Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭১

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭১

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭১
Maha Aarat

সকালবেলা চা হাতে নিয়ে মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনেই এসে আচমকা মাহেরের হাতে আলতো চুমু খায় সে।মুখে লম্বা সালাম দিয়ে হাত পেতে বলে, ‘সালামি দিন?’
মাহেরের ভাবমূর্তি তখনও নিশ্চল তবে একটু অবাক হয়েছেন বুঝা যায়।ভ্রু জোড়া কুঁচকে কপালে তুলে বললেন , ‘কি?কিসের সালামি?’
‘ঈদের সালামি।’
‘ঈদ তো চলে গিয়েছে দূদিন আগেই।’
‘কিন্তু আপনি তো সালামি দেননি।’
‘ঈদের সালামি দিতে হয় নাকি?’-মাহের জানেন এ কথা বললেই সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে।তবুও বললেন।
আইরার মুখের নরম ভাব সাথে সাথে উবে গেলো।গলা উঁচুতে তুলে সে বলল, ‘মানে?এই লেভেলের কীপ্টা আপনি?আমার হক এটা।’

‘কোথায় লিখা আছে এই হকের কথা।আমি তো কখনো শুনিনি।’
‘লেখা থাকা না থাকাটা ম্যাটার না।আমার সালামি আমাকে বুঝিয়ে দিন,ব্যস।’
‘ঠিক আছে মেনে নিলাম ঈদের সালামি তোমার হক।কিন্তু তুমি চাওনি,ঈদ চলে গিয়েছে।বেঁচে থাকলে সামনের ঈদে একশো টাকা রেডি থাকবে।ওকে?’
আইরা অবাক হয়।চোখ কপালে তুলে বলে, ‘অনলি একশো?ইম্পসিবল।পাঁচশো টাকার একশোটা নোট চাই।’
‘এই গরীব মানুষের ওপর এতো অত্যাচার? আল্লাহ সহ্য করবেন না।’
‘আমি জানিনা।আপনার কিডনি বেঁচে দিন।ওগুলো তো ফ্রেশ কন্ডিশনে আছে,তাও দেন।আমার চাই-ই।আপনার কিডনি লিভার হার্ট যা বেঁচা লাগে বেঁচুন,বেঁচে আমার টাকা দিন।’
মাহেরের চোখ কপালে।আল্লাহু আকবার! এই মেয়ে বলে কি!
অদ্ভুত দৃষ্টিতে কয়েক পলক তাকিয়ে ব্যতিব্যস্ত সুরে জিজ্ঞেস করলেন , ‘আমার কিডনি বেঁচে দিই তুমি চাও?লিভার হার্ট খুলে আনলে তো আমি মারা যাব।তুমি বিধবা হয়ে যাবে।জেনেশুনে তোমাকে এমন শাস্তি আমি দিব না।’
‘আমার টাকা চাই-ই চাই।ভাইয়া ভাবিদেরকে এজিপ্টের ৩০০ পাউন্ড করে করে দিয়েছেন আমি তো ওতো চাইছি না।আমি মুদ্রা চাইছি।’
‘তোমার ভাই বড়লোক।তার সাথে আমার মিলালে কীভাবে হবে।’ বলে মাহের পকেট থেকে পাঁচশো টাকার কচকচে নোট বের করলেন।
আইরা নিলো না,মুখ ফুলিয়ে চলে গেলো।আইরা দূ:খ পেলো,না এরকম না বিষয়টা যে সে হাজার হাজার টাকা চায়।কিছু দূ:খকে সে চাপা দিয়েছে।ঈদের দিনে তাদের সবারই মন মেজাজ ভালো ছিলো না আরহামের বিষয়টা নিয়ে।তবুও তিনি ঈদের দিনেও একবার শুভেচ্ছা জানাননি,উপহার তো দূর একটা চকলেট ও না।আর একটু সুন্দর করে কথাও না?সে এতোটাই অযোগ্য?

