ইশকে এ নিকাহ পর্ব ২
লাইরা আয়নাত
আশ্য পরিবারের বড় ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট চলছে। চারদিকে এক রয়্যালিটি। ইনায়াত যান্ত্রিকভাবে খাবারের ওপর চামচ নাড়ছে। সে জানে না সে খাবার খাচ্ছে নাকি বিষ;কিউনকিউবানের মেয়ে হওয়ায় এই পরিবারের কেউ তাকে মেনে নেয়নি। আয়াজের চাচাতো ভাই-বোনদের বাঁকা কথা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ইনায়াত পাথরের মতো শান্ত। সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, শুধু চুপচাপ নিজের খাওয়া চালিয়ে যায়। পাশে বসে থাকা আয়াজ সব দেখছে, কিন্তু তার অভিব্যক্তিতে কোনো হেলদোল নেই। তার কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব নেই।
হঠাৎ আয়াজের মা, মিসেস আয়রা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “কী করছো তোমরা? থামো! অনেক হয়েছে। এভাবে কেউ কাউকে কথা বলে?”
মায়ের কথায় আয়াজ তাচ্ছিল্যভরা গলায় ফোড়ন কাটে, “থামবে কেন? ওরা যা বলছে ঠিকই তো বলছে। চিট করে একজন লো-ক্লাস মেয়ে আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে।”
আয়াজের এই নিষ্ঠুর মন্তব্যটি শোনামাত্রই ইনায়াত চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এতগুলো অপমান নিঃশব্দে হজম করার পর তাকে এভাবে হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে দেখে টেবিলের সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। ইনায়াত সরাসরি মিস্টার কেনিথ এবং মিসেস আয়রার চোখের দিকে তাকায়। তার ঠোঁটে এক চিলতে শান্ত কিন্তু অর্থপূর্ণ হাসি। সে বলে, “আমার একটা কথা বলার ছিল। জানি হয়তো বেয়াদবি হবে, কিন্তু অনুমতি দিলে বলতে চাই।”
মিস্টার কেনিথ কিছুক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীর গলায় অনুমতি দেন, “হুম, বলো।”
“আমি একজন স্টুডেন্ট, প্রতিদিন আমার ক্লাস থাকে। পাশাপাশি ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের আমার একটা আলাদা মার্কেটিং সাইডও আছে। আমি কি সেগুলো এখন থেকে কন্টিনিউ করতে পারি? আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না তো?”
মিস্টার কেনিথ হালকা হেসে জবাব দেন, “না না, এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। মিডিয়া এখনো তোমাকে আমাদের পরিবারের অংশ হিসেবে চিনে ওঠেনি, তাই তুমি কাজ করতে পারো। তবে সাবধান, কেউ যেন না জানে যে তুমি আমাদের সাথে আত্মীয়তার সূত্রে যুক্ত।”
ইনায়াত মাথা নত করে সায় দেয়, “জি, অবশ্যই। আমি খেয়াল রাখব। আমার খাওয়া শেষ, আমি আসছি। বেয়াদবি মাফ করবেন।”
সবাই তো অবাক আয়াজ সহ সবাই মনে করেছিল সে তার অপমানের জবাব দিবে কিন্তু এ কি ও তো অন্য কিছু বলল। দ্রুত পায়ে সে নিজের রুমে চলে আসে। রুমে এসেই সে নাভিদকে ফোন দেয়। নাভিদ তার মতোই একজন জুনিয়র অ্যানালিস্ট। ইনায়াত সরাসরি কাজের কথায় আসে, “চল, আমরা কাজে নেমে পড়ি। আমি অনুমতি পেয়ে গেছি, একটু পরই আসছি। তুই এভিডেন্সগুলো নিয়ে রেডি থাকিস।”
ওপাশ থেকে নাভিদ বলে, “ওকে, আমি আসছি। তুই কুইক আয়, আজ সারাদিন প্রচুর খাটতে হবে।”
