কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৮
তন্ময়ী তিতিক্ষা
আকস্মিক দরজার ঠকঠক শব্দে ঘুম ছুটে গেল আর্শির। ভ্রু যুগল কুঁচকে চক্ষুদ্বয় অল্পস্বল্প মেলে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করল। মাথাটা ভার লাগছে অদ্ভুতভাবে। চোখে এখনো ঘুমের ছাপ স্পষ্ট। পুনরায় দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজে উঠে বসার চেষ্টা করল আর্শি। কারো শক্ত বাঁধনে আবদ্ধ বুঝতে পেরে পুরোপুরি নেত্রপল্লব মেলে চাইল সে। মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই থমকে গেল আর্শি। তাকে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে ছেলেটা। একটা হাত আর্শির কোমর জড়িয়ে, আরেকটা হাত তার মাথার কাছে। মুখটা একদম গুঁজে রেখেছে আর্শির চুলের ভেতর। নিশ্বাসের উষ্ণতা স্পষ্ট অনুভব করল আর্শি। কিছুটা চমকাল, সেই সাথে ভরকালও কিছুটা। আকস্মিক মাথায় একটু চাপ প্রয়োগ করতেই রাতের সমস্ত ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠল।
ভয়ের চোটে সেই কিনা আযরানকে জড়িয়ে ধরেছে। কথাটা ভাবতেই চক্ষুদ্বয় বেরিয়ে আসার জোগান। তবে কিছু কথা মাথায় আসতেই কিছুক্ষণের জন্য একদম স্থির হয়ে গেল সে।গতরাতের ভয়, আতঙ্ক সব যেন কোথাও মিলিয়ে গেল এই এক মুহূর্তে। আর্শির বুকের ভেতরটা কেমন শান্ত হয়ে গেল। এমনভাবে কেউ তাকে শেষ কবে আগলে রেখেছিল মনে করতে পারল না। মনে করার পারার কথাও না। তাকে আগলে রাখার মতো কোনো মানুষই ছিল না। কিন্তু এখন? তাহলে কি কেউ একজন চলে এসেছে তাকে আগলাতে?
আর্শি নেত্রপল্লব পিটপিট করল একবার। সে জানে না আসলে কি হবে ভবিষ্যতে। আর না জানতে চায়। এই বিয়ের পরিণতি কি হবে কে জানে। একটা সূক্ষ্ম দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আর্শির অভ্যন্তর থেকে। দরজায় আবারও শব্দ হলো, সেই সাথে বাইর থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে এলো। আর্শি চমকে উঠল এবার। সাথে সাথে ধ্যান ভেঙে বাস্তবে ফিরে এলো। উঠতে উঠতে বলে উঠল,
“আসছি!”
কথাটা বলে দ্রুত আযরানের হাতটা সরানোর চেষ্টা করল আর্শি। কিন্তু আযরানের ঘুম ভাঙল না। বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। যেন ছাড়তেই চাইছে না। আর্শি কি করবে বুঝতে পারছে না। প্রগাঢ় দৃষ্টিতে তাকাল আযরানের পানে। ঘুমন্ত অবস্থায় আযরানকে একদম নিষ্পাপ লাগছে। কিন্তু সে তো জানে জেগে থাকাকালীন এই নিষ্পাপ দেখতে ছেলেটাই গম্ভীর্যতার আড়ালে একটা বিটকেল। নিমিষেই নাকটা ফুলে গেল আর্শির। দ্রুততার সহিত আযরানের হাত সরিয়ে ছুটে গেল দরজার দিকে। কাঠের দরজাটা খুলতে অপরপাশে বিদ্যমান হলো এক অপরিচিত মুখশ্রী। সামনে দাঁড়ানো মধ্যবয়সী মহিলাটাকে আর্শি চিনলো না। মহিলাটি আর্শির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিল। মুহুর্তে গুটিয়ে গেল আর্শি। কেউ এভাবে তাকালে তার বড্ড অস্বস্তি হয়। সামনে থাকা মহিলাটি এবার হাতে থাকা পানের খিলিটা মুখে পুড়ে বলে উঠল,
“তোমরা নতুন ভাড়াটিয়া আইছো?”
