Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (৩)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (৩)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (৩)
তোনিমা খান

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাপ্তি যখন ঘৃণায় রূপ নেয়, তখন সেই প্রতিক্ষীত প্রিয় মুখটিও অন্তঃস্থল ঘৃণায় বিষিয়ে দেয়। দশ বছর যাকে এক নজর দেখার জন্য নিলীমা নরকযন্ত্রণা সহ্য করে মৃত মানুষের ন্যায় বেঁচে ছিল, আজ তাকে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে দেখলেও তার ঘৃণা হয়, রাগ হয়।
নীলিমার তীব্র হাহাকার আজ নিছকই এক করুণ উপহাসে পরিণত করে দিয়ে এখন মানুষটা শুধুমাত্র ক্ষমার জন্য তার দুয়ারে এসে দাঁড়ায়।
নিলীমা কাঁদতে গিয়েও হেসে ফেলল নিজের করুন দশায়। কিন্তু নিয়তির দুয়ারে বারবার মাথা‌ ঠুকতে সে নারাজ। সবসময় নিয়তি তাকে দুঃখের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে না।
চোখের পানি মুছে নেয় নিলীমা‌। চোয়াল শক্ত করে দরজা খুলে সোজা সিকদার বাড়ির মূল ফটকের এসে দাঁড়াল।
ওয়াহেদ দুই কদম এগিয়ে আসল। অনুনয় করে বলল,

–“আমরা পাঁচ মিনিট বসে কথা বলি নিলীমা?”
–“আপনি রোজ রোজ এখন এখানে আসেন কী করে? আপনার স্ত্রী এখন আর আপনাকে হুমকি দেয় না? আপনার ছেলেকে মেরে ফেলছে না?”, নিলীমার কঠিন স্বরে ওয়াহেদ শ্রান্ত কণ্ঠে বলল,
–“নিহামকে স্কুলে দিয়ে এখানে এসেছি আমি।”
–“এখন কতভাবেই এখানে আসতে পারছেন, তাই না? অথচ দশটা বছর কী ঠুনকো কারণ দেখিয়ে তিনটি জীবন নষ্ট করে দিলেন! আপনার লজ্জা করে না নিজের এই মুখ দেখাতে, হ্যাঁ? আমার দুইটা সন্তানের দশ বছরের কষ্টের পরিবর্তে নিজের এই ঠুনকো কারণগুলো দেখাতে লজ্জা করলো না? আপনি কী আসলেই বাবা? কখনো আমায় ভালোবেসেছিলেন? আমায় বাদ দিন… আমার সন্তানদের? আমার দু’টো ফুটফুটে মেয়েদের কখনো ভালোবেসেছিলেন?”
ওয়াহেদ নিরুত্তর। জীবনের যেই পর্যায়ে নিজের পিতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে সেই বিদঘুটে পর্যায়ে বলার মতো তার কাছে কিছুই নেই।
নিলীমা পুনরায় বলল,