মাইমুনা ঘনঘন দরজার বাহিরে উঁকি দিচ্ছেন ,আর হাত কচলাচ্ছেন,চোখে তীব্র শঙ্কা বা অনুশোচনা।এ কয়দিনে আরহামকে দেওয়া শাস্তি এবার যেনো তিনি নিজেই অনুভব করছেন।হাফসা এক কোণে দাঁড়িয়ে কেবল দেখে যাচ্ছে মাইমুনার আহাজারি।একটু পরপর তিনি বলছেন,আচ্ছা তুমি কীভাবে একা একা ক্ষমা চেয়ে নিলে?আমাকে সাথে নিলে না?এখন আমার কি অস্বস্তি হচ্ছে বুঝতে পারছো হাফসা?’
‘জ্বি আপু পারছি।’
‘শাহ কখন আসবেন বলেছেন?’
‘কিছুক্ষণের মধ্যেই বললেন তো!’
‘কিন্তু আসছেন না তো।’
‘আরেকটু অপেক্ষা করি।’
মাইমুনার নিশপিশ অবস্থার ইতি ঘটাতেই বোধহয় আরহামের গলার আওয়াজ পেয়ে গেলো।পাশ দিয়ে হাফসা বেরিয়ে যেতেই তিনি তীক্ষ্ণ নজর দিলেন ওর ওপর।পরক্ষণেই মাইমুনার কাছে এগিয়ে এসেই বললেন ,
‘সালামুন আলাইক!’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম।আসসালামু আলাইকুম।’
আরহাম জবাব দিলেন আর কিছু বললেন না।একটু আগেই বাসায় ফিরেছেন তিনি।তখুনি উমায়ের বলে গেলেন,মাইমুনা কিছু জরুরী কথা বলবেন।দেখা করে যেতে।
‘কেমন আছেন?সুস্থ তো,আলহামদুলিল্লাহ? ‘-আরহাম।
মাইমুনা বুঝতে পারছেন উনি চেয়েও কথা শুরু করতে পারছেন না।এতক্ষণে তো ঠিকই গুছিয়ে নিয়েছিলেন কথাগুলো।হঠাৎ কি হলো আবার।

‘আলহামদুলিল্লাহ আপনি?’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’
‘শাহ।কিছু ব্ বলার ছিলো আপনাকে।’
‘আমি শুনতেই এসেছি।’
‘আ্ আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন,তাই না?’
‘কেন মনে হচ্ছে?’
‘আগের মতো কথা বলেন না,দেখা করেন না।’
‘আমি তো চাই আপনি নিজেই দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন।’
‘আমার ভুল বুঝতে পারছি দেরীতে হলেও।ক্ষমা করা যায় না?’
আরহাম অনেকক্ষণ চুপ থাকলেন।নীরব পরিবেশে ঘরটা যেনো আরও সময়টা যেনো ঘড়ির কাটা থামিয়ে দিয়েছে।
‘ক্ষমা করার কিছু নেই,মাইমুনা।আমি তো আপনার ওপর রাগ করিনি।’
‘কিন্তু কষ্ট তো পেয়েছেন!’
‘এই. এই পুরো ব্যাপারটা আমি ভুলে যেতে চাই।এটা আমাকে ব্যথা দেয়।’
‘তাহলে কি বুঝবো আমি?’
‘আগের হানি’কে চাই শুধু।ব্যসস এতুটুক!’
মাইমুনার ভেতর জমা হওয়া এতক্ষণের জড়তা,অনুতপ্ততা বা অস্বস্তি সব কেটে গেলো।আরহামের হাতে টপাটপ চুমু আঁকলো সে।ভেজা ভেজা চোখে বললেন , ‘এমন কোনো ঝড় আর না আসুক,যেটা আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরী করে দেয়।’
‘আসবে না,ইন শা আল্লাহ।’

