অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪
তোনিমা খান
–“কাছেই ছিলেন, ভালো ছিলেন, জৈবিক সকল চাহিদা পূরণ করার জন্য আপনার কাছে ভরপুর সুযোগ ছিল। তাই হয়তো কুঁড়ে ঘরে ফেলে আসা দারিদ্র্যতায় মোড়া ঘরটিতে পড়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর সাহস হয়নি, তাই না?”
রূপকথা ম্লান কণ্ঠে শুধাল। বিধ্বস্ত ওয়াহেদ ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“এমনটা নয়, রূপকথা। আমি ওই অবস্থায় নিলীমার মুখোমুখি হওয়ার সাহস জোগাতে পারিনি। চোখের সামনে ওকে ভাঙার সাহস আমার হয়ে ওঠেনি।”
কতটা ঠুনকো অযুহাত! দশটা বছর নিজের স্ত্রী সন্তানকে অবর্ণনীয় ক্লেশের মাঝে রেখেছে শুধুমাত্র এই ঠুনকো কারণে? রূপকথা শব্দ করে হেসে উঠল। অথচ চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“আপনার অযুহাতগুলো শুনে আপনার প্রতি ঘৃণা আর অভিযোগ আরো বেড়ে যাচ্ছে, খালুজান। আপনার সাহস হয়নি আমার সেই মায়ের সামনে দাঁড়ানোর , যেই মা আপনার অসুস্থতায় বিনা অভিযোগে সেলাই কাজ করে ঘর চালিয়েছে? আপনার সকল দুঃসময়ে যে বিনা অভিযোগে পাশে ছিল, তাকে গিয়ে একটাবার বুঝিয়ে বলার সাহস আপনার হলো না? অবশ্য, বিপদে পড়ে যদি কেউ এত সুখ আর অর্থবিত্ত পায়, তবে এমন সাহস না হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
পরক্ষণেই রূপকথা প্রচন্ড উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আপনি কখনো আমার মাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করেছিলেন, হ্যাঁ? স্ত্রী হিসেবে সম্মান করেছিলেন? আমাদের ভালোবেসেছিলেন? আপনি একজন প্রকৃত স্বামী আর বাবা হলে যেকোনো মূল্যে আমাদের খোঁজ নিতেন, যোগাযোগ করতেন। কিন্তু আপনি কী করলেন? আপনি তাকে চোখের সামনে ভাঙতে দেখার সাহস পাননি, কিন্তু আড়ালে লুকিয়ে তিলে তিলে ভেঙেছেন। ওই মহিলা আজও আপনার অপেক্ষায় দিন গোনে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি তার সাথে জেনেশুনে কোনো অন্যায় করতেই পারেন না। আর আপনি সামান্য এই কারণগুলো দেখিয়ে বলছেন, আপনি এই কারণে দশ বছর পর্যন্ত আপনার স্ত্রী সন্তানের খোঁজ নেননি?”
–“আমি প্রতিমাসে তোমাদের জন্য টাকা পাঠাতাম, রূপকথা।”
টাকা? রূপকথা বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল বাবা নামক মানুষটির দিকে। হতবাক হয়ে শুধায়,
–“আমার মায়ের সাথে কী আপনার টাকার সম্পর্ক ছিল? আর কোনো সম্পর্ক নেই? বৈবাহিক সম্পর্ক মানে কী শুধুই ভরণপোষণ? আমার মা আজ পর্যন্ত আপনার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, যত্ন এগুলো যা লালন করে আসছে। অথচ আপনার কাছে এই সম্পর্কের মানে শুধুই টাকা? আপনি কী আদৌও খোঁজ নিয়েছেন, আমার মা ওই টাকা আজ পর্যন্ত ছুঁয়েছে কি-না? কখনো ফিরেও তাকায়নি ওই টাকার দিকে। কারণ কী জানেন? আমার মা টাকা নয় আপনাকে চাইতো।”
ওয়াহেদ অনুতাপে জর্জরিত কণ্ঠে বলল,
–“আমি দোষী রূপকথা। আমার ভুল হয়েছে সবটা লুকিয়ে রাখা। আমার তখনই জানানো উচিত ছিল নীলিমাকে।”
রূপকথা ম্লান হাসল। বলল,
–“আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন, খালুজান। ভাগ্যিস আপনি লুকিয়ে ছিলেন! আমার মা যে আপনার কাছে শুধুই একটা ‘দায়িত্ব’ ছিল, তা তো আজ প্রমাণিত হলো। নয়তো দশ বছর শুধুমাত্র সাহসের অভাবে নিজের স্ত্রী-সন্তান থেকে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে? পারে না। ভালোবাসা আর বিশ্বাস থাকলে তাকে এতটা যন্ত্রণা দিতে পারতেন না; সব ছেড়েছুড়ে তার কাছে গিয়ে সত্যটা জানাতেন।”
মেয়ের চোখেমুখে ভরপুর ঘৃণা। একরত্তি সহানুভূতি কিংবা করুণা নেই সেখানে। ওয়াহেদ ব্যর্থতার নিঃশেষিত শোক নিয়ে তাকিয়ে রইল। মিহি স্বরে বলল,
–“আমায় ক্ষমা করা যায় না রূপকথা? নীলিমা আমার দায়িত্ব নয়, আমি ওকে আজও ভীষণ ভালোবাসি, সম্মান করি। আর সেই ভালোবাসার টানেই ওকে দুঃখ দেওয়ার সাহস পাইনি।”
নির্জনা বেগম শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লেন। শিরদাঁড়া আর উঁচু করার শক্তি পায় না। তার ছেলে আর বোন তার ঋজু শির ভেঙে দিয়েছে।
সে কী করে মৌনতা আর রূপকথার চোখে চোখ মেলাবে? এদের ক্ষতিপূরণ করবে কী করে?জীবনটা এতটা জটিল না হলেও পারত।
তপোবন শ্রান্ত নয়নে তাকিয়ে থাকে বিধ্বস্ত মেয়েটির দিকে। ইচ্ছে করছে কঠিন এই দুনিয়া থেকে ঝট করে মেয়েটিকে আড়াল করে নিতে, কিন্তু… পাপ কখনো পিছু ছাড়ে না। একদিন না একদিন ঠিক খুঁজে নিয়ে বেদনা দিয়ে যায়।
ওয়াহেদ ফের অনুনয় করল,
–“প্লিজ রূপকথা, বাবাকে একটা সুযোগ দাও।”
মেঝেতে উদ্ভ্রান্তের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসা নিঝাম চমকে উঠল ওয়াহেদের কথায়। চোখের সামনে নিজের জীবনের সর্বোচ্চ সুখটুকু হারিয়ে যেতে দেখে সে তখন উন্মাদ হয়ে উঠল। নিরুপায় সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে ছুটে নিচে নেমে যায়। ওয়াহেদ নিঝামের পরবর্তী পদক্ষেপ আন্দাজ করতে পারলেও আজ খুব একটা বিচলিত হলো না। আজ সে ভীষণ ক্লান্ত!
