Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫
তোনিমা খান

লোকে বলে সময়ের বিবর্তনে অনুভূতি বদলায়। কিন্তু লোকে এটা বলে না যে, সময়ের পরিক্রমায় নিষ্ঠুরভাবে বদলে যাওয়া মানুষগুলোই আসলে অনুভূতি বদলাতে বাধ্য করে।
দীর্ঘ দশ বছর চাতক পাখির মতো যার অপেক্ষায় নীলিমা দিন গুনেছে, আজ সেই মানুষটার ভাবনাকেও সে নিজের মনে স্থান দিতে চায় না। সে এমনভাবে তাকে ভুলেছে, যেন ‘স্বামী’ নামক সেই মানুষটির অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই।

রূপকথা কান থেকে ফোন নামিয়ে ছলছল নেত্রে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে মায়ের হাস্যোজ্জ্বল ব্যস্ত কণ্ঠ— যেন জগতে তার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। অথচ এই মানুষটা আদতে সুখ কী, তাই বোঝে না। জীবন তাকে প্রতি পদে পদে আঘাত করতে করতে আজ এক বিধ্বস্ত মানবে পরিণত করেছে, যে কি না আজ ঠিকমতো নিজের দুঃখটুকুও প্রকাশ করতে পারে না।
আজ ছাব্বিশ দিন তাদের আকস্মিক মিলন এবং বিচ্ছেদের। এই ছাব্বিশ দিনে স্বামী নামক মানুষটা নীলিমাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিয়েছে। অথচ নীলিমার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা ক্লেশ নেই। সেদিনকার পর থেকে সে অস্বাভাবিকভাবে রিক্ত হয়ে গিয়েছে। আজ পর্যন্ত তাকে ওই বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি; দেখা যায়নি একটু কাঁদতে কিংবা বিলাপ করতে। বরং সে আগের চেয়েও বেশি উদ্যমে কাজ শুরু করেছে, সংসার গোছাচ্ছে, শুকতারাকে আগলে বাঁচার চেষ্টা করছে। তবে একটি পরিবর্তন স্পষ্ট, এখন সে আর কারও পথ চেয়ে থাকে না, মোনাজাতে কাউকে ফিরে পেতে চায় না। বরং কাউকে ভুলতে চাওয়াই তার আপ্রাণ প্রচেষ্টা।
রূপকথা ক্লান্ত স্বরে মাকে ডেকে ওঠে,

— “আম্মা?”
— “হ্যাঁ বল, মা শুনছি তো।”
মায়ের সেই কৃত্রিম ব্যস্ততা দেখে রূপকথা অনুনয় করে বলল,
–“ও মা, এমন করছো কেন?”
নীলিমা হাতের কাজ থামায়। ব্লাউজ সেলাই করছিল। অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে শুধাল,
–“কেমন করছি?”
রূপকথা ঢোক গিলে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে ক্ষীণ স্বরে বলল,
— “আমার কাছে নিজেকে এত শক্ত দেখানোর প্রয়োজন নেই, আম্মা। আমি কী এতটাই পর হয়ে গিয়েছি যে আমার কাছেও মনের ব্যথাগুলো লুকাতে হবে? আমি জানি তুমি ভালো নেই, তবে কেন নিজেকে ভালো প্রমাণ করার এই বৃথা চেষ্টা করছো?”
নীলিমার দেহ ম্লান হয়ে আসে, দৃষ্টি উদাসীন হঢ়। খোলা জানালার ওপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,

–“আমি ভালো নেই কে বলেছে? আমি কেন ভালো থাকব না, কথা? এমন মানুষের জন্য আমি কাঁদব যার কাছে আমার সন্তানদের কষ্টের কোনো মূল্য নেই? বিগত দশ বছর আমি প্রতিটি নিঃশ্বাস নিয়েছি আমার সন্তানদের জন্য। অথচ আজ দশ বছর পর সেই মানুষটা এসে অবলীলায় বলল, অন্য এক নারীর হুমকির ভয়ে সে তার ফেলে যাওয়া স্ত্রী-সন্তানদের খবর নেয়নি! এটা আমি মেনে নেব? ভুলে যাব আমার সন্তানদের দশ বছরের সেই ক্ষুধার যন্ত্রণা? ক্ষমা করে দেব তাকে? নিজেকে কষ্ট দেব? কক্ষনও না! একজন কাপুরুষের জন্য আমি এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দেব না। আমার সন্তানরাই আমার সুখ ছিল, তারাই আমার সুখ হয়ে থাকবে। কোনো কাপুরুষ আমার সুখ-দুঃখ নির্ধারণ করার অধিকার রাখে না।”
গড়িয়ে পড়া অবাধ্য অশ্রুটুকু শক্ত হাতে মুছে ফেলে নীলিমা হাসিমুখে পুনরায় বলল,
— “আমি অনেক ভালো আছি রে মা। আমার জন্য চিন্তা করবি না। তুই শুধু নিজের সংসার আর পড়াশোনায় মনোযোগ দে। তোকে অনেক বড় হতে হবে, যেন নিজেই নিজের ঢাল হতে পারিস, নিজের সন্তানের নিরাপত্তা হতে পারিস।”
মায়ের এই দৃঢ়তায় রূপকথার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। ছোটবেলা থেকে এমনি এক লড়াকু মাকে দেখেই সে শক্তি পায়।
সে মৃদু স্বরে বলল,

— “ঠিক আছে আম্মা।”
— “আচ্ছা, অনেক কথা হলো; এখন পড়তে বস। রাত অনেক হয়েছে। আমার নানুভাই কী ঘুমিয়ে পড়েছে?”
রূপকথা ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দার সোফায় বসা বাবা-ছেলের দিকে তাকাল। তারা নিঃশব্দে কথা শুনছিল। রূপকথা হেসে বলল,
— “উঁহু, সে তার নানুর কথা শোনার জন্য এতক্ষণ আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। তার সাথে একটু কথা বলো। সে ভাবছে তার নানু অনেক কষ্টে আছে। সে তো জানে না, কষ্ট আমাদের নিত্যসঙ্গী; এত সহজে আমাদের ভাঙা যায় না।”
তানশান বড় বড় চোখে রূপকথার দিকে তাকায়। ইশারায় ঘন ঘন হাত নেড়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেও রূপকথা শুনল না, জোর করে তার কানে ফোন ধরিয়ে দিল। তপোবন মৃদু হেসে ছেলের চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
–“কথা বলো। জিজ্ঞেস করো নানু কেমন আছে? আর নানুকে বলো সব সময় এমন শক্ত থাকতে। আমরা সবাই তার পাশে আছি।”
তানশান কথা বলল। সবশেষে দৃঢ় কণ্ঠে আশ্বাস দিয়ে বলল,