বিকেলের আলোটা একটু হালকা হয়ে এসেছে। সূর্যটা যেন আর একটু নামলেই পানিতে ডুবে যাবে।ঠিক যেন ক্লান্ত এক রাজপুত্র, সারা দিন রোদ ছড়িয়ে শেষে আর কুলাতে না পেরে শুয়ে পড়বে জলঘুমে।হালকা বাতাস বইছে, গাছের পাতাগুলো যেন ধীরে ধীরে একটানা দুলে যাচ্ছে। সেই বাতাস এসে পুকুরের জলে একটা ছোট্ট ঢেউ তোলে।
আইরা দূর থেকে দেখছিলো।এ বাসার একপাশে একটা ছোট্ট পুকুর আছে,মাছ চাষ করা হয়।এরপরেও এর জল চকচকে,ঘোলাটে নয়।হঠাৎ হঠাৎ পুকুরে তৈরি হয় ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ, যেন কারো মন খারাপের ছায়া দূর থেকে মনে হয় এক টুকরো ঝাপসা আয়না।ঢেউগুলোর দোলন দূর থেকে ভাসা ভাসা সাপের চলনের মতো লাগছে।সকালের পর সে আর লোকটার মুখোমুখি হয়নি।রুমে এসে চুপচাপ শুয়েছিলো।আধ ঘন্টা লোকটার কোনো নড়চড় পাইনি।তিনি বারান্দায়ই ছিলেন এই পুরো সময়টা।ড্রয়ারে কয়েকদিন থেকে সিগারেট নেই,নয়তো এই আধঘন্টা সময় শুধু শুধু নষ্ট না করে সিগারেট টেনে পার করে দিতেন।বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেবল বলে গেলেন, ‘ফিরতে দেরী হতে পারে।তুমি লাঞ্চ করে নিয়ো।’

তিনি ফিরলেন সন্ধ্যার পর।আইরার নীরব ছটফটানিতে কেটেছে সারাদিন।তার কেন জানি মনে হয়,উনার স্পেশাল কেউ আছে,সত্যি আছে।কিন্তু উনার ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে কখনো কোনো কথা বলেন না তিনি।সারাদিন বাইরে কি করে একটা মানুষ।তাঁর মন কু’ডাক দিলো।তিনি এই দীর্ঘ সময়টুকু কি ওই স্পেশাল মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন।তাঁর চোখে চোখ রেখেছেন,একটু হাত ধরেছেন!না উনি তো এতো রোমান্টিক না।
আইরার বুকটা টুকরো টুকরো হয়ে গেলো এক কঠিন ব্যথায়।জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয়েছিল,সব ছেড়েছুড়ে বাসায় চলে যাবে সে।আব্বুর কাঁধে মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদবে। তারপর কোনো একটা ঝাপসা ঘুমে হারিয়ে যাবে, যে ঘুমের কোনো ব্যথা নেই, কোনো কষ্ট নেই, কোনো যন্ত্রণাও নেই।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কলিংবেল বাজে।
আজ আর বেহায়ার মতো ছুটে গেলো না সে।বরং চুপচাপ নিজের রুমেই ফিরে এলো।বেহায়া হতে হতে একেবারে নিচু পর্যায়ে নেমে এসেও লোকটার মনের আশেপাশেও জায়গা পায়নি।ঠিক করে নিলো,আর নিজে থেকে কখনো কথা বলবে না।অবশ্য এমন প্রমিস নিজের সাথে প্রতিদিন করে সে।কাজে আসেনি এখন পর্যন্ত।কিন্তু আজ নয়।আজ সে নিজের সম্মানকে খুঁজে পেয়েছে।নাকি শুধু ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকা এক ধরনের প্রতিশোধ, কে জানে!
তবু চোখ একবার দরজার দিকে গিয়েই থেমে গেলো —

‘আবার এসে দাঁড়িয়েছে সেই গম্ভীর রাজা, যার মুখে সবসময় যেন দূ:সংবাদের শিরোনাম বসে থাকে!’
দরজায় নক হচ্ছে,আইরা নিজ চিন্তার পর্ব বিরতি ঘোষনা করে দরজায় চোখ ফেললো।আলাভোলা সরল চোখের কোমল দৃষ্টি; মাহের দ্রুত নিজেকে সামলে একটু এগিয়ে আসলেন।
আইরা দেখলো, মাহের দাঁড়িয়ে আছেন ভেজা চুল আর ভিজে জামাকাপড়ে — হাতে ভেজা ফুলের একটা ছোট্ট তোড়া।যেন রেইন লিলি, হঠাৎ করে বৃষ্টিতে ফোঁটা প্রথম ভালোবাসা।
তিনি কোনো কথা না বলেই সেটা তার হাতে দিয়ে দিলেন।
আইরা ফুলটা হাতে নিয়েই পাশের টেবিলে রাখলো। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মুখে এমন এক অভিব্যক্তি — যেন এই তোড়া কোনো রিকশাওয়ালার ফেলে যাওয়া লতাপাতা।
মাহের ভ্রু কুঁচকালেন।
কি অদ্ভুত!উনার চুল থেকে এখনো টপটপ করে জল ঝরছে।শার্ট ভিজে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে।হাতের পশম এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে।এতো কষ্ট করে বৃষ্টিতে ভিজে তাজা ফুল নিয়ে আসলেন আর সে নির্বিকার?

