Mad for you 2 part 10
তানিয়া খাতুন
রুহি স্নান সেরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।
ক্ৰিশের কিনে আনা হালকা রঙের টপ আর প্লাজোটি পরে তাকে যেন অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল।
ভেজা চুলের ডগা বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে, আর সে ধীরে ধীরে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছিল।
কিছুক্ষণ পর তার দৃষ্টি নিজের প্রতিবিম্বে গিয়ে আটকে রইল।
পোশাকটি তার গায়ে এত নিখুঁতভাবে মানিয়েছে যে রুহির নিজেরই বিস্ময় লাগল।
লোকটা তার মাপ এত নিখুঁতভাবে জানল কীভাবে?
প্রশ্নটি মনে জাগতেই হঠাৎ কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তটি তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
ক্ৰিশ যেভাবে হঠাৎ তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছিল…
তার দৃঢ় বাহুর বাঁধন…
তার চোখের সেই তীব্র দৃষ্টি…
সব মনে পড়তেই রুহির শরীর শিউরে উঠল।
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল ভয়ে।
সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।
“ভাগ্যিস তখন ওনি( শরিফুল সাহেব) চলে এসেছিলেন…”
মনে মনে ফিসফিস করে বলল সে।
নইলে কী হতো, সেটি আর কল্পনাও করতে পারল না।
ভয়ে তার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো।
ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে বিছানার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল রুহি।
দু’হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে চুপচাপ বসে রইল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো কারও সিটি বাজানোর শব্দ।
পরের মুহূর্তেই দরজাটি খুলে ঘরে প্রবেশ করল ক্ৰিশ।
ভেতরে ঢুকেই সে জোরে দরজাটি বন্ধ করে দিল।
শব্দটিতে রুহি কেঁপে উঠল। ভয়ে আরও গুটিয়ে নিল নিজেকে।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, চোখে অদ্ভুত এক দুষ্টুমি।
রুহির বুকের ধুকপুকানি আবার বেড়ে গেল।
ক্ৰিশ কোনো কথা না বলে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল।
রুহির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
পরক্ষণেই সে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে নিল।
ক্ৰিশ শার্ট খুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলল।
তার ভেজা চুল থেকে এখনো ছোট ছোট পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
তারপর গিয়ে এসির তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
ভ্রু কুঁচকে রুহির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার গরম লাগছে না, বাটারফ্লাই?”
“আমার তো ভীষণ গরম লাগছে। তাই শার্ট খুলে ফেললাম।”
এরপর একটু উঠে বসে ধীরে ধীরে রুহির দিকে ঝুঁকে এলো সে।
“তুমিও খুলে ফেলো টপটা…”
কথাটি শুনে রুহির মুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল।
লজ্জায় যেন কান পর্যন্ত রক্তিম হয়ে গেল।
সে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বলে,
“আপনি ছেলে… আমি মেয়ে… আমি এটা করতে পারব না…”
ক্ৰিশ কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর দু’হাত বিছানায় ভর দিয়ে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ল রুহির ওপর।
রুহির নিঃশ্বাস আটকে এলো।
এত কাছে চলে এসেছে ক্ৰিশ যে তার শরীরের উষ্ণতা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল সে।
ক্ৰিশ নিচু গলায় বলে,
“কেন পারবে না?”
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো রুহির পোশাকের দিকে।
“তোমার অতিরিক্ত কী আছে লুকানোর দেখাও?”
কথাটি শুনে রুহির ভেতরে জমে থাকা লজ্জা আর রাগ একসাথে বিস্ফোরিত হলো।
সে হঠাৎ দু’হাতে ক্ৰিশ কে জোরে ধাক্কা দিল।
ক্ৰিশ হয়তো এমনটা আশা করেনি।
ভারসাম্য হারিয়ে সোজা পড়ল রুহির ওপর।
মুহূর্তেই দু’জনের শরীর একসাথে ধাক্কা খেল।
দু’জনই কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল।
রুহির বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।
তার হাত দুটো এখনো ক্ৰিশের বুকে আটকে আছে।
আর ক্ৰিশ…সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুহির মুখের দিকে।
দু’জনের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে এসে লাগছে।
রুহি ভয়ে ও লজ্জায় চোখ বন্ধ করে নিল।
কিন্তু চোখ বন্ধ করেও সে অনুভব করতে পারছিল—ক্ৰিশ এখনো নিবিড়ভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ক্ৰিশ আরও একটু ঝুঁকে এলো।
তার মুখ এতটাই কাছে যে রুহি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস নিজের গালে এসে লাগছে।
সে ধীরে ধীরে রুহির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে—
“ড্রেসের fitting হয়েছে, butterfly?”
