Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৫
Maha Aarat

মুহূর্তেই আহনাফ তাজওয়ার ছুটে এলেন নিজের ঘর থেকে।
উনার চোখে ভয়, কিন্তু মনোযোগ তীক্ষ্ণ।
তিনি ধীরে ধীরে হাফসার কপালে হাত রাখলেন, ঠোঁটের নীচে উষ্ণতা দেখলেন, তারপর পার্লস চেক করে বললেন—
— “ও সেন্স হারিয়েছে।সামথিং ব্যাড।”
তিনি নিজ হাতে কোলে তুলে নিলেন মেয়েটিকে।আম্মু ইতোমধ্যে কান্না জুড়ে দিয়েছেন।গাড়ি বের করার খবর পৌঁছানার মতোও মাথা কাজ করছে না উনার।আহনাফ তাজওয়ার তুমুল কন্ঠে বললেন , ‘গাড়ি বের করার কথা বলুন গিয়ে।’

হাসপাতালের ভিতরে…..
নিমিষেই তারা পৌঁছালেন।জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হল হাফসাকে।
চেক আপ করার পরে ডাক্তার বললেন,
“পিঠে এবং কোমরে গভীর ব্যথা ও ব্লান্ট ট্রমা আছে। মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এটা আশাব্যঞ্জক।তবে কিছুদিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। যেটা সবচেয়ে ভালো খবর—বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি।”
মাইমুনা চোখ মুছছিল, একটুর জন্য না কতোবড় বিপদ থেকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন,আলহামদুলিল্লাহ।’
আরহামকে ইনফর্ম করা হয়েছে।তিনি তখন ছিলেন অনেক দূরে,অফিস এরিয়ায়।ফরেন বায়ারদের সাথে তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে, কিন্তু শুনেই ছুটে বেরিয়ে পড়লেন।

গাড়ি থেকে নেমেই ছুটে হাসপাতালের করিডোরে ঢুকে পড়লেন আরহাম।চোখে তীব্র দুশ্চিন্তা, হাত কাঁপছে।
উনি জানতে পারল, হাফসা এখন সেমি-কনশাস।আহনাফ তাজওয়ার সামনে এসে বললেন,
“আমরা সময়মতো পৌঁছেছি।তুমি দেরি করোনি—কিন্তু ভয় পাইয়ো না নিজেকে।সব ঠিক আছে।”
আরহাম ঠাণ্ডা হতে চাইলেন,কিন্তু পেরে উঠলেন না।
উনি হাফসার কেবিনে ঢুকলেন—চোখ চিকচিক করছে,হাতে বুক ধরা।
হাফসার চোখ আধা-বুজা ছিল, কিন্তু আরহামের স্পর্শে চোখ খুলল।
আরহাম দিশেহারা হয়ে গেলেন।বুঝে উঠতে পারছেন না কি বলবেন ,কি করবেন।উনার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ছোট্ট প্রাণের আবরণে।ফিসফিস করে বললেন
“আমি কেন থাকলাম না,উমায়ের! ”

হাফসার গালের একপাশে ব্যান্ডেজ।যে কারনে বামের চোখটা ছোট হয়ে আছে।আরহামের প্রাণ যে যায় যায়,কিন্তু উমায়েরকে আর দূর্বল হতে দিলেন না তিনি।শক্ত করে হাত ধরে থাকলেন।
আরহাম তার কপালে আলতোভাবে ঠোঁট রাখলেন।
“আমি থাকবো।এবার আর কোথাও যাবো না। ভয় পেয়েছি আমি… আপনাদের হারানোর ভয়।”
হাফসা শুধু বলার চেষ্টা করলো, “আল্লাহ তো আছেন।”আরহাম থামিয়ে দিলেন তাকে।
আরহাম চুপ করে তাকিয়ে থাকলেন।তারপর দুহাত হাত শক্ত করে ধরে বললেন,
“ভালোবাসি।এই জীবনে যা কিছু সত্যি—তার মধ্যে এইটা সবচেয়ে নিখুঁত সত্যি।আপনাদের ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনাই করতে পারি না।”
আহনাফ তাজওয়ার কেবিনের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তখনও।ইনসিডেন্টাল টাইমে নিজের সাহস রাখা কঠিন,কলিজা তো তাদেরও কাঁপে।তবুও একজন বাবার মতো, একজন অভিভাবকের মতো, আহনাফ তাজওয়ার এর দায়িত্ব বা ভালোবাসার কমতি কখনোই ছিল না।

