Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২
রুপান্জলি

চট্টগ্রাম এস.আর. মির্জা’স গ্রুপের সামনে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার সাথে সাথে তিনজন গার্ড এগিয়ে গেলো সেদিকে। ডোর খুলতেই বেড়িয়ে এলো দ্বীপ,, তার সাথে অর্পনা। আজকেও দুজন সেইম আউটফিট,, বাদামি শার্ট আর ব্লাক পেন্ট। অর্পনা হেলিকপ্টার থেকে নামতেই ওর হাতে থাকা মোটা ফাইল আর ভেনিটি ব্যাগটা হাতে নিলো দ্বীপ । বিহান ওদের সাথে নেই,, সে আপাতত ভিলায় থাকা সবাইকে সেফটি দেওয়ার কাজে মিয়োজিত। বয়সে যতোই বড়ো হোক না কেনো,, তবুও এখানে আসা প্রতিটি ছেলে মেয়ে তাদের দায়িত্বে এসেছে,, তাদের খেয়াল রাখা আবশ্যেক। দ্বীপ অর্পনা পাশাপাশি হেটে লিফ্টে পৌছালো,, মিটিং রুম ৭ তলায়। অর্পনা একটা জিনিস খেয়াল করলো দ্বীপদের প্রতিটা অফিস ১০ তলা করে এবং একই ডিজাইনের। মিটিং রুমে পৌছাতেই ৬ জন ক্লায়েন্টের দর্শন পেলো অর্পনা ,,

যারা আগে থেকেই তাদের জন অপেক্ষা করছিলো। আর ম্যানাজার দায়িত্বের সহিত উনাদের কোম্পানি দিচ্ছিলেন। এটা বরাবরি হয়,, যখন মিটিং এ মির্জা বাড়ির কেউ উপস্থিত থাকে তখন ক্লায়েন্টদের অপেক্ষা করতে হয়। মির্জাদের দিয়ে কাজ করানো অনেকেরই ড্রিম। মাঝমধ্যে ওদের সিডিউল ফাকা থাকেনা। তখন কেউ কেউ টানা দুই বছর কাজ পেন্ডিং এ রেখে দেয় তবুও অন্য কোথায় সাবমিট করে না। অর্পনা আর দ্বীপকে আসতে দেখে ম্যানাজার সরে গেলেন। অর্পনা সালাম জানালো সবাইকে,, টুকটাক আলাপ করলো। দ্বীপ মুগ্ধ দৃষ্টিতে বার বার অর্পনাকেই দেখে,, একটা মেয়ে এতো পারফেক্ট কি করে হয়? সবাই বলে অর্পনা নাকি লাফাঙ্গা, উগ্র, ম্যানার্সল্যাস, ওর পাপ্পা ওকে ভালো শিক্ষা দেয়নি অথচ দ্বীপের দেখা সবচেয়ে পারফেক্ট মানুষ হচ্ছে এই রমনি। তার নিজের থেকেও বেশি পারফ্যাক্ট মনে হয় অর্পনাকে। কূসলাদি বিনিময় করে অর্পনা সোজা কাজের কথায় চলে গেলো আপাতত টাইম ওয়েস্ট করার মতো টাইম অর্পনার হাতে নেই। অর্পনাকে কাজে ফোকাস করতে দেখে বাকি ছয়জন ও সিরিয়াস হলো। অর্পনা পুরো একটা প্রজেক্ট বড়ো স্ক্রিনে ধীরে প্রেজেন্ট করলো। এখানে বিল্ডিং এর ডিজাইন থেকে শুরু করে, কোন সিমেন্ট ইউস করা হবে,, ভীমের রড কতো মিটার হবে,, ছাদের কোন রড ইউজ করা হবে। ১১-১২ তলার ভীম কতোটা গভীর থেকে তৈরি করা হয়,, প্লাস্টার কেমন হবে,, রং কেমন হবে,, প্রতিটি রুমে ঠিক কি ধরনের আসবাব রাখা হবে সবটা ডিটেলে দেখালো। বর্তমান প্রজেক্টে ১৭ টা বিল্ডিং তোলা হবে,, এটা করতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই বছর। কারন একটা বিল্ডিং এর ছাদ ঢালাইয়ের পর সেটা পারফেক্ট হতে সময় লাগে ২০-২৫ দিন কিংবা তারো বেশি। এই ক্ষেত্রে ১১-১২ তলার একটি রেসোর্ট বানাতে দের- দুই বছর সময় লাগবে। এরপর বাকিটুকু সময় প্লাস্টার, ডেকোরেশন আর আদার্স ফরমালিটিসের জন্য। সেই সাথে বিল্ডিং এর এক্সেক্ট খরচ, তাদের কোম্পানির বিল,, ভ্যাট, ডিসকাউন্ট, সম্পূর্ণ টা দক্ষতার সাথে প্রেজেন্ট করার পর ক্লায়েন্টরা ভাবুক হলেন, নিশ্চয়ই নিজেদের মনে হিসেব নিকেশ করছে। অর্পনা এই ফাকে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো,, কেমন হয়েছে? দ্বীপ গর্বিত দৃষ্টিতে তাকালো,, ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবির করে বললো — সু পারফ্যাক্ট।

