Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪১ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪১ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪১ (৩)
রুপান্জলি

চোখ বুজে বালিশে হেলানা দিয়ে বসে আছে অর্পনা, চোখ ভাসছে গতকাল রাতের কিছু আবছা দৃশ্য। সে দ্বীপের সাথে অনেকটাই ক্লোজ ছিলো,, নিজে থেকেই ক্লোজ হয়েছিলো সেই সাথে অনেক কথাও বলছে যেসব হয়তো তার স্বভাবের বাহিরে। তবে কি কি বলেছিলো সেসব মনে করতে পারছেনা। আপাতত সেসব মনে করার চেষ্টায় আছে। সে কি এমন কোনো কথা বলে ফেলেছে? যা কেউ জানেনা? আদ্রিয়ানকে আগে ভালোবাসতো কিংবা সেদিন রাতে তার সাথে হওয়া অন্যায়ের কথা? দ্বীপ কি জানে সে পুরোপুরি পবিত্র নয়? তার শরীরে লেগে আছে একাধিক পুরুষের ছোয়া? সেসব জেনে দ্বীপের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? সকাল থেকে দ্বীপ একটা কথাও বলেনি।

এমনকি ঘুম থেকে উঠার পর দ্বীপকে রুমেও দেখা যায়নি। যাই একটু আগে রুমে এসেছে,, এসে কোনো কথা বার্তা না বলে সাথে সাথে ওয়াসরুমে ঢুকে গিয়েছে। তবে কি দ্বীপ কাল রাতে তার বিষয়ে সব জেনে গিয়েছে? তার তো জ্বর এলে হুস থাকে না। ম*দ খাওয়া মাতালের মতো পেটের ভিতরে থাকা সব কথা কোনো দ্বীধা ছাড়াই উগরে দেয়। কাল ও হয়তো এমন কিছুই হয়েছে যার ফলে দ্বীপ ঘৃণায় তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না। অতিরিক্ত চিন্তায় মাথা ব্যাথা করছে অর্পনার। সে চোখ খুলে সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে চসমাটা বের করে নিলো। চোখে চসমা লাগিয়ে মেসেঞ্জারে ” ভুতের আড্ডা ” গ্রুপে গিয়ে সবার উদ্দেশ্য মেসেজ পাঠালো,, সে আজ ভার্সিটিতে যাবেনা,, তারা যেনো ওকে না খোঁজে। মেসেজ দিয়ে আবারও বালিসে হেলান দিয়ে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে রইলো। যতো দিন যাচ্ছে তার জীবনটা কেমন দুর্বিসহ্য হয়ে উঠছে। কবে তার মুক্তির পালা আসবে? এতোটা আয়ু থাকার কি খুব প্রয়োজন? এবার আয়ুটা শেষ হয়ে যাক, সেও চিরতরে মুক্তি নিক এই কষ্টকর জীবন থেকে। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ওয়াসরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে অর্পনাকে উদাসীন হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকালো দ্বীপ। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে অর্পনার দিকে এগিয়ে এলো,, গালে কপালে হাত দিতেই বুঝলো জ্বর এখনো পুরোপুরি সারেনি। গালে গলায় ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই দ্বীপের দিকে তাকালো অর্পনা। দ্বীপ ওর পাশে বসে গালে হাত বুলিয়ে বললো — এখন কেমন লাগছে?

,,, অর্পনা ছোট করে বললো — ভালো।
,,, চলো, গোসল করলে আরও বেটার লাগবে। গোসল শেষ করে খাবার খেয়ে লক্ষি মেয়ের মতো ঘুমাবে,, আমি দুপুরের দিকে ফিরে আসবো।
,,, অর্পনা এই বিষয়ে কিছু বললো না তবে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো— সকালে কই গিয়েছিলেন?
,,, তোমার জন্য ফ্রুটস আর ড্রিংকস আনতে, ওপাশে রেখেছি খেয়াল করোনি?
,, নাহ!!
,,, সরি, টায়ার্ড লাগছিলো তাই কিছু না বলেই শাওয়ার নিতে চলে গিয়েছিলাম। রাগ করেছো?
,,, অর্পনা মাথা ঝাকিয়ে না করলো। মানে রাগ করেনি। দ্বীপ উঠে গিয়ে চিরুনি এনে অর্পনার বেনি করা চুলগুলো খুলে দিয়ে আচরাতে লাগলো। এখন আর এসবে অবাক হয়না অর্পনা, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে!! কিছু সময় পর অর্পনা নরম স্বরে বললো — কিছু প্রশ্ন করবো? ঠিকঠাক উত্তর দিবেন?

