আমার আলাদিন পর্ব ৩৪
জাবিন ফোরকান
সারিকাকে দেখার সাথে সাথে অনুরাগের কাছ থেকে ছিটকে দূরে সরে গেল সুগন্ধা। দ্রুত গলায় জানাল,
“আসলে পিসলায় গেসিলাম তো, চা পইড়া গেছে। আপাজান একটু বসেন, আমি দশ মিনিটে আপনার চা দিতেসি।”
মেয়েটি কিচেন থেকে বেলচা নিয়ে এসে মেঝে মুছে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো তুলে আবার কিচেনে আড়াল হয়ে গেল। অনুরাগ একটি নিঃশ্বাস ফেলল। সারিকার কাছে কোনোপ্রকার ব্যাখ্যা দিলনা। নিজের হালকা দাগ হয়ে যাওয়া স্যুটটা সে খুলে বাহুতে ঝুলিয়ে নিল। চুপচাপ গিয়ে বসল সোফায়।
“সাই গতকাল বলল তোমরা সবাই নাকি বরিশাল যাচ্ছ?”
সারিকা সুগন্ধার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার বিপরীতে অন্য প্রসঙ্গ টানল দেখে অনুরাগ মনে মনে স্বস্তি পেল।
“হ্যাঁ। আপনিও যাচ্ছেন?”
সারিকা এক লহমা চুপ করে রইল। অতঃপর সোফায় অনুরাগের থেকে অনেকখানি দূরত্ব রেখে বসে উত্তর করল,
“হ্যাঁ।”
অনুরাগ খানিক অবাক হলো। সারিকা যাচ্ছে সেই কথাটি সাইবান তাকে জানায়নি। যদি যেত তাহলে তো জানানোর কথা ছিল! তাহলে কি সারিকা এই সিদ্ধান্তটা এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই নিয়ে ফেলল?
“প্রথমে যাব ভাবিনি। আজ সকালে উঠে মনে হলো, অনেকদিন দাদুর বাড়ি দেখিনা। জীবন আবারও ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে একটু ঘুরে আসা দরকার।”
ঠিক। সারিকা সিদ্ধান্তটা এখনি নিয়েছে! অনুরাগ মনের অস্বস্তিটা চেপে গিয়ে বলল,
“ভালো সিদ্ধান্ত।”
এমন সময় সুগন্ধা এসে পড়ল। হাতে দুই কাপ চা। একটা আদা লেবু দিয়ে রং চা, সারিকার জন্য। অন্যটা দুধ চা, অনুরাগের দিকে বাড়িয়ে দিল সে। নিঃশব্দে মাথা দুলিয়ে কাপটা গ্রহণ করে নিল অনুরাগ। একটা সংক্ষিপ্ত চুমুক দিয়ে সে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
“আপনার হাসবেন্ড যাচ্ছে না?”
সারিকা নিজের কাপে চুমুক দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। পরবর্তীতে উত্তর দিল,
“না। ও ব্যস্ত মানুষ। তাছাড়া অ্যাপার্টমেন্টের কাজ নিয়ে এমনিতেও চিন্তার উপর আছে।”
“ওহ।”
কথা হারিয়ে ফেলল অনুরাগ। এরপর আর কি বলা যায় খুঁজে পেলনা তাই চুপচাপ চায়ে চুমুক দিতে থাকল। অথচ একটা সময় ছিল, যখন তাদের কথা বলার জন্য কোনো বিষয়ের প্রয়োজন হতনা। গাছের পাতা কেন সবুজ হয়, এই অহেতুক বিষয় ঘিরেও উভয়ের ঠোঁটে হাজারো শব্দের ফুলঝুড়ি ছুটত। সেই দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি, ঠিক যেমন অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলো।
“কোথায় যাওয়ার কথা হচ্ছে সকলের?”
হুট করে কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই সারিকা এবং অনুরাগ উভয়ে তাকাল সামনে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে ইরাম, তার কয়েক হাত পিছনেই সাইবান। অনুরাগ কিছু বলার আগেই পিছন থেকে সাইবান বলে উঠল,
“লঞ্চে যাবেন নাকি গাড়িতে?”
“কোথায় যাব?”
“হানিমুনে।”
সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছে গিয়ে অনেকখানি বিব্রত হয়ে পিছনে ফিরে তাকাল ইরাম। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল স্বামীর দিকে। সাইবানের অবশ্য বিশেষ হেলদোল নেই। সে আয়েশ করে নিচে নেমে সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। হলরুমে যে আরও কিছু মানুষ উপস্থিত আছে তাতে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা নেই। ইরাম গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হানিমুন কোথায়?”