–“একটা সন্তানের দোহাই দিয়ে ফেলে আসা দুইটা সন্তানকে ভুলে গেলেন। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাওয়া অমন রাজ্য ধরে রাখার জন্য তো উত্তরাধিকারীর প্রয়োজন। আর আল্লাহ দিয়েছে ও একটা ছেলে। আপনার কী ভাগ্য! কারোর নজর না লাগুক। আমার আর আমার সন্তানদের ও না।”
–“আমায় একটু বোঝার চেষ্টা করো নিলীমা। টাকার লোভ আমার কখনোই ছিল না এটা তোমার থেকে ভালো কে জানে?”
–“আমি ভালো করেই জানি আপনাকে। যখন টাকা ছিল না তখন একনিষ্ঠভাবে আমার হয়ে ছিলেন, আর যখন টাকা পেলেন তখন একনিষ্ঠভাবে আমায় ভুলে গেলেন। আমি আপনার মতো কাপুরুষকে ঘৃণা করি, ওয়াহেদ। আপনি ক্ষমা চেয়েছেন, আমি তা মঞ্জুর করলাম। তবে তা মায়ার বশবর্তী হয়ে নয়, বরং আমার জীবন থেকে আপনার শেষ অস্তিত্বটুকু মুছে ফেলার জন্য। আপনার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ, রাগ, কষ্ট নেই। আপনি যেটা করেছেন আপনার দিক থেকে সঠিক করেছেন।
আমায় দয়াকরে তালাক দিয়ে চিরতরে মুক্ত করে দিন নামেমাত্র এই সম্পর্ক থেকে। আমি আপনার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব আমায় দু’টো পরীর মা হওয়ার সৌভাগ্য করে দেয়ার জন্য। কিন্তু দয়াকরে নিজের এই মুখ আর দেখাবেন না আমায়। আপনাকে দেখলে, আপনার কথা শুনলে আমার ঘৃণায় অন্তঃস্থল বিষিয়ে আসে বিশ্বাস করুন।”
দৃঢ় কণ্ঠে অনুনয় করে বলেই নিলীমা অশ্রুসিক্ত নয়ন মুছতে মুছতে বাড়িতে ঢুকে গেল।
সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তপোবনের মেজো চাচি বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,

–“মাইয়্যা মানুষের অত অভিমান রাখতে নেই। দশ বছর কী কম কষ্ট করলা, এখন একটু সুখ করো। মাইনা নাও যা বলে আর একটু সুখে ঘর করো।”
নিলীমা পা থামিয়ে অবাকপানে তাকায়। মেনে নেবে? কী মেনে নেবে? স্বামীর ঠুনকো অজুহাতের ভিত্তিতে তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে মেনে নিয়ে আবার সংসার করবে? নিজেকে পুনরায় দুঃখের জীবনে ধাবিত করবে? নিজের স্বামীকে অন্য একজনের সাথে ভাগ করার মতো যন্ত্রণা সহ্য করবে? নিজের দুধের শিশুর খিদের জন্য ছটফট করা ভুলে যাবে? মতামতের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নিজের বড় মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার যন্ত্রণা ভুলে যাবে? কোনোদিন না!
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো নিলীমার। সুদৃঢ় কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“অভিমান নয় ভাবি, আত্মসম্মান। দশ বছর যখন মাথা উঁচু করে একা একা বাঁচতে পেরেছি, তখন বাকি জীবনটাও কাটাতে পারব। কিন্তু এমন কোনো মানুষের সাথে দ্বিতীয় বার সংসার করব না যার কাছে আমার আর আমার সন্তানদের কোনো মূল্য নেই।”
বলেই সে গটগট করে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল। ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। তবে আজ আর কান্না আসল না। কান্না গুলো শুকিয়ে গিয়েছে ঘৃণার তোপে।
ওয়াহেদ তখনো বলহীন দেহে দাঁড়িয়ে আছে। স্থির দৃষ্টি এঁটে আছে জানালার কাছে থাকা সেলাই মেশিনটির দিকে। এটা সে কিনে দিয়েছিল টাকা জমিয়ে। এই একটা মেশিন তাদের কত দুঃখ দূর করেছে! তার অবর্তমানে তার সন্তানদের ও দুঃখ দূর করেছে।
তার একটা ছোট্ট দারিদ্র্যতায় মোড়া সুখময় সংসার ছিল। যেটা সময় আর কর্মফলের কারণে আজ চরম ঘৃণ্য ছক অতীতে পরিণত হয়ে গিয়েছে। কর্নকুহরে আন্দোলিত হলো নিলীমার বলা একটি সম্বোধন।

