এই অবেলায় পর্ব ৪১
সুমনা সাথী
প্রভাতের কাঁচা রোদ তালুকদার বাড়ির প্রতিটি কোণ উর্বর আলোয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। নবনী রান্নাঘরে ব্যস্ততায় মগ্ন। ঠিক তখনই বাইরে কলিংবেল এর আওয়াজ হলো। দিব্যর নামে একটি পার্সেল এসেছে। বেশ সুন্দর ভাবো মোড়ানো মাঝারি আকারের একটি কাগজের শক্ত বাক্স। পার্সেলটি হাতে নিয়ে নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দিব্যর ঘরের দিকে। ঘরের ভিতরে শুয়ে বাবা ও মেয়ে দুজনেই তখনো গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। নবনী অত্যন্ত সতর্ক কদমে এগিয়ে গিয়ে দিব্যর একদম সন্নিকটে বিছানায় একপাশে বসল। কালকের প্রগাঢ়, তিমিরাচ্ছন্ন মুহূর্তগুলোর পর থেকে নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছে না নবনী। সমস্ত কায়ায় তখনো যেন কাল রাতের মাদকতা লেগে আছে। পার্সেল বাক্সটা আলতো করে এককোণে রেখে সে অত্যন্ত মৃদু স্বরে ডাকল,
“শুনছেন? এই যে… একটু শুনুন না।”
ওপাশ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর মিলল না। নবনী আবারও সামান্য ঝোঁকে। ওর তপ্ত নিশ্বাসের হাওয়া দিব্যর মুখে ছড়িয়ে যাচ্ছে। কয়েকবার ডাকলো নবনী। আচমকা দিব্যর ঘুমন্ত মুখাবয়ব এক তীব্র বিরক্তিতে কুঁচকে এক হয়ে গেল। সেটা নবনীর চোখে ভীষণ মায়াবী ও মোহনীয় ঠেকল। অবচেতনেই তার রক্তিম ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসির রেখা প্রসারিত হলো। দিব্য আলতো করে নিজের ভারী চোখের পাতা মেলল। ঘুম-জড়ানো ভাঙা চোখে পিটপিট করে চেয়ে বলল,
“তোমাকে আমি এভাবে ডাকতে বারণ করেছিলাম না?”
নবনী নিজের ডাগর চোখ দুটো ঈষৎ কুঁচকায়। অবুঝের ভান করে বলল,
“কেন? ওভাবে ডাকলে এমন কী হয় শুনি?”
দিব্য এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ নিস্পৃহ হয়ে রইল। তার ঠিক পরক্ষণেই নবনী কিছু বুঝে ওঠার আগে নিজের একখানা হাত বাড়িয়ে একটা আকস্মিক হেঁচকা টানে নবনীকে নিজের দিকে টেনে নিল। আকস্মিক এই ঝড়ে অপ্রস্তুত নবনী নিজেকে সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল দিব্যর সেই চওড়া, শক্ত বক্ষপটের ওপর। হৃদস্পন্দন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যেতেই সে লজ্জায়, আড়ষ্টতায় আর্তনাদ করে চাপা গলায় বলে উঠল,
“কী করছেন কী আপনি? ছাড়ুন! পাশে দিয়া ঘুমিয়ে আছে। ও জেগে গেলে কী ভাববে?”
দিব্য অবশ্য স্ত্রীর সেই তটস্থ আপত্তিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। নিজের তপ্ত আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় নবনীর ফর্সা কপোলে এসে পড়া অবাধ্য কিছু কেশ গুচ্ছ যত্নে সরিয়ে দিল। তারপর তা গুঁজে দিল ওর কানের লতির পেছনটায়। অন্য হাতটা দিয়ে নিজের বাম বক্ষের ঠিক মাঝখানটায় যেখানে হৃদপিণ্ডটা। সেখানে ইশারা করে ঘুম-জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“সকাল সকাল ওভাবে বুকের ভেতর কাঁপন ধরানো সুরে ডাকায় এইখানটায় তীব্র ব্যথা লেগেছে। তারপর ভেতরের অবাধ্য মনটা আর কোনো জাগতিক নিয়ম মানতে চাইছে না। শুধু এইরকম পাগলামিই করতে ইচ্ছে করছে। এখন বলো, এতে আমার কী দোষ?”