,,, বিরবির করে বললেও অর্পনা বুঝে নিলো। মুচকি হাসলো সে,, হাসবেন্ডের দৃষ্টিতে থাকা মুগ্ধতা তাকে বিমোহিত করছে। অর্পনা একটা জিনিস খেয়াল করলো, রাজনীতি বীদ দ্বীপ মির্জা যতোটা অগোছালো, উগ্র। বিজন্যসম্যান দ্বীপ মির্জা সম্পূর্ণ তার উল্টো। রাজনীতিতে সে মারমুখো, অসৎ, খুনি, ঠকবাজ, প্রতারক হলেও বিজনেস লাইফে একজন আদর্শ মানব। এর একটা মুখ্য কারন রয়েছে, সেটা হলেন মাহিদ মির্জা। বাবা চাচার পর তিনি ই এই বিজন্যাসের হাল ধরেছিলেন,, একা হাতে সামলিয়েছেন সবটা। এই এতো বছরের ক্যারিয়ারে এক ফোটা অসৎ কাজ তিনি করেননি,, তাই দ্বীপ বাবাকে সম্মান করার খাতিরে সেও কোম্পানিতে এক টুকরো অসৎ কিছু হতে দেয়নি। এখন ও না আবার সাত বছর আগেও না। অনেক ভাবনা চিন্তার পর ক্লায়েন্টরা তাদের মতামত রাখলো,, তবপ মতামত অর্পনার হিসেব মাফিক হলো না,, সে আরেকটু বাড়ালো,, ক্লায়েন্টরা আপত্তি প্রকাশ করলো,, অর্পনা আর কিছুটা কমালো,, এই পর্যায়ে মেনে নিলেন তারা। ডিল সাইন করা হলো,, ডিল সাইন হতেই ছয়জন ধীরে ধীরে উঠে দাড়িয়ে দ্বীপের সাথে হেন্ডসেক করে হাগ করলো ,, অর্পনার দিকে হাত বাড়াতেই অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকালো। অনুমতির আশায়,, দ্বীপ চোখের ইশারায় শায় জানালো,, এখানে থাকা পাঁচ জন ই আরশাদ জামানের থেকে বয়স্ক, অর্পনার বাবার সমান,, অর্পনাও তাদের মেয়ের সমান। অর্পনা মিউচুয়াল্লি পাঁচ জনের সাথে হেন্ডসেক করলো। ষষ্ঠ জন যিনি,, সে কিছুটা ইয়াং আর ভদ্র,,সে নিজ থেকেই হেন্ডসেক করতে চায়নি, অর্পনা কঙ্গ্রেট্স জানিয়েছে,, লোকটা সেটা গ্রহন করে ধন্যবাদ জানিয়েছে। দীর্ঘক্ষন আলাপ চারিতার পর মিটিং রুম খালি হলো। ক্লায়েন্টরা চলপ জেতেই অর্পনার কাছে এগিয়ে এলো দ্বীপ,, অর্পনা নিজ থেকেই দ্বীপকে জড়িয়ে ধরলো। দ্বীপ অর্পনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো — আমার ব্লাড ভেলোরা। ইউ আর সু ট্যালেন্টেড।

,,, অর্পনা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপকে। দ্বীপ ওকে নিয়ে চেয়ারে বসে পরলো,, কোলে বসিয়ে গালে চুমু খেলো পরপর কপালে, নাকে, থুতনিতে ঠোটে। অর্পনা সানন্দে মেনে নিলো সেসব,, দ্বীপ অর্পনার সামনে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে বললে — তুমি বিষয়টা প্রোফেসনাল্লি নিতে পারো,,
,,, আমি জব করবো? কতো সেলারি দিবেন?
,,, এই প্রফেশনে মান্থলি দের-লাখ দেওয়া হয়,, তোমায় নাহয় আমার অংশ থেকে ৫০% শেয়ার দেওয়া হলো৷ জব করতে হবে না,, নিজের বিজন্যাস নিজে সামলাবে।
,,, অর্পনা নাকোচ করে বললো — আই ডন্ট লাইক দেট,, আমি সিঙ্গার হতে চাই।
,,, তাহলে গানটা প্রোফেসনাল্লি নেও।
,,, নিলাম তো,,
,,, এভাবে নয়,, প্রকাশ্যে।
,,, নাহ!! আমি কোনোদিনি নিজেকে প্রকাশ করবো না। আমার দুটো সত্তা, একটা অর্পনা যাকে আমি ভালোবাসি। আর অন্যটা পৃথা, যাকে সবাই ভালোবাসে। চলুক না এভাবেই,, আমি চাইনা ভালোবাসার মানুষ গুলো পৃথা রুপে অর্পনাকে দেখে পৃথাকে ঘৃনা করুক।

,,, আমার অর্পনাকে ঘৃণা করবে,, এতো সাহস কার?
,,, সবাই অর্পনার প্রতি বিরক্ত।
,,, আমি অর্পনাতেই আসক্ত!!
,,, দ্বীপের সামান্য উত্তরে অসামান্য আবেগ পেলো অর্পনা,, বুকের ভিতর কি যে হচ্ছে,, বলে বুঝানোর যো নেই। এই লোকটা একটা মায়া,, সত্যি ই আস্ত এক মায়ার-পিন্ড। অর্পনা অনুভব করলো দ্বীপ যদি আদির চেয়েও মারাত্মক ভাবে তাকে হার্ড করতো তাহলেও সে দ্বীপের প্রতি শোধ নিতে পারতো না। লোকটা তার বড্ড মায়ার ,, শুরুতে অবুঝ ছিলো কিনা? তাইতো এতো মায়া তৈরি হলো,, ঐ মায়ার কাছে টুকটাক ভুল গুলো এখন আর ধরা দেয়না। আর মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট কথা, দ্বীপ অর্পনাকে ভালোবাসে,, পৃথাকে নয়,, শুধুই অর্পনাকে যেটা অর্পনা বরাবর চেয়েছিলো।

