প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৯
আরাফাত আদনান সামি
“আজ তোর শাড়ির আঁচলটা বড্ড বেশি ওপরে উঠেছে, সুইটহার্ট। তা নিচে কি কোনো দাগ লুকোনোর চেষ্টা হচ্ছিল নাকি?”
করিডোরের আবছা আলো-আঁধারিতে কৌশিক মায়ার মাথার ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে দিতেই মায়ার ফর্সা, মসৃণ গলার সেই গাঢ় লালচে দাগটা আলোর নিচে চকচক করে উঠল। ওটা কোনো সাধারণ দাগ নয়, দুপুরের সেই তীব্র ভালোবাসার এক জীবন্ত দলিল। কৌশিক নিজের খসখসে বুড়ো আঙুল দিয়ে সেই দাগটার ওপর আলতো করে স্পর্শ করল। সেই ছোঁয়ায় এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল মায়ার শরীরে। ও শিউরে উঠে সলজ্জে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
“ছাড়ুন না… কেউ দেখে ফেলবে!”
মায়ার কণ্ঠস্বর এবার ভয়ে আর লজ্জায় বুজে এল। সে চাইল কৌশিকের বুক থেকে সরে আসতে, কিন্তু কৌশিকের শক্ত বাহুবন্ধন তাকে আরও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।
“দেখুক। সবাই জানুক, কৌশিক নীর চৌধুরীর কামনার আগুন কতটা তীব্র হয়।”
কৌশিকের গলার স্বর এবার সত্যি সত্যিই গম্ভীর এবং গভীর আবেগে ডুবে গেল। সে মায়ার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মায়া, তুই হসপিটাল থেকে ফেরার পর থেকে আমার মনে হচ্ছিল আমি আমার জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিসটা হারিয়ে আবার ফিরে পেয়েছি। আমি আমার নিস্পন্দ বুকটার ভেতর আবার স্পন্দন ফিরে পেয়েছি। তুই কী জানিস? তোকে হারানোর ভয়টা আমাকে ভেতরে ভেতরে কতটা শেষ করে দিচ্ছিল?”
কৌশিকের গলার সেই আকুলতা মায়ার মনকে নাড়া দিল। সে চোখ খুলে কৌশিকের দিকে তাকাল। অহংকারী, দাপুটে মাফিয়া লিডারের চোখে এখন কোনো অহংকার নেই, আছে কেবল এক নিঃশর্ত প্রেমিকের ব্যাকুলতা। মায়া নিজের নরম হাতটা বাড়িয়ে কৌশিকের শক্ত গালে রাখল।
“এই যে, আমি তো আপনার কাছেই আছি, অসভ্য লোক। আমি কোথাও যাব না। কিন্তু আপনার এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ আর কামনা মাঝে মাঝে আমার ভয় বাড়িয়ে দেয়। মনে হয় আপনি আমাকে ভালোবেসে মেরেই ফেলবেন…”
মায়ার কথার মাঝেই কৌশিক মায়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ওটাতে একটা দীর্ঘ, উষ্ণ চুমু খেল। তার চোখ দুটো যেন মায়ার আত্মাকে খুঁড়ে দেখছে।
“তুই আমার অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো, মায়া। আমি রক্তের হোলি খেলা মানুষ, আমার চারপাশের বাতাস সবসময় বিষাক্ত। সেই বিষাক্ত বাতাসে তুই আমার একমাত্র বিশুদ্ধ অক্সিজেন। তোকে হারানো মানে এই কৌশিক নীর চৌধুরীর চিরতরে মৃত্যু।”
মায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে পরম শান্তিতে কৌশিকের চওড়া বুকে মাথা রাখল। ও বুঝতে পারল, এই মানুষটার ভেতরের ভালোবাসাটাও তার বাইরের রূপের মতোই উগ্র আর তীব্র। কিন্তু এই উগ্রতার ভেতরে যে অতল গভীরতা আছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো সাধারণ ভালোবাসায় নেই। ঠিক তখনই করিডোরের ওপাশ থেকে একটা কৃত্রিম কাশির শব্দ শোনা গেল।