–“একটা সুযোগ দেব? সদ্য সুখের মুখ দেখা আমার মাকে আরেকবার ভেঙে চুরমার করার জন্য?”
–“প্লিজ রূপকথা।”
উপস্থিত সকলে রূপকথার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু রূপকথা নিরুত্তর।
তকদির সিকদার গম্ভীর স্বরে বললেন,
–“বড় বউমা যেটা সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই হবে, ওয়াহেদ। ভুলটা তোমার ও ছিল, আমরা মরে যাইনি। আমাদের জানাতে পারতে কিন্তু তুমিও নিঝামের কর্মকাণ্ড গুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছ।”
শশুরের কথায় রূপকথা ম্লান হাসল। তার সিদ্ধান্ত? সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে এখন সবাই তার থেকে সুযোগ আর সিদ্ধান্ত চাচ্ছে।
ছন্নছাড়া শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে রূপকথা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দেহে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই সামনের মানুষটার সাথে এই ঘৃণ্য কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“সুযোগ চাচ্ছেন? দিলাম সুযোগ। বিগত দশ বছর যেমন অজস্র সুযোগ থাকতেও আমাদের খোঁজ নেননি, তেমন আরেকবার হারিয়ে যান। এমনভাবে হারিয়ে যান, যেন আপনার কোনো অস্তিত্বই নেই। আমার মা বহু কষ্টে হাসতে শিখেছে, একটু সুখের মুখ দেখেছে। তার সেই সুখটুকু ছিনিয়ে নেবেন না। আপনার হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সামলে আজ দশ বছর পর সে একটু শান্তিতে আছে। কিন্তু নিজের স্বামীকে অন্য নারীর সাথে দেখাটা তার জন্য নরকীয় যন্ত্রণার সমান হবে। আমার মা মরে যাবে। প্লিজ, একেবারে চলে যান আমাদের জীবন থেকে। আপনার কাছে আমার আর কোনো চাওয়া নেই।”
রূপকথার চোখ থেকে অনর্গল অশ্রু ঝরছে। ওয়াহেদ বলহীন দেহে শুধু তাকিয়ে রইল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“দোষ যখন করেছি, তখন অন্তত ক্ষমাটুকু করে দাও। নয়তো মরেও যে শান্তি পাবো না, আম্মা।”
–“আমাদের মতো হতদরিদ্র মানুষের ক্ষমার আপনার কী প্রয়োজন? আপনারা বড়লোক মানুষ! ওসবের প্রয়োজন নেই আপনাদের।”
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রূপকথা ছেলের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। তানশান পিছু নিতে যাবে, তার আগেই নিঝামের ক্ষিপ্র কণ্ঠ ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। পরক্ষণেই শোনা গেল নিহামের ভয়ার্ত কন্ঠে চিৎকার,
–“পাপা, প্লিজ সেভ মি!”
রূপকথার পা থমকে গেল। সেই আকুতিভরা ‘পাপা’ ডাকটি শুনে বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইল তবুও গলধঃকরণ করে নিলো।
সকলে বিরক্ত হয়ে কড়িডর থেকে নিচে উঁকি দিল। কিন্তু আকস্মিক তাদের উদাসীন চিত্ত কেঁপে উঠল নিঝামকে নিহামের গলায় ছুরি ধরতে দেখে। তপোবন হতভম্ব হয়ে গেল ছুরিটা দেখে। ওটা মাংস কাটার ছুরি। সে চেঁচিয়ে উঠল,
–“ছোট খালামনি, পাগলামির একটা সীমা আছে! ওর গলা থেকে ছুরি সরাও। ও ছোট মানুষ, ভয় পাচ্ছে। বড়দের দ্বন্দ্বে বাচ্চাকে টানছ কেন?”
তপোবন ছুটে নিচে নামে। নির্জনা বেগম হুঙ্কার দিয়ে বললেন,
–“নিঝাম, পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই? ওর গলা থেকে ছুরি সরা!”
তপোবন আর তকদির সিকদারকে এগিয়ে আসতে দেখে উদ্ভ্রান্ত নিঝাম কঠোর স্বরে বলল,
–“একদম আমার কাছে আসবে না তোমরা!”
