অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬২
Maha Aarat
সাহরির পরের সময়টুকু ছিল আরহাম আর মাইমুনার একান্ত নিজের।আরহাম মসজিদ থেকে আসামাত্রই খুব সকালে ভোরের নির্মল বাতাস গায়ে মাখতে বের হওয়া তাদের।স্কেচে ভর দেওয়া ছাড়াই আরহামের কাঁধে ভর দিয়ে সে দিব্যি হাঁটছে।প্রিয়তমের বুকের খুশবু আর চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে সকাল টা মাইমুনার চমৎকার কেটেছে।আরহামের কন্ঠে নাশিদ শোনার সৌভাগ্য মাইমুনার খুব কম সময়ই হয়েছে।তাঁর মধ্যে আজকের সকাল ছিল অন্যতম।
তুমি রক্তজবা কিংবা গোলাপ আমার আঙ্গিনায়
আমি সূর্যের আলোর মতো তোমায় মাখবো আমার গা’য়ে।
যদি মেঘলা দিনের বৃষ্টিরা সব ঝড়ে উঠানে,
এই বুকটা জুড়ে উঠান গড়া কেউ কি তা জানে।
তুমি হলেও হতে পারো,সেই বৃষ্টির ফোঁটা
যাতে রুক্ষ জমি আবার ফিরে পাবে পূর্ণতা।
তুমি রক্তজবা কিংবা গোলাপ আমার আঙ্গিনায়
আমি সূর্যের আলোর মতো তোমায় মাখবো সারা গা’য়।
শুধু ‘তুমি’র জায়গায় আরহাম ‘আপনি’ ব্যবহার করেছেন। নাশিদ শেষ হতেই মাইমুনার যেনো সম্বিৎ ফিরলো।মোলায়েম কন্ঠের মোহময়ী সুরে এতো চমৎকার লাগছিলো যে তাঁর মনে হচ্ছিলো,এটা আমরণ চলতে থাকুক।তবুও বোধ হয় বিরক্তি আসবে না।
রুমে ফিরতে ফিরতে দূচোখ ভারী হয়ে আসলো গভীর তন্দ্রায়।আরহাম তাকে মুগ্ধচোখে দেখছিলেন।যেনো সামনে আস্ত একটা গোলাপ।যার পাপড়িতে পাপড়িতে মাখা গভীর প্রেম।ভালোবাসার গালিচা; যেটাতে কেবল আঁকা সুখের শেষ সীমান্ত।
মাইমুনা খুব কাছ থেকে দেখলেন আরহামের চোখ ও ছোট হয়ে আসছে।ঘুমে লেগে আসতে চাওয়া চোখদ্বয় টেনে টেনে তুলছেন তিনি।অথচ এখনি বের হবেন বাইরে।
‘আপনার তো ঘুম হয়নি।কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে তারপর বের হোন।’
‘সমস্যা নেই।’
‘সমস্যা আছে।’
আরহাম হাসলেন।জুব্বার হাতার হুক লাগাতে লাগাতে বললেন , ‘আপনি ঘুমান হানি,তাকাতে পারছেন না।’
মাইমুনা হাল ছাড়লেন না।অনুতপ্ত সুরে বললেন ,আমাকে নিয়ে সকালে বের না হলে আপনার ঘুম ঠিক হতো।এখন আমার অনুশোচনা হচ্ছে।’
আরহাম জোর দিয়ে বললেন , ‘আই এম অল রাইট,হানি।’
‘আমি চাই এখন আপনি আমার পাশে ঘু…
আরহাম তাঁর ঠোঁটে শাহাদাত আঙ্গুল রেখে চোখের তীক্ষ্ণ ইশারায় বুঝালেন এই মুহুর্তে এমন আবদার একদমই নয়।
‘এখুনি বের হতে হবে।কয়েকজন অপেক্ষা করছেন।আমি তো কথা ভাঙ্গতে পারি না।অবশ্যই আবার খুব শীঘ্রই একটা সুন্দর প্রভাত হবে,আপনার সাথে।ইন শা আল্লাহ।’