“বরিশাল।”
ইরাম চোখ পিটপিট করল। বরিশাল? সাইবান আর সারিকা উভয়ের বাবা আহমদ উদ্দিন ভিন্ন জেলার মানুষ, তাদের পৈতৃক নিবাস বরিশালে এটুকু তথ্য তার জানা আছে। সাইবান হেলেদুলে এগিয়ে এসে হাতের আঙুল মটকাতে লাগল। বাঁকা হাসল, অতঃপর মাথা কাত করে ইরামকে আপাদমস্তক দেখে ঠোঁট চেটে বলল,
“লন্সের কেবিনে ওঠবেন নাকি জামাইর বুকে ঠাইস্যা যাইবেন আপনার উফরেই ছাইড়্যা দেলাম, বোঝলেন মনু?”
ভ্রু কপালে উঠে গেল ইরামের, এই ছেলে আঞ্চলিক ভাষা জানে? তাকে এই বিব্রত অবস্থা থেকে উদ্ধার করতেই যেন শব্দ করে উঠে দাঁড়াল অনুরাগ,
“অ্যাহেম! বউয়ের সাথে রসের আলাপ তুই প্রাইভেটলিও করতে পারবি। মানুষকে ফ্রিতে থিয়েটার দেখানোর প্রয়োজন নেই।”
“তুই তো শুকনো বিচিকলা, জীবনে কোনো রস নেই। আমি হলাম টসটসে তরমুজ, রস খালি বেয়ে বেয়ে পরে। এত রস প্রাইভেটলি ধরে রাখা যায়না, পাবলিকলি শো করতে হয়।”
“হ্যাঁ, নাইলে আগে ভাইজান সুন্দর বেটিদের নাচন কোদন দেইখা দেইখা রস ধইরা রাখত, এখন তো বউয়ের জন্য আর পারেনা। রস খালি উতলাইয়া পড়ে। আহারে কপাল পোড়া ভাইজান আমার!”
কখন যে সুগন্ধা টেবিলের কাছে উদয় হয়েছে কেউ খেয়ালই করেনি। তার কথা কানে যেতেই পিত্তি জ্বলে গেল সাইবানের, চোখের ভেতর বুঝি বজ্রপাত ঝিলিক দিয়ে উঠল।
“জরিনার আম্মা সকিনা, তোর মাথায় আজকাল চুল একটু বেশিই গজিয়ে গিয়েছে। আয়, কয়টা ছিঁড়ে কমিয়ে দেই।”
সটান হাত বাড়িয়ে সুগন্ধার লম্বা বেণী পেঁচিয়ে ধরল সাইবান। অট্টহাসি হাসতে হাসতে সুগন্ধা ঝটকা দিয়ে উঠল,
“আরে, ভাইজানের ইঞ্জিনে পেট্রোল ঢাইলা দিলাম নাকি?”
“ইঞ্জিন শালী তোর পিঠের উপর ভাঙব আমি। তুই যে সিরিয়ালের ধলা ধলা নায়কদের ট্রিটমেন্ট করে গড়া ফেইক বডি দেখে মুখের লালা ঝরাস সেটা বলে অপমান করতে গেলেই মানুষ বলবে নারী নির্যাতন!”
“ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, ওগুলা সিরিয়াল না, কোরিয়ান ড্রামা।”
“তোর কোরিয়ান ড্রামার গুষ্টির খেতায় আগুন! থাকে বাংলাদেশে লোল ফালায় কোরিয়ানে! দুইদিনের নমুনা লুডুসরে বলে রামেন! ওই দাঁড়া তুই! ছেমড়ি!”
সাইবান এবং সুগন্ধা দুজনই কিচেনে আড়াল হয়ে গেল। ভেতর থেকে ধুপধাপ, ধামুর ধুমুর, ঝনঝন বাসন কোসনের আওয়াজ আসতে লাগল। কুরুক্ষেত্র বেঁধেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইরাম কপালে হাত দিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এদের কান্ডকারখানা দেখা মুশকিল। হুট করেই পিছন থেকে অনুরাগের হাসির শব্দ ভেসে এলো। ঘুরে তাকাল ইরাম। অনুরাগ বেশ প্রফুল্ল হয়েই হাসছে, হাসলে তার এক গালে ছোট্ট একটা টোল পরে। নিজের খালি হয়ে যাওয়া কাপটা টেবিলে রেখে দিয়ে অনুরাগ বলল,
“মেয়েটা তো বেশ মজার। আমি দেখে আসছি, কিচেনটাকে না আবার দুজন মিলে ধ্বসিয়ে ফেলে, শেষে সামিয়া আন্টি আমায় ধরবে।”
অনুরাগ শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে কিচেনে চলে গেল। ইরাম জানেনা কেন, তার চোখ গিয়ে পড়ল সোফায় চুপটি করে বসে থাকা সারিকার উপর। এতক্ষণ অপলক হয়ে অনুরাগকেই দেখছিল সে, চোখে অদ্ভুতুড়ে এক বিষণ্নতা নিয়ে। ইরাম তাকাতেই সারিকা দ্রুত উঠে পড়ল, নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল কিন্তু হঠাৎ ইরাম ঠান্ডা গলায় ডেকে উঠল,
“সারিকা?”