ফোনটা কেটে দিয়ে ইনায়াত দ্রুত পায়ে চেঞ্জিং রুমে ঢোকে। সময় খুব কম। নিজের লাগেজ থেকে বের করে নেয় বাছাই করা পোশাক। কিছুক্ষণ পর সে যখন বেরিয়ে আসে, তার অবয়বে মিশে আছে এখন কনফিডেন্স। পরনে সলিড কালারের একটা হালকা টপ, তার ওপর লেয়ার করা আইভরি শেডের একটা লং কোট। হাই-ওয়েস্টেড ওয়াইড-লেগ প্যান্টের সাথে কোমরে জড়ানো একটা স্লিক কালো বেল্ট মাথায় নিখুঁতভাবে সেট করা ক্রিম রঙের হিজাব, হাতে ডার্ক ব্রাউন রঙের একটা হ্যান্ডব্যাগ আর পায়ে ম্যাচিং ফ্ল্যাট হিলস সব মিলিয়ে ইনায়াতকে মনে হচ্ছে কোনো প্রফেশনাল ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভার পেজ। ঠিক একই সময় আয়াজও তার পার্সোনাল চেঞ্জিং রুম থেকে বেরিয়ে আসে। দুজনের জন্য এখানে আলাদা ড্রেসিং স্পেসের ব্যবস্থা আছে।
আয়াজ সামনে থাকলেও ইনায়াত সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর দেয় না। সে আয়াজকে বাতাসের মতো এড়িয়ে নিজের গন্তব্যে পা বাড়াতে চায়। কিন্তু দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই পেছন থেকে আয়াজের ধারালো কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “এই যে, দাঁড়াও! কথা আছে তোমার সাথে।”
ইনায়াত দাঁড়ায়। কিন্তু সে ঘুরে তাকায় না, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আয়াজ দ্রুত পায়ে হেঁটে তার একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। দুজনের মাঝখানে এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। আয়াজ সরাসরি ইনায়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার অ্যাকাউন্টের সাথে যে কার্ডটা তোমাকে দেওয়া হয়েছে, ওটা এখনই ফেরত দাও। আমার উপার্জিত একটা টাকাও তুমি আর ইউজ করবে না, মনে থাকে যেন।”
রুমের এক কোণে দামি গিফট বক্সগুলো পাহাড়ের মতো স্তূপ হয়ে আছে। রয়্যাল নিয়ম মেনে তাকে যা যা দেওয়া হয়েছিল, ইনায়াত সেগুলোর সিল খোলারও প্রয়োজন বোধ করেনি। সে উদাসীন চোখে সেই কোণটার দিকে একবার তাকায়। তারপর নির্লিপ্ত গলায় বলে, “ঐ স্তূপের মধ্যে কোথাও হয়তো আছে। ওগুলো খুলে দেখিনি! ”
কথাটা শেষ করে সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। কিন্তু আয়াজ তাকে এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। সে ছোঁ মেরে চিলের মতো ইনায়াতের বাহু খপ করে চেপে ধরে। ইনায়াত থমকে যায় আয়াজ হিসহিসিয়ে বলে, “আমি বলেছি আমার হাতে এনে দাও! কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
ইনায়াত এক মুহূর্ত স্থির থেকে হ্যাঁচকা টানে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেয়, “দিচ্ছি তো! কিন্তু কথায় কথায় এভাবে হাত ধরার কি? মুখে বললেই তো দিব! ”
সে গটগট করে হেঁটে গিফট বক্সগুলোর কাছে যায়। কয়েকটা বক্স সরিয়ে কাঙ্ক্ষিত কার্ডটা বের করে আনে। তারপর আবার ফিরে এসে আয়াজের সামনে কার্ডটা বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “নিন।”
আয়াজ কার্ডটা ছোঁ মেরে নেওয়ার সময় শব্দ করে হাসে। সেই হাসিতে বিদ্রুপ আর অহংকার মাখানো। সে বলে, “রয়্যাল লাইফ এনজয় করার জন্য যে জালটা বুনেছিলে, সেটা তো ছিঁড়ে গেল। এখন কী করবে?”