তপোবন তবুও থামল না। নিঝাম তৎক্ষণাৎ ছুরিটা আরেকটু চেপে ধরে বলল,
–“খবরদার তপোবন, আর এক পা-ও এগোবে না, নয়তো আমি ছুরি চালিয়ে দেব! ওয়াহেদকে নিচে পাঠাও, আমি বাড়ি যাব।”
পরক্ষণেই চিৎকার করে বলল,
–“ওয়াহেদ… ওয়াহেদ নিচে এসো! তোমার হাতে দুই মিনিট সময়। এর মধ্যে না আসলে আমি ওর গলায় ছুরি চালিয়ে দেব। আর তুমি ভালো করেই জানো, আমি শুধু শুধু হুমকি দেই না।”
নিঝামের বজ্রকণ্ঠে ওয়াহেদ উদাসীন চিত্তে দোতলা থেকে নিচে তাকাল। আজ ছেলের এই দশাতেও তার মাঝে কোনো বিচলন নেই। সে ক্লান্ত স্বরে বলল,
–“চালিয়ে দাও। এরপর আমিও নিজেকে শেষ করে দেব। সব ঝামেলা একেবারে মিটে যাবে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে নিঝাম, আর সহ্য করতে পারছি না। চালিয়ে দাও, দ্রুত করো!”
রূপকথা চমকে তাকাল নিঝাম আর ওয়াহেদের দিকে। ওয়াহেদের এমন নির্ভীক কণ্ঠে নিঝাম অস্থির হয়ে পড়ল। সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“আমি কিন্তু সত্যি সত্যি চালিয়ে দেব ওয়াহেদ! তুমি কি তোমার ছেলেকে ভালোবাসো না?”
–“ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণাগুলো আজ অনেক বেশি ভারী হয়ে গিয়েছে, নিঝাম। আর এই ভার আমি বইতে পারছি না।”
–“এসব ন্যাকামি আমার সাথে করবে না, ওয়াহেদ! তুমি নিচে এসো। আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকব না। তুমি এই কারণেই এখানে আসার জন্য এত আগ্রহী ছিলে, তাই না? নিচে নামো!”
ওয়াহেদ চোখে চোখ রেখে বলল,
— “বললাম না আসব না? তোমার যা ইচ্ছা করো।”
ছুরিটা নিহামের মসৃণ নরম চামড়া ছুঁয়ে যাচ্ছে। তকদির সিকদার রাগে কাঁপছেন। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
–“নিঝাম, তুমি একটা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ। তুমি সুস্থ মানুষের মাঝে থাকার যোগ্য নও। ওকে ছাড়ো বলছি, নয়তো ফল ভালো হবে না।”
নিহাম ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তপোবনের দিকে তাকাল। আকুতিভরা কণ্ঠে বলল,
–“ভাইজান, আমি ব্যথা পাচ্ছি। প্লিজ সেভ মি!”
নিঝাম উপরে তাকিয়ে ফের তেজি কণ্ঠে বলল,
–“ওয়াহেদ শুনছ? নিহাম ব্যথা পাচ্ছে। আমি কিন্তু মোটেও ফাঁকা হুমকি দিচ্ছি না। নিচে আসো।”
ওয়াহেদ নির্বাক, নিস্তেজ। চামড়া ভেদ করে লাল রক্তবিন্দু দৃশ্যমান হতেই তপোবন ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটি ক্রিকেট বল হাতে তুলে নিয়ে সোজোরে নিঝামের মাথা বরাবর আঘাত করলো।
তীব্র আঘাতে নিঝাম ‘আহ’ করে মাথা চেপে ধরল। সে অপ্রস্তুত হতেই তকদির সিকদার দ্রুত নিহামকে নিজের কাছে টেনে নিলেন।
নিঝাম চেঁচিয়ে উঠল,
–“ওকে আমার কাছে দাও! ও আমার ছেলে, আমি ওর সাথে যা খুশি তাই করব।”
নিঝাম নিহামকে নিয়ে টানাটানি করতে গেলে তকদির সিকদার তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিঝামের গালে এক চড় বসিয়ে দিলেন। নিঝাম সোফার কোণে মুখ থুবড়ে পড়ল। কাঠের সাথে মাথায় আঘাত লেগে তার চোখের সামনে মুহুর্তেই সব অন্ধকার হয়ে এল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে নিস্তেজ হয়ে পড়ল।
তপোবন অচেতন দেহটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
–“আব্বু, ছোট খালামনি বিকৃত মস্তিষ্কের হিংস্র এক মানুষ। এভাবে তো সে যেকোনো সময় কারো বড় ক্ষতি করে ফেলবে।”
তকদির সিকদার চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
–“ওকে এখন এভাবে রাখা যাবে না। ওকে আটকে রাখতে হবে, ওর চিকিৎসার প্রয়োজন।”
রোজের হাত ধরে নির্জনা বেগম নিচে নামলেন। নিহামকে কোলে নিতেই দেখলেন গলায় সূক্ষ্ম ক্ষত। তিনি অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললেন,
–“ও কি মা, নাকি কসাই? নিজের সন্তানের গলায় কেউ ছুরি ধরতে পারে?”
তপোবন দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্স এনে নিহামের গলায় ওষুধ আর ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিল। নিহাম তখনো ভয়ে কাঁপছে। তপোবন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আশ্বস্ত করল,
–“আর ভয় নেই নিহাম। ভাইজান আছে তো!”
