প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮১
সাইয়্যারা খান
তৌসিফ সকালের খাবার খেয়ে পৌষকে নিয়ে রওনা দিয়েছে ওপেড়া হাউজ দেখতে। পৌষের সেসব দিকে তেমন আগ্রহ না থাকলেও বিষদ আগ্রহ নিয়ে ও দেখছে আশেপাশের পরিবেশ। বরফে ঢাকা চারপাশ। গতরাতে তুষারপাত হয়েছিলো। পরণে থাকা জ্যাকেট গাড়িতে উঠে একটু খুলে বসেছে ও। তৌসিফ ফোনে এতক্ষণ তুহিনের সাথে কথা বলছিলো। রেগেমেগে একাকার ছেলে। সমান তালে হইচই করছে। রোপঢোপ দেখাচ্ছে বড় ভাইকে। তৌসিফ সারারাত বউ নিয়ে মজমাস্তি করে এখন আছে ফুরফুরে মেজাজে তাই তো খট করে ফোনটা রেখে দিলো। পৌষ বসা ওর বাহু ঘেঁষে। তৌসিফ ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে তাকালো পৌষের দিকে। হাই নেক একটা সুইটার পরণে পৌষের। হাত বাড়িয়ে একটু নামালো তৌসিফ। চোখে পড়লো ছোট বড় অসংখ্য লাল দাগ যেগুলো সে নিজে করেছে গতরাতে। পৌষের দৃষ্টি পুরোপুরি বাইরে। গলায় তৌসিফের হাত সে অনুভব করেছে কিছু গা শিউড়ে উঠেছে যখন খোঁচাখোঁচা দাঁড়ি যুক্ত চোয়ালটা গলায় না বলেকয়ে চলে এসেছে। ড্রাইভার বসা সামনে৷ ওরা দু’জন পেছন সিটে। পৌষ ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলো তৌসিফকে অথচ তৌসিফ সরলো না বরং মুখটা গুঁজে দিলো আরেকটুখানি। এক হাতে জড়িয়ে নিলো পৌষের কোমড়। পৌষ ওর চুল মুঠ করে ধরলো পেছন থেকে। চাপা স্বরে শাসালো,
“কি করছেন? সামনে ড্রাইভার। এটা গাড়ি।”
“চুমু খাচ্ছি। থাকুক ড্রাইভার। হোক গাড়ি।”
“ছাড়ুন বলছি! অসভ্য লোক। গলা ব্যথা আমার।”
“এজন্যই তো ব্যথা উপশম করছি।”
“সরুন৷ রাস্তায় আছি আমরা।”
হাজার বলেকয়েও লাভ হলো না। তৌসিফ দাগগুলোয় খুব যত্ন করে করে আদর দিলো। নরম ঠোঁটের আলতো স্পর্শ আর উষ্ণ নিঃশ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠলো পৌষ। বেশ খানিক সময় পর মুখ তুললো তৌসিফ। পৌষ হাফ ছেড়ে উঠতেই তার ঠোঁটে নরম স্পর্শ এলো। পৌষ ফিসফিস করে সাবধান করলো,
“এটা রাস্তা।”
“এটা অস্ট্রেলিয়া।”
গন্তব্যে পৌঁছাতে ওদের ততটা সময় লাগে নি। গায়ে জ্যাকেট জড়িয়ে পৌষ নেমে এসেছে। তৌসিফ ড্রাইভারের সাথে কিছু কথা বলে পৌষের বাহু টেনে নিলো নিজের বাহুর মাঝে। পৌষ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“এখানে তো অনেক ঠান্ডা।”
“হানি, লুক!”
শাহাদাত আঙুল তুলে ইশারা দিলো তৌসিফ। পৌষ তাকালো। পাখির পালকের মতো করে করা নিদর্শন। ওর কাছে আহামরি মনে না হলেও বিস্মিত হতে ভুললো না। চোখে লাগার মতোই সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এটা। তৌসিফ পৌষকে দেখলো। হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেই বললো,
“রাতে আরো দারুণ দেখায়।”
“আপনি আগেও দেখেছেন?”
অবাকতা কাটিয়ে প্রশ্ন করে পৌষ। তৌসিফ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝাতেই পৌষ ফের বলে ওঠে,
“সরাসরি?”
“হ্যাঁ।”
“আগেও এসেছেন এখানে?”