থমকাল রমণী। মাথা কাত করে ঘুরে তাকাল। ইরাম শান্ত গলায় বলল,
“একটা কথা সবসময় মাথায় রেখো, তুমি এখন বিবাহিত, তোমার একজন দায়িত্ববান স্বামী আছে।”
সারিকা সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াল এবার। তার চেহারায় রাগ ফুটল। ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল, হনহন করে এগিয়ে এসে ইরামের মুখোমুখি দাঁড়াল সে। গম্ভীর গলায় বলে বসল,
“হোয়াট ডু ইউ থিংক ইউ আর?”
“আ’ম নো বডি।”
উত্তর করল ইরাম। পিছিয়ে গেলনা। সামান্য একটু ঝুঁকে সারিকার চোখে চোখ মিলিয়ে জানাল,
“অতীত, অনুভূতি থাকাটা দোষের নয়। কিন্তু এক সম্পর্কের বাঁধনে থেকে অন্য সম্পর্কের স্বপ্নে বিভোর থাকাটা অন্যায়। অন্যায়টা না নিজের সাথে করো, না তো মিসির ভাইয়ার সাথে।”
বাঁকা হাসি ফুটল সারিকার ঠোঁটে,
“আপনি নিজেকে খুবই বড় কিছু মনে করেন, তাইনা? তবে বয়স বাড়লেই যে বুদ্ধি বাড়ে না সেটার প্রমাণ আপনি নিজেই। আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর আগে ভেবে দেখবেন আপনার নাকটার ক্ষমতা কতটুকু। যে গল্প আপনি জানেন না, সে গল্প নিয়ে মন্তব্য করতে আসবেন না।”
আর দাঁড়ালনা সারিকা, উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে গেল। ইরাম কিছু বললনা, স্থির চেয়ে রইল মেয়েটির চলার পথের দিকে।
পরদিন বিকালবেলা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নিচ্ছে ইরাম। একটা লাল সালোয়ার কামিজ পরনে তার, চুলগুলো বেণী পাকিয়ে একপাশে ঝুলিয়ে নিয়েছে। শেষমেষ সাইবানের কথা ফেলতে পারেনি সে, সত্যিই বরিশাল যাওয়ার জন্য রাজী হয়েছে। এতে কিছুদিন কম্পিউটার ক্লাস মিস যাবে, তবে আশার কথা আগামী দুই তিনদিন কায়সানের অনুপস্থিতির কারণে ক্লাস একটা করেই হবে। সেক্ষেত্রে ইরাম কাকতালীয়ভাবে ছোট একটা ছুটি পেয়ে গিয়েছে। তাই আর বিশেষ গড়িমসি করেনি। তাছাড়া, এটা রীতিমত একটা পারিবারিক ট্রিপে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
সারিকা যাচ্ছে তাদের সাথে। আজ সকালে হুট করে সাইবান সুগন্ধাকেও ব্যাগ গোছাতে বলেছে। হয়ত ইযানের দেখভালের কথা চিন্তা করে। অপরদিকে অনুরাগও যাচ্ছে তাদের সাথে। সবাই মিলিত হওয়ায় শেষমেষ নদীপথকেই বাছাই করা হয়েছে। ইরামও মানা করেনি। তার কখনো লঞ্চ, নৌকা, স্পিডবোট এই ধরণের বাহনগুলোতে চড়া হয়নি। এটা তাই একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা হবে বলেই তার বিশ্বাস। যদিও নদী তার কিছুটা ভয়ই লাগে, তবে সকলের উত্তেজনা – উৎসাহের কথা চিন্তা করে আর মানা করেনি সে। ইযানকে এর মধ্যেই খাইয়ে প্রস্তুত করে দিয়েছে সে। কিছুক্ষণ আগেই ছেলেকে নিয়ে নিচে নেমে গিয়েছে সাইবান। ইরামও দ্রুত গোছগাছ শেষ করে বেরিয়ে এলো। সত্যি বলতে, তার নিজেরও একটু উদ্দীপনা কাজ করছে। ইযানকে নিয়ে এই প্রথম বেড়াতে যাওয়ার মতন কোনো ব্যবস্থা, উপরন্তু বিয়ের পর সাইবানের সাথে প্রথম যাত্রা। সবকিছুতেই একদম প্রথম প্রথম অনুভূতি।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল ইরামের। সাইবান ইযানকে বেবি ক্যারিয়ারে সেট করে নিচ্ছে, একপাশে দাঁড়িয়ে সামিয়া নাতির প্রয়োজনীয় জিনিসের ছোট ব্যাগটা হাতিয়ে দেখছেন সব নেয়া হয়েছে কিনা। সঙ্গে সঙ্গে জননীর আদেশও চলছে,