গ্রাম্য টানটান কথা শুনে কৌতুহলী হলো আর্শি। মহিলাটির দিকে কিছুটা উৎসুক দৃষ্টি ফেলে বলে উঠল,
“জ্বি? মানে হ্যাঁ নতুন এসেছি।”
“সাথে ক্যাঠা? জামাই নি?”
এবার যেন মজা পেল আর্শি। কথার ধরনটা তার কাছে কেমন যেন অদ্ভুত শোনাচ্ছে। কিছুটা আনন্দিত চেহেরায় মাথা নেড়ে বলে উঠল,
“জ্বি আমি আর আমার বর।”
মহিলাটা যেন এবার উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আর্শির জন্য কিছুই দেখতে পেল না। এবার পুনরায় মনোযোগ স্থির করল আর্শির দিকে। পানের রসটুকু গিলে গমগম কন্ঠে বলে উঠল,
“আমি তোমার পাশের বাড়িতেই থাকি। খাওনের পানি লাগবো না? একটা কলসি লইয়া নিচে আইসো। এইহানে কিন্তু খাওনের পানি নিচ থেইকা তুইলা নিতে হয়। তোমরা তো নতুন আইছো, না জানলে কেমনে নিবা? এজন্য কইতে আইলাম।”
আর্শি মৌনমুখে দাঁড়িয়ে রইল৷ তাদের কাছে তো কলসি নেই। তাহলে পানি নিবে কিভাবে? আর খাওয়ার পানি নিচে থেকে আনতে হয় এমনটা সে কখনোই দেখেনি। ইতস্তত অনুভব করল আর্শি। মিনমিন করে বলে উঠল,
“জানানোর জন্য ধন্যবাদ আন্টি। তবে..আসলে আমাদের কোনো কলসী নেই। তাই.. ”
কথা শেষ করতে পারল না আর্শি। এর পূর্বেই সামনে থাকা মহিলাটি বলে উঠল,
“সমস্যা নাই আমি দিতাছি। তুমি তাড়াতাড়ি আইয়ো। পানি বন্ধ করে দেওয়ার আগেই।”
মহিলাটা কথাটা বলেই আর দাঁড়াল না। পানের খিলি চিবুতে চিবুতে ধীর কদমে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে আবারও বলে উঠল,
“তাড়াতাড়ি আইসো কিন্তু! পানি বন্ধ হইয়া গেলে আর পাইবা না।”
দরজার সামনে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আর্শি। নতুন জায়গা, নতুন নিয়ম সবকিছুই কেমন অচেনা লাগছে। দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকল সে। পিছনে তাকিয়ে দেখল আযরান এখনো গদির ওপর কুঁকড়ে ঘুমাচ্ছে। মুখটা শান্ত যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তাকে ছুঁয়ে যেতে পারছে। এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল আর্শি। মনে মনে ভাবল ডাকবে কি না কিন্তু পরক্ষণেই মাথা নাড়ল।
“ঘুমাক। কাল রাতেও ঠিক মতো ঘুমায়নি”
নিজের সাথেই বিড়বিড় করে বলল আর্শি। তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে একটা ওড়না জড়িয়ে নিল। চুলগুলো এলোমেলোই রইল। ঠিক করার মতো সময় নেই।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই এক অন্যরকম পরিবেশ চোখে পড়ল। পুরান ঢাকার সেই চিরচেনা গলিঘুপচি। সরু সিঁড়ি। দেয়ালের রং উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। নিচে নামতেই একটা ছোট্ট উঠোনের মতো জায়গা। সেখানে কয়েকটা কল বসানো। চারপাশে বিভিন্ন বয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে লাইন ধরে। কারো হাতে কলসি, কারো হাতে বালতি। আর্শি নিচে নামার সাথে সাথে কয়েক জোড়া চোখ তারদিকে স্থির হলো।
মুহূর্তেই অস্বস্তিতে গুটিয়ে গেল মেয়েটা। আর্শি মাথা নিচু করে দাঁড়ালো এককোণে। শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল কয়েকজনের ফিসফিসানি।
