Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৭
Maha Aarat

আরহাম নামাজ থেকে ফিরে সোজা রুমে চলে এলেন।ফ্রীজ থেকে খেজুরের প্যাকেটটা হাতে নিতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়লো করিডোরে।নিচের দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রুমের দিকেই আসছিলেন উমায়ের।এতো মনোযোগের উৎস খুঁজতে গিয়ে ভালো করে তাকাতে গিয়ে হেসে ফেললেন আরহাম।আরহামের জুতো পড়েছে আর হাঁটতে গিয়ে সব মনোযোগ জুতোর দিকেই উনার।তাঁর ছোট পা’র জন্য জুতোটা বেশ বড় তাই কমঅর্ধেক পায়ের অংশ বেরিয়ে আছে সামনে।আরহাম মুচকি হাসতে হাসতে দরজার সামনে দাঁড়াতেই সে বাঁধা পেলো।চোখ তুলতেই উনাকে হাসতে দেখে ভড়কালেও বুঝতে পারলো না।হাফসার চোখ আটকালো ঠান্ডা মেঝের ওপর আরহামের খালি পা’তে।চট করে জুতো খুলে এগিয়ে দিতেই আরহাম তাকে আচমকাই শূন্যে তুলে দূ’গালে ভালোবাসা এঁকে বিছানায় বসালেন ।গায়ে কমফোর্টার জড়িয়ে দিয়ে ফ্রীজ থেকে বের করা খেজুর আর বক্সের ওপর থেকে চীনাবাদাম নিয়ে আসলেন।কমফোর্টার নিজের গায়েও শেয়ার করে হাফসাকে জড়িয়ে ধরে হেলান দিয়ে বসলেন।বাদামের খোসা ছাড়িয়ে তার মুখে তুলে দিতে দেখলেন সে লজ্জ্বায় লাল হয়ে আছে।আরহামের ভ্রু কুঁচকে আসলো।এমন কিছু তো হয়নি যাতে সে লজ্জ্বা পাবে।পরক্ষণেই মনে হলো একটু আগের কথা।

আরহাম মুচকি হেসে বাদাম ছিলতে ছিলতে চুপিচুপি তার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস সুরে বললেন , ‘আমাকে আকৃষ্ট করার জন্য আপনার লাজরাঙা মুখ’ই যথেষ্ট।সো,আপনি কি চাচ্ছেন এই মুহুর্তে আমি আকৃষ্ট হই?’
হাফসা তড়িৎ দাঁতে দাঁত চেপে স্ট্যাচু হয়ে বসলো।আরহামের ঘন দাঁড়ি তাঁর কানে সুরসুরি লাগছে।সুরসুরিতে এমনিই হাসি আসে তাঁর।কি এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।
এবার আরহাম খাইয়ে দিতে চাইলে হাফসা উনাকে রিপিট করতে চায়।আরহাম চোখ ইশারায় না করলেন।উনার চোখের দৃষ্টিতে যেনো ঝলসাচ্ছে..”আলিঙ্গনে ভালোবাসার মোহ জেগে উঠে,সেই মোহতে ডুবলে পরে পাইনা তীরই-খুঁজে।”

হাফসাকে মুখোমুখি বসালেন আরহাম।চোখে চোখ রাখার সাহস হলো না তাঁর।আরহামের এক কোমল দৃষ্টি যেনো তাকে পুরোটাই পড়ে নিচ্ছে।এই নিঁখুত গভীরদৃষ্টি অগ্রাহ্য করবে কেমন করে।নিচুমুখে দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে থাকে সে।আরহাম দৃষ্টি সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশার সুরে বললেন , ‘আমার আনরোমান্টিক বউ!’
হাফসা থমকালো।উনার সামনে লজ্জ্বায় তাঁর নাজুক অবস্থা আর সে উনার দিকে মনোযোগ দিবে কি করে!
‘সবাই নাকি ছোট্ট ছোট্ট পুচকে চায় কিন্তু এই বাচ্চাটাকে বড় করতে আমার আরও তিন চার বছর লেগে যাবে।’
নাহ!লোকটার মুখে কোনো ব্রেইক নেই।এখান থেকে কেটে পড়তে না পরলে তাঁর আজকে দফারফা অবস্থা হয়ে যাবে।
যাওয়ার জন্য উদ্যত হতে গেলে আরহাম ভ্রু কুঁচকাতেই সাথে সাথে বসে পড়ে সে।
‘কিচেনের দিকে ভুল করেও পা বাড়ালে আমার কঠোরতার সীমা ছাড়িয়ে যাবে উমায়ের।’
লোকটার কন্ঠে কি আগুন!বেশ যাবে না সে।

