সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২২
Raiha Zubair Ripti
সিকান্দার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই রেণু কে দেখতে পেলো। তড়িঘড়ি করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“ মুনতাহা কে দেখেছো তুমি? সারা বাড়ি খুঁজেও পেলাম না। ”
রেণু ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে আশপাশ টায় একবার তাকিয়ে বলল-
“ ভাই আফনের লগে আমার কিছু কথা আছে। অনেক দিন ধইরা কইতে চাইতাছি কিন্তু সুযোগই পাইতাছি না। ”
সিকান্দারের শোনার ইচ্ছে হচ্ছে না। তার অস্থির মন কেবল মুনতাহা কে খুঁজছে। পেলে তখন হয়তো শুনবে।
“ তোমার কথা শোনার চেয়েও আগে আমার মনের খোঁজ পাওয়া বেশি জরুরি রেণু। পরে শুনবো। এখন আসি। ”
সিকান্দার কথাটা শেষ করেই হাঁটা ধরলো। পথিমধ্যে পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। সে ফোনটা বের করে দেখলো তার এসিস্ট্যান্ট রবিন ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে রবিন সালাম দিয়ে বলে উঠলো-
“ স্যার আপনি কোথায়? ম্যাডাম এসে অপেক্ষা করছে আপনার জন্য সেই কখন থেকে। ”
সিকান্দারের কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাওয়া বুকটা যেন সাথে সাথে শীতল নদীতে পরিনত হলো। কপালে লেগে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম সে বা হাত দিয়ে মুছে বলল-
“ আপনার ম্যাডাম কে ফোনটা দিন। ”
মুনতাহা সকালে নিজ হাতে সিকান্দারের জন্য খাবার রান্না করেছিল আজ। একটা সপ্তাহ ধরে সে এই লোকটাকে এক সেকেন্ডের জন্যও দেখে নি। কি যে কষ্ট হচ্ছিলো। সিকান্দার বলেছিল অফিসে অনেক কাজের চাপ যাচ্ছে তার উপর দিয়ে। এখানে ওখানে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। একটা সপ্তাহ যেন সময় দেয় মুনতাহা তাকে। সেলিম মির্জাও সেম কথাই বলেছিলো। মুনতাহা বিশ্বাস করেছিল। তাদের ফোনে তিনবেলার জায়গায় দু’বেলা কথা হতো। মুনতাহা যখন ফোন দিত তখন ফোন সুইচঅফ বলতো। তবে ফোনে কথা বলা আর সামনা-সামনি কথা বলা, দুটোর অনুভূতি কি আর এক? প্রায় প্রতিদিন সে লোকটার জন্য রাত জাগতো, এই আশায় যে হয়তো সে আসবে। মুনতাহা কে চমকে দিয়ে মৃদুস্বরে ডাকবে। কিন্তু সে আসতো না।
মুনতাহার কান্না পেত। চোখের জলে ভিজাতো বালিশ। অফিসটাও সে চিনে না সিকান্দারের। চিনলে সে চলেই যেত। সাহস করে কাউকে বলতেও পারছিলো না। আজ সিমরান শপিং এর কথা বলায় মুনতাহা তখন নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে নি বিধায় বলেছিল সে একটু অফিসে যেতে চায়,সিকান্দারের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে যাবে। সিমরান তখন বললো শপিংমলে যাবার পথে নামিয়ে দিবে।
সিমরান কে সেদিনই অর্নব গিয়ে নিয়ে এসেছে। সালমান মির্জার কাছে মাফ চেয়েছে,অবশ্য সেসব সে মন থেকে চায় নি। সিকান্দারের ভয়েই চেয়েছে। নাদিম তো দিবেই না তার বোন কে। সালমান মির্জাই পাঠিয়েছেন।
