Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৫
Maha Aarat

আজকে বাসায় একটা অনুষ্ঠান। আইরার মেঝোচাচার একমাত্র ছেলের রিসিপশন।পুরো সকালটা নিজের রুমে কাটিয়ে বারোটার দিকে বেরোলো আইরা।কাকিমণিরা এসে বারবার তাড়া দিয়ে যাচ্ছেন বলে তাকে রেডি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হয়।নিজেকে কালো পর্দায় আবৃত করতে করতে সে ভাবছিলো আজকে নিশ্চয়ই লোকটা আসবেন।আরহামের অনুপস্থিতিতে ব্যবসার সব বিষয়-আসয় আহনাফ তাজওয়ার নিজে সামলাচ্ছেন।মাহেরকে তিনি নিজে ইনভাইট করেছেন।আইরার মন বলছে,লোকটা আসবে।আজকে উনাকে একনজর দেখার জন্য মন ছটফট করছে তাঁর।কি বেহায়া মন তাঁর!সারাদিনের প্রার্থনায় কেবল চায়,লোকটার প্রতি মায়া-ভালোবাসার ইতি ঘটুক।অথচ সময়ে অসময়ে বেহায়া মন আবার উনার জন্যই বিষিয়ে উঠে।ভাগ্যিস দারুন কোনো স্মৃতি নেই তাদের।নয়তো স্মৃতির ক্ষতটা পোড়া অন্তর টা আরও ছাই করে দিতো।
দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সাময়িক পরিক্ষা শুরু হয়েছে আজ থেকেই।এক্সাম হলে ডিউটি দিতে হবে সকাল ১০ টা থেকে দূপুর ২ টা অব্দি।এদিকে মাহেরের এপোয়েনমেন্ট জমে আছে যোহরের পরপরই থেকে।এক্সাম টাইমের ডিউটি মাহের বেশীরভাগ সময় এভোয়েড করেন।অথচ আজ ঠিক সময়েই হাজির।পরিক্ষা অন্তত সে মিস দিবে না।একটাবার নিশ্চয়ই দেখা হবে।

পেরিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকদিন।এই কয়দিনে এশা-রায়ানের দূরত্ব বেড়েছে।যেদিন রাতে রায়ান তাকে দেখতে আসছিলেন তার পরের দিন সকালেই এশার মায়ের কাছে গিয়ে নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, ‘আপনার মেয়েকে পাওয়াটা আমার কাছে বিশ্বজয় করার সমান ছিলো।আপনার মেয়ে জেদী,রাগী।না বুঝে কখনো বা আমার সাথে অল্প কথা কাটাকাটি হয়ে যায় তবে দিনশেষে উনিই আমার শান্তি।উনাকে না দেখে বেঁচে থাকা অসম্ভব প্রায় আম্মু।উনার রাগ করাটা মোটেও অস্বাভাবিক ছিলো না।নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলেই আবারও আসবো ইন শা আল্লাহ।’
অথচ বাসায় আসার পরেও পুরোদমে তার ইগ্নোরেন্স হজম করছেন রায়ান।রায়ান তাকে জোর করেননি।সম্পর্কের সুতো মজবুত হতে মাঝে মাঝে কিছু দূরত্ব হজম করতে হয়।তবুও দিনশেষেও সে যদি ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়,এটাই অনেক।

আজকে ফিজিক্স পরিক্ষা।যদিও সিলেবাসের অংশটুকু ক্লাসেও সম্পূর্ণ হয়নি সুতরাং খুব একটা সুবিধে করা কঠিন ব্যাপার।অবশ্য তাদের জন্য যারা কেবল ক্লাস গুলোতেই ভরসা করে।আইরা আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সবার কলম চলছে সে বাদে।এই পরিক্ষায় স্নেহাও তার আশেপাশে নেই আর বাকিদের সাথেও ভাব নেই।নীরবে বসে বসে চুপিচুপি হিসেব কষছিলো পাশ মার্কটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।অমনি আচমকা লোকটার উদয় হলো।উনাকে একপলক দেখার ইচ্ছা আইরা খুব কষ্টে হজম করে নিলো।বেহায়া মন বারেবার চাইছে একপলক তাকাতে,যেমনটা চাইছিলো রিসিপশনের পুরো বিকাল,আইরা তবুও তাকালো না সে।ক্লাসে ডিউটিরত স্যারের সাথে হ্যান্ডশেক আর আলাপ কেবল একটা অজুহাত মাহেরের।তিনি এসেছিলেন কেবল তাকে একপলক চোখের দেখা দেখার জন্য।হাফ পিরিয়ডের ঘন্টা বাজতেই ডিউটিরত স্যার বললেন, ‘আমাকে একটু যেতে হবে।আপনি কি কিছুসময় থাকবেন?’
মাহের নির্দ্বিধায় মাথা নাড়ালেন।ঘন কালো নিকাবে আবৃত হয়ে আছে সে।চোখটাও ভালোভাবে দেখার মুরোদ নেই।এদিকে মেয়েগুলোর অশুভ দৃষ্টিতে বেশ বিব্রতবোধ করছিলেন মাহের।এরই মধ্যে অবাক হলেন যখন আইরা পেপার জমা দিতে চাইলো।এখনও অর্ধেকের মতো সময় বাকি তাহলে তার অস্বস্তির কারন কি উনার উপস্থিতি,বুঝে উঠতে পারলেন না মাহের।