নবনী হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো ক্ষণিক। আড়ালে মৃদু হাসল। লজ্জার তীব্রতায় মনে হলো এই মুহূর্তে বোধহয় তার কান দিয়ে অলৌকিক গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে! সেই দৃশ্যটা যদি সত্যি রূপক অর্থে দৃশ্যমান হতো। তবে দিব্য নিশ্চয়ই তা দেখে হেসেই খু ন হতো। নবনী লজ্জায় আর দিব্যর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে কথা বলতে পারছে না। দৃষ্টি তার দিব্যর গলায় নিবদ্ধ। অথচ দিব্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর রাঙা মুখটার পানে। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট একরাশ দুষ্টুমি। নবনী নিজের ভেতরের কম্পনটুকু ঢাকতে কোনোমতে আমতা আমতা করে প্রসঙ্গ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বলল,
“এইযে? ছাড়ুন না। সত্যি বলছি। আপনার নামে বাইরে একটা পার্সেল এসেছে। জরুরি কিছু নাকি আছে ওতে। চেক করুন।”
দিব্য মনে করার চেষ্টা করল আজ কি বিশেষ কিছু আসার কথা ছিল? মস্তিষ্ক ঘেটে তেমন কিছু উদ্ধার করা গেল না। নবনীর অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে। দিব্য তালুকদারের সূক্ষ্ম কমনসেন্সটা যে হঠাৎ কোথায় লোপ পেল। তা সে ভেবে পাচ্ছে না। নবনী জিজ্ঞেস করল,
“কী ভাবছেন এত? আমি কিন্তু রান্না বসিয়ে এসেছি।”
দিব্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “আজ এত সকালে রান্না? ব্যাপার কী?”
“ভাইয়ার জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া হবে।”
“তোমার রান্না নিশ্চয়ই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না?”
“আমি কি একটু সাহায্যও করতে পারি না?”
দিব্য মৃদু হেসে মাথা উপর-নিচ দোলাল। নবনী আর সহ্য করতে না পেরে অস্থির হয়ে বলল,
“ছাড়ুন তো এখন!”
বলেই সে জোরপূর্বক নিজেকে ছাড়িয়ে একটু সরে এলো। দিব্য অবশ্য তাকে খুব শক্ত করে ধরে রাখেনি। তাই সরে আসতে খুব একটা কসরত করতে হলো না। মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটিয়ে নবনী ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেল। দিব্য প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরক্ষণেই নিজের মনেই হেসে ফেলল। তবে সেই হাসির রেশটুকু মিলিয়ে গেল বিছানায় পড়ে থাকা বাক্সটার দিকে নজর পড়তেই। সে সোজা হয়ে বসল। কৌতুহল আর অজানা আশঙ্কায় বাক্সটা খুলতেই ভেতরে একটা ডাক্তারি রিপোর্ট চোখে পড়ল।কাগজটা হাতে নিয়ে মেলে ধরতেই দিব্যর মাথার ওপর যেন আচমকা আকাশ ভেঙে পড়ল। চোখের সামনের অক্ষরগুলো কি সত্যি? সে কি ঠিক দেখছে? নাকি এটাও কোনো কুটিল চাল? বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে উঠল। তাড়াহুড়ো আর কাঁপাকাঁপা হাতে সে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনটা জ্বলে উঠতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা অচেনা নাম্বার থেকে আসা বিশাল বড় এক বার্তা। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা অচেনা নাম্বারের দীর্ঘ বার্তাটি পড়তে গিয়ে দিব্যর বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। প্রতিটি লাইনে যেন লুকিয়ে ছিল এক একটা বিস্ফোরণ। বার্তাটি সাজানো ছিল ঠিক এভাবে,
“অবাক হচ্ছিস? হুঁশ! তোর চেয়ে বেশি অবাক আমি নিজে হয়েছি। কি মজার ঘটনা তাইনা? ছোটবেলায় আব্বু-আম্মুর সাথে একবার পাকিস্তানে গিয়েছিলাম। আব্বুর একটা জরুরি কাজে। সেখানে কোনো একটা জায়গা থেকে জাহাজে চড়েছিলাম আমরা। মাঝদরিয়ায় হঠাৎ শুরু হলো প্রকৃতির তাণ্ডব। ঝড় আর তার কবলে পড়ে তলিয়ে গেল আস্ত জাহাজটা। সেই ভয়ানক জলোচ্ছ্বাসে কে কোথায় ছিটকে গেল। কেউ জানে না। মুহূর্তের মধ্যেই আমি আমার পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আজও আবছা মনে পড়ে। আম্মু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে। কিন্তু পারলেন না। নিয়তির টানে আমি আলগা হয়ে গেলাম। শুধু মনে আছে। আমি এক অতল অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাচ্ছি। যখন চোখ মেললাম। তখন আমি সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জগতে। একটা অচেনা মানুষের ঘর। চারপাশের পরিবেশটাও একদম আলাদা। যারা আমাকে মরোমরো অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছিল। তাদের ভাষা আমার জানা ছিল না। আর আমার মুখের ভাষাও তাদের মাথায় ঢুকছিল না। তার ওপর সেই ভয়ানক দুর্ঘটনার ট্রমা আর চেনা মানুষদের হারানোর তীব্র ভয়ে আমি একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারতাম না। এরপর জীবনের স্রোতে কত কী ঘটে গেল!
