেসে ফের আওড়ায়,
—”এতটা ঘৃণা আমি জীবনে খুব কম মানুষকে করেছি। আপনি তাদের একজন নন… আপনি তাদের সবার উপরে। জানেন? মানুষ বলে মৃত্যুর পর নাকি সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতে হয়। কিন্তু আমি পারিনি। কারণ আপনি কখনো সেই ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না”
জ্যাক একটু থেমে ফের বলতে শুরু করে,
—”আপনার কাছে নারী মানেই ছিল ভোগের বস্তু, একটা শরীর, একটা প্রয়োজন, একটা খেলনা। মানুষ হিসেবে তাদের কোনো মূল্যই ছিল না আপনার কাছে। আপনি আমার মাকেও সেভাবেই ব্যবহার করেছিলেন। তারপর তাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে রেখে চলে গিয়েছিলেন”
সে মুঠো শক্ত করে এতটা জোরে যে হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে,
—”আর আপনার সেই পাপের জীবন্ত প্রমাণ। জানেন, সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী?”
একটা তিক্ত শুষ্ক হাসি বেরিয়ে আসে তার ঠোঁটের কোণ থেকে। গলায় জমে ওঠে তীব্র বিতৃষ্ণা তবুও ফিসফিস করে,
—”আমি যতবার আয়নায় নিজের মুখ দেখি, ততবার আপনার মুখটাই দেখি। নিজেকে ঘৃণা করার অন্যতম কারণও আপনি”
সে কবরটার দিকে তাকিয়ে আরও এক পা এগিয়ে গিয়ে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয় কর্কশ গলায় শুধালো,
—”আপনি কখনো বাবা ছিলেন না। একটা সন্তান পৃথিবীতে এনে দিলেই কেউ বাবা হয়ে যায় না। বাবা সেই মানুষ, যে সন্তানের ভয় দূর করে, বাবা সেই মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে নিরাপদ লাগে, বাবা সেই মানুষ, যার নাম শুনলে শ্রদ্ধা আসে। আর আপনি?
আপনার নাম শুনলেই আমার ভেতর শুধু ঘৃণা জন্মায়। আমি আপনার মতো হইনি, আপনার মতো হবও না। আপনার মতো কোনো নারীর চোখে ভয় দেখতে চাই না, আপনার মতো কারও জীবন ধ্বংস করে চলে যেতে চাই না”
সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে সঙ্গে সঙ্গে ইবেলিনার হাসিখুশি মুখটা ভেসে ওঠে তার সামনে। আস্তে করে বলে,
—”আমি অন্তত তাকে ভালোবাসি… যেভাবে আপনি কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতে পারেননি, এমনকি নিজের স্ত্রীকেও না”
সে চোখ খোলে সামনের কবরটার দিকে শেষবারের মতো তাকায় শুধালো,
—”এই আসাটাও আমার ইচ্ছায় না, আমার স্ত্রীর ইচ্ছায়। সে বিশ্বাস করে মৃতদের জন্য প্রার্থনা করা উচিত। দুর্ভাগ্যবশত, আমি তার মতো ভালো মানুষ নই। তাই আপনার জন্য কোনো প্রার্থনা নিয়ে আসিনি, শুধু একটা বিদায় নিয়ে এসেছি”
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৩
এই বলে সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। আর ঠিক তখনই..তার পেছনে কুয়াশার ভেতর থেকে আরেকটি অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জ্যাকের পদক্ষেপ থেমে যায়। সামনের মানুষটাও তাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্ত দুজনেই নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। জ্যাকের চোখ মুহূর্তেই শীতল হয়ে আসে। কারণ এই মানুষটাকেও সে কখনো নিজের বলে মেনে নিতে পারেনি যদিও একই রক্ত, একই অতীতের আরেকটি ছায়া। তার বাবার রেখে যাওয়া আরেকটি উত্তরাধিকার যাকে পৃথিবীতে উনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন। কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে জ্যাকের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে ওঠে। তারপর আগন্তুক ব্যক্তি ভ্রু কুঁচকে ধীর স্বরে বলে ওঠে,
—”জ্যাক… তুমি এখানে?”