“কাপুরুষ।”
এত কঠিন আর ঘৃণ্য সম্বোধন নিয়ে সে বাঁচবে কী করে?
দু’টো নারীর বাজেভাবে ঠকে যাওয়ার এই গল্পে মৌনতা এক নিঃস্ব সত্তা। যার থেকে একটু একটু করে সব হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে তার মাতৃত্বের দম্ভটুকু। যেই মাতৃত্বের লড়াই লড়তে লড়তে মৌনতা আজ মৃত্যুর দারপ্রান্তে সেই মাতৃত্ব কী হেরে যাবে?
–“যতই যাই হয়ে যাক না কেন মৌন! ইমরোজ তো নায়েলের বাবা। নায়েল তো চাইবেই বাবার সাথে কথা বলতে। ও কী বোঝে বড়দের দ্বন্দ্ব?”
মৌনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালো নিশাতের দিকে। ক্রন্দনরত কম্পিত কণ্ঠে বলল,

–“বাবা? তুমি কোন বাবার কথা বলছ খালামনি? আমার মেয়েটা সারারাত কান্না করত একটু বাবা মায়ের কাছে ঘুমানোর জন্য। কিন্তু মানুষটা জোর করে ওকে ঘর থেকে বের করে দিতো। বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আমার মেয়েটা সন্ধ্যা থেকে আনন্দিত থাকতো কিন্তু ওই মানুষটা একটাবার কোলেও নিতো না।”
মৌনতা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এরোজ রক্তাভ নেত্রে স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে অজস্র ক্ষোভ!
মৌনতা চোখের পানি মুছতে মুছতে পুনরায় দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আমার মেয়েটার যখন তার বাবাকে খুব প্রয়োজন ছিল তখন সে আনন্দ ফুর্তিতে ব্যস্ত ছিল, খালামনি। এখন সব শেষ! আমাদের মা মেয়ের সকল প্রচেষ্টা অপেক্ষা ফুরিয়ে গিয়েছে। এখন আর আমার মেয়ের তার বাবাকে প্রয়োজন নেই। এখন শুধু ওই বিদঘুটে অধ্যায়কে ভুলে যাওয়ার পালা। আর নায়েলকে ভুলতেই হবে ওই নিকৃষ্ট মানুষটাকে। ওর বাবা নেই।”
মাসুমা ছলছল নেত্রে তাকালো মেয়ের পানে। কিন্তু এরোজ! তার অবয়ব থেকে রাগ ক্ষোভ সবটা একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে লাগল। চোখেমুখে ফুটে উঠল বিশ্ব জয়ের প্রফুল্লতা। নীরব জয়ের উল্লাসে চোখমুখে ফুটে উঠল অদম্য দুঃসাহস। নিজের পথটুকু আরো মসৃণ করার জন্য ঠিক এতটুকু দৃঢ়তাই যেন তার কাম্য ছিল।
নিশাত উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে নম্র স্বরে বলল,

–“আচ্ছা, ঠিক আছে। নায়েল কখনো আর ইমরোজের সাথে কথা বলবে না। তুমি শান্ত হও আম্মা। এই অবস্থায় শরীর আর মনের উপর চাপ প্রয়োগ করো না। আমি এখুনি ব্লক করে দেব ইমরোজকে।”
মৌনতা ভেঙে পড়ে না বরং দূর্বার গতিতে মেয়েকে কোলে নিয়ে উপরে ছুটে যায়। যেন ইমরোজ নামক নিকৃষ্ট বাবার থেকে সন্তানকে লুকানোর তীব্র প্রচেষ্টা!
এরোজ ম্লান হাসল তার লুকানো দেখে। দঢ় কণ্ঠে আওড়ালো,,
–“ভয় নেই মৌন। আপনাকে আর আপনার মেয়েকে আমি বহু আগেই আমার মাঝে লুকিয়ে নিয়েছি। সেখানে কোনো ‘অতীত’ পৌঁছানোর সাধ্য নেই।”
এরোজের সুপ্ত বাসনা গুলোকে আরো দৃঢ় করে দিল মৌনতার আজ একটু দৃঢ়তা।
নায়েল অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালো মায়ের পানে। জেদি কণ্ঠে বলল,
–“তুমি কেন আমায় পাপাল সাতে কথা বলতে দাওনি? আমি পাপাল সাতে কথা বলব। পাপা কেন আমাদেল নিতে আসে না? আমি দাদু যাব, ফুফি যাব, বলো পাপা যাব।”
মৌনতা চোয়াল শক্ত করে বলল,