,,, বলো!!
,,, সত্যিটা বলবেন?
,,, আমি উত্তর দেওয়ার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেও মিথ্যা বলিনা।
,,, কাল রাতে আমি আপনাকে কিছু বলেছি?
,,, কোন বিষয়ে?
,,, যেকোনো।
,,, হুম অনেক কিছুই বলেছো।
,,, কি কি জানেন আপনি আমার সম্পর্কে?
,,, পুরোটাই!!
,,, পুরোটা বলতে?
,,, তোমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা।
,,, সবটা?
,,, হুম!!
,,, কবে থেকে জানেন?
,,, তোমার সঠিক পরিচয় জানার পর থেকে।
,,, আমার মাম্মা পাপ্পার সেপারেশন সম্পর্কে?
,,, হুম!! জানি।
,,, আমার শৈশব সম্পর্কে?
,,, হুম!!
,,, কিশোর বয়সে কাউকে ভালোবাসতাম !!
,,, আই নো!!
,,, কাকে বাসতাম সেটা?
,,, জানি!!
,,, সারে চার বছর আগের সেই ঘটনা?
,,, জানি!!
,,, আমি যে অপবিত্র, আমার শরীরে যে একাধিক পুরু,,

,,, অর্পনার ঠোঁট দুটো দুই আঙ্গুলে চেপে ধরলো দ্বীপ,, আবার সাথে সাথে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁটে হাত বুলিয়ে বললো– তুমি অপবিত্র নও, তুমি আমার দেখা সবচেয়ে পবিত্র সত্যা, যার পদধূলিতে আলোকিত হয়েছে আমার অন্ধকার জীবন। যার মুখ চেয়ে এখনো বেঁচে আছি আমি। তুমি আমার সেই পবিত্র অংশ যেটা আমার বুকের বাম পাজর থেকে বানানো হয়েছিলো। আমার পাজর কখনোই অপবিত্র হতে পারেনা ভেলোরা৷ এসব নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করবেনা। কারন তোমার করা প্রশ্ন গুলো আমাকে কম, তোমাকে ব্যাথিত করবে বেশি।
,,, অর্পনার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো। আজ দ্বিতীয় বারের মতো প্রকাশ্যে কেঁদে দিলো অর্পনা। চোখে জমা পানিটুকু অবলিলায় ঝড়ে পরলো গাল বেয়ে। সে অসহায়ের মতো বললো — আমি চাইনি আপনি জানুন, নিজেকে আজকের পর খুব নিচু মনে হবে। আপনার চোখ চোখ রেখে কথা বলার সাহস পাবোনা।
,,, বলতে বলতে মাথা নিচু করে নিলো অর্পনা। দ্বীপ তর্জনী আঙুলের সাহায্যে অর্পনার সুশ্রি মুখাটা তুলে, গালে গাল ঘষে সব পানি মুছে দিলো। চোখের পাতায় চুমু খেয়ে সব পানি শুষে নিতে নিতে বললো– এভাবে কথা বলবে না, আমার বিরক্ত লাগছে। আমার ভেলোরা তো এতোটা ভঙুর নয়, সে খুব স্ট্রং। তার কন্ঠে এসব নরম কথা মানায় না। তুমি হবে ভয়াঙ্কর,, যে সারাক্ষণ হাসবেন্ডকে আতঙ্কে রাখবে। এমন ভাবে কথা বলবে যেনো হাসবেন্ডের রাগ আকাশ চুম্বি হয়ে যাবে তবুও ফিরতি একটু রাগ দেখাতে না পারে। তুমি সারাক্ষণ আমায় জ্বালিয়ে পু্রিয়ে আমার জীবনটা ছাড়খার করে দিবে। তোমায় কেউ পানি হতে বলেনি ভেলোরা,, তুমি আগুন হয়ে জ্বালিয়ে দাও আমায়।

,, দ্বীপের কথায় মলিন হাসলো অর্পনা, তার ভালো লাগছেনা। দ্বীপকে কেনো সবটা জানতে হবে? এতোটা দুরন্দর হওয়া কি খুব প্রয়োজন ছিলো? তার তো বাঁচতে ইচ্ছা করছে না,, নিজেকে ঘৃণা হচ্ছে। সে তো ইউজ্ড,, ইচ্ছাকৃত হোক কিংবা অনিচ্ছাকৃত তাকে তো সত্যি ই ইউজ করা হয়েছিলো। এসব প্রকাশ হওয়ার পর আর কি নিয়ে বরাই করবে সে? তার কাছে তো কিছুই রইলো না। এজন্যই বোধহয় দ্বীপ ওকে কোনোদিন সিরিয়াসলি নেয়নি। দ্বীপ তো আগে থেকেই জেনে গিয়েছিলো সে যতই উপরে উপরে শক্ত থাকুক না কেনো ভিতরে ভিতরে তার মতো ভঙ্গুর নারী এই পৃথিবীতে খুব কম ই আছে। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ওকে কোলে তুলে নিলো দ্বীপ। অর্পনা কিছু বললো না, কিছু বলার মতো এনার্জি পেলো না। দ্বীপ ওকে নিয়ে বাথটবে বসিয়ে দিয়ে,, কাবার্ট রুম থেকে একটা টিশার্ট আর জগার্স এনে হেঙ্গারে রাখলো । টাওয়ালটা হাতের কাছে রাখতে নিতেই অর্পনা প্রশ্ন করলো — এই ড্রেস কেনো?
,,,দ্বীপ স্যাম্পু আর স্যাুপ এগিয়ে দিয়ে বললো — সমস্যা কোথায়? আগে তো পরতে এসব, এখনো পরবে। বাড়িতে এসব পরা নিয়ে কোনো প্রবলেম নেই তবে বাহিরে যাবার বেলায় লং ড্রেস পরে ঘোমটা দিয়ে যাবে। সম্ভব হলে মেধার মতো বোরকা পরবে। মানো আর না মানো, আমার ওয়াইফ তুমি। মির্জা বাড়ির বউ,, সেদিক থেকে তোমার নিজেকে হেফাজত করা উচিৎ!!