নিহাম ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
–“মাম্মাকে আমার খুব ভয় লাগে, ভাইজান। আমি মাম্মার কাছে যাব না… প্লিজ আমাকে মাম্মার সাথে পাঠিও না। মাম্মা আমাকে অনেক মারে।”
“কোথাও পাঠাব না তোমাকে। তুমি আমার কাছেই থাকবে। মাম্মা আর তোমাকে মারতে পারবে না।”
তপোবন নিহামকে নিয়ে তার ঘরে চলে গেল। তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল। গলার ব্যথা ভুলতে নিহাম বিনা বিবাদে ঘুমের আশ্রয় নেয়। নিহাম ঘুমিয়ে পড়তেই তপোবন বের হয়। যেতে যেতে তানশানকে বলল,
–“আব্বু, ওর সাথে থাকো।”
–“কিন্তু মিমি?”, তানশানের উৎকণ্ঠা ভরা কণ্ঠ।
–“মিমি ঠিক আছে, চিন্তা করো না। আমি দেখছি। তুমি একটু পর যেও, এখন আপাতত ওকে একটু সময় দাও। ভয় পেয়েছে যে!”
–“ওকে পাপা।”
তপোবন বেরিয়ে আসে। নিঝামকে গেস্ট রুমে শুইয়ে দিয়ে দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে দেয়া হলো।
তপোবন নিচে নামতেই ওয়াহেদ, তকদির সিকদার, নির্জনা বেগমকে দেখে বলল,
–“ডাক্তার আনাচ্ছি আমি।”
তকদির সিকদার থমথমে মুখে বললেন,
–“আনো।”
তপোবন ডাক্তারকে ফোন করে সোফায় বসে। নতশির ওয়াহেদের পানে চেয়ে বলল,
–“খালুজান, হারিয়ে যাওয়া বাবার থেকে কারণ হিসেবে রূপকথা স্বাভাবিক ভাবেই পজেটিভ কোনো কারণ শুনতে চাইতো। কোনো মেয়েই চায় না তার বাবাকে ঘৃণা করতে। কিন্তু সেটা সে পায়নি। তাই তার এমন আচরণকে আমি খুব একটা অন্যায় বলব না। কিন্তু এতকিছুর পর এটাও সত্য, আপনিও কোথাও না কোথাও একটু হলেও বাধ্যবাধকতার শিকার ছিলেন। তবে বাধ্যবাধকতার থেকেও আপনার সুযোগ সুবিধা আরো বেশি ছিল। কিন্তু আপনি সেগুলো কাজে লাগাননি। দশ বছরে নিজের পরিবারকে না হোক অন্তত আমাদের জানাতে পারতেন ছোট খালামনির কর্মকাণ্ডের কথা। আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতাম।”
তকদির সিকদার ব্যগ্র কণ্ঠে বললেন,
–“দেখা যাচ্ছে, নিঝামের এই উগ্রতাগুলোকে তুমিই প্রশ্রয় দিয়েছো ওয়াহেদ।”
তপোবন শুধায়,
–“আপনি এখন কী করতে চাইছেন খালুজান? দয়াকরে আজ অন্তত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কোনো প্রকার দ্বিধা করবেন না।”
ওয়াহেদ নত শির ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আমি শুধু নিলীমার সাথে একটু কথা বলতে চাই, তপোবন। ও আমার সব কথা শুনে যা শাস্তি দেবে আমি তা মাথা পেতে নেবো।”
নির্জনা বেগম ম্লান কণ্ঠে বললেন,
–“তবে আজকেই চলে যাও বাগেরহাটে। নিঝামকে আমরা দেখে নেবো।”
–“উঠলে আবার ঝামেলা করবে। যদি জানে আমি বাগেরহাটে গিয়েছি তবে নিহামকে মেরেই ফেলবে।”, ওয়াহেদের কথায় তকদির সিকদার গমগমে স্বরে বললেন,
–“তুমি কি মনে করো সেটা আমি হতে দেব? নিহামকে আমি আর ওর হাতে দিচ্ছি না। ও সুস্থ নয়, ওর কাছে বাচ্চাটা সুরক্ষিত নয়। ওর চিকিৎসা প্রয়োজন।”
–“ও কাউকেই শান্তিতে থাকতে দেবে না। আমি আপনাদের ওপর আর আপদ চাপাতে চাই না।”
ওয়াহেদের কথায় নির্জনা বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
–“ওর অভিভাবক আমি। ওর ভালো-মন্দের ব্যবস্থা করার জন্য আমি এখনো বেঁচে আছি। তুমি শুধু বলো, তুমি কী চাও?”
বিগত দশ বছরের মানসিক যন্ত্রণায় ক্লান্ত ওয়াহেদ বলল,
–“আমি শুধু একটু শান্তি চাইছি, আপা। আমি নিঝামের থেকে চিরতরে মুক্তি চাই। আমার আর নিহামের প্রতিটা দিন যেন জাহান্নামের মতো কাটে।”
–“আর নিলীমা?”
–“আমি ওর সামনে দাঁড়াব। ক্ষমা চাইব। এরপর ও যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি মেনে নেব।”
নির্জনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“তোমার সাথে যা হয়েছে তা অন্যায়, কিন্তু তুমি নীলিমা আর তার সন্তানদের সাথে যা করেছ, সেটাও অন্যায়। তোমার বিচার করবে নিলীমা, আর আমি আমার বোনের ব্যবস্থা করব। নিঝাম সুস্থ মানুষের মাঝে থাকার যোগ্য নয়। আমি ওর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করব। ও আর তোমাদের জীবনে বাধা হবে না, আমি কথা দিচ্ছি।”
ওয়াহেদের চোখেমুখে মুক্ত পাখির ন্যায় উচ্ছ্বাস! চোখে আনন্দের অশ্রু! মাঝে মাঝে জীবন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়ায়, যেখানে একটা ক্ষমা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ!