“খবরদার লঞ্চের ছাদে উঠে অহেতুক বসে থাকবিনা। সাথে বাবু আছে, বাবুর গায়ে যেন একফোঁটা ঠান্ডা বাতাসও না লাগে। একেবারে প্রয়োজন ছাড়া কেবিনের বাইরে বের হওয়ার দরকার নেই। আর ইরামের দিকে খেয়াল রাখবি। সুগন্ধাকেও আমি পইপই করে বলে দিয়েছি। তোরা দুজন পুরুষ, মেয়েদের চোখে চোখে রাখবি একেবারে।”
“ব্রো। চিল। তোমার ছেলে পাঁচ বছরের বাচ্চা না যে এভাবে উপদেশের লিস্ট ধরিয়ে দিচ্ছ। এক বাচ্চার বাপ আমি, একটু তো সম্মান করো!”
সঙ্গে সঙ্গে সামিয়া সাইবানের কান চেপে ধরলেন।
“আহহহ…আউচ!”
“সরি ব্রো, দশ বাচ্চা পয়দা করলেও আমার কাছে তুই পাঁচ বছরের বাচ্চাই থাকবি ব্রো! আরেকটা কানমলা খেতে চাস ব্রো?”
“মম! আমার সম্মান নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে তোমায় ড্যাডের মনের ঘরে নির্বাসন দেয়া উচিত।”
“যাক, অবশেষে মধুর ডাকটা বেরিয়েছে আমার ব্রোর মুখ থেকে। শোন রে ছোট পোটলার বাপ বড় পোটলা, তোর ড্যাডের মনের ঘরের প্রয়োজন নেই আমার বুঝেছিস? মমের ক্ষমতা আছে নিজের ঘর নিজের তৈরি করে নেয়ার। ইউ নো?”
“ইয়েস আই নো, স্লে কুইন! জাস্ট ডোন্ট কিক ড্যাড’স অ্যাসেস হোয়েন আ’ম নট হেয়ার টু ওয়াচ দ্যা ফান!”
ইরাম নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দেখে গেল। যতবার সামিয়া আর সাইবানকে সে একসাথে দেখতে পায়, ততবার কেন যেন তার তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা হয়। মা ছেলের মাঝে এমনও সহজ সম্পর্ক হতে পারে? এই জুটিকে না দেখলে ইরাম হয়ত কোনোদিন সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারতনা।
“এইযে, আমার মেয়েটা এসে পড়েছে। মাশাআল্লাহ, একেবারে লাল টুকটুক পরী।”
সামিয়া কখন তার দিকে ঘুরে তাকিয়েছে ইরাম টেরও পায়নি। খানিকটা লজ্জা পেয়ে গেল সে মন্তব্যে। এগিয়ে গেল সামনে, সামিয়ার দুই হাত ধরে বলল,
“বাড়িতে করিম চাচা ছাড়া কেউ থাকবেনা। আম্মু, নিজের যত্ন নিও। হ্যাঁ জানি, তুমি ডাক্তার, অনেক ব্যস্ততা, মানুষের জীবন রক্ষার মহৎ দায়িত্ব তোমার কাঁধে। তবে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তো তোমাকে আগে নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে। তাইনা?”
“দেখেছ? এভাবেই মায়ের জন্য চিন্তা করতে হয়! এইযে বড় পোটলা, বউকে দেখেও তো কিছু শিখতে পারিস।”
চোখ ওল্টালো সাইবান,
“মানুষের আলগা পিরিত দেখলে গা জ্বলে।”
সাইবানের বাহুতে চাপড় বসালেন সামিয়া। তাতে মাকে জিভ দেখিয়ে ভেংচি কেটে বেবি ক্যারিয়ার হাতে তুলে নিয়ে ইরামের দিকে ফিরল সাইবান,
“এইযে, এবার বেরোবেন নাকি লঞ্চ থেকে আপনাকে আমন্ত্রণ করে স্পেশাল ইনভাইটেশন কার্ড পাঠাতে হবে? লঞ্চ ছুটে গেলে শেষে বুড়িগঙ্গা সাঁতরে কুল পাবেন না কিন্তু। তখন বুকে কেন, পিঠেও জায়গা দেবনা। জনদরদী গরীবের বন্ধু জ্যাক না আমি, যে রোজের জন্য সবকিছু ছেড়ে দেব।”
“ইশ! যাত্রার আগে আগে টাইটানিকের মতন ডিজাস্টার মুভির কথা না বললেই না?”