,,, কাজ শেষ করে অফিস থেকে বের হতে হতে বেলা তিনটা,, অর্পনা আর দ্বীপ এখন ভিলাতে ফিরে যাবে,, ওখানে সবাই ওদের জন্য অপেক্ষা করছে,, নিচে নামতেই বড়ো বড়ো গাছগুলোর ছায়া তলে আরশাদ জামানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো দুজন। অর্পনা দৌড়ে গিয়ে পাপ্পার সামনে দাড়ালো,, আরশাদ জামান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অর্পনা দুহাতে জড়িয়ে ধরলো,, ডিল ফাইনাল হওয়ার কথা জানালো। আরশাদ জামান জানতেন উনার মেয়ের দ্বারা সব সম্ভব। তিনি গর্বের সহিত মেয়ের প্রশংসা করলেন,, পাপ্পার প্রশংসায় পুলকিত হলো অর্পনা। দ্বীপ ততোক্ষণে ওদের কাছে পৌছে গিয়েছে। আরশাদ জামানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো — এখানে দাড়িয়ে ছিলেন কেনো? ভিতরে যাওয়া উচিৎ ছিলো।

,,, আরশাদ জামানের গম্ভীর মুখে হাসি ফুটলো, অর্পনাকে নিয়ে দ্বীপের সামনে দাড়ালেন। একজন ডিটেকটিভকে বরাবরি লম্বা চওড়া দেহের অধীকারি হতে হয়। সেই মতে আরশাদ জামান বড্ড লম্বা দেহি পুরুষ,, সাথে বেশ শক্তপোক্ত মানব। অথচ দ্বীপ উনার থেকেও বেশ বলিষ্ঠবান, লম্বায় কয়েক ইঞ্চি বেশি,,দ্বীপকে তিনি যতোবার দেখেন ততোবার অন্তকরন শান্ত হয়,, ছেলেটা অসম্ভব সুন্দর,, একটু বেশি ই সুন্দর। আদিটাও সুন্দর তবে উনার মেয়ের যোগ্য না। অর্পনার পাশে দ্বীপকে বড্ড মানায় বললে ভুল ই হবে বরং দ্বীপের তুলনায় অর্পনা বড্ড খাটো,, ৩ ইন্চি হিল পরার পরেও কাধ ছুতে পারছেনা,, তবুও আরশাদ জামানের চোখে উনার মেয়ে আর মেয়ের জামাই সর্বকালের সেরা জুটি। এই প্রথম দ্বীপের কাধে হাত রাখলেন আরশাদ জামান,, নরম স্বরে বললেন —
,,, আমায় ইমেডিয়েটলি নোয়াখালী যেতে হবে,, বিষয়টা সিরিয়াস। সাবধানে থেকো আর আমার মেয়েকে যত্নে রেখো,, দেখো যেনো আমার মেয়ে যত্নের অভাবে কখনো আমায় মিস না করে।

,,, দ্বীপের গম্ভীর মুখেও হালকা হাসি ফুটলো। শ্বশুরটা যখন ভালো বিহেব করছে সেও নাহয় করলো। এমনিতে যতোই প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো আচরন করুক,, শ্বশুরকে তার বেশ পছন্দ। অর্পনা আরও শক্ত করে পাপ্পাকে জড়িয়ে ধরলো,, কিছুটা দূরেই আরশাদ জামানের গাড়ি দাড়িয়ে। দ্বীপ একবার উনাকে বললেন যেনো হেলিকপ্টারে করে চলে যান কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। তিনি বড্ড আত্মসম্মানিয় লোক,, মেয়ের জামাই বড়োলোক হওয়ার ফায়দা লুটার মতো মানুষ তিনি নয়। অর্পনা আর দ্বীপ উনাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। যাবার আগে অর্পনার বার্থডে গিফ্ট স্বরুপ একটা বক্স দিলেন সাথে ফেভারিট কিছু চকলেট,, বেশ খুশি হলো অর্পনা। দেখেই মনে হচ্ছে এটার ভিতর ওয়াচ রয়েছে,, আর ওয়াচ জিনিসটা তার বরাবরই প্রিয়।সাথে পাপ্পার দেওয়া ওয়াচের তো কোনো তুলনাই হয়না। আরশাদ জামান চলে যেতেই অর্পনা ওয়াচের বক্সটা আনবক্স করলো। তাতে একই মডেলের দুটো ঘরি,, দেখেই বুঝা যাচ্ছে একটা দ্বীপের জন্য। দ্বীপ ম্যাক্সিমাম টাইমেই সিলভার প্লেটের ওয়াচ ইউজ করে তবে আরশাদ জামান যেটা দিয়েছে ওটা ব্লাক। অর্পনা ভ্রু উচিয়ে প্রশ্ন করলো — পছন্দ হয়নি?

,,, দ্বীপ হাত এগিয়ে দিলো,, অর্পনা প্রথমে বুঝলো না পরক্ষণেই বিষয়টা ক্যাচ করতে পেরে প্রফুল্ল হেসে দ্বীপের হাতে থাকা সিলভার ওয়াচটা খুলে আরশাদ জামানের দেওয়া ওয়াচটা পরিয়ে দিলো পরপর নিজের হাতেরটা খুলে সেও ব্লাক ওয়াচটা পরে নিলো। অর্পনা দুজনার হাত মিলিয়ে হেন্ডশেক করার মতো করে ধরলো,, রাত মাঝেমধ্যে সেইম ড্রেস হলে এভাবে ছবি তোলে,, সেও চেষ্টা করলো। দ্বীপকে বললো একটা পা এগিয়ে দিতে,, দ্বীপ তার বউয়ের কার্যকলাপে কিছুটা বিরক্ত,, এসব সে পছন্দ করেনা কিন্তু মানাও করলো না,, এক পা এগিয়ে দিলো। অর্পনাও তার এক পা এগিয়ে দ্বীপের পায়ের সমান সমান করলো। বাম হাতে দ্বীপের বাম হাত ধরে উপর থেকে একটা ছবি তুললো। সেইম ড্রেস, সেইম পেন্ট, সেইম স্যুজ, সেইম ওয়াচ শুধু একজনার বিগ সাইজের হাত পা,, আরেকজনার মিনি সাইজের হাত পা৷ ছবি তোলা শেষ হতেই অর্পনার কাধ পেচিয়ে ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো দ্বীপ,, এভাবেই হেটে গেলো হেলিকপ্টারের দিকে।