— “নানুমণি, কখনো কষ্ট পাবেন না। আমরা তো আছি। আমরা থাকতে আপনার আর কাউকে প্রয়োজন নেই।”
এই তো! দুঃখী নীলিমার হাসিমুখে বেঁচে থাকার জন্য এই সেটুকুই যথেষ্ট। আর কী-ই বা প্রয়োজন? সে ভালো থাকবে, ভুলে যাবে যে সে কাউকে একদা ভালোবেসেছিল। কিন্তু এটা কখনো ভুলবে না—যে তার সন্তানরা তাদের নিজের বাবার কাপুরুষতার কারণে দশ বছর কষ্ট ভোগ করেছে।
ফোন রাখতেই নিলীমা ফের কাজে মগ্ন হয়। কাজ করতে করতেই আনমনা দৃষ্টি জানালা ভেদ করে বাইরে তাক করলে দেহ অসাড় হয়ে আসে, বহুল কামনীয় একটি মুখ দেখতে পেয়ে। ওয়াহেদ অনুনয় ভরা দৃষ্টিতে তাকায়। নিলীমার চোখমুখ শক্ত হয়ে আসে। তৎক্ষণাৎ হন্তদন্ত হয়ে জানালা আঁটকে দিল।
ওয়াহেদ শ্রান্ত দেহে দাঁড়িয়ে রইল। একবার আর দু’বার নয়। সেদিনের পর থেকে বহুবার নিলীমার দ্বারপ্রান্তে এসেছে। কিন্তু ক্ষমা তো দূর একটু চোখের দেখাও দেখতে নারাজ নিলীমা। নিঝামকে খুলনাতেই একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর তত্বাবধায়নে চিকিৎসারত রয়েছে। আগামীকাল তাকে রিলিজ করা হবে। হয়তো জীবনটা আবার দূর্বিসহ হয়ে উঠবে। অথচ এই দূর্বিসহ ভারী জীবন বহন করার শক্তি ক্রমশই হারিয়ে ফেলছে সে।
ফোন রেখে তানশান প্রফুল্ল চিত্তে উঠে দাঁড়াল। আড়মোড়া ভেঙে বলল,

–“আমি ঘুমাতে যাচ্ছি পাপা, গুড নাইট!”
তপোবন নীরবে মাথা নেড়ে সায় জানাল। বলল,
–“ফোন দেখবে না, সোজা ঘুমিয়ে পড়বে।”
— “ছোট পাপার সাথে একটু কথা বলব তো।”
তপোবন পকেট থেকে ফোন বের করে ঘড়ি দেখে। রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট তখন। এরোজ এখনো অফিস থেকে বাড়ি ফেরেনি। সে বলল,
— “ছোট পাপা এখনো অফিসে আব্বু, ব্যস্ত থাকবে। এখন কল দিও না।”
তানশান ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
–“ছোট পাপা কখনোই আমার কল ইগনোর করে না, যতই ব্যস্ত থাকুক!”
— “কিন্তু তোমার তো তার ব্যস্ততা বোঝা উচিত।”
— “কিন্তু আমি তাকে মিস করছি। কথা না বললে ঘুম আসবে না। আর নায়েল! গতকাল ওই পাকা বুড়ির সাথে কথা হয়েছিল।”
তপোবন হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,

–“আচ্ছা যাও, কথা বলে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ো।”
তানশান হাসিমুখে বেরিয়ে গেল। তপোবন আলগোছে মৃদু আলোয় বদ্ধ নেত্রে সোফায় মাথা এলিয়ে দিল। রূপকথা ছেলের পিছু পিছু যেতে গিয়েও একবার ফিরে তাকাল হঠাৎ নরম হয়ে যাওয়া মানুষটার দিকে। ঘরের সবচেয়ে মজবুত খুঁটিটাকে আজ হঠাৎ এমন মিইয়ে যেতে দেখে তার ভালো লাগছে না।
তানশানের জীবনে একটি নতুন অভ্যাস যুক্ত হয়েছে। আর সেই অভ্যাসের নাম হলো ‘মিমি’। আগে ঘুমের আগে মায়ের ডায়েরি পড়ার অভ্যাস থাকলেও এখন তাতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। এখন ঘুমের আগে একজনের সাথে একদফা খুনসুটি বা দ্বন্দ্ব না হলে তার ঘুম আসে না।
আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই দ্বন্দ্বটুকুই তার এখন খুব প্রিয়।
নিজের ঘরে ঢুকেই শূন্য দরজার পানে একবার ফিরে তাকায়। কেউ নেই সেথায়। সে চাচাকে ফোন দেয়। সাথে সাথেই রিসিভ হয়। ভেসে আসে স্নেহভরা কণ্ঠ আর স্ক্রিনে ভাসে ক্লান্ত একটি মুখ।

–“আব্বু!”
–“ছোট পাপা, আই মিস ইউ আ লট!”
— “পাপাও তোমাকে অনেক মিস করেছি। কিন্তু এখনো জেগে আছো কেন?”
–“তোমার সাথে কথা বলব বলে। এরপরেই ঘুমিয়ে পড়ব।”
চাচা-ভাতিজার দীর্ঘক্ষণ কথা হলো। ঠিক সেই সময় নায়েল কাঁদতে কাঁদতে এরোজের অফিসে ঢুকল। এরোজের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল কাঁদতে দেখে। সে ঝট করে তাকে কোলে তুলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে শুধাল, –“কাঁদছো কেন মা?”
নায়েল ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “ফেলিত, আমায় আই নাভ ইউ বলেছে। ফেলিত পঁচা ছেলে!”
ফোনের ওপাশে তানশানের গুরুগম্ভীর মুখ ছাপিয়ে খিলখিলিয়ে হাসি বেরিয়ে এল নায়েলের কথায়। তার পাকা বুড়ি ভীষণ ঢং করতে জানে!
এরোজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কান্নার কারণ শুনে। আদুরে গলায় বলল,

–“তাতে কী হয়েছে মা? এজন্য কাঁদতে হয়?”
নায়েল কান্না থামিয়ে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকাল।
— “নিশান্ত বলেছে আই নাভ ইউ মানে খালাপ জিনিস। ও কেন বলবে?”
–“নিশান্ত এগুলো বলেছে তোমাকে?”
— “হুঁ।”
— “তারপর তুমি কী বললে ফেরিতকে?”
নায়েল চোখ মুছতে মুছতে বলল,
–“ননসেন্স বলেছি।”
এরোজের মাথায় আগুন ধরে গেল। সে তানশানের ফোন কেটে সরাসরি নিশান্তকে কল করল। নিশান্ত ফোন ধরে হাসি মুখে বলল,
–“হ্যালো ব্রো!”
এরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার সামনে হাজির হবি, নয়তো তোর হাত-পা আমি ভেঙে দুই ভাগ করে দেব।”
নিশান্ত ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