কিন্তু নিজের আসল পরিবারের কাছে আর কোনোদিন ফেরা হলো না। একসময় বুক চিরে আসা দীর্ঘশ্বাস আর নিষ্ঠুর ভাগ্যকে আমি মেনে নিলাম। আশ্রয়দাতা সেই লোকটার পরিবারের সাথেই আমি বড় হতে লাগলাম। উনার ছেলে ছিলো না৷ তাই আমাকে নিজের কাছে রাখলেন। তবে উনি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। অন্ধকার অপরাধ জগতের সাথে ছিল ওঁর ওঠাবসা। সময়ের নিয়মে আমাকেও সেই চোরাবালির দিকে টেনে নেওয়া হলো। যদিও শুরুর দিকে ছোটখাটো অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলাম। এরই মাঝে একদিন বিয়ে করলাম। বছরখানেকের মাথায় আমার স্ত্রী একটা ফুটফুটে ছেলের জন্ম দিল। মনে হলো এতদিনে আমার নিজের বলতে একটা সংসার হলো। একটা আশ্রয় মিলল। অতীত ততদিনে স্মৃতির অতল গহ্বরে প্রায় হারিয়েই গেছে। কিন্তু ভাগ্য। একদিন সকালে কাজ সেরে বাড়ি ফিরে যা দেখলাম তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমার সাজানো সংসারটা র ক্তে ভেসে গেছে! পুরো পরিবারকে নির্মমভাবে খু ন করা হয়েছে। একজনও বেঁচে নেই।
যিনি আমাকে স্নেহে ছেলের পরিচয় দিয়ে বড় করেছিলেন। তিনি, তাঁর স্ত্রী, এমনকি তাঁর যে মেয়েটিকে আমি নিজের ছোট বোনের মতো ভালোবাসতাম। সবার ক্ষতবিক্ষত, ছিন্নভিন্ন দেহগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। সেই মরীচিকার মাঝে আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম। যাকে আমি ‘পাপ্পা’ ডাকতাম তার বস এসে দেখা করলেন আমার সাথে। তিনি আমার পরিবারের খু নিদের খোঁজ দিলেন। জানতে পারলাম। তারা সংখ্যায় আটজন ছিল। প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে আমি নিজেই ওদের দলে ভিড়ে গেলাম। তারপর? একে একে আটটা পশুকে নিজ হাতে মেরে দিলাম। তখন আমার বয়স পঁচিশ। এরপর থেকে পুরোদস্তুর ওঁর হয়ে কাজ শুরু করলাম। একের পর এক দেশ ঘুরেছি। আর অগণিত মানুষের প্রাণ নিয়েছি। এই খুনের নেশায় মেতে একসময় বাংলাদেশেও পা রাখা হলো। আমি চাইলে তখন আমার আসল পরিবারকে খুঁজে বের করতে পারতাম।
কিন্তু ততদিনে আমি এতটাই পঙ্কিলতায় ডুবে গেছি যে। ওই র ক্তাক্ত হাত নিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা আমার ছিল না। এরই মধ্যে একদিন ওপরমহল থেকে হুট করে নির্দেশ এলো। আমাদের একটা বিশেষ ‘ফর্মুলা’ লাগবে। যার পেছনে কোটি কোটি টাকার খেলা চলছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেল। সেটা নাকি দিব্য তালুকদার নামের একজন লোক আগেই হাতিয়ে নিয়েছে! যেভাবে হোক ওটা তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে হবে। সেই মিশন নিয়েই এই দেশে আসা। তোকে কতভাবে বোঝালাম। নানারকম হুমকি-ধমকি দিলাম। এমনকি মৃত্যুর ভয় দেখাতেও ছাড়লাম না। তবুও