ঘরটা নিঃশব্দ। সন্ধ্যার আলো কমে গিয়ে ঘরে এক ধরনের ম্লান অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে।চায়ের কাপের ধোঁয়া উঠছে না আর।বারান্দার জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে গরম বাতাস।এতসবের মধ্যেও যেন এই একটুখানি মুহূর্ত সময় থেমে গেছে।
আরহাম নিঃশব্দে ঘরে ঢোকেন।এক হাতে একটি খাম, অনুমতি নেন না আরহাম,চুপিচুপি এসে আম্মুর পাশে দাঁড়ান।
“আম্মু, আব্বু এটা আপনার জন্য দিয়েছেন।”
মিসেস আফসানা একটু অবাক হয়ে খামটি হাতে নেন।
তিনি থমকে যান।তাঁর মুখে অবিশ্বাসের ছাপ।কোনো কথা বলেন না, কিন্তু খামটি হাতে নেন ধীর গতিতে।এক মুহূর্ত যেন স্থির হয়ে থাকে ঘরটায়।
আরহাম চলে যেতেই চুপচাপ, নিঃশব্দে চিঠির ভাঁজ খুলেন।কিন্তু চিঠির একেকটা শব্দ, একেকটা লাইন যেন চুপ করে গিয়ে গলার কাঁটা হয়ে ওঠে উনার।
আফসানা,

আজকের এই চিঠিটি আপনার কাছে পৌঁছানোর জন্য আমি অনেক সময় নিয়ে লিখছি।বহু বছর ধরে আমি আপনার সাথে দূরত্বে ছিলাম, এবং আপনি জানেন,সেই সময়টা আমার জন্য কতটা কঠিন ছিল।বিদেশে যখন ছিলাম, তখন আপনার প্রাপ্য সময় আপনাকে দিতে পারিনি, এবং জানতাম না, আপনি কেমন আছেন,ভেতরে।আমি জানি, সেই সময়গুলো আপনার জন্য কতটা অন্ধকার ছিল।
তবে আজ যখন আমি নিজেকে এই চিঠি লিখতে বাধ্য অনুভব করছি, তখন একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে—কেন আমাদের সম্পর্ক এতটা দূরত্বে চলে গেল? আপনি বলুন,”আমরা একে অপরকে জানতেই পারলাম না’, কিন্তু আসলেই কি তাই?আমি জানি, কখনোই ভালোভাবে আপনার পাশে দাঁড়াতে পারিনি।তবে আমি কখনো চাইনি যে আপনি একা থাকেন,কষ্ট পান,আফসানা।

আমি জানি, আমি আপনাকে একা রেখেছি, কিন্তু আমি জানি, আমি আপনার জন্যও ত্যাগ করেছি। যখন আমি দেশে ফিরে এসেছি, তখন যে আমি একেবারে একা অনুভব করেছি, সেটা আপনি জানেন না।আর আমার ব্যবহারগুলো অবহেলা?না,আপনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।তাই আমি এড়িয়ে চলেছি,আপনি কখনোই আমার অবহেলায় ছিলেন না।আমি জানি, আমাদের সম্পর্কটার মধ্যে সময়ের অনেক খালি জায়গা ছিল, যা এখন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তবে যদি আপনি আমাকে সুযোগ দেন, তাহলে আমি আবার আপনার পাশে থাকতে চাই।আমি এখন আর সেই পুরনো আমি নেই, যাকে আপনি একবার চিনেছিলেন।কিন্তু আপনার সঙ্গে আবার সব কিছু শুরু করার সুযোগ থাকলে, আমি চাইবো আপনি আমাকে সেই সুযোগ দিবেন। আমাদের দুজনের পথ তো আলাদা ছিল, কিন্তু এখন তো একে অপরকে নতুন করে বুঝতে পারি,যাতে আরও কয়েক বছর পরেও আফসোস করে বলতে না হয়,দূরত্ব বেড়েছিল তবুও আমরা চেষ্টা করিনি।
আর আপনি আমার ‘একসময়কার’ নয়,চিরকালের প্রিয়।
হাবীবুক
আফসানা যখন পড়তে থাকেন “আর আপনি আমার ‘একসময়কার’ নয়,চিরকালের প্রিয়” উনার চোখের কোণ ভিজে যায়। দীর্ঘ বছর ধরে জমে থাকা একগুচ্ছ অভিমান চুপিচুপি গলে যায় এই এক লাইনে।

