Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৩

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৩

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৩
Maha Aarat

মাহেরের হসপিটালে আসার ঘন্টাখানিক হয়েছে।টেস্টের কিছু রিপোর্টে খুব মনোযোগ সহকারে চোখ বুলাচ্ছিলেন তিনি।অমি আসার পারমিশন চাইতে মাহের শুধু হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়িয়ে আবারও নিজ কাজে মনোযোগী হলেন।
পার হয়েছে বেশ খানেক সময়।চোখের চশমা ছেড়ে রকিং চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলেন মাহের।গত কয়েক দিন ধরে উনার সাথে খারাপ কিছু হচ্ছে।দূ তিনজন পেশেন্ট এর ট্রিটমেন্ট সঠিকভাবে দিতে মিস্টেক করেছেন।যা গত আট বছরেও হয়নি কখনো।কিছু ব্যথা #ভুলতে গিয়ে #ভুল হয়ে যাচ্ছে।অথচ নিজেকে ব্যস্ত রাখার আর বিকল্প পথ নেই।
ঘাড় সোজা-কাত করে ঘুরিয়ে নিলেন।ব্যাকপেইন প্রচন্ড জ্বালা করছে।সোজা হয়ে অমির দিকে তাকাতে বুঝলেন সে মুখ নিচু করে চুপচাপ।অথচ সে মোটেও চুপচাপ থাকার ছেলে নয়।কথা বলে মুখে ফেনা তুলিয়ে দেওয়ার মতো ছেলেকে এতো চুপচাপ দেখে প্রশ্ন করার ইচ্ছেটাও যেনো জাগলো না।তবুও জানতে চাইলেন, ‘তোমার কিছু হয়েছে?’

‘জ্বি না স্যার।’
মাহের মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘যখন থেকে বিছানা নষ্ট করো তখন থেকে তোমাকে চেনা আমার।মিথ্যে আমার সামনে নয়।’
‘ত্ তেমন কিছু না স্যার।’
মাহেরও আর জোর দিলেন না।অমি গভীর দৃষ্টিতে তাকালো স্যারের দিকে।সে জানে স্যার আর ম্যামের মধ্যে কিছু হয়েছে।কি হয়েছে সেটা তাঁর অজানা।তবুও দ্বিধা ভেঙে জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘আপনার কি মন খারাপ স্যার?’
‘না।’
‘ম্ মনে হচ্ছে তো…
কথার মাঝে অমি তৎক্ষনাৎ জিভ কাটে যখন মাহের একেবারে শান্ত চোখে তাঁর চোখে চোখ রাখলেন।জিভ কেটে দূ গালে চাপড় দিয়ে বলে, ‘স্ সরি স্যার।’
মাহের তাঁর সরি’ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে আচমকা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা আমার মাঝে কি পছন্দের কিছু পাও?কারো এট্রাকশনে পড়ার মতো কিছু আছে?খারাপ দিকগুলো ও বলো।’
অমি অকপটে বলে দেয়, ‘মেয়েতে এ্যালার্জি আছে।’

‘হুয়াট?’
মাহের স্পষ্ট শুনতে পারেননি।অমি নিজের ভুল শুধরে দ্রুত বলল, ‘মেদবিহীন শরীর,সুদর্শন সুপুরুষ,সরকারের সম্পদ,ব্যাংকভর্তি…
‘সাট আপ।’
‘আপনি একজন হ্যান্ডসাম ড্যাশিং পুরুষ স্যার।কাজের প্রতি কনসার্ন।দায়িত্বে মনোযোগী..
মাহের কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন এবার।কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘আমি ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেছি আর তুমি আমার স্ট্যাটাস বলে যাচ্ছো।’
‘ওহহো!আচ্ছা সরি স্যার এখন বলছি’ বলে গলা কেশে প্রস্তুত হলো সে।মাহের তাকে সেখানেই থামিয়ে দিলেন।আসরের সালাতের সময় হয়েছে।ড্রয়ার থেকে টুপিটা বের করে বের হওয়ার সময়ও দেখলেন অমি ঠায় দাঁড়িয়ে তখনো।তাকে ঘাড় ধরে বের করে বললেন, ‘আমার এলার্জি মেয়েতে’ আর তোমার নামাজে?’