— “কেন ব্রো, কী হয়েছে?”
— “আই লাভ ইউ মানে খারাপ কথা আর ননসেন্স বলা ভালো, এসব কে শিখিয়েছে তাকে? তোকে পেটাতে ইচ্ছে করছে আমার। কোন সাহসে ওকে এসব উল্টাপাল্টা শেখাচ্ছিস?”
নিশান্ত আমতা আমতা করে বলল,
–“আরে ভাই, আমি তো ওকে সঠিক শিক্ষা দিচ্ছি। নিভাকেও আমি এভাবেই বড় করেছি। যে-ই ওকে আই লাভ ইউ বলত, ও তাকে ননসেন্স বলে দিত। তাই তো এই যুগেও নিভা এখনো কোনো হারাম আজেবাজে সম্পর্কে জড়ায়নি। আমাদের নায়েলও তেমন হবে।”
— “তোকে এত পাকনামি করতে হবে না। ওর মাথার ওপর ছোট পাপা আছে, ওকে কোনো খারাপ কিছুতে জড়াতে দেব না। কিন্তু ভবিষ্যতে ওকে এমন কিছু শেখালে ফল ভালো হবে না।”
নিশান্ত পাণ্ডুর মুখে সায় জানালো। ফোন রেখে এরোজ তাকায় কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে থাকা মেয়েটির পানে। কোলে বসিয়ে বলল,
–“নিশান্ত পঁচা কথা বলেছে, মা। ওকে বকে দিয়েছি। আমাদের যখন কাউকে খুব ভালোলাগে তখন আমরা তাকে আই লাভ ইউ বলি। এই যে ছোট পাপা তোমাকে খুব ভালোবাসি যার জন্য বলি, আই লাভ ইউ। এটা খারাপ নয়। আর ছোট পাপা তোমার চারিধারে খারাপ মানুষ তো দূরের বিষয়, খারাপ কথাও ঘেঁষতে দেব না।”
নায়েল অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এরোজের দিকে। বলল,

–“ফেলিত ব্যাড বয় নয়?”
–“নাহ, ফেরিত তো তোমায় ভালো বন্ধ মনে করে তাই বলেছে, সে তোমায় খুব ভালোবাসে। সবসময় তোমার সাথে খেলতে চায়। বুঝেছো?”
নায়েল মাথা নাড়লো। সে তো জানে, আই লাভ ইউ মানে ভালো কথা কিন্তু বিগত বহুদিন যাবৎ নিশান্ত তাকে শেখাচ্ছিল এটা খারাপ।
এরোজ তাকে ডেস্কে বসিয়ে দিয়ে সাথে করে আনা বেরির বক্সটা বের করে। মুখে দিতে দিতে দেখলো মেয়েটির মন খারাপ হয়ে আছে। সে ছোট্ট হাত দুটো মুঠোবন্দী করে নেয়। হাতের উল্টো পিঠে চুমু দিয়ে বলে,
–“আমার মায়ের মন খারাপ হয়ে গেল কেন?
নায়েল উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“মাম্মা হাসপাতাল থেকে কবে আসবে?”
–“আর দু’দিন মা। তারপরেই এসে যাবে মাম্মা।”
–“আল পাপা? পাপা এখনো কেন আমাদেল নিতে আসছে না? আমলা বালিতে যাব না? দাদুভাই, দাদুমনি, ফুফি, বলো মা কবে যাব?”
এরোজের মনটা বিষণ্ন হয়ে উঠল। সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে নায়েলকে সুখে রাখার চেষ্টা করে, অথচ দিনশেষে শূন্যতাই তার প্রাপ্তি। সে ম্লান কণ্ঠে বলল,

–“পাপার এখানে ভালো লাগছে না, মা?”
নায়েল বেরি খেতে খেতে আচমকা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আলে তুমি তো পাপা না, তুমি তো ছোট পাপা। তুমি মিসটেক কলেছো।”
বলেই সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ছোট্ট হাত দুটি আঁকড়ে ধরা এরোজের হাত দুটো কেঁপে উঠল নায়েলের কথায়। একটু একটু করে বাচ্চা মেয়েটির পৃথিবী হতে চাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় রুঢ়ভাবে থমকে গেল ছোট্ট একটা স্বীকারোক্তিতে। আঁকড়ে ধরা হাত দুটো ঢিলে হয়ে যায়।
সে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“পাপা নই?”
নায়েল ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“না তো, তুমি তো ছোট পাপা। পাপা তো বালিতে। পাপা বলেছে, আমাদেল নিতে আসবে তালাতালি।”
এরোজ কৃত্রিম হাসল নায়েল কথায়। অস্ফুট স্বরেই বলল,

–“ঠিক বলেছো, ছোট পাপা একটু মিস্টেক করে ফেলেছি। স্যরি মা!”
–“ইটস ওকে!”
এরোজ টলমলে চোখে তাকায় নায়েলের মুখপানে। সে শক্তি হারাবে না কোনোক্রমেই। ঢিলে হয়ে যাওয়া হাতদুটো আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল। হাসিমুখে বলল,
–“কিন্তু ছোট পাপার এই মিস্টেক’টাকে একদিন তুমি নিজেই শুধরে দেবে। আমি অপেক্ষায় থাকব সেই দিনটার। যেদিন তুমি নিজ থেকে আমার হবে।”
নায়েল বুঝলো না এরোজের কথাটা। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“কী বলেছো?”
–“কিছু না। চলো আমরা এখন কাজ করি। তারপর দ্রুত বাড়িতে যাব।”
–“ওকে।”
নায়েল বেরি খেতে মগ্ন হয়।

তানশান ওয়াশরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে বের হতেই দেখল রোজকার অভ্যাস ঘরময় জুড়ে ঘুরঘুর করছে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। রূপকথা বিছানা ঝেড়ে দিয়ে বারান্দার শাটার আর পর্দা লাগিয়ে দেয়। অতঃপর ব্যস্ত কদমে এগিয়ে আসে ছেলের কাছে।
মুখের সামনে রোজকার ন্যায় একটা সিদ্ধ ডিম আর কলা ভেসে উঠতেই তানশান বিরক্তি মিশ্রিত দৃষ্টি ফেলল তার মিমির দিকে। অসহায় কণ্ঠে বলল,
–“রোজ রোজ এগুলো না খেলে হয় না?”
রূপকথা শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
–“রোজ রোজ এগুলো না খেলে কারোর সাথে ক্লাসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবে কী করে? বারবার আঘাত দিয়ে তাকে শক্ত করবে কী করে?”
তানশান কপাল কুঁচকে নিলো রূপকথার কথার মানে বুঝতে না পেরে। কিন্তু যখন বুঝলো তখন তেতে উঠল,
–“দিস ইজ নট ফেয়ার, মিমি। আপনি আমার উপর নজর রাখতে পারেন না।”
রূপকথা তার মুখে ডিমের এক টুকরো ভেঙে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমি তোমার উপর নজর রাখতে যাব এত খারাপ দিন আমার আসেনি। তুমি নিজেই প্রমাণ রেখে দাও তোমার খাতায়। আর সেগুলো আমার চোখেই পড়ে।”
তানশানের কান গরম হয়ে গেল। সুনেহরা জড়িত যেকোনো কিছু তার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। সে সোফায় বসে নীরবে খেতে লাগল। রূপকথা তার মিইয়ে যাওয়া মুখ দেখে শুধায়,