“খুক খুক! রোমান্স কি এখানেই শেষ হবে, নাকি ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত গড়াবে? না মানে, বড় আম্মু কিন্তু মায়াকে সব জায়গায় খুঁজছেন।”
রোহিতের চেনা গলা পেয়ে মায়া এক ঝটকায় কৌশিকের বুক থেকে সরে এল এবং নিজের শাড়ির আঁচলটা আবার তড়িঘড়ি করে গলার ওপর টেনে নিল। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। ও মাথা নিচু করে দ্রুত করিডোর দিয়ে মেইন হলের দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। কৌশিক পকেটে হাত গুঁজে ধীর পায়ে রোহিতের দিকে তাকাল। ওর চোখে এখন পৃথিবীর সমস্ত বিরক্তি জড়ো হয়েছে।
“রোহিত, তোর কি টাইমিং সেন্স কোনোদিন ঠিক হবে না? যখনই আমি আমার বউয়ের সাথে একটু পার্সোনাল টাইম স্পেন্ড করি, তখনই তুই কোত্থেকে যেন ভূতদের মতো হাজির হোস!”
রোহিত হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। ও কৌশিকের কাঁধে হাত রেখে টিপ্পনী কেটে বলল,
“কী করব বলো কৌশিক ব্রো? তুমি তো আগে শুধু লাশের ওপর আর আন্ডারওয়ার্ল্ডে হুকুম চালাতে! কিন্তু এখন একটা মেয়ের সামনে যেভাবে তুমি গলে জল হয়ে যাচ্ছো, এটা চৌধুরী সাম্রাজ্যের জন্য একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বটে! একদম ডায়েরিতে লিখে রাখার মতো।”
কৌশিক রোহিতের হাতটা কাঁধ থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার কথা ছাড় নিজের চরকায় তেল দে, রোহিত। ওই ১৭ বছরের মেয়েটা তোকে যেভাবে জুতোপেটা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তুই আগে সেটা সামলা। চৌধুরী বাড়ির ড্যাশিং মাফিয়া লিডার একটা পুচকে মেয়ের পেছনে কুকুরের মতো ঘুরছে, এটা দেখলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের তোর শত্রুরা হাসতে হাসতে এমনেই মরে যাবে।”
রোহিতের মুখের চওড়া হাসিটা এবার একটু মিলিয়ে গেল, তবে ও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ও নিজের শার্টের কলারটা একটু স্টাইল করে ঠিক করতে করতে বলল,
“ওহ্, তা তুমি জেনে গেছো? যাগ্গে, আমার জন্যই ভালো হলো। নিধি পাখি একটু বেশিই উড়ছে, কৌশিক ব্রো। তবে ওর এই ওড়াউড়ি বেশিদিন থাকবে না। আমি খুব জলদি ওর ডানায় এমন এক ভালোবাসার মুক্ত আঠা লাগিয়ে দেব যে ও সারাজীবন আমার এই খাঁচাতেই বন্দি মুক্ত আকাশে থাকবে। তুমি যেমন ভাবিকে নিজের করে নিয়েছো, আমিও নিধুকে ঠিক আমার এই ছন্নছাড়া লাইফের রানি বানিয়ে ছাড়ব, দেখে নিও।”
কৌশিক একটা তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি হাসল।
“দেখি তোর ছন্নছাড়া স্টাইল নিধির ওপর কতটুকু কাজ করে। তবে মনে রাখিস, নিধি কিন্তু মায়ার মতো নরম আর শান্ত নয়। ও আস্ত একটা এটম বোম, তাই সামলে… না হলে তোর প্যান্টের ভেতর ভুম করে ব্লাস্ট হয়ে যাবে। পরে একুলও যাবে ওকুলও যাবে।”
রোহিত এক চোখ মেরে হেসে বলল,
“আমিও তো ডিনামাইট, ব্রো। বোমে বোমে যখন ব্লাস্ট হবে, তখন চৌধুরী ভিলার রোমান্স দেখার মতো হবে। ধামাকা!”
