obsession vs love part 23
নিরুর কল্পনারাজ্য
নিজের চাচাতো ভাই অর্থাৎ নির্ঝরের হাতে থাপ্পড় খেয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে ঐশী। মনের কথা বললে যে নির্ঝর এভাবে তার ফিরতি জবাব দিবে তা তার মেয়েলি সত্ত্বা মোটেই পূর্ব থেকে অবলোকন করতে পারেনি। হয়তো ভেবেছিলো নির্ঝর খুব বাজেভাবে অপমান করবে কিন্তু সে যে তাকে এভাবে থাপ্পড় মেরে বসবে তা কে জানতো? আপাতত নির্ঝরের প্রকোষ্ঠ হস্তের থাপ্পড় খেয়ে ঐশীর গম্ভীর আদলে অশ্রুজলের প্রভাব অধিক লক্ষণীয়। নির্ঝর তখন অতিরিক্ত রাগের বশে থরথর করে কাঁপছে সাথে তার ফর্সা আদলে ছায়া পড়েছে রক্তাভ আভার। রণমূর্তি ধারণ করে সে ঐশীকে বললো,
— কী সব বলছিস ঐশী? কী বলছিস নিজের কোনো আইডিয়া আছে হ্যাঁ?
ঐশী ব্যর্থ হলো তাকে বোঝাতে,
— নির্ঝর, তুমি প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো….
— নির্ঝর? নির্ঝর আবার কী? নির্ঝর ভাই ডাক। সাহস খুব বেড়েছে তাই না?
ঐশীর চোখ হতে আপনাআপনি অশ্রু ঝড়ে পড়লো। তা দেখে নির্ঝর নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো,
— দেখ, ঐশী! উই আর ব্রাদার এন্ড সিস্টার। ওকে? আমরা কাজিন। এখানের মধ্যে তুই এসব নোংরামি কীভাবে ঢোকাতে পারিস তুই?
নোংরামি? ঐশী স্তব্ধ হলো। নির্ঝর তার ভালোবাসাকে নোংরামোর আখ্যা দিতে পারলো? সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বাকহারা হয়ে রইলো। নির্ঝর তাকে বললো,
— দেখ, ঐশী। ভুলে যা এসব। জাস্ট ফরগেট এভ্রিথিং ওকে? আমিও ভুলে যাবো। প্লিজ এসব নিয়ে আর জলঘোলা করিস না।
কথাগুলো বলেই সে প্রস্থান গ্রহণ করলো। আর ওদিকে ঐশী? ঐশী দাঁড়িয়ে রইলো হতবুদ্ধির ন্যায়। সে ভেবে পেলো না কী বলবে এবং কী করবে। সে যে সাহস নিয়ে বলে ফেলোছে যে সে নির্ঝরকে ভালোবাসে! এখন তার মনে হলো না বলাটা-ই বোধহয় ভালো ছিলো। কেনো সে বলে ফেললো? একতরফা অনুভূতিগুলো এতোটা পোড়ায় কেনো? ঐশী দিশেহারা হলো। কান্না আটকে রাখার প্রয়াস চালালো ঠোঁট কামড়ে। এতোটা অসহায় বোধহয় সে কখনো অনুভব করেনি। আজ তাকে দেখতে আসবে আর এদিকে নির্ঝর তাকে বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করছে না। কী করবে সে?
সকাল সকাল অফিসে যাওয়ার পায়তারা করছে ঝিলিক। পরণে তার ফর্মাল পোশাক। গতকালের সেই ধাঁধাটির খানিক সংঘাত-উপসংঘাত করতে পেরেছে হয়তোবা সে। বহুকিছুই তার মস্তিষ্কে খেলে যাচ্ছে। একে একে বহু হিসেবে সে গড়মিল পাচ্ছে। ঝিলিকের বেশি বেশি ভাবলে মাইগ্রেনের ব্যথা উঠে যায়। এতো বেশি ভাবা তার বাচ্চার জন্য রিস্কি ব্যাপার হয়ে যাবে। ঝিলিক শুধু এটুকুই মস্তিষ্কে আবদ্ধ করে রাখলো– যা ঘটছে আশেপাশে তার সত্য নয়; সত্য তা-ই যা সে জানেনা! অবশেষে গতকালের আইয়ুশের আচরণে সে অনেকটা অবাক হয়েছে। যদি এমনটা হয়- আইয়ুশ এসব ইচ্ছে করেই করছে তবে সে কেনো-ইবা ঝিলিকের সন্নিকটে সে আসবে? তার তো কোনো কারণ নেই। যদি অনুশোচনাবোধ থেকেও হয় তাহলেও তো এমন আচরণ করার কথা নয়। গতকাল সে আইয়ুশের চোখে কিছু একটা দেখেছে। যা তার কখনো নজরে আসেনি। কিছু একটা যা তার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলেছে। অন্তত সে আইয়ুশের চোখ পড়তে মোটেই ভুল করবে না। ঝিলিক আরও একটা কথা ভেবে ফেললো– তাহলে আইয়ুশকে কী কেও জোর করছে এসবের জন্য? হিসেব কষলে দেখা যায় যে– আইয়ুশ কখনো ঝিলিককে ডিভোর্সের কথা উল্লেখ করেনি। তাহলে? তাহলে কী…….