মুনতাহা সকাল সকাল উঠেই সিকান্দারের পছন্দের সব খাবার রান্না করে সিমরানের সাথে বেরিয়েছিল,তখন কেউ ছিলো না বসার ঘরে। সেজন্য দেখতে পারে নি। ফোনে চার্জ ছিলো না বলে ফোনটা ওভাবেই বন্ধ অবস্থায় চার্জে লাগিয়েছিল। সিকান্দার বালিশ টা উঁচা করলে হয়তো দেখতে পেত। অফিসে এসে পিওন কে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলো সিকান্দার নাকি অফিসে নেই। বোকা মেয়ে ভাবছিল হয়তো আবার কোথাও ছোটাছুটি করছে তার স্বামী টা কাজের জন্য। ফোনটাও আনে নি সাথে। সবাই তখন এক অপরিচিত বোরকা নিকাব পরিহিত মেয়েকে এভাবে অফিসের ভেতর দেখে একটু চমকেছিল বটে,কিন্তু যখন মেয়েটার পরিচয় জানতে পারলো তখন তারা আগের তুলনায় আরো বেশি চমকালো। মেয়েটার কেবল দুটো চোখ দেখা যাচ্ছে। আর বাকি সব কালো কাপড়ের আবরণে ঢাকা। বলতে দ্বিধা নেই এই পরিবর্তন কেবল বিয়ের পরই হয়েছে মুনতাহার। আগেও সে বোরকা নিকাব পরলেও কখনো হাত মোজা, পা মোজা পরতো না। কিন্তু বিয়ের পর সিকান্দার কিনে দিয়েছে,বাহিরে বের হলেই এসব পরতে বলেছে। রবিন অফিসে এসেই জানতে পারলো তার স্যারের ম্যাডম এসেছে। আর স্যার অফিসে নেই। সেজন্য রবিন ফোন করেছিল।
মুনতাহা ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে ছিলো। রবিন ফোনটা বাড়িয়ে দিতেই সে ফোনটা কানে নিয়ে সালাম দিলো। সিকান্দারের উত্তপ্ত কলিজাটা যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা হলো। সে সালামরে জবাব দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় শুধু বলল-
“ আমি আসছি মন,পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি। ”
সিকান্দার ফোনটা কেটে দিয়েই বেরিয়ে যায়। রেণু তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। বলা হলো না কথাটা!
সিকান্দার অফিসে এসেই দ্রুত গতিতে বড়বড় পা ফেলে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। রবিন এসে দাঁড়াতেই সিকান্দার জিজ্ঞেস করে –
“ ম্যাডাম কোথায়? ”
“ আপনার কেবিনে স্যার। ”
“ ঠিক আছে,আপনি এখন আসুন। ”
সিকান্দার কেবিনের দিকে আসলো। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে প্রতিবারের মতো এবারও তার দু’টো চোখ মুনতাহা কে খুঁজে পেতেই সাথে সাথে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো বুকের সাথে। ধড়ফড় করে লাফাচ্ছে তার বুক। বুঝাই যাচ্ছে অস্থির হয়েছিল। সিকান্দার মুনতাহার নিকাবটা সরিয়ে দিয়ে কপালে গালে,হাতে চুমু খেয়ে আবার বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলে-
“ না বলে কেনো বের হয়েছেন বাড়ি থেকে মন? আমি সারা বাড়ি খুঁজেও আপনাকে পাই নি। তখন আমার কেমন লাগছিল জানেন? পাগল পাগল লাগছিল নিজেকে। ফোন করতেন আমাকে একটা। আপনার ফোন কোথায়? কতগুলো ফোন দিয়েছি সুইচ অফ বলছে বারবার। ”
মুনতাহা লেপ্টে রইলো স্বামীর বুকে। কতদিন পর এই বুকটায় সে ঠাই পেয়েছে! তার স্বামী বাড়িতে গিয়েছিল আজ! ইশ জানানো যেত না তাকে?