তুই তোর জেদ ধরে রাখলি। কোনো কথাই কানে নিলি না। কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম তখন। যখন ওপর থেকে তোর ছবি আমার হাতে দিয়ে বলা হলো। এটা আমাদের জন্য দারুণ সুযোগ। কারণ কী জানিস? তুই দেখতে হুবহু আমার মতো! তোকে মেরে ফেলার স্পষ্ট অর্ডার ছিল আমার ওপর। কিন্তু তোর ছবিটার দিকে তাকিয়ে প্রথমবার আমার হাত কাঁপল। বুকটা কেমন যেন করে উঠল। আমি দেখলাম। খোঁজ নিলাম। যত গভীরে গেলাম তত অবাক হলাম।
বুঝলাম তোকে আমি কোনোভাবেই মারতে পারব না। তাই কৌশলে তোকে না ছুঁয়ে স্রেফ ফর্মুলাটা হাতিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুই, তোর ওই রূপবতী বউ আর তোর গোটা ফ্যামিলি মিলে এমন পণ্ডিতি শুরু করলি যে আমার মাথাটাই নষ্ট করে দিলি! সব বাল পাকনা। ওহ্ ভালো কথা। এই যে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টটা দেখছিস না? ওটা তোকে কিডন্যাপ করার আগেই করিয়েছিলাম। অত্যন্ত গোপনে। অসীমের কাছ থেকে তোর একটা স্যাম্পল জোগাড় করে। জীবনের এই প্রথম আমি কোনো মিশনে হার মানলাম। যা, তোকে জীবনটা ভিক্ষা দিয়ে গেলাম। নওয়াজ নকীব কখনো হারে না। এটা মাথায় রাখিস। এখন নিশ্চিন্তে নিজের কাজ কর। তবে একটা কথা বলে রাখি। পরের বার কেউ তোকে এভাবে হুমকি দিলে সোজা মেনে নিবি। বেশি চালাকি করতে যাবি না। নয়তো আবার যদি কখনো আমার পাল্লায় পড়িস। তখন আর এই দয়াটুকু আশা করিস না।
আরেকটা ব্যাড নিউজ আছে তোর জন্য। আমি কিন্তু ইতিমধ্যে জেল থেকে বেরিয়ে গেছি। তুই যখন এই পার্সেলটা হাতে পাবি। ততক্ষণে আমি মাঝআকাশে। প্লেনে উড়ছি। আর হয়তো কোনোদিন এই দেশে ফিরব না। আমি ছাড়াও এখানে সব ঠিকঠাকই চলবে। আমার ফেরার সব রাস্তা আমি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছি। বাকি জীবনটা এভাবেই ফেরারি হয়ে, অন্ধকার গলিতে কেটে যাবে। কোনো একদিন শত্রু পক্ষের বুলেট কিংবা পুলিশের এনকাউন্টারে হুট করে মরে পড়ে থাকব কোথাও। কেউ জানতেও পারবে না। কেউ এক ফোঁটা চোখের পানিও ফেলবে না। শুধু শুধু এ নিয়ে তোর জীবনে সমস্যা বাড়িয়ে লাভ কী, বল? তাই বাড়ির কাউকেই আমার ব্যাপারে একটা অক্ষরও জানাবি না। আয় হায়! গুরু। লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছি। নয়তো তোর মতো একটা মানুষের সামনে আবেগ ঢেলে এত বড় নাটক আমি করতে বসতাম না! ছিঃ! তবে ভুলেও ভাবিস না তোকে এসব জানিয়ে আমি কোনো সস্তা সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছি। স্রেফ দয়া করলাম। আর কেন করলাম? সেটার কারণটা স্পষ্ট করে গেলাম। একই সাথে আমার ক্ষমতাটাও তোকে দেখিয়ে দিলাম। পরের বার আমার মতো কোনো মানুষের মুখোমুখি হলে তাকে পুলিশে দেওয়ার মতো বোকামি অন্তত করিস না। বলদ!”