“কালকে নতুন আইছে মনে হয় জামাই নিয়া।”
এমন কতশত কথা। নতুন মানুষ দেখে যেন মানুষগুলোর কৌতূহলের শেষ নেই। তাদের মধ্যে থেকেই সেই মহিলাটা হুট করে আর্শিকে হাত নেড়ে ডেকে উঠল,
“এইদিকে আইসো মা।”
আর্শি এবার যেন একটু স্বস্তি পেল। ধীর কদমে মহিলাটার দিকে এগিয়ে গেল। মহিলাটা একটা মাঝারি সাইজের কলসি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এইটা নাও। এইখানে ধরো। এই কলটা থেকে ভালো পানি আসে।”
আর্শি ধীরে মাথা নেড়ে কলসিটা নিল। হাত কাঁপছে সামান্য। কলের নিচে ধরতেই ঠান্ডা পানি পড়তে শুরু করল। সেই পানির শব্দে কেমন যেন একটা শান্তি লাগল আর্শির। ব্যাপারগুলো তার কাছে নতুন হলেও মন্দ লাগছে না। চারপাশের দৃষ্টি তখনো তার ওপর স্থির। এবার একজন মহিলা পাশ থেকে বলে উঠল,
“নতুন বিয়া করছো?”
আর্শি অল্পস্বল্প মাথা নাড়াল। ভদ্রতার সহিত জবাব দিল,
“জ্বি।”
“তুমি একটু মোটা হইলেও ম্যালা সুন্দর গো।”
মহিলাটার কথায় একদম থমকে গেল আর্শি। এমন সরাসরি মন্তব্য শুনে কী বলা উচিত বুঝে উঠতে পারল না সে। চারপাশে কয়েকজন হেসে উঠল মৃদুস্বরে। আর্শি অপ্রস্তুতভাবে হাসল। সেই সাথে লাজুকতাও ঘিরে ফেলল তাকে। কেউ তাকে এভাবে কখনোই বলেনি। বরং তাকে কতশত কটুবাক্য হজম করতে হয়েছে। এর মাঝেই কলসিটা প্রায় ভরে উঠল। আর্শি দুই হাতে শক্ত করে ধরল কলসিটা। ভারী হয়ে গেছে বেশ। হাত কাঁপছে কিছুটা। আর্শিকে কলসী দেওয়া মহিলাটার নাম জাহানারা। তিনি আবার বলল,
“সাবধানে নিয়ো। পইড়া যাইও না আবার।”
জাহানারা বেগমের আন্তরিকতায় আর্শি মুচকি হাসল। মাথা নেড়ে সাঁই জানালো। চারপাশের দৃষ্টি এখনো আর্শির পিছু ছাড়ছে না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল সে। সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই কলসিটার ভার যেন হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে গেল। কপালে ঘাম জমে উঠল নিমিষেই। হাহ! তার শরীরের বুঝি এইটুকু কলসী নেওয়ার শক্তি নেই? এবার দাঁত চেপে উঠতে লাগল আর্শি। দুই-তিন ধাপ উঠতেই হুট করে একটা শক্ত হাত এসে কলসিটার হাতলটা ধরে ফেলল।কলসিটা তার হাত থেকে একপ্রকার ছিনিয়েই নিল সেই হাতটা।
মুহূর্তের জন্য আর্শি বুঝতে পারল না কী হলো। বুকটা ধক করে উঠল। ভয় আর বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল চক্ষুদ্বয়।
“এই!”
শব্দটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগেই থেমে গেল। কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আযরান। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে এখনো ঘুমের ছাপ। কিন্তু দৃষ্টি স্থির আর্শির ওপর। আর্শি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু কন্ঠে বলে উঠল,
“তুই না ঘুমে ছিলি?”
আযরান ভ্রু কুঁচকে কলসিটার দিকে তাকাল, তারপর আর্শির দিকে। কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“এটা নিয়ে উঠছিলি তুই?”