‘ফেলে দিলে?’
‘ফেলিনি।রেখেছি।’
মাহের এবার একটা পলিথিন মোড়ানো ব্যাগ এগিয়ে দিলেন।
‘তোমার হক।’
বলেই হাঁটা ধরলেন। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো চোখের দিকে তাকানো নেই — যেন মামাবাড়ির বাজার করে ফেরার সময় পিঁয়াজ-রসুনের হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন।
আইরার মাথায় রাগ উঠে গেলো।
‘এই লোকটা একদম অস্বাভাবিক! রোবটের মতো! তার কোনো মুড নেই, কোনো স্পার্ক নেই, কেউ যেন ব্যাটারি ছাড়া চালাচ্ছে!’
কিন্তু এই ব্যাগে কি।কিসের হক?আইরা ভ্রু কুঁচকালো।প্রশ্ন করার সুযোগ পেলো না সে।মাহের চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন।কিন্তু তার যে প্রশ্ন করতেই হবে। ছুটে বের হলো তার পিছে। ঠিক তখনই ঘটে গেলো বিপত্তি — মাহেরের ভেজা শরীর থেকে ফেলা পানিতে পিচ্ছিল মেঝে। আইরা একটানে পিছলে গিয়ে ধুপাস করে পড়ে গেলো। এমন করে পড়লো যেন পৃথিবীর সকল আত্মসম্মান সেই মুহূর্তে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো!
মাহের ড্রয়িং থেকে ছুটে আসলেন চিৎকার পেয়ে।দেখলেন কোমরে হাত দিয়ে চোখমুখ খিঁচে মৃদু আর্তনাদ করছে সে।মাহের কালক্ষেপন না করে দ্রুত কোলে উঠিয়ে নিয়ে বিছানায় বসালেন।সে বসতে পারলো না,শব্দ করে পড়ে শুয়ে রইলো।
‘কীভাবে পরে গেলে?’
‘আ্ আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম।’
মাহের দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।এ মেয়েকে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন।শান্ত অথচ শাসনের সুরে বললেন , ‘এতো উতালপাতাল করো কেন।আমি তো বাসায়’ই থাকবো,কোথাও চলে যাচ্ছিলাম না তো।’

“আপনি না আমাকে ইহকালে পাবেন,না পরকালে দোষী বানাতে পারবেন।আপনি আমার সামনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেও আমি বাঁধা দিবো না,বোধ হারাবো না।গায়রে মাহরাম তো গায়রে মাহরামই।”
কথাগুলো আদওয়ার মস্তিষ্কে চরকার মতো ঘুরছে।লোকটার কথার প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে ক্ষোভের আগুন।একজন রাজপুত্র,যে কিনা তাঁর রাণীদের নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে।কিন্তু একদিন হুট করে সেই রাজ্যের এক সামান্যতম প্রজা জেদ করলো,এই সুদর্শন রাজপুত্রকে তাঁর চাই-ই চাই।তাকে না পেলে সে প্রাণ দিয়ে দিবে।অথচ তাঁর এতো আবেগ,ভালোবাসা আর পাগলামিকে পায়ের নিচে পিষে রাজপুত্র চিঠি পাঠালো, সে মরে গেলেও রাজপুত্র ফিরেও তাকাবে না।ব্যাপারটা যতটুকু অযৌক্তিক আর হাস্যকর,তাঁর চেয়েও বেশী হাস্যকর বোধহয় এর বাস্তবিক প্রতিফলনটা।