রুহি চোখ বন্ধ রেখেই কাঁপা কাঁপা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ… ঠিক হয়েছে…”
তার গলায় লজ্জা আর অস্বস্তি মিশে ছিল।
ক্ৰিশের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
সে আরও নিচু গলায় বলল—
“দেখেছো? তোমার শরীর স্পর্শ না করেও… তোমার প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা মাপ আমার জানা হয়ে গেছে।”
কথাটা শুনে রুহি ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
সে আস্তে করে বলল—
“সরে যান… please…”
ক্ৰিশ যেন তার কথাই শুনল না।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে রুহির মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল।
তার আঙুলের স্পর্শে রুহির শরীর আবার কেঁপে উঠল।
“চোখ খোলো… তাকাও আমার দিকে।”
রুহি ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
পিটপিট করে তাকাল ক্ৰিশের দিকে।
দু’জনের চোখ এক মুহূর্তে আটকে গেল একে অপরের মধ্যে।
ক্ৰিশ আঙুল দিয়ে slide করে রুহির কপাল থেকে গাল পর্যন্ত।
তার স্পর্শে অদ্ভুত এক শীতলতা ছিল, অথচ সেই শীতলতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল দখলদারির তীব্রতা।
সে শান্ত গলায় বলল—
“তুমি এখন আমার বউ…”
“মিসেস খান হয়ে গেছো, butterfly। এটা সবসময় মাথায় রাখবা।”
তার দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল।
রুহির বুকটা ধক করে উঠল।
“তোমার আব্বু-আম্মুর সাথে আমি কথা বলে নেব। আপাতত তুমি ওদের কাছে যাবে না।”
রুহি কিছু বলতে যাচ্ছিল।
কিন্তু তার আগেই ক্ৰিশ নিজের আঙুল চেপে ধরল রুহির ঠোঁটে।
“হুশ…”
তার কণ্ঠ নিচু, অথচ দৃঢ়।
“আমি বেশি কথা পছন্দ করি না।”
সে আরও একটু ঝুঁকে এলো।
“আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমি দ্বিতীয়বার কোনো কথা বলতে পছন্দ করি না।”
রুহির গলা শুকিয়ে এলো।
সে ভয়ে কিছু বলতে পারল না। শুধু আস্তে করে মাথা নাড়ল।
“কাল থেকে কলেজে যাবে… কিন্তু আমার সাথে যাবে। আমার সাথেই ফিরবে।”
তার চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল।
“অন্য কোনো ছেলের দিকে ভুলেও তাকাবা না। কথা বলাও বন্ধ।”
রুহির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ক্ৰিশ খুব শান্ত স্বরে বলে—
“তুমি আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি… শুধু আমার। বুঝেছো?”
তার কণ্ঠে এমন এক দখলদারির অনুভূতি ছিল, যেটা শুনে রুহির ভয় আরও বেড়ে গেল।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার নিচু গলায় বলল—“আর যদি কোনো রকম ভুল কিছু হয়…”
সে ধীরে ধীরে রুহির থুতনি তুলে ধরে।
“তাহলে তোমাকে আর সময় দেব না।
হাত-পায়ে শিকল বেঁধেও হোক… ক্ৰিশ খান বাসর করবে।”
কথাটা শুনে রুহির পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো।
তার চোখ ভিজে উঠল আতঙ্কে।
কিন্তু সে কোনো কথা বলতে পারল না।
শুধু কাঁপতে কাঁপতে আবার মাথা নাড়ল…
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। তারপর মাথার নিচে এক হাত রেখে ভ্রু কুঁচকে রুহির দিকে তাকাল।
“আমার মাথাটা টিপে দাও,”
“ভীষণ যন্ত্রণা করছে।”
রুহি বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটা এমনভাবে কথা বলে যেন আদেশ করা তার জন্মগত অধিকার।
মনে মনে ক্ৰিশ কে হাজারটা গালি দিল সে।
অসভ্য… জোর করে বিয়ে করেছে, আবার হুকুমও করছে!
কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস হলো না।
ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসতেই ক্ৰিশ কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই মাথাটা এনে রাখল রুহির কোলের উপর।
পরক্ষণেই মুখ গুঁজে দিল তার উদরে।
রুহির পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
তার নিঃশ্বাস যেন মুহূর্তেই আটকে গেল।
ক্ৰিশের গরম নিঃশ্বাস কাপড় ভেদ করে এসে লাগছিল তার শরীরে।
সেই উষ্ণ স্পর্শে রুহির আঙুল পর্যন্ত কেঁপে উঠছিল।
“কি… কি করছেন?”