‘যতক্ষন আমি রুমে থাকি আমার পাশে থাকা যায় না?শুধু কিচেনের হুড়োহুড়ি আসে কেন?’
হাফসা তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ায়।একহাতে কান ধরে সরি হতেই আরহাম মুচকি হাসলেন।এক উষ্ণ আলিঙ্গনে আগলে নিয়ে চুপিচুপি বললেন , ‘আপনি আমার এক তৃষ্ণার নাম।ছন্নছাড়া আমি যখন নিজের ইমান সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম তখনই আপনার আগমন।বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে একসেপ্ট করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না অথচ বুঝতে পারছিলাম না ওই এলোমেলো সময়ের ব্যস্ত ইস্তেখারার রেজাল্ট কেন পজিটিভ আসছিল।তবুও অবাস্তব লাগছিল সব।নিকাহ’র পর আপনি স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে।লজ্জ্বায় জড়তায় আমার সামনে আসতেন না আর আমার কতো ইচ্ছে করতো একটু কথা বলি।আপনি একটু সামনে থাকুন।’
হাফসা চোখ বড় বড় করে তাকালো।আরহাম তার গালটেনে বললেন , ‘নিকা’হর পর প্রথম সাক্ষাৎ।বোকা!’

বাবার বাড়িতে এসেই মা বাবার ওপর হামলে পড়েছে সে।এদিকে ভয়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকা একমাত্র বরের দিকে তাকানোর সময়ই নেই তার।আসার পর থেকেই এশার কাজিনের ছেলে তামিম এর সাথে টুকটাক গল্প করছিলেন আর মাঝে মাঝে ভেতরঘরে উঁকি মারছিলেন।দূপুরের শেষ সময় তখন।মিসেস মাইশা ব্যস্ততা নিয়ে বললেন , ‘অনেক দেরি হয়ে গেলো বাবা।খাবার রেডি করা হয়েছে খেতে আসো।’
রায়ানের পেটে সত্যিই খিদে।আজকে অফিসেও কিছু খাওয়া হয়নি।সকালের সামান্য নাস্তা পেটকে কতক্ষণই স্বান্তনা দিতে পারে?
রায়ান বিনয়ের সহিত বলতে লাগলেন , ‘আম্মু আব্বু সবাই আসুন একসাথে লান্চ করি।’
‘আমরা তো করে নিয়েছিলাম বাবা।’
রায়ানের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর আসলো না।তামিমকে জোর করলেও সে খাবার খেতে নারাজ।মা নাকি তাঁর জন্য মমো বানিয়ে অপেক্ষা করছে।রায়ান এবার আশা পেলেন এশা আসবে।খাবার জন্য হলেও সে সামনে আসবে।তবে উনার সম্পূর্ণ আশা নিরাশ করে দিয়ে মা উনাকে বসার তোড়জোড় করতে করতে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি বসে পরো।শীতের খাবার গরম গরম যে টেস্ট পরে আর তা পাওয়া যায় না।’

