Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 35

Naar e Ishq part 35

Naar e Ishq part 35
তুরঙ্গনা

সারাটা দিন নানা চিন্তার আবর্তে কেটে গেল সুহিনের। নিমরা আর দানিয়াল দুজনেই ভার্সিটিতে চলে গিয়েছে; দানিয়েল যাওয়ার আগে দুপুর অব্দি সকল রান্নাবান্না গুছিয়ে রেখে গিয়েছে। হয়তো সন্ধ্যা নাগাদ তারা ফিরে আসবে, কিন্তু সুহিন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। দুপুর পেরিয়ে প্রায় বিকেল গড়িয়ে এল, অথচ সে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। গতরাতেই দানিয়েল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে এই সপ্তাহে মিলানে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়; উপরন্তু তাকে একা যেতেও নিষেধ করে দিয়েছে। কি এক মুসিবত!
বিরক্ত হয়ে ঘরের মেঝেতে পায়চারি করতে করতে এক সময় সুহিন ঘরের কোণায় রাখা নিজের গোছানো লাগেজটি টেনে বের করল। তার ভেতরে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে লাগেজের একটি গোপন পকেট থেকে সে উজ্জ্বল একখানা হীরের আংটি বের করল। আংটিটি দেখলেই বোঝা যায় যে সেটি অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু এতদিনের জমানো বোঝা এবার নামিয়ে ফেলতেই হবে—সুহিনের পক্ষে এটি আর নিজের কাছে রাখা সম্ভব নয়।
​আংটিটি একপাশে সরিয়ে রেখে সে আরও একটি জিনিস বের করল—টম ফোর্ডের একটি নিকষ কালো পারফিউম ফ্লাকন। জিনিসটি হাতে নিয়ে এপাশ-ওপাশ নেড়ে ভ্রু কুঁচকে সে বিড়বিড় করল,

“এটাও দিয়ে দেবো?… না দিয়ে আর করবই বা কি! ওনার যা-কিছু আছে সবটাই আজ ফিরিয়ে দিয়ে চিরতরে মুক্ত হবো।”
সুহিন আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত গোসল সেরে, পরনের পোশাকটি বদলে একটি ক্যাজুয়াল নীল-সাদা গাউন পরে নিল। এরপর রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কৌতুহলে শেষবারের মতো পারফিউমের বেশ কিছুটা গায়ে মেখে নিল। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ফিরিয়েই যখন দিতে হবে, তবে না হয় পুরোটা শেষ করেই দেবো। নষ্ট করে আর কি লাভ।”
পারফিউমের গাঢ় কোরাল সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই অবাধ্যভাবে সুহিনের চোখ দুটো বুজে এল। নিমিষেই নাসিকারন্ধ্র বেয়ে সেই পরিচিত সুগন্ধি তার মস্তিস্কে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করল; অবচেতনেই সে নিজের খুব কাছে, একদম মুখোমুখি কেকের উপস্থিতি টের পেল। ঠিক যেন এক মায়াবী বিভ্রম!
​পরমুহূর্তেই একরাশ তীব্র বিরক্তিতে চোখ মেলে তাকাল সুহিন। মাথা ঝাকিয়ে সেই আচ্ছন্নতা কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিল।যথারীতি আংটিটা নিজের বা হাতের অনামিকায় পড়ে নিয়ে, পারফিউমটাও সাথে নিয়ে নিল। ভেজা চুলগুলো কোনোমতে শুকিয়ে নিয়ে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল।
এই মুহূর্তে ট্রেনে মিলান পৌঁছাতে প্রায় ঘণ্টা তিনেকের মতো সময় লেগে যাবে। সেই হিসেবে সন্ধ্যারাতের মধ্যেই হয়তো সেখানে পৌঁছে যাবে; আর কাজ মিটিয়ে বড়জোর রাত এগারোটা-বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। ব্যাপার না! সারাটাজীবন তো অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়েই চলতে হলো, এবার অন্তত এইটুকু কাজ আজ একাই করা যাক।
সুহিন মিলানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে, ট্রেনে ওঠা মাত্রই প্রথমে নিমরাকে মেসেজ করল। কিছুক্ষণ পরই নিমরা রিপ্লাই করতে শুরু করল,

সুহিন___”তুই ফিরবি কখন?”
নিমরা___”এইতো বিকেলের দিকে। একা একা বোর হচ্ছিস? চিন্তা করিস না, আরেকটু পরই আমি চলে আসছি।”
___”আরহাম ভাইও তোর সাথে আসবে?”
___”না, ভাই আজ না-ও ফিরতে পারে। ল্যাবে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ আছে ওর। তারপর হয়তো কোথায় একটা যাবে বলল। সিওর না। আসতেও পারে। কেনো বলতো? ভাইকে দরকার?”
___”না, না, তেমন কিছু না। আমায় একটা সাহায্য করতে পারবি?”
___”কি?”
___”আমি মিলানে যাচ্ছি। তুই একটু আরহাম ভাইকে ম্যানেজ করে নিস প্লিজ।”
___”মানে?মানে? মিলানে…একা একা তুই…কি প্রয়োজনে?”
___”আরহাম ভাই তোকে কিছু বলেনি?”
___”কোন বিষয়ে?”
___”আমরা যে মিলানে গিয়েছিলাম, তখন কেকে-র সাথে আমাদের দেখা হলো…এসব নিয়ে কিছু বলেনি তোকে?”