–“আমার কারণে ওর সাথে এমন করছো?”
–“নাহ।”, তানশান গম্ভীর গলায় জবাব দিল।
–“তবে?”
তানশান চোখ তুলে তাকায়।
–“তবে কী?”
–“কেন ওর সাথে এমন ব্যবহার করছো?”
–“ও যা করে সেগুলো আমি পছন্দ করি না। এগুলো আমায় লজ্জিত করে। আমার লক্ষ্যে বাঁধা সৃষ্টি করে।”, তানশান চোখে চোখ রেখে বলল।
রূপকথা হাতের কাজ থামায়। নম্র স্বরে শুধায়,
–“তুমি তাকে পছন্দ করো না?”
–“সিলি কোয়েশ্চেন, মিমি। এসব প্রশ্নের কোনো ভিত্তি নেই।”
–“সিলি, ভিত্তিহীন একটা প্রশ্নের জবাবই দাও না।”
তানশান শান্ত দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“নাহ।”
রূপকথা হেসে উঠল। ফের কাজে মগ্ন হয়ে বলল,
–“মিথ্যা কথা বললে একটা! মনে রেখো তুমি কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো।”
ঠিক দূর্বল জায়গা বরাবর আঘাত করল রূপকথা। তানশান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমি মিথ্যা বলিনি। সুনেহরার আচরণ অবিকল মাম্মার মতো, তাই ওকে নয় বরং ওর আচরণ আমার ভালোলাগে। মানুষ হিসেবে কাউকে আমাদের ভালো লাগতেই পারে, তার মানে এটা নয় যে আমি তাকে ভালোবাসি বা অন্যকিছু। আর সবকিছুর একটা সঠিক সময় আছে। এইসব পছন্দ ভালোলাগার সঠিক বয়স আর সময় এটা না। আমায় এখন পড়াশুনা করতে হবে, পাপার মতো অনেক বড় হতে হবে, সবার ঢাল হতে হবে।”
রূপকথা মুগ্ধ হয়ে শুনলো মাত্র পনেরো বছরের একটা ছেলের কথা। বিমুগ্ধ চিত্তে এগিয়ে এসে ভীষণ আদরের সাথে ছেলের মাথায় হাত রাখলো। হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

–“এই যে এতটুকু বুঝতে পারছো এর পুরস্কার হিসেবে সৃষ্টিকর্তা একদিন তোমায় ঠিক তোমার প্রাপ্য দেবে। নিজের বয়স আর সময়টাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাও। মিমি, তোমায় বিরক্ত করলে স্যরি। কিন্তু আমি শুধু তোমার মনের কথা জানতে চাইছিলাম। তোমায় কোনো প্রকার লজ্জা কিংবা বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে নয়।”
তানশান সোফায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে নত শির খেতে খেতে বলল,
–“আমি জানি, আপনি আমার সাথে মজা করেন সবসময়। কখনোই পাপাকে এসব বলবেন না।”
–“এইতো বুঝে গিয়েছো মিমিকে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমি কখনোই বলব না। আমার কথা না শুনলে আমি আলবত বলব। এখন মাথায় তেল দিয়ে দেব তাতেও নাক কুঁচকাতে পারবে না।”, রূপকথা হেসে বলল। তানশান তৎক্ষণাৎ তেতে উঠে বলল,
–“এটা ঠিক নয়, মিমি।”
–“এটাই ঠিক। মাথা আগাও।”, রূপকথা তেজি কণ্ঠে বলেই মাথায় ভালো করে তেল দিয়ে দিতে লাগল। তানশান বিরক্ত হয়ে বলল,

–“আপনি একটা নাছোড়বান্দা!”
–“হুম, যত তাড়াতাড়ি এটা মেনে নেবে তত তাড়াতাড়ি তোমার জন্য ভালো।”
তানশান ক্লান্ত স্বরে বলল,
–“আমি কী বোকা না-কি! এটা আমি অনেক আগেই মেনে নিয়েছি।”
ছেলেটির পরাস্ত কণ্ঠে রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। হাসিমুখে বলল,
–“এইতো আমার বুদ্ধিমান ছেলে। যাও দাঁত ব্রাশ করে ঘুমিয়ে পড়ো।”
তানশান মৃদু হেসে দাঁত ব্রাশ করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। রূপকথা লাইট নিভিয়ে চলে যায়। রূপকথা চলে যেতেই তানশান বেড সাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে মায়ের ডায়েরিটা বের করে। চোখেমুখে অপ্রকাশিত উজ্জ্বলতাহ ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি নিয়ে ডায়রির শেষ পাতায় জীবনে প্রথমবারের মতো লিখল,
–“মাম্মা, আই গট অ্যান এঞ্জেল।”

মায়ের ডায়েরিতে আজ পর্যন্ত তানশান একটা কলমের ফোঁটাও দেয়নি। তবে আজ প্রথমবার মনে হলো, মিমি নামক মানুষটা অনেক অনেক ভালোবাসা আর সম্মান ডিজার্ভ করে। তাই আজ তাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পান্নায় লিপিবদ্ধ করে নিলো। তার দু’টো মা!
ওষ্ঠকোনে একফালি হাসি নিয়ে তানশান ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে চোখ বুজে।
বারান্দায় বসে ঝিমাতে ঝিমাতে তপোবন অচিরেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তার তন্দ্রাচ্ছেদ ঘটে চুলের মাঝে কেউ হাত গলিয়ে দিতেই। আসে আলতো নড়েচড়ে উঠল। চোখ মেলে তাকালে রূপকথার মুখটি ভেসে উঠল। সে আধো আধো নয়নে তাকিয়ে বলল,
–“তুমি।”
রূপকথা মৃদু হেসে শুধাল,
–“মন খারাপ?”

তপোবন ম্লান হাসল। আলগোছে ভার হয়ে থাকা মাথাটা এলিয়ে দেয় সেই জায়গাটিতে যেই জায়গাটা সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে তাকে তার পরিবার আর সন্তানকে আগলে রাখছে। দু’হাতে জড়িয়ে ধরে সরু কোমর।
রূপকথা প্রেম বলতে বোঝেই এই একটা মানুষকে। প্রথম প্রেম, ভালোবাসা, ভরসা, আশ্রয় সবটা এই মানুষটা জুড়ে। তাই এই মানুষটা খুব বিশেষ তার কাছে। সে সাদরে বুকে জড়িয়ে নিলো মানুষটাকে। হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“ঘরের খুঁটি আজ এমন দূর্বল হয়ে পড়েছে কেন?”
আঁধারে এঁটে থাকা ধূসর দৃষ্টিদ্বয় চিকচিক করছে। তপোবন ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“সব সম্পত্তির মাপজোক, ভাগ বাটোয়ারা শেষ। পোরশু লাস্ট বৈঠক! আনুষ্ঠানিকভাবে সব সম্পত্তি সবার নামে করা হবে‌। আমার পরিবারটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল রূপকথা! জীবন এতদিন যতবার আমাদের ভেঙেছে ততবার আমরা তিন ভাই একসাথে ছিলাম। কিন্তু আজ…আজ সবটা শেষ! আমার ঘরটা একটু একটু করে তার সব সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে।”

