দুইজনাতেই পর্ব ২৪
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
ভোরের আলো তখনো ফুটেনি। অদূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে কবুতরের ভারী আওয়াজের ধ্বনী। শামীমদের বাসার মালিক ছাদেই বেশ কবুতর পালে। আশপাশে প্রায় সবুজাভ গাছগাছালি। সাক্ষ্যর ঘুম ভাঙ্গল একটু আগেই। খুব নিকটে মেয়েলি সত্ত্বার অস্তিত্ব টের পেয়েই বুঝে উঠল মেয়েটার এলোমেলো চুল তার নাক মুখে জড়িয়ে আছে। এক হাত জড়িয়ে আছে সাক্ষ্যর বুক। এক পা আলগোছে দিয়ে রেখেছে সাক্ষ্যর পায়ের উপরেই। আহা! কি সুখ? সাক্ষ্য বোধহয় অন্য সময় হলে বিরক্ত হতো এমন অবস্থায়। অথচ আজ বিরক্ত হলো না। একদম পাখির ছোট্ট ছানার ন্যায় একটা মেয়েকে নিজের বুকে পড়ে থাকতে দেখে মুগ্ধ হয়ে চাইল। ফর্সা গড়নের মেয়েটির চোখ, ঠোঁট, নাক সবই যেন আদুরে। সাক্ষ্য মনোযোগ দিয়েই দেখল। দেখল ঠোঁটের এককোণে ফুলে যাওয়া অংশটাও। সাক্ষ্য মুহূর্তেই ভ্রু জোড়া কুঁচকাল। ভেবে নিল নিজে আবার এর কারণ কিনা। কিন্তু সাক্ষ্যর মস্তিষ্ক স্পষ্ট জানান দিল সে কিচ্ছু করেনি। হয়তো এমনিই কোন কারণে ফুলে গিয়েছে। অতঃপর নিজ মনেই হেসে বিড়বিড় করে বলল,
“ ঘুম থেকে উঠলে নির্ঘাত ভেবে নিবে যে আমি আবার সুযোগ টুযোগ নিয়ে ফেলেছি। এক চামচ বেশি বুঝা মানুষ তো। বুঝেই নিবে। ”
ফের আবারও চাইল দ্বিতীর মুখে। কি সুন্দর আদুরে। চেয়ে থেকেই বলল,
“ ঘুমালে লাগে যেন পিচ্চি একটা বাচ্চা। কিছুই জানে না। কি আদুরে ছানা। ইচ্ছে হচ্ছে কোলে নিয়ে বসে থাকি। অথচ জেগে গেলেই এখন এমন সুচালো চাহনিতে চাইবে যেন আমায় খু’ন করবে। ”
সাক্ষ্য চাপাশ্বাস ফেলে। কিছুটা এগিয়ে ফু দিয়ে দ্বিতীর কপালের চুলগুলো সরিয়ে হাসল। দ্বিতী ততক্ষনে ঘুমের মধ্যেই তীব্র বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল। যেন তার ঘুমে বিরক্ত করা মানুষটির প্রতি সে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি বিরক্ত। সাক্ষ্য একই কাজটাই ফের আবার করল। আবারও ফু দিল। এবারে শুধু কপালে চুল উড়ানোর জন্য ফু দিল না। সারা মুখেই ঠোঁট চোঙা করে ফু দিল। ঘুমকাতুরে দ্বিতী বিরক্তে তিক্তবিরক্ত হয়ে মুখচোখ কুঁচকায় আবার। চোখ বুঝে রেখেই দুই হাত বাড়িয়ে সামনের অদৃশ্য বস্তুটিকে ধরার জন্য হাত বাড়াতেই তা গিয়ে ঠেকল সাক্ষ্যর মুখে। সাক্ষ্যর ঠোঁটজোড়ায় তখন কেবল হাসি ফুটল। চাপা স্বরে বলে উঠল,
“ বুঝলাম, ঘুম বেশি আপনার। কিন্তু, আপনাকে বিরক্ত করতে আমার ভালোই লাগছে। কি করি বলুন তো? এই যে চোখ মুখ কুঁচকে নিচ্ছেন এটা দেখতেও ভালো লাগছে। কি ভয়ানক অবনতি হয়ে আমার দেখুন! ”
দ্বিতী নড়চড় করল। ঘুমের মধ্যেই বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“ হু। ”
সাক্ষ্য ভাবল জেগে গেছে বুঝি?অথচ পরমুহূর্তেই বুঝতে পারল ঘুমের মধ্যে জবাব দিয়েছে মেয়েটা। সাক্ষ্য ফের বউয়ের সরলতা দেখে হেসে ফেলে৷ একে একে দ্বিতীর ভ্রু, ঠোঁট, নাকে তর্জনী আঙ্গুলে বুলাতে বুলাতেই আরো একদাফ বিরক্ত করল দ্বিতীকে। প্রচন্ড রকমে ঘুমকাতুরে দ্বিতী এই পর্যায়ে অসহ্য রকমের বিরক্ত হলো যেন। অনেকটা সময় বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে নিয়েই চোখ মেলল হঠাৎ। সাক্ষ্য তখন ভদ্র বাচ্চার মতো চোখ বুঝিয়েছে। বেচারা দ্বিতী ঘুমঘুম চোখে এপাশ ওপাশ চেয়েই বুঝে উঠার চেষ্টা করল। সাক্ষ্যও ঘুমাচ্ছে। তাহলে? বেচারা দ্বিতী কিছু বুঝে না উঠে আবার ও চোখ বুঝতে নিতেই আবার চোখ খুলে ফেলল সচেতন চোখে। সাক্ষ্যর চোখ বুঝে রাখা৷ তবে ঠোঁটে ঝুলছে বাঁকা হাসি। ভেবেছে দ্বিতী বোধহয় লক্ষ্যই করবে না। অথচ দ্বিতীর চোখে পড়ে গেল। ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে ঘুমঘুম স্বরেই বলে ফেলল,
“ এই? আপনি হাসছেন কেন? ”
আকস্মিক কন্ঠটা কানে পৌঁছাতেই সাক্ষ্য এতক্ষন ঘুমিয়েছে এমন ভান ধরে চোখ মেলে চাইল। তাকাল দ্বিতীর মুখচাহনিতে। চোখ তখনো পুরোপুরি মেলে ধরেনি। ঘুমের রেশ কাটেনি বলা চলে। তবুও সাক্ষ্যর হাসি ধরে ফেলেছে ঠিকই। সাক্ষ্য অল্প একটু চুপ থেকেই বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ একি! আপনি আমার এত কাছাকাছি যে? যদি বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়ে দেন এখন খু’নোখু’নি করে? ”
দ্বিতীর এবারে ঘুম কেটে আসল যেন। নিজের অবস্থান বুঝে উঠে সরে গেল খানিকটা। পরমুহূর্তেই বলল,
“ আমি আমার জায়গাতেই ঘুমিয়েছি।”
“ তাহলে এখানে এলেন কি করে? আমি তো ঠিকই আমার জায়গায় আছি। একটুও চেঞ্জ হয়নি। ”
দ্বিতী নিজের দিকে যুক্তি পেল না। রাতে যখন জেগে সাক্ষ্যর বাহুডোরে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল তখনই সরিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। এখন তাহলে এই প্রশ্ন শুনতে হতো না। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আপনি রোবট তাই। আমি তো আর রোবট নই। হাত পা নড়ে আমার। ”
সাক্ষ্য চাপা হাসল দ্বিতীর আড়ালেই। গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“ কেন? ঘুমের মধ্যে এক্সারসাইজ করেন? ”
দ্বিতী কপোট রাগ দেখাল। জানাল,
“ করি। তো? সমস্যা কি? ”
“ সমস্যা অনেক। ”
“ বলুন…”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ ঘুমের মধ্যে হাত পা নাড়ানোর নাম করে এমন ব্যাঙ এর মতো হাত পা ছড়িয়ে আমায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে রাখলে আমার সমস্যা হবে না? আমি এমন ব্যাঙ নিয়ে ঘুমোতে অভ্যস্ত নই। ”
তীব্র অপমানে দ্বিতীর মুখচোখ থমথমে হয়ে এল যেন। সাক্ষ্যর উচিত চিল এটা বলা যে, সে এমন ব্যাঙ নিয়ে ঘুমোতে অভ্যস্ত হতে চায়। অথচ বলল কি? মুখটা থমথমে রেখেই সে উঠে বসল। বলল,
“ ভালো। আমি কি বলেছি আপনাকে অভ্যস্ত হতে? ”
“ আপনি না বললেও আমায় অভ্যস্ত হতে হবে। ”
“ কারণ? ”
“ কারণ আম্মু আমার ঘাড়ে পাখির ছানার মতো একটা ব্যাঙ জুটিয়ে দিয়েছে। অভ্যস্ত হওয়া ছাড়া তো কিচ্ছু করার নেই বলুন? ”
দ্বিতী নিজের এহেন অপমানে মুখ থমথমে রেখে জবাব দিল,
“ আছে। সল্যুশন নাম্বার ওয়ান, পাখির ছানার ন্যায় ব্যাঙটাকে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে লাইফ পার্টনার করুন। সল্যুশন নাম্বার টু, আনুষ্ঠানিক বিয়ে না করে আজীবন আপনি আপনার বাড়িতে,আমি আমার বাড়িতে থাকি। কোনটা বলুন? ”
সাক্ষ্য দায়সারা ভাব নিয়ে উঠে বসল। বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতেই ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে জবাব দিল,