–“তোমার বাবা আর নেই নায়েল। তোমার বাবা হারিয়ে গিয়েছে। আর কখনো তোমার বাবা আমাদের নিতে আসবে না। আমরা আর কখনো বাবার সাথে থাকব না।”
–“কেন থাকব না?”
–“বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। আর কখনো আসবে না নায়েল।”
–“আসবে না?”
–“নাহ, তুমি আর কখনো বাবার কাছে যেতে চাইবে না। তাহলে কিন্তু মা হারিয়ে যাব নায়েল।”
–“না, তুমি হালাবে না।”, নায়েল জেদি কণ্ঠে বলেই মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মেয়েকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে মৌনতা মেয়ের চুলের গোছায় অজস্র চুমু দিলো। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
–“মায়ের আর শক্তি নেই তোমায় কষ্ট পেতে দেখার নায়েল। আমি জানি না, তোমার সাথে অন্যায় করছি কি-না কিন্তু ইমরোজ কখনোই তোমার বাবা হতে পারবে না। সারাজীবন দুঃখ পাওয়ার থেকে বাবার থেকে এইটুকু দূরত্ব তোমার জন্য উত্তম।”
নায়েল কিছুই বুঝল না মায়ের কথা। ছোট্ট মস্তিষ্ক শুধু এতটুকু বুঝল, মা বাবার কথা শুনলেই রেগে যায়। মা বাবার সাথে কথা বলতে দিতে চায় না, দেখা করতে দিতে চায় না।

সময়গুলো সুখের মতোই ক্ষণস্থায়ী। চোখের পলকে সপ্তাহ গড়ায়।
সকাল সাতটা। রূপকথা ছেলের যাবতীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে শেষবারের মতো চেক করে নিলো। তানশান ঘড়ি পড়তে পড়তে তাড়া দিয়ে বলল,
–“মিমি, হয়েছে। এত কিছু কেন দিচ্ছেন?”
মাথা চুলকাতে থাকা রূপকথার মাথায় তৎক্ষণাৎ আরো কিছু আসল। আচমকা সে ঝড়ের গতিতে ছুটতে ছুটতে বলল,
–“আরে তানশান, ড্রাই ফ্রুটসের কোটা দিতে মনে নেই। হায় আল্লাহ!”
রূপকথা ছুটলো পুনরায়। তানশান পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
–“আরে ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে কী করব মিমি? আমি কী শশুর বাড়িতে যাচ্ছি যে আপনি যা যা পারছেন তাই ব্যাগে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন?”
রূপকথা শুনলো না তানশানের বারণ। তপোবন বোনের ব্যাগ হাতে ছেলের ঘরে ঢুকতেই বলল,
–“হয়নি তানশান? তোমায় সাড়ে সাতটার মধ্যে স্কুলে থাকতে হবে।”
–“আমার হয়েছে পাপা কিন্তু মিমির হয়নি। সে যা পারছে আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।”
তপোবন কিছু বলতে যাবে তার আগেই রূপকথা ছুটে ঘরে ঢুকল। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“এইযে ড্রাই ফ্রুটস আর এই বাটিতে চারটা ডিম সিদ্ধ আর এই বোতলে তোমার ইলেকট্রোলাইট গুলিয়ে দিয়েছি আমি।”

তানশান বিরক্তি নিয়ে তাকায় মিমির পানে।
তপোবন স্মিত হাসল রূপকথার উদ্বিগ্ন মুখটি দেখে। চোখেমুখে মাতৃসুলভ চিন্তা, স্নেহ, যত্ন। সে এখন পর্যন্ত কাউকে গর্ভে ধারণ করেনি তবুও তার অন্তরাত্মা মাতৃত্বের মহিমায় বলীয়ান। যেই মাতৃত্ব সৎ সন্তান কিংবা নিজের সন্তানের মধ্যে ফারাক করতে জানে না। প্রকৃত নারী এবং প্রকৃত মা এর সংজ্ঞা বোধহয় এখানেই পরিপূর্ণতা পায়।
রূপকথা ছেলের কাঁটা কাঁটা চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“নিজের খেয়াল রাখবে। অচেনা কেউ ডাকলে যাবে না, কিছু দিলেও খাবে না, নাকের কাছে কোনোকিছুর ঘ্রাণ নিতে দিলেও নেবে না। সবসময় টিচারদের সাথে থাকবে। আর ফুপিকেও দেখে রাখবে।”
তানশান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