রূপকথার দেহ ম্লান হয়ে আসে। চোখের সামনে নিজের আগলে রাখা ঘরটিকে ভেঙে যেতে দেখার ক্লেশ কতটা বিদঘুটে তা সে বোঝে! মিহি স্বরে বলল, –“কে বলল সবটা শেষ? সৃষ্টিকর্তা আমাদের ঝুলিতে যা রেখেছেন আমরা নাহয় তার মাঝেই সুখ খুঁজব। আমরাই এই ঘরের সৌন্দর্য হয়ে উঠব।”
তপোবন ম্লান হাসল। চোখের সামনে ভাসছে পুরো বাড়ি জুড়ে প্রজাপতির মতো ছুটতে থাকা নায়েলের ছোট্ট অবয়ব। মৌনতার সারা বাড়ি টো টো করে বেড়ানো, ভাইজান বলে ডাক দেয়া। রোজ কাজ শেষে বাবার আর ইমরোজের সাথে বাড়ি ফেরার সেই বিমুগ্ধকর দৃশ্য! শূন্যতায় হাহাকার করে উঠল বুকটা।
–“এখন কী আপনিও সবার মতো দায়িত্ব থেকে মুখ লুকাতে চাইছেন? তবে কিন্তু বেঁচে থাকা সৌন্দর্যটুকুও হারিয়ে যাবে। কারণ এই বাড়ির অন্যতম সুখ, অন্যতম মজবুত খুঁটি আপনি। আপনি যেদিন নড়বড়ে হয়ে যাবেন সেদিন এই ঘরটা পুরোপুরি তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলবে।”
তপোবন মাথা তুলে তাকায়। স্মিত হেসে বলল,
–“সবসময় চেষ্টা করেছি নিজের পরিবারটাকে আগলে রাখার। সেটা শেষ নিঃশ্বাস অব্দি চেষ্টা করে যাব। কিন্তু মাঝেমধ্যে বলহীন লাগে।”

–“বলহীন লাগলে চলুন দুটো ডিম সিদ্ধ করে দেই, খেয়ে শক্তিশালী হয়ে যাবেন। কিন্তু বলহীন হওয়া যাবে না তবে আমার আর তানশানের হবে কী?”
তপোবন হেসে উঠল। আলগোছে মেয়েটিকে কোলে বসিয়ে কোমর জড়িয়ে নেয়। মিহি স্বরে বলে,
–“আপনাদের জন্যই তো এখনো বাঁচার স্বপ্ন দেখি মুরুব্বি।”
রূপকথা দু’হাতে আঁকড়ে ধরল সেই শক্তপোক্ত পুরুষালী গলদেশ। আহ্লাদী কণ্ঠে বলল,
— “তবে চলুন নতুন করে স্বপ্ন বুনি। আমাদের একটা ছোট্ট ঘর হবে, সেই ঘরে শুধু খুব প্রিয়জনরা থাকবে, যারা দুঃখ দেওয়ার কথা চিন্তা করতেও ভয় পাবে। মাথার উপর আব্বু আম্মার ছায়া থাকবে‌।
খোলা বারান্দার এক কোণে একঝাঁক মাধবীলতা থাকবে, আর বিকেল হলে আমরা চা হাতে নিয়ে হারানো দিনের গল্প করব না, বরং আগামীর নতুন কোনো ভোরের পরিকল্পনা করব। সেই ঘরের প্রতিটা দেয়ালে তানশান আর নায়েলের বড় হওয়ার সাক্ষী থাকবে। কেউ আমাদের সম্পর্কের মাঝে দেয়াল তুলবে না, কেউ স্বার্থের টানে আঙুল তুলবে না। মাঝেমধ্যে যখন আপনি ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরবেন, আমি আপনার সবটুকু অবসাদ কেড়ে নেব। কিন্তু তার জন্য আপনাকে শক্ত থাকতে হবে, কারণ আপনার ওই হাসিমুখটাই তো আমাদের আস্ত একটা পৃথিবী!”
তপোবন বিমুগ্ধ চিত্তে চেয়ে রইল মেয়েটির পানে। চারপাশের এই স্বার্থপর পৃথিবীর কোলাহল ছাপিয়ে মেয়েটির অস্তিত্বটুকুই তার কাছে প্রশান্তির হয়ে উঠল। হস্তদ্বয় আরো দৃঢ়ভাবে মেয়েটিকে নিজের সাথে আগলে নেয়। সেই দৃঢ়তায় স্পষ্ট সুপ্ত বাসনা, সে এই মেয়েটিকে বাকি জীবনটা আগলে বাঁচতে চায়‌, নতুন স্বপ্ন বুনতে চায়।
তপোবন স্মিত হেসে বলল,

–“চলো, তবে এক নতুন গল্পের শুরু করি।”
রূপকথা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
–“চলুন।”
তপোবন সত্যিই চললো। এক ঝটকায় মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিতেই রূপকথা হকচকিয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলল,
–“একি একি কোলে তুললেন কেন? ছাড়ুন ছাড়ুন পড়তে বসতে হবে আমায়।”
তপোবন ঘাড় কাত করে তাকায় মেয়েটির কুঁচকানো মুখপানে। ধূসর চোখে অস্পষ্ট হাসির উজ্জ্বলতা। চলতে চলতে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“আজ আর পড়তে হবে না, মুরুব্বি। চলুন আজ আমি একটু আপনাকে পড়ি।”
রূপকথার কান গরম হয়ে উঠল। তেতে উঠে তার বুকে চিমটি কেটে বলল,
–“বুড়ো লোকের ভিমরতি হয়েছে, ছাড়ুন বলছি। ফেইল করলে সব দোষ আপনার। তখন আমায় একটুও দোষ দিতে পারবেন না।”
তপোবন হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
–“বউ ফেইল করলেও আমার, পাশ করলেও আমার। সবটাই যখন আমার তখন কিসের এত চিন্তা!”
তপোবন ঠিক বলে। সত্যিই মেয়েটি জুড়ে সবটা একান্তই তার। মেয়েটির প্রতিটা লহমা, প্রতিটা অনুভূতি, প্রতিটা ভাবনা জুড়েই শুধু সে আর তার পরিবার। ছোট্ট রূপকথার নিজস্ব এক পৃথিবী রয়েছে যার নাম “তপোবন সিকদার”
রাতের দীর্ঘ সেই প্রহরটুকু তপোবন নিজের নামে করে নিলো। অজস্র মুহুর্ত বিমুগ্ধ চিত্তে কেটে গেল মেয়েটিকে পড়তে পড়তেই।