,,, রাতের মন বেশ খারাপ,, এখনো পর্যন্ত কারোর সাথে একটা কথাও বলেনি। সারাক্ষণ তার জন্য নির্দিষ্ট করা ঘরটায় বসে ছিলো। অরুন, ইরা বহুবার ডেকেছে কিন্তু দরজা খুলেনি। মেধা, পরশিও এসেছিলো তবে পল্লব একবারও আসেনি। পল্লবের উচিৎ ছিলোনা রাতকে একবার সরি বলা? বলেনি,, তাদের বন্ধু মহলের কেউ কখনোই এমনটা করেনি,, সবাই তো জানে রাত একটু বেশি আবেগি। তাই বরাবরি সে রাগ করলে সবাই সাথে সাথে সরি বলে দেয়,, পল্লব ও বলে কিন্তু আজ বলেনি। কেনো বললো না? কিসের এতো দেমাগ তার? পল্লবের দেমাগের কথা ভাবতে গিয়ে রাতের মনে পরলো সে পল্লবকে কি বলেছে। কথাটা আরও একবার মনে মনে আওড়াতেই মাথা চুলকালো,, তার কি আদেও ওই কথাটা বলা ঠিক হলো? পল্লবের দ্বারা তার জীবন নষ্ট হবে এটা সয়ং ফ্যারেস্তা এসে বললেও তো তার বিশ্বাস হবেনা তাহলে তার মুখ দিয়ে কি করে কথাটা প্রকাশ পেলো? পল্লবটা নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়েছে? ভাবনাটা মনে আসতেই দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো রাত, দরজার সামনে অরুন, ইরা দাড়িয়ে। অর্পনা আর দ্বীপ এখনো ফিরেনি,, ওদেরকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হলো। এরা এতোক্ষণ এখানেই দাড়িয়ে ছিলো নাকি? রাতকে বেরুতে দেখে অরুন ওকে একপেশে নরমাল্লি জড়িয়ে ধরলো,, কিছুটা ধমকের স্বরে বললো — এরকমটা কেনো করলি রাত? চিন্তা হয়না? এটুকুতে এতো রাগ করার কি হলো?

,,, রাত্রি অরুনের বাহু থেকে মুখ তুলে ঠোঁট উল্টালো,, পরপর আবেগি কন্ঠে বললো — আমার কেনো যেনো খুব রাগ হয়েছিলো।
,,, রাতের আবেগি কন্ঠে গলে গেলো অরুন,, গালে হাত রেখে সুধালো– এখন রাগ কমেছে?
,,, কমেছে,, কিন্তু পল্লব কোথায়? ও খুব রাগ করেছে তাইনা?
,,, ইরা নাকোচ করে বললো– ওহুম,,, কষ্ট পেয়েছে। তর এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি রাত,, পল্লব কিন্তু এমন নয়। হয়তো বহুবার না বলে তর নোট্স নিয়েছে,, এসাইনমেন্ট নষ্ট করেছে,, তকে পচায়,, ঝগড়া করে,, বাট কখনোই তর ক্ষতি চায়নি।
,,, রাত্রি অনুতপ্ত হলো,, মাথা নিচু করে বললো — ও কোথায়? একবার সরি বলে আসি।
,,, কটেজ আর ভিলার মধ্যবর্তি জায়গায় যেই ব্রিজটা আছে,, অনেক্ষন যাবত ওখানেই বসে আছে। যাহ গিয়ে সরি বল,, পল্লব প্রাণোচ্ছল মানুষ,, বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবে না।
,,, রাত্রি মাথা ঝাকালো,, অরুনের হাত ধরে বললো — চল আমার সাথে,, আমার কেমন জানি ভয় করছে। পল্লব যদি ধমক দেয়?
,,, অরুন রাতের হাত ধরে এগুতে এগুতে বললো — অনাহিতা আপু বলেছে,, পল্লবকে জায়িন নামে ডাকলে ও খুব সেন্টিমেন্টাল হয়ে যায়। ওর দাদু রেখেছিলো তো!! লাস্টবার যখন ও আমার সাথে রাগ করেছিলো,, আমি এই ট্রিক্সটাই ফলো করেছিলাম। তুই ও একই কাজ করবি,, ঠিক আছে?
,,রাত্রি ফের মাথা ঝাকালো। অরুন আর রাতের সাথে সাথে ইরাও গেলো,, তিনজন মিলে ঠিক ওর রাগ ভাঙাতে পারবে।