–“আমি বাচ্চা নই মিমি। এগুলোতো আমি জানি।”
–“আমরা জানা জিনিসকেই বেশি অবহেলা করি বুঝলে? যাও, আমি জানি তুমি জিতেই আসবে।”
তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল মিমির দৃঢ় বিশ্বাসে।
তপোবন ছেলে আর বোনকে নিয়ে নিচে নামে। সে একাই যাচ্ছে তানশান আর রোজকে স্কুলের বাসে উঠিয়ে দিতে। আটটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে বাস ছাড়বে। রোজ ছ্যানছ্যান করছে। সে যেতে চায় না কিন্তু তানশানের জেদের কারণে তাকে যেতে হচ্ছে। উপরন্তু তার শরীরটা খারাপ যাচ্ছে।
রূপকথা পাণ্ডুর মুখে নিচে নামলে তপোবন তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“এভাবে মুখটা করে রেখেছো কেন? সাথে যেতে চাইলে চলো। কিন্তু এমন মুখ করে রাখার কোনো মানে হয় না।”
রূপকথা বিমর্ষ মুখে মাথা নেড়ে নাকচ করল।

–“আব্বুজান, আম্মার ওষুধ আছে। নাস্তা বানাতে হবে।”
–“তবে হাসো।”
রূপকথা তার কথামতো দাঁত বের করে মেকি হেসে দেখালো। তপোবন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল,
–“পাজি মেয়ে!”
–“তো আমার হাসি আসছে নাহ আমি হাসব কী করে?”
তপোবন ডানে বামে মাথা নাড়লো। মন খারাপ করার কথা তার, অথচ মেয়েটা গতকাল রাত থেকে মুখটা বাংলার পেঁচার মতো করে বসে আছে। তার মাথা খেয়ে নিচ্ছে, তানশানকে ছাড়া তার নাকি নিজেকে শূন্য মনে হয়। কীসব অদ্ভুত কথা! সে কী মানুষ না?
নির্জনা বেগম নাতির চুল গুছিয়ে দিতে দিতে অসন্তোষের সাথে বলল,
–“এই এতদূর একটা প্রতিযোগিতার জন্য যাওয়া কী খুব প্রয়োজন ছিল দাদুভাই? সাতদিন দাদুকে চিন্তায় রাখবে। আমার এমনিতেই প্রেশার ফল করছে ক’দিন যাবৎ। নিজের খেয়াল রাখবে।”
তানশান বিরক্ত হয়ে বলল,

–“আমি এখন অনেক বড় হয়েছি দাদুমনি।”
–“বড় হলে আমায় নিজের লেজ বানিয়ে টানছো কেন? একা একাই যাও। আমি বড় হয়েছি ডাডুমনি!”
রোজ মুখ বাঁকিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল। তানশান রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় ফুপির দিকে। ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“এর জন্য ফুপিকে আমি নিতে চাইনি পাপা। তার মতো ন্যাকা ঝামেলার মানুষের সাথে আমি এক সপ্তাহ থাকব কী করে? কী ইরেটেটিং!”
–“মুখ সামলে কথা বলো রোবটের বাচ্চা!”, রোজ তেতে উঠল।
তপোবন ধমকে উঠল দু’জনকে,
–“রোজ, তানশান বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে। দু’জন ভদ্রভাবে যাবে ভদ্রভাবে আসবে। একটুও ঝগড়াঝাঁটি যেন না হয়।”
দু’জন ই মুখ বাঁকালো। তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