,,, অর্পনা ঠোঁট বাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বললো– নোংরা জিনিস যতই ঢেকে রাখুন না কেনো গন্ধ তো ছড়াবেই।
,,, অর্পনার কথায় ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো দ্বীপ,, দাতে দাত পিষে বললো– অসুস্থ বলে রাগতে চাচ্ছিনা, যথেষ্ট নরম স্বরে কথা বলছি। তোমার বেলায় আমি যতটা ধৈর্য ধরি এতোটা ধৈর্য আমি আমার ৩১ বছরের জীবনে কারোর জন্য ধরিনি,, এমনকি পারমিতার জন্য ও না। সুতরাং, দূর্বলতার সুযোগ নিবেনা ভেলোরা। আমার হাত কিন্তু যথেষ্ট শক্ত, গালে পরলে ঠিক থাকতে পারবেনা। চুপচাপ গোসল করে নাও আমি বাহিরে অপেক্ষা করছি। গোসল শেষ হলে আমায় ডাকবে কেমন?

,,, অর্পনা কিছু বললো না, মাথা নিচু রেখে বসে রইলো। ওকে এরকম ভাবে দেখতে একটু ও ভালো লাগছেনা দ্বীপের, বুকের ভিতর রক্ত ক্ষরন হচ্ছে। লোকে বলেনা? যে যেমন তাকে নাকি তেমন রুপেই মানায়? অর্পনার বেলায় ও তাই,, অর্পনা যেমন কাটখোট্টা ওকে তেমন কাটখোট্টা রুপেই মানায়। গতকাল হয়তো ক্ষনিকের জন্য বাচ্চামি করেছিলো,, ওটা ওই ক্ষনিকের জন্যই মানানসই। দ্বীপ অর্পনার গাল আকরে ধরে ঠোঁটের কোনে শক্ত চুমু খেয়ে বললো– এভাবে থাকিস না জান। আমার কাছে তর এতো হেজিটেশন কিসের? আমি আর তুই কি আলাদা? তুই তর সম্পর্কে যা জানিস, আমি তা জানলে ক্ষতি কি? আমার কাছে তুই নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ নারী তুই,, আমার সামনে অন্তত নিজেকে নিচ ভাবিস না।
,,, অর্পনা জলজল চোখে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বললো– দয়া করছেন?
,,, দ্বীপ অর্পনার চোখে জমা জল টুকু মুছে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো– নিজেকে দয়া করা যায়না জান,, তুই তো আমার। আমার আমিকে আমি নিজে কিভাবে দয়া করবো? বল!!

,,, বেলা ১২ টার কাছাকাছি,,
,,, শরীরের উপর ভারি কোনোকিছুর উপস্থিতি টের পেয়ে নড়ে উঠলো অর্পনা। হঠাৎ পেটে উদ্ভট স্পর্শ পেতেই ধরফরিয়ে উঠলো মেয়েটা। অসুস্থ শরীর নিয়েই হাসতে হাসতে কাবু হয়ে গেলো। পেটে স্পর্শ করা হাত গুলো সরানোর চেষ্টা করতে করতে বললো — ওফফ!! ছাড়, আমি সিক। বাদরের দল তরা এখানে কি করছিস? ছাড় নারে বাপ, আল্লাহ!!
,,,সাথে সাথে শুনা গেলো চার মূর্তির অট্টহাসির শব্দ। রাত্রি আর ইরা মিলে অর্পনার পেটে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করতেই অর্পনা না চাইতেও হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতে লাগলো। হাসতে হাসতে একসময় সবার চোখ দিয়ে পানি চলে এলো। শেষে ক্লান্ত হয়ে ইরা আর রাত্রি অর্পনার গায়ের ওপর মাথা হেলিয়ে দিতেই অরুণ এগিয়ে এসে অর্পনার হাত ধরে ঝটকা মেরে টেনে তুললো। ইরা আর রাত্রি পাশাপাশি শুয়ে থাকায় হঠাৎ টানে রাত্রির নাক গিয়ে ধাক্কা খেল ইরার মাথায়। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো দুজন। রাত্রি উঠে বসে নাক ঘষতে ঘষতে হেসে ফেললো। ইরাও মাথা ডলতে ডলতে হেসে ফেললো। ওদের হাসিটা মনে হয় পছন্দ হলো না পল্লবের। সে এগিয়ে গিয়ে ইরা আর রাত্রির মাথা ধরে আবারও ঠাস করে বারি মেরে ইনোসেন্ট ফেইস বানিয়ে বললো–
— একবার ঠাস খেলে আবার খেতে হয়, নয়তো শিং গজাবে!