আজকে তাঁর মন ভালো নেই দেখে মাহমুদ সাহেব বাহির থেকে খাবার অর্ডার করলেন।বাবা মেয়ে একসাথে ডিনার করা শেষে ভদ্রলোক মিতুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তুমি থেকো ওর সাথে।আর দূজনে শুয়ে পড়ো তাড়াতাড়ি।’
এশার মলিন মুখ।তাঁর মা তাকে ফোন করে নরম স্বরে কথা বলেছেন,মায়ের ওপর রাগ ভ্যানিশ।কিন্তু লোকটা এতো সেলফিশ!কোথায় গেলো উনার পাগলামি,এতো কেয়ার,বা ভালোবাসা!শূন্যের সাথে সম্পূর্ণের হিসেবে হাত বাড়াতে কেবল শূন্যই যেনো ফলাফল।
শোবার সময় না চাইতেও মিতুর হাত জড়িয়ে ধরছে সে।এটা তাঁর অভ্যেস,ওই সেলফিশ লোকটার কারনেই এই অভ্যেস।
সে বুঝলো মিতু নড়েচড়ে উঠছে।সে বোধহয় বিরক্ত।এশা মন খারাপের সুরে বলে, ‘তুমি কি বিরক্ত হচ্ছো?’
সে নির্বিঘ্নে উত্তর দিলো, ‘না না আপা।আন্নে ধইরে ঘুমান।’
এশা হাফ ছাড়লো।ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে বলল, ‘আমার ঘুমটা লেগে আসুক,তারপর হাত সরিয়ে দিয়ো।কেমন?’

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সাথে হালকা গমগমে বিজলীর আওয়াজ।দ্রুতবেগে ছুটে আসা দখিনা সমীরন বা নি:শ্বাসের ঘন আওয়াজ কিছুই শোনা বাদ যাচ্ছে না,বাদ যাচ্ছে শুধু একফোঁটা কথার অভাব।যে কথার তৃষ্ণায় ওপাশের মরুভূমি শুকিয়ে কাঠ।
‘আই মিস ইউ!’
আরহামের হঠাৎ কন্ঠস্বর তাঁর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিলো।একই মানুষ,একই কন্ঠ অথচ কত শত মাইল দূরে।বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো হাফসার।কথারা খেই হারিয়ে চুপিচুপি আড়ালে লুকিয়ে গেলো।সে শুধু ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ অনুভব করতে লাগলো প্রিয়তমের গভীর কন্ঠস্বর।
‘আই মিস ইউউউউ!!’
নাহ,সে শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।বরং লজ্জ্বা পাচ্ছে।কীভাবে একই কথা রিপিট করবে সে।মিস তো সেও করছে।মুখে জানিয়েও দিতে হবে?
‘খেয়েছেন?’
‘জ্বি আপনি?’