–“রোজ? তুমি তো বড়, তুমি কেন ওর সাথে তর্ক করো?”
–“আমি ইচ্ছে করে করি না ভাইজান। তোমার ছেলে করে।”
দু’জন এভাবেই একে অপরের উপর‌ দোষ চাপাতে মগ্ন হয়। রূপকথা ছেলেকে শাসায়। অতঃপর দাদা দাদুর থেকে বিদায় নিয়ে তারা তিনজন গাড়ির কাছে এগিয়ে গেল। কিন্তু উঠতে গিয়েও তপোবন ছেলেকে আঁটকে দিল।
তানশান চোখ তুলে তাকায় বাবার মুখপানে। তপোবন মিহি স্বরে বলল,
–“মিমিকে বলে আসো।”
সহসা তানশানের সম্বিৎ ফিরলো। সে চকিতে পিছু ফিরে তাকাতেই দেখল রূপকথা সদর দরজা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিনা বিলম্বে সে ছুটে যায়।
নিজের সর্বস্ব দিয়েও যখন পরিবর্তে খুব অল্পকিছু প্রতিদান ভালোবাসা ফিরে পায় তখন সেটা বেদনাদ্বায়ক। রূপকথার ও মন খারাপ হচ্ছিল তানশান সবার থেকে বিদায় নিলেও তার থেকে নেয়নি বলে। কিন্তু সেই অনুভূতি নিদারুণ ভাবে থমকে গেল ছুটে এসে কেউ জড়িয়ে ধরতেই। রূপকথা হকচকায়। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ভুলে যায় কিয়ৎকালের জন্য।
তানশান ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“থ্যাংক ইউ মিমি পাপাকে রাজি করানোর জন্য। আসছি হ্যাঁ? আপনি কিন্তু মন দিয়ে পড়াশুনা করবেন। ফাঁকিবাজি করবেন না। আমি আপনার জন্য উপহার নিয়ে আসব।”
মেয়েটির নেত্রদ্বয় ছলছল করে উঠল। এইযে প্রথমবারের মতো মনে হলো সে সত্যিই কারোর মা। রূপকথা কাঁপা কাঁপা হাতে ছেলেটির পিঠে হাত রাখল। আলতো হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমার ছোট টিচারের কথা অমান্য করার সাধ্য আমার আছে নাকি! যা যা কমপ্লিট করতে বলেছো সব কমপ্লিট করে রাখব আমি। নিজের খেয়াল রেখো।”
তানশান তাকে ছেড়ে দিয়ে হাসিমুখে মাথা নেড়ে পুনরায় ছুটে যায় বাবার কাছে। তপোবন গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে নিজের ছোট্ট স্ত্রীকে এক পলক দেখে নেয়। মেয়েটি চোখ মুছতে ব্যস্ত। মেয়েটি খুব করে চায় তার ছেলেটার মা হতে। তার সকল প্রচেষ্টা সে লক্ষ্য করে। কিন্তু কখনো জোর করে ছেলের উপর। তবে এখন মনে হলো জোরজবরদস্তি নয় বরং এটা মেয়েটির প্রাপ্য। আর তানশানের দায়িত্ব রূপকথাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়ার।
দীর্ঘ আড়াই মাস পর তপোবন স্বচক্ষে তৃশানকে দেখতে পেল। চোখেমুখে ভরপুর গাম্ভীর্যতা নিয়ে এগিয়ে গেল ছেলেটির কাছে। তৃশান চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্রমেই নিজের দূর্বলতা লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে লাগল।
তপোবন স্পষ্ট দেখলো তার অস্বাভাবিক আচরণ। তবে তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ভীষণ সাবলীল কণ্ঠে বলল,