দূর্ঘটনার বেশ কয়েকদিন হলো।হাফসা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়,তবুও আম্মু রোজ সকালে তাকে হাঁটান,যেন শরীর বসে না যায়,ফিট থাকে।হাফসার একটু কষ্ট হয়, রাতে ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ হঠাৎ। কিন্তু শরীরের চেয়েও মনটাই বেশি ক্লান্ত।
ঘরে মানুষজন স্বাভাবিক আচরণে ফিরেছে, কিন্তু হাফসা জানে—তার চারপাশে এখনো অতিরিক্ত সতর্কতা, অতিরিক্ত নীরবতা ঘুরে বেড়ায়।
আরহাম যেন একমাত্র মানুষ, যার সামনে ভাঙা হাফসা নিজেকে একটু একটু করে খোলার সাহস রাখে।
এক সকালে, বারান্দায় বসে কোরআনের আয়াত পড়ছিলো হাফসা।পাশে এসে চুপ করে বসেন আরহাম।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আরহাম ধীরে বলেন,

“আজ আপনার আওয়াজে সুর ছিল।”
হাফসা লজ্জ্বা পেয়ে গেলো।
“আপনি শুনলেন?”
“আপনার পড়া শুনে আজ মনে হলো, আপনি একটু ভালো আছেন।অন্তত কণ্ঠে তো রোদ উঠেছে।”
হাফসা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর নিচু গলায় বলে—
“ভালো থাকতে ভয় করে এখন। ভয় করে আবার যদি ভেঙে পড়ি?”
আরহাম সোজা তাকান তার দিকে।
“ভালো থাকা সাহসের কাজ।আর আপনি সাহসী ছিলে সবসময়।শুধু নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে।”

ড্রয়িং রুমে সন্ধ্যার নাস্তার প্রস্তুতি।আহনাফ তাজওয়ার সোফায় হেলান দিয়ে ফোনে তাকিয়ে আছেন।ফোনের স্ক্রিনে তাদরে বহু বছর আগের এক পুরনো ছবি।আহনাফ তাজওয়ার এর মনে হলো ,এই ছবিটাও নির্জীব।পাশাপাশি দাঁড়ালেও যেন বুঝা যাচ্ছে,দুইটা হৃদয়ে কোটি কোটি মাইল দূরত্বের পাহাড়।
অথচ তখন চিঠিতে যখন পড়ছিলেন, “তবে আজও আমি জানি, আপনি যখন দেশে ফিরেছিলেন, তখন আপনার ভেতরে কতটা ক্লান্তি, একাকীত্ব, এবং যন্ত্রণা ছিল—সেসময় আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারিনি” তিনি মনে করেন, এতটা সত্যি কথা কেউ কখনো তাঁর মুখোমুখি বলে উঠতে পারেনি।তিনি স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন কতক্ষণ!
চিঠি শেষে কেউ কারো সাথে কথা বলেন না।শুধু দুজনের মাঝখানে হঠাৎ এক ধরনের গাঢ় নীরবতা নেমে আসে। সেটা চেপে ধরা অভিমান, না বুঝে ফেলা ভালোবাসা—বোঝা মুশকিল।কিন্তু এটা স্পষ্ট, কিছু একটা বদলে গেছে।
আরহাম কফি খেয়ে উঠে গিয়েছেন।আফসানা একটু নড়েচড়ে বসেন, মনে হয় কিছু বলতে চান।কিন্তু ঠোঁট কাঁপলেও শব্দ বের হয় না।
আহনাফ তাজওয়ার উনার অস্বস্তি কাটাতে চোখ নামিয়ে বলেন,
“চা খেয়েছি আজ।পুরনো স্বাদটা ফিরে এলো।”
আফসানা মাথা নিচু করে ফেলেন, কিন্তু মুখের এক কোণে কেমন যেন একটা শান্ত বিষাদ ফুটে ওঠে।সেটা দুঃখ না ভালোবাসা—সে নিজেও ঠিক জানেন না।
আরহাম দূর থেকে তাকিয়ে থাকেন চুপচাপ। কিছু বলার নেই, কেবল মনে মনে দোয়া করেন,হয়তো এই ছোট্ট প্রচেষ্টাটা বড় কিছু হয়ে দাঁড়াবে।