সে মাথা নিচু করে তাকিয়েই আছে কখন থেকে।মাহের হেডফোন খুলে নিলেন।বুঝলেন সে নিজ থেকে কিছু বলবে না।এবার তিনি নিজেই জিজ্ঞেস করলেন , ‘বলো!’
‘আপনি হার্ট হয়েছেন?’
‘হুয়াই?’
‘হার্ট বেঁচার কথা বলেছিলাম যে।’
‘সো?’
‘ক্ কিছু না।’
‘কি বলতে এসেছো?’
‘আমার ওগুলো চাই না।ঝোঁকের বসে বলেছি।বিশ্বাস করুন,আমি বুঝতে পরিনি।আপনি ওগুলো ফেরত দিয়ে দিন।সন্তুষ্টচিত্তে যে পাঁচশো টাকার নোট দিয়েছিলেন ওটাই দিন।আমি তাতেই খুশি হবো।
আইরা সেই ৩০০ পাউন্ডের প্যাকেট টা ফিরিয়ে দিয়ে হাত বাড়ালো।মাহের তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন কেবল।অতপর নীরবতা ভেঙে যখন গম্ভীর কন্ঠে তীরের মতো প্রশ্ন ছুঁড়লেন আইরা ভয় পেলো,
‘কেন নিবে না?কি সমস্যা?’
লোকটা যেনো উনার চিরাচরিত গম্ভীর খোলসে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়েছেন।আইরা সহজ হতে পারলো না।লোকটার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তার মনে হলো,প্রথমে সালামি চেয়ে সে এক অন্যায় করেছিলো,আর দ্বিতীয়ত এরকম সাফোগ্যাটিং পরিস্থিতি তৈরী করে সে আরো বড় অন্যায় করে ফেলেছে।

‘আই নীড অ্যান্সার!’
কতো শান্ত কন্ঠ অথচ কতো ভয়ংকর।
‘ম্ মানে আমি ভুল করে ফেলেছি।’
‘কি ভুল?’
‘আমি এমনি এমনি স্ সালামির কথা বলেছি।কিন্তু এতদূর বলে যাবো,আমি নিজে বুঝতে পারিনি।’
‘এখন নিতে কি সমস্যা?’
‘আপনি রাগ করেছেন।’
‘বাচ্চাদের সাথে আমি বড় মানুষ হয়ে কীভাবে রাগ করবো?’
‘বাচ্চা যখন বিয়ে করেছেন কেন তাহলে?’-আইরা কিছুটা তেজে উঠলো।
‘তুমি জোর করে করেছো।’
‘আপনার ম্যাচিয়ুর এডাল্ট মেয়ে পছন্দ আমি জানি।চিন্তা করবেন না।’
‘কেন?’
‘আমি আপনাকে বিয়ে করতে দিব না।’
মাহের উত্তর দিলেন না।আইরা ভেবে পায় না,হঠাৎ হঠাৎ কি হয়ে যায় উনার।গলার ভেতর কথা কি আটকে যায়?

‘স্যার?’
‘উমম।’
‘ওগুলো রেখে দিন।আর এ বিষয়টা ভুলে যান।’
‘ওগুলো তোমার হক।’
‘আর লজ্জ্বা দিবেন না।আমি তো বলেছি,আমার মাথা ওতো কাজ করেনি,বুঝতে পারিনি কি থেকে কি বলে ফেলেছি।’
মাহের এ প্রসঙ্গে কিছু বললেন না।বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন ভাবুক ভঙ্গিতে।শাওয়ার নিয়ে চুলগুলো ভালোভাবে মুছেননি।এই ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ায় উনার কি ঠান্ডা লাগছে না! প্রশ্নটা কি করবে সে?না না,কি অবান্তর প্রশ্ন।
মাহের তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন।সিরিয়াস ভঙ্গিতে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলেন, ‘তুমি এরকম নাক বোঁচা করে ঘনঘন পলক ফেলে কেন কথা বলো?’
‘আ্ আমি তো এভাবেই বলি।’-আইরা বিব্রতবোধ করলো।
‘এভাবে বলবে না।’
‘কেন স্যার?আপনার কোনো সমস্যা হয়?’-আইরার উৎসুক প্রশ্ন।
‘হয়।’
‘কি সমস্যা?’
বরাবরের মতো এবারও চুপ তিনি।নিশ্চয়ই কথা আটকে গেছে।আইরা পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘কি সমস্যা স্যার?গুরুতর কিছু?’
‘হুম।’