আর্লি স্প্রিং। মার্চের শেষ সপ্তাহ হলেও ওন্টারিও প্রদেশের রাজধানী টরন্টোতে শীতের দাপট তখনও প্রকট। প্রকৃতি শীতল এবং স্যাঁতস্যাঁতে। মাঝেমধ্যে আকস্মিক তুষারঝড় এখানে স্বাভাবিক হলেও এই সময়ে বৃষ্টির আধিক্যই বেশি থাকে। যাকে স্থানীয়রা ‘এপ্রিল শাওয়ার’ বলে থাকে।
মাত্র দুদিন আগে হওয়া তুষারঝড় থেমে গিয়ে আজ প্রকৃতিতে খানিক উষ্ণতার ছোঁয়া লেগেছে। রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে বরফগলা পানিতে পথঘাট স্যাঁতস্যাঁতে, পিচ্ছিল। ঠিক তেমনি, মৌনতার ক্লান্ত আর যন্ত্রণাবিদ্ধ জীবনেও আজ এক চিলতে স্বস্তির আভাস মিলেছে।
দিনটি ছিল পঁচিশে মার্চ। কাক ডাকা ভোরে খুলনা সিটি মেডিক্যালের পরিবেশ ছিল আড়ম্বরপূর্ণ, থমথমে। বহুতলা ভবনের এগারো তলার কড়িডোরে সিকদার পরিবারের সকল সদস্য থম মেরে বসেছিল। তাদের সেই থমকানো পরিবেশে ঠিক সাতটা দশ মিনিটে আলোড়ন তোলে সৃষ্টিকর্তার পাঠানো একটা ছোট্ট স্বর্গীয় পরীর কান্না।
সেদিন প্রথমবারের মতো ইমরোজ সবার সামনে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলেছিল যখন তার কোলে সদ্য জন্মানো নায়েলকে তুলে দেয়া হলো।

কক্ষে থাকা ডিজিটাল ঘড়িটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মৌনতার চোখের কার্নিশ বেয়ে টপটপিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। ঘড়িতে জ্বলজ্বল করছে পঁচিশে মার্চ ঠিক সকাল সাতটা বেজে দশ মিনিট।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! রাজকুমারীর মতো জন্ম নেওয়া মেয়েটি আজ বাবা-মা ছাড়াই কোথাও হয়তো উদাস মনে পড়ে আছে। কাঁপতে থাকা ঠোঁট কামড়ে ধরে মৌনতা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
–“আমার মেয়েটাকে তিলে তিলে এতিম করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ ইমরোজ। আপনি জীবনে খুব সুখী হন। আমাদের মা-মেয়ের ভালোবাসার বদলে এত করুণ উপহার দিয়েছেন—যে সুখের নাম শুনলেও এখন আমাদের গাঁয়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু আপনি অবশ্যই সুখী হন, অনেক সুখী হন।”
বহুক্ষণ যাবৎ কান্নার কারণ জানতে চাওয়া লিরা এবার নম্র স্বরে শুধাল,
–“কেন কাঁদছ সুইটহার্ট? শরীর খারাপ করছে?”
মৌনতা চোখ তুলে তাকায় লিরার পানে। ক্রন্দনরত গলায় বলল,

–“আজকে আমার মেয়ের জন্মদিন। আজ ও পাঁচ বছরে পা দেবে। কিন্তু ওর সাথে ওর বাবা মা কেউ নেই। ও কখনো এভাবে একা থাকেনি। ও নিশ্চয়ই অনেক কান্না করছে।”
লিরা ম্লান হাসল। মৌনতা অনুনয় করে বলল,
–“আপনি কী একটু ডক্টরকে বলবেন আমায় আজকের জন্য একটু ছেড়ে দিতে? আমি তো এখন যথেষ্ট সুস্থ্য।”
–“স্যরি ডিয়ার। আমি এগুলো বললে আমার জব থাকবে না।”
লিরা অসহায় কণ্ঠে বলল। একজন মা চাইলেও তার সন্তানকে দেখতে পারে না, ছুঁতে পারে না, তার মাথার উপর ছায়া হতে পারে না। পৃথিবীতে এর থেকে অসহায়ত্ব বোধহয় আর কিছু হতে পারে না। মৌনতাও একজন অসহায় মায়ের মতো তাকিয়ে রইল লিরার দিকে। জীবন এত বিদঘুটে পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যেখানে সন্তানের থেকে দূরত্বের চেয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা কম কষ্টকর মনে হয়।
মৌনতার অসহায়ত্ব দীর্ঘ হলো। কিন্তু দুপুর বারোটা নাগাদ আইসোলেশন রুমে দু’জন নার্স ঢুকলঝ। সাধারণত আইসোলেশন রুমে একজন নার্স আর ডক্টর ব্যতীত কেউ ঢোকে না। তারা মৌনতাকে বের করার প্রস্তুতি নিতেই মৌনতা অবাক হলো। উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধাল,

–“আমাকে কোথায় নিচ্ছেন? নরমাল কেবিনে? আমি কী সুস্থ হয়ে গিয়েছি?”
নার্স দু’জন প্রগাঢ় হেসে বললেন,
–“তোমায় সাময়িক রিলিজ দেয়া হচ্ছে। তাই রিলিজের পূর্বে ফাইনাল চেকাপ করার জন্য নেয়া হচ্ছে।”
মৌনতার চোখেমুখে উচ্ছ্বাস আনন্দ আঁছড়ে পড়ে। চোখ দু’টো খুশিতে টলটল করে উঠল। সে প্রাণোচ্ছ্বল কণ্ঠে শুধায়,
–“সত্যি? আমায় কী আজকেই রিলিজ দেবে?”
–“হুম। কিন্তু একটু সময় লাগবে চেকাপ করাতে আর রিপোর্ট পেতে রাত হয়ে যাবে।”
মৌনতা দুঃখী হলো না। দেরি হোক তবুও সে তার নায়েলকে দেখেতে পারবে। সে বলল,
–“কিন্তু ডক্টর হঠাৎ কেন আমায় রিলিজ দিচ্ছে? এখনো তো আঠাশ দিন হয়নি।”
–“ডক্টর বলেছেন, তুমি এখন সাময়িক ছুটির জন্য প্রায় প্রস্তুত। তবে খুবই সতর্কতার সাথে থাকতে হবে।”
মৌনতা অশ্রুভেজা নয়নে গাল ভরে হাসল নার্সের কথায়। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তাকালো পরিচিত কেউ আছে কি-না দেখার জন্য। কিন্তু কেউ নেই, তাকে কী কেউ নিতে এসেছে?