ইনায়াত ওর এই অপমানজনক কথাগুলো কানেই নেয় না। সে সোজা আয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসে যে হাসিতে তাচ্ছিল্য মেশানো। সে খুব ধীরস্থিরভাবে জবাব দেয়, “এসবের প্রয়োজন আমার কোনোদিন ছিল না, মিস্টার। আপনাদের এই তথাকথিত ‘রয়্যাল’ জীবন আপনাদের মেকি আভিজাত্যের জন্যই তোলা থাক। আমার মতো সাধারণ মানুষের জন্য আপনাদের এই সোনার খাঁচার কোনো মূল্য নেই।”
বলেই ইনায়াত আর এক সেকেন্ড দেরি করে না। নিজের হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে দৃপ্ত পায়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। তখনি আয়াজের দাম্ভিক কণ্ঠস্বর পিছন থেকে ধেয়ে আসে, “তোমাকে আমার সাথেই বের হতে হবে, চলো। এটাই রুল।”
ইনায়াত কোনো তর্কে যায় না, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, “আচ্ছা।”
ক্যাসেলের দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে তারা এগোয়। সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই আয়াজ তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে, “নিজের গাড়িতে তোমাকে নেওয়ার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই, কিন্তু নিতে হচ্ছে। তবে কিছুটা দূরে গিয়েই তোমাকে ড্রপ করে দেব। তোমার মতো কাউকে নিজের গাড়িতে করে নিয়ে ঘোরার রুচি বা ক্লাস, কোনোটাই আমার নেই।”
ইনায়াতের অভিব্যক্তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসে না। সে চুপচাপ হেঁটে যায়। আয়াজের এই বিষাক্ত, অর্থহীন ইগো তার মস্তিষ্কের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারে না। তার মাথায় এখন বর্তমান ‘কেস’ নিয়ে হাজারো সূক্ষ্ম হিসেব-নিকেশ। এসব ফালতু কথা কানে তোলার মতো সময় বা ইন্টারেস্ট কোনোটাই তার নেই। ক্যাসেলের গেট পেরিয়ে আয়াজের গাড়িতে ওঠে তারা। কিছুটা পথ এগোতেই কষে ব্রেক করে টায়ার ঘষে গাড়ি থামায় আয়াজ। সে ইনায়াতকে আরও কিছু কটু কথা শোনাবে, তার আগেই ইনায়াত বরফের মতো শীতল স্বরে বলে ওঠে, “ডোন্ট ওরি, ভার্সিটির কেউ আমাদের এই সো-কলড সম্পর্কের কথা ঘুণাক্ষরেও জানবে না।”
কথাটা ছুঁড়ে দিয়েই সে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। স্টিয়ারিংয়ে হাত চেপে আয়াজ স্থির, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে উইন্ডশিল্ডের বাইরে তাকিয়ে থাকে। তারপর একটু সামনে ঝুঁকে জানালার কাঁচ নামিয়ে তীক্ষ স্বরে বলে, “আমার সাথে যেতে পারো চাইলে। এতটুকু ফেভার আমি করতেই পারি।”
কথাটি শুনে ইনায়াতের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের এক বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে সে শুধু একটা উপেক্ষার হাসি দিয়ে মাথা আলতো নেড়ে আয়াজকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়। এই তীব্র অবজ্ঞা আয়াজের রয়্যাল ইগোতে সজোরে চাবুক মারে। তীব্র রাগে ধপাস করে গাড়ির দরজা আটকে দেয় সে। সে ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্যামিলির ক্রাউন প্রিন্স! আর এই সামান্য একটা মেয়ে তার ইগোকে এমন নির্দয়ভাবে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে? কী স্পর্ধা ওর! রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আয়াজ ভার্সিটি ক্যামব্রিজের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছোটায়। ইনায়াত তারই স্টুডেন্ট, এই অপমানের। প্রতিশোধ সে আজ ক্লাসেই নেবে।
বিকেল পাঁচটা। বাইরের আকাশটা টিপিক্যাল ব্রিটিশ ওয়েদারের মতোই গুমোট, মেঘলা এক আঁধার নেমে আসছে চারধারে।
বাথরুমের ভেতর শাওয়ারের স্বচ্ছ পানির ধারা মিশে যাচ্ছে গাঢ় লাল রক্তের সাথে। ঝরঝর করে নিচে পড়ছে সেই লালচে পানি। একটা হাই-প্রোফাইল ক্রিমিনালের পিছু নিতে গিয়ে ছুরির গভীর আঘাতে ইনায়াতের কাঁধ বেশ জখম হয়েছে। নাভিদ কোনোমতে ফার্স্ট-এইড করে তাকে ক্যাসেলে ড্রপ করে দিয়ে গেছে। ক্ষত তেমন গভীর নয় ভেবে ইনায়াত নিজেই ব্যান্ডেজটা খুলে ফেলেছিল। কিন্তু ব্লিডিং তো এখন আর বন্ধই হচ্ছে না! পানির অবিরাম ধারায় হয়তো রক্তপাত কিছুটা কমবে, এই আশায় সে শাওয়ারের নিচে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যথায় নয়, বরং নিজের ওপর রাগে তার শরীর রী রী করে ওঠে ফ্রাস্ট্রেশনে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। “ড্যাম ইট!”