আইরা আন্দাজ করতে পারলো না সেই গুরুতর সমস্যা টা কি হতে পারে।তবে এবার উৎসাহী সুরে বলল, ‘যাই হোক,আমি আপনার জন্য একটা উপহার এনেছি।’
মাহের ভ্রু উঁচু করে তাকালেন।সে পাশের রুমে চট করে গিয়ে চট করে ফিরে আসলো।তাঁর হাতে একটা ছোট্ট বাক্স,যেটা লাল রঙ্গের রেপিং পেপারে মুড়ানো।মাহের সেটা বেশ আগ্রহ নিয়ে খুলতে লাগলেন।উনার চোখে আলাদা এক এক্সাইটমেন্টে।মিনিট খানেকের মধ্যে পেপার ছাড়াতেই বেরিয়ে আসলো একটা ছোট্ট বাক্স।মাহের আইরার দিকে একপলক তাকিয়ে লজ্জ্বায় পড়ে গেলেন।কেন জানি,আর যেনো চোখ মেলাতে পারছেন না।আইরা ভ্রু কুঁচকালো এবার?তাঁর চোখের তারায় স্পষ্ট প্রশ্ন, ‘উপহার পছন্দ হয়নি,স্যার!’

রাতটা অনেক নীরব। আরহাম যখন রুমে ফিরে এলেন, তখন ঘরটা নরম আলোয় ডুবে আছে। কিন্তু উমায়ের নেই। কোথায় গেলেন?
ধীরে ধীরে পা ফেলে আরহাম বারান্দায় এলেন। হাফসা জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে, দূহাতের আজলায় মুখ রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাইরে জোছনা ঝরে পড়ছে ঝলমল করে।একধরনের স্বপ্নের মতো লাগছে সব।
আরহাম পাশে এসে দাঁড়ালেন।
‘আমার পুচকে পুতুলসোনা কেমন আছেন ,উমায়ের?’
কি চমৎকার সম্বোধন।হাফসা মাথা নাড়লো।আরহাম শান্ত চোখে তাকালেন।
খানিক নীরবতা বাদে বললেন ,
‘আপনি জানেন উমায়ের, আজকের চাঁদটাকে দেখে আমার মনে পড়লো আল-মুনীর নামটা।’
হাফসা একটু চমকে তাকালেন, ‘আল-মুনীর?’
‘আল্লাহর ৯৯টি নামের একটা। যার মানে—He who illuminates. এই আলো, এই নরম নীরবতা—সব আল্লাহর রহমত। যেমন আপনি।’
হাফসা কেমন গলে গেলো,মুখে এক চিলতে লাজুক হাসি।

‘আপনিও আল্লাহর রহমত, আমার জন্য।’
একটা পাখি হঠাৎ পাশের গাছে এসে বসল।কিছুক্ষণ ডানা ঝাপটে চলেও গেলো।
আরহাম মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন হাফসার দিকে। ধীরে ধীরে উনার হাত ছুঁয়ে গেল হাফসার হাত। একটা মুহূর্ত, যেখানে সময় থেমে থাকে।
‘আপনি কি জানেন, যখন কেউ আল্লাহর ভালোবাসায় কারো দিকে তাকায়, তখন সেটা ইবাদতের মতো হয়?’
হাফসা জবাব দিতে পারলো না। চোখ নামিয়ে ফেলল।আরহাম এগিয়ে এলেন একটু, তাঁর কপালে একটুকরো নরম চুমু রাখলেন।
‘আমরা যদি একে অপরের ওপর হক আদায় করি, তাহলে এই সংসার আমাদের জান্নাতের একটা ছোট ঝলক হতে পারে।আপনাকে দেখে আজ সে বিশ্বাসটা আবার জেগে উঠেছে।’
হাফসা কাঁপা গলায় বললা, ‘আর আপনি আমাকে দেখে কি ভাবলেন?’
‘যে আপনি সেই মেয়েটা, যার সাথে সেজদায় যাওয়া যায়, যার হাত ধরে তাওবাহ করা যায়, যার চোখে তাকিয়ে চুপচাপ কুরআন মুখস্থ করা যায়।’
হাফসার চোখে জল জমে উঠলো। আরহাম আবার তাঁর গাল ছুঁয়ে বললেন,

