নূর ই মহব্বত পর্ব ১১
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
–আবরার! তুমি নিজের জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছ? ওনাকে এই অব্দি কেন এনেছো?
আবরার ঠান্ডা মাথার মানুষ। সে ঠাণ্ডভাবেই সব হ্যান্ডেল করতে চাই। এগিয়ে এসে বললো,
– তুহি, প্লিজ আগে চিৎকার বন্ধ করো। একটু শান্ত হও।
– কি শান্ত হবো? তুমি গলতে পারো কিন্তু আমি না!
– তুহি! ওদের মনে হয় এবার সামনাসামনি বসে কথা বলা দরকার। অনেক তো হলো, আর কতদিন এভাবে নিজের অতীত থেকে পালিয়ে বেড়াবে নওমি?
তুহি রাগ সামলে বললো,
– তুমি কি ভেবে এসব করছো আমি জানি না। আমি বুঝতে পারছি নওমির স্কুলের ঠিকানাও তুমিই দিয়েছিলে!
এবার আযলানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনি কি কথা বলবেন আমি জানি না কিন্তু নওমিকে কোনরকম কথা শুনানোর চেষ্টাও করবেন না বলে দিলাম আর না তো জোরজবরদস্তি। আর যদি আদনানকে নেওয়ার চিন্তা থাকে তাহলে এখনই আসতে পারেন।
আযলান এবার জবাব দিল,
– আমি আদনানকে কেড়ে নিতে আসিনি! ও আমার নিজের রক্ত, নিজের সন্তান ওকে নিতে চাইলে আমি সহজেই নিয়ে নিতে পারতাম কিন্তু জোর করার ইচ্ছে কিংবা মন মানসিকতা কিছুই নেই। আমি শুধু এতো বছরের একটা ভুল বুঝাবুঝি মেটাতে চাই।
তুহি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
– হঠাৎ এত বছর পর আপনার এটা মনে হলো কেন যে এটা ভুলবোঝাবুঝি? কেনই বা মেটাতে ইচ্ছে হলো?
আবরার আর নওমি এতক্ষণ সবটা দেখছিল এখন আবরার তুহিকে থামিয়ে দিল।
– আহ্ তুহি! থামো তো! ওদের সত্যিই কথা বলা প্রয়োজন! পুরো বিষয়টা আমরা কেউই জানি না। হতেই পারে দুজনই পরিস্থিতির স্বীকার?
তুহি গরম চোখে তাকিয়ে বললো,
– যা মন চাই করো তুমি।
বলে সে রুমের দিকে হাঁটা দিল। আবার থেমে পেছন ফিরে বললো,
– নওমির ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি ওকে কোনো চাপ দেওয়া হয় সেটা ভালো হবে না মাইন্ড ইট! আবরার তোমাকেও বলে রাখলাম।
হনহন করে চলে গেল ভেতরে। এদিকে আবরার ওর পেছন পেছন যেতে যেতে বললো,
– ভাই আপনার জন্য তো এখন আমার সংসার ভাঙতে বসেছে! আপনাকে সাহায্য করতে গিয়ে বউ আমারে হু’মকি দিচ্ছে!
আযলান না চাইতেও হাসলো একটু। আবরার যেতে যেতেই বললো,
– ভাই নওমিকে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না জোর করবেন না কিন্তু।
আবরার যেতেই আযলান ধীর পেয়ে এগিয়ে গেল। নওমি আদনানকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। ভয়ে নাকি চিন্তায় জানা নেই কিন্তু ওর গা হাত পা কাঁপছে। আযলান ওর অবস্থা বুঝতে পেরে বললো,
– নওমি…নওমি প্লিজ একটু শান্ত হও। আমি আদনানকে কেড়ে নিতে আসিনি! আমি একটু কথা বলতে এসেছি। আমাদের মধ্যে যা হয়েছে এসব কেউ ষড়যন্ত্র করেই করেছে। প্লিজ একটু ঠান্ডা মাথায় কথা বলি?
নওমি নিজেকে ধাতস্থ করে ঠান্ডা কণ্ঠে বললো,
– আপনার সাথে বলার মতো কিছু নেই। যা হয়েছে সবই কাঁচের মতো পরিষ্কার।
– কিছুই পরিষ্কার না। প্লিজ অনেক কিছু আমাদের আড়াল রয়ে গেছে যার কারণে এই দুরুত্ব!