ইদানীং সে নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছে।মাহের বাসায় আসলেই দৌড়ে যায়না উনার ব্যাগ ক্যারি করতে, ফ্রেশ হতে সাহায্য করতে, কাপড়চোপড় এগিয়ে দিতে।মাহেরের পছন্দের খাবার রান্না হলে প্লেটভরে কেউ আর নাকানিচুবানি খাওয়ায় না।রাত হলে সে আর অপেক্ষা করে না,মাহেরের বাহুতে মাথা রাখার।আজকাল নিজের কমফোর্টার টাও আলাদা করে নিয়েছে সে।মাঝে মাঝে জেদ ধরতো,আচার,ফুচকা বা চকলেট আনতে এখন করে না।ছুটির দিনে তার বেশীরভাগ সময় কাটে একা শুয়ে থাকতে থাকতে,নয়তো ছাদে নীরবে বসে থেকে।পড়ার জন্য এখন আর তাগাদা দেওয়া লাগে না তার।সন্ধ্যার নামাজ তিলাওয়াত শেষেই বসে পড়ে।সন্ধ্যের পরে মাহেরের সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যেত তার হাতের চমৎকার চা’য়ের সুবাদে,এখন সেটা রিনু বানায়; তার চা’তে স্বাদ নেই,ক্লান্তি কাটে না।মাহের আজকে অবাক হয়েছিলেন যখন দেখছিলেন, তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো অব্দি রিনু কিনে এনে দিচ্ছে।মাহের গোপনে ব্যথা লুকালেন।এতো ঘৃণা এখন?
গতদিন মাহের আইসক্রিম এনেছিলেন।জড়তা মাড়িয়ে নিজে থেকে তাকে ডেকে দিলে উত্তর আসে, তার ঠান্ডার সমস্যা আছে। খেতে পারবে না অথচ প্রচন্ড জ্বরেও আইসক্রিম ইগনোর করার বান্দা নয় সে।আজকে মনে করেই ফুচকা নিয়ে আসলেন।তার সামনে প্লেট রাখলে ডাগর ডাগর চোখতুলে তাকায় সে।এই সরল দৃষ্টি মায়া লাগে মাহেরের।মাহেরের ইচ্ছে করে, তার গালটা আলতো ছুঁয়ে দিতে।কপালে কোনো জাদু সুখ এঁকে দিতে, যে সুখে চোখ বুজে অভিমান ঝড়াবে সে।
আইরা স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘আমার এসিডিটি সমস্যা।দেখেননি সকালে গ্যাসের ওষুধ নিলাম?’
মাহেরও পাল্টা ছুরি চালালেন ‘খাও।অসুস্থ হলে ওষুধ আছে,আল্লাহ সুস্থ করে দিবেন।’
নাহ।কথা এগোনোর মতো মানসিকতা নেই তার। তাই কোনো কথাবার্তা ছাড়াই একটার পরে একটা না চিবিয়েই গিলতে লাগলো।প্লেট খালি হতেই চোখ জল ছাড়লো তার মাহের ইচ্ছে করে ঝাল ফুচকা এনেছেন।যাতে তার একটু কথা শোনা যায়, নীরব হয়ে যাওয়া পাখিটা একটু ছটফট করুক।এখন হয়তো করছেও।ওয়াশরুমের বদ্ধ দরজা পেরিয়ে তার আওয়াজ আসার কথা না।
আইরা আসলো,গুনে গুনে ঠিক মিনিট পনেরো পরে।সে ভেবেছিল মাহের চলে গিয়েছেন।অথচ উনাকে আগের মতো ঠায় বসে থাকতে দেখে একটু চমকালো।উনার কতশত গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে আছে নিশ্চয়ই।এভাবে সময় অপচয় করার মানুষ নন তিনি।
মাহেরের আশ্চর্যের সীমা ছাড়ালো যখন উনি বসে থাকা সত্ত্বেও আইরা কোনো ভাবাবেগে ছাড়াই বইয়ে মুখ ডুবালো।তার আচরণে সে বুঝিয়ে দিচ্ছে, সামনে বসা মানুষটাকে নিয়ে একটুও মাথাব্যথা নেই তার।এবার বোধহয় একটু ধৈর্যচ্যুত হলেন মাহের।তার মুখোমুখি ঝুঁকে বললেন, ‘এতো শাস্তি দিচ্ছো।আমি তোমাকে একরাত দিয়েছি আর তুমি প্রত্যেকটা দিন,প্রতিরাত।হুয়াই?’