,,, ছোট্ট বুকে মেঘ জমিয়ে কেনরে কাদিস পাখি,,
,,, তুই ফিরবি বলে আমি কেমন সন্ধা নামায় রাখি,,
,,, বারংবার এই লাইন টুকুতেই শিষ বাজাচ্ছে পল্লব,, দৃষ্টি কাঠের তৈরি রাস্তায়,,মাথা নিচু করে ব্রিজের রেলিঙে বসে আছে। পাশে এসে দাড়ালো রাত,, ঠোঁটে হাসি,,পল্লবের শীষ বাজানো লাইনের পরের টুকু গুনগুন করে গাইলো,,
,,, ছোট্ট তর ঐ ওমের ডানায় নাক ঘষতে দিবি কি?
,, বুকের ভিতর ঘুলঘুলিতে একলা পাখি হবি।
,,, ( কিছুটা মুখ ভেঙচিয়ে) হুহ!! আমিও পারি, হয়তো তর মতো শিষ বাজাতে পারিনা কিন্তু গান তো গাইতে পারবো নাকি?
,,, রাতের কন্ঠ শুনে রেলিং থেকে নেমে পরলো পল্লব,, ভিলার দিকে পা বাড়াতেই হকচকিয়ে গেলো রাত্রি। তাড়াহুড়ো করে পল্লবের হাত টেনে ধরলো। নরম স্বরে বললো — সরি জায়িন,, আমার এভাবে রিয়্যাক্ট করা উচিৎ হয়নি।
,,, পল্লব চোখ মুখ শক্ত করে রাতের দিকে তাকালো। পল্লবের চোখ লাল,, রাত্রি ভ্রু কুচকে নিলো। ওর কথায় পল্লব কেদেছে নাকি? হুট করেই নাকে উদ্ভট গন্ধ ঠেকলো,, সিগারেটের স্মেল,, রাত্রির ভ্রু শিথিল হয়ে এলো। অবাক কন্ঠে সুধালো — তুই সিগারেট খাস?

,,, পল্লব উত্তর করলো না, হাত থেকে রাতের হাতটা সরিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো– আমার থেকে দূরে থাক নয়তো তর জীবন নষ্ট করে দিবো।
,,,পরপরই আবারও ভিলার দিকে হাটা দিলো। অরুন আর ইরা কিছুটা দূরে দাড়িয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে। রাত্রি ঠোঁট উল্টে বুঝালো,, পল্লব কথা শুনছেনা। ততোক্ষণে পল্লব অরুনদের কাছাকাছি পৌছে গিয়েছে। অরুন আর ইরা বাকি পথ এগিয়ে এসে পল্লবের পথ আটকালো। অরুন পল্লবের কাধে হাত রেখে বললো — থাক না ভাই,, বুঝিস ই তো। রাত একটু বেশি ই অবুঝ,, বাদ দে।
,,, পল্লব ওদের সাইড কাটিয়ে বললো — তরাও দূরে থাক নয়তো তদের জীবন ও নষ্ট করে দিবো।
,,, ওরাও হতাশ হলো,, এই ছেলে এখন একজনার রাগ সবার উপর দেখাচ্ছে। এই মুহুর্তে অর্পন ই ভরসা। ইরা পা দিয়ে কাঠের রাস্তায় বারি মেরে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো –+ এই অর্পনের বাচ্চাটাও না,, জামাই পেলে কিছু মনে থাকে না। আসার কথা ছিলো তিনটায়,, এখন বাজে চারটা। কে জানে জামাই নিয়ে কোন চুলোয় প্রেম করতে ঢুকেছে।

,,,সমুদ্রের পাড়ে মাদুর বিছিয়ে ইফতারের আয়োজন করছে সবাই,, আজ মেধাও আছে তাদের সাথে,, তবে কিছুক্ষণেই বেড়িয়ে যাবে,, ইফতার আইটেম রেডি হলেই বিহান ওকে নিয়ে চলে যাবে। সামনেই হেলিকপ্টার ল্যান্ড করা,, ঢাকা পৌছাতে বড়োজোর ৩০ মিনিট লাগবে। মেয়েটা যেতে ইচ্ছুক না, সবার সাথে সময় কাটাতে তার ভালো লাগে।কিন্তু রোমানা বেগমের তিব্র নিষেধ রয়েছে,, এমতাবস্থায় জ্বীন জাতির নজরে আটকানো খুবি খারাপ লক্ষন,, মিসক্যারেরজ হয়ে যায়,, আর উনি কিছুতেই চাননা উনার পরিবারের প্রথম নাতির কোনো ক্ষতি হোক। বিহান আর মেধাও চায়না,, তাই অনেক নিয়মাবলি মেনে চলে। ইফতার রেডি করতে থাকা পাঁচ রমনিকে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে ,, সবাই থ্রিপিস পরা, মাথায় বড়ো করে ঘোমটা দেওয়া। এই ব্যাপাটাতে অর্পনার প্রতি প্রতিবার মুগ্ধ হয় দ্বীপ,, মেয়েটাকে ঘোমটা দিলে নতুন বউদের মতো লাগে,, যদিও অর্পনা তার জন্য নতুন ই আগে তো পারুর মনে করতো। পারুর কথা মনে আসতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো দ্বীপ,, সরাসরি আকাশের দিকে তাকালো,, আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করলে নাকি সরাসরি আল্লাহ এর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়,, সেই সাথে বর্তমানে সে রোজাদার। দ্বীপ গভীর মনোযোগে আল্লাহ এর কাছে আরজি জানালো — আমার ওয়েলি লেডিকে ভালো রেখো মালিক, কষ্ট দিওনা।