___”ঐ, ভাই কি এটা জানে? তুই না বললি, এসব কথা পড়ে বলবি,তাহলে?”
___”না মানে, গতরাতে আমি ঐ বিষয়টা ওনাকে বলে ফেলেছি।”, সুহিন কিছুটা ইতস্তত হয়ে টাইপ করল। তৎক্ষনাৎ নিমরার প্রত্যুত্তর এলো,
___”ওহ শি*! এইজন্যই সকাল সকাল বান্দা আমার সাথে এতো মেজাজ দেখাল। ইচ্ছে তো করছে তোকে আমি…!”
___”প্লিজ রাগ করিস না, এখন আমায় হেল্প কর, নয়তো ঝামেলা বেঁধে যাবে।”
___”আমি কি হেল্প করব? ভাই কি তোকে মিলানে যেতে নিষেধ করেছে?”
___”হ্যাঁ!”
___”তাহলে যাচ্ছিস কেন গাধা! কিছু হয়ে গেলে তোকে তো কিছু বলবে না, সব আমার উপর দিয়ে ঝাড়বে।”
___”আরে আরে শোন না, কোনো কিছু হবে না আমার। আমি আজই ফিরে আসব। আর তুই যেহেতু বললি আরহাম ভাই আজ ফিরবে না তাহলে ওনাকে কিছু বলারই প্রয়োজন নেই। তাহলেই হবে।”

___”কিন্তু তুই হঠাৎ মিলানে যাচ্ছিস কিসের জন্য?”
___”উনি যেতে বলেছেন। ডিভোর্সের ব্যাপারে লয়ারের সাথে সরাসরি আলোচনা করতে।… নিমরা তুই তো জানিস, আমি গত একটা বছর ধরে এই অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে চাইছি। ওদিকে উনিও এবার সবকিছু মিটিয়ে ফেলতে চাচ্ছে। কিন্তু আরহাম ভাই আমায় একা ছাড়তে নারাজ।”
তীব্র গতিতে ট্রেন ছুটছে; আর সুহিন ভেবে চলেছে নিমরা এবার কি বলে। সে চুপটি করে সিটে গুটিয়ে বসে থেকে তার উত্তরের অপেক্ষায় রইল। কিছুক্ষণের মাঝেই রিপ্লাই এলো,
___”ঠিক আছে, আমি হ্যান্ডেল করে নেবো। সাবধানে যাস। আর বেশি রাত হলে একা ফেরার দরকার নেই, ওনাদের কাউকে বলিস তোর সাথে কাউকে পাঠিয়ে দিতে নয়তো ওখানেই থেকে যাস। রোজি মেয়েটা খারাপ না। দেখ, যতদ্রুত পারিস ঝামেলা মিটিয়ে ফেল।”
সুহিন তৎক্ষনাৎ খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল। দ্রুতগতিতে টাইপ করল,
___”থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ,থ্যাংক ইউ সো মাচ।”
___”ইট’স ওকে, সাবধানে যাস। রাস্তাঘাটে দেখে চলিস, গাড়ি-ঘোড়ার সাথে উল্টে পরিস না যেন। নয়তো তোর আরহাম ভাই আমায় উল্টো করে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে।”

মিলানে সবচেয়ে এলিট ক্লাস এরিয়ার ব্ল্যাকভেইন এস্টেট নামক বিশাল বড় বাড়িটার সীমানায়, বোকা রমণীর পৌঁছাতে পৌঁছাতেই রাত আটটা ছুঁইছুঁই হলো। এতটা বিলম্ব হয়ে যাবে তা সে নিজেও ভাবতে পারেনি। এদিকে প্রকৃতির রূপও ক্রমশ থমথমে হয়ে উঠছে। মাথার ওপর মস্ত বড় একখানা চাঁদ জেগে থাকলেও, একদল অবাধ্য কালচে মেঘ এসে তাকে গ্রাস করতে চাইছে। চারপাশ কাঁপিয়ে বয়ে যাচ্ছে উত্তাল, ঝোড়ো শীতল হাওয়া।
​সুহিন আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সেই বিশাল রাজকীয় অট্টালিকার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে খেয়াল করল, এস্টেটের আশেপাশে কোথাও কোনো মানুষের কোলাহল নেই। আসলে পুরো শহরের মাঝে এই অঞ্চলটাই বড় অদ্ভুত। যত বেশি এর জৌলুস ও বিলাসিতা, ঠিক ততটাই এর গাম্ভীর্য। চারধারে কেমন যেন এক নিস্তব্ধ, ভুতুড়ে এবং শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
​সুহিন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে ভেতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু বাড়ির বিশাল ফটকের কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েও কারোর দেখা মিলল না। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আটকে গেল কিছুটা দূরে, ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় ঘেরা এক নির্জন উদ্যানের দিকে। সেখানে একটি সাদা কাঠের বেঞ্চে কেউ একজন দু-হাত দু-পাশে ছড়িয়ে গা এলিয়ে বসে আছে। মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে সে এক করুণ সুর তুলেছে বাতাসে। চারপাশের ঝোড়ো হাওয়াকে সাক্ষী রেখে, আকাশের পানে চেয়ে সেই ব্যক্তি বিষাদমাখা কণ্ঠে গাইছে,

​”কোই শাম বুলায়ে,
কোই দাম লাগায়ে,
ম্যায় ভি উপর সে হাস্তি,
পার আন্দর সে হায়ে…
কিউঁ দার্দ ছুপায়ে বৈঠী হ্যায়…
কিউঁ তু মুঝসে ক্যাহতি হ্যায়,
ম্যায় তো খুদ হি বিখরা হুয়া..”
কণ্ঠস্বর থেমে গেল। বাতাসের শো শো শব্দে চারপাশে ছেয়ে গেল। সেই ঝোড়ো হাওয়াকে ছিন্ন করে আবারও মানবের কন্ঠস্বর হতে নির্গত হলো,
“হায়েএএএ আন্দার আন্দার সে টুটা ম্যায়য়য়..
তেরে ইশক মে খুদ হী সে রূঠা… ম্যায়য়য়!”
​কন্ঠ শুনে সুহিনের বুঝতে আর বাকি রইল না যে এই ব্যক্তিটি আসলে কে। উদ্যানের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি চকচকে নিকষ কালো ফেরারি। লোকটির পেছন ফিরে বসার কারণে মুখাবয়ব স্পষ্ট না হলেও, তার সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর সুহিনকে বিভ্রান্ত করল না। কিন্তু এত করুণ আর আকুল সুরে কেকে-কে হয়তো সে কখনো গাইতেও শোনেনি।