আইরা জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন শাস্তিটা স্যার?’
‘বুঝতে পারছো না?’
‘না তো।’
মাহের উত্তর দিলেন না। ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে যেতেই বিদ্রুপের হাসি হাসলো আইরা।ষোলো আনার বিনিময়ে সে তো কেবল একআনা দিচ্ছে, এটাই সহ্য হচ্ছে না?
আজকাল আরহাম খুব বেশীই ব্যস্ত থাকেন।রামাদ্বান আসার পর থেকে উনার ব্যস্ততা যেন তিনগুণ বেড়েছে।সকালে বেরিয়ে গেলে আসেন রাত করে।তারাবীহ পড়ান এরপর শুরু হয় তালিম।নব যুবকদের নিয়ে তালিমের আয়োজন করা হয়েছে মসজিদে।আর লেকচারার হিসেবে তাদের সাথেই দীর্ঘসময় পার করেন তিনি।
দূ একদিন ছাড়া আজ আঠারো রামাদ্বান পর্যন্ত ইফতার করেছেন বাইরে।আজকেও এর ব্যতিক্রম হলো না।ইফতার আর মাগরিবের সালাত আদায় করতে গিয়েই মনে হলো,শরীরটা যেনো অত্যাধিক দূর্বল লাগছে হাফসার।কিন্তু আব্বু এ সময় চা খান।তিলাওয়াত শেষে আম্মু আব্বুকে চা দিয়েই রুমে আসলো হাফসা।অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটা হাতে নিলো।চেক করে দেখলো ইনবক্সে কোনো মেসেজ নেই।ফোন রেখে চোখ বুজলো সে।সারাদিনেও একটাবার কি মনে হয় না উনার,একটু খোঁজ নিই!
ঘড়িতে দশটা বাজে।ক্লান্ত।শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুম লেগে আসছিলো তাঁর।আর এতো দেরীতে ঘুম ভাঙ্গলো এখন।তড়িঘড়ি করে উঠে নামাজে দাঁড়ায় সে।ঘন্টা দেড়েক শেষে সালাত শেষ করে নিচে নামল।খিদে পেয়েছে হাফসার।ড্রয়িং রুমে মাইমুনার পাশে বসে খাবার তুলে নিতেই শুনতে পেলো তাদের কথোপকথন।আরহাম বাসায় এসেছেন আর তাঁরা দীর্ঘ সময় একসাথে গল্প করছিলো শুনেই মন খারাপ হলো তাঁর।নিজের ঘুমকে ভৎসনা দিতে দিতে উঠে আরহামের রুমের দিকে এগোলো।নাহ,অন্ধকার হাতড়ে উনার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেলো না।আরহাম ঘুমিয়ে পড়েছেন।একটু অপেক্ষা করা যেত না; নীরব অভিমান গায়ে মেখে নিজে এসেও শুয়ে পড়লো সে।আজকে তাঁর কিছুই ভালো লাগছে না।
মধ্যরাত বা সাহরির পূর্বক্ষণ।সময় আন্দাজ করা যাচ্ছে না।কিন্তু এলার্মও বাজছে না তাহলে তাঁর ঘুম ভাঙ্গার তো কথা না।কয়েক সেকেন্ড এর ব্যবধানে পরিচিত সুঘ্রাণে চোখ পিটপিট করে তাকালো।ড্রীম লাইটের আবছা আলোয় আস্তে আস্তে আবিষ্কার করলো প্রিয় মুখ।হাই তুলতে তুলতে কেবল জিজ্ঞেস করলো, ‘সাহরির সময় হয়ে গিয়েছে? এলার্ম তো বাজলো না।’
‘হয়নি।’
তাহলে কেন উঠবে সে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে চোখ বুজে এলো গভীর তন্দ্রায়।অথচ আরহাম আবার তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালেন।ওরনার কোণ সরু করে নাকে সুড়সুড়ি দিতেই হুলস্থুল করে উঠলো সে।আরহাম দেখলেন একজোড়া অনুভূতিহীন চোখের গাঢ় মায়া।
‘আই এম স্যরি!’