দীর্ঘ আটটা দিন হাসপাতালে কাটানোর পর অবশেষে কলরবকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলো। হাসপাতাল তার সহ্য হচ্ছিল না। চিকিৎসকদের আপত্তি সত্ত্বেও এক প্রকার জেদ ধরেই সে চলে এসেছে। অবশ্য সাথে কাব্য আছে বলে বাড়ির লোকেদের বাড়তি কোনো দুশ্চিন্তা করতে হলো না। ওরা সবেমাত্র ঘরে পা রেখেছে। কলরবের সুস্থ শরীরে ফিরে আসায় বাড়ির সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তবে একটা মস্ত বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে কলরবের মাথার ব্যান্ডেজটা খোলার পর। চুল কামানো ন্যাড়া মাথাটা নিয়ে তার সে কী লজ্জা! একটু এদিক-ওদিক হলেই। কাউকে দেখলেই ঝটপট মাথায় ক্যাপ গলিয়ে দিচ্ছে। যদিও কাব্য কড়া ভাষায় দু-তিন দিন মাথায় ক্যাপ দিতে বারণ করেছে। যাতে ক্ষতটা বাতাস পায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! নিজের এই রূপ ঢাকা দিতে সে বেশির ভাগ সময় ঘরের দরজা বন্ধ করে সবাইকে বাইরে বের করে দিয়ে বসে থাকছে।
“পনেরো দিন কী বলছিস? আগামী একমাস আমি এই ঘর থেকে এক পা-ও বের হচ্ছি না! খবরদার, উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে আমাকে ভোলানোর চেষ্টা করবি না বলে দিলাম।”
নিযানা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। কলরবের মাথায় এখন অবশ্য ক্যাপটা নেই। চুলহীন মাথাটায় তাকে আসলেই একটু অদ্ভুত লাগছে। বাড়ির অন্য সবাই এটা নিয়ে হাসাহাসি আর মজা করলেও। নিযানার কেমন যেন একটা মায়া কাজ করছে।তবে মুখে কিছু প্রকাশ করার উপায় নেই। তাহলে বাড়াবাড়ি করবে। হঠাৎ নিযানার দিকে নজর পড়তেই কলরব বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠল,
“কী দেখছিস অমন হাঁ করে?”
নিযানা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “কিছু না তো।”
“আমি শেভ করব।”
“তা করো। আমি কি বারণ করেছি নাকি?”
“জিনিসগুলো এনে দে একটু।”
নিযানা কথা না বাড়িয়ে ড্রয়ার থেকে শেভিং কিট বের করে সামনে এনে রাখল। কাজ শেষ করে নিযানা যেই না পা বাড়াবে ঘর থেকে চলে যাওয়ার জন্য অমনি কলরব পেছন থেকে ডেকে উঠল,
“দাঁড়া।”
নিযানা থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাল, “কী হলো?”
“আমাকে একটু হেল্প কর।।আমার ডান হাতটায় সমস্যা হচ্ছে। ঠিকঠাক ধরতে পারছি না। ক্যানেলা করার কারণে জায়গাটা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। প্রচুর ব্যথা করছে এখনো। তার ওপর কাব্য বলেছে এখনো নাকি ইনজেকশন চলবে। কবে যে হাতের এই বালটা খুলতে পারব কে জানে!”
নিযানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা এসে বসল। শেভিং কিটের জিনিসপত্রগুলো গোছাতে গোছাতে বেশ শান্ত গলায় বলল,
“মুখের ভাষাটা একটু সংযত করো কলরব। এটা কোনো ভদ্র মানুষের ভাষা হতে পারে না। আর তা ছাড়া এসব কি আমি পারি নাকি? তার চেয়ে বরং কাব্য ভাইয়াকে বা অন্য কাউকে ডেকে দিই?”