​এই জনমানবহীন নিস্তব্ধতায় কেকে কেন একা বসে আছে? চারধারে এমন বৈরী হাওয়া বইছে; অথচ সে কেমন যেন প্রচন্ড নির্বিকার, উদাসীন। তবে কি সে সুহিনের জন্যই অপেক্ষা করছিল? হয়তো তাই, তাকে সন্ধ্যায় আসার কথা বলা হয়েছিল অথচ সে এসে পৌঁছেছে প্রায় রাত আটটায়।
​পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সুহিন এক নতুন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছে, এখন কাজ শেষ হতে যদি আরও বেশি রাত হয়ে যায়, তবে সে বাড়ি ফিরবে কী করে? আর এখানে থেকে যাওয়া মানে, এই খ্যাপাটে লোকটার কিছু ত্যাড়া কথা শোনা। এমনিতেও দেরি করে আসায়, এখন কেকে’র সামনে গেলেই যে নিশ্চিত কিছু ত্যাড়া কথা শুনতে হবে, তা বলাই বাহুল্য। মনে মনে সে আওড়াল—”কী এক মুসিবত রে বাবা!”
তবুও সুহিন বুক বেঁধে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। অন্ধকারে তার হাতের হীরের আংটিটি জ্বলজ্বল করছে, আর বা-হাতের মুঠোয় সে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে সেই পারফিউমের ফ্লাকন। একরাশ দ্বিধা আর সংকোচ বুকে চেপে সে ধীরে ধীরে কেকের প্রায় গা ঘেঁষে পাশে এসে দাঁড়াল। অতঃপর কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকল,
​”শুনছেন!”

​কেকের হাতে তার চিরচেনা একখান মেটালিক লাইটার; বুড়ো আঙুলের ডগায় সেটির ফ্লিন্ট হুইল ঘুরিয়ে আগুন জ্বালিয়ে-নিভিয়ে এক অদ্ভুত, উদাসীন বন্য খেলায় মত্ত ছিল সে। কিন্তু হঠাৎ চেনা নারী কণ্ঠস্বর কানে আসতেই তার হাতের নড়াচড়া স্তব্ধ হয়ে গেল। মন্থর গতিতে মুখ ফিরিয়ে সে সুহিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। কেকের কাঁধ ছোঁয়া সেই নিকষ কালো চুল, আর তার আড়ালে ঢেকে থাকা গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে সুহিন মুহূর্তেই ঘাবড়ে গেল। দুই পা পিছিয়ে যেতে নিয়েও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল সে। কেন জানি না, এই লোকটার চোখের দিকে তাকালেই এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা ভীতু রমণীকে গ্রাস করে; সে কিছুতেই আর চোখ মিলিয়ে স্থির থাকতে পারে না।
​পরিস্থিতি সামাল দিতে সুহিন আবারও ইতস্তত করে বলল,

“আ…আপনি, আপনি আসতে বলেছিলেন।”
​সুহিন মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিল—দেরি করে আসার অপরাধে লোকটা এবার নিশ্চিত একগাদা ত্যাড়া কথা শুনিয়ে দেবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেকে তেমন কিছুই করল না। এমনকি কোনো বাক্যব্যয় পর্যন্ত করল না। সে সুহিনের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আবার সেই মেঘাচ্ছন্ন বিস্তীর্ণ আকাশের দিকে তাকাল। আজকের আবহাওয়াটা সত্যিই বড় বিচিত্র; আকাশে মস্ত বড় এক চাঁদ জোছনা ছড়াচ্ছে, একইসাথে আবার যেকোনো মুহূর্তে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি নামবে—তারই পূর্বাভাস চারধারে।
​হঠাৎ করেই কেকে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সুহিনের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“গাড়িতে চল, আকাশের অবস্থা ভালো না।”
​তার এমন আকস্মিক কথায় সুহিন কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, বাড়িতে ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলতে লয়ার…”
​সুহিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই কেকে নিজের মতো করে গাড়ির দিকে পা বাড়াল। না থেমেই অবিন্যস্ত, ভারি গুরুগম্ভীর গলায় আদেশ ছুঁড়ল,
“সাথে আসতে বলেছি।”
​বলেই সে সামনে এগিয়ে চলল। সুহিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ সেই নির্জন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে রইল। মনের ভেতর হাজারটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর কুয়াশা জমলেও এই মুহূর্তে আর কোনো উপায়ন্তর ছিল না। অগত্যা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে কেকের পেছন পেছন সেই কুচকুচে কালো ফেরারিটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

ফেরারির ভেতর এক থমথমে, জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা। সচল এসির হিমশীতল হাওয়ায় ভর করে কোরালের স্নিগ্ধ পরিচিত সুগন্ধি চারপাশের বাতাসে ডানা মেলছে। সুহিন কেকের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে জড়সড় হয়ে বসে আছে। অন্যদিকে কেকে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে ব্যাকসিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নিজের মতো নিস্পৃহ হয়ে রয়েছে।