এই আন্ডারকাভার মিশনটা সাকসেসফুল করা তার জন্য জীবন-মরণের থেকেও বেশি কিছু। একজন কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের বিরুদ্ধে সব সলিড প্রমাণ জোগাড় করতে পারলেই সে এম আই সিক্সে জয়েন করার সুযোগ পাবে। তার মামা, যিনি একজন সিনিয়র এম আই সিক্সের অফিসার, তিনিই তাদের দুই ভাইবোনকে এই প্রমিস করেছেন। তারা বয়সে তরুণ হলেও, তাদের কাজের ধার অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। একজন দক্ষ এম আই সিক্স অফিসার হওয়াই ইনায়াতের জীবনের একমাত্র ফোকাস। তাই রয়্যাল ফ্যামিলির এই মেকি ‘বিয়ে বিয়ে’ খেলায় তার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই।
শাওয়ার শেষে একটা ওভারসাইজড কালো টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার পরে বেরিয়ে আসে ইনায়াত। ভেজা চুলগুলো থেকে এখনও টপটপ করে পানি ঝরছে, টাওয়েল দিয়ে ঘষে ঘষে সেগুলো মুছতে থাকে সে।
বাথরুমের বাইরে পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়ায়। দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ। তার পরনে একটা নেভি ব্লু টিশার্ট আর হাফ প্যান্ট। শারীরিক গঠনে সে হ্যান্ডসাম ফর্সা, দীর্ঘদেহী, পেশিবহুল শরীর, সবদিক থেকেই পারফেক্ট এক ভাস্কর্য। কিন্তু এসব ইনায়াতের কাছে একেবারেই অর্থহীন। যে জিনিস তার নয় সে জিনিসের দিকে ইন্টারেস্ট ইনায়াত জীবনেও দেখায় না।
অন্যদিকে, আয়াজের তীক্ষ্ণ, শিকারি দৃষ্টি ইনায়াতকে আপাদমস্তক স্ক্যান করে নেয়। এই ক্যাজুয়াল লুকে ওকে আরও বেশি ওয়াইল্ড আর আকর্ষণীয় লাগছে। ঢিলেঢালা টি-শার্ট, ট্রাউজার আর পিঠের ওপর অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ভেজা চুল। ইনায়াতের চুলগুলো গাঢ় বাদামি রঙের আর হালকা কোঁকড়ানো, চুলগুলো খুব বেশি লম্বাও নয় কোমর অবধি ছড়ানো যেমন সাধারণ মেয়েদের থাকে চুল। সাধারণ আর দশটা ব্রিটিশ মেয়ের মতোই ফর্সা আর সুন্দর সে, তবে তার চেহারায় একটা আলাদা শার্পনেস আয়াজের নজর কাড়ে। সেটা হলো তার বাঁ দিকের গজদাঁত। হাসলে হয়তো সেই দাঁতটা তাকে এক চার্মিং লুক দেয়, কিন্তু আয়াজ এখন পর্যন্ত এই মেয়েটিকে একবারও মন খুলে হাসতে দেখেনি! সবসময় ঠিক একটা ইমোশনলেস রোবটের মতোই বিহেভ করে সে।
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ নজরে ইনায়াতকে মেপে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে আয়াজ নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রশ্ন করে, “ভার্সিটিতে যাওনি কেন আজ?
ইনায়াত ওর দিকে না তাকিয়েই তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে ধীর পায়ে আয়াজকে পাশ কাটিয়ে যায়। ওর চলাফেরায় শুধু উদাসীনতা। চলতে চলতেই শান্ত গলায় জবাব দেয়, “আমি কি একবারও আপনাকে কথা দিয়েছিলাম যে আজ ভার্সিটি যাব?”