,,, পরশির ছুকছকানি স্বভাব এখানেও স্থির,, সে একবার এখান থেকে নিয়ে খাচ্ছে আবার ওখান থেকে নিয়ে খাচ্ছে। আবার কখনো শরবত টেস্ট করার নাম করে নানান তৃপ্তি দায়ক কথা বলে সবাইকে বিভ্রান্ত করছে। পরশীর কান্ডে রাতের পেট গুরগুর করছে,, মেয়েটা একদমি খিদা সহ্য করতে পারেনা। সে কয়েকবার পেটে হাত দিয়ে পরশীকে এমন করতে না করেছে। অরুন আর রাতের সম্পর্কটা আগের মতো হলে বর্তমানে বেশ জ্বালাতে ওকে,, পল্লব থাকলে আরও বেশি জ্বালাতো। পল্লবের মন খারাপ,, ছেলেটা এখনো কারোর সাথে প্রয়োজনের বাহিরে কথা বলেনি,, ঐতো একা একা সমুদ্রের পাড়ে ভাঙা গাছের গুড়ির উপর বসে আছে,, কি করছে কে জানে? পরশীকে এমন করতে দেখে ধমক দিলো মেধা,, সে ঠোঁট উল্টে উঠে দাড়ালো। নালিশ জানাতে ভাইয়াদের কাছে গেলো। দ্বীপ আর বিহান প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ছিলো,, পরশি একটা চেয়ার টেনে বিহান আর দ্বীপের মাঝখানে বসলো। বিহানের কাধে মাথা রেখে মেধার নামে নালিশ করলো — দেখলে ভাইয়া? ভাবি আমায় খাওয়ার জন্য খোটা দিয়েছে,, পাশের বাড়ির ভিড়ালটাকে আম্মু যেভাবে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় আমাকে ওভাবে তাড়িয়ে দিয়েছে। তোমার বউকে কিছু বলো।
,,, বিহান মেধাকে মিথ্যা মিথ্যা শাসন করার ভান ধরে বললো– কি হয়েছে মেধা রানি? আমার বোনটা নাহয় একটু চোর,, চুরি করেই খায়। আবার রোজাদারকে বিরক্ত করে,, এতে এমন কি হলো যে তুমি ওকে বকলে? শুনো এর পর থেকে আমার বোন ডাকাতি করলেও ওকে তুমি কিছু বলবেনা। একটা মাত্র বোন আমার। সে চুরি ডাকাতি না করলে কে করবে?

,,, পরশি চোখ ছোট ছোট করে বিহানের দিকে তাকালো,, এটা কি ছিলো? তাকে এতোটা সসম্মানে অপমান করতে পারলো তার ভাই? পরশি ফের ঠোঁট উল্টালো,, এবার দ্বীপের কাছে বিহানের নামে নালিশ করলো। দ্বীপ বিরক্ত হলো বিহানের প্রতি, কয়েকটা ধমক ও দিলো। এই পর্যায়ে পরশি বেশ খুশি। বড়ো ভাইয়ার হাতের বাহু ধরে তাতে মাথা ঠেকিয়ে আবদার করে বললো — ভাইওও!! আজকে সন্ধার পর আমরা পাবলিক বিচে যাবো,, প্লিজ!! ওখানে অনেক মজা হয়,, মেলাও হয়,, নিবে?
,,,দ্বীপ পারশীর মাথায় হাত বুলিয়ে কথা দিলো নিয়ে যাবে। ভাইয়ার কথায় মন ভালো হয়ে গেলো পরশীর,, সে বিহানকে ভেঙচি কেটে সমুদ্রের পাড়ে গেলো। পল্লব এক দৃষ্টিতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে,, একটার পর একটা ঢেউ এসে বালি কনা ভিজিয়ে দিচ্ছে, সেটাই মন দিয়ে পরখ করছে পল্লব। পরশী ওর পাশে গিয়ে দাড়ালো,, কিছুটা উকি মেরে প্রশ্ন করলো–

,,,, হিরো!! আপনার কি মন খারাপ?
,,, পরিচিত কন্ঠ শুনে পাশ ফিরে তাকালো পল্লব,, পরশীকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক ভ্রু উচিয়ে প্রশ্ন করলো — কি বলে ডাকলে?
,,, হিরো!! আপনি তো হিরোই,, তামিল মুভির নায়কদের মতো সুন্দর।
,,, মুচকি হাসলো পল্লব,, বিচলিত হলো না। সোজা সাপ্টা প্রশ্ন করলো — তুমি কি সত্যি ই আমায় পছন্দ করো? লাইক হাসবেন্ড টাইপ?
,,,, পল্লবের সোজা সাপ্টা কথায় থমথমে খেয়ে গেলো পরশী,, পরোক্ষনেই নিজেদের বংশ পরম্পরা ধরে রাখতে নির্লজ্জের মতো বললো — হুম,, খুব পছন্দ করি,, আপনাকে দেখলেই আমার কেমন যেনো লাগে। বুকের ভিতর থাকা হৃদযন্ত্রটা ধরাস ধরাস করে উঠে।
,,, এই পর্যায়ে ও মুচকি হাসলো পল্লব,, সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউ গুলোর দিকে নজর স্থির করে বললো — বেলা বোসের নাম শুনেছো? ওইযে ঐ গানটা,,

“”চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো? এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না। সমন্ধটা এবার তুমি ব্যাস্তে দিতে পারো,,মাকে বলে দাও বিয়ে তুমি করছো না। “”
আমায় ভালোবাসলে আমার প্রেয়সীর হাল হবে বেলা বোসের মতো। এইযে তোমার ইরাপু,, তোমার অরুন ভাই,, ওদের মতো আমি কিন্তু অতো বড়োলোক নই। আমাদের এক তলা ছোট বিল্ডিং,, বাবা কোম্পানির জব করে,, মা গৃহিণী তবে বাড়িতে স্টুডেন্ট পড়ায়,, বড়ো বোনের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর হবে,, ছোট একটা বোন। বাবার বয়স হয়েছে,, খুব দ্রুতই আমাকে সংসারের হাল ধরতে হবে অথচ আমার পড়ালেখা এখোনো শেষ হয়নি। পড়াশোনার পাঠ চুকাতে আরও তিন বছর,, তারপর চাকরি খোজা। বাংলাদেশে চাকরি পাওয়ার চান্স কতোটা নিশ্চয়ই জানো? চাকরি পেতে পেতে আরও কয়েক বছর,, এর মধ্যে ছোট বোনের বিয়ে,, ছোট বোনকে বিয়ে না দিয়ে আমার বিয়ে করা সম্ভব নয়। আর এই পর্যন্ত আমার প্রেয়সী অপেক্ষা করতে পারবে না,, তার বয়স হবে অনেক। লোকে নানান কথা বলবে। তারপর সেসব মানতে না পেরে হুট করেই প্রেয়সী তার পরিবারের কথায় অন্যথায় বিয়ে করে ফেলবে। সে পরবে লাল শাড়ি আর আমি ধরবো নে*শা। সে করবে স্বামীর ঘর আর আমি নষ্ট করবো আমার বাবা মায়ের স্বপ্ন। মধ্যরাতে তার স্বামী যখন তাকে কাছে টেনে নিবে আমি তখন ভাঙা কাচে নিজের জীবন বিলানোর চেষ্টায় মাতবো। একদিন চেষ্টা করতে করতে হাড়িয়ে যাবো অজানায়।