​তার এই রহস্যময় নীরবতা সুহিনের ভেতরের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুহাতের মুঠোয় থাকা পারফিউম ফ্লাকনটা সে শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। দৃষ্টি নিচের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও, সে আড়চোখে বারবার কেকে-কে পরখ করে নিচ্ছে। এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এবার সুহিন গভীরভাবে লক্ষ্য করল, কেকের হাবভাব আজ স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি গম্ভীর আর অদ্ভুত। পরনে তার নিকষ কালো টি-শার্ট, তার ওপর চাপানো কালো লেদার জ্যাকেট; আর কবজিতে জড়ানো চিরচেনা সেই ব্রেইডেড ব্রেসলেট।
নতুন করে বর্ণনা করার আর কিছুই নেই—যেন এক অন্ধকার সত্তার প্রতিমূর্তি হয়ে সে বসে আছে। সে সুহিনের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, কোনো কথাও বলছে না। ওদিকে সময়ের চাকা তার নিজস্ব গতিতে ঘুরে চলেছে। সুহিনের মনে ক্ষণে ক্ষণে কাঁটা দিচ্ছে একটাই চিন্তা—তাকে তো আজই বাড়ি ফিরতে হবে।
​এই থমথমে পরিবেশ ভাঙতে এবং কথার সূত্রপাত করতে সুহিন কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। হঠাৎ করেই তার নজর পড়ল নিজের বাঁ হাতের অনামিকার দিকে। হীরের আংটিটার দিকে কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকার পর, এক ঝটকায় সে সেটি আঙুল থেকে খুলে ফেলল। আংটিটা হাত থেকে আলাদা করার সময় তার মনে কোনো ভয় নয় বরং নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার মতো অজানা তীব্র এক খারাপ লাগা অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
​তবুও সে নিজেকে শক্ত করল। কাঁপা কাঁপা হাতে আংটিটা কেকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব মৃদু স্বরে বলল,
​”নিন, এটা রাখুন।”

কেকে তৎক্ষণাৎ চোখ মেলল না। তবে তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। বেশ কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরলয়ে চোখ খুলে, রমণীর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ওপর দৃষ্টি স্থির করল। অন্ধকারেও হীরেটা ঝকমক করছে; এবং সরাসরি গিয়ে যেন বিঁধছে কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।
কেকে শিরদাঁড়া টানটান করে, সোজা হয়ে বসে গুরুগম্ভীর শীতল গলায় বলল,
​”এটার মানে কী?”
—“এটার মানে, যার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দেওয়া!”
সুহিন নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব দৃঢ় রাখার চেষ্টা করল,
“আমার পক্ষে এটা আর নিজের কাছে রাখা সম্ভব নয়। এমনিতেও জিনিসটা অনেক দামী। আমার থেকে আপনার কাছেই এটি অনেক বেশি নিরাপদে থাকবে।”
​কেকে এক পলক আংটিটার দিকে তাকিয়ে আবার সুহিনের নীলচোখ দুটোর দিকে তাকাল। তার চোখের কৃষ্ণগহ্বরের ন্যায় গভীর দৃষ্টি সুহিনকে স্তব্ধ করে দিল। কেকে সামান্য বাঁকা হাসল; একরাশ তাচ্ছিল্য নিয়ে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কেকে বলল,

​”ফিরিয়ে দিচ্ছিস? নাকি নিজের অতীতটাকে এক ঝটকায় মুছে ফেলার সস্তা চেষ্টা করছিস, কোনটা?”
​সুহিন এবার কেকের দিকে সরাসরি তাকাল। তার বুকটা ধক করে উঠলেও সে দমে গেল না। বলল,
“অতীত মোছার চেষ্টা নয়। আমি শুধু আমাদের এই জোরপূর্বক জড়ানো সম্পর্কটার একটা সুরাহা চাই। আপনিই তো লয়ারের সাথে কথা বলতে ডেকেছিলেন, তবে এখন লয়ার কোথায়? আর আমরা এভাবে গাড়িতে বসে আছি কেন?”
​কেকে কোনো উত্তর দিল না। সে সুহিনের হাত থেকে আংটিটা একপ্রকার কেড়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে নিয়ে নিল। অতঃপর আবার আগের মতো ব্যাকসিটে গা এলিয়ে হেলান দিয়ে বসল; দৃষ্টির সম্মূখে আংটিটা ধরে একনাগাড়ে দেখতে থাকল।
খানিকক্ষণ বাদে কেকে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল,

“একে তো দেরি করে এসেছিস তার উপর আবার তেজ দেখাচ্ছিস! এনিওয়ে, লয়ারের সাথে কথা হয়েছে আমার। নেক্সট উইকে অফিশিয়ালি আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে।”
তার কথা শুনে সুহিন দমে গেল। যা একটু জেদ জমিয়ে নিয়ে এসেছিল, তার সবটাই যেন হাওয়ায় মিশিয়ে গেল। মানে তার আসার আগেই বান্দা নিজেই সবটা মিটিয়ে নিয়েছে? সে যাই হোক, এর মানে তো এটাই যে তার আর আজকে কোনো প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে এখনই রোমের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়াই ভালো।
পিনপতন রুদ্ধশ্বাস নীরাবতাকে চিঁড়ে সুহিন বলল,

—“তবে…আগামী সপ্তাহেও তো আমায় আসতে হবে, তাই না?”
—“হু, হয়তো।” কেকের সোজাসাপ্টা জবাব। সুহিন কেনো যেন ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠল। সে আর এখানে স্থির থাকতে পারবে না। ভারী দীর্ঘ শ্বাস টেনে আওড়াল,
“তাহলে আর কি, আমি না হয় এবার আসছি!”
—“হু! তবে তার আগে আমার কিছু হিসাব মেটানো বাকি আছে।”
সুহিন উঠতে গিয়েও থমকে গেল। শঙ্কিত গলায় প্রশ্ন করল,
​”কীসের হিসাব?”
​কেকে মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। বাহিরে ঝড়ো হাওয়ার উন্মাদনা অনেকটাই বেড়েছে। সে সুহিনের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল,
“আজকের রাতটা অনেক দীর্ঘ হতে চলেছে। এত তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। বাড়ি ফেরার ট্রেনটা বোধহয় আজ তোর মিস হয়ে যাবে।”