“ ফোন করেছিলাম। ফোন বন্ধ ছিলো আপনার। আর আমার ফোনে চার্জ ছিলো না। সেজন্য চার্জে দিয়ে এসেছি। আর আমি আপনার জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে এসেছি। এই এক সপ্তাহ কি না কি দিয়ে খাওয়াদাওয়া করেছেন। আমি চিনি না বলে আসতে পারি নি। আজ সিমরান শপিংমলে যাওয়ার পথে নামিয়ে দিয়ে গেছে বলে আসতে পারলাম। ”
সিকান্দার সাথে সাথে মুনতাহার হাতের মোজা খুলে হাত উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। রাঁধতে গিয়ে কোথাও কোনো চোট পেয়েছে কি না। ফর্সা হাতে একটু ছোট গোলের মতো কালচে দাগ দেখা গেলো। সিকান্দার টেবিল খুঁজে মলম বের করে সেটা লাগিয়ে দিয়ে বলল-
“ কি দরকার ছিলো আমার জন্য রান্না করার? ”
“ তাহলে কার জন্য রান্না করবো আমি? কে আছে আর আমার? ”
“ হাতে তেল ছিটে এসেছিল। ”
“ সামান্যই তো। রাঁধতে গেলে একটু আধটু তেল ছিটেই। ”
“ আপনাকে মানা করেছিলাম না আমি রান্না ঘরে যেতে? কথা শুনলেন না কেনো আমার? ”
“ মেয়ে মানুষ আমি। আমি রাঁধবো না তো কে রাঁধবে? আজীবন কি শুধু কাজের লোক দিয়ে রান্না করাবেন? ”
“ যতদিন সামর্থ্য থাকবে ততদিন করাবো। ”
“ যখন সামর্থ্য ফুরিয়ে যাবে তখন? ”
“ তখন আমি করবো। ”
মুনতাহা হাসলো সে কথা শুনে। প্লেটে খাবার বেড়ে সাজিয়ে বলল-
“ খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে? ”
“ আপনি খেয়েছেন? ”
“ উঁহু। ”
সিকান্দার হাত ধুয়ে আগে মুনতাহা কে খাইয়ে দিলো। তারপর নিজেও খেলো। মুনতাহার হাতের রান্নার প্রশংসা করলো। স্ত্রী এত যত্ন করে হাত পুড়িয়ে তার জন্য রান্না করেছে আর সে তার প্রশংসা করবে না? এও হয়? হাতে চুমু খেয়ে রান্নার প্রশংসা করেছে। শুনুন পুরুষগণ, আপনারা আপনাদের স্ত্রী দের কে ছোটখাটো বিষয়ে সুন্দর সুন্দর কমপ্লিমেন্ট দিবেন,প্রশংসা করবেন,বাড়ি ফেরার পথে রোজ একটি করে ফুল নিয়ে এসে স্ত্রীর হাতে বা কানে গুঁজে দিবেন। একটু সাজলে তার রূপের বাহবা দিবেন। সৃষ্টি কর্তা তাকে কতটা যত্ন করে বানিয়েছে সেই সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টির প্রশংসায় কখনো কার্পণ্য করবেন না। জীবনে চলতে গেলে টাকা পয়সার প্রয়োজন আছে। কিন্তু মেয়েরা টাকা পয়সার চেয়ের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার প্রিয় মানুষটির মুখে নিজের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজের প্রশংসা। নারীর ভালোবাসা পেতে আর কিছুর প্রয়োজন নেই,তারা কেবল প্রশংসা, প্রায়োরিটি, যত্ন এসবকেই ভালোবাসে।
খাওয়া দাওয়া শেষে বিকেল বিকেলের দিকে তারা মির্জা বাড়িতে আসে। বাড়ি ফিরেই মুনতাহা তাকে জিজ্ঞেস করলো-
“ আবার চলে যাবেন? ”
সিকান্দার মাথা নাড়িয়ে বলল-