“ সল্যুশন নাম্বার থ্রি, পাখির ছানার মতো মেয়েটাকে অলটাইম আমার চোখের সামনে ঘুরঘুর করতে দেখতে চাই। চোখের শান্তি, মনের শান্তি, আত্মার শান্তি। ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকাল। কি রং পাল্টানো মানুষ এ পুরুষ! মাত্রই বলল সমস্যা। দ্বিতী ভ্রু বাঁকিয়েই শুধাল,
“ এত শান্তির মাঝে সমস্যা ভুলে গেলেন? ”
সাক্ষ্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ সমস্যা হলে সমাধান ও খুঁজে নিতে পারব। আপনি আছেন না? ”
“ আমি থাকলে কি? ”
মাথার ঝাকড়া কালো চুল গুলো চুলকে এবারে উত্তর দিল সাক্ষ্য,
“ সমস্যা যখন আপনাতেই, সমাধান ও আপনাতেই মিলবে। চিন্তা নেই। ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে আর উত্তর দিল না। কি উত্তর দিবে? গিরগিটির মতো একবার এক রূপ দেখতে দেখতে নিজেই বুঝে উঠে না এই পুরুষকে। দেখা গেল এখান থেকে ফিরেই সাক্ষ্য আর তাকে চিনলই না। এমন একটা ভান করল যেন বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়েছে। দ্বিতী নিজেও উঠে দাঁড়াল। আলগোছে চুলগুলো দুই হাতে খোঁপা করতে করতে দ্বিতীর হঠাৎ খেয়াল হলো তার শরীরে ওড়না নেই। দ্বিতীর এই পর্যায়ে রাগে দুঃখে কেঁদে দিতে মন চাইল যেন। এতোটা সময় বকবক করে যাচ্ছে অথচ এই ছোট্ট বিষয়টা তার মাথাতে আসল না? সাক্ষ্য খেয়াল করেছে কি? দ্বিতী দ্রুতই খাটের কোণে পড়ে থাকা ওড়নাটা টেনে তুলে চটফট করে পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। লজ্জায়, অস্বস্তিতে তার ইচ্ছে হচ্ছে নিজের মাথাটা নিজেই ফেলে দিক।
তখন আলো ফুটেছে চারপাশে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে জানান দিচ্ছে সময়টা ছয়টা পেরিয়ে গিয়েছে। সাক্ষ্যরা সকাল সকালই রওনা দিবে । দেরি না করে নাস্তাটা করে যেন তৈরি হয়ে নেয় এটা আগেই জানানো হলো দ্বিতীকে। দ্বিতীও তাই জামাকাপড় নিয়ে আবারও ওয়াশরুমে হাজির হলো। যে গরম পড়েছে! গোসল না করলে সে আধসিদ্ধ হয়ে যাবে। কার বিয়েবাড়িতে গিয়েও সিদ্ধ হয়ে ফিরেছে। পরে রাতে ফিরে আর গোসল করাও হয়নি। বাসায় হলে সে অবশ্যই ঘন্টা দুয়েক সময় নিয়ে পড়ে থাকত পানির নিচে।
দ্বিতী খুব বেশি সময় নিল না। গোসল সেরেই চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে একপাশে রেখে দ্রুত বের হলো। পরনে একটা লাল রাঙা গোল জামা। সাক্ষ্য দাঁত ব্রাশ করতে করতে মাত্রই বেলকনি থেকে রুমে এসেছিল। অতঃপর সাতসকালে এমন স্নিগ্ধময়ী রমণীর স্নিগ্ধ রূপ দেখে বেলকনির দরজাতেই হেলান দিয়ে দাঁড়াল। মুখে ব্রাশ রেখে বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েই দেখল মেয়েটার চুল মোঁছার দৃশ্য৷ সাক্ষ্যর আজকাল নিজেকে প্রেমরোগের খুব জটিল রোগী মনে হয়। নয়তো এমন ব্যাক্তিত্ববান সাক্ষ্য কিনা এই মেয়ের কাছে এলে এমন বেহায়া হয়ে যায়? তাকিয়ে থাকতে মন চায়? কি অদ্ভুত! প্রত্যেক বিবাহিত পুরুষেরই বুঝি বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার মতো এই কঠিন রোগটা আছে। অন্তত সাক্ষ্য টের পাচ্ছে তা। দ্বিতীর নজরে নজর পড়ার আগেই সাক্ষ্য চোখ সরাল। মুখ ধুঁয়ে এসেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ গোসল করেছেন কেন এত সকালে?”