–“তৃশান, ওদের খেয়াল রেখো। আমি তোমার বাবার কথামতো, তোমার ভরসাতেই ওদের ছাড়ছি।”
তৃশান নতশির থমথমে মুখে বলল,
–“জি ভাইজান।”
তপোবন মৃদু হাসল। বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে ছেলেটির বাহু চাপড়ে বলল,
–“তুমি আমার দেখা সবচেয়ে দূরন্ত আর মেধাবী ছেলে। ঠুনকো কোনোকিছু তোমায় বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে না। ভালো থেকো। আমি জানি তুমি নিজেকে সামলে একটা ভালো পর্যায়ে পৌঁছাবে। আমার দোয়া থাকবে তোমার জন্য।”
তৃশান জানে এই কথাগুলোর মানে। কিন্তু তপোবন যেটা বিভ্রান্ত বলে অ্যাখ্যায়িত করল, সেটা তার জীবনের করা সবচেয়ে সুন্দর ভুল। সেটা ভাবলে গুনাহ হয় অথচ ওই ভাবনাটুকু জুড়ে থাকে অপার্থিব সুখ।
ছেলে আর বোনকে বাসে তুলে দিয়ে তপোবন বাড়ির পথ ধরে। একমনে ড্রাইভ করতে করতে তার মনে পড়ে রূপকথার বলা কিছু কথা।
“সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে থাকতে থাকতে দমবন্ধ হয়ে আসে। সবার ইচ্ছে করে প্রত্যাহিক জীবনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে একটু ঘোরাফেরা করতে, নিজেকে জানতে।”
তপোবনের ললাটে ভাঁজ দৃঢ় হয়। গাড়ির স্পিড বাড়াতে বাড়াতে গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। তার জীবনটা বয়সের তালে পরিপূর্ণ হলেও রূপকথার জীবন আর বয়স দুটোই অন্যরকম রঙিন। সে রূপকথা জীবনের রঙ ছিনিয়ে নিতে পারে না। ওর চাওয়া পাওয়া গুলোকে সংসার আর জীবনের চাপে উপেক্ষা করতে পারে না।
বসার ঘরে তখন তকদির সিকদার চা পান করছিলেন। গাড়ির চাবি হাতে তপোবন ধীর কদমে ঢুকে বাবার সামনের সোফায় বসল।
তকদির সিকদার চায়ে চুমুক দিতে দিতে শুধালেন,

–“ওদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে এসেছো? গাড়ি ছেড়েছে?”
–“হুম, এতক্ষণে ছেড়েছে হয়তো।”
–“ছাড়ার পড়েই আসতে।”
–“সমস্যা নেই। ওখানে অনেক অভিভাবক আর টিচার রয়েছে।”
–“আচ্ছা।”
তপোবন বাবার দিকে ইতস্তত দৃষ্টি ফেলে পা নাড়াচ্ছে আর হাত নাড়াচ্ছে। মূলত সে যখন গভীর চিন্তায় থাকে তখনি এমন অদ্ভুত আচরণ করে। তকদির সিকদার খেয়াল করেন ছেলের বিচলন। শুধালেন,
–“কিছু বলবে? চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন তোমায়?”
তপোবন হাসার চেষ্টা করল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“না আব্বু, তেমনকিছু না।”
বলেই তপোবন ঘাড় চুলকালো। আড়চোখে তাকালো পত্রিকা পড়তে ব্যস্ত বাবার মুখপানে। কিছু তো সে বলতে চাইছে। কিন্তু এই বয়সে এসে বাবাকে কী করে বলবে মনের কথা এই নিয়ে ইতস্তত বোধ করতে হচ্ছে! কী লজ্জার বিষয়!

–“কিছু বলার থাকলে বলো। তোমায় তো চিন্তিত দেখাচ্ছে।”
পুনরায় বাবার কথায় তপোবন গলা খাঁকারি দিয়ে ইতস্ততা ঝেড়ে ফেলল। চাপা স্বরে বলল,
–“আব্বু, রূপকথা তো ছোট মানুষ। ওর বয়সের সবাই যেখানে পড়াশুনা, বাবা মায়ের সাথে সময় কাটানো, ঘোরাফেরা করছে, জীবন উপভোগ করছে সেখানে ও সংসার, স্বামী সন্তান আর পড়াশোনা এতসব কঠিন দায়িত্ব করছে। কখনো কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ও সুযোগ হয়নি ওর। ও কখনো আবদার ও করে না কোনোকিছুর। তাই আরকি ভাবছিলাম যে, ওকে ক’দিন কোথাও থেকে ঘুরিয়ে আনি। ওর ভালো লাগবে।”
তকদির সিকদার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন নিজের আধবুড়ো ছেলের দিকে। এই বয়সে এসে এইটুক কথা বলার জন্য বাবার থেকে অনুমতি নিতে হবে?
সে হতবাক হয়ে বলল,