রাত তখন ১০টা। মেহমানরা সবাই একে একে চলে গেছেন। অমিতাভ পাটোয়ারী এবং রুবিনা পাটোয়ারী তাদের মেয়ের সাথে শেষবারের মতো কিছু সময় কাটিয়ে বিদায় নিয়েছেন। পুরো চৌধুরী ভিলা এখন নিঝুম, শান্ত। মায়া নিজের ঘরে ফিরে এসে একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ও ভারী শাড়িটা বদলে একটা আরামদায়ক, নরম সুতির থ্রি-পিস পরে নিল। সারাদিনের ক্লান্তি, মেহমানদের আনাগোনা আর দুপুরের সেই কামনার ঝড়ের পর ওর শরীর এখন প্রচণ্ড ভারী আর অবসন্ন হয়ে আছে। ও বিছানায় গিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। ঠিক কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার মৃদু শব্দ হলো। কৌশিক ঘরে ঢুকল। ও নিজের জমকালো পাঞ্জাবিটা খুলে একপাশে রেখে আবার সেই কালো ট্রাউজারটা পরে নিল। তার সুগঠিত উদোম বুকটা ঘরের মৃদু আলোয় চকচক করছে। সে ধীর পায়ে বিছানায় এসে মায়ার পাশে বসল। মায়া চোখ বন্ধ করে থাকার ভান করছিল, কিন্তু ও ঠিকই টের পাচ্ছিল কৌশিকের অতিমাত্রার পুরুষালি উপস্থিতি। কৌশিক মায়ার ওপর ঝুঁকে এল। তার ভেজা চুলের দু-এক ফোঁটা জল মায়ার গালে পড়ল। ও মায়ার কপালে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ছোঁয়াল।
“আমার হার্টবিট কী আমাকে একা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে?”
মায়া চোখ না খুলেই মুখটা একটু কুঁচকে বলল, “হুম। দয়া করে আর ডিস্টার্ব করবেন না। আমার শরীরে এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ট নেই। ঘুমোতে দিন।”
কৌশিক মৃদু হাসল,একটা গভীর, তৃপ্তির হাসি। ও মায়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে নিজের শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে নিল। ওর একটা হাত মায়ার পেটের ওপর এসে থামল। ও আলতো করে, পরম যত্নে মায়ার পেটে হাত বোলাতে লাগল, যেখানে দুপুরের সেই তীব্র উগ্রতার কারণে মায়া এখনো হালকা ব্যথা অনুভব করছিল। কৌশিকের হাতের এই মৃদু, উষ্ণ স্পর্শে মায়ার ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি এবং ব্যথা যেন এক জাদুকরী শান্তিতে রূপ নিতে লাগল। কৌশিক মায়ার কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তোকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলি, তাই না হার্টবিট? মারদাঙ্গা মানুষ তো, ভালোবাসার স্টাইলটাও বড্ড বুনো হয়ে যায়।”
মায়া এবার চোখ খুলল। ও ঘুরে কৌশিকের চোখের দিকে তাকাল। ঘরের ডিম লাইটের মৃদু আলোয় কৌশিকের চোখ দুটোকে বড্ড মায়াবী, বড্ড আপন লাগছিল। মায়া নিজের হাতটা বাড়িয়ে কৌশিকের ঘন চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে একটু দুষ্টুমির সুরে বলল,
“কষ্ট দিলেও তো আবার নিজেই মলম লাগিয়ে দেন। আপনার এই গিরগিটির মতো রূপ বদলানোটাকেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি, মিস্টার অসভ্য নীর চৌধুরী। কখনো বাঘ, তো আবার কখনো আবার বিড়াল!”