হাফসা কথা বাড়াতে চাইলো না।মাঝে মাঝে নীরবতার চেয়ে গাঢ় শাস্তি বোধহয় কিছুতে নেই।
‘ইট’স ওকে।’ বলে ঘুমাতে গেলে আরহাম একটানে তাকে বাহুতে এনে শোয়ালেন।চোয়ালে আঙ্গুল ধরে বললেন , ‘আপনি বললেন ‘ইটস ওকে’ আর আমি শুনেছি ‘আমি রেগে আছি’।
হাফসা কোনো কথাতেই টললো না।নির্বিকারচিত্তে বলল, ‘আমি কখনো আপনার সাথে রাগ দেখিয়েছি?’
‘দেখালে তাও ভালো হতো।এরকম ফেইক লুক নিয়ে থাকতেন না।’
‘আমি ঠিক আছি।’
‘আমি ঠিক নেই।’
‘কি হয়েছে?’
‘আমার চোখে ,নাকে,গালে,ঠোঁটে ,বুকে ব্যথা করছে।প্লিজ প্রেস ইট।’
হাফসা আদেশমতো আঙ্গুল এগিয়ে তুলতুল গালে টিপে দিতেই আরহাম চোখমুখ কুঁচকে বললেন , ‘আপনার হাত এতো শক্ত কেন।ব্যথা কমছে না বরং বাড়ছে তো উমায়ের।’
আরহামের চালাকি এবার বেশ ভালো স্পষ্ট হয়েছে হাফসার কাছে।চুপচাপ বসে চিরপরিচিত কাজ নখ খুঁটতে লাগলো সে।আরহাম আরও কয়েকবার তাগদা দিতে কাজে এগোলো সে।ধীরে ধীরে ঠোঁট নিয়ে গালে ছোঁয়াতেই আরহাম দূষ্টু হেসে বললেন , ‘এখন কম্ফোর্ট ফিল করছি,ক্যারি অন।’
আরহাম অনেকভাবে তার মন ভালো করার চেষ্টা করলেন।ব্যর্থ হয়ে আহত কন্ঠে বললেন , ‘আপনার রাগ করাটা ঠিক আছে ,উমায়ের।কিন্তু আমি ভেবেছিলাম রাতে আপনার সাথে থাকবো।’
‘আমি রাগ করছি না।এখন আমি ঘুমাব।’
‘ওকে।’
আরহাম ছেড়ে দিলেন।হাফসা একপাশ হয়ে চুপেচাপে শুয়ে পড়লো।শুধু আরহামের প্রতি অভিমানেই নয়,তাঁর বড্ড ক্লান্ত লাগছে।মাথার ভেতর শতেক চিন্তা নিয়ে তার ভয় হয়।অথচ সবকিছুর একমাত্র সমাধান উনি’ই।
বেশ কিছুক্ষণ পেরোলো।তন্দ্রায় নিমজ্জিত হওয়া চোখজোড়া ঘুমে বুজার আগে ঘাড় ফিরিয়ে আরহামকে দেখলো।তিনি এখনো মুখ ভার করে বসে আছেন।এবার খুব মায়া হলো তাঁর।আজকাল যা তা রিজনে লোকটাকে হেয় করে যাচ্ছে সে।কিন্তু আবার কিছুই যেনো নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকছে না।
হাফসা কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঘুমাবেন না?’