ঝিলিক তৈরি হতে হতে এতোসবকিছু ভেবে ফেললো। অতঃপর সে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোনোর রাস্তা ধরলো। আজ অবশ্য বাইক নিয়ে মোটেই বের হয়নি সে। বেরিয়েছে কার নিয়ে! ড্রাইভার-ই তাকে পৌঁছে দিবে কেননা আজ ঝিলিক ড্রাইভ করার মুডে মোটেই নেই। হিসেবের গোলমালে সে নিজেই যেনো গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। সকাল সকাল অফিসের মেইন ফটকখানা পার করা মাত্রই সেখানে উপস্থিত সকল এমপ্লয়ি হঠাৎ করেই নতমস্তকে তাকে অভিবাদন জানালো। ঝিলিক হঠাৎ চমকে গেলো। সে মোটেই এসব আশা করেনি। সেখানে উপস্থিত বহু লোক, যাদের মাঝে হয়তো-বা কেও কেও তার বাবা-চাচাদের সমবয়সী। ঝিলিক প্রথমে ইতস্ততবোধ করলো। অতঃপর সে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— আরে আরে, এসবের দরকার নেই। আপনারা আপনাদের কাজ করুন…
তার কথা শেষ হবার পূর্ব মুহূর্তেই সেদিন যে মেয়েটি রিসিপশনে তার নিকট হতে পরিচয় চেয়েছিলো সে খানিকটা মাথা উঁচিয়ে বললো,
— না ম্যাম! আপনি আমাদের ম্যাডাম। মির্জা গ্রুপের সবচেয়ে কনিষ্ঠ উত্তরাধিকারী। আপনাকে আমাদের গ্রিড করতেই হবে ম্যাম।
ঝিলিক ভ্রু কুঁচকালো। অবশ্যই তার এসবে মন্দ লাগছে না। সে প্রত্যুত্তর না করে ফরমাল প্যান্টের পকেটে হাত গলিয়ে বেশ কায়েদা করেই হেঁটে গেলো। অবশ্যই তার চোখে-মুখে অন্যরকম এক তেজ। ঝিলিক ওপরে যেতেই ঘটে গেলো আরেক কান্ড। আহানা নামের সিনিয়রটি তাকে দেখতেই ঝাপটে ধরলো একদম। ভীষণ অনুরোধক কন্ঠে বললো,
— ঝিলিক, একটা কাজ করবে প্লিজ?
ঝিলিক সবেই ঢুকেছিলো অফিসে। হুট করে আহানার এমন কান্ডে সে হতবাক হয়ে পড়লো। শুধালো,
— কী কাজ?
— আহ! তেমন কিছুই না। আজকে শুধু একটা মিটিং আছে। সেখানে ক্লায়েন্টের কাছে আমার আর আমার একটা কলিগ সিমির যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু সিমি আজ আসেইনি অফিসে। সুতরাং তুমি এক এবং একমাত্র সাহারা আমার। প্লিজ, না করোনা।
ঝিলিক কিছুক্ষণ ভাবলো। অতঃপর ঠোঁট কামড়ে কুঞ্চিত ভ্রু’তে জবাব দিলো,
— প্লেইস কোথায়?