“ আর যাব না। ”
রেণু সিকান্দারের ফেরার কথা শুনে ঠাণ্ডা জল দেওয়ার বাহানায় তার ঘরের সামনে এসে দরজায় কড়া নেড়ে বলল-
“ ভাইজান পানি নিয়া আসছি। ”
সিকান্দার তো পানি চায় নি আজ। ভাবলো হয়তো অভ্যাস হয়ে গেছে রেণুর,তাই নিয়ে আসছে। এগিয়ে আসলো। মুনতাহা ওয়াশরুমে গেছে ফ্রেশ হতে। দরজা খুলে পানির গ্লাস টা নিলো। দরজা আঁটকে দিবার সময় রেণু কে নড়তে চড়তে না দেখে দাঁড়িয়ে গেলো। মুখের উপর দরজা আঁটকে দেওয়াটা এক ধরনের বেয়াদবি। সিকান্দার রেণুর হাত কচলানো দেখে বলল-
“ কিছু বলবে রেণু? ”
রেণুর বয়স হবে ১৬-১৭। তার মা আর একটা ভাই আছে ছোট। মা টা অন্য বাড়িতে কাজ করে। ভাইটা শুনেছে হসপিটালে ভর্তি। রেণু আমতাআমতা করে বলল-
“ ভাই আফনেরে আমি একটা কথা কইতে চাইছিলাম। ”
সিকান্দারের মনে পরলো রেণু সকালেও কি যেন বলতে চেয়েছিল।
“ তুমি সকালেও কিছু একটা বলতে চেয়েছিলে রেণু। শুনি নি তখন। এখন বলো,আমি শুনছি। তোমার ভাই ঠিক আছে তো? টাকার সমস্যা হচ্ছে না তো? ”
সিকান্দার তার ভাইয়ের যাবতীয় চিকিৎসার খরচ বহন করছে। সেই লোকটার এত বড় ক্ষতি রেণু আর হতে দিতে চায় না। শুরুতে বুঝে নি তাকে দিয়ে সাইদা মির্জা কি করাচ্ছে। কিন্তু সেদিন বুঝেছে। যেদিন তারা রুমে কথাবার্তা বলছিল তাবিজটা নিয়ে। কিছু একটা খারাপ কাজ করছে তারা।
“ রায়হানের চিকিৎসার কোনো সমস্যা হচ্ছে না ভাইজান। ” কথাটা বলে রেণু তার ওড়নার গিট থেকে একটা তাবিজ বের করে বলে- “ ভাইজান এই তাবিজ টা আমি আফনের রুমে বিছানার তলে পাইছি। ডাস্টবিনে ফালায় দিছিলাম। পরে আবার তুইল্লা আনছি আপনারে দেখানোর জন্য। একটু দেখেন তো কিয়ের তাবিজ এইডা। ”
সিকান্দার তাকালো তাবিজটার দিকে। রেণুর হাত থেকে নিয়ে বলল-
“ আচ্ছা আমি দেখছি এটা। আর কিছু বলবে? ”
রেণু মাথা নাড়িয়ে না জানালো। আর কিছু বলবে না। তার এটুকুই বলার ছিলো। রেণু চলে যেতেই সিকান্দার দরজাটা লাগিয়ে দিলো। বিছানায় বসে তাবিজটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকবার ভাঁজ করা হলদে কাগজ। কাগজজুড়ে আঁকা অদ্ভুত সংখ্যার ছক, কালো কালি দিয়ে লেখা দুর্বোধ্য চিহ্ন, আর মাঝখানে গুঁজে রাখা কয়েকটি ছোট ছোট চুলের গোছা। কাগজের ভাঁজে লেগে ছিল ধূসর ছাইয়ের মতো গুঁড়ো, আর কালো সুতা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল পুরো জিনিসটা।
সিকান্দার সাথে সাথে বুঝে গেলো এটা কিসের তাবিজ। কারন সে কালো যাদু সম্পর্কে জানে। বইতে তাবিজের বিষয়ে এইসব সহ আরো অনেক কিছু উল্লেখ ছিলো। তারমানে তাকে কালো যাদু করার চেষ্টা করছে কেউ! কিন্তু কে করছে? সিকান্দার তো কখনো কারো কোনো ক্ষতি করে নি। তার তো শত্রুও নেই। তাহলে?
ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সিকান্দার তড়িঘড়ি করে সেই তাবিজ টা বিছানার নিচে রেখে দেয়। মুনতাহা ভেজা জামাকাপড় হাতে বেরিয়ে এসে সিকান্দারের চিন্তিত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু হয়েছে? ”
সিকান্দার মাথা নেড়ে না জানালো। হাসার চেষ্টা করলো। মুনতাহা ভেজা জামাকাপড় নিয়ে বেলকনিতে গেলো মেলে দিতে।
সিকান্দার নিজের এই পবিত্র ঈমান হারানোর ভয়ে, শয়তানের প্ররোচনায় প্রভাবিত হওয়ার ভয়ে আগের থেকেও আল্লাহর ইবাদত আরও বাড়িয়ে দিলো। সে যদি শুরুতেই তার এই পরিবর্তনের এই মানেটা বুঝতে পারত, তাহলে হয়তো কখনোই এতদূর পর্যন্ত আসত না।
তবে একটা কথা মানতেই হবে তান্ত্রিক সিকান্দারের ওপর কালো যাদু করলেও তাকে আল্লাহর পথ থেকে, আল্লাহর ইবাদত থেকে, নামাজ-কালাম থেকে এক চুল পরিমাণও সরাতে পারেনি। শয়তান কেবল জয়ী হয়েছিল সিকান্দার আর মুনতাহার মধ্যকার দূরত্ব বাড়াতে। মানুষের সঙ্গে বিনা কারণে রাগারাগি করাতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, কালো যাদুর প্রভাবেও সিকান্দার কখনো নিজের স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি।
হয়তো এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে সিকান্দারের জন্য একটি পরীক্ষা। কারণ আল্লাহ যখন কোনো বান্দার ঈমানকে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে চান, তখন তাকে এমন সব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান, যেগুলো বাহ্যিকভাবে শাস্তি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে হয় আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যম। কখনো ভয় দিয়ে, কখনো দুঃখ দিয়ে, কখনো প্রিয় জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কখনো এমন একাকীত্ব দিয়ে কখনো মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে তাঁর ঈমানকে যাচাই করেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে।
সিকান্দারের ক্ষেত্রেও যেন তাই হচ্ছিল। তার ঈমান পরীক্ষা করা হচ্ছিল। তার নিজের চিন্তার ভেতরে। নিজের মনের ভেতরে। নিজের অনুভূতির ভেতরে।
কখনো হঠাৎ করে মুনতাহাকে দেখলেই বুকের ভেতর অকারণ বিরক্তি জন্ম নিত। আবার কয়েক মুহূর্ত পর সেই একই মানুষটাকে দেখে নিজের আচরণের জন্য অনুশোচনায় পুড়ত সে।
কখনো মানুষের কথায় এমন রাগ উঠত যে মনে হতো সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলবে। কিন্তু অজু করে জায়নামাজে দাঁড়ালেই সেই আগুন নিভে যেত।
রাতের পর রাত তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে সিকান্দার কাঁদত। প্রতিটি সিজদায় সে নিজের হৃদয়টা আল্লাহর সামনে মেলে ধরত। আর হয়তো সেই কারণেই শয়তান তার ওপর পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করতে পারছিল না। কারণ শয়তানের সবচেয়ে বড় বিজয় হলো মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। সিকান্দারকে সে কষ্ট দিতে পেরেছিল। অস্থির করতে পেরেছিল। তার সংসারে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করতে পেরেছিল। কিন্তু তাকে নামাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে পারেনি।কুরআন ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে পারেনি।আল্লাহর ওপর ভরসা হারাতে বাধ্য করতে পারেনি। আর যতদিন কোনো বান্দার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা জীবিত থাকে, ততদিন তার পরাজয় সম্পূর্ণ হয় না।