‘আমি যে বললাম কোনো উত্তর নেই না?কাল সারাদিন-রাত কেনো ফোন বন্ধ ছিল?’
হাফসা আঁতকে উঠে।একটু আগের কোমল কন্ঠস্বর নয়,বরং সে এক রাগী কন্ঠ শুনতে পাচ্ছে।নিজের ভুলের জন্য মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত হলো সে।
‘দিস ইজ টু মাচ!’
ফোনটা কেটে গেলো।আরহাম আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করেননি উত্তরের।এবার ভীষণ ভয় হলো হাফসার।তাঁর অবজ্ঞা হলো নিজের প্রতি,নিজের অনুভূতির প্রতি।প্রতিটাবার লোকটা এসে তাকে একমুঠো ভালোবাসা দিয়ে যান,আর সে পরিবর্তে একঝুড়ি দূ:খ বিলিয়ে দেয়।
অভিমান অনুযোগ বা জড়তা সব ভেঙে কল ব্যাক করলো হাফসা।আরহাম ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন প্রিয় সম্বোধন, কুররাতু আইয়্যুন এর দিকে।বারতিনেক কল এসে ফিরে যাওয়ার পরের কলটা তুললেন।এবার তাঁর কথা ফুটলো।একদমে বলে গেলো, ‘আফওয়ান।ক্ষমা করুন।আমি একটু বেখেয়ালের জন্য ফোনের দিকে নজর দিইনি।অন্য বিষয়ে মনোযোগ ছিলো কিন্তু যখন ওপেন করলাম তখন দেখলাম আপনার রাতের মধ্যমুহুর্ত চলছে।আমি আপনাকে মিস করেছি,অনেক মিস করেছি।টেনশন হচ্ছিল, আপনার সাথে কথা হয়নি তাই।কল দিতে গিয়ে পরে ভাবলাম আপনি নিশ্চয়ই ঘুমে থাকবেন।ঘুম না ভাঙ্গাই।এজন্য দিইনি।আর আজকে আপনার কলের অপেক্ষায় ছিলাম।আমার মনে হচ্ছিল আপনি ব্যস্ত…
আরহামের সব রাগ ক্ষনিকেই মিশে গেলো।উনার মুচকি হাসির নীরব আওয়াজ হাফসার কান পর্যন্ত পৌঁছলো না।এদিকে একদমে কথাগুলো বলে ঠোঁট উল্টে বসে রইলো হাফসা।লোকটা উত্তর দিচ্ছেন না সে কি ভুল কিছু বলে ফেলেছে না কি!
বেশ কিছুক্ষণ পেরোলো।কল এখনো রানিং।কিন্তু লোকটার আওয়াজ নেই।
‘হ্ হ্যালো!’ বলতেই শোনা যায় গা হিম করা এক শীতল কন্ঠস্বর,
‘টেনশনে কি আপনার ঘুম ঠিক মতো হয়েছে,হোমাপাখি?’

গভীর রাত।শুনশান নীরবতা সাথে তীব্র কুয়াশায় জড়ানো ঠান্ডা পরিবেশ।বেলকনিতে ধপ করে আওয়াজ হয়,অতপর ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ।ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করে হাত দিয়ে মাথা ঝেড়ে নিলেন রায়ান।লতাপাতার জংলি আবরণ জড়িয়ে আছে গায়।কব্জির নিচ হয়তো বাজেভাবে ছিলে গেছে।চোখ খিঁচে ব্যথাটুকু হজম করে নিলেন।নিজের দিকে আর মনোযোগ দিলেন না এ মুহুর্তে।
মিতুর ঘুম খুব কাঁচা।আওয়াজ শুনে এতোক্ষণে তার ঘুম বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে।হঠাৎ অবয়ব দেখে ভয়ে চিৎকার দেওয়ার আগেই রায়ান ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সতর্ক করে দিলেন।মুখে হাত চেপে গলা পর্যন্ত চলে আসা চিৎকারটুকু হজম করে নিতেই রায়ান বললেন, ‘তুমি এখন যাও।আধঘন্টা পরে এসো।’
‘আমি কি আমার ঘরে চলি যিতাম?’
‘নাহ।কষ্ট করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো বাইরে।’
মিতু চলে যেতেই চুপিচুপি দরজা আটকালেন রায়ান।এশার পাশে এসে বসে অপলক চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।কি একটা অবস্থা! শ্বাশুড়ির সাথে জোট বাঁধতে গিয়ে বউয়ের থেকে কতো দূরে থাকতে হচ্ছে উনার।এদিকে ভদ্রমহিলা বারবার হুমকি ধামকি দিচ্ছেন, ‘তুমিও হার মানবে না রায়ান।ওর রাগ আর তেজ নিয়ে কতোদিন থাকতে পারে,আমরাও দেখি।তাই না বলো?’