কাব্যর নাম শুনতেই কলরব আঁতকে উঠল, “একদম না! ও তো আমাকে পেয়ে বসবে। ইচ্ছামতো মজা ওড়াবে। বাড়ির সবাই এমনিতেই হাসাহাসি করছে। এমনকি দিয়া অব্দি আমাকে দেখে ফিকফিক করে হাসছে!”
“দোষটা তো তোমারই। এখন বেশি কথা না বলে মুখটা আগাও।”
কলরব খানিকটা সোজা হয়ে বসল। তবে তার ভেতরের খিটখিটে ভাবটা গেল না। গাল ফুলিয়ে বলল,
“আমার ছাড়া আর কার দোষ হবে নাকি! এই পৃথিবীতে তো সবাই একেকটা আস্ত ফেরেশতা। একমাত্র আমিই যত নষ্টের গোড়া। শয়তানের বংশধর! আমার বাপ ও শয়তান।”
ওর অনর্থক ক্ষোভ দেখে নিযানা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খিলখিল করে শব্দ করে হেসে উঠল। কলরব থমকে গিয়ে তাকাল ওর দিকে। আর তাকানো মাত্রই তার চোখজোড়া আটকে গেল নিযানার ওই হরিণি চোখের ওপর। এই মুহূর্তে চোখে চশমা নেই বলে চোখ দুটো যেন আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে। নিযানা গালে শেভিং ফোম মাখিয়ে দিল। কিন্তু রেজারটা হাতে নিয়ে গালের ত্বকে ছোঁয়াতে গিয়েই সে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কারণ, কলরব পলকহীন দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নিযানার ঠোঁটের কোণের হাসিটা ততক্ষণে উধাও। এভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকায় নিজের ভেতর কেমন যেন একটা ছটফটানি শুরু হলো তার। বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল,
“কী দেখছ এভাবে?”
কলরব চমকে উঠে বলল, “দেখছি তুই আবার হাসছিস কিনা। একদম হাসবি না বলে দিলাম। খুব মজা লাগছে তাই না? আমাকে এই অবস্থায় দেখে খুব আনন্দ পাচ্ছিস?”
নিযানা চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, “যদি হাসিই। তো কী করবে শুনি?”
“সাহস থাকে তো হেসে দেখা!”
নিযানা জেদ করে একটা হাসি দিল। কিন্তু সেই হাসির রেশটুকু মুখে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কলরব এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। নিজের সাদা ফেনা মাখা গালটা সে ঝট করে ঘষে দিল নিযানার ফর্সা গালের একপাশে। ব্যস! পলকের মধ্যে নিযানার ঠোঁটের কোণের সব হাসি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। কলরব নিজের বুদ্ধিতে নিজেই বিজয়ের হাসি হেসে বলল,
“কী? বন্ধ হয়ে গেছে তো হাসি?”
নিযানা চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে উঠল, “ছিহ্ কলরব! এটা কী ধরনের পাগলামি হ্যাঁ? কী করলে এটা!”
“বেশ করেছি! আরও দাঁত বের করে হাসো দেখি!”
নিযানা রাগ দেখিয়ে বলল, “যাও, আমি আর কিচ্ছুতে সাহায্য করব না তোমাকে। নিজেই করো তোমার শেভ!”
“তুই এখন চাইলেও যেতে পারবি না। আমি খুব ভালো করেই জানি।”
নিযানা ভুরু কুঁচকে বলল, “কেন পারব না?”
বলেই সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর আগেই কলরব চট করে তার দু-হাতে নিযানার পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরল। নিজের দিকে আরেকটু টেনে এনে সশব্দে হেসে বলল,
“কারণ আমার এই শেভিংয়ের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। আমি তোকে এক ইঞ্চিও নড়তে দিচ্ছি না।”
নিযানা ছটফট করে উঠলো। বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করেও লাভ হলো না৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। অন্তত মুখটা ধুয়ে আসতে দাও?”
কলরব বাঁকা হেসে বলল, “কেন? আমার মুখে কি বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে যে আমি একটা বোকা?তোকে ছাড়ি আর তুই পালাস। সেই সুযোগ আমি দিচ্ছি না!”