উত্তর এল,
“ করব না কেন? বাসায় ফেরার জন্য রওনা দিব একটু পর। অতটুকু পথ যাব। গোসল করাই তো উচিত।”
সাক্ষ্য আর কিছু বলল না। বিছানার এককোণে বসে কপাল ঘষে বিড়বিড় করল,
“ ঠোঁটও ফুলিয়ে রেখেছে। সাতসকালে গোসল ও সেরেছে। আল্লাহ জানে মানুষ কি মনে করবে? বিশেষ করে নিষাদ আর শামিম…”
দ্বিতী লক্ষ্য করল সাক্ষ্যর বিড়বিড় করাটা। মুহূর্তেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে বলে উঠল,
“ কি বিড়বিড় করছেন? ”
সাক্ষ্য চাইল। তারপর হঠাৎ মনে হলো সে যেটা ভেবে মনে মনে অস্বস্তিতে ভুগছে এ একই অস্বস্তিতে ফেলে দ্বিতীকেও জ্বালানে যাক। অতঃপর ওভাবেই ঠোঁট চেপে হেসে বলে উঠল,
“ মিসেস এহসান,আপনার ঠোঁট…”
দ্বিতী অবাক হয়ে বলে উঠল,
“ কি? ”
“ ঠোঁট ফুলে আছে কেন? ”
আকস্মিক কথাটায় দ্বিতী মুহূর্তেই হাজির হলো আয়নার সামনে। সাক্ষ্যর মুখে চাপা হাসিটা সহ্য হলো না। আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের ঐ ফুলো অংশটা দেখেই সাক্ষ্যর হাসির সাথে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে মুহূর্তেই সন্দেহী কন্ঠে বলে উঠল,
“ আসলেই তো ফুলে আছে। কি করেছেন? ”
সাক্ষ্য জানতই যেন এটা। সবকিছুতে এক চামচ বেশি বুঝা মেয়েটা এমনই ভাববে এটা আগের কথা। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ ঠোঁট ফুলে গেছে আপনার। আমি কি করব? মাইন্ড ভালো করেন। ”
“ মাইন্ড ভালোই আমার।”
“ ভালো হলে উল্টোপাল্টা ভাবনা বাদ দিন। ’
দ্বিতী বাদ দিল না ভাবনা। পিছু ফিরেই তপ্ত মেজাজে বলল,
“ আমি জানি, এটা আপনিই..”