ভয়ে আর অস্বস্তিতে কাঁপা গলায় বলে উঠল সে।
“বালিশে মাথা রাখুন… please…”
ক্ৰিশ চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু হেসে ফেলল।
তারপর অত্যন্ত নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল—
“আমার বউয়ের কোলে শুয়েছি… তোমার সমস্যা কি?”
কথাটা শুনে রুহির মুখ গরম হয়ে উঠল।
সে দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলানোর চেষ্টা করল।
বিরক্ত হয়ে জোরে জোরে ক্ৰিশের চুল টানতে শুরু করলো।
ক্ৰিশ চোখ বন্ধ রেখেই হেসে উঠল।
মাথাটা আরও একটু গুঁজে দিল তার কোলের কাছে।
তার মুখে তখন অদ্ভুত প্রশান্তি।
যেন বহুদিন পর সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।
সকালের আলো ধীরে ধীরে পুরো ঘরটাকে আলোকিত করে তুলছিল।
পর্দাগুলো বাতাসে হালকা দুলছে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে চোখ খোলে।
ঘুম ভাঙতেই স্বভাববশত পাশে হাত বাড়িয়ে রুহিকে খুঁজল সে।
কিন্তু বিছানার পাশটা ফাঁকা।
মুহূর্তেই তার কপাল কুঁচকে গেল।
সে দ্রুত উঠে বসল।
“আবার পালালো নাকি?”
বিরক্ত গলায় বিড়বিড় করে উঠল ক্ৰিশ।
এক মুহূর্তেই তার ঘুম উধাও হয়ে গেল। মাথার ভেতর যেন রাগ দপদপ করে জ্বলে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগোতেই হঠাৎ বেলকনির দিক থেকে কোকোর ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে এলো।
তার সাথে মিশে ছিল এক মেয়েলি হাসি।
নরম, প্রাণখোলা হাসি।
ক্ৰিশ থেমে গেল।
ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল সে।
আর পরের দৃশ্যটা দেখেই কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
রুহি দাঁড়িয়ে আছে।
তার কোলে কোকো।
সকালের হাওয়ায় রুহির খোলা চুলগুলো উড়ছে। মুখে কোনো ভয় নেই এই মুহূর্তে।
বরং শিশুর মতো হাসছে সে।
কোকোর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে রুহি।
আর কোকো আনন্দে ঘেউ ঘেউ করে সাড়া দিচ্ছে।
মাঝে মাঝে দুই পা তুলে রুহির গায়ে উঠে পড়ছে।
রুহি হেসে গড়িয়ে পড়ছে তার দুষ্টুমি দেখে।
ক্ৰিশ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখতে লাগল।
তার চোখে ধীরে ধীরে অদ্ভুত এক মুগ্ধতা নেমে এলো।
এই বাড়িতে ক্ৰিশের অসংখ্য বন্ধু এসেছে। কত মানুষ কোকোর সাথে মিশতে চেয়েছে।
কিন্তু কোকো কখনো ক্ৰিশ ছাড়া আর কারও কাছে যায়নি।
এই প্রথম সে নিজে থেকে কারও কাছে গিয়ে এত আদর নিচ্ছে।
রুহি হঠাৎ কোকোর গালে চুমু খেল।
কোকোও আদুরে ভঙ্গিতে নিজের মুখ ঘষে দিল রুহির গলায়।
দৃশ্যটা দেখেই ক্ৰিশের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে জ্বলে উঠল।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল—
“শালা… আমার মতোই হয়েছে।”
তারপর বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেল।
রুহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ৰিশ কোকোকে এক ঝটকায় তার কোল থেকে ছিনিয়ে নিল।
“এই!”
রুহি অবাক হয়ে তাকাল।
ক্ৰিশ কোনো কথা না বলে কোকোকে নিয়ে গিয়ে রুমের এর বাইরে নামিয়ে দিল।
কোকো হতভম্ব হয়ে কয়েকবার ঘেউ ঘেউ করল।
তারপর ক্ৰিশ দরজাটা বন্ধ করে আবার ধীরে ধীরে রুহির সামনে এসে দাঁড়াল।
রুহি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
লোকটার আচরণ তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল রুহির মুখের দিকে।
তারপর আচমকা হাত বাড়িয়ে রুহিকে টেনে নিল নিজের কাছে।
রুহির বুক ধক করে উঠল।
ক্ৰিশ নিচু হয়ে তার ঠোঁটে আলতো একটা চুমু এঁকে দিল।
তারপর গলায়।
Mad for you 2 part 9
“আর কোনোদিন…”
সে ধীরে ধীরে রুহির চিবুক তুলে ধরল।
“আমি ছাড়া কাউকে এভাবে আদর করবা না।”
তার চোখে তখন শিশুসুলভ হিংসেটা স্পষ্ট।
রুহি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
ক্ৰিশ যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
“যাও, রেডি হও, কলেজযাবো।”