কেকের শেষ কথাটি সুহিনের কানে পৌঁছানো মাত্রই তার বুকের ভেতরটা যেন হিম হয়ে গেল। সে চকিতে কেকের দিকে তাকাল, কিন্তু কেকে তখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
সুহিন অস্থির হয়ে সিটের ওপর নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠস্বরে এবার স্পষ্ট ভীতি ও বিস্ময় প্রকাশ পেল,
“মানে কী? আপনি কি বলতে চাইছেন যে আমি আজ বাড়ি ফিরতে পারব না?”
কেকে একটুও নড়ল না। সুহিনের এই আকুলতা যেন তাকে স্পর্শই করল না। সে অত্যন্ত ধীরলয়ে মুখ ফিরিয়ে সুহিনের দিকে তাকাল। গাড়ির ভেতরের আবছা আলোয় তার চোখের মণি দুটো যেন বন্য শিকারির চোখের মতো জ্বলজ্বল করছে। সে জ্যাকেটের পকেট থেকে তার সেই মেটালিক লাইটারটি বের করে আবারও বুড়ো আঙুলের ডগায় সেটির আগুন নিয়ে বন্য খেলায় মত্ত হলো। আগুনের মৃদু আলোয় তার গম্ভীর মুখাবয়ব আরও বেশি রহস্যময় দেখাল।

সুহিন মূলত তার এইসব কার্যকলাপ দেখেই বেশি ভীত হয়। নিমিষেই যেন সবকিছুই তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে থাকে। সুহিন কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু বলতে উদ্যত হয়। কিন্তু তার পূর্বেই কেকে নিস্পৃহে বলে উঠল,
“আমাকে কি তোর, আর কিছুই ফিরিয়ে দেবার নেই?”
কেকের দৃষ্টি তার লাইটারের দিকে নিবদ্ধ। সুহিত দ্বিধান্বিত হলো তার কথা শুনে। কেকে তার কাছে আর কি চাইছে? এরিমধ্যে তার নজর পড়ল নিজের হাতের দিকে। ওহ্ হ্যাঁ, এটা তো এখনো দেওয়া হয়নি।
সুহিন পারফিউমের ফ্লাকনটা কেকের দিকে এগিয়ে দিল। ক্ষীণ স্বরে মিনমিন করে বলল,
“এই নিন!”
লাইটারের থমথমে শব্দ হুট করেই স্তিমিত হলো। কেকে ভ্রু কুঁচকে পাশে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
—‘কি এটা?’

কেকের সোজাসাপ্টা জিজ্ঞাসা। সুহিন কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে আওড়াল,
‘আপনার পারফিউম! আমার কাছে ছিল।”
—“এটা তোর কাছে গেল কি করে? আমি তো দেইনি।”
সুহিন এই পর্যায়ে ভড়কে গেল।আঁড়চোখে পাশে তাকাতেই, কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকে বিদ্ধ হলো। সুহিন অস্ফুটস্বরে আওড়াল,
“আমি ভুলে নিজের কাছে…আ…মানে, বাড়িতে ছিল, আমি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম।”
সুহিন একটু থামল। কিছুটা সময় নিয়ে আবারও বলল,
“এই পারফিউমটা ছাড়া আপনার আর কোনো কিছুই বোধহয় আমার কাছে নেই।”
কেকে পারফিউমের ফ্লাকনটা নির্লিপ্ততার সাথে দুবার উল্টেপাল্টে দেখে নিল। ক্লোরাল ফ্র্যাগ্রান্সের টম ফোর্ড ব্ল্যাক এডিশনের Fu*king Fabulous সে বহুবছর আগে থেকেই ব্যবহার করে আসছে। যার জন্য একটা পারফিউমের হিসেব হয়তো সে আলাদাভাবে কখনো রাখেনি; কিন্তু এখন তা সে করছে।
খেয়াল করে দেখল, পারফিউমের অধিকাংশই প্রায় শেষ। বলতে গেলে এখন এটা পুরোটাই খালি। অথচ দেশে যাওয়ার সময় তার সব এক্সেসারিসই ছিল একদম নতুন। আর তার যতদূর মনে আছে, সে দেশে খুব একটা পারফিউম ব্যবহার করার সুযোগও পায়নি। তবে এটা শেষ হলো কি করে?
কেকে পারফিউমটা নেড়েচেড়ে সুহিনের উদ্দেশ্যে বলল,

“তা এটা দিয়ে কি সব দেনাপাওনা শোধ করে নিচ্ছেন?…যদিও এটা সম্পূর্ণ খালি মনে হচ্ছে।”
সুহিন হকচকিয়ে গেল তার কথায়। এখন সে কি বলবে?মাঝরাতে আনমনা হয়ে, যখন পুরোনো স্মৃতিগুলো তাকে তাড়া করত—তখন প্রায়শই সে এই পারফিউম নিজের গায়ে মেখে নিয়ে কেকের কাল্পনিক অস্তিত্ব অনুভব করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু এখন কি আর এসব কথা ওনাকে বলা যাবে?
সুহিন ইতস্তত ভঙ্গিতে তড়িঘড়ি করে আওড়াল,
“আমায় যেতে হবে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। আকাশের অবস্থাও ভালো না।”
কেকে মাথা নুইয়ে ক্ষীণ দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। সুহিন তার দিকে ফিরে, অস্ফুটে বলল,
“আসছি তবে! ভালো থাকবেন…!”
সুহিন এই বলেই গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার উপক্রম করল, কিন্তু হুট করেই কেকে এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। সুহিনের দিকে না ফিরে থাকা অবস্থাতেই, সে হঠাৎ রমণীর কচি হাতখানা সিটের উপর শক্ত করে চেপে ধরল। হাতে টান পড়তেই সুহিন মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। কেকের ভাবভঙ্গি রহস্যময় ও নির্লিপ্ত। অকস্মাৎ সে গুরুগম্ভীর হাস্কি স্বরে, ধীরস্থিরে ডেকে উঠল,