,,, রাত্রি আর ইরা আবার ব্যাথা পেয়ে ফোসফোস করতে করতে পল্লবের দিকে তাকালো, পরপর নিজেরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হেসে একটু এগিয়ে এসে পল্লবের মাথা ধরে দুজনে ধাম করে পল্লবের মাথায় বারি মারলো। পল্লব তো ব্যাথা পেলোইনা উল্টো দুজন ব্যাথা পেয়ে ওমা ওমা করতে করতে আবার বিছানায় লুটিয়ে পরলো। ওদের কান্ড দেখে অর্পনা হাসতে হাসতে কুসন জড়িয়ে ধরে অরুনের পেটে মাথা হেলিয়ে দিলো। সেই সুযোগে অরুন ঠাস করে অর্পনার গালে চর মেরে বললো — কিরে তর নাকি জ্বর এসেছে, দেখি তো চেক করে।
,,, বলতে বলতে কপাল ধরে জ্বর চেক করার নাম করে ঠাস করে কপালে ঠুয়া পারলো। অর্পনা ব্যাথাতুর শব্দ করে অরুনের পেট থেকে মাথা তুলতেই আরেক গালে জ্বর চেক করার নাম করে চর মারলো। পরপর গলায় চেক করার জন্য হাত বাড়াতেই অর্পনা অরুনের হাত ধরে বললো — এবার কি গলা টিপে ধরবি কুত্তা? সর এখান থেকে। তরা আমার শ্বশুর বাড়িতে কি করছিস? আর আমার যে জ্বর এসেছক এটা তদের কে বললো?

,,, তুমি অসুস্থ বলে ভাইয়া নিজে গিয়ে ওনাদেরকে নিয়ে এসেছে। যেনো তোমার একটুখানি ভালো লাগে। ভাবো তো আমার ভাইয়া তোমায় ঠিক কতোটা ভালোবাসে। তার পরেও তুমি আমার ভাইয়াকে দুচ্ছাই দুচ্ছাই করো।
,,, বলতে বলতে ট্রে হাতে রুমে ঢুকলো পরশী। তার মাথায় লম্বা ঘোমটা যেনো ওকে পাত্র পক্ষ হতে দেখতে এসেছে। অর্পনা ভ্রু কুচকে পারশীর দিকে তাকালো। যেই মেয়ে সারাদিন চুল গুলো দুই ঝুটি করে হেলো কিটি টিশার্ট আর প্লাজু পরে ঘুরে বেড়ায়, সেই মেয়ে থ্রিপিস পরে ঘোমটা দিয়ে বধু সাজে তার রুমে এসেছে তাও পল্লবকে পটানোর জন্য? বাহ বাবা বাহ!! বলতে হবে,, নাটকের জন্য মির্জারা সেরা রে,, তবে দ্বীপের করা কাজে অর্পনার মনে কিছুটা শীতল হওয়া বয়ে গেলো। লোকটা তাকে একটু বেশি ই বুঝে। নয়তো সব ছেড়ে বন্ধু বান্ধবকে ডাকতো না। তার মনের অবস্থা এখন যতটা করুন, এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো এই চারজনকে। আর লোকটা সেই প্রয়োজন বুঝতে পেরে তাদেরকে হাজির করেছে। অর্পনা কৃতজ্ঞ,, আজকের জন্য গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ হলো দ্বীপের প্রতি। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ফোনে মেসেজ আসলো,, অর্পনা জানে এই মেসেজের মালিক কে? একমাত্র তিনি একজন ব্যাক্তি যে টাকা খরচ করে তাকে মেসেজ দেয়। অর্পনা ফোনের স্ক্রিন অন করে সাটার টানতেই দেখলো,, সেখানে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা — মন ভালো করার ঔষধ পাঠিয়ে দিলাম,, বাড়ি ফিরে যেনো আগের মতো অগ্নিরুপি অর্পনাকে দেখতে পাই। যার চোখে নির্লিপ্ততা থাকলেও কথায় হাজার ক্ষানিক মরিচের ঝাজ মিশে থাকে। যে পাউকে পরোয়া করেনা এমনকি নিজের হাসবেন্ডকেউ না। তোমার সাথে দেখা করিনি বলে রাগ করোনা,, খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ পরে গিয়েছে। আর আমি থাকলেও তোমরা ভালো মতো আড্ডা দিতে পারবে না,, আন-ইজি ফিল করবে। তাই আপাতত চলে যাচ্ছি, সন্ধায় ফিরে আসবো। ফ্রেন্ডদের সাথে ইনজয় করো কেমন? নিজের খেয়াল রেখো।