— বেশি দূরে নয়। কাছেই। পাশের বিল্ডিং এ।
ঝিলিক রাজি হয়ে গেলো। অফিসে ঢোকামাত্রই তারা ফের রওনা হলো প্রজেক্ট- ডি এর ফাইল সাবমিট করে ক্লায়েন্টের মনোযোগ আকর্ষণে।
চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারে ধূম্র গতিতে ছুটে চলছে বিলাশবহুল এক কার। তাতে তীক্ষ্ণ বাজপাখির দৃষ্টিতে ড্রাইভ করছে নিকোলাস। উদ্দেশ্য এক এবং একটিই। চট্টগ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী সমুদ্রসৈকত–পতেঙ্গা বিচ। বাহিরে তখন সকাল দশটার সূর্যের আলো তেজ প্রখর হচ্ছে ধীরে ধীরে। নিকোলাস নিজের কানে থাকা ইয়ারবাডস এর সাহায্যে অপরপার্শ্বের ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলো। ম্যাভিয়াস কেইভারের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা নিকোলাসের সকল আইনি তদন্ত শেষে কিছুই ধরা না পড়ায় ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট অবশেষে নিকোলাসের পিছু ছেড়েছে। বর্তমানে এমকের তুখোড় মস্তিষ্কের প্ল্যানগুলো ধীরে ধীরে কাজে দিচ্ছে। দেওয়ার-ই কথা। ম্যাভিয়াস কেইভার সেজে যখন নিকোর আগমন ঘটেছিলো সেসময় ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের সকল নজর এসে পড়েছিলো নিকোলাসের ওপর। সেই সুযোগে এমকে তার বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত সকল ধরণের পরিচয়পত্র তৈরি করেছে। নিজেকে রাশের চৌধুরীর উত্তরাধিকারের স্থানটি পাকাপোক্ত করেছে যাতে কারও চিন্তাতেও না আসে এই কথা। সেই সাথে নিজেকে গা ঢাকা দিয়েছে। আর যতদিনে ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট মেভিয়াস কেইভার সম্পর্কিত তথ্য জোগাড় করেছে ততদিনে নিকোলাসের নির্দোষ হওয়ার সম্পূর্ণ প্রমাণ ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের হাতে পৌঁছে গিয়েছে। সেহেতু এখন তারা নিকোলাসের পিছু করবেনা। নিকোলাস উল্লাসে তীক্ষ্ণ হাসির রেখা টানলো। ভীষণ হাসি পেলো তার! এখন বিডিতে থাকা সকল ইললিগ্যাল কাজ কত অনায়াসেই হয়ে যাবে। তার ভাবনার মাঝেই সে এসে পৌঁছালো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। সেখানে পর্যটকদের ভিড়ে মিশে গিয়ে একটা সাধারণ স্পিডবোটে চড়ে বসলেও সেই স্পিটবোট খুব একটা কাছে সীমাবদ্ধ থাকলোনা। তা চলে গেলো প্রায় মাঝ সমুদ্রে এবং লোকসমাগম হতে বহুদূর! কিছুদূর যেতেই সেথায় একখান বড় জাহাজ দেখা গেলো। যেগুলো সাধারণত মালবাহী এবং সাধারণ হিসেবে ধরা হয়। নিকোলাস সতর্কতার সহিত শিপের মই বেয়ে জাহাজে উঠতেই সেখানে থাকা কালো পোশাকে আবৃত সকল গার্ড হাঁটু মুড়ে বসে তাকে স্বাগতম জানালো।নিকোলাসের তীক্ষ্ণ চোয়াল তখনও ঠিক আগের ন্যায়-ই মজবুদ। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে গিয়ে বসলো। বেশ আয়েশী ভঙ্গিমায় পায়ের ওপর পা তুলে গা ছড়িয়ে দিয়ে ঠোঁটে সিগারেট ধরালো। হাতে তার গান। সামনে থাকা ব্যক্তিটি তার এমন অভিব্যক্তিতে কিছুটা ভয় পেলেও পরবর্তীতে বাহবা দিলো,
— কুল! আ’ম লাইকিং ইট। এখন আমি বুঝতে পারছি; মনস্টার কিং তোমাকেই কেনো নিজের ডান হাত বানিয়ে রেখেছে….