“ইয়েস, হানি।”
স্বীকারোক্তি দিয়ে আবার ঠোঁটে চুমু দিলো। পৌষ এবারে কপাল কুঁচকে তাকালো। রাগত্ব স্বরে বললো,
“কথায় কথায় এত চুম্মাচাম্মি কিসের?”
“হানিমুনে না আমরা?”
“এজন্য আপনি এমন করবেন? অসভ্য লোক।”
“তোমারই তো।”
দু’জনের দারুণ সময় কাটছে এখানে। পৌষ এমনিতেই চঞ্চলা তারউপর পেয়েছে এমন মুক্ত আকাশ। ঠান্ডাকে মোটেও পরোয়া করলো না ও। তৌসিফ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আড়ালে পৌষের ছবি তুলছিলো তখনই পৌষ ঘুরে তাকালো। দৌড়ে এলো তৌসিফের দিকে। তৌসিফের মাথায় তখন ঠান্ডার দরুন টুপি পরা। পৌষ ওকে চেপে ধরেই গালে ঠোঁট দাবালো। ঝুলে পড়লো প্রায় গলা জড়িয়ে। ওভাবেই সেলফি তুললো তৌসিফ। ফোন নামিয়েই বলে উঠলো,
“হোটেলে চলব?”
“এত তারাতাড়ি?”
“তুমি তো আমাকে অস্থির করে দিলে।”
পৌষ সাথে সাথে সরে গেলো। কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,
“আপনি দূরেই থাকুন।”
“বললেই হলো?”
পৌষ দৌড়ালো, পেছনে দৌড়ালো তৌসিফ।
পৌষকে হোটেলে রেখে তৌসিফ বেরিয়েছে একটু আগে। বলেই গিয়েছে হোটেল লবির ক্যাফেতেই আছে সে৷ পুরাতন এক বন্ধু আসবে, কিছু কথা আছে তার সাথে। পৌষের ঘুমে তখন চোখ ভেঙে আসছিলো। এই লোক লাঞ্চ করিয়ে ওকে ফুসলেছে অতঃপর হোটেলে এনে রোমিওগিড়ি দেখিয়েছে। রাতে আরেকবার কাছে আসতে চাইলে পৌষ ঝাটাপেটা করবে বলে ভেবে রেখেছে কিন্তু এই হোটেল রুমে বসে ঝাটাই বা পাবে কোথায়?
পৌষের ঘুম ভেঙেছে কিছুক্ষণ হলো। উঠে প্রথমে চমকে গিয়েছিলো অপরিচিত জায়গায় নিজেকে একলা দেখে। ফোন হাতে তুলেই দেখলো তুহিন কয়েকবার কল করেছে। পৌষ ব্যাক করলো আগে ওকে। রিসিভ হলো তড়িৎ বেগে।
“অ্যাঁই অ্যাঁই ফুপাতো বোন!”
“বলেন মামাতো ভাই।”
“কোথায় তোমরা? মেঝ ভাইয়া কোথায়? লজ্জা করলো না সাথে ছোট দেবড় এনে এভাবে দৌড়ে পালালে?”
“এনেছিলাম কি?”
“তো? তোমার বরই খরচ দিয়েছে টিকিটের।”
“বেশ তো। আমার বরটা কই যে গেলো?”
“গেলো মানে? কোথায় মেঝ ভাইয়া?”
পৌষ ঠোঁট উল্টালো। বললো,
“জানি না। আমি রুমে একা।”
“শয়তান মাইয়া, কাজেরই না কোন। হানিমুনে এসে বর হারিয়ে বসে আছে। বলে যায় নি?”
পৌষ হাই তুললো। জানালো,
“লবির ক্যাফেতে আছেন। বলেই গিয়েছেন।”
“কি কাজ?”
“বললো বন্ধু আসবে।”
“এখনই ওঠো তুমি। দৌড়ে যাও। হানিমুনে এসে কিসের বন্ধু?”
“আশ্চর্য! আপনি এমন করছেন কেন?”
“বলদ কোথাকার! যেতে বলেছি না?”
“পারব না।”
“আচ্ছা বলো কোন হোটেল?”
“নাম তো জানি না কিন্তু অনেক বড়।”
“বলদ। আশেপাশে কি দেখা যায়?”