নওমি ওর কথা শুনতেই চাইছে না। আযলান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। নওমি আযলানের দিকে না তাকিয়ে আদনানকে আরেকটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে রইল। সে এই মুহূর্তে আযলানের কোনো কথাই শুনতে প্রস্তুত নয়।
আযলান কিছুটা জোরের সুরেই অথচ অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
– প্লিজ নওমি! আজ তোমাকে আমার কথা শুনতেই হবে। আমি তোমাকে বসতে বলছি, প্লিজ একটু বসো। সব কথা শোনার পর যদি মনে হয় যে তুমিই ঠিক তাহলে বিশ্বাস করো আমি আর তোমাকে জোর করবো না।
আযলানের অনমনীয় জেদ আর আকুলতা দেখে সে আর ফিরিয়ে দিতে পারল না। একপ্রকার অনিচ্ছা আর ক্ষো’ভ নিয়েই সে সোফাটায় ধপ করে বসে পড়ল। আদনান মায়ের কোল ঘেঁটে তখনো গোল গোল চোখে আযলানকে দেখছিল। আযলানও সেটা দেখেছে কিন্তু তাকাতে পারছে না সে। নিজের ছেলে হয়েও তার দিকে তাকাতে তার ভাবতে হচ্ছে! ওর দিকে চোখ পড়লেই কলিজা মোচড় দিয়ে উঠছে আযলানের।
আযলান নওমির মুখোমুখি একটা সিঙ্গেল সোফায় বসল। কিন্তু কথা শুরু করার আগে সে ভেতরের রুমের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকল,
– আবরার! তুহি! তোমরাও প্লিজ একটু ড্রয়িংরুমে এসো। আমি চাই আজ যা কথা হবে, তা তোমাদের সবার সামনেই হোক।
আবরার আর তুহি ভেতরের রুম থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলো। তুহির মুখে তখনো অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট, আর আবরার বেশ গম্ভীর। সবাই বসার পর আযলান একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নওমির দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বরটা সিরিয়াস,
– আমি এখনো জানি না আমাদের সাথে এই জঘন্য কাজটা কে করেছিল। আমি তোমাকে ইচ্ছে করে ভুল বুঝিনি না তো তুমি…
তুহি চুপ থাকতে পারলো না। কথার মাঝেই বলে উঠলো,
– নিজের স্ত্রীকেই তো আপনি চিনতে পারেননি! এতই যখন টান তাহলে ওকে চিনেন নি কেন? আদনানকে চু’রি করা বাচ্চা বলতেও তো আপনার বাঁধেনি!
কথার মাঝে কথা বলায় আবরার বিরক্ত হলো কিন্তু আযলান বিচলিত না হয়ে বললো,
– আমি আদনানকে চুরি করা বাচ্চা বলিনি! আমি উদাহরণ দিয়েছিলাম! তাছাড়া নওমিকে আমি কখনোই এই বেশে দেখিনি। আমি নিশ্চয়ই আমার চেম্বারে আশা কোনো নারীকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখবো না? এটা আমার পেশাগত নীতিতেও পড়ে না। আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও এই নিকাবের আড়ালের নওমিকে চট করে চিনতে পারত না।
তুহি চুপ হয়ে গেল। এই পর্যায়ে নওমি মুখ খুললো,
– জীবনের এমন একটা পর্যায় কাটিয়ে এসেছি যেখানে দুনিয়ার দিকে তাকালে দেখতাম অনেক মানুষ কিন্তু আমার আপনের তালিকায় একজন ও নেই। এতো এতো লোকের ভিড়ে কেউ যে আমাকে নিঃস্বার্থ ভালবাসবে এমন কেউ ছিলো না! তখন সবদিক শুন্য, দিশেহারা আমি। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম পুরো দুনিয়ায় কেউ না থাকলেও একজন থাকে, যে কখনোই মুখ ফিরিয়ে নেয় না। মহান আল্লাহ্ তাআলা! মনে পড়তেই ফিরে গেলাম তার দরবারে। আর এই কারণেই আমার পরিবর্তন। ধাক্কা খেয়ে শিখলাম মহান রব ছাড়া আপন বলতেই কিছু নেই! আর ওনার দয়াতেই আজ আমি আর আমার আদনান এই কঠিন শহরে কঠিন জীবনে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছি।
তুহি কিছু বলতে চাইলে আবরার থামিয়ে দিয়ে বললো,
– তুহি প্লিজ আগে ওনাকে কথা শেষ করতে দাও।
আযলান দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করলো,
– আমি জানি না কে সেই ডায়েরিটা তোমার ড্রয়ারে রেখেছিল, আর কেইবা বেনামী চিঠিগুলো দিয়েছিল তার হদিস আমি আজও পাইনি। আমি শুধু এতটুকু বুঝতে পেরেছি, আমরা দুজনই কোনো এক তৃতীয় ব্যক্তির কুৎসিত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলাম। যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমাদের আলাদা করা।
– ডায়েরি? চিঠি?