তার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নিকোলাসের ভারী কন্ঠস্বর ভেসে এলো তার পানে,
— উহহু! মিস্টার বেনজামিন, আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা একদমই পছন্দ করিনা। সো, কাজের কথায় আসুন।
— আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটা তো অফকোর্স। দেখো, তুমি আমাকে ড্রাগের কয়েকটা স্যাম্পল দেখাও আর আমি তোমাকে তোমার গোল্ডবারগুলো দিয়ে দিচ্ছি।
নিকোলাস হাতের ইশারায় সেখানে উপস্থিত তার গার্ডগুলোকে ডাকলো। তারা বেনজামিনের সম্মুখে কয়েকটা বাক্স খুলে স্যাম্পল মেলে ধরতেই নিকোলাস রাশভারি স্বরে বলে,
— সি দিজ ড্রাগস। ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিন।
এটার বিশেষত্ব হলো- এই ড্রাগ যাকেই একবার পুশ করা হবে সে-ই এডিক্টেড হয়ে যাবে সাথে সাথে। আর বেনিফিটস হলো এই ড্রাগ নেওয়ার পর সে আর কোনোকিছুই মনে রাখতে পারবেনা। সেসময়ের সম্পূর্ণ স্মৃতি সে ভুলে যাবে। এই ড্রাগ মার্কেটে লঞ্চ হলে নিশ্চয় বুঝতে পারছপন আপার লেভেলে এটার চাহিদা ঠিক কতটুকু হতে পারে?
বিদেশী সেই লোক তথা– হেমিস্টার বেনজামিন হা হয়ে রইলেন। তার বেশ পছন্দ হলো এই ড্রাগের বৈশিষ্ট্যগুলো। নিঃসন্দেহে এই ড্রাগ দিয়ে গোটা এক জাতিকে ধ্বংসের অভিমুখে ঠেলে দিতে পারবেন তিনি সঙ্গে বিভিন্ন ইললিগ্যাল কার্যে ও ব্যবহার করতে পারবেন এই ড্রাগ। তিনি বেশ খুশি মনেই নিকোলাসের ভারী ব্যক্তিত্বের সামনে নিজেকে পেশ করলেন,
— ব্র্যাভো! তুমি নিজেও জানো না তুমি কী করেছো। বলো, বলো তোমার কত কত গোল্ডবার চাই? বলো!
নিকোলাস তীর্যক হাসলো। অভিব্যক্তির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না ঘটিয়ে রাশভারী কন্ঠে বললো,
— আমাদের কার্গোশিপে করে আগামী তিনদিনের মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে সেইসকল ড্রাগস চলে যাবে বাংলাদেশোর সীমানা পেরিয়ে ব্রাজিল! সো, বুঝতেই পারছেন আমাদের কাজের গতি। সেইসাথে গোল্ডবারের পরিবর্তে বস মুড চেইঞ্জ করেছে। এই ড্রাগ গোল্ডবার দিয়ে আর কেনা সম্ভব হচ্ছেনা!
মিস্টার বেনজামিন অবাক হয়ে গেলেন। বিস্মিত কন্ঠে শুধালেন,
— এটা কী ধরণের বিহেভিয়ার? যদি ড্রাগসগুলে আমাকেই না দিবে তাহলে আমাকে ডাকার মানে টা কী? বাংলাদেশে আসা কী আমার জন্য ভীষণ ইজি ছিলো নাকি?
নিকোলাস তখনও শীতল কন্ঠে তাকে সাবধান করলো,
— উঁহু! গলা উঁচু নয় মিস্টার বেনজামিন। বস বলেছে আপনার কাছেই ড্রাগসের এই স্যাম্পল বিক্রি হবে। কিন্তু…ওই লাল কহিনূরটা বসের চাই!
— কী! কী বলছে তুমি এসব? লাল কহিনূর, মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে তোমার?
— এনেছেন তো সাথে করে! ব্যাস, দিয়ে দিন। এতো কথা বাড়িয়ে তো লাভ নেই।
ভদ্রলোক ঘাবড়ালোন। চোখ দুটো যেনো কোটর হতে বেরিয়ে আসার উপক্রম। এই পুরুষ কী করে জানে এই কথা? তিনি তবু আমতা আমতা ভঙ্গিতে বলেন,
— এমন তো কথা ছিলোনা। তাহলে এমন বিশ্বাসঘাতকতার কী মানে?