,,, অর্পনার ঠোটে হালকা হাসি ফুটলো,, এই প্রথম দ্বীপের কথায় শায় জানিয়ে রিপ্লাই পাঠালো– ওকে!! আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।
,,, পরশী ভালো মতো ঘোমটা টেনে রাত্রি আর ইরার দিকে শরবত এগিয়ে দিলো। পরপর অরুনের দিকে এগিয়ে দিতেই অরুন মুচকি হেসে বললো — ধন্যবাদ বেয়ান!!
,,, অরুনের আন্তরিকতায় লাজুক হাসলো পরশী,, মাথা ঝাকিয়ে ফিরতি ধন্যবাদ জানিয়ে পল্লবের দিকে এগিয়ে গেলো । অরুন এখনো পরশীর দিকেই তাকিয়ে আছে,, বিষয়টা রাত্রির চক্ষু আড়াল হলো না,, তার বুকটা মুচর দিয়ে উঠলো। অরুন কেনো এই মেয়েটার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে? মেয়েটা তো খুব সুন্দরি,, নিশ্চয়ই খুব পছন্দ হয়েছে? ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো,, তবে কাঁদলো না। নাক টেনে নিজেকে সামলে নিলো। তৎক্ষনাৎ রুমে এলো মেধা। সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে রাত্রির দিকে চোখ যেতেই চোখ ছোট ছোট করে নিলো। পরপর কৌতুহল বসত প্রশ্ন করলো– তোমার নাকে কি হয়েছে রাত? এরকম লাল হয়ে আছে কেনো?
,,, অর্পনা হালকা হেসে বললো– আর বলোনা মেধাপু!! এরা এসে থেকে তুমুল মারামারি বাঁধিয়ে দিয়েছিলো। মারামারি করতে গিয়ে এতোটা ব্যাথা পেয়েছে ব্যাচারি।
,,, পল্লব ফোরন কেটে বললো– এতোটাও ব্যাথা পায়নি আপু,, সবটাই ওর গায়ের রঙের জন্য। ধবল রুগি,, একটু ব্যাথা পেলেই লাল নীল হয়ে যায়।

,,, পল্লবের কথায় মুখ ভেংচালো রাত্রি। পল্লব বিপরীতে হাত তুলে চর দেখালো মানে এরকম করলে থাপ্পড় মারবে,, রাত্রি আবার মুখ ভেংচালো। ওদের আবার ঝগড়া করতে দেখে মেধা হালকা ধমকের স্বরে বললো– কি করছো এসব? এই বয়সে এরকম মারামারি করলে হবে? বড়ো হচ্ছো না? মেয়েটার নাক তো পুরো লাল টকটকা বানিয়ে ফেলেছো৷ যাও সবাই মিলে বারান্দায় গিয়ে আড্ডা দাও। অর্পনা নিয়ে যাও ওদের। আর পরশী!! তর কি কান্ড জ্ঞান হবে না? রুমে বসিয়ে কেউ খাবার দেয়? বলদি একটা!! যাহ সব নিয়ে বেলকনির রেস্ট টেবিলে রেখে আয়। রেখে আমার পিছন পিছন আয়, আরও খাবার আনতে হবে।
,,, পল্লবের সামনে বলদি বলায় খুব লজ্জা পেলো পরশী,, মুখটা কাচুমাচু করে বললো — তুমি যাও আমি আসছি।
,,, মেধা শায় জানিয়ে চলে গেলো। মেধা যেতেই পরশী অবশিষ্ট গ্লাসটা নিয়ে পল্লবের কাছে গেলো। নতুন বউয়ের মতো লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললো– নিন, আপনার শরবত!!
,,, পল্লব শরবত নিতে হাত বাড়াতেই পরশী নিজ উদ্দমে সেটা এগিয়ে দিলো। পল্লব গ্লাসে হাত রাখতেই পরশী ইচ্ছা করে পল্লবের হাতের সাথে হাত স্পর্শ করালো। পরপর কারেন্টের ঝটকা খাওয়ার মতো ভান করে মাথার ঘোমটা ধরে ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে গেলো। পারশীর কান্ডে হতবুদ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো পল্লব। তাকিয়ে আছে বাকি চারজন ও। পরশী যেতেই হেসে উঠলো সবাই। অর্পনাকে হাসতে দেখে পল্লব ভ্র বাকিয়ে বললো — তর ননদের মাথায় কোনো প্রবলেম আছে? ডক্টর দেখাস না কেন?

,,, অর্পনা হাসি কমিয়ে কৌতুক স্বরে বললো — এতোদিন তুই যাকে দেখতি তার সাথে ফ্লার্ট করতি,, আজ আমার ননদ তর সাথে করছে। সমস্যা কি? তরা দুটোই এক কম্পানির ম্যানাজার।
,,, ইরা বললো — এটা ঠিক বলেছিস, তদের খুব ভালো মানাবে। ভেবে দেখতে পারিস পল্লব, মেয়ে কিন্তু মাশাল্লাহ!!
,,, পল্লব শরবতে চুমুক দিয়ে বললো — ক্ষমা কর!! অর্পনার ননদ আরও বেশি ন্যাকা,, দেখলিনা কেমন সিনেমার মতো অভিনয় করে পালালো? এরকম মেয়ে আমার মনে ধরার মতো না।
,,, অর্পনা বললো — আমার ননদের হাজারটা রুপ,, বাঁচতে পারলে বেঁচে যাস। আশা করি ফেঁসে যাবি। আচ্ছা!! চল বারান্দায় যাই,, ওখানের পরিবেশটা খুব সুন্দর।