আয়াজ মুহূর্তের জন্য আবারো থমকে যায়। সত্যি বলতে, ইনায়াতের এই পাল্টা যুক্তি ওর ইগোতে গিয়ে লাগে। ও একদম ঠিক বলেছে সে তো কিছুই জানায়নি। ইনায়াত ব্যালকনিতে গিয়ে তোয়ালেটা মেলে দিয়ে আসে। হাতের ব্যথায় ভেতরটা কামড়ে ধরছে ওর, মনে হচ্ছে কেউ ধারালো কিছু দিয়ে কাঁধের মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছে। কিন্তু চেহারায় সে যন্ত্রণার এক বিন্দুও প্রকাশ পেতে দিচ্ছে না সে। আয়াজ এবার ওর সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। ওর শিকারি চোখজোড়া ইনায়াতের মনের ভেতরটা পড়ে নিতে চাইছে, “তাহলে সারাটা সময় ছিলে কোথায়?”
ইনায়াত একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আয়াজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একদম নিস্পৃহ গলায় বলে, “দেখুন, পেপার অনুযায়ী না আমি আপনার সত্যিকারের ‘মিসেস’, আর না আপনি আমার ‘মিস্টার’। তাই আমাদের মধ্যে কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেই। আমি আপনাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য নই।”
আয়াজের কাছে ইনায়াতের এই ধারালো যুক্তিগুলো ফুলের মালার চেয়ে বিষাক্ত তিরের মতো বেশি বিঁধছে। এই মেয়েটা মানুষ না রোবট? সবসময় বরফশীতল গলায় কথা বলে তাকে অপদস্থ করতে এক মুহূর্তও ভাবে না। আয়াজ পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে ইনায়াতের দিকে বাড়িয়ে দেয়, “এটা দেখ।”
ইনায়াত শব্দ না করে কাগজটা হাতে নেয়। আয়াজ মনে মনে অবাক হয় এই মেয়েটা কি কোনো কিছুতেই বিচলিত হয় না? অন্তত জিজ্ঞেস তো করবে কাগজটা কীসের! সাধারণ কৌতূহলও কি নেই ওর?
ইনায়াত পেপারটা খুলে চোখ বোলায়। এটা একটা ম্যারেজ কন্ট্রাক্ট পেপার। আয়াজের স্ত্রী হয়ে থাকতে হলে তাকে কী কী শর্ত মানতে হবে, তারই লিস্ট। আগামী সাত-আট মাস এই চুক্তি বহাল থাকবে, তারপর সোজা ডিভোর্স। শর্তগুলো বেশ কড়া দু’জনের পার্সোনাল স্পেস সম্পূর্ণ আলাদা থাকবে, কেউ কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাবে না, শুধু ইনায়াতকে আয়াজের ফ্যামিলি রুলসগুলো মেনে চলতে হবে। আয়াজের ব্যক্তিগত কোনো জিনিস ইনায়াত ছুঁতে পারবে না, এমনকি বাইরের কারও কাছে আয়াজকে নিজের ‘হাসব্যান্ড’ হিসেবেও পরিচয় দেওয়া যাবে না। নিজের প্রাইভেসি নিয়ে আয়াজ বেশ ভালোই কড়াকড়ি শর্ত রেখেছে। একদম শেষে লেখা এই কন্ট্রাক্ট মেনে নিলে ডিভোর্সের পর আয়াজ ইনায়াতকে থার্টি মিলিয়ন ইউএস ডলার পে করবে।
পুরোটা পড়ে ইনায়াত আড়চোখে আয়াজের দিকে তাকায়। ওর চোখের কোণে এক চিলতে কৌতুক এখন, “স্যার, কিছু মনে না করলে একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করি?”
আয়াজ বেশ একটা ‘বস’ ভাব নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কপালে ভাঁজ ফেলে বলে, “সাহস তো মন্দ না! প্রশ্ন করতে চাও? আচ্ছা, করো।”
ইনায়াত একদম সহজ ভঙ্গিতে, মনে হয় সাধারণ কোনো আবহাওয়া নিয়ে কথা বলছে, এমন স্বরে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কি গে?”
ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১
প্রশ্নটা বজ্রপাতের মতো শোনায় আয়াজের কাছে আয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়। ইনায়াতের মনে হয়েছে, এত প্রাইভেসি আর এত কড়াকড়ি তখনই সম্ভব যদি পুরুষটির নারীদের প্রতি কোনো আগ্রহ না থাকে। আয়াজ বিষ্ফোরিত নেত্রে ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে থাকে, সে যা শুনেছে তা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