‘এ্ এশাকে দেখছি না?’
‘ও তো খেয়ে নিয়েছে।’
প্রচন্ড রুচি থাকার পরেও খাবার টেবিলে বসার আর কোনো ইচ্ছেই রইলো না।মিসেস মাইশাকে খুব সিরিয়াস সুরে বললেন , ‘কিন্ত মা আমি তো খাব না।আমার পক্ষে এখনি খাওয়া সম্ভব না।’
‘কেন?’
‘সম্ভব নয় আর কি।’
‘খেয়ে বেরিয়েছো?’
‘আসলে অফিসে তো আলাদা করে দূপুরের খাবার রান্না করা হয়।’
মিসেস মাইশার চোখেমুখে এবার হতাশা।তাকে আরও কয়েকবার জোর করেও কায়দায় আনতে না পেরে খাবার ঢেকে নিতে নিতে বললেন , ‘কি আর করা।আমি আরো কতো তাড়াহুড়ো করলাম।’
রুমে এসে ব্লেজার খুলে ছুড়ে ফেলে সটান হয়ে শুয়ে রইলেন রায়ান।আর আধ ঘন্টা পর তিনি বেরিয়ে যাবেন অথচ আসার পর থেকে আধমিনিটের জন্যও সে সামনে আসছে না।
চোখ বুজে থাকতে থাকতে ঘুমের রেশ চলে আসছিলো চোখে।এর মধ্যেই রুমে প্রবেশ করলো এশা।অহেতুক প্রশ্ন ছেড়ে সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করলো, ‘খান নি কেন?’
‘ ইচ্ছে করছে না।’
ব্যস।এতটুক শোনার জন্যই সে আসছিল বোধহয়।এশা চলে যেতেই রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে এখন থেকে একঘন্টা পরের একটা এলার্ম সেট করে চোখ বন্ধ করে নিলেন।

সেদিন বিকালের ওই ঘটনার পর আদওয়ার অস্থিরতা আরো বেড়েছে।কেন তাঁর নোংরা অতীত তাঁর পিছু ছাড়লো না।তখন না হয় দ্বীনি বুঝ ছিলো না।নন মাহরাম সম্পর্কে কোনো ধারনাই না থাকা আদওয়া যেনো এক রঙ্গিন দুনিয়ার একচ্ছত্র বাসিন্দা।হারাম সম্পর্কের কোনো সুন্দর শেষ নেই।এর চেয়ে বরং শত অপেক্ষার পর,এক হালাল সঙ্গীনীই উত্তম।
আরহামের প্রতি তাঁর গভীর অনুভূতিতে কোনো খাদ নেই।কিন্তু খাদ তাঁর ইমানে।এই একটা মানুষের কথা ভাবতে গেলে তাঁর মন বেহায়া হয়ে উঠে।যাকে নিয়ে ভাবতে গেলে এর উপসংহার ধরা কঠিন।এমনকি যার দূজন সঙ্গিনী থাকা বাদেও!উনারা নিশ্চয়ই ভীষণ সৌভাগ্যবতী।
ইমানের প্রতি তাঁর পুরনো অনুভূতির কোনো মানে নেই।হৃদয়ের ভাঁজে সূচের মতো তীক্ষ্ণভাবে জেগে উঠা বিষাদ সেই অনুভূতির কবেই কাফন ছাড়া দাফন হয়ে গেছে।এখন তো তাঁর হৃদয়ে শুধুই বর্তমান।তাঁর শুভ্র জুব্বাওয়ালা!
উনার বোনের বিয়ে খুব ছোটখাটো ভাবে সম্পন্ন হলেও আঙ্কেল এসে আদওয়া আর তাঁর আম্মুকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ রেখে গেছেন।উনার পরিবারের এই আয়োজনটা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় সে।তাঁরপর এই যাত্রার শেষ দেখার পালা।

রায়ানের ঘুমের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ নষ্ট হলো যখন আবারো কোনো আওয়াজ কানে আসলো।খাবার রুমের টেবিলে নিয়ে এসেছে এশা।রায়ানকে ডেকে বলে, ‘আসুন।’
‘বললাম তো খাবো না।’
‘খেতে হবে।’
‘ইচ্ছে নেই।’
এই লোকটা কম নাছোড়বান্দা না তো!প্লেটে খাবার নিয়ে বিছানায় এসে বসলো।তিনি তখনো মুখ ফিরিয়ে।
‘সকালে অল্প নাস্তা খেয়েছেন আর এখন সন্ধ্যে হতে চলেছে।’
‘তুমি কী করে ভাবলে যে আমি অফিসে খাইনি।’
‘ভাবার কিছু নেই।আমি জানি খাননি।’
‘জোর করো না আমি খাবো না।আমার খিদে নেই।’
রায়ানকে টেনে তুললো সে।কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে খাবার মেখে মুখে তুলে দিতে গিয়ে বলল, ‘বাচ্চাদের মতো জেদ কেন এতো।আমার খাওয়ার একদম রুচি নেই সেজন্য মাকে বলেছিলাম আপনাকে খেতে দিতে।আমি খাইনি বলে তো খাবেন না তাই ওই মিথ্যে বলেছি যে আমি খেয়ে নিয়েছি।আল্লাহুম্মাগফিরলী আল্লাহুম্মাগফিরলী!
‘আর যেনো মিথ্যা না বলতে হয়।কখনো না।’
‘আচ্ছা।’
রুচি না থাকলেও প্লেটের বেশীরভাগ খাবারগুলো গিলতে হলো এশাকেই।নামাজের এলার্ম দিয়ে রায়ান শুয়ে চোখ বুজে রইলেন।এত মজার ঘুম মিস দেওয়া যাবে না।