নিযানা দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা কোনোমতে গিলে চুপ করে রইল। ওর নীরবতা দেখে কলরব চোখ টিপে বলল,
“যত দেরি করবি তত কিন্তু তোরই লস। আমার এভাবে ধরে রাখতে মোটেও খারাপ লাগছে না।”
নিযানা গরম চোখে চাইলো। মনে মনে ভীষণ চটলেও অগত্যা নিজেকে শান্ত করল। এই নাছোড়বান্দা ছেলের সাথে জেদ ধরে লাভ নেই। সে খুব ভালো করেই জানে। এখন কাজটা শেষ না করলে এই ছেলে তাকে কোনোভাবেই ছাড়বে না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল এর শোধ সে পরে সুদ-আসলে উসুল করে নেবে। অগত্যা আবার রেজারটা হাতে তুলে নিতেই হলো।
“ভাইয়া! ওই…!”
আচমকা মৌনিতা ঘরে ঢুকে পড়ল। চোখের পলকে নিযানাকে আলগা করে ছেড়ে দিল কলরব। মৌনিতা দরজার চৌকাঠে থমকে দাঁড়াল। কলরব এমন একটা ভাব করল যেন কিছুই হয়নি। মৌনিতা ওদের দুজনের থমথমে আর অপ্রস্তুত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিচে মেজো মামা এসেছেন তোমার সাথে দেখা করতে। ড্রয়িংরুমে বসে আছেন।”
কলরব বলল, “উনাকে একটু বসতে বলো। আমি শেভ করছি। শেষ করেই নিচে আসছি।”
মৌনিতা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও পরক্ষণেই চোখ দুটো সরু করে নিযানা আর কলরবের দিকে তাকাল। নিযানার গালের সাদা ফেনাটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
“কিন্তু শেভ কে কাকে করছে? সেটা তো ঠিক বুঝলাম না ভাইয়া! নিযানার গালে কি ইদানীং দাড়ি-গোঁফ গজাতে শুরু করেছে নাকি?”
নিযানা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে মৌনিতার উদ্দেশ্যে বলল,
“কলরব ইচ্ছা করে এই বাঁদরামিটা করেছে। আস্ত বেয়াদব একটা!”
মৌনিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আল্লাহ্ জানে! দেশলাই আর পেট্রোল এক ঘরে কীভাবে থাকো তোমরা? আগুন লাগে না? সিরিয়াসলি। তোমরা পারোও বটে! যা খুশি করো বাপু। আমি আর নেই এর মধ্যে।আসছি।”
মৌনিতা ঘর থেকে চটজলদি বেরিয়ে গেল। সে যেতেই কলরব সশব্দে হেসে উঠল। নিযানা হাতের রেজারটা উঁচিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“একদম হাসবে না বলে দিলাম! আর একটা বার হাসলে, এটা দিয়ে ডাইরেক্ট গলা কে টে দেব তোমার!”
কলরব শান্ত ছেলের মতো মুখটা চেপে ধরে চুপ করে গেল। নিযানা আর সময় নষ্ট না করে বাকি কাজটুকু দ্রুত শেষ করল। কলরব পুরোটা সময় দেখলো ওকে। নিযানা সেটা লক্ষ্য করেও না দেখার ভান করলো। শেভিং কিটের জিনিসপত্রগুলো ধুয়ে-মুছে নির্দিষ্ট জায়গায় গুছিয়ে রাখল। বের হওয়ার জন্য যেই না দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে অমনি কলরব পেছন থেকে আবার ডেকে উঠল,
এই অবেলায় পর্ব ৪০
“এই, দাঁড়া।”
নিযানা বিরক্ত মুখে ঘুরে তাকিয়ে বলল, “আবার কী হলো?”
“আমিও নিচে যাব।”
কলরব বিছানা থেকে নেমে চট করে ড্রেসিং টেবিলের দিকে গেল। সেখান থেকে কিছু একটা হাতে নিয়ে নিযানার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। নিযানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কলরব চোখের সামনে চশমাটা পরিয়ে দিল। হঠাৎ এই কাণ্ডে নিযানা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। কলরব দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বিরক্ত গলায় বলল,
“চশমাটা পর, কানা! নয়তো চোখের মাথা খেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সোজা মুখ থুবড়ে পড়বি। আরেক ঝামেলা!”