নিকোলাস কিছু বলতেই যাবে কিন্তু তার আগেই সেখানে থাকা একজন গার্ড ছুটে এলো। বললো,
— স্যার, বাহিরে কিছু স্পিডবোটকে এদিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। হতে পারে সেগুলো নৌবাহিনী অথবা অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টের অফিসারস।
গার্ডটির এমন কথাতে মি. বেনজসমিন চমকে উঠলেন। বললেন,
— হোয়াট দ্যা ফাক ইজ হ্যাপেনিং? এজন্যই আমাকে বিডিতে আনা হয়েছে? ধরিয়ে দেওয়ার জন্য?
নিকোলাস নিজেও অবাক। এখানে ডিফেন্সের লোক কী করে আসতে পারে? তারা জানবেই-বা কীভাবে? নিকোলাস দ্রুত নিজের গার্ডদের ইশারা করে। বলে,
— দ্রুত এসব সমুদ্রে ফেলে দাও। কোনোরকমে যেনো এই ড্রাগ ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট অব্দি না পৌঁছায়! আর হ্যাঁ, মি. বেনজামিন যদি বাঁচতে চান তো দ্রুত কহিনূর টা দিয়ে দিন!
মি. বেনজামিন দিশেহারা হলেন। সে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নতুন। চেনেনা কিছুই! তিনি নিকোলাসের কাছে আকুতি মিনতি করা আরম্ভ করলেন। বললেন,
— আই উইল গিভ ইয়্যু দ্যাট ওয়ান। প্লিজ, সেইভ মি!
নিকোলাস বক্র হাসে। শিপের অন্যপাশে বের হয়ে দ্রুত স্পিডবোট নামায়। বাকি গার্ডরা নিজেরা যার যার মতে করে ব্যবস্থা করে নেয়। নিকোলাস বেনজামিনকে নিয়ে স্ববেগে স্পিডবোটটাকে টেনে নিয়ে যায়।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের হেড এর এসিস্ট্যান্টকে দেখা যায়। পরণে তার ফরমাল পোশাক সাথে তীক্ষ চোয়াল। এক চোখ বুজে অপর চোখের সাহায্যে তাকিয়ে নিশানা লাগায় সে। নিকোলাসকে গানপয়েন্টে রেখে ট্রিগার প্রেস করতেই গুলি গিয়ে সোজাসুজি বিদ্ধ হয় নিকোলাসের বাম হাতের পেশিবহুল বাহুতে। নিকোলাস তবু নিজেকে আড়াল করে নেয়। মুখে তার মাস্ক। সে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে স্পিটবোটের ভারসাম্য বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যায়।
পেছন থেকে সেই পুরুষটি তাকিয়ে নিকোলাসকে দেখে। ইতোমধ্যেই তাদের ফোর্স সেই শিপটা দখল করেছে। কিন্তু সেখানে আশানুরূপ কিছু পাওয়ার কথা নয়। পেছন থেকে একজন ফোর্স অফিসার তাকে ডাকে। বলে,
— একে! আমরা সফলভাবে এই ড্রাগডিল ক্যান্সেল করতে পেরেছি।
তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই তীর্যক হাসে একে ওরফে আফি ম শাহ কৌশিক! অতঃপর কাওকে ফোন করে গম্ভীর কন্ঠে বলে চলে কয়েকটি শব্দ,
— স্যার, আমাদের কাজ ডান! ড্রাগডিল এবার সমাপ্ত হয়েছে। অবশ্যম্ভাবী যে পরবর্তীবার এমকে নিজে উপস্থিত থাকবে। কিন্তু এবারেও সেই মনস্টার কিং এর ডানহাতের সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা ধরতে পারিনি তাকে স্যার। হেডকে আপনি কনফার্ম করে রাখুন এই কথাটি৷
কৌশিক কথা শেষ করে অদূরে তাকালো। কৌশিক এক হাত পকেটে হাত গুঁজে দুর্বিক্ষণ এর সাহায্যে দেখতে পেলো সেই স্পিডবোটটি যাকে শত চেষ্টা করেও ধরা যায়নি। সেই নামহীন ব্যক্তি যে কিনা এমকের ডানহাত সে পালিয়ে গিয়েছে ওদিকেই। তবে পালিয়ে আর যাবে কোথায়? ধরা তো পরতেই হবে! এবং সেই দিনটিও বেশি দূরে নয়।
ঝিলিক আর আহানা মিলে পাশের কোম্পানিতে এসেছে। সেখানেই তাদের আজকের রিপ্রেজেন্টম্যান্ট। প্রজেক্ট-ডি এর ফাইলগুলো চেক করার সময় ঝিলিকের আচমকা কারও সনে ধাক্কা লাগলো। সে চোখ উঁচিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো সায়নকে। সায়নকে এখানে দেখে সে খানিকটা অবাক হলো। আসার সময় সে খেয়াল করেনি সে ঠিক কোথায় এসেছে। তাই সে দ্বিধা নিয়েই প্রশ্ন করে বসে,
— আপনি এখানে?