আর্শি একটু ইতস্তত করে বলল,
“পানি আনতে বলেছিল.নিচ থেকে নিতে হয় নাকি..তাই আরকি ”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আযরান নিঃশ্বাস ফেলল। আর্শির দিকে ঘুমন্ত চক্ষুদ্বয় নিক্ষেপ করে বলে উঠল,
“একবার ডাকতে পারতি।”
আর্শির আর কিছু বললো না। আযরান এগিয়ে এসে আর্শির হাতটা মুঠোয় পুরে নিল। একহাতে থাকা কলসিটা শক্ত করে চেপে আর্শিকে সাথে নিয়ে উপরে উঠতে থাকল। এবার আর কোনো দ্বিমত বা ত্যাড়ামি করল না আর্শি। বরং ভদ্র মেয়ের মতো এগিয়ে গেল আযরানের পিছু পিছু। ঘরে এসেই চলে গেল ছোট্ট রান্নাঘরে৷ অপরদিকে আযরান কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করে চলে গেল ফ্রেশ হতে। দুজনে মিলে নাস্তার পাঠ চুকাল। আর্শি এককাপ চা হাতে রুমে ঢুকতেই নজরে এলো পরিপাটি আযরানকে। কোথাও বের হচ্ছে নাকি? কৌতুহল দমাতে না পেরে প্রশ্ন করে বসল,
“কোথাও বের হচ্ছিস?”
ছোট্ট আয়নার দিকে একবার তাকিয়ে আযরান বলে উঠল,
“হুম! চাকরী খুঁজতে হবে না? নাহলে বউকে খাওয়াবো কি?”
আর্শি হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আযরানের পানে। আযরান চাকরী করবে? কিন্তু ও চাকরী করতে পারবে? কন্ঠে অবাকতা মিশিয়ে আর্শি বলে উঠল,
“তুই চাকরী করতে পারবি? আর তোকে কে চাকরী দিবে এইটুকু বয়সে?”
আযরান একবার আঁড়চোখে তাকাল। বয়স নিয়ে কিছু বললেই তার পছন্দ হয়না। আর এই মেয়েটা বার বার বয়স নিয়েই কেন পরে থাকে? একটা নিঃশ্বাস ত্যাগ করল আযরান। ধীর কদমে এগিয়ে এলো আর্শির নিকটে। নিমিষেই আর্শির বুক ধুরুধুরু করতে শুরু করল। দূরত্ব রেখে থেমে গেল আযরান। কিছুটা শান্ত স্বরে বলল,
“কেন চাকরী করতে পারবো না? আর কথায় কথায় বয়স টানবি না। আর কিছুতে বয়স টানলে তোকে মাথায় তুলে আঁছাড় দিবো।”
বোকা বনে গেল আর্শি। কি এমন বলল যে আযরান তাকে আঁছাড় দিবে? তবে কথাটা খুব একটা পাত্তা দিল না সে। আযরানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠল,
“কেন পাগলামি করছিস আযরান? তুই বাড়ি ফিরে যা প্লিজ। আগের মতোই তুই বাড়িতে থাক আর আমি হোস্টেলে। তোর জন্য হয়তো বড়মাসহ সকলে কষ্ট পাচ্ছে। রাতেও বড়মা কল দিয়েছে। তুই প্লিজ বাড়ি ফিরে যা। এই বিয়ের কোনো মানেই দেখছি না আমি আর না কোনো ভবিষ্যৎ। এর থেকে ভালো ডিভোর্স… ”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৭
মুহুর্তে দু’টো হাত চেপে ধরল আর্শিকে। আযরান নিজের সাথে একদম শক্ত করে চেপে ধরল তাকে। ভয়ে আত্মা বেরিয়ে আসার জোগান আর্শি। আকস্মিকতায় হৃদপিন্ড লাফাচ্ছে। আযরান আর্শির চোয়াল চেপে ধরল তবে শক্তি প্রয়োগ করল না। আযরানের ধূসর চোখদু’টোয় অস্থিরতা স্পষ্ট। আর্শিকে আরেকটু নিজের সাথে মিশিয়ে শক্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“আর একবার এই শব্দ উচ্চারণ করলে একদম জানে মেরে দিবো মুটি। কসম বলছি। তুই সত্যিই আমার হাতে মরবি।”