,,, পল্লবের ভারি কথাগুলো বড্ড কঠিন ঠেকলো মেয়েটার কাছে,, সে পলক ঝাপটে প্রশ্ন করলো — আপনি কাউকে ভালোবাসেন হিরো?
,,, পল্লব তাচ্ছিল্য হাসলো– মধ্যবিত্যরা খাবার হজম করার সময় পায় না আবার ভালোবাসা,!!
,,, এই পর্যায়ে ও বুঝলো না মেয়েটা,, খাবার হজম করার সাথে ভালোবাসার কি সম্পর্ক। তাই আপাতত এটা বাদ দিলো,, সে আরও একবার সোজা সাপ্টা মনের অনুভূতি প্রকাশ করলো — আপনি আমায় ভালো বাসবেন হিরো? আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো,, বেলা বোস ও হবো তবে বেলা বোসের মতো ছেড়ে যাবো না।
,,,পল্লব শব্দ করে হাসলো,, হাতে থাকা পাথরটা সমুদ্রের পানিতে ছুড়ে মারলো। হাসার তোপে মশৃন চুলগুলো দুলে উঠলো,, এই চুলগুলোতে কোনো কৃত্রিমত্তা নেই,, হয়তো জন্মগতই চুলগুলো এমন। পল্লব হাসি থামিয়ে ফের হেসে বললো– হাসালে মেয়ে!! আমার সাথে তোমার যায়? ধরো আমি চাকরি পেলাম,, বেতন কতো হবে?

সরকারি চাকরি হলে ৫০ হাজার। কোম্পানির হলে বড়োজোর ১ লাখ,, এর মধ্যে সংসার খরচা,, ভবিষ্যতের জন্য সেভিংস,, সন্তান সন্ততি হলে তাদের আলাদা খরচা। এটুকু টাকায় তোমায় গুছাতে পারবো? আমি মাসে যা কামাবো তুমি এক শপিং এ তার দ্বীগুন খরচা করো। জীবনটা ফ্যান্টাসি নয়,, এখন তোমার কাছে দুর্বা ফুলকেও গোলাপ মনে হবে,, তাই বলে কি দুর্বা ফুল গোলাপ হয়ে যাবে? নিজের মতো কাউকে বেছে নাও,, জীবন বড্ড সুন্দর,, নষ্ট করোনা।

,,, পরশী ভাবলো,, হিসেব মিলালো। সত্যি ই সে শপিং এ গেলে এক দের লাখ টাকা খরচ করে। তার একটা রেগুলার ড্রেসের প্রাইজ ৮-১০ হাজার টাকা। টিশার্ট, প্লাজু গুলো ও নামি দামি ব্রেন্ড থেকে ইনপুট করা হয়,, এগুলো ছাড়া সে পরতেও পারেনা। তাহলে পল্লবের সাথে কিভাবে থাকবে? পল্লবকে দেখে তার কখনোই মনে হয়নি পল্লবরা মদ্যবিত্ত,, ওয়েল ড্রেস আপ, সবচেয়ে বড়ো কথা পল্লবের সৌন্দর্য। হিসেব করলে পল্লব পরশীর ভাইয়াদের থেকেও বেশি নজর কাড়া। তার এই সৌন্দর্যের কাছে তার নরমাল ড্রেস আপকেও ওয়েল মনে হতো তাই অবলীলায় পল্লবকে ধনী পরিবারের সন্তান ভেবে নিয়েছিলো সে। তবে এখন জেনেছে বলে যে পছন্দের পরিমাপ কমে গিয়েছে এমন নয়। অনেক ভাবনা চিন্তার পর মেয়েটা সরল জবাব দিলো — আপনি চিন্তা করবে না,, ভাইয়ারা আছে তো,, আমারো অনেক টাকা আছে,, আপনাকে আমার খরচা দিতে হবেনা,, আমি নিজের জন্য আপনার কাছে এক টাকাও চাইবো না। সত্যি!!