সন্ধ্যা রাত অথচ হাফসা ঘুমিয়ে পড়েছে, বইটা খোলা রেখেই। আরহাম আস্তে করে গিয়ে গায়ে পাতলা কমফোর্টার তুলে দেন।
তারপর একবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বলেন,
“আপনি যদি আবার হাঁটতে শেখেন, আমি পাশে হাঁটবো। আপনি যদি থেমে যান, আমি বসে থাকবো।আপনি যদি কাঁদেন,আমি যত্ন করে কান্না থামাবো- তবুও শুধু পাশে থাকতে চাই।”
চাঁদের আলো জানালায় পড়ে।শান্ত একটা ঘর।
তাদের জীবনের হাহাকার নেই, শুধু একরাশ শান্তি, ধীরে ধীরে ফিরে আসা আলোর মতো ভালোবাসা।

রাত নেমেছে অনেক আগেই।চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে বিছানায় পড়ছে নিঃশব্দে।বাতাসে বকুল ফুলের ঘ্রাণ, যেন দুনিয়ার সকল ভার মুছে দিতে চায়।ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা, অথচ তাতে এক ধরনের আত্মার শব্দ লুকিয়ে—যা শুধু ভালোবাসায় আর ইবাদতে বোঝা যায়।
রুমে ফিরে দেখলেন মাইমুনা।ঘুমোচ্ছেন অথচ এ সময় তিনি তো ঘুমান না।কিন্তু আরহাম তার হাত স্পর্শ করতেই বুঝলেন ,সে ঘুমে না।
“শরীর ঠিক তো,হানি?”
‘জ্বি।”
‘মন ভালো।”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“আপনার হাজব্যান্ড ভালো আছেন?”
মাইমুনা ফিক করে হেসে ফেললেন।
“এর সঠিক উত্তর জানা নেই।”
“বাট ইট ইজ ইয়োর রেসপনসেবলিটি।”
মাইমুনা চোয়াল ঝুলিয়ে তাকিয়ে রইলেন।আরহাম ‘আসছি’ বলেই বেরোলেন।খানিক পর ফিরে এলেন মাইমুনার পছন্দের খাবার,নারাচা নিয়ে।মাইমুনা অত্যন্ত খুশি হলেন,সাথে অবাক হয়ে বললেন , “আপনি তো বাইরের খাবার পছন্দ করেন না।”
আরহাম হালকা হাসলেন।তাঁর মুখে এক টুকরো তুলে দিতে দিতে বললেন , “আফওয়ান।আমি আজকাল আপনাকে সময় দিতে পারি না,হানি।”

“আমি অপেক্ষা করতে জানি।”
আরহামকে রিপিট করছে সে।আরহামও তাকে চুপচাপ খাইয়ে দিতে ব্যস্ত।অথচ আরহামকে কিছুটা অন্যমনষ্ক দেখে মাইমুনা প্রশ্ন করলো, “আপনি ঠিক আছেন?”
একটু গম্ভীর হয়ে তাকালেন আরহাম।আজকাল আমি অনেক কিছুতে নিজের মধ্যে হারিয়ে যাই।সবাই আমাকে দেখে মনে করে, আমি পারফেক্ট।অথচ আমি ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ি মাঝে মাঝে। আপনাদের কিছু বলতেও পারি না।”
মাইমুনা এবার আরহামের হাতে স্পর্শ রাখলেন।নম্র কন্ঠে — “আপনি যদি নিজেকে আমাদের ‘রাহবার’ ভাবেন, তাহলে আপনাকে বোঝার দায়িত্ব তো আমাদের, তাই না? আপনি নিজেকে হারাতে পারেন না। আপনি যদি ক্লান্ত হয়ে যান, তবে আমাদের ছায়া কে হবে?”
আরহাম স্থির চোখে তাকিয়ে থাকেন তার দিকে।মাইমুনার চোখে তখন কোমল দীপ্তি। কোন জোছনা নেই জানালার বাইরে, তবু তার চোখে আলো ঠিকরে পড়ছে।
আরহাম ধীরে ধীরে বললেন,

“আপনি কীভাবে পারেন?এত গভীরভাবে কথা বলতে?”
“কোরআনের সাথে থাকলে ভাষা বদলে যায়।অন্তরের গভীরতা তৈরি হয়।আপনি জানেন না, আমি কতবার আপনাদের জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদেছি।এমন একটা সংসার চাই, যেখানে দুই স্ত্রী শত্রু না, বরং আল্লাহর পথে সহযাত্রী।”
আরহাম হেসে উঠলেন হঠাৎ, একটু দুষ্টুমি করে বললেন,
“আপনি না হলে আমি পাগল হয়ে যেতাম মনে হয়।মাঝে মাঝে আপনার এই কথাগুলো আমার আত্নাকে ঠান্ডা করে ফেলে।
আরহাম মাইমুনার দিকে গভীরভাবে তাকালেন, “আপনি জানেন হানি,আপনাকে এতো সুন্দর লাগছে আজ,ইয়া মারহাবা” বলে আরহাম বুকে হাত রাখলেন।
মাইমুনা লজ্জায় একটু মুখ নিচু করলেন।
আরহাম একটু থেমে বললেন,