মনের সর্বোচ্চ বিরুদ্ধে গিয়েও হসপিটালে এটেন্ড করতে হলো উনাকে।আরামের ঘুম ছেড়ে খুব সকালে এতোদূর ড্রাইভ টা সহজ ছিলো না মাহেরের জন্য।কলেজ থেকে ক’দিনের ছুটি নেওয়া ছিল কিন্তু হসপিটালের ডিউটি থেকে চাইলেও নিস্তার পাওয়া কঠিন।
নিজের সীটে অলসভঙ্গিতে বসে ছিলেন মাহের।অমি নক করায়ও উনার দৃষ্টির নড়চড় হলো না।অমি এসে অনুমতি নিয়ে বলল, ‘স্যার আজকে দূপুরের পর তো অপারেশন এর পেশেন্ট আছে।আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন।’
‘ডক্টর মেহেদীর সাথে আমি কথা বলে নিয়েছি।উনি করবেন এটা।’
‘কিন্তু স্যার পেশেন্ট তো আপনার।’
‘উনি হ্যান্ডেল করে নিতে পারবে।বেশী কথা বলো না।’
বেশ কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা।অমির পেটের ভেতর কথারা যেন দৌড়াচ্ছে।প্রশ্নগুলো ফুল রেসে ছুটোছুটি করছে।তাই উসখুস করতে করতে একসময় জিজ্ঞেস করেই বসলো, ‘আ্ আপনি কি কোনো কারনে রেগে আছেন স্ স্যার?’
‘তোমার মনে হচ্ছে?’
কি ভয়ানক এক্সপ্রেশন।চোখে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে অথচ কতো ঠান্ডা অভিব্যক্তি।অমি ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো,

‘জ্ জ্বী।’
‘আমারও মনে হচ্ছে।কিন্তু বুঝতে পারছি না কেন হচ্ছে।’
‘আপনি কিছু নিয়ে টেনশন করছেন?’
‘কাজ ছাড়া কোনো টেনশন নেই।’
‘আপনার কিছুদিন ব্রেইক নেওয়া উচিত।’
‘ভাবছি।’
‘লম্বা করে একটা ব্রেইক নিয়ে এর মধ্যে শুভ কাজটা সেরে নিলে এই সুযোগে আমারও কিছু স্বস্তি হতো।’
কথাগুলো বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছিলো।মাহের জানতে চাইলেন , ‘কিছু বলছিলে?’
‘ন্ না।না তো স্যার।’
‘আজকে তিনটার দিকে বাসায় চলে যাবো।কালকে কোনো ইমার্জেন্সি পেশেন্ট ও না থাকে যেনো।’
‘কেন স্যার?’
‘আরহামের বাসায় বিয়ে।তুমিও ইনভাইটেড।’
‘উনার বিয়ে মানে?এ কি বলছেন??’
অমির চোখেমুখে উৎকন্ঠা,অস্থিরতা।
‘কেন বেশী বুঝো?ওর নয় ওর বোনের বিয়ে।’
‘আমি আরো ভাবলাম..

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৬

অমিকে কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মাহের উঠতে উঠতে বললেন , ‘মাথাটা খেয়ে দিও না আর।স্যারের রুম থেকে আসার পর পেশেন্ট পাঠাবে।’
মাহের বেরিয়ে গেলে ধপ করে বসে পড়ে অমি।আগেরবার তো এশা ম্যামের সাথে স্যারের জুটি মিললো না।এবার বন্ধুর বোনের সাথেও না?উনি কি চিরকাল চিরকুমারই থাকবেন?

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৮