সায়ন থমকায়। ধাক্কার দরুণ নিচে পড়ে যাওয়া ফাইলের কাগজপত্রগুলো তুলে দিয়ে মৃদু হেসে জবাব দেয়,
— ভার্সিটি যাচ্ছিলাম। তো ভাবলাম, একবার অফিস থেকেও ঘুরে যাই!
— অফিস?
— ইয়েস, অফিস!
ঝিলিক আশপাশে ভালো করে নজর বোলালো। অতঃপর দেখতে পেলো এটা কেইভার গ্রুপ। নিজেই নিজের বোকা বোকা প্রশ্নে বিরক্ত হলো। পাশ থেকে আহানা তাকে ফিসফিসালো কানে কানে,
— ঝিলিক, তোমাদের পূর্ব পরিচয় ও রয়েছে?
ঝিলিক ওপর-নিচ মাথা নাড়লো। আহানা বিস্ময়ে দু’হাতে মুখ ঢাকলো। সায়ন আহানার পানে তাকালোনা। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঝিলিকেই আবদ্ধ রইলো। ঝিলিক সায়নের হাত থেকে পেপারগুলো নিতে নিতে অল্প সৌজন্যতামূলক হাসলো। বললো,
—ধন্যবাদ। আর, মিস্টার মেভিয়াস কী আছে? আমাদের মির্জা গ্রুপের সাথে কেইভার গ্রুপের একটা মিটিং ছিলো আজ। প্রজেক্ট ডি-নিয়ে।
সায়ন প্রত্যুত্তরে বললো,
— উমম, আনফোরচুনেটলি মেভিয়াস নেই। সায়নকে দিয়েই কাজ চালাতে হবে তোমার।
ঝিলিক হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বললো,
— চলুন তবে। দশটা বাজতে আর পাঁচমিনিট বাকি। সো, কনফারেন্স রুমে তো বসা-ই যায়।
সায়ন বিনা ভণিতায় সম্মতি জানালো। তারা কনফারেন্স রুমে গিয়ে বসলো। ওপরে ওপরে সব সফেদ হলেও ভেতরে ভেতরে সবই তাদের কালো কারবার। সেদিক হতে ঝিলিককে আড়ালে রেখে সায়ন ঝিলিককে দেখানোর চেষ্টা করলো তাদের সবকিছু। ঝিলিক আশপাশ নজর বুলিয়ে নিজেদের প্রজেক্ট সম্পর্কে সায়নকে পূর্ণাঙ্গরূপে ধারণা দেওয়া চেষ্টা করলো। মূল প্রজেক্ট সাবমিট সাথে প্রজেক্টরে বিশদ ব্যাখ্যার ব্যাপারখানা কথামতো আহানা সামলালো।
আইয়ুশের ধারণা ছিলোনা যে ঝিলিক অফিসে আসামাত্র বেরিয়ে গিয়েছে। নামাজ আদায় করার পর চোখটা খানিক লেগে আসলেও পরক্ষণেই কোনো এক কাজে বেরিয়ে পড়েছিলো। ঝিলিক অফিসে জয়েন করার পর থেকে সে বাড়িতে যাওয়াও কমিয়ে দিয়েছে। সকালের সময়টা সে বাড়িতে যায়-ইনা। এ বিষয়ে ঝিলিক অজ্ঞ। খবর পাওয়া মাত্র-ই সে একপ্রকার ছুটেই গেলো। ঝিলিক তখন প্রজেক্ট-ডি সাইন করিয়ে বের হচ্ছিলো আহানার সাথে। সঙ্গে অবশ্য সায়ন ও ছিলো। তার বাহানা ছিলো–সে এখন ভার্সিটি রওনা হবে। তাই তাদের সাথেই বেরোবে। আইয়ুশ সেখানে গিয়ে আহানা এবং ঝিলিককে একত্রে দেখতে পেয়ে রাগত্ব ভঙ্গিতে তাদের পানে আসে। আহানার কাছে গিয়ে সে তাকে অল্প গলা উঁচিয়ে ধমকায়,
— এই মেয়ে, এখানে তোমাকে একা একা কে আসতে বলেছে? সিনিয়র কাওকে আনোনি কেনো?