আজ একটা ‘ক্ষমা’ ওয়াহেদকে হয়তো নতুনভাবে বাঁচতে সাহস জোগাবে। কিন্তু নিলীমা? আত্মসম্মানে বলীয়ান নারীটি তাকে ক্ষমা করবে তো?
জীবন আর বয়সের কঠিন দোরগোড়ায় থাকা রূপকথা নিতান্তই অপরিপক্ক এক শ্রান্ত পথিক। যেখানে জীবন প্রতিটা মোড়ে দুঃখ দিতে চায়— অথচ বয়সটা এত ভারী দুঃখ নেয়ার জন্য সামর্থ্যবান নয়।
কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যদি দুঃখ দেয়, দুঃখ ভার বহন করার ক্ষমতাও দেয়। আর রূপকথার সেই ক্ষমতা হলো তার স্বামী আর সন্তান।
নারীটির সুখ দুঃখের সঙ্গী দু’জন আজ দুঃখদের একটুও প্রশ্রয় দেবে না বলেই অতি সত্বর সেই সকল জিনিস সমেত হাজির হলো যাতে নারীটির মুখে হাসি ফোটে।
কথায় কথায় উপহার চাওয়া নারীটির জন্য আজ না চাইতেও অনেক উপহার হাজির। একটা শাড়ির জায়গায় তিনটা শাড়ি, এক বক্স পিনাট বার, দুই তোড়া লাল গোলাপ, বার্গার, পিৎজা, ফুচকা কোনোকিছু বাদ রাখেনি বাবা ছেলে।
কিন্তু এই ঠুনকো জিনিসগুলো কী নারীটির গভীর ওই ক্ষত পূরণ করতে পারে?
তপোবন আর তানশান অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় একে অপরের দিকে। পরপরই তাকায় বিছানার এক কিনারায় বসে জোরে জোরে বই পড়তে থাকা নারীটির পানে। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অজস্র পছন্দনীয় জিনিস থাকতেও আজ নারীটির মাঝে কোনো উদ্বেগ উত্তেজনা নেই। অথচ হাতে করে আনা একটা সামান্য চকলেট ও মেয়েটির মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতো।
রূপকথা পড়তে পড়তেই নত শির ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন। আপনি যেই পড়াগুলো দিয়েছিলেন আমি সেগুলো পড়ছি। এক ঘন্টার মধ্যে শেষ করে ফেলব আপনিই চিন্তা করবেন না।”
তপোবন আর তানশান মানতে পারলো না নারীটির অদ্ভুত আচরণ। তার তো কান্না করা উচিৎ, রাগ ঝাড়া উচিৎ, ভেতরকার সব দুঃখ তাদের কাছে রাখা উচিৎ কিন্তু এ কেমন অস্বস্তিকর নীরবতা?
তপোবন আলতো স্বরে ডেকে ওঠে,
–“রূপকথা?”
মেয়েটির পড়ার গতি আরো বেড়ে গেল যেন সে লুকাতে চাইছে। তানশান ও অস্থির হয়ে ডেকে ওঠে,
–“মিমি? দেখুন আপনি শাড়ি চেয়েছিলেন না? একটা না তিনটা শাড়ি এনেছি আর বার্গার পিৎজা ও এনেছি। আর সবচেয়ে মজার জিনিস ফুচকা। অনেক ফুচকাও এনেছি। আপনি যত ইচ্ছা তত খাবেন কেউ বকা দেবে না আপনাকে।”
নারীটি তবুও পড়ছে তো পড়ছেই। তপোবন অস্থির কণ্ঠে বলল,
–“রূপকথা এখন পড়তে হবে না দেখো এখানে সব তোমার পছন্দের জিনিস আছে। তুমি তো বলতে তোমায় একসাথে পঞ্চাশটা ফুচকা দিলেও তুমি খেতে পারবে, এখানে পুরো পঞ্চাশটা ফুচকা আছে। খাবে না?”
ঠিক যেন হাতে গড়া পুতুলের ন্যায় আদুরে হাতে বাবা ছেলে নারীটির দুঃখগুলোকে সামলাতে চাইছে। কিন্তু নারীটি ভীষণ ক্লান্ত। তিরতির করে কেঁপে ওঠা ওষ্ঠদ্বয় কেঁপে ধরে রূপকথা। লালচে নেত্রে তুলে তাকায় বাবা ছেলের মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“দুঃখ পেতে পেতে আমি আজ পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছি তানশানের পাপা। আপনারা চিন্তা করবেন না, এখন আর দুঃখ গায়ে লাগে না আমার। সব সয়ে গিয়েছে। আমি একদম ঠিক আছি। এসব কিছু আমার লাগবে না। আমি কী বাচ্চা নাকি? আপনারা আপনাদের কাজে যান আর আমাকেও পড়তে দিন।”
বলেই রূপকথা ফের জোরে জোরে পড়তে লাগল। তানশান বিমর্ষ মুখে বাবার পানে তাকায়। তপোবন ম্লান হেসে ছেলের মাথায় হাত রাখলো। মিহি স্বরে বলল,
–“একটু পর ঠিক হয়ে যাবে আব্বু। একটু সময় দাও দেখবে একটুপর এইসব ফুচকা আর বার্গার একাই খেয়ে ফেলবে।”
তানশান নীরবে মাথা নাড়লো। ধীর কদমে বেরিয়ে যায় কামরা থেকে। বের হতেই ব্যস্ত কদমে এগিয়ে আসা রোজ বলল,
–“কী হলো, ভাবির কী অবস্থা? ঠিক আছে?”