বলেই তুহি নওমির দিকে তাকালো। নওমি ঘাড় উঁচিয়ে মাথা নাড়ল অর্থাৎ এই বিষয়ে সে কিছুই জানে না। আযলান নওমির দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর মুখে বিস্ময়। তুহির মুখটাও হাঁ হয়ে গেছে। আযলান বুঝতে পারল, তিন বছর আগে থেকেই পর্দার আড়াল থেকে যে খেলাটা খেলা হয়েছিল, তার একটা বড় অংশ নওমি নিজেও কোনোদিন জানতে পারেনি। নওমি সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললো,
– কিসের ডায়েরি কিসের চিঠির কথা বলছেন আপনি? এটা আপনার মনগড়া গল্প নয় তার গ্যারেন্টি কি?
– মনগড়া গল্প বলার দরকার কি আমার? যা ক্ষতি হওয়ার তা কি আমার হয়নি? সেই ডায়েরি এবং চিঠি গুলো আমি বহু আগেই পুড়িয়ে ফেলেছি নাহয় তোমাদের সন্দেহ করতে হতো না আমার!
তুহি প্রশ্ন করলো,
– কি ছিলো ডায়রিতে?
– তোমার ড্রয়ার থেকে একটা ডায়েরি পেয়েছিলাম যেখানে লেখা ছিল তুমি আমাকে কখনোই মেনে নিতে পারো নি, আমার অগোচরে অন্য কারোর সাথে জড়িয়ে পড়েছ।
এরপর আযলান চিঠি আর ফোন মেসেজের সব কথা খুলে বললো। নওমি স্তব্ধ হয়ে আযলানের কথাগুলো শুনছিল। তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে হতভম্ব হয়ে বললো,
– আমি কোনদিন ডায়েরিই লিখতাম না! আর না কোনো চিঠি আমার কাছে এসেছে! আর আমার জীবনে আপনি ছাড়া…
বলতে বলতে নওমির গলাটা ধরে এলো। অপমানে আর তীব্র যন্ত্রণায় তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে উঠল। আযলান ধীর কণ্ঠে বললো,
– আমি বুঝতে পারছি কিন্তু সেই ডায়েরির হাতের লেখাটা হুবহু তোমার ছিল। অনেক চেষ্টা করেছি কোনোভাবে মিলানোর যে লেখাটা তোমার নয় কিন্তু সেখানে আমি ব্যর্থ। এমন কোনো নিখুঁত লোক আমাদের পেছনে লেগেছিল, যে তোমার হাতের অক্ষরগুলো অবিকল নকল করতে পেরেছিল। সেদিন ওই ডায়েরিটা দেখার পর আমার মাথা কাজ করেনি। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, কেউ একজন খুব ঠান্ডা মাথায় আমাদের তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।
সবাই এক প্রকার স্তব্দ হয়ে গেছে। এতকিছু তারা কল্পনাও করেনি।
– আপনি এসব নওমির সাথে আলোচনা না করেই ওকে ভুল বুঝলেন? ওকে কি বলা উচিত ছিলো না?
আযলান শান্ত চোখে নওমির দিকে তাকালো। নওমি তাকিয়ে থাকতে পারলো না, সে চোখ নামিয়ে নিলো। আযলান সেভাবেই তাকিয়ে বললো,
– আমি নওমিকে জিজ্ঞেস করেছি কি যা সেটা ওকেই বলতে বলো? আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি নওমি?
নওমি চুপ হয়ে আছে। আযলান হতাশার সুরে বললো,
– নওমিকে আমি সেদিনই জিজ্ঞেস করেছিলাম যেদিন আননোন নম্বর থেকে কল এসেছিল কিন্তু নওমি ভেবেছিল আমি তাকে সন্দেহ করছি। ইভেন যখন আবরারের ছবি দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম তখনও সে কতটা রিয়েক্ট করেছিল জিজ্ঞেস করো তাকেই!
নওমি ফুসে উঠে বললো,
– আমি রিয়েক্ট করেছি? কেন করেছিলাম, সেটা আপনার ওই বড় বড় কৈফিয়তের মাঝে খুব সুন্দর চেপে গেল! বরং আমি খুব কম রিয়েক্ট করেছি বলতে হয়! শুধু আমার দোষটাই দেখলেন নিজেরটা ঢেকে দিলেন!
– মানে? আমি তো বলেছি তোমাকে ভুল বুঝাটা আমার ভুল ছিলো।
– সেইটা তো কোনো ভুলই নয়! এর চেয়ে বড় অপরাধ করেন নি?
আযলান অবাক চোখে তাকিয়ে বললো,
নূর ই মহব্বত পর্ব ১০
– কীসের কথা বলছো নওমি? পরিষ্কার করে বলো?
– আপনার চরিত্র তো ধোয়া তুলসী পাতা! আপনি ঘরে বউ রেখে বাইরে সম্পর্ক রাখেননি?
আযলান চিল্লিয়ে বললো,
– হোয়াট! কি বলছো এসব! আমি কেন বাইরে কারো সাথে সম্পর্ক রাখতে যাবো?