“হানি!”
কেকে মুখ তুলে সুহিনের দিকে ফিরে চায়।সেই অতি পরিচিত মায়াবী সম্বোধনটি কানে আসতেই সুহিনের সারা শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। কত দিন, কত দীর্ঘ মাস পর সে এই চেনা কণ্ঠস্বরে এই ডাকটি শুনল! তার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
কেকের সেই চিরচেনা শান্ত-শীতল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, শক্ত চোয়াল, এলোমেলো চুলগুলো কাঁধ অব্দি ছুঁয়েছে; সবমিলিয়ে বিধ্বংসী প্রলয়ঙ্কারী এক বন্য পৌরুষ রূপ। সেসব অবচেতন মনে পরখ করে সুহিন অচিরেই শুষ্ক ঢোক গিলল। না বলা হাজারো কথা চাপা পড়া ঐ রহস্যময় তীক্ষ্ণ-শীতল শিকারী চোখ দুটোতে চোখ মেলাতেই যেন তার শরীর ক্রমশই অবশ হয়ে আসে।
সুহিন কিছু বলার চেষ্টা করল,কিন্তু কাজ হলো না। বাহিরে তীব্র ঝড়ো হাওয়া বইছে; ঝলসানো চাঁদকে ক্রমশই আড়াল করতে চাইছে অন্ধকারে ঘেরা মেঘগুলো। সবকিছু ছাড়িয়ে দুর্বার এক ঝড় তান্ডব তুলেছে রমণীর নাজুক অন্তরালে। জনমানবশূন্য এক ফাঁকা রাস্তায় কেকে’র নিকষকালো ফেরারি’তে কেবল তারা দুজন; ক্লোরালের সুগন্ধ পুরো ফেরারি’তে ছড়িয়ে আছে। সময় যত গড়াচ্ছে দমবন্ধকর নিস্তব্ধতা ততই যেন বাড়ছে। অজানা এক সংশয়ে সুহিনের কেনো যেন কান্না পেয়ে গেল।
ততক্ষণে বোকা রমণীকে সম্পূর্ণ ঘায়েল করে দিতে, কেকে হঠাৎ ভগ্নস্বরে ধীরস্থিরে একটি গানের তিনটে পঙক্তি গেয়ে উঠল,

❝___হালকা হাওয়ার মতন,
চাইছি এসো এখন____
___করছে তোমায় দেখে,
অল্প বেইমানী মন____
___বাঁধবো তোমার সাথে
আমি আমার জীবন____❞
সুহিনের পুরো সত্তা যেন কেঁপে উঠল। বিস্ময়ে খানিকটা হতভম্বও হলো সে। তার সকল ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে—আর বেশিক্ষণ এখানে থাকলে, জীবনের সব চাইতে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে যাবে।
সুহিন তীব্র এক সংশয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বাচ্চাদের মতো করে ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠল,
“আমি বাড়ি যাবো!”
কেকে তার কথায় ক্ষীণ তির্যক হাসল। সুহিনের থেকে নজর ফিরিয়ে নিল; তবে তার হাত ছাড়ল না। বরং ব্যাকসিটে গা এলিয়ে দিয়ে, চুইংগাম চিবোনোর ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে চাপা স্বরে আওড়াল,
“গাধা!”

সুহিন হয়তো তার এই বিশেষ সম্মোধনটুকু শুনতে পেল না। অবশ্য শুনলেও বেশি কিছু করতে পারত না সে।
এরিমধ্যে হুট করে আকাশে বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। সুহিন অচিরেই কেকের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই, কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। বাহিরের তীব্র ঝড়ো হাওয়ার তান্ডব, ভেতরের এই পরিস্থিতিক উত্তেজনাকে মোটেও ছুঁতে পারছে না। সুহিনের ধ্যানজ্ঞান সব তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।
সুহিন মাথা নুইয়ে,কেকের কব্জা থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। ব্যর্থ হয়ে পুনরায় ঠোঁট উল্টে ভীতু স্বরে আওড়াল,
“হা… হাত ছাড়ুন…”
—“আর যদি না ছাড়ি?”
সিটে গা এলিয়ে নির্বিকারে বসে থাকা কেকে, অকপটে আওড়াল।
—“আ…আপনি পাগলামি করছেন।”
কেকে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে ক্ষীণ হাসল। বলল,
“পাগলামি করার সুযোগটাই বা দিলি কই?”
সুহিনের কন্ঠনালী শুকিয়ে চৌচির হলো। তার অবস্থা বেগতিক দেখে, কেকে থেমে ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
“হানি, আর ইউ স্কেয়ার্ড?”
সুহিন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“আমি, বাড়ি যাবো।”