মৌনতা প্রধাণত যার চিকিৎসাধীন রয়েছে সে হলো ডঃ আরন শিম্মার। এরোজ শুধু চারবার তার সাথে দেখা করেছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই রেগুলার চিকিৎসক ডঃ মার্ক মিন্ডেন এর সাথে কথা হয়।
ডঃ মার্ক মিন্ডেন এর পেছনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে এরোজ। সম্মুখে ডঃ আরন শিম্মার কিছুটা ক্রুব্ধ!
দুইদিন আগে রিলিজ দিতে নারাজ সে। এই সময়ে রোগীর অবস্থা ভীষণ নাজুক আর সংবেদনশীল থাকে। যেকনো একটা ক্ষুদ্র ভুলের কারণে পরে পস্তাতে হতে পারে।
কিন্তু এরোজের অনুরোধেই তারা আজকে রিলিজ দিচ্ছে মৌনতাকে। যদিও ডঃ মিন্ডেন এতে এরোজকে অনেকটা সাহায্য করেছে। কেননা মৌনতার রিকভারি বেশ দ্রুতগামী ছিল। এতটা দ্রুত তারা আশা করেনি। কিন্তু মৌনতার মাঝে অদম্য মানসিক শক্তি ছিল, অপেক্ষা ছিল সন্তানকে এক পলক দেখার। হয়তো তাই সৃষ্টিকর্তাও তার সঙ্গ দিয়েছে।
ডঃ আরন মৌনতার কেবিনের দিকে পা বাড়ায়। ডঃ মিন্ডেন ও সাথেই যায়। যেতে যেতে পাশে চলতে থাকা এরোজকে হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

–“সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছো মৌনতাকে?”
এরোজ স্মিত হেসে মাথা নাড়লো। ডঃ ফের বললেন,
–“আমার তরফ থেকে তোমাদের মেয়েকে অনেক অনেক ভালোবাসা দেবে।”
–“থ্যাংক ইউ স্যার!”
ডঃ মার্ক মিন্ডেন মৃদু হাসলেন। মাঝেমধ্যে প্রিয়জনের সঙ্গ রোগীর সুস্থ্যতার গতিকে আরো ত্বরান্বিত করে দেয়। মূলত এটাই তার প্রচেষ্টা!
মাতৃত্বের হাহাকার একটু বেশিই দীর্ঘ হলো। মৌনতার সকল রিপোর্ট আসতে রাত নয়টা বেজে গেল। ডঃ আরন শিম্মার এর কেবিনে আরেকদফা মিটিং বসলো। মিটিং এ এরোজ আর তার খালু উপস্থিত।
নিশাতের হাজব্যান্ড শাহরিয়ার আলম চিন্তিত কণ্ঠে শুধালেন,

–“রিপোর্ট কী আশানুরূপ এসেছে?”
ডক্টরের জবাব আসলো না। এরোজ চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রইল ডাক্তারের দিকে। ব্লাস্ট সেল (ক্যান্সার কোষ) যদি পাঁচ পার্সেন্টের নিচে না আসে তবে ডাক্তার কোনোক্রমেই মৌনতাকে রিলিজ দেবে না বরং আবার ও ইনডাকশন থেরাপি দিতে হবে।
দীর্ঘ দশ মিনিট বাদ ডঃ একটা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললেন। চোখের চশমা খুলে নিজ ভাষায় জানালেন,
–“কংগ্রাচুলেশন! মৌনতার ব্লাস্ট সেল পাঁচ পার্সেন্টের নিচে নেমেছে।”
ডঃ মার্ক মিন্ডেন সহ এরোজ আর তার খালু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এরোজের শ্রান্ত ভর ছেড়ে দেয়। চোখের কোনা টলটল করে ওঠে, এইতো এভাবেই তারা প্রতিটা ধাপ জিতে যাবে। জিততেই হবে! নয়তো নরপশুরা যে জিতে যাবে। এরোজের চোখেমুখে অদম্য জেদ! মৌনতাকে সুস্থ্য হতেই হবে।
কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস বোধ হয় আড়ালে হাসছিল। তার অদম্য জেদ, শক্তি আর দৃঢ়তা কয়েক মিনিটের মাঝেই থমকে গেল।
যেই একটা জিনিসের জন্য বিগত ছয়টা বছর সে নিজের গোটা জীবন কারোর নামে করে দিয়েছিল সেই জিনিসটাই এখন আর নেই।
যে চুলগুলো ছোঁয়ার জন্য তার অন্তঃস্থল বছরের পর বছর গুমরে মরেছে, আজ সেই চুলগুলোই তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু মুহূর্তটা কেন এত বিদঘুটে? কেন এত হাহাকার মেশানো?
ডক্টরের নির্দেশনা মনোযোগ সহকারে শুনে এরোজ ডিসচার্জ সামারি নিয়ে তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল কেবিনের বাইরে। ঠিক তখনি লিরা ব্যস্ত কদমে এগিয়ে এসে একটা ব্যাগ এগিয়ে দিল।

–“কী এটা?”
এরোজের কৌতুহলী গলায় লিরা বলল,
–“তুমি মৌনতার চুল সংরক্ষণ করতে বলেছিলে। এই নাও, এটা করতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে এরোজ।”
এরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ব্যাগটির দিকে। কিয়ৎকাল পূর্বেও সে নিজেকে যেকোনো কঠিন মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছিল। কিন্তু এখন তার হাত পা কাঁপছে কেন? কেন ভেতরটা ভেঙে আসছে?
এরোজ কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে। ব্যাগটার ভেতরে তাকাতেই তার পৃথিবীটা থমকে গেল। পুরো ব্যাগজুড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে কালো রেশমের ন্যায় একরাশ চুল। কিন্তু আজ সেগুলো প্রাণহীন, শিকড়চ্যুত। এরোজের শ্বাস আঁটকে এল। চোখে জ্বলজ্বল করছে ভেতরের আর্তনাদগুলো। লিরার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
–“এত চুল? তুমি তো বলেছিলে ইনডাকশন থেরাপিতে সব চুল একবারে পড়ে না!”
লিরা কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার বলল,

–“সবার ক্ষেত্রে সমান হয় না। মৌনতার দেহ আগে থেকেই অনেক পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। উচ্চ তাপমাত্রার কেমো তার শরীর সহ্য করতে পারেনি। এখনো অল্পকিছু চুল আছে। ডক্টর বলেছে, এরপর যেদিন হাসপাতালে আসবে সেগুলো কেটে আসবে। নয়তো প্রচুর ঝামেলা হবে।”
এরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ব্যাগটার দিকে। এতদিন যতবার দেখা হয়েছে, মৌনতার মাথায় ক্যাপ পরানো থাকত। সে ভেবেছিল আড়ালে হয়তো রয়েছে যত্ন করে রাখা একরাশ চুল। কিন্তু আজ এই প্লাস্টিকের ব্যাগটা যেন একটা ছোট কফিন, যেখানে মৌনতার আজন্ম লালিত সৌন্দর্যের সমাধি হয়েছে।
লিরা চলে যায়। আর নিজের প্রাণহীন স্বপ্নদের হাতে নিয়ে এরোজ বলহীন দেহে পড়ে রইল বেঞ্চিতে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আঁখিদ্বয় রক্তাভ হয়ে উঠল।
এরোজ স্থবিরতা ভেঙে কম্পিত হাতে ছুঁয়ে দিল চুলগুলো। একবার দু’বার এমনকরে অজস্রবার ছুঁয়ে দেখতে দেখতেই সে হঠাৎ করেই শব্দ করে কেঁদে উঠল। ঝট করে ঠোঁটে চেপে ধরে নিজের প্রিয় চুলগুলো। শেকড়হীন চুলের গোছায় অজস্র চুমু দিতে দিতে আর্তনাদের সুরে বলে ওঠে,