‘না।’
‘কেন?’
‘ইচ্ছে করছে না।’
‘ওহ।’
এবার আরেকটু নরম হলো সে।বলল, ‘একটু মন খারাপ ছিলো।এখন সেটা নেই,বুঝতে পেরেছেন? এখন ঘুমান।’
আরহাম তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন।কন্ঠে গভীর ব্যথা নিয়ে বললেন , ‘আমি আপনাকে চাই,এটা বুঝেও আপনি ইচ্ছে করে আমাকে অবহেলা করেন,এ জিনিসটা খুব খারাপ লাগে আমার।’
হাফসা মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে আরহামের পাশ ঘেষে বসলো।আরহামের হাতে হাত রাখলো না সে।আঙ্গুলে আঙ্গুল ছুঁতে গিয়েও জড়তা নিয়ে বলল, ‘আমার একটা রোগ হয়েছে।এ রোগের সমাধান হয়ে গেলে আমি ঠিক হয়ে যাবো।এরপর থেকে এমন হবে না আর।’
আরহাম তার চিবুকে চুমু খেয়ে বললেন , ‘আমার কাছে লজ্জ্বা পাওয়ার রোগ কোনোদিন ঘুচবে বলে মনে হয় না।এমন একটা দিন যদি আসতো,যেদিন আপনি নিজ থেকে আমার কাছে আসতেন।’
আরহামের স্পর্শ গাঢ় হতে চললো।হাফসার মনে হলো কাছে কোথাও তুমুল ঝড় হচ্ছে।আর ঠান্ডা বাতাসের জোয়ার তার দিকেই ধেয়ে আসছে।শিরশির অনুভূতি নিয়ে বলল, ‘সাহরির সময় হয়েছে।’
‘হোক!’
‘সত্যি হয়েছে।’
‘একঘন্টা সময় বাকি আছে।’
হাফসার আর কোনো হেতু রইল না আরহামের ডাক এড়িয়ে যাওয়ার।আরহাম উষ্ণ আঁচে গ্রীবাদেশে সিক্ত করতে করতে বললেন , ‘এরকম ভালোবাসার রাত জমাবো,পাঁচ সাতটা হলেই বেঁচে আসবো।সেই মুদ্রা দিয়ে একদিন জৌৎস্না কিনবো।লাজুক ফুলের মহামারী রূপ জৌৎস্নার আলোয় স্পষ্ট দেখে চোখের তৃষ্ণা মিটাবো।’
ক্যালেন্ডারে পাতা যেন চোখের পলকেই দৌড়াচ্ছে। একটা চ্যাপ্টারের পর আরেকটা চ্যাপ্টার খুব দ্রুত বদলাচ্ছে।শুধু বদলাচ্ছে না আদওয়ার অনুভূতি , বরং গাঢ় হচ্ছে হৃদয়ের আলপনায় আঁকা এক বিষাক্ত ভালোবাসার জখম।এই শহরের খামে প্রতিদিন কত ভালোবাসার গল্প জমে।ডাকপিয়নের ঢাকনা খুলে প্রিয় চিঠি বুকে মেখে কতজন স্বপ্ন বুনে।শুধু তাঁর ডাকপিয়নটা পরিত্যক্ত পড়ে আছে।সোনায় বাঁধানো আর অশ্রুজলে লেখা কাব্যগুলো কেবল স্থান পায় নোংরা কোনো গার্বেজে,ডাস্টবিনে।অথচ উনার প্রিয়জনদের অবহেলাগুলোও হয়তো উনি যত্নে কুড়িয়ে নেন বুকপকেটে।আদওয়ার মনে হয়,এই পৃথিবীতে খুব কম মেয়েরাই সব দিকে থেকে সুখী হয়।আর সেই লিস্টে উনার দূই আহলিয়া তো আলবাত উপস্থিত।উনি তো আদওয়ার আকাশের চাঁদ।যাকে কেবল দূর থেকে দেখা যায়,ছোঁয়া যায় না।কিন্তু আজকাল সেই চাঁদকে দেখাও যায় না।