সামিয়া আরেক দফায় ছেলেকে শাসন করলেন। ইরাম মুচকি হেসে দেখল কান্ড। অবশেষে সামিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা গাড়ির দিকে এগোল। সারিকা আর সুগন্ধাকে ব্যাগপত্রের সঙ্গে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, এখন সাইবান শুধু ইরাম আর বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছে, এমনটাই পরিকল্পনা ছিল। ওদিকে অনুরাগেরও এতক্ষণে পৌঁছে যাওয়ার কথা। সামিয়া গাড়ি অব্দি হেঁটে এলেন, ছেলে বউয়ের গায়ে আয়তুল কুরসি এবং দোয়া ইউনূস পড়ে ফু দিয়ে দিলেন। গাড়িটা যখন বাড়ির সীমানা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল, তখন সামিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে একরাশ আশা এবং ক্ষীণ আশঙ্কা নিয়ে চেয়ে রইলেন। মায়ের মন এমনি হয়ত, সুখের সময়েও চিন্তারা ঘিরে ধরে।
সদরঘাটের ভিড়ে ঢোকার পর ইরামের সত্যিই মনে হলো ভিন্ন এক জগতে এসে পড়েছে সে। বিশাল প্যাসেজ দিয়ে ঘাটের সঙ্গে টার্মিনালের সংযোগ করা। নিচে বুড়িগঙ্গার পাড়। টিভিতে দেখেছে সে, ঈদের সময়ে এখানে পা রাখার মতন জায়গাও পাওয়া যায়না। এখন অবশ্য মানুষ তুলনামুলক কম। দূর থেকে বিভিন্ন লঞ্চের সাইরেনের আওয়াজ ভেসে আসছে। সঙ্গে হকার আর কুলিদের কলরব। সাইবান সামনে সামনে হাঁটছে, এক হাতে বেবি ক্যারিয়ারে থাকা ইযান, অন্য হাতে ইযানের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যাগ। ইরাম সাহায্যের জন্য ছেলেকে নয়ত ব্যাগকে ধরতে চেয়েছিল। সাইবান সাফ মানা করে দিয়েছে। এখানে নাকি বেশ চুরি হয়। ক্ষণে ক্ষণে পিছনে ঘুরে ইরামকে দেখছে সে। অর্ধাঙ্গিনী পিছিয়ে পড়লে থেমে দাঁড়াচ্ছে, অপেক্ষা করছে, কাছে এলে আবার হাঁটা শুরু করছে। এমনভাবেই তারা অবশেষে পৌঁছে গেল ঘাটে।
নিচে বুড়িগঙ্গার কালো পানি, সামনে দাঁড়ানো দানবাকৃতির লঞ্চ। ইরাম ঘাড় টানটান করেও দেখতে বেগ পোহালো। লঞ্চ তো নয় যেন একেকটা আস্ত ফাইভ স্টার হোটেল! এম ভি কালাইয়া, পারাবত ১৭, ঈগল ৪ আরও কত কত নাম! একেবারে আলাদাই দুনিয়া। মানুষজন নৌকা থেকে চলন্ত লঞ্চে উঠছে। দাঁড়িয়ে থাকা লঞ্চের স্টাফরা হাকডাক করে যাত্রী আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
সাইবান যে লঞ্চের সামনে গিয়ে থামল, সেই লঞ্চ আশেপাশের অন্যান্য লঞ্চের দিক থেকে তুলনামূলক সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক দেখতে। ধাতব দেয়ালে গোটা গোটা অক্ষরে লিখিত— এমভি সুন্দরবন ১৬।
একটা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঘাট আর লঞ্চের সঙ্গে পথ তৈরি করা হয়েছে যেন যাত্রীরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। দুজন স্টাফ দাঁড়িয়ে আছে আমন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। ইরাম থামল। তখনি অন্য একটা লঞ্চ এসে পাশে ঘাট দেয়ায় এত জোরে গোটা ঘাট কেঁপে উঠল যে রমণী একটুর জন্য ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। সাইবান পাশে থাকায় ধরে ফেলল,
“সাবধানে। লঞ্চ ঘাট দেয়ার সময় ধাক্কা লাগে।”
“সেটা তুমি আগে বলবে না আমায়?”