আহানা বেচারি ধমক খেয়ে চুপসে ওঠে। বলে,
— স..স্যার, সিমি আসেনি তাই…
— তাই বলে তুমি তোমার জুনিয়রকে নিয়ে আসবে?
— স..স্যরি স্যার!
মাঝখান হতে সায়ন বলে ওঠে,
— মি. মির্জা! রিল্যাক্স। এভ্রিথিং ইজ ফাইন।
আইয়ুশ এক পলক তার পানে নজর রাখে। চোখদুটো হতে যেনো আগুনের লেলিহান শিখা নির্গত হচ্ছে। এতোটা হাইপার হয়ে আছে আইয়ুশ! সায়ন তাকে বিদ্রুপ করে হাসে। আইয়ুশকে খুব তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করলো ঝিলিক। হাবভাব সব নোট করে নিলো মস্তিষ্কে। অতঃপর এক পা আগাতে নিয়েই বাধে বিপত্তি। পায়ে মোচকা খেয়ে পরে যাওয়ার আগেই আইয়ুশ তাকে সামলে নেয়। কোমড় পেঁচিয়ে ধরে ভয়ার্ত দৃষ্টে শুধায়,
— আট ইয়্যু ফাইন? লেগেছে কোথাও?
সায়নের নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে ঝিলিক ও আইয়ুশের প্রতি অল্প দূর্বলতা দেখাচ্ছে। সায়নের মেজাজ ধপ করে জ্বলে উঠলো। না না! এতো প্ল্যান এভাবে মাটি হতে পারেনা। সায়ন নিজেকে সামলে রাখার বহু চেষ্টা করলেও একসময় সে ব্যর্থ হয় আইয়ুশের ব্যবহারে। আইয়ুশ ঝট করে ঝিলিকের পায়ের কাছে বসে পড়ে। ঝিলিকের বাম পায়ের সামান্য উঁচু হিলের জুতোজোড়া খুলে ভালো করে পরখ করতে থাকে। পাশে আহানা ও ব্যস্ত হয়ে ঝিলিককে ধরে রেখেছে। ঝিলিক ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললো। বোধহয় ভেতরে হাড়-ই ফেটে গেলো! সায়ন নিজের সংযম বজায় রাখতে না পেরে হুট করেই ধাক্কা দিয়ে বসলো আইয়ুশ। অতঃপর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল এমকে ওরফে মনস্টার কিং কিছুর তোয়াক্কা না করে ঝিলিকের পায়ের কাছে বসে পড়লো। হিসহিসিয়ে আইয়ুশকে বললো,
— বাস্টার্ড! হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে ওকে। সর সামনে থেকে।
আইয়ুশ খানিকটা পিছিয়ে গেলো। অবাক হয়ে চেয়ে রইলো সায়নের পানে। ঝিলিক সায়নের স্পর্শ বুঝতে পেরে পা সরিয়ে নিলো। ব্যথাটা মুখ বুজে সহ্য করে নিতে চেয়ে বললো,
— ইটস ওকে, আ’ম টোটালি ফাইন।
সায়নের রাগ আরও খানিক বাড়ে। দ্রুত দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে,
— এতক্ষণ তো ঠিকই ছিলো। আমি স্পর্শ করাতেই উবে গেলো?
ঝিলিক ভ্রু কুঁচকে চেয়ে থাকে সায়নের পানে। এসব বলছে কী এই পুরুষ? সায়ন হুট করেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। বেশ দৃঢ় স্বরে সে নিজের ভুল ঢাকতে বলে,
— আই মিন–এখন কী ঠিক আছো?
ঝিলিক বিরক্তিমাখা আদলে ওপর-নিচ মাথা নাড়লো। অতঃপর কোনোরূপ পতিক্রিয়া না দেখিয়ে যাওয়ার পথ ধরলো আহানাকে নিয়ে। আইয়ুশ ঝিলিককে যেতে দেখে হালকা স্বরে বলে,
— বি কেয়ারফুল!