যতবার সিকান্দারের অন্তরে অস্থিরতা জন্ম নিয়েছে, ততবার সে আরও বেশি সিজদায় লুটিয়ে পড়েছে। যতবার তার বুকের ভেতর অজানা ভার নেমে এসেছে, ততবার সে আরও বেশি করে হাসবিয়াল্লাহ উচ্চারণ করেছে। শয়তান প্রতিটি আঘাত করেছে অন্ধকার দিয়ে, আর সিকান্দার তার জবাব দিয়েছে নূর দিয়ে। প্রতিটি ওয়াসওয়াসার জবাব দিয়েছে জিকির দিয়ে।প্রতিটি দুর্বলতার জবাব দিয়েছে সিজদা দিয়ে।আর এ কারণেই শয়তান ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল।
কারণ ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, শয়তানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো যখন কোনো বান্দা তার প্ররোচনার কারণে আল্লাহ থেকে দূরে না গিয়ে উল্টো আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হয়ে যায়।
সিকান্দারের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল।
যে ফাঁদ তাকে ধ্বংস করার জন্য পাতা হয়েছিল, সেই ফাঁদেই শয়তানের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। কারণ আল্লাহ যার হিদায়াত রক্ষা করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই।
শয়তান বুঝতে পারল,সিকান্দারের হৃদয়ের চারপাশে এমন এক দুর্গ গড়ে উঠেছে, যার দেয়াল ইট-পাথরের নয়। সেই দেয়াল গড়ে উঠেছে তাওয়াক্কুল দিয়ে। সবর দিয়ে। সিজদা দিয়ে। আর আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস দিয়ে।
কিন্তু এখন তাদের পরিকল্পনাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করল। আর এটাই ছিল শয়তানের পরাজয়। ভয়ংকর পরাজয়। অপমানজনক পরাজয়। শয়তান পরাজয় মানতে নারাজ। সিকান্দারের ক্ষতি করতে পারে নি তে কি হয়েছে। এখন সেইসব মানুষদের ক্ষতি করবে যারা তাকে ডেকেছিল। শয়তানের সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়ল সেই মানুষগুলোর ওপর,যারা তার অন্ধকার শক্তি দিয়ে সিকান্দার কে আল্লাহর থেকে বিমুখী করতে চেয়েছিল।
সিকান্দারের জীবনটা এক ঝড়ের কবলে পড়েছিল।আর সেই ঝড়ের মধ্যে সে একটি জিনিস শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছিলো,সেটা হলো আল্লাহকে। যেমন ডুবে যাওয়া মানুষ শেষ ভরসা হিসেবে একটি ভাসমান কাঠকে আঁকড়ে ধরে।
কিন্তু সিকান্দারের ভরসা কোনো কাঠ ছিল না।কোনো মানুষ ছিল না। কোনো শক্তি ছিল না। তার ভরসা ছিল সেই সত্তা, যিনি আসমান ও জমিনের মালিক। সিকান্দার এই বিশ্বাসেই ছিলো যে-
“আমার রব আমাকে দেখছেন। আমার রব আমার কথা শুনছেন। আর আমার রব কখনো আমাকে একা ছেড়ে দেবেন না।”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২১
শেষ পর্যন্ত শয়তানও সত্যি সত্যি হেরে গেল সিকান্দারের ভেতরের আল্লাহভীরুতা, ইবাদতের গভীরতা, তার আমলের সেই অদৃশ্য পবিত্র শক্তির সামনে। সেই শক্তির সামনে দাঁড়ানোর সাহস আর তার হলো না। যতবারই সে কাছে আসতে চেয়েছে, ততবারই এক অদৃশ্য দেয়াল তাকে ছিটকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সিকান্দারের কাছে পৌঁছানোর সব পথ তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