উনার একবারের জন্য মনে হলো,উনি সামনে থাকায় সে বিব্রতবোধ করছিলো তাই হয়তো..
নতুন ভবনের অফিসরুমের তিনতলায় স্পেশাল টিচার্স রুম।সেখানে দাঁড়ালে ক্যাম্পাসের বেশখানিক অংশ আর ক্যান্টিন টা স্পষ্ট দেখা যায়।ক্যান্টিন আর ক্যাম্পাসের দূরত্ব বেশী নেই।পরিক্ষা চলাকালীন সময়ে এখন ক্যাম্পাসে বেশী ভীড় নেই।যারা আছে তাঁরা অন্য ডিপার্টমেন্টের,বা সিনিয়ররা।ক্যাম্পাসের পরিবেশটা প্রকৃতির মিশেলে সজ্জিত।কৃত্রিমতা ছাড়াও এখানে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য করে তৈরী করা আছে জায়গাটা।সামনে আছে বড় দিঘী,কোণায় কোণায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল-দেহী কয়েকটা গাছ।তাদের ছায়াই রোদের তীব্র ঝলকানি বা অতিবৃষ্টির দমকা টা হালকা এড়ানো যায়।ঘাসের ওপর ব্যাগ রেখে গোল হয়ে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলো আইরা।এর আগের কিছুক্ষণ সে কাটিয়েছে বটগাছটার ঠিক নীচে।খুব চেষ্টা করেও কেন জানি আগের চঞ্চল ছটফটে আইরাকে সে খুঁজে পাচ্ছে না।সে অনুভব করতে পারছে,তাঁর ভেতরের ‘আমিটা’ শেকড় ছেড়ে যেনো কেমন নিভে গেছে।চাইলেও যেনো আর সেটাকে উজ্জ্বীবিত করা সম্ভব হচ্ছে না।ঘরবন্দী হয়ে থাকা আজকাল অসহ্য লাগে তাঁর।আর বের হলেই ভাবিপুর মলিন দৃষ্টি তাকে আরও গাঢ়ভাবে পুড়িয়ে দেয়।ভাবিপু তো কোমল,আবেগী,মিষ্টি মিশুক একজন মেয়ে,তবে উনার ভাই কেনো এতো ব্যতিক্রম এই প্রশ্নের ঝুলিতে আজও কোনো উত্তর জমা করতে পারে নি সে।

মাহের কয়েক পলক তাকে দেখে চুপচাপ নিজের বরাদ্দকৃত ডেস্কে চলে গেলেন।অবহেলায় যাকে হারিয়েছো,অবেলায় তাকে খুঁজো না কথাটা খুব করে অনুভব করা যায়।তাঁর ইগ্নোরেন্সে মাহের যতোটা না আহত তাঁর চেয়ে বেশী খারাপ লাগছে তাঁর পরিবর্তন,তাঁর নীরবতা,তাঁর মৌণতা।মাঝে মাঝে খুব ভৎসনা করেন নিজেকে।সেদিন যদি আবেগকে একটু কন্ট্রোলে এনে এমন ভয়াবহ সিদ্ধান্তে সম্মতি না দিতেন,তাহলে আজ এত বড়ো দায়ের আসামী হতেন না।মন ভাঙ্গার দায়,সে যে বড়ো অসহায়,কোনো কিনার যে নেই আর,আবারও একই পথে ফিরবার।

কাশফুলের ঝোপটাই শুধু আগের মতো আছে।পূর্বের পতিত জমিটা ফসল বুনছে এখন।বটতলার বটগাছটা নেই,গতবছর কেটে ফেলা হয়েছে।পাড়ে জমে উঠা ভৃঙ্গরাজ ফুলগুলো নির্বংশ হয়ে গেছে।বিলের পানি শুকিয়ে কাঠ,ছোট ছোট ঝোপগুলোর গাছে ঝুলছে শুকনো পাতা।সন্ধ্যের টকটকে লাল আকাশ আর হালকা কুয়াশা গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে আদওয়া।তাঁর মনে পড়ছে সুন্দর অতীত টা।সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানো,বিল থেকে শাপলা তোলা,ভৃঙ্গরাজ জমিয়ে মালাগাঁথা বা সূর্যডোবার দৃশ্য টা অবলোকন।কতো সুন্দর স্মৃতি,অথচ সেগুলো গার্ভেজের মতো মস্তিষ্কের এক কোণায় ঠেসে পড়ে আছে।কারন এসব সুন্দর স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে এক কুৎসিত বাস্তবতা।
ইমানের বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে সাথে মস্তিষ্কে মেজর প্রবলেম।পুরনো সম্পর্কের মান অভিমান আর মন কষাকষির অবসান হয়েছে আগেই।বন্ধুত্বের খাতিরে আজ তাদের গ্রামে আসা,প্রিয় বন্ধুকে দেখবার জন্য তাঁর বাবার নীরব ছটফটানি অগ্রাহ্য করে অনুরোধ ফিরিয়ে দেবার সাহস আদওয়ার হয়নি আজ।অথচ এখানে এসে ইমানের মলিন মুখখানা দেখতেই তাঁর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তাঁর।কেন জানি খুব মায়া হচ্ছিলো তাঁর।একটা ইন্সিডেন্টেই তাদের পরিবারটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে।ইমান ভাইয়ের আম্মু,একজন শক্তপোক্ত মধ্যবয়সী নারীও যেনো থমকে গিয়েছেন এমন ইন্সিডেন্টে।তাদের এমন করুন পরিস্থিতি চোখে আটকে যাওয়ার মতো।আদওয়ার কেনো জানি সহ্য হচ্ছিল না ইমান ভাইয়ের বিধ্বস্ত চেহারা।তাই নীরবতা হিসেবে কোনো এক সময়ের পছন্দের জায়গাটি বেছ নেয় সে।অথচ ভেতর থেকে আসা তীব্র ঝড় তাকে বারবার যেনো খুব করে ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে।

