Mad for you 2 part 1
তানিয়া খাতুন
নেশা… নেশা লেগেছে… প্রেমের নেশা…তাই লায়লা দেবে মজনু কে শশা…
রাতের নির্জনতাকে যেন ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে একটা কর্কশ অথচ মোহময় কণ্ঠ।
গলা ছেড়ে গান গাইছে “দেশের মুখ্যমন্ত্রীর একমাত্র বখাটে ছেলে—ক্ৰিশ খান।”
রাস্তার দু’পাশে ঝাপসা আলো, হালকা কুয়াশার মতো ধোঁয়া, আর তার মাঝেই বজ্রগতিতে ছুটে চলা একটা কালো গাড়ি… যেন মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে।
স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে হাত চেপে ধরে আছে ক্ৰিশ।
উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি, লম্বা-চওড়া শরীর, পেশিতে ভরা বাহু।
জিমে প্রতিদিন ঘাম ঝরানোর ফল তার প্রতিটা নড়াচড়ায় স্পষ্ট।
শ্যামলা গায়ের রঙ, কিন্তু মুখে এমন এক আকর্ষণ, যা একবার দেখলে চোখ সরানো মুশকিল।
তার ঠোঁটের কোণে সেই বেপরোয়া হাসি—যেটা মেয়েদের পাগল করে দেওয়ার জন্যই যেন জন্মেছে।
লম্বা চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালের ওপর পড়ে আছে।
মাঝে মাঝে বাতাসে উড়ছে, আর সেই চুল সরাতে সরাতেই সে আরও বেশি হ্যান্ডসাম হয়ে উঠছে।
প্ৰতিদিনের মতো আজও তার চোখ লাল, পুরো শরীর মদের নেশায় ভাসছে।
গাড়ির স্পিড এতটাই বেশি যে সামনে থাকা গাড়িগুলোকে খেলনার মতো পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।
পাশে বসে থাকা তার একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু—আমান।
তার মুখে ভয় আর বিরক্তির মিশ্রণ।
এই দৃশ্য তার কাছে নতুন না। বরং প্রতিদিনের অভ্যাস।
ক্ৰিশের কাছে মদ, ঝামেলা, আর মারপিট —এই তিনটাই যেন বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
মদ না খেলে, ঝামেলা না করলে, বেপরোয়া কিছু না করলে—তার যেন ঘুমই আসে না।
হঠাৎ করে ক্ৰিশ এক্সিলারেটরে আরও জোরে চাপ দিল।
গাড়ির স্পিড যেন ঝড়ের মতো বেড়ে গেল।
আমান আতঙ্কে সিট চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল—
“এই ভাই! ব্রেক মার! আজকে মনে হয় আর বাঁচবো না!
আম্মু… তুমি নিজের খেয়াল রাখো!”
তার গলায় সত্যিকারের ভয়।
কিন্তু ক্ৰিশের মুখে শুধু বিরক্তি।
“চুপ শাওয়ার নাতি !”—একটা ধমক দিয়ে হঠাৎই সে ব্রেক কষল।
চিড়ধরা শব্দে গাড়ি থেমে গেল রাস্তার পাশে একটা ছোটো দোকানের সামনে।
চাকার ঘর্ষণে ধুলো উড়ে চারপাশ ধোঁয়াটে হয়ে গেল।
আমান কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারল না।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখল—সে এখনও বেঁচে আছে।
সে গভীরভাবে একটা শ্বাস নিল, যেন নতুন জীবন পেল।
অন্যদিকে ক্ৰিশ দরজা খুলে দুলতে দুলতে গাড়ি থেকে নামল।
তার হাঁটায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—নেশা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে।
আমানও ধীরে ধীরে নেমে আসতেই ক্ৰিশ বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল—
“এই… দাড়িয়ে কী করছিস? দুটো সিগারেট নে… আমি আসছি।”
আমান ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
“এখন আবার কোথায় যাবি?”
ক্ৰিশ একচিলতে দুষ্টু হাসি দিয়ে কানের পাশে আঙুল তুলে ইশারা করল—
“মুততে যাচ্ছি… যাবি?”
আমান সাথে সাথে নাক-মুখ কুঁচকে এক পা পিছিয়ে বলল—
“ইসস! না রে ভাই… তুই যা!”