“ফাইন, সরি। দেখি এবার উঠুন আপনি, আমি পিছনে আসছি পোটলাকে নিয়ে।”
ইরাম দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে সামনে তাকাল। দুনিয়ার যত লঞ্চ দুর্ঘটনার কথা তার এখনি কেন স্মরণে আসছে? কি আশ্চর্য্য! যেহেতু নদী, নালা এবং এই ধরণের জায়গায় আগে আসা হয়নি, সেহেতু ইরাম আবিষ্কার করার সুযোগ পায়নি এসবে হালকা ভয় আছে তার। বিশাল লঞ্চের দিকে তাকালেই কেমন বুক কাঁপছে তার। পাটাতনের উপর পা দিতে গিয়েও দ্বিধা হচ্ছে। ওপাশে থাকা স্টাফরা বুঝতে পারল।
“আফা আফনার সমস্যা হইলে আমার হাত দুইটা ধইরা আহেন।”
ইরামের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল লঞ্চের এক লোক। দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগল সে। ঘাট থেকে লঞ্চে ওঠার জন্য যদিও যথেষ্ট প্রশস্ত কাঠের পাটাতন দিয়ে দেয়া হয়েছে, তবুও নিচের কালচে বুড়িগঙ্গার পানি তাকে বিভ্রান্ত করল। এমন ক্ষেত্র বড্ড অচেনা কিনা! তবে এমন গর্ধবের মতন দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? পিছনে আরও মানুষ অপেক্ষায় আছে। মনকে কোনমতে স্থির করে হাত বাড়িয়ে দিল ইরাম সামনের দিকে, কাঁপা কাঁপা পায়ে এগোতে নিল। নিচের পানির দিকে না তাকালেই চলবে, মনে মনে জপতে লাগল সে। তবে লোকটা তার হাতের নাগাল পাওয়ার আগেই হুট করে তাকে রীতিমত শূন্যে তুলে ফেলল কেউ। বিস্ময়কর একটি শব্দ করে একজোড়া প্রশস্ত কাঁধ চেপে ধরল ইরাম, অবাক হয়ে আবিষ্কার করল সাইবানকে। একটি হাতে ইরামকে কোলে তুলে নিয়েছে সে, অপর হাতে বেবি ক্যারিয়ারে আধঘুমন্ত ইযান। দৃশ্যটি বাহ্যিকভাবে দেখতে প্রায় অবিশ্বাস্য লাগল। আশেপাশের মানুষজন সব বিস্মিত হয়ে নিষ্পলক চেয়ে রইল। সাইবান কারো সাহায্য অব্দি চাইলনা, আপনমনে বিড়বিড় করল একটি অস্ফুট শব্দ,
“বিসমিল্লাহ।”
অতঃপর পাটাতনের উপর পা রাখল সে। নির্দ্বিধায়। পদক্ষেপ একটুও টললনা তার। যেন এতটা ভার বহন করা অসাধ্য কিছু নয়। অজান্তেই কালচে বুড়িগঙ্গার পানি এবং পরে বেবি ক্যারিয়ারের ভেতর থাকা ছেলেকে এক নজর দেখে ইরাম না পারতে ফিসফিস করল,
“তোমার ভয় করছেনা?”
কপালে দুই ফোঁটা ঘাম জমলেও মুচকি হাসল সাইবান,
“যার হাতে গোটা দুনিয়া, তার আবার ভয় কিসের?”
ইরাম মনের ভেতর ভীষণ এক অনুভূতির জোয়ার টের পেল। এক সময়কার দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলেটা এমন করে দায়িত্ব কাঁধে তুলতে শিখল ঠিক কবে, সেটা সে নিজেও বলতে পারবেনা। সে কি এতকাল নিজের অতীত এবং ইযানের ভবিষ্যতের চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে নিজের স্বামীর ভেতরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো নজরে আসেনি? প্রথমবারের মতন ইরাম সাইবানের মুখের দিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকাল। এক সময়কার ছোট সেই খালাতো ভাই হিসাবে নয়, বরং নিজের স্বামী হিসাবে, একজন পুরুষ হিসাবে। যেন প্রথমবার দেখছে সে সাইবানকে, অনুভব করছে কত বড় হয়ে গিয়েছে ছেলেটা!