,,, পল্লব বুঝলো মেয়েটা কত্ত সরল সাদাসিধা,, এই সরল মেয়েদের তার ভালো লাগেনা,, ন্যাকাদের তো সহ্যই হয়না। তবুও শান্ত কন্ঠে বুঝানোর মতো করে বললো — নিজের বউ অন্যের টাকায় চলবে এটা বড়ই লজ্জা জনক। আমি অতোটাও আত্মসম্মান হীন নই। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, পরশি!! তোমায় আমি বোনের নজরে দেখি। আমার ছোট বোন অহমিকাও তোমার বয়সি,, তোমার প্রতি ইহো-জনম, পরো-জনম কোনো কালেই এর বাহিরে অনুভূতি জন্মাবে না। আমায় বিরক্ত করো না প্লিজ,, এতে তোমায় মায়া বাড়বে আর আমার বিরক্তি।
,,, পরশী ফিরতি কিছু বলার ভাষা পেলো না,, সে বড্ড ছোট আর আদরের,, এতো কঠিন কিছু বুঝেনা। শুধু তার কান্না পাচ্ছে,, তার পছন্দের মানুষটা তাকে বোনের নজরে দেখে অথচ তার পছন্দটা শুধু পছন্দেই থেমে নেই,, ভালোবাসায় পরিনত হচ্ছে ধীরে ধীরে। সে কান্না দমাতে এদিক ওদিক তাকিয়ে পিছনে তাকাতেই আত্মাটা ধ্বক করে উঠলো। তাদের পিছনে চার মুর্তি দাড়িয়ে,, পরশীকে চমকে যেতে দেখে ইরা ইশারায় চুপ করতে বললো,, পরশী মাথা ঝাকালো। তৎক্ষনাৎ পল্লবের উপর ঝাপিয়ে পরলো চারজন,, পেটে, পিঠে শুরশুরি দিতে দিতে বললো — আর রাগ করে থাকবি? বল,, রাগ করবি?

,,, পল্লব শক্ত থাকার চেষ্টা করেও পারলো না, হেসে দিলো। সবার হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে হাপিয়ে উঠলো কিন্তু কাউকে ছাড়াতে পারলো না। এট লাস্ট কুলোতে না পেরে মুখ খুলতে বাধ্য হলো — প্লিজ, মাফ কর। মরে যাচ্ছি আমি,, থামনা ভাই। আল্লাহ!! মেরে ফেললো,, সর!! সরনা।
,,, কেউ সরলো না,, উল্টো হাতের তীব্রতা বাড়িয়ে তুমুল ভাবে সুরসুরি দিতে লাগলো। পল্লব চিংড়ি মাছের মতো লাফঝাপ করতে করতে হাড় মানলো। তাদের বন্ধুত্বের ১৯ নং শর্ত অনুযায়ি কেউ রাগ করলে তাকে সুরসুরি দেওয়া হবে এবং যতক্ষণ না সে রাগ ভেঙে রাগ করার জন্য ক্ষমা চাইবে ততোক্ষণ সুরসুরি দেওয়া চালিয়ে যেতে হবে। অগত্যা সেই শর্ত পল্লবকেও মানতে হলো,, সে হাপাতে হাপাতে ফের বললো — আচ্ছা সরি,, আমি ভেরি ভেরি দুঃখিত। দয়া করে আমায় মাফ কর চান্দুরা,, আল্লাহ!! ছাড় অরুইন্না!! তুই বেশি বেশি করতাছোত। সরিতো,, আর জীবনেও রাগ করবো না,, মরার পরেও না। আমি জাহান্নামে গেলে তদের জাহান্নামে নিয়া যাবো,, থাম।
,,, থেমে গেলো সব,, পল্লব যেমন সুরসুরি খেয়ে হাপিয়ে উঠেছে,, তেমনি বাকি চারজন ও হাপিয়ে উঠেছে। অগত্যা চারজন পল্লবকে উঠিয়ে গু্রির উপর বসে পরলো। আহাম্মক বনে গেলো পল্লব,, তার রাগ ভাঙাতে এসে তাকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো? আর ১০ টা মিনিট সম্মান করলে কি খুব ক্ষতি হতো? পল্লব যেই কথাটা বলেছে সেটা কিছুটা উচ্চ স্বরেই বলেছে,, দ্বীপ আর বিহানের কানেও পৌছালো কথাটা। বিহান সামনাসামনি বসে অর্পনার দিকে তাকিয়ে থাকা মানবের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য গলা খাকারি দিলো। দ্বীপ তাকাতেই বিহান মুখে সিরিয়াস ভাব এনে বললো — একটা কথা ভাবলাম!!

,,, কি?
,,, আমি ৯৯% শিউর তুই আর আমি পরোজনমেও একসাথে থাকবো। ধর আমি যদি জাহান্নামেও যাই,, আমি জাহান্নামের যেই স্তরে থাকবো তুই ও সেই স্তরেই থাকবি। আবার ধর জান্নাতে গেলেও,, আমি যেই স্তরে যাবো তুই ও সেই স্তরেই যাবি। ভালোই হলো,, ওখানেও তর বউ আর তকে বিরক্ত করতে পারবো আমি।
,,, বিহানের কথায় বিরক্ত হলো দ্বীপ,, তবে চোখে জিঙ্গাসা,, এমন কথা বলার কারন কি? বিহান রয়ে সয়ে বললো — জীবনে যা কামিয়েছি, দুজন একসাথে কামিয়েছি। অপকর্ম করি আর ভালো কর্ম,, দুজন একসাথে করেছি। খুন খারাপি যা করার একসাথে করেছি। লাস গুম করার হলে ভাগাভাগি করে করেছি। যেখানে পাপ, পূন্য এক,, ফলাফল তো সমানি হবে তাইনা?
,,, দ্বীপ হতাশ হলো,, দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিরিয়াস কন্ঠে বললো — বিহান!! তুই যদি কোনোদিন মানুষ হয়ে যাস আমায় জানাস।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫১ (৩)

,,, কেনো?
,,, মসজিদে মিষ্টি দিবো।
,,, দ্বীপের কথায় শব্দ করে হেসে ফললো মেধা,, ঠোঁট উল্টালো বিহান। মানে এটা কি তার বউ? নিজের বিয়ে করা বউ? কিভাবে হতে পারে? নাহ এটা তার বউ হতেই পারেনা। নিশ্চয়ই অর্পনা সকালে কারসাজি করে তার বউকে অন্য কোনো রমনির সাথে এক্সচেঞ্জ করিয়ে এনেছে,, নয়তো তার বউ তো এতো পল্টিবাজ নয়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here