,,, পল্লব আর কথা বাড়ালো না,, তার কোনো মেয়ের প্রতি ইন্টারেস্ট জাগেনা। পরশীর প্রতি তো কোনোভাবেই না। তথাকথিত যেই আঠারো জন এক্সের কথা সবাই জানে ওসব ও ফেইক। মুলত পল্লব কোনোদিন কোনো মেয়েকেই জীবনে এলাও করেনি। কোনো একদিন একজন বলেছিলো, পল্লব নাকি প্লে বয়, তার সাথে আর যাই হোক ভালোবাসা হওয়ার নয়। চেহারা দেখেই কেমন প্লে বয় প্লে বয় গন্ধ পাওয়া যায়। সেদিন থেকে পল্লব প্লে- বয়। আর কখনো তার কাছে নিজেকে সুদ্ধি প্রমান করার চেষ্টা করেনি,, সেও ব্যাক্তি পল্লবকে খুঁজতে যায়নি। এই খোঁজ অখোঁজের খেলায় পল্লব চলে গেলো একদিকে আর ঐ মানুষটা হাড়িয়ে গেলো নিজের গন্তব্যে।
,,, বারান্দায় এসে সবাই এদিক ওদিকে গিয়ে পুরো বারান্দাটা দেখতে লাগলো। বারান্দাটা বেশ বিশাল আর অসম্ভব সুন্দর। চারদিকে ফুলের চাড়াগাছ যাতে ফুটে আছে নানান জাতের ফুল। একপাশে ছোট্ট একটা সুইমিং পুল, তার পাশে দোলনা,, দেওয়ালে এন্টিকের আসবাবপত্র,, একদিকে দ্বীপ আর অর্পনার অনেকগুলো ছবি একসাথে করে ঘর বানিয়ে রাখা। খেয়াল করলে দেখা যায় সবগুলো ছবি অর্পনার নয় কয়েকটা ছবি পারুর ও আছে। সেই ছবিগুলো দেখতে দেখতে ইরা অর্পনার উদ্দেশ্য প্রশ্ন করলো — তর খারাপ লাগেনা অর্পন ?
,,, অর্পনা এগিয়ে এসে পারুর একটা ছবি ছুয়ে বললো — আমি নিজেই সাজিয়েছি। সুন্দর হয়েছে না?
,,, অর্পনার কথায় বড্ড অবাক হলো ইরা। কতো অবলীলায় ভাগ করে নিচ্ছে দুজন অথচ আদ্রিয়ানের মুখে অর্পনার নাম শুনলেই ইরার আত্মা কেপে উঠে, বুকে জ্বালা করে। ইরা কিছুটা সাহস নিয়ে প্রশ্ন করলো — আদি স্যারের কথা তর মনে পরেনা অর্পন?

,,, অর্পনা মলিন হেসে বিরবির করে বললো — আমাদের তাকেই মনে পরে যাকে আমরা ভুলে যাই, উনি আমার ঘৃনায় মিশে আছে,, মরার আগে যা শেষ হওয়ার নয়।
,,, বিরবির করে বলায় ইরা বুঝলো না কথাটা। ফের প্রশ্ন করলো — উত্তর দিবি না?
,,, কি দিবো?
,,, মনে পরে?
,,, মাঝে সাজে।
,,, কখনো যদি জানতে পারিস উনি ভালো নেই?
,,, আমি জানি উনি ভালো নেই।
,,, কিভাবে জানিস?
,,, সব জানার কারন থাকে না।
,,, এতোটা কনফিডেন্ট?
,,, বুঝাপড়াটা তেমনি!!
,,, তর মায়া হয়না?
,,, এক জীবনে ভালো থাকতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। খারাপ তো অনেকেই থাকে,, বলতে গেলে ভালো থাকা মানুষের বড্ড অভাব এই দুনিয়ায়।

,,, ওদের কথোপকথনের মাঝে কয়েকজন মেইড, পরশী আর মেধা এক গাদা খাবার নিয়ে হাজির হলো। চিপ্স, কোল্ড ড্রিংক্স, কয়েক পদ মিষ্টি, ফ্রুট্স, আইসক্রিম, কয়েক রকম ডেসার্ট। মেধা দ্রুত তাড়া দিলো সবাইকে যেনো এখোনি এসব খেয়ে শেষ করে। খাওয়া শেষ করে আবার নিচে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে হবে। বাড়ির কর্তিতা পুরো দমে রান্না চাপিয়েছে তাদের জন্য। মেধার কথায় প্রথমে সবাই নাকোচ করলেও অর্পনা, মেধা আর পরশীর জোরাজোরিতে মানা করতে পারলো না। অগত্যা সবাই গোল হয়ে চেয়ারে বসলো,, মেধা আর পরশী ও আড্ডায় সামিল হলো। আড্ডা দিতে দিতে রাত্রি খেয়াল করলো তার ডান পা টা কবজা করে নিয়েছে কেউ। ধীরে ধীরে আগলে নিচ্ছে নিজের পায়ের তলায়। পরিচিত স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো মেয়েটা, এক হাতে পরনের কামিজ খাঁমচে ধরে নিজেকে ঠিক রাখার প্রয়াস চালালো, তবে স্পর্শ কারি মানবের বোধহয় রাত্রির সামলে নেওয়াটা পছন্দ হলো না তাই স্পর্শের পরিমান বৃদ্ধি করলো। রাত্রি পা সরাতে চেয়েও সরাতে পারছেনা। অরুনের এই নিরব টরচারে বরাবরি দূর্বল হয়ে পরে রাত্রি। অগত্যা এবারেও দূর্বল মন নিয়ে অরুনের দিকে তাকালো তবে সাথে সাথেই মনটা ভেঙে চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেলো। অরুনের পাটা তার পায়ের উপর থাকলেও নজর পরশীর দিকে স্থির। পরশী ও কেমন লাজুক লাজুক হাসছে,, তবে কি অরুন ভুল করে তার পায়ে পা দিয়েছে? ভাবনাটা মনে আসতেই জোর করে পা ছাড়াতে চাইলো তবে অরুন শক্ত করে আটকে রাখায় পারলো না। রাত্রি ঢোক গিলে নিজেকে ঠিক রেখে ফোন বের করে অরুনের ফোনে টেক্সট পাঠালো– অরুন!! পা টা আমার,, তুই বোধহয় কিছুটা ভুল করে ফেলেছিস।
,,, মেসেজ সেন্ড হওয়ার সাথে সাথে অরুন ফোন তুলে নিলো। রাত্রির পা থেকে পা সরিয়ে রিপ্লাই করলো– ওপ্স সরি!! আমি ভাবলাম বোধহয় পরশী।