–“তা এমন চোরের মতো আমার কাছে বলছ কেন? আমার কাছে বলতেই বা হবে কেন? তুমি কী ছোট মানুষ যে আমি বকা দেব? তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাবে। বলা লাগবে কেন?”
তপোবন ইতস্তত করে বলল,
–“পুরো অফিসের দায়িত্ব তো আমার উপর আব্বু। আমি চাইলেই হুটহাট কোনো কাজ করতে পারি না।”
–“অফিস আমি দেখে নেবো তুমি যাও তো বড় বউমাকে নিয়ে ঘুরতে। অতটুকু একটা মেয়ে এত দায়িত্ব সহকারে পুরো বাড়ি সামলে রাখছে এটা অনেক বিশাল ব্যাপার। আমারই উচিৎ ছিল আরো আগে তোমাদের দায়িত্ব থেকে একটু অব্যাহতি দেয়া। যাও যাও, যেখানে ইচ্ছা যতদিনের জন্য যেতে চাও, যাও। আমি অফিস ঠিক সামলে নেবো।”
তপোবনের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
–“থ্যাংক ইউ আব্বু। আমি তোমার উপর বেশিদিন চাপ দেব না। শুধু এক সপ্তাহ তুমি অফিসটা একটু সামলে নাও। আর আমি অফিসের সবাইকে সব দিকনির্দেশনা দিয়েই যাব।”

–“এত দুশ্চিন্তা করতে হবে না তোমায়। যত দিন ইচ্ছা ঘুরে এসো।”
তপোবন বাবার থেকে বিদায় নিয়ে ত্রস্ত পায়ে ছুটলো রান্নাঘরে। রূপকথা তখন ব্যস্ত সকালের নাস্তা বানাতে। আচমকা কেউ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই সে হকচকিয়ে পিছু ফিরে তাকায়।
তপোবনকে দেখেই চঞ্চল কণ্ঠে শুধাল,
–“তানশানের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?”
–“হু।”
রূপকথা ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেললো আশেপাশে। চাপা স্বরে বলল,
–“ছাড়ুন আমায়। জবা আপা আসবে।”
তপোবন ভ্রুক্ষেপ করে না তার কথার। মিহি স্বরে ডেকে ওঠে,

–“রূপকথা?”
–“হুঁ।”
–“মেঘ ছুঁয়েছ?”
–“মেঘ ছোঁয়া যায়?”
–“যায়। ছুঁয়েছ?”
–“নাহ।”
–“পাহাড় দেখেছ?”
–“নাহ।”
–“সমুদ্রের পাড়ে খালি পায়ে হেঁটেছ?”
–“উঁহু?”
–“এক ঘন্টার মধ্যে সাত দিনের প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় নিয়ে তৈরি হবে।”
রূপকথা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
–“কেন?”
তপোবন তাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। মৃদু হেসে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (২)

–“আমার একান্ত ব্যক্তিগত রূপকথার রাজ্যকে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট এক নতুন রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যাব। যেখানে সকল দায়িত্বের ভার ছাপিয়ে সে শুধুই তপোবন সিকদারের ব্যাক্তিগত মানুষ হিসেবে নিজেকে চিনবে। যাবে?”
খুনতি হাতে রূপকথা কোমরে হাত দিয়ে সরু চোখে তাকায় সম্মুখের লোকটির দিকে। এক বুড়ো লোক ম্যাথ টিচার থেকে হঠাৎ এত কাব্যিক হয়ে গেল কী করে?

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here