—“হুম!”
—“এক্ষুনি যাবো।”
—“হুম!”, আবারও একই নির্লিপ্ততায় আওড়াল কেকে। সুহিন আর নিজেকে সামলাতে পারল; কেকের ভাবগতিক যে স্বাভাবিক নয় এটা তো স্পষ্ট। এই ভণিতা, নির্লিপ্ততা সবই তার প্রমাণ।
—“হাত ছাড়ুন আমার। চলে যাবো আমি!”
খানিকটা রুক্ষতার সাথে জোর গলায় বলে ফেলল রমণী। অথচ তার নীলচে চোখদুটো ছলছলে জলে ভরে উঠেছে।
এইবার কেকে তার দিকে মুখ ফেরাল। অদ্ভুত সেই তীক্ষ্ণ গম্ভীর চাহুনি। সুহিন শিউরে উঠল তাতে। বান্দার ভাবগতিক সত্যিই ঠিক নেই। আগে জানলে জীবনেও এই অসময়ে আসতো না সে।
কেকে সুহিনের কবজিটা নিজের মুঠোর ভেতর আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল। সুহিন মুক্তি পাওয়ার ব্যাকুলতায় বারংবার উসখুস করতে লাগল। এক সময় শুষ্ক ঢোক গিলে অবরুদ্ধ গলায় বলল,
“এখন কেনো এসব পাগলামি করছেন? দুদিন বাদে তো আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে, তাই না?”
কেকে তার এই প্রশ্নের কোনো প্রত্যুত্তর দিল না; কেবল এক ভারী, তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করল। পরমুহূর্তেই সে সুহিনের দিকে কিঞ্চিৎ ঘুরে বসে তার ওপর বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে পড়ল। নিজের একটি হাত সুহিনের কাঁধের পাশে সিটের ওপর ঠেকিয়ে, অন্য হাতের আঙুলের ডগা দিয়ে সে রমণীর আলগা খোঁপাটা এক টানে খুলে ফেলল। একই সাথে সুহিনের চুলে থাকা কালো ইলাস্টিক গার্ডারটিও সে নিজের আঙুল দিয়ে টেনে খুলে নিয়ে, এক লহমায় তা নিজের বাঁ হাতের ব্রেইডেড ব্রেসলেটের পাশে পরে নিল।অবাধ্য বাদামি চুলগুলো এক নিমিষে সুহিনের পিঠ ও কাঁধে ছড়িয়ে পড়ল।

​নিজের এত সন্নিকটে কেকের এই অতর্কিত সংস্পর্শ পেয়ে সুহিন চরম জড়তায় আড়ষ্ট হয়ে নিজের মাঝেই কুঁকড়ে গেল। এক লহমায় ভয়ে ও সংকোচে চোখ-মুখ খিঁচে নিল। তার হৃৎস্পন্দন তখন কোনো বুনো ঘোড়ার ন্যায় অবাধ্য গতিতে ছুটছে। বন্ধ আখিঁদ্বয়, সংশয়ে শুকিয়েছে ছোট্ট মুখখানা,চশমাটাও বেখেয়ালিতে নাকের ডগায় নেমে এসেছে। কোমল ওষ্ঠদ্বয় অনবরত কাঁপছে।
কেকে তার এরূপ দশায় মন-অজান্তেই নিঃশব্দে তির্যক হাসল। রমণীর দিকে আরেকটু ঝুঁকে পড়ল। দুজনের তপ্ত নিশ্বাস মিলেমিশে একাকার হলো। নিজস্ব সহজাত গাম্ভীর্যের সাথে নির্লিপ্ততা মিশিয়ে কেকে হাস্কিটোনে ফিসফিস করে আওড়াল,
❝Love is a fairytale, but obsession is a war. And Wifey, I’ve never lost a battle.❞
(লাভ ইজ আ ফেয়ারিটেইল, বাট অবসেশন ইজ আ ওয়ার। অ্যান্ড ওয়াইফি, আই হ্যাভ নেভার লস্ট আ ব্যাটেল।)
বন্য পুরুষের লোমহর্ষক কন্ঠস্বরে সুহিন শিউরে উঠে নিজের চোখদুটো মেলে তাকাল। তবে অস্থিরতায় সে বুঝতে পারল না কেকে আদতে কি বলল। সুহিন তার কথার অর্থ বুঝে ওঠার আগেই, কেকে অকস্মাৎ এক অভাবনীয় কান্ড করে বসল।
একটানে ত্বন্বী রমণীর লতানো কোমড়টা হাতের কৌশলে পেঁচিয়ে ধরল। বলা নেই, কওয়া নেই, এক ঝটকায় সে রমণীর কোমড়ে হেঁচকা টান দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। সুহিন হুমড়ি খেয়ে কেকের শক্তপোক্ত প্রশস্ত বুকের উপর আছড়ে পড়ল।
সুহিনের সারাশরীর অনবরত কাঁপছে। গলা শুঁকিয়ে চৌচির হয়েছে। তার হাতদুটো গিয়ে ঠেকেছে কেকের ঘাড় আর বুকের বা-পাশে। রমণীর একরাশ লম্বা বাদামী চুলগুলো ছড়িয়ে গিয়ে দুজনকে একত্রে আঁকড়ে ধরেছে যেন।
এরিমধ্যে কেকে সুহিনের পা-দুটো নিজের দিকে টেনে নিল। সুহিনকে নিজের উরুতে জোরালো ভাবে বসিয়ে, ফেরারির ব্যাক-সিটে গা এলিয়ে দিল কেকে। নাজুক রমণী সংশয়ে নুইয়ে পড়তেই,কেকে তির্যক হেসে ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ভগ্নকন্ঠে গেয়ে উঠল,