ক্ৰ হালকা হেসে টলতে টলতে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে লাগল।
কোনোরকমে হেঁটে সামনে এগোতে লাগল।
পা দুটো ঠিকমতো তাকে সাপোর্ট দিচ্ছে না—মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে।
চারপাশটা তার চোখে ঝাপসা, মাথাটা ঘুরছে ভয়ানকভাবে।
টলতে টলতে সে একটা অন্ধকার গলির দিকে ঢুকে পড়ল।
গলিটার ভেতরটা আরও নির্জন, রাস্তার আলো ঠিকমতো ঢুকছে না।
ঠিক তখনই—
হঠাৎ একটা তীব্র আলো এসে পড়ল তার মুখে!
একটা স্কুটির হেডলাইট সরাসরি তার চোখে লাগল।
ক্ৰিশ বিরক্ত হয়ে মুখে হাত দিয়ে আলোটা আড়াল করার চেষ্টা করল—
নেশার ঘোরে সে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিল না।
পা তুলে এক পা এগোতেই হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে সামনে হোঁচট খেল—
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
স্কুটিটাও সামনে এসে হঠাৎ জোরে ব্রেক কষল!
চাকার কর্কশ শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে…
ক্ৰিশ সামনে ঝুঁকে পড়ায়,
আর তার কপাল গিয়ে জোরে ধাক্কা খেল স্কুটির সামনের ধাতব অংশে।
এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু যেন থেমে গেল…
তারপরই—
ক্ৰিশের কপাল ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করল।
লাল রক্ত ধীরে ধীরে বেয়ে পড়ছে তার মুখ বেয়ে…
স্কুটির উপর বসে থাকা মেয়েটা ভয় পেয়ে একদম জমে গেল।
তার হাত কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে।
সে তাড়াতাড়ি স্কুটি ফেলে দিয়ে নেমে এল।
দৌড়ে ক্ৰিশে কাছে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে তার কাঁধে হাত রাখল—
“এই… শুনছেন? শুনছেন? কোথায় লেগেছে আপনার?”
তার গলায় আতঙ্ক স্পষ্ট।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে মুখ তুলল…
চোখ দুটো লাল, দৃষ্টি ঝাপসা, কপাল দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অস্পষ্টভাবে হাসল…
তারপর ফিসফিস করে বলল—
“সালা… নেশাটাই বিগড়ে দিল…
এখন লায়লাকে… শশা কে দেবে…?”
তার কথা প্রায় বোঝাই গেল না।
রুহি—কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারল না।
তার শুধু মনে হচ্ছে— মানুষ টা যেকোনো সময় জ্ঞান হারাবে।
ঠিক সেটাই হলো…
ক্ৰিশের শরীর হঠাৎ ঢলে পড়তে লাগল।
“এই! এই!”—চিৎকার করে উঠল রুহি।
সে তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ফেলল,
আর ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে বসে পড়ল ক্ৰিশকে নিয়ে।
ক্ৰিশের মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল সে।
রুহির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ভয়েতে।
সে বুঝতে পারছে না এখন কী করবে।
রুহি তার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।
খুব শান্ত, ভদ্র, মার্জিত… আর ভীষণ ভীতু স্বভাবের।
পড়াশোনায় সবসময় ভালো।
আর কিছুদিন পরেই কলেজে ভর্তি হবে।
এই প্রথম সে একা স্কুটি নিয়ে বেরিয়েছে।
নতুন নতুন চালানো শিখেছে—এখনও পুরোপুরি অভ্যস্ত নয়।
তাও এই স্কুটিটা তার নিজের না…
তার বান্ধবী সিমরানের।
আজ একটু দরকারে নিয়ে বের হয়েছিল।
কিন্তু যদি সে জানত—
এভাবে অজানা ঝামেলায় জড়িয়ে যাবে…
তাহলে সে কোনোদিনই আজ বের হতো না…
রুহি কাঁপা হাতে ক্ৰিশের কপালের রক্ত থামানোর চেষ্টা করছে,