— “একটা কিস… পাবো?”
মাইমুনা কপাল উঁচু করেই বললেন,
— “প্রশ্নটা করেন কীভাবে!”
“ভালোবাসায় লজ্জা নেই, গুনাহ হলে আলাদা কথা। আর আমার তো হালাল ভালোবাসা!”
মাইমুনা এবার নিজের গাল ঠেলে এগিয়ে দিলেন।
আরহাম নিঃশব্দে, গভীর আবেগে একটা ছোট্ট চুমু রাখলেন তার গালে।
অতপর ফিসফিস করে বলেন,
“আপনি আমার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ আবরণ, মাইমুনা। আমার আত্মার পোশাক। আর যদি পারি, আমিও হব আপনার রাহাত(শান্তি/স্বান্তনা/সুখ)আপনার রক্ষাকবচ।”
চুপচাপ ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
শুধু বাইরের গাছের পাতা নড়ে ওঠে হালকা বাতাসে। কোথাও একটা রাতচরা পাখি ডাক দিলো।

রাত গভীর। আহনাফ তাজওয়ার ঘুমোতে পারছেন না। একঘেয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বারবার মনে পড়ছে চিঠির লাইনগুলো।
‘আমার সময় ফিরিয়ে দিন।’
এই লাইন যেন বারবার ঘুরে ফিরে আসছে হৃদয়ের গভীরে।
অন্যদিকে, আফসানা চুপচাপ বিছানার একপ্রান্তে বসে আছেন।বাতি নিভিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু ঘুম আসছে না। বারবার মনে পড়ছে উনার কথা,
‘আপনার অবহেলার চেয়ে দূরে পরে থাকাই ভালো।’
উনার চোখ ছলছল করছে।এত বছরের সম্পর্ক, অথচ এতটুকু বোঝাপড়ার অভাব?
তবুও এক অদ্ভুত শান্তির ছায়া যেন লেগে আছে দুজনের চোখে।এই প্রথম তারা জানলো—অন্তত একজন কখনোই ভুলে যায়নি, একজন কখনোই ভালোবাসা ছাড়েননি।
পরদিন সকালে, আহনাফ তাজওয়ার বারান্দায় দাঁড়িয়ে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছেন।পাশে এসে দাঁড়ান মিসেস আফসানা।

– “আজ সকালের চা দেব?”
একটা সাধারণ প্রশ্ন, কিন্তু এতদিন পর এর গভীরতা অনেক। আহনাফ তাকান না, শুধু মাথা নাড়েন।
– “হুম। কড়া করে।”
এইটুকু বিনিময়ে একটা সম্পর্ক হয়তো আবার হেঁটে চলা শুরু করে।ধীরে ধীরে।অভিমানের পথ পেরিয়ে, ভালোবাসার দিকে।
দিনগুলো একটুখানি বদলে গেছে। কথা বাড়েনি, কিন্তু অভিমান কমেছে। প্রতিটি ছোট ছোট ইশারায় বোঝা যাচ্ছে, কেউ কাউকে আর দূরে ঠেলছেন না।
সোমবারে রোজা রাখার সময় একদিন হাফসা রান্নাঘরে ঢুকে দেখে, আজ আম্মুঅনেক আয়োজন করেছেন।তেমন বড় কিছু না, কিন্তু একসাথে বসে খাওয়ার মতো খাবার।
আম্মু কিছু বলেন না, কিন্তু টেবিলের একদম শেষ মাথায় আব্বু যে চেয়ারে বসেন, সেখানে আগে থেকেই রাখা এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত আর কাটা খেজুর রাখা।
আব্বু এসে বসেন।মুখে কিছু বলেন না।আম্মু ও না। কিন্তু দুজনেই একসাথে খেতে শুরু করেন।
হাফসা বুঝে যায়—আজ ইফতার শুধু রোজা ভাঙা নয়, বরং ভাঙা সম্পর্কের পাটাতনে প্রথম ইট।