,,, মনের সন্দেহ সত্যি হতেই মলিন হাসলো রাত্রি, টাইপ করলো– ইট্স ওকে!! এবারের মতো কিছুই বললাম না, এরপর থেকে যাকে ছুতে চাস তাকে ঠিক ঠাক বুঝে তারপর ছুবি। নয়তো এতে অন্যরা বিরক্ত হয়। যাই হোক, নতুন জীবনের জন্য কঙ্গ্রেট্স। ভাবিনি এতো দ্রুত মনের মতো কাউকে পেয়ে যাবি। বেস্ট অফ লাক ডিয়ার এনিমি!!
,,, অরুন চোখ তুলে রাত্রির দিকে তাকালো। মেয়েটা ওকে এতোটা খারাপ ছেলে ভাবে? এতোটা? ভাবুক!! ওর ভাবনাকে সত্যি প্রমান করতে রিপ্লাই করলো– থ্যাংক ইউ!! বাট তুই কি ভেবেছিলি, সারা জীবন তর জন্য হা পিত্তেস করবো আমি? ইম্পসিবল!! তকে বলেছিলাম না তর থেকেও হাজার গুন সুন্দর মেয়ে বিয়ে করে দেখাবো আমি? দেখ, তর থেকে ভালো, ভদ্র, সুন্দর আর ওয়েল স্টাটাস ওয়ালা মেয়ে তর সামনে বসে আছে। অর্থমন্ত্রীর মেয়ে সে,, তুই কে? তর কি আছে? পরিচয় কি? নিজেকে দেখ আর পরশীকে দেখ,, তদের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ঐযো বলেনা? আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে,, আমার সাথেও তাই হয়েছে। তকে হাড়িয়ে আমি উত্তম কিছুর হুদিস পেয়েছি এবার পরশীর মেনে নেওয়ার পালা। ও মেনে নিলেই বিয়েটা করে ফেলবো। এই পড়ালেখা দিয়ে কি হবে? বিয়ে যেহেতু করতেই হবে,, এখনি করে নিবো। আমার বাপের কি কম আছে? তর মতো হাজারটা রাত্রিকে লালন পালন করার ক্ষমতা দিয়েছে আমায় তার মধ্যে পরশী তো নাদান বাচ্চা। ওকে আগলে রাখা কোনো ব্যাপার না,, একবার বিয়েটা হয়ে গেলে খুব আদর করবো আমার বউকে। যতটা তকে করেছি তার থেকেও হাজার গুন বেশি,, প্রতিটি পারতে পারতে আমার আদর মিশে থাকবে। খুব ভালোবাসবো আমার বউকে,, খুব!!
,,, দীর্ঘ মেসেজ পড়ে অরুনের দিকে সরাসরি তাকালো রাত্রি। অরুন তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো,, রাত্রিকে তাকাতে দেখে বক্র হাসলো, তাতে মিশে আছে হাজারটা তুচ্ছতাচ্ছিল্যকর বার্তা। বিনিময়ে রাত্রি শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হাসলো,, ঠোঁট নাড়িয়ে বললো — বেস্ট অফ লাক।

,,, পরপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। রাত্রির এই স্বাভাবিক থাকাটা পছন্দ হলো না অরুনের। কথামতো রাত্রির চোখে এখন পানি থাকার কথা ছিলো। কষ্ট দেওয়ার জন্য এতো কথা বললো অথচ মেয়েটা কষ্ট পেলো না? সব সহাস্যে মেনে নিলো? কেনো মানলো? এতোটা বুঝদার কেনো সাজবে রাত? সে কাঁদছে না কেনো? অরুনের ভিতরটা হাসফাস করে উঠলো। ইচ্ছা হলো রাত্রির গালে দুটো থাপ্পড় মেরে বলতে “” কাঁদছিস না কেনো? কাঁদ,, না কাঁদলে তর ভালোবাসা বুঝবো কি করে আমি? “” কিন্তু পারলো না। নিচের দিকে ঝুকে রাতের পা খুজে আবারও পা রাখলো অথচ ওপাশ নিস্তব্ধ,, রাত্রি কোনো প্রতিক্রিয়া করছে না। অরুন মেসেজ অপশনে গিয়ে আবার মেসেজ পাঠালো তবে মেসেজ ডাইভার্ড হলো না,, সম্ভাবত অরুনকে ব্লক করে দিয়েছে রাত্রি। হয়তো আর কথা বলতে চায়না, কথা বাড়াতে চায়না, আর না তাদের সম্পর্কটা বাঁচাতে চায়। রাত্রির নির্লিপ্ততায় অরুন ও অভিমান করে ফোন রেখে দিলো,, রাতের পা থেকে পা সরিয়ে এনে চেয়ার ছেড়ে উঠে পুল সাইডে চলে গেলো। ভালো লাগছে না তার,, কিভাবে রাতের মনের কথা জানবে তার রাস্তা পাচ্ছেনা,, রাতকে বুঝতেই পারছেনা সে।