ইরামের বাহু অজান্তেই সাইবানের কাঁধে জড়িয়ে গেল। বুকের ভেতরের আশঙ্কাটুকু কর্পূরের ন্যায় উবে গেল। এই বাহুর মাঝে সে এবং তার সন্তান সদা নিরাপদ, চিন্তার কোনো কারণ নেই। সে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। এমনটাই অনুভূত হলো রমণীর।
সাইবান পাটাতন বেয়ে হেঁটে গিয়ে অবশেষে লঞ্চের ভেতর পা রাখল। ভেতরে থাকা স্টাফরা স্বাগতম জানাল তাদের।
“স্যার মনে হয় ম্যাডামের খুব কেয়ার করেন।”
একজন হেসে মন্তব্য করল। সাইবান পাল্টা কিছু বললনা। অতি সাবধানে ইরামকে নিচে নামিয়ে দিল। বেবি ক্যারিয়ারে থাকা ইযান তখনি শব্দ করে উঠল,
“আআ…মুই!”
একগাল হাসল সাইবান। হাঁটু মুড়ে বসে বলল,
“হয়, মুই রে মুই! বাহের দ্যাশে নিয়া তোরে মোগো ভিডা ঘুরাইয়া আনমু, বোজ্জো? এহনি শিখ্যা হালা মোগো পরানের ভাষা, পোটলাডা।”
“তুমি এত চমৎকার বরিশাইল্লা জানো?”
ইরাম আরেক দফায় মুগ্ধতা প্রকাশ না করে পারলনা। তবে সাইবান প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“কিরে বরিশাইল্লা খেতার গাট্টি? আসতে পারলি শেষমেষ? ভাবছি তোকে ছাড়াই লঞ্চ না আবার উড়াল দেয়।”
এসে দাঁড়াল অনুরাগ। সাইবান খেঁকিয়ে উঠল,
“আমার সাথে কোথাও খেতার গাট্টি দেখছিস? শালা অন্ধ!”
“না, বউ বাচ্চার গাট্টি দেখছি।”
মজা নিতে ছাড়লনা অনুরাগ।
“চিল অনু চিল, জিনি তো আমাদের জিনিই, স্ট্রং ম্যান।”
ইরাম বেবি ক্যারিয়ার থেকে ইযানকে বুকে তুলে নিয়েছে সবেমাত্র। অথচ এই অতি পরিচিত কণ্ঠটি তাকে ওই স্থানেই জমিয়ে দিল। এমনকি সাইবানকেও। হতবাক হয়ে তারা দেখল, গটমট করে হেঁটে আসছে তিতলি। ক্রপ টপ আর টাইট জিন্স পরনে। চুলগুলো হাই পনিটেইল করে রাখা। সাইবানের চোখজোড়া বিস্ময়ে প্রসারিত হয়ে গেল। ঝট করে ফিরে তাকাল সে অনুরাগের দিকে। প্রথমটায় অনুরাগ অপরাধীর ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিল, পরক্ষণে কাছে ঝুঁকে সাইবানের কানে ফিসফিস করে বলল,
“বিয়েতে তিতলিও দাওয়াত পেয়েছে। ওর বাবা আমার সাথে নিয়ে যেতে বলেছে। মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে হয়েছে সব। সরি দোস্ত। আই ডিড নট মিন টু।”
সাইবান জবাব দিলনা ঠিকই, কিন্তু তার দৃষ্টিতে ফুটে ওঠা চাপা ক্রোধ চিনতে কারোরই ভুল হলনা।
ছেলেমেয়েরা সবাই চলে যেতেই বাড়িটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। ফ্রি সময় থাকায় সন্ধ্যায় একাই সোফায় চা নিয়ে বসেছেন সামিয়া। সুগন্ধা মেয়েটা আজকাল হিন্দি সিরিয়াল বাদ দিয়ে কোরিয়ান আর চাইনিজ ড্রামা দেখছে। মাঝে মধ্যে দেখতে দেখতে সামিয়ারও কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। তিনি একটা ড্রামার এপিসোড চালিয়ে আনমনে বসে আছেন, দেখছেন না তেমন মনোযোগ দিয়ে। ছেলেমেয়েদের ছাড়া কিছুই ভালো লাগছেনা।
ঠিক এমন সময়েই আহমদ এসে বসলেন বিপরীত দিকের সোফায়। কোনো কথা না বলেই রিমোটটা টেনে খানিক স্বৈরাচারের মতন চ্যানেল বদলে দিলেন তিনি। টিভিতে এখন ফুটবল খেলার ম্যাচ চলছে। সামিয়া বিরক্তবোধ করলেন।
“আমি একটা জিনিস দেখছিলাম।”
“বুড়ি বয়সে ভীমরতির প্রয়োজন নেই তোমার।”
পায়ের উপর পা তুলে একদম বেপরোয়া মনোভাব নিয়েই আয়েশ করে খেলা দেখতে লাগলেন আহমদ। সামিয়া কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইলেন। তারপর ঠাস করে হাত থেকে চায়ের কাপ রেখে দিয়ে বলে উঠলেন,
“তুমি আর কতদিন এই বাড়িতে ঘাঁটি গেড়ে থাকবে বলে ভাবছ?”