তানশান মলিন মুখে না বোধক মাথা নেড়ে ঘরে চলে গেল। অবুঝ রোজ দরজা লাগানো দেখে আর গেল না। তানশানের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত নিহামকে দেখে আসল। সেই দুপুর থেকে ঘুমাচ্ছে। এখন বিকাল। চারিদিকের অসুস্থ পরিবেশে ত্যক্ত মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় পা গুটিয়ে বসলো। তানশান মলিন মুখে বই খাতা নিয়ে পড়তে বসে।
রোজ অবলোকন করে ভাতিজার মলিনতা। ম্লান হেসে ডেকে ওঠে,
–“তানশান?”
–“হুঁ।”
–“মিমিকে খুব ভালোবাসো?”, রোজের প্রশ্নে নিজ কর্মে মগ্ন তানশানের হাত থেমে গেল। আনমনা দৃষ্টিতে ভাসে গভীর রাতে মাথায় কারোর স্নেহের পরশ। পনেরো বছরের এই জীবনে খুব গভীর রাতে বাবার স্পর্শ ব্যতীত আর কখনো কারোর স্পর্শ অনুভব হয়নি। কিন্তু এখন? প্রায়শই রাতের আঁধারে কেউ তাকে খুব আদর করে, তার ভালোবাসা চায়। কিন্তু…দিনের আলোয় স্পষ্ট জীবনের জটিলতাগুলো কোথাও না কোথাও একটু হলেও জড়তা অনুভব করে।
শুভ্র চেহারায় মৃদু জড়তা ফুটে উঠল। তানশান পুনরায় নিজের কাজে মনোযোগ দিল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“শি ইজ সামওয়ান, হু ডিজার্ভ রেসপেক্ট এন্ড লাভ। আ’ম জাস্ট ডুয়িং দ্যাট।”
রোজ হাসল। সে জানে তানশান অনুভূতি প্রকাশে কাঁচা। কখনো মন খুলে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। আর সে এটাও জানে তার এই সম্মান ভালোবাসা দায়িত্ববোধ নয়, বরং সে মন থেকেই রূপকথার প্রতি নির্ভর হচ্ছে। বড় ভাইজানের সুখে সে খুশি কিন্তু তার থেকেও খুশি তানশানের মাথার উপর মায়ের ছায়া দেখে।
তপোবন দরজা আঁটকে সোজা মেয়েটির সামনে পা গুটিয়ে বসলো। নামেমাত্র দূরত্বে থাকা মেয়েটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে দেখছে, মেয়েটি ঠিক কতক্ষণ নিজের অনুভূতির সাথে লড়াই করতে পারে।
দীর্ঘ আধা ঘন্টা তপোবন সেভাবেই নীরবে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে।
নিজের উপর সর্বোচ্চ জোর খাটিয়েও রূপকথা আর বইয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। সে সরব লালচে নয়ন তুলে ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখের লোকটির দিকে। রাগান্বিত স্বরে বলে,
–“কী সমস্যা আপনার? আমায় ডিস্টার্ব করছেন কেন? এখান থেকে সরুন, আমায় পড়তে দিন।”
তপোবন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকালো। ক্ষীণ স্বরে শুধাল,
–“নিজের উপর কেন জোরজবরদস্তি করছো?”
–“আমি কোনো জোরজবরদস্তি করছি না নিজের উপর।”
–“করছো।” তপোবনের জেদি কণ্ঠে রূপকথাও জেদি কণ্ঠে বলল,
–“করছি না।”
তপোবন শোনে না তার কথা। বইটা টেনে নিয়ে যেতে চাইলে রূপকথা আরো শক্ত হাতে বইটা আঁকড়ে ধরলো।
–“ছাড়ুন আমি পড়ব। আমায় বিরক্ত করবেন না।”
পুরুষালী শক্তি সাথে পেরে ওঠে না রূপকথা। তপোবন জোরপূর্বক বইটা ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারে অদূরে। হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নেয়।
ছোট্ট দেহটিকে বক্ষমাঝে শক্ত করে জড়িয়ে নিতেই কারোর গুমড়ে কাঁদার শব্দে আলোড়িত হয় কামরাটি। তপোবন ম্লান হাসল সেই কান্নার শব্দে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“দুঃখ চাপিয়ে রাখতে নেই। দুঃখ যত চেপে রাখা হয় সেগুলো ততো গভীর হয়।”
বক্ষস্থলের পাঞ্জাবি খামচে ধরে রূপকথা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
–“আমি ওই লোকটাকে ক্ষমা করতে চাই কিন্তু আমার ভেতর থেকে তার জন্য ক্ষমা আসে না। আমি তাকে ঘৃণা করতে চাই না কিন্তু আমার ভেতরটা ঘৃণায় বিষিয়ে আছে। আমি কী করব?”
–“কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখো। তিন যা করবেন শুধু তাতে সায় দেবে। কিন্তু সবসময় মনে রাখবে ঘৃণা আমাদের ক্ষতি ছাড়া কিছুই করে না। একটু ক্ষমায় যদি সামনের মানুষটার হৃদয় শীতল হয় তবে অবশ্যই তাকে মন থেকে ক্ষমা করা উচিৎ, তাই না?”