‘বাড়িডে আসো,সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে!’
ইমান ভাইয়ের শুকনো কন্ঠটা চিনতে ভুল হলো না তাঁর।মনের বিরুদ্ধে গিয়েও সে বলে ফেলল, ‘এমনভাবে ভেঙে পড়বেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘বাবার এক্সিডেন্ট আমাকে যতোটা দূর্বল করেছো,তার চেয়ে বেশী দূর্বল করে দিচ্ছো তুমি।ভালোবাসার প্রয়োজন নেই,একটু করুনা বা দয়াও আসে না তোমার?’
‘আমি ভালোবাসি একজনকে!’
কথাটা হজম করতে গিয়ে মনে হলো বেয়নেট দিয়ে হৃদয়টা যেনো খুঁচিয়ে দিচ্ছে কেউ।খুব করে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেই সাথে ভয়াবহ ব্যাথা।খানিক বাদেই উত্তর দিলেন, ‘এটা তোমার আবেগ; আর উনিও ম্যারেড।’
আদওয়া দুয়ে দুয়ে চার মিলাতে সময় নিলো কিছুক্ষণ।লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘তাতে আমার সমস্যা নেই।’
‘আমি উনার মতো হয়তো হতে পারবো না কিন্তু চেষ্টা করবো আল্লাহর জন্য।তবুও একটা সুযোগ দিয়ে দেখো।’
‘এমন করুন করে অনুরোধ করবেন না ইমান ভাই!আমার ফিরিয়ে দিতে কষ্ট হয়।’

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষা টা মধুর হয়।যেমন দীর্ঘ সময় পর প্রিয়জনের সাক্ষাৎ বা কাঙ্ক্ষিত কিছু প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।দেশে ফিরার অপেক্ষা যেনো ফুরোচ্ছেই না আরহামের।আম্মু আব্বুর সাথে সাক্ষাৎ,প্রিয়তমাদের অভিমানে গাল ফুলানো মুখ আর এক পলক দৃষ্টি বিনিময়,ব্যসস এর চেয়ে শান্তি আর কিছুতেই নেই।আর কখনো হুষ থাকতে প্রিয়জন থেকে দূরে আসবেন না বলে ঠিক করে নিলেন আরহাম। এবারের দূরত্বটা শেষবারের মতো।ইজিপ্টের সাথে বাংলাদেশের টাইম টা ব্যতিক্রম।যেমন ইজিপ্টে এখন রাত অথচ বিডিতে রাতের শেষাংশ।আরহামের নির্ঘুম চোখজোড়া এখনও পিটপিট করে ফোনের স্ক্রীনে তাকাচ্ছে।কিছুক্ষণের মধ্যে উমায়ের অনলাইন আসার কথা।কথা বলে একসাথে ঘুমাবেন বলে ঠিক করে নিলেও উমায়ের আসলেন বেশ দেরীতেই।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৪

অথচ আরহামের ঘুমে জমে আসা চোখ বা ক্লান্তি সব দূর হয়ে গেলো তার কোমল সুর কানে আসতেই।তার ঘুমজড়ানো কন্ঠ শুনতেই ইচ্ছে হলো ঠিক এই মুহূর্তে তাকে একপলক দেখতে।অথচ আবদার করলে সে লজ্জায় মিশে যাবে।তার চেয়ে বরং অপেক্ষার প্রহর শেষে চুপিচুপি একটা নির্জন সকাল আসুক জীবনে।ভালোবাসার মোহর মারা হৃদয়ে নতুন বসন্তের ফুল ফুটুক,আরহাম না হয় মৌমাছি হয়ে সেই সুবাসিত মিষ্টি ফুলের সব সৌরভ শুষে নিবেন!কিছু অপেক্ষা হোক,সুন্দর কিছু সমাপ্তির জন্য!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here