“খাট, আলমারি, কাউচ…”
“ইশ রে খাড়া বলদ একটা।”
“আপনি খাড়া শয়তান একটা।”
পৌষ বিরক্ত হয়ে ফোন কাটলো। তুহিন ফোন দিলেও আর রিসিভ করলো না৷ পৌষ ফ্রেশ হয়ে এসে গায়ে শুধু সুয়েটার জড়ালো। চুল আঁচড়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। লিফট দিয়ে নিচে নামতে নামতে একবার ভাবলো বাসায় ফোন দিতে হবে। পিহা মুখিয়ে থাকে গল্প শুনতে, শ্রেয়াণের খবর নিতে হবে।
লবিতে নেমে পৌষ এদিক ওদিক তাকালো। ক্যাফেটা নজরে আসতেই হাঁটা দিলো ওইদিকে। ইশ! ভুল হয়ে গেলো একটা। রুমে থেকে সার্ভিস থেকে এক কাপ কফি খাওয়া উচিত ছিলো। টাকাটা উসুল করতে হবে? তার জামাই এর বহুত কষ্টের টাকা। এদিক ওদিক তাকিয়ে পৌষ খুঁজছে তৌসিফকে। উনি কি আবার বেরিয়ে গেলো? রুমে গিয়ে না পেলে এই লোকের মাথা না আবার ঘুরে যায়। আনমনা হয়ে খুঁজতে গিয়ে পৌষ ধাক্কা খেলো এক লোকের সাথে। মুখ তুলে তাকাতেই এক ধবধবা বিদেশি দেখলো। লোকটা নেশা করা, পৌষের তাই মনে হলো। রাগে কটমট করে তাকিয়ে বললো,
“শা’লা নেশাখোর।”
লোকটাকে একজন ওয়েটার ধরে নিয়ে গেলো হোটেলের বাইরে। পৌষের নজর হঠাৎ গিয়ে আটকালো একদম কোণায়। তৌসিফের পেছন থেকে ফট করে চিনে ফেলেছে ও। কপালে ভাজ পড়লো একইসাথে। সাথে একজন মহিলা বসা। পৌষ অবুঝ চোখে তাকিয়ে ওদের দেখছিলো তখনই ওর ঠান্ডা মাথা গরম করে দিতে মহিলাটা তৌসিফের বাহু জড়িয়ে ধরলো। ধরলো তো ধরলো মাথাটাও ঠেকিয়ে দিলো ঐ বাহুতে। এক সেকেন্ড! নাকি মাইক্রো সেকেন্ড? পৌষের বোধহয় লাগলো না ওখানে পৌঁছাতে। একদম ঝপ করে ও মহিলাটার সোনালী চুল খাঁমচে ধরলো। এমনি এমনি অবশ্য ধরে নি৷ ও নিজ চোখে দেখেছে মহিলাটা তৌসিফের ঠোঁটের দিকে হাত বাড়াচ্ছিলো যা তৌসিফ সরানোর আগেই তার বউ ধরে ফেলেছে। পিয়াসী চমকে ওঠে। তৌসিফ অবাক হতে গিয়েও যেন হয় না৷ ও থম ধরে গিয়েছে। রাগে হিসহিসিয়ে উঠলো পৌষ,
“কাকে? কাকে ধরছিলি শা’লি? আমার জামাই এটা? এই পৌষরাতের।”
পিয়াসী আচমকা আক্রমণে কুঁকড়ে উঠলেও প্রতিহত করতে চাইলো। ওর বড় বড় নখ গেঁথে গেলো পৌষের হাতে। নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ডেকে ওঠে,
“তৌস..তৌসিফ!”
তৌসিফ যেন বাস্তবে ফিরলো। তারাতাড়ি পৌষকে ধরে বললো,
“হানি, লিভ হার।”
“কেন? কেন ছাড়ব? লুইচ্চা, বদমাশ! মাত্র না আমার সাথে রঙ তামাশা করে আসলেন? বিদেশের মাটিতে এসেই রূপ বেরিয়েছে?”
পিয়াসীর চুল পৌষ ছাড়ছেই না। মানুষজন জমে গেছে ইতিমধ্যে। তৌসিফ পেছন থেকে পৌষকে টেনে ধরলো নিজের সাথে। ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮০
“কাম ডাউন পৌষরাত। লুক এট মি।”
“কুত্তী! তুই ভাগ! ভাগ বলছি।”
পিয়াসী ভস্ম করার দৃষ্টিতে তাকালো অতঃপর হেসে ফেললো। তৌসিফের বাহুতে ছটফট করতে থাকা পৌষকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“আমাকে দেখেই এমন করছো? তোমার বরের গার্লফ্রেন্ড সংখ্যা জানলে তো জ্ঞান হারাবে।”