এই মানুষটার কোনো কথায় রূপকথার মাঝে কখনো সংশয় জাগে না। তাই সে নির্বিবাদে মাথা নাড়লো। তপোবন মৃদু হাসল তার প্রত্যুত্তরে। ভীষণ আদরের সাথে দু’হাতের আজলায় কান্নারত মুখটি নিয়ে ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো । রূপকথা চোখ বন্ধ করে নেয়। একে একে অনুভব হয় রুক্ষ শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় পুরো মুখশ্রী ছুঁয়ে যাচ্ছে।
তপোবন এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“তবে এতসব চিন্তা করা বাদ দাও। দুশ্চিন্তা কখনোই নিয়তিকে আটকাতে পারবে না, তবে কী প্রয়োজন নিজের সাথে অন্যায় করার! এখন এসব ভুলে যাও, শুধু সামনে যা আছে তাকে হাসিমুখে আগলে নিয়ে বাঁচতে শেখো। সঙ্গ দেয়ার জন্য আমরা আছি তো।”
রূপকথা অশ্রুসিক্ত নয়নে ম্লান হাসল। তপোবন হাত বাড়িয়ে ফুচকার ব্যাগটা খুললো। অতঃপর নিজ হাতে ফুচকা বানিয়ে মেয়েটির মুখের সামনে ধরে বলল,
–“খেয়ে নাও, দাঁতে দাঁত চেপে ফুচকা ওয়ালাকে বলেছি বেশি করে শুকনো ঝাল দিতে। কী যে কষ্ট হয়ে বলে বোঝাতে পারব না। ”
বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠে রূপকথা অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিক করে হেসে উঠল। চোখ মুছতে মুছতে বলল,
–“আপনি জানেন না এগুলো শুকনো ঝাল দিয়ে খেতে কী মজা!”
–“হুঁ, তা তো তোমার খাওয়া দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এটাই শেষবার। আর কখনো এভাবে খেতে পারবে না।”
তপোবন তার মুখে ফুচকা ঢুকিয়ে দিয়ে বলল। রূপকথা শান্ত মেয়ের মতো খেতে লাগল আর তপোবন মনোযোগ সহকারে ফুচকা বানাতে মগ্ন হয়। মিনিটের মাঝেই অসুস্থ পরিবেশটাকে বদলে ফেলার মতো ক্ষমতাধর লোকটিকে মুগ্ধ চোখে দেখে রূপকথা।
ফুচকা বানাতে বানাতেই তপোবন ছেলেকে ফোন দিল। সেকেন্ডের মাঝে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তপোবন দরজা খুলে দিল। খুলেই স্বগৌরবের সাথে বলল,
–”ওই দেখো তোমার মিমি ফুচকা খাচ্ছে। এখন খুশি?”
তানশানের চোখমুখ ঠিকরে আনন্দ বেরিয়ে আসে। সে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“মন ভালো হয়েছে? ফুচকা ভালো লাগছে? শাড়ি দেখেছেন? সব আপনার পছন্দের রঙের।”
রূপকথা মৃদু হেসে ছেলেটিকে কাছে ডাকে।
–“এখানে এসো।”
তানশান নিরুদ্বেগ বিছানায় উঠে পা গুটিয়ে বসে। রূপকথা তার মুখে একটা ফুচকা ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
–“আসো একসাথে দেখি।”
সদ্য দরজায় দাঁড়ানো রোজ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“এটা কিন্তু ঠিক নয় বড় ভাবিজান, আমায় ছেড়ে তোমরা ফুচকা খাচ্ছো কী করে? তোমাদের ভেতর কী মন বলে কোনো অঙ্গ আছে?”
সে ছুটে গিয়ে বিছানায় উঠে পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে সে একা নয়। রোজ চকিতে দরজার পানে তাকায়। নিহাম মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে সেথায়।
সে হাত নেড়ে বলল,
–“নিহাম ভেতরে এসো।”
রূপকথার হাসিমুখ নিভে গেল নিহামের নামটি শুনে। তোয়ালে খুঁজতে থাকা তপোবন নিহামের নাম শুনতেই ফিরে তাকায় দরজার পানে। সে রূপকথার দিকে এক পলক তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“নিহাম ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে আসো।”
তপোবন তার হাত ধরেই ভেতরে নিয়ে আসে। বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলে,
–“গলার ব্যথা কমেছে? এখন একটু ভালো লাগছে?”
নিহাম শুধু মাথা নাড়ল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়। আগে তো কখনো মা ছুরি চালায়নি কিন্তু আজ? মায়ের দেয়া আঘাতে সে একদম ভয়ে গুটিয়ে রয়েছে। তা দেখে তপোবন তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
–“ভয় নেই, ভাইজান। আর কখনো তোমায় মাম্মা মারতে পারবে না। ভাইজান সবসময় তোমার সাথে আছি।”
নিহাম নীরবে পরে থাকে তপোবনের কাঁধে। মিহি স্বরে শুধায়,
–“পাপা?”
–“পাপা একটু কাজে গিয়েছে সকালে এসে পড়বে। এসো আমরা বার্গার খাই। তুমি তো রুবার্সের বার্গার পছন্দ করো তাই না? এসো।”
তপোবন নিহামকে নিয়ে ঠিক রূপকথার কোল ঘেঁষেই বসালো। রূপকথা স্থির দৃষ্টিতে তাকায় তপোবনের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই তপোবন মৃদু হেসে কিছুক্ষণ আগের বলা কথাটি ফের মনে করিয়ে দিল,
–“সামনে যা আছে তা আগলেই আমাদের সুখী থাকতে হবে, রূপকথা। জীবন কখনোই বেড অফ রোজেস হয় না। কেউ সর্বসুখী হয় না। এই দেখো না, ছোট্ট নিহামের জীবনেও কত দুঃখ! আজ সে তার মায়ের দ্বারা আঘাত পেয়েছে ভয়ে কুঁকড়ে আছে।”
একজন স্বামীর পরে তপোবন যেন দৃঢ় এক পথপ্রদর্শক। তাই তো কঠিন এই মুহুর্তটিকেও কিছু শব্দের দ্বারা ভীষণ অবলীলায় সহজ করে দিল। রূপকথা তাকায় নিহামের গলার দিকে। শুকনো রক্তের ছোঁয়া এখনো লেগে আছে। সে শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা হাতটি রাখে ছেলেটির মাথায়। বহুকষ্টে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তুলে শুধায়,
–“ব্যথা করছে?”