আর বারবার ডাকছে—
“এই… চোখ খুলুন… প্লিজ চোখ খুলুন…”
কিন্তু ক্ৰিশের চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে…
রুহি কোনো উপায় না পেয়ে তাড়াতাড়ি নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা খুলে ফেলল।
হাত কাঁপছে তার… বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে ভয় আর অজানা দুশ্চিন্তায়।
ব্যাগের ভেতর থেকে নিজের সাদা রুমালটা বের করল সে।
ক্ৰিশের কপাল দিয়ে এখনও টপটপ করে রক্ত পড়ছে।
“ইশ… কী করব এখন…”—নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল রুহি।
তারপর কাঁপা হাতে রুমালটা ভাঁজ করে ক্ৰিশের কপালের ওপর চেপে ধরল।
ধীরে ধীরে শক্ত করে বেঁধে দিল, যাতে রক্তপাতটা অন্তত কিছুটা থামে।
ক্ৰিশ তখন প্রায় অচেতন…
তার শ্বাস ধীর হয়ে আসছে, চোখ বন্ধ, মুখ ফ্যাকাশে।
রুহির বুকটা কেঁপে উঠল।
হঠাৎ সে নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছোটো ডায়েরি বের করল।
পাতা উল্টে দ্রুত কিছু একটা লিখতে লাগল।
হাত এতটাই কাঁপছে যে লেখাগুলোও কাঁপা কাঁপা হয়ে যাচ্ছে।
লেখা শেষ করে সে তাড়াতাড়ি পাতাটা ছিঁড়ে নিল।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করল…
তারপর সেই কাগজটা ক্ৰিশের শার্টের পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিল।
ধীরে ধীরে ক্ৰিশের মাথাটা নিজের কোল থেকে নামিয়ে মাটিতে আলতো করে রাখল সে।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটু পেছনে সরে গেল।
চোখে অপরাধবোধ, ভয়…
মৃদু কাঁপা গলায় বলল—
“ক্ষমা করবেন… আমাকে এখনই যেতে হবে…
আমি বাড়িতে না বলে বেরিয়েছি…
এখন না ফিরলে আম্মুর হাত থেকে বাঁচব না…”
কথাগুলো বলেই থেমে একবার ক্ৰিশের দিকে তাকাল—
তারপর হঠাৎ ঘুরে দৌড়ে বেরিয়ে গেল গলির বাইরে, বড় রাস্তায়।
চারপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগল—
“কেউ আছেন? প্লিজ… হেল্প!”
ঠিক তখনই—
দূর থেকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল একজনকে।
সে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল—
“এই শুনো বোন! একটা কালো টি-শার্ট পরা ছেলে কে… দেখেছ?”
রুহির চোখে যেন হঠাৎ আশা জ্বলে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল—
“হ্যাঁ! হ্যাঁ! উনি ওখানে… এক্সিডেন্ট হয়েছে… প্লিজ চলুন!”
বলে সে আবার দৌড় দিল গলির ভেতরে।
পেছনে পেছনে —আমানও—দৌড়ে এল।
গলির ভেতরে ঢুকেই আমান ছুটে গিয়ে ক্ৰিশকে তুলে নিল—
“ক্ৰিশ! এই ক্ৰিশ! চোখ খোল!”
তার গলায় আতঙ্ক, চোখে ভয় স্পষ্ট।
রুহি পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে…
গলা শুকিয়ে গেছে তার।
ধীরে ধীরে বলল—
“আমি… আমি যাই… আপনি প্লিজ ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যান…”
এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না সে।
দৌড়ে গিয়ে স্কুটিটা তুলে নিল।
হাত কাঁপলেও কোনোরকমে স্টার্ট দিল।
একবারও পেছনে তাকাল না…
কিন্তু মনটা ভারী হয়ে আছে।
অদ্ভুত একটা অপরাধবোধ বুকের ভেতর চেপে বসেছে।
“আমি কি ভুল করলাম…?”—নিজেকেই প্রশ্ন করল সে মনে মনে।
তবুও এখন তার কিছু করার নেই।
রাত অনেক হয়ে গেছে…
আর দেরি করলে সত্যিই বাড়িতে বিপদ হবে।
স্কুটির গতি বাড়িয়ে সে অন্ধকার রাস্তার ভেতর মিলিয়ে গেল…