কৌশিক মায়ার নাকটা নিজের দু-আঙুলের ডগায় হালকা করে টিপে দিয়ে একগাল দুষ্টুমি মাখা হাসি হাসল। তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
“কী বললি? আমি বিড়াল? আচ্ছা… তাহলে বিড়ালের সবচেয়ে পছন্দের খাবারটা জলদি খাইয়ে দে। না হলে কিন্তু এই বিড়ালটা নিজের মতো করে কামড়ে-চেটে আদর করে নিতে বাধ্য হবে!”
কৌশিকের ডাবল মিনিং কথা বুঝতে মায়ার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। ও লজ্জায় লাল হয়ে কৌশিকের বুকে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল,
“অসভ্য!”
কৌশিক মুখটা আরও একটু এগিয়ে নিয়ে একদম মায়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করল,
“মেউ… মেউ…”
মায়াবতী চোখ দুটো বড় বড় করে মায়া তাকাল,
“কী শুরু করলেন? এভাবে মেউ মেউ করছেন কেন?”
কৌশিক মায়ার কোমরে নিজের শক্ত হাতটার গ্রিপ আরেকটু শক্ত করে টেনে এনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তারপর চোখ টিপে বলল,
“মেউ মেউ… দেখ হার্টবিট, তোর পোষা বিড়ালটা তার রাতের খাবারের জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে! এবার তো একটু দয়া কর তোর মেউ মেউ এর উপর।”
মায়া এবার হেসে ফেলে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“উঁহু, একদম না! আমার এই ক্ষুধার্ত বিড়ালকে আজ উপোস থাকতে হবে। আমার শরীরটা সত্যি খুব ম্যাজম্যাজ করছে, আমি আর পারছি না। আমি বরং ঘুমাই!”
কথাটা বলে মায়া কৌশিকের বুকে হাত দিয়ে তাকে একটু দূরে ঠেলার চেষ্টা করল। কৌশিক আরও একটু চেপে এসে মায়ার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট জোড়া নিয়ে গেল। তাদের উষ্ণ নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে। কৌশিক চোখের ইশারায় মায়ার ওষ্ঠাধর দেখিয়ে বলল,
“শরীরে শক্তি নেই তো কী হয়েছে? ঠোঁটে তো শক্তি আছে। নাকি ওটাও লক হয়ে গেছে?”
মায়া মুচকি হেসে কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরল, “আপনার সাথে কথায় জেতা অসম্ভব। আপনি আস্ত একটা ডাকাত!”
“হ্যাঁ, তোর মনের ডাকাত।”
বলেই কৌশিক মায়ার ঠোঁটে এক আলতো, স্নিগ্ধ চুমু খেল। এবারের চুম্বনে কোনো জোর জবরদস্তি ছিল না, ছিল না কোনো উগ্রতা। ছিল কেবল এক পরম নির্ভরতা, বিশ্বাস আর ভালোবাসার এক গভীর চাদর। চুম্বন শেষে ও মায়াকে নিজের বুকের ভেতর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ঘুমাবি?”
“হুম।”
মায়া কৌশিকের বুকে মুখ লুকিয়ে চোখ বন্ধ করল। কৌশিক মায়ার কোমরে চিমটি কেটে মুখ গোমড়া করার ভান করে বলল,
“সত্যি সত্যি ঘুমাবি? এই গভীর রাতে তোর এই মায়াবী রূপ দেখেও আমি কিচ্ছু করতে পারব না? একটুও না, হার্টবিট…”
মায়া কৌশিকের বুকে একটা মৃদু কিল মেরে চোখ না খুলেই হেসে বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৮
“একদম না! বিয়ের পরে আপনি আমাকে শান্তিতে একটা দিনও ঘুমাতে দেন নি তাই আজ শুধু ঘুম হবে। গুড নাইট, মিস্টার হাজব্যান্ড।”
কৌশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,
“তোর এই ‘না’ বলাটাই আমার ভেতরের তৃষ্ণাকে আরও বাড়িয়ে দেয় রে সুইটহার্ট…”