বাকিটুকু বলার আগেই দ্বিতীর মনে পড়ল কাল রাতে নিজের মোবাইলটা ঠপাস করে তার ঠোঁটে পড়েছিল। এতোটা পড়েছিল যে সে ব্যথাও পেয়েছিল বেশ। এখন বুঝে উঠল ঠোঁট ফোলা দেখানোর কারণটা। ফোঁস করে শ্বাস ফেলতেই সাক্ষ্য ততক্ষনে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,
“ আমি কি? ”
দ্বিতী মাঝপথে নিজের ভুল বুঝেও থেমে গেল না। নিজের দিকটা মজবুত রাখতে মুখচোখ থমথমে করে উত্তর দিল,
“ কিছু না। ”
কথা সোফাতেই বসা। সকাল সকাল সেও গোসল সেরেছে দ্বিতীর দেখাদেখি। আসলেই যা গরম পড়ছে। ভেজা চুলগুলো ছেড়ে দিয়েই চায়ের কাপে চুমুক তুলছিল মেয়েটা। বাসায় ফিরেই কত কত পড়তে হবে। দুইদিনের পড়া কি কম? মেডিকেলের পড়ার চাপে মরতে মরতেও বেঁচে আছে এই তো অনেক। কথা এসবই ভাবছিল। এর মাঝেই হাজির হলো সাম্য। হাতে বোধহয় চারটে আইসক্রিম । এসেই প্রথমে একটা আইসক্রিম দিয়ে এল দ্বিতীকে। বাকি দুটো নিয়ে পাশের রুমটায় যেতে নিয়েও থেমে দাঁড়াল। কথাকে ইঙ্গিত করে বলল,
“ এই কাঁথা শোন? এই দুটো আইসক্রিম নিধি আর স্নেহাকে দিয়ে আয়। বিনিময়ে তোকে এক টুকরো দিব। ”
কথা শুনল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল,
“ তুমি ও তো দিয়ে আসতে পারো সাম্য ভাই। ”
“ তুই দিয়ে এলে কি দুনিয়া উল্টে যাবে? ”
“ আমার ইচ্ছে হচ্ছে না দিয়ে আসতে। তুমি দিয়ে এসো। ”
সাম্য রাগল। একদম কথার পাশে বসেই হুট করে তার হাতে থাকা চায়ের কাপটা ছিনিয়ে নিল। জানাল,
“ চা পরে খাবি। আগে দিয়ে আয়। বসে থেকে থেকে হাতি হচ্ছিস। ওজন কত দেখেছিস? ”
ঠিক আরেকটু দূরেই নিষাদ আর শামীম ছিল। ওদের সামনেই এমন ওজন নিয়ে খোঁটা দেওয়াতে কথার খারাপ লাগল যেন। মুখ ছোট হয়ে এল। সবসময় ওজন নিয়ে খোঁটা দেয় কেন সাম্য? কথা কি চেষ্টা করছে না ওজন কমানোর? না পারলে কি করবে ও? কথার চোখ টলমল করে। উঠে দাঁড়িয়ে সাম্যর হাত থেকে আইসক্রিম দুটো নিয়ে গেল নিধিদের কাছে। নিধি আর স্নেহাকে দিল। অতঃপর ফের ফিরে এসে সোফায় বসল নিরব হয়ে। সাম্য ততক্ষনে বাকি থাকা আরেকটা আইসক্রিমে ঠোঁট ছুঁইয়েছে। চায়ের কাপটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ তুই আইসক্রিম খেয়ে কি করবি? যে পরিমাণে মোটা হচ্ছিস। না খাওয়াই ভালো। ”
কথা নিরব চাহনিতেই তাকাল। চায়ের কাপটাও এগিয়ে হাতে নিল না। শুধু নিভে যাওয়া স্বরে বলে উঠল,
“ আমি কি তোমায় বলেছি আমি আইসক্রিম খাব? ”
“ বলিসনি। কিন্তু তোর তো মনে হতেই পারে তোর জন্য আনিনি কেন। তাই বলে রাখলাম। তুই মোটা, তাই আনিনি। ”
“ ভালো করেছো। ”
কথা চুপ হয়ে গেল। চা পেয়ে যে মেয়ে একবার ও না করে না সে মেয়েটা বাকি চা টুকু আর নিল না। ছোট থেকে কেন সে খাবার নিয়ে সচেতন হলো না একবার? কেন? তখন থেকে সচেতন হলে তো ওজন এতোটা বাড়ত না। আর না তো মোটা হতো। এই সমাজ কি জানে মোটা হওয়াতে সবজায়গায় বুলিং এর স্বীকার হওয়া কতটা কষ্টের? হয়তো জানে না। কথা নিরব অভিমানেই বসে থাকল। ফোনে নিউজফিড স্ক্রল করল। অথচ মন জুড়ে চলছে একটাই অভিযোগ, কেন এত মোটা সে?