সায়হানের টিসি হওয়ার পর থেকে মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে সে আর ঢুকতে পারে না।ঢুকতে গেলেই তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।পরিবারেও কমপ্লেইন আসে,সেগুলো সে পাত্তা দেয় না।যোহরোর সালাতের সময় উনাকে একপলক দেখার তৃষ্ণায় সে তপ্ত রৌদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকে।তাঁর চোখের অনিমেষ ক্লান্তি দূর হয়ে যায়,উনার এক পলক দেখা পেতেই।
রামাদ্বানে তার সেরা চাওয়া টা হচ্ছে,আরহাম।নিশ্চয়ই এর চেয়ে উত্তম সময় আর নেই।মোনাজাতে আষ্টেপৃষ্টে থাকা লোকটার পোকা তাঁর মস্তিষ্কে ঘুণে ধরেছে।তাই তো আজকাল নিজের কাজকর্মে সে নিজেই হতবাক।যেমন ছুরি দিয়ে ফ্রুটস কাটতে গিয়ে আনমনেই ভাবতে ভাবতে হাত কেটে ফেলছে,পড়তে বসে গিয়ে বইয়ের খাতাপত্রে প্রিয় নাম লিখে ভরিয়ে ফেলছে,একা একা কথা বলার খারাপ অভ্যাস জন্মেছে।মায়ের সাথে অযথা রাগারাগি আর ভাইকে নিয়ে উদাসীন হওয়ার পিছনের কারনটাও এই লোক।কি দারুণভানে তাঁর হৃদয় দখলে নিয়ে দিব্যি হেসেখেলে বাঁচছেন।এর একটা শেষ বিহিত হওয়া দরকার।ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথার ভেতর অদ্ভুত সব চিন্তারা দখল নিয়ে বসলো।
পরের দিন~
আরহাম রেডি হয়ে দেখলেন সে রুমে নেই।মাইমুনার রুম থেকে সাক্ষাৎ শেষে ড্রয়িং এ আসতে দেখলেন সে চেয়ারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তাঁর চোখদূটে বলছে,কাঙ্ক্ষিত জনের জন্যই এই অপেক্ষা।আম্মু আব্বু সোফায়।ড্রয়িং রুম টু কিচেন সার্ভেন্টদের আনাগোনা।আরহামের অর্ডার পালন করছে সে।কিচেনে তাকে দেখা যায় না আজকাল।তবে অপেক্ষা করার জায়গা তো ড্রয়িংরুম নয়।আরহাম তাঁর সামনাসামনি এসে দাঁড়ালেন।ঘড়ির হুক লাগাতে লাগাতে বললেন, ‘হাগ,চুমুটুমু কি এখানে দিব?সবার সামনে?আমার আপত্তি নেই।’
হাফসার মুখে হাত চলে গেলো।এসব ইন্সিডেন্টাল কথা না একটু দূরে বসা আম্মু আব্বুর কানে না চলে যায়।সে চোখ নামিয়ে বলল, উহু।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬১
আরহাম দেখলেন তার গাল দূটো লাল গোলাপি হয়ে গেছে।রুমে এসেই কোমল আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিতেই পকেটের ফোন টা উচ্চস্বরে বেজে উঠতেই আরহামের কপালে তিনটা ভাঁজ পড়লো।উনার কুঁচকানো ভ্রু দেখেই বুঝা গেলো এ মুহুর্তে কল আসায় তিনি চরম বিরক্ত।
কারো সাথে কথা বলে ফোন সাইলেন্ট করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেও উনার কুঁচকানো কপালের খাঁজগুলি যেনো মিশলো না।
উনার মুখের অভিব্যক্তি মুহুর্তেই বদলে গেলো।ভালোমতো বিদায় না নিয়েই দ্রুত বেরিয়ে গেলেন তিনি…