❝___চাইলে আশকারা পাক,
বেঁচে থাকার কারণ_____
____আজকে হাতছাড়া যাক,
ব্যস্ততার বারণ___উমমম।
_____লিখব তোমার হাতে
আমি আমার মরণ_____❞
ওষ্ঠদ্বয় নড়ছে গানের সুরে। অথচ কেকের হাত দুটো বিচরণ করছে নাজুর রমণীর কোমড় হতে পিঠ, কিংবা লতানো গাঢ় বাদামী চুলের গোছে।
প্রতিবার উদর হতে কোমড় কিংবা পিঠ অব্দি কেকের এই অযাচিত বিচরণ কিংবা স্পর্শে রমণী শিউরে শিউরে উঠছে। কাঁপা কাঁপা হাতে কেকের কালো লেদার জ্যাকেটটার বুকের অংশ শক্ত হাতে খিঁচে, চেপে ধরল সে। ততক্ষণে কেকে নিজের মুখ বাড়িয়ে ঝুকে পড়েছে নুইয়ে পড়া রমণীর দিকে। অদ্ভুত এক সম্মোহনে সে সুহিনে একগোছা লতানো চুল নিজের আঙ্গুলের ডগায় পেঁচিয়ে নিল; পরক্ষণেই তা স্পর্শ করালো নিজের নাসারন্ধ্রে। সহজাত গাম্ভীর্যের মাঝেও রমণীর চুলের আবেশিত উন্মাদনায় মত্ত হলো সে।
সুহিন বুঝতে পারে না, প্রতিবার কেকে তার এই চুলের মাঝে কি খুঁজে পায়। যখনই তাকে হাতের নাগালে পায় তখনই তার এই বাদামী চুলের নেশায় মত্ত হয়ে যায়। অনবরত শুঁকতে থাকে তার এখই লতানো চুল; খানিকটা বুনো শিকারি নেকড়ের মতোই।
সুহিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না৷ কাঁপা কাঁপা স্বরে হাঁপিয়ে উঠে বলল,

“থামুন, বন্ধ করুন এইসব৷ এটা ঠিক হচ্ছে না।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! রমণীকে সম্পূর্ণ মোহাবিষ্ট ও দিশেহারা করে দিতে কেকে তার অবাধ্য আঙুলগুলো সুহিনের বাদামী রেশমি চুলের ভেতর গলিয়ে দিল; অতঃপর অত্যন্ত ধীরলয়ে হাত ছোঁয়ালো তার সুকোমল গ্রীবা ও গলার ভাঁজে। সেই স্পর্শের তীব্র আবেশে সুহিনের চোখ দুটো বুজে এল, সে নিরূপায় হয়ে কেকের দিকে খানিকটা হেলে পড়ল; মাথাটা পেছনের দিকে এলিয়ে দিল এক লহমায়।
ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় রমণীর উন্মুক্ত গলা আর নীল-সাদা গাউনের অবিন্যস্ত কলারের ফাঁক গলে তার সরু কলার বোনটি শ্বেতশুভ্র নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল কেকের ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে।
​কেকে বন্য তৃপ্তিতে আপাদমস্তক অবলোকন করল এই অসহায় রমণীকে। এক অদ্ভুত কারণে সুহিনের এই অবশ ও ব্যাকুল অবস্থা দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বক্র হাসি ফুটে উঠল। কোনো বখাটে, উদ্ধত যুবকের মতো সরু ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে রমণীর এই অসহায় আত্মসমর্পণ উপভোগ করতে লাগল। মনে মনে নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সে ভাবল,

“এটাই কি সেই মেয়েটা না—যে পুরো পৃথিবীর কাছে অত্যন্ত সরল, অত্যন্ত বোকা! অথচ এই মেয়েটাই আজ আমার সামান্য একটু স্পর্শে কিভাবে এতো নাজেহাল হয়ে উঠছে?”
কেকে এবার সুহিনের সেই সুকোমল গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিল। নাকের ডগা আর রুক্ষ ওষ্ঠাধরের বারংবার আলতো ঘর্ষণে রমণীকে সে আরও বেশি উত্তাল করে তুলল। সুহিন বোধহয় নিজের হুঁশ-জ্ঞান হারাতে বসেছিল, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ক্রমশ অবশ হয়ে আসছিল। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ তার কানের লতিতে আলতোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে কেকে ফিসফিস করে আওড়াল,
​”ওয়াইফি! নেক্সট উইক, উই আর অফিশিয়ালি গেটিং ডিভোর্সড।”
​নিমিষেই সুহিন থমকে গেল; চোখ দুটো তৎক্ষণাৎ মেলে তাকাল। তার আচ্ছন্নতা কাটানোর জন্যই যেন কেকের এই তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ। সুহিন সচেতন হতেই অনবরত কাঁপতে লাগল। এটা সে কী করছিল? তার চোখেমুখে ভীতির ছাপ আবারও স্পষ্ট হলো। তার চেয়েও বেশি তাকে রুদ্ধশ্বাস করে তুলল কেকের এই ‘ওয়াইফি’ সম্বোধন। দীর্ঘ একটা বছর পর আবারও এই নিষ্ঠুর পুরুষের মুখে এই সম্বোধন—তা-ও কিনা তাদের আসন্ন বিচ্ছেদের কথা মনে করিয়ে দিতে!
​সুহিন কাঁপা কাঁপা স্বরে কিছু একটা বলবে, তার আগেই কেকে দৃঢ়তার সাথে তার কোমড়ে হাত পেঁচিয়ে হেঁচকা টান মেরে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্টে মিশিয়ে নিল,

Naar e Ishq part 34

​”ওয়াইফি! লেটস্ হ্যাভ সাম ফান!”
​সুহিন তার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পেরে, কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,
​”মা… মানে?”
​কেকে তৎক্ষণাৎ তার মুখটা নামিয়ে, রমণীর ওষ্ঠদ্বয়ের কাছে নিয়ে গেল। নিজের সমস্ত নির্লিপ্ত ভাবমূর্তি বজায় রেখে, অত্যন্ত গম্ভীর ও রাশভারী হাস্কিস্বরে ফিসফিস করে বলল,
“ফা-ক দ্য ফা-কিং ফা-কার, বিফোর দ্য ফা-কিং ফা-কার ফা-কস্ ইউ, বেইবি!”

Naar e Ishq part 36

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here