,,,, রাত ১১ টা বেজে ২৫ মিনিট।
,,, মনোযোগ সহকারে বই পড়ছে অর্পনা। দ্বীপ সোফায় বসে কাজ করতে করতে বার বার অর্পনার দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটা যখন পড়তে বসে তখন তাকে আলাদা রকম সুন্দর লাগে। ছিমছাম গড়নে ফ্রী সাইজ টিশার্ট, লুজ ট্রাওজার, চুলগুলো হাত খোপা করা,, চোখে গোল ফ্রেমের চসমা। এই চসমাটার প্রেমে বহুবার পরেছে দ্বীপ । অর্পনা যখন চোখে চসমা লাগিয়ে পড়তে বসে তখন দ্বীপ এক ধ্যানে শুধু অর্পনাকেই দেখতে থাকে। চসমা পরলে কাউকে এতোটা সুন্দর লাগে? এতোটা? কিভাবে পসিবল? জীবনে চলতে ফিরতে বহুবার বহু নারীকে সানগ্লাসে দেখেছে দ্বীপ, তবে এতোটা মোহনীয় কাউকে লাগেনি। একবারের বেশি তাকাতেও ইচ্ছা করেনি। তবে অর্পনার বেলায় সে নজর ফিরাতে পারেনা,, নিজের মাঝেই থাকেনা। দ্বীপ অর্পনার দিকে তাকিয়ে থেকেই নরম স্বরে বললো — চসমাটা খুলে ফেলো।
,,,অর্পনা চোখ তুলে তাকিয়ে দ্বিধান্বিত কন্ঠে বললো — হোয়াই? এনি প্রবলেম? আসলে পড়তে বসলে এটা লাগে আমার নয়তো মাথা ব্যাথা করে।

,,, দ্বীপ শায় জানিয়ে বললো — হুম!! খুব বড়ো প্রবলেম।
,,, কেনো কি হয়েছে?
,,, তুমি চসমাটা খুলে পড়তে বসো,, আসলে আমি কাজে মন দিতে পারছিনা। বার বার অবাধ্য নজরটা তোমার চোখে আটকে যাওয়ার পায়তারা করছে। বড্ড নিরুপায় আমি, নিজেকে সামলাতে পারছিনা।
,,, অর্পনার ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠলো আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না দ্বীপের দিকে। চসমা না খুলে অন্যদিকে তাকিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারছেনা। কানে বার বার প্রতিদ্বনি হচ্ছে “” চসমাটা খুলে ফেলো, আমি কাজে মন দিতে পারছিনা,, আমি বড্ড নিরুপায় “” এভাবে বলাটা দাগ কাটলো অর্পনার মনে। এতোটা মায়া ছড়ানো মানুষটা তাকে ভালোবাসেনা অথচ সর্বোক্ষন প্রেমিকের মতো আচরন করে। এসব কি আদেও মানা যায়? অর্পনার ভাবনার মাঝেই গ্রুপ থেকে কল এলো আর সাথে সাথে কেটে গেলো। পরপরি মেসেজের টোন বাজলো,, গ্রুপ থেকে মেসেজ এসেছে তাই ফোন হাতে নিলো অর্পনা। স্ক্রিনে ভাসা মেসেজটা চোখে লাগতেই হাতটা থরথর করে কেপে উঠলো,, ফোনটা খেই হাড়িয়ে পরলো বিছানায়। দ্বীপ অর্পনার দিকেই তাকিয়ে ছিলো,, ওকে এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলো দ্বীপ। অর্পনার পাশাপাশি বসে গালে হাত রেখে বললো– কি হয়েছে জান? এভাবে কাপছো কেনো? শরীর খারাপ করছে?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪১ (২)

,,,, অর্পনা কিছু বলতে পারলো না, তার মস্তিষ্ক যেনো হেং মেরে গিয়েছে,, কোনো কথাই গ্রহন করতে পারছেনা। অর্পনাকে শক্ত হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ ওর বাহু ধরে হালকা ধাক্কা দিতেই দ্বীপের বুকে ঢলে পরলো অর্পনা। হকচকিয়ে গেলো দ্বীপ, অর্পনাকে আগলে নিয়ে গালে চাপর মেরে কয়েকবার ডাকলো তবে সারা পেলো না। পরোক্ষনেই মনে পরলো অর্পনা ফোনে কিছু একটা দেখেছে,, কিন্তু সেটা কি? ভাবতেই তাড়াহুড়ো করে অর্পনার ফোনটা তুলে নিলো। স্ক্রিনে ভাসছে পল্লবের মেসেজ
— রাত্রি সুইসাইড করেছে,, ল্যাভ এইডে আছি,, দ্রুত চলে আয়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here