“কেন? তোমার দমবন্ধ লাগছে? দরজা খোলা আছে, বেরিয়ে যেতে পারো।”
স্বামীর এমন কথায় অন্তর পুড়ল সামিয়ার।
“অনেকদিন ধরে দেখছি তোমাকে আহমদ, কেমন ভূতের মত এখানে পরে আছো। কি চাও তুমি?”
“আমি না থাকলে সুতো দিয়ে বেঁধে রাখা পরিবারটা বন্যায় ভেসে যাবে, সেটা হোক তাই চাই না।”
আহমদের চোখ টিভির দিকে, একবারের জন্যও তিনি সামিয়ার দিকে তাকাচ্ছেন না।
“কই? আগে তো তোমার এত দরদ উৎলে ওঠেনি এই পরিবারের প্রতি!”
“আগে তো আর কেউ বাড়িতে একটা মাঝবয়সী ডিভোর্সি মেয়েকে বাড়ির বউ করে ঢোকায়নি!”
“আহমদ! সমস্যা কি তোমার?”
গর্জে উঠলেন সামিয়া। উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন সটান। আহমদ একটুও ক্রোধ দেখালেন না, বরং ঘুরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“চিৎকার করোনা সামিয়া। সমস্যা আমি না, তুমি তৈরি করেছ। এর মাশুল তোমাকে আজ নাহয় কাল গুনতেই হবে।”
“মাশুল গুনব? আমি? আমার ছেলেকে দেখেছ তুমি একবার ভালোভাবে?”
একটুখানি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন সামিয়া।
“মাঝবয়সী ডিভোর্সি বলে যাকে অপমান করতে চাইছ, তার জন্যই আমার ছেলের চেহারায় খুশি ছলকে উঠে। বেঁচে তো ও এতদিন ছিলই, কিন্তু সে বেঁচে থাকায় কোনো উদ্দেশ্য ছিলনা। অথচ আজ দেখ, আমার ছেলে দায়িত্ব নিতে শিখে গিয়েছে।”
“আমার ছেলে, আমার ছেলে, আমার ছেলে! আমাদের বলতে ঈর্ষা হয়, তাইনা?”
শীতল হাসি হাসলেন আহমদ। সামিয়া জমে গেলেন। স্বামীর এই অভিব্যক্তি তার ভীষণ চেনা। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন আহমদ, ধীরপায়ে হেঁটে এসে সামিয়ার মুখোমুখি থামলেন। চোখে চোখ রাখলেন।
“তোমার এই গর্বই না একদিন তোমার কাল হয়ে দাঁড়ায়, মাই ডিয়ার ওয়াইফ!”
গলা কাঁপল সামিয়ার,
“ক.. কাল? কাল কেন হবে? কি বলছ তুমি?”
আহমদ ঝুঁকে এলেন, সামিয়ার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করলেন,
“আমি কি বলছি তা তুমি ভালোভাবেই বুঝতে পারছ, অস্বীকার করোনা। মাঝবয়সী ডিভোর্সি এক বাচ্চার মাকে বিয়ে দিয়েছ, তোমার ছেলে খুব সুখে আছে, দায়িত্ব শিখে গেছে, একেবারে সোনায় সোহাগা তুমি তাইনা?”
একটু থামলেন তিনি, অতঃপর যুক্ত করলেন,
“আমার ছেলে আমার ছেলে বলে যাকে বুকে আগলে রাখ, সে যেদিন তোমার মূর্খতার পিছনের সত্যিটা জানবে, সেদিন কি সে নিজেকে আদৌ তোমার ছেলে বলে দাবী করতে চাইবে? ইউ আর সেলফিশ সামিয়া, রিয়েলি রিয়েলি সেলফিশ! ইউ ডিড নট ইভেন স্পেয়ার আওয়ার সন!”
আমার আলাদিন পর্ব ৩৩
সামিয়ার সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। হৃদযন্ত্র বুঝি স্পন্দন বন্ধ করে দিল। আহমদ সরে গেলেন, আর দাঁড়ালেন না, হেঁটে অন্দরমহলে আড়াল হয়ে গেলেন। তিনি চলে যেতেই সামিয়া নিজের পায়ের জোর হারিয়ে ফেললেন, ধপাস করে বসে পড়লেন মেঝেতেই। দেহ পেরিয়ে আত্মা অব্দি কাঁপল তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় উষ্ণ অশ্রু গড়াতে শুরু করল।