ঝিলিক একপলক সেদিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায় কোম্পানি হতে। সায়ন সেদিকপানে চেয়ে থাকে। আইয়ুশ এতক্ষণ নিগূঢ় দৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করছিলো সায়নকে। সায়নের কর্মকান্ডে আনমনে হাসে সে। সায়ন আইয়ুশের উপস্থিতি লক্ষ্য করে বল,
— তুই এখানে কী করছিস? ঝিলিকের আশেপাশে ঘোরার চেষ্টা? ফলটা কিন্তু তোকেই পোহাতে হবে!
আইয়ুশ নিঃশব্দ রয়। সে কিছু হিসেব মিলিয়েছে। সেই হিসেব শুধুমাত্র আরেকটু যাচাই করা বাকি। সায়ন তাকে হাসতে দেখে বিদ্রুপ করে বলে,
— কীরে, প্রেয়সীর শোকে পাগল হলি নাকি?
আইয়ুশ নির্লিপ্তে জবাব দেয়,
— ভালোবাসলে মানুষ পাগলই হয়।
এমকেমধারণা করতে পারলোনা কথাটা তার উদ্দেশ্যেই ছিলো! আইয়ুশের এমন কথার প্রত্যুত্তরে সে জবাব দেয়,
— তোর কান্নার আওয়াজ বড্ড শান্তি দেয়। এক কাজ করিস, প্রতিদিন কাঁদিস। কেমন?
সায়ন হাসতে আরম্ভ করলো। আইয়ুশ এবার এগিয়ে এলো। বললো,
— তাই নাকি? শরীরের মধ্যে চিপ ফিট করে নিজেকে খুব মহান ভাবছিস? শালা, বলদ। সাহস থাকলে সামনাসামনি লড়াই কর।
— উঁহু! এভাবে তো আমাকে মোটেই বোকা বানানো সম্ভব নয় মি. মির্জা। লেটস ট্রাই এনাদার ওয়ে নেক্সট টাইম ওকে? টাইম খুব শর্ট! বুঝলি তো। তুই বরং কাঁদতেই থাক আজীবন। ততদিনে আমি তোর প্রাণপাখিকে পাচার করে দিই! চিপটা তো আর পাবিনা কখনো। হাহ!
সায়ন আপনমনে হাসতে হাসতেই চলে গেলো। সায়ন যাওয়ার পর আইয়ুশ কেমন করে যেনো হাসলো। উন্মাদের ন্যায়! যেনো খুব মজার কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে সে। আইয়ুশ মুহূর্তেই দ্রুতবেগে গাড়ি নিয়ে মির্জা বাড়ি পৌঁছায়। কোনোদিক না তাকিয়ে সোজা নিজ কক্ষে গিয়ে উপস্থিত হয়। সাঁঝের উপস্থিতির আভাস না পেয়ে মুহূর্তেই ঢুকে পড়ে নিজের ব্যবহারকৃত ওয়াশরুমে। যা বরাবরই বৃহৎ এবং বিলাশবহুল। পর্দার ওপারে বাথটাব। ঢুকতেই নজরকাড়া এক বড় আয়না।সেই আয়নাতে আইয়ুশের পড়তিচ্ছবি দৃশ্যমান৷ তবে ওপাশ হতে কী তা শুধুই আয়নায় মানুষের প্রতিবিম্ব-ই দেখায়?
obsession vs love part 22
আইয়ুশ সরাসরি বেসিনের কল ছেড়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে মুখ ধুঁয়ে নিজেকে শান্ত করে। অতঃপর খানিকক্ষণ আয়নার পানে তাকিয়ে থাকে চতুর দৃষ্টে। আয়নার সূক্ষ্ম এক কোণা হতে ছোট্ট বিন্দুর ন্যায় লাল রশ্মি নির্গত হচ্ছে। তা দেখে আইয়ুশের ঠোঁটে ফুটে ওঠে বিদ্রুপের হাসি। তা কী এমকের প্রতি? হয়তো-বা তাই-ই। আইয়ুশের ঠোঁটের কোণ চওড়া হয়। বিড়বিড় করে আপনমনে,
— যে খেল শুরু হয়েছিলো এক অমোঘ ভগ্নগাঁথার মধ্য দিয়ে, সেই খেল এর রণক্ষেত্রে যুদ্ধবিজয়ী হিসেবে এবার ভিলেন নয়; জয়ী হবে হিরো! খলনায়ক নয়, কমলারঙা কেশের সেই রমণীর জীবনে আজীবন কেবল রাজত্ব চলবে নায়কের।