–“আমি আজীবন এই চুলগুলোকে ছুঁতে চাইতাম কিন্তু এভাবে তো কক্ষনো চাইনি। তবে কেন আমাদের এভাবে দেখা হলো?”
আর্তনাদগুলো বড্ড অনাদরে অবহেলিত হলো হাসপাতালের নিস্তব্ধ কড়িডরে। কেউ শুনলো না এরোজের আর্তনাদ গুলো‍।
কেবিনের বেডে পা ঝুলিয়ে বসে আছে মৌনতা। চোখেমুখে এক চিলতে অমলিন শিশুতোষ হাসি। পাশ দিয়ে যাওয়া একজন নার্সকে সে শুধাল,
–“আমায় কে নিতে এসেছে?”
নার্স মৃদু হেসে উত্তর দিলেন
– “এরোজ।”
মৌনতার ঠোঁটে এক চিলতে প্রশান্তির রেখা ফুটে উঠল। গত এক মাসে সে এইটুকু অন্তত বুঝেছে, মানুষটা বাইরে থেকে যতটাই উগ্র কঠোর হোক না কেন, কর্তব্যে সে অটল।
এই অচেনা বিভূঁইয়ে ওই মানুষটাই তাদের একমাত্র শক্তপোক্ত আশ্রয়।
লিরা এরোজের আনা পোশাকগুলো নিয়ে এগিয়ে এলে মৌনতা সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখল। পাতলা সুতির ফ্রক, ঢিলেঢালা প্যান্ট আর একটা ওভারকোট। সে এমন ধরণের পোশাক কখনোই পড়েনি। শাড়ি আর থ্রি পিস ব্যতীত সে অন্য কোনো পোশাকে স্বস্তি পায় না। সে শুধায়,

–“এগুলোই পড়তে হবে?”
লিরা মৃদু হেসে বলল,
–“হুম, সদ্য কেমো শেষ হওয়ায় তোমার ত্বক এখন ভীষণ সংবেদনশীল। খুব নরম আর হালকা কাপড়-ই এখন পড়তে হবে।”
জীবনে অনেককিছু না চাইতেও আমাদের মেনে নিতে হয়। কিন্তু মৌনতার চঞ্চলতা, মাতৃত্বের উল্লাস আর হাসি হঠাৎ করেই মুখ থুবড়ে পড়ল যখন তার মাথা থেকে ক্যাপটা খুলে ফেলা হলো, আর সম্মুখে ভেসে উঠল একটা বিশাল আয়না। মৌনতার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে।
শীর্ণ হাড়ের ওপর ফ্যাকাসে চামড়ার প্রলেপ, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে কালশিটে দাগ, কোটরাগত চোখ—যেন এক জীবন্ত কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার এই ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখে সে যতটা না থমকাল, তার চেয়েও বেশি বিদীর্ণ হলো নিজের শ্রেষ্ঠতম সৌন্দর্যকে হারিয়ে।
​মৌনতা উন্মাদের মতো আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাথার তালুর দু-এক জায়গায় পড়ে থাকা অবশিষ্ট চুলের গোছাগুলো উদ্ভ্রান্তের মতো ছুঁতে ছুঁতেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আর্তনাদ করে বলল,

–“আমার চুল? আমার চুল কোথায় লিরা? আমার হাঁটু সমান চুল ছিল, তা নেই কেন? তুমি তো বলেছিলে চুল পড়বে তিন চারটা কেমো দিলে?”
লিরা আহত নয়নে মৌনতার আর্তনাদ শুনলো। ইংরেজিতে না বললেও সে বুঝলো মৌনতা চুল নিয়েই কষ্ট পাচ্ছে। সে আদুরে গলায় বলল,
–“ডোন্ট প্যানিক সুইটহার্ট! তোমার চিকিৎসা শেষ হতেই তোমার চুল আবার আগের মতো গজাতে শুরু করবে।”
মৌনতা স্তব্ধ হয়ে গেল। যেখানে মৃত্যুই হয়তো জীবনের একমাত্র উপসংহার, সেখানে চুলের আশা করা কি নিছক অলীক স্বপ্ন নয়? অন্তঃস্থলে আন্দোলিত হওয়া চরম সত্যটিতে এক অদ্ভুত রিক্ততা ভর করল মৌনতার সারা শরীর। আর্তনাদগুলো গুমরে মরল বুকের গভীরে।
সর্বশান্ত হয়ে যায় দেহ।
ঠিক তখনই ধীর কদমে ঘরে ঢুকল এরোজ। চোখে তার প্রিয়তম সৌন্দর্যকে হারানোর এক নিঃশেষিত শোক। পাশে এসে কেউ দাঁড়াতেই মৌনতা বিধ্বস্ত নয়নে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই এরোজ স্মিত হাসল। মিহি স্বরে বলল,

–“এখনো সৌন্দর্যের মতো তুচ্ছ একটা জিনিসের জন্য এত আর্তনাদ? ভুলে গিয়েছেন, অপার্থিব সৌন্দর্য থাকাকালীন ও কেউ একজন বাজেভাবে ঠকিয়ে গিয়েছে? তবে কেন ক্ষণস্থায়ী এই সৌন্দর্যের জন্য এত আর্তনাদ? আপনার সৌন্দর্য আপনার ভেতরে থাকা মন আর আপনার সন্তান।”
মৌনতার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ায়। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“স্বান্তনা দিচ্ছেন?”
এরোজ দেয়ালে বাহু ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। বুকে হাত গুঁজে বলল,
–“উহু, শুধু নিজেকে চেনাতে সাহায্য করছি। আপনি এখনো নিজেকে চেনেন না। যেদিন চিনবেন সেদিন থেকে আর সৌন্দর্যের পরোয়া কোনোদিন করবেন না। শুধু আপনাকে যারা সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসে তাদের পরোয়া করবেন।”
–“আমার সন্তান ব্যতীত কেউ আমায় সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসে না।”
এরোজ ম্লান হাসল। ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪ (২)

–“অথচ আপনার স্মৃতি নিয়ে কেউ ছয় বছর অনায়াসে কাটিয়ে দিয়েছে। সৌন্দর্য তো দূরের কথা এক নজর দেখার ও অধিকার ছিল না তার।”
মৌনতা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট নড়ছে কিন্তু কিছুই শুনতে পেল না। শুনতে পেল না, সৌন্দর্য নয় তার স্মৃতিটুকুই কারোর বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ছিল। কারোর জন্য এতটা অমূল্য সে!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here