নিহাম হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। রূপকথা যেন পরিস্থিতির চেয়েও কঠিন সত্তার অধিকারী। সে আলগোছে একহাতে নিহামকে নিজের সাথে আগলে নিলো। নম্র স্বরে বলল,
–“ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। এসো আমরা বার্গার খাই। তারপর ওষুধ খাবে। দেখবে আর ব্যথা থাকবে না।”
রূপকথা নিজেই তার হাতে বার্গার তুলে দিল। তপোবন বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে হাঁফ ছাড়লো। মুগ্ধ চিত্তে তাকালো চমৎকার সত্তার অধিকারী মেয়েটির পানে। চোখে চোখ পড়তেই তপোবন ইশারায় শাব্বাশি জানালো জীবনে আরেকবার জিতে যাওয়ায়।
রোজ আর তানশানের মুখেও হাসি ফুটে উঠল চোখের সামনে জটিল একটা সম্পর্ক সহজ হতে দেখে।
সুখ দুঃখের পালাবদল-ই তো জীবন। নিলীমার জীবন থেকে দুঃখ কেবলই বিলীন হচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ করেই তারা ফিরে আসার শক্তপোক্ত একটা কারণ পেয়ে গেল।
নিলীমার হাতের কাজ খুব সুনিপুণ। যেই একবার তার থেকে কাজ করিয়েছে প্রশংসা না করে যেতে পারেনি। এর জন্যই নিলীমার কাজের পরিমাণ বেশি।
রাত তখন নয়টা। জানালার সামনে রাখা সেলাই মেশিনে বসে নিলীমা একমনে সেলাই করে যাচ্ছে। পাশেই শুকতারা আপেল খাচ্ছে আর পড়ছে। নিলীমা কাজ করতে করতে তার দিকে এক পলক চেয়ে মৃদু হাসল। স্বাস্থ্য বেড়েছে, দুলাভাইয়ের পাঠানো দামী দামী প্রসাধনী ব্যবহার করে রুক্ষ শুষ্ক চুলগুলো এখন বেশ সিল্কি হয়েছে, চেহারার ধূলোময় ভাবটাও ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
নিজের অযত্নে গড়া পরীদুটোকে যত্নে বেড়ে উঠতে দেখে নিলীমা বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলল। দুঃখগুলো এখন কম অনুভব হয়।
সে কাজ করতে করতে আনমনে জানালা ভেদ করে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। আবছা এক অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে অনতিদূরে। সে ভালো করে তাকালো। কিন্তু তার দৃষ্টি থেকে উদাসীনতা উবে যায় অবয়বটি দুই পা এগিয়ে আসতেই। নিলীমা স্তব্ধ হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য নয়নে তাকালো আঁধার ভেদ করে কৃত্রিম আলো অবয়বটির উপর পড়তেই।
এই অবয়বটি যে তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। এই অবয়বটিকে সে চিনতে ভুল করবে কী করে? সে আকস্মিক হড়বড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
–“ওয়াহেদ? ওয়াহেদ ওখানে কী আপনি দাঁড়িয়ে আছেন? ওয়াহেদ আপনি এসেছেন?”
“ওয়াহেদ…ওটা ওয়াহেদ…” বিড়বিড়িয়ে আওড়াতে আওড়াতেই নিলীমা ছুটে বের হয় ঘর থেকে। শুকতারা অবাক হয়ে যায় মাকে এভাবে ছুটতে দেখে। সে তৎক্ষণাৎ পিছু ছুটতে ছুটতে শুধায়,
–“আম্মা, এভাবে দৌড়াচ্ছো কোথায়?”
–“তারা, ওখানে তোর বাবা। ওই যে বাইরে আমি স্পষ্ট দেখেছি। হায় আল্লাহ আবার হারিয়ে না যায়।”
নিলীমা উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটছে। ছুটতে ছুটতে ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়াতেই তার চিত্ত হীম হয়ে আসে। হাতের আঙুলগুলো থরথরিয়ে কাঁপছে উত্তেজনায়। বিগত দশ বছরে এমন অজস্র স্বপ্ন দেখায় সে বিশ্বাস করতে পারল না।
সে হড়বড়িয়ে বলে ওঠে,
–“ওয়াহেদ এটা আপনি? আপনি ভ্রম নন তো? আমি আগের মতো স্বপ্ন দেখছি না তো? ওয়াহেদ কথা বলছেন না কেন? শুনছেন? আপনি কী ফিরে এসেছেন? ওয়াহেদ প্লিজ বলুন, আপনি স্বপ্ন নন। আপনি সত্যিই এসেছেন? স্বপ্ন কী এত নিখুঁত স্পষ্ট হয়?”
ওয়াহেদ ছলছল নেত্রে চেয়ে ডেকে উঠল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৩
–“নিলীমা?”
নিলীমার কর্নকুহরে আন্দোলিত হলো সেই ডাক। বলহীন দেহে নিলীমা সরব আঁধারের মাঝে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত দেহে ধপ করে ভেজা ঘাসের উপর বসে পড়ল। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে,
–“এটা ভ্রম নয়! এটা ভ্রম নয়!”