‘আপনার চোখে আলোর মতো কিছু আছে আজ, জানেন?’
‘কী আছে?’
‘যেনো বেহেশতী কোনো শান্তি।’
এই বলেই তিনি তাঁর মুখ হাফসার মুখের একদম কাছে আনলেন। গালটা গালের পাশে এসে ঠেকল, চুল ছুঁয়ে গেল কপালে।খুব আস্তে, খুব নম্রভাবে, আরহাম উনার কোমল ফুলকে ছুঁয়ে দিলেন।কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো অপবিত্রতা নেই, কেবল এক প্রকার “হালাল প্রেমের নিঃশব্দ সংলাপ”।
বারান্দার পাশে রাখা ল্যাভেন্ডার ফুলটা হঠাৎ দুলে উঠলো বাতাসে।
কিছু মুহুর্ত পার হলো,আরহামের বন্ধন হালকা হতেই হাফসা পেছনে সরে গিয়ে দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
‘ইন্টারেস্টিং!’
হাফসার মুখ লাল হয়ে গেছে, চোখ ঝলমল করছে।
আরহাম হেসে এগিয়ে গেলেন, তার দু’হাত হাফসার দু’পাশে রেখে কাঁধে ভর দিয়ে বললেন,
‘আপনি লজ্জা পান দেখেই তো বারবার বলি। এই লজ্জা—এই হাসি, এগুলো না থাকলে তো আমি আসক্ত হতাম কিসে?’
হাফসা ঠোঁট কামড়ে বললো,

‘আপনি দয়া করে… আপনি কিন্তু খুব চালাক।’
‘এই চালাকি তো আমার হক, নয় কি?’
বলেই তিনি আবার তার কপালে এক চুমু রাখলেন। এরপর গালের এক পাশে মুখ ছুঁইয়ে বললেন,
‘আপনার গালের এই গন্ধটা বুঝেন?সোপ না ফুল, বোঝা যায় না। কিন্তু আমার কাছে চমৎকার লাগে।’
হাফসা এবার আস্তে আস্তে আরহামের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেললো।
আরহাম উনার চাদর প্রসারিত করে ছেড়ে তাকে জড়িয়ে নিয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন,
‘চলুন, এবার নামাজ পড়ি। আজকের এই ভালোবাসার জন্য আগে আল্লাহর কাছে শোকর হাজিরা দিই। কষ্টের পর এই শান্তিটুকু যেন চিরস্থায়ী হয়।’
হাফসা উনার বুকেই মাথা রেখে বলল,
‘জ্বি, চলুন… আগে ইবাদাত, তারপর এই জান্নাত-ঘেরা সংসার।’
‘হুম ভালোবাসি,ভালোবাসি হোমাপাখি।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭০

‘আমিও আপনাকে ভালোবাসি … ভীষণ রকম। তবে আল্লাহর ভয় ছাড়া নয়। আমি চাই, আপনি আমার ভালোবাসায় হারিয়ে না যান…বরং সেই ভালোবাসা আপনাকে আল্লাহর কাছে আরও বেশি নিয়ে যাক।’
আরহামের চোখ ঝলঝল করে উঠলো।কোনো উত্তরের প্রয়োজন ছিল না, এই ভালোবাসার ভাষা তো হৃদয়ের গভীরে লেখা।
দূরে কোথাও ডাহুকের ডাক ভেসে আসে। বারান্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্কিডের গাছ যেন আবার মাথা ঝাঁকায়—স্বাক্ষী হয়ে থাকে এক নিঃশব্দ, পবিত্র প্রেমের।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here