রায়ানও মাথা দূলিয়ে সম্মতি দিয়েছেন।অথচ বউয়ের থেকে দূরত্বে উনার মন পুড়ছে।ফোন দেননি বলে বোকা মেয়েটাও নিশ্চয়ই অভিমান করে আছে।এই এতটুকু একটা মুখে এতো মায়া!রায়ান চুপিচুপি কয়েকটি চুমু এঁকে দিলেন রাগিনী বউটাকে।হাতের পিঠে গভীর চুমু এঁকে দিলেন।মনে মনে যেনো লম্বা কথোপকথন চালিয়ে গেলেন।একসময় মনে পড়লো,এই সুন্দর মুহুর্তের ইতি ঘটাতে হবে।বাড়ির সদর গেট দিয়ে প্রবেশ করা উনার জন্য যতোটা না সহজ তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি কঠিন বৃষ্টিতে পিচ্ছিল গাছ বেয়ে দেয়াল টপকে নিচে নামা।রায়ান ঘড়িতে সময় দেখে শেষ ভালোবাসাটা এঁকে দিলেন কপালে।ফিরে এসে মিতুকে বললেন, ‘ওর যত্ন নিও।’
‘আন্নে সামন দি বাইর হোন।’
‘তোমার স্যার আমাকে কেটে ঝুলিয়ে শুকাতে দিয়ে দিবেন।’
পেছন ফিরে আরেকবার তাকালেন রায়ান।অতপর বেলকনিতে এসে মিতুর উদ্দেশ্য ইশারা করলেন,বেলকনির গ্লাসটা ভেতর থেকে লক করে নিতে।

অনেক ঘাটাঘাটির পর,আর স্পাই লাগিয়ে সে এ খবর সম্পর্কে নিশ্চিত হলো যে আরহাম তাজওয়ার পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে গিয়েছেন।খোদ কিছুটা অভিমান হলো তার।হৃদয়ের আয়নায় একটা ছোট্ট স্বপ্ন বুনে সে।মনের উঠোনে কতশত ভালোবাসার আলপনা এঁকেছে সে তার হিসেব নেই।তবে এবার সিদ্ধান্তে সে অটল।আরহাম তাজওয়ার ফিরলেই সে প্রস্তাব দিবে।গ্রহন করে নিলে সে তো মহা খুশী,আর না করতে চাইলে তার কি করা উচিত এটাও ভেবে রেখেছে সে।বেশ কিছুক্ষণ একান্ত ভাবনায় মশগুল আদওয়ার ধ্যান ভাঙ্গে স্নায়ু থেকে পাওয়া কিছু ব্যতিক্রম চিন্তাধারায়।তার আরেক মন বলে, ‘এটা তো স্পষ্ট হারাম।তারপরও একজন পরপুরুষ নিয়ে তুমি গভীরভাবে ভাবছো।এর পরিণাম নিশ্চয়ই ভয়াবহ!’
তবুও তার মন বোঝে না।একবার তাকে পেয়ে গেলে আর তো পাগলামি করবে না সে– শয়তানের আশ্বাস পেয়ে কিছুটা শান্ত হয়।তবে তার চিন্তা বা উদ্দেশ্যটুকু কি আসলেই সফল হবে?

‘টেল মি হুয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?ইজ ইট ইউর ফাইনাল ডিশিসন।এ্যান্সার মি!’
মেসেজ টা একদিন থেকেই ফোনের নোটিফিকেশনে ঝুলে আছে। আইরার কোনো উত্তর পৌঁছায় নি আর।সে তো জানিয়েই এসেছে তার সিদ্ধান্ত।তবুও আবার জিজ্ঞাসা কেন!
তাদের সম্পর্কের বন্ধন টা প্রথম থেকেই একটা দূর্বল সুতোয় বাঁধা।একপাশে টান খেলে অন্যপাশে ঝড় উঠে।একেক ঝড়ে এর স্থায়িত্বটুকু একেবারে কমে এসেছে।যা এই মুহুর্তে চুলের ন্যায় সরু!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫২

আইরা মেসেজে চাপ দেয়।স্পষ্ট হয়ে উঠে মাহেরের পাঠানো বার্তাটি।উত্তরে ‘ইয়েস’ উত্তর টা লিখতে গিয়ে তার দূর্বল ‘আমিটা’ ভেঙে গেলো।হুট করে বিনা বার্তায় ঝড় নেমে এলো দুচোখ জুড়ে।বুকের ভেতর কয়েকদিনের জমানো,চেপে রাখা কান্নাগুলোর জায়গার সংকুলান হয়েছে বোধহয় এজন্য আর আটকে থাকতে পারেনি!দূচোখ বেয়ে নেমে এলো এক নিরাধারা ঝরনা!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here