সাম্য হঠাৎ তার কাছে বসল। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ স্নেহা আইসক্রিম নিয়েছে? ”
স্নেহা শামীমের বোন। দেখতে স্লিম, সুন্দরী এই মেয়েটাে আশপাশে এই দুইদুন প্রায়সই ঘুরঘুর করেছে সাম্য। চোখ এড়ায়নি কথার। উত্তরে বলল,
“ হ্যাঁ নিয়েছে। ”
“ ভাবছি, ওকে তোর ছোট ভাবি বানাব। কেমন হবে? ”
কথা আশাহত এক পথিকের ন্যায় চাইল ।ওকেই জিজ্ঞেস করছে? যে মেয়েটা কিশোরী কাল থেকে আড়ালে আবড়ালে তাকে ভেবে অনুভূতিতে সিক্ত হয়েছে তাকে এসেই জিজ্ঞেস করছে। কথা কি জবাব দিবে? দিল না জবাব। চুপ করে থাকল। সাম্য ফের আবারও বলল,
“ এই কাঁথার বাচ্চা কাঁথা, বল কেমন হবে? ’
কথার বোধহয় কষ্ট হলো। নিজের অবস্থান, শারিরীক আকার সব নিয়ে নিজের প্রতি জন্মার তীব্র অভিযোগ। চোখ টলমল করল। অবাধ্য বিষাদরা হুরহুর করে নামতে চাইল দুচোখ বেয়ে। অথচ কাঁদল না কথা। ছোটস্বরে জবাব দিল,
“ ভালো হবে। মানাবে দুইজনকে। ”
“ সত্যি? যদি ও তোর ভাবী হয়ে যায় তো তাহলে তোকে আর মোটা বলব না। প্রমিস। ”
“ আচ্ছা। ”
কথাটা আর বসে থাকতে পারল না। প্রিয় পুরুষের অন্যের প্রতি মুগ্ধতাও চুপচাপ সইতে পারল না আর। নিরব ব্যথা আর বিষাদ নিয়েই ছুটে এল রুমে। নিধি আর স্নেহার মাঝখান দিয়েই দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা লাগাল। আজ যদি কথা চিকন হতো, দেখতে চোখ জুড়ানো সুন্দরী হতো তাহলে কথা নিজে সাম্যর কথায় বাঁধ সেধে বলত যে, সে তাকে পছন্দ করে। এভাবে অন্যের কথা না ভাবে। অথচ কথার সে সাহস হলোই না। হবেও না কখনো। কথা শুধু ওভাবেই নিরবে কাঁদল। কাঁদতে কাঁদতেই আওড়াল,
“ সাম্য ভাই? আমার এতোটা কষ্ট হচ্ছে কেন? বিশ্বাস করো, অনেক কষ্ট হচ্ছে সাম্য ভাই। ইশশ! যদি আমি তোমার যোগ্য হতাম? যদি চিকন হতাম? তোমার পাশে তাহলে আমাকেও মানাত বলো? আচ্ছা সাম্য ভাই, মোটা হওয়া কি অপরাধ? খুব অপরাধ? ”
কালকের পড়া শাড়িটাই গোছাচ্ছিল দ্বিতী। গুঁছিয়ে ব্যাগে নিতেই সাক্ষ্য হঠাৎ শাড়িটার দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আজ শাড়ি পরবেন না? ”
“ আজ কেন পরব? বিয়ে তো শেষ। ”
সাক্ষয কন্ঠ গম্ভীর রেখে বলল,
“ বিয়েবাড়িতেই কেন পরতে হয়? ”
“ কারণ কবি বলেছে একটা বিয়েবাড়িতে গিয়েছে বাকি দশজনের বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকাল। প্রশ্ন ছুড়ল,
“ দশজনের মধ্যে আপনি ও আছেন নাকি? অথচ অলরেডি একজনের গলায় ঝুলে জীবন তেজপাতা করে দিচ্ছেন। ”
” কে? ”
“ আপনি। আর কে হবে? ”
দ্বিতী নিজেও ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,
দুইজনাতেই পর্ব ২৩
“ আমি আপনার লাইফে যাই ইনি এখনো তার আগেই তেজপাতা করে দিচ্ছি? গেলে কি হবে? ”
সাক্ষ্য দ্বিতীর আড়ালেই হাসল। বরে উঠল,
“ তেজপাতার পরিচর্যা হবে। ”
পরমুহূর্তেই যেতে যেতে আওড়াল,
“ জ্বালিয়ে লাইফ তেজপাতা বানিয়ে দিচ্ছেন দেখেই ঘরে তোলার ব্যবস্থা করছি ম্যাম। যাতে জ্বালালেও আমার খাঁচাতেই থেকে জ্বালান। নয়তো সাক্ষ্যর ধৈর্য্য এতো কাঁচাও না। ”