চৈত্রের পড়ন্ত বিকেল। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে হালকা রঙে রূপ নিচ্ছে, আর সেই আলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল কফি শপের কাঁচের জানালা।
আইরা আর মাহের এসেছেন আজ একটু সময় কাটাতে। হালকা রঙের শার্টে মাহের শান্ত, আত্মস্থ। আইরা কিছুটা উত্তেজিত, কারণ অনেকদিন পর এমন একটা বের হওয়া হলো।দু’জনেই অর্ডার করেছে, কফি আর কিছু কেক।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঢুকলেন একজন তরুণী। লম্বা হিজাব পরা, গম্ভীর মুখ, চোখে কাঁটাতার-সদৃশ কঠিন দৃষ্টি।
তিনি ঢুকে একপলক দেখলেন মাহেরকে, তারপর স্থির হয়ে একসেকেন্ড এর মতো দাঁড়িয়ে চলে গেলেন।আইরা দেখলো,মাহের স্বাভাবিক নেই।উসখুস করছেন।মাহের কখনো আইরার সামনে সিগারেট টানেন না।কিন্তু এখন বিনা দ্বিধায় সিগারেট ধরাতে ধরাতে উল্টোদিক মুখ করে লম্বা টান দিচ্ছেন।আইরা খেয়াল করলো,উনি এক হাতে শক্ত করে ব্রেঞ্চের কোণ ধরে আছেন।’উনার কি ব্যথা লাগছে না ‘এ প্রশ্নটা মাথায় আসার আগে তার মাথায় আসলো, উনি প্রানপনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন রাগ কন্ট্রোল করতে,কিন্তু কেন!
মাহের চটজলদি আইরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি বসো, আমি একটু আসছি।”
আইরার মুখে সামান্য প্রশ্নচিহ্ন।তবু সাহস হলো না জিজ্ঞেস করতে।

কফিশপের বাইরের কর্নারে দাঁড়িয়ে মাহের নিচু গলায় বললেন,,
“লুবাবা, আমি তোমার খোঁজ রাখি সবসময়।এখন এখানে আসার কারণ?”
“আমি তোমাকে ভাই বলি, কিন্তু তুমি কোনোদিন আমায় বোন স্বীকার করো নি।কেন?আমাদের তো দোষ নেই!”
মাহের চোখ নামিয়ে ফেললেন।
“তোমার কথা আমি কাউকে বলিনি, জানো কেন? কারণ হাফসা এখনও জানে না তুমি কে।ও জানেই না, আমাদের একই বাবা।ভাবতেও পারবে না।”
“আর এই মেয়েটা তোমার স্ত্রী?তাকেও জানাতে পারো না?” — লুবাবার চোখে একটা ব্যথা।
“তোমরা আমার জীবনের এমন অধ্যায়, যেটা আমি লুকিয়েছি,প্রকাশ করিনি।জানি, এটা অন্যায়। কিন্তু কিছু কিছু সত্য এমন থাকে, যেগুলো কাউকে না জানানোই ভালো।”

“আমরা কি এমনই সত্য?”
“হুম।”
“তাহলে দিনশেষে আমাদের কোনো পরিবার রইলো না।”-লুবাবার কন্ঠ ভেজা।
মাহের নিশ্চুপ।
মাহের জানেন,লুবাবা স্ট্রং মেয়ে।হুট করে তার ভেঙে পড়া মাহেরকে একটুখানি হলেও যন্ত্রণা দিচ্ছে।একই রক্তের তো!তাই বোধহয়।
তিনি না চাইতেই বলে ফেললেন , “আমি আছি।”
“না থাকারই মতো।”
“না থাকার চেয়ে তো এটা বেটার।নিজের খেয়াল রেখো,তোমার বাবুর যত্ন নিও,মাইসারার খেয়াল রেখো।”
“আমি আমার আরেকটা বোনকে একটাবারও দেখার সুযোগ পাবো না?”
“যে কষ্ট আমি বয়ে বেড়াই,সে কষ্ট হাফসার না হোক।সব আশা পূরণ হতে নেই।ভালো থাকো।”

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আইরা একা বসে ছিল বারান্দায়। বাতাসে হালকা শীত, গা ছমছম করে ওঠে।
পেছন থেকে মাহের এসে একটা চাদর ওর গায়ে জড়িয়ে দিলেন।
“তুমি রাগ করেছো?”
আইরা মাথা নাড়ল না।
“আমি শুধু চাই… আপনি আমায় বিশ্বাস করুন।গোপন করবেন না।লুকাবেন না।আপনি জানেন না, আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আর আমি আপনার সবটুকু হতে চাই—আপনার যন্ত্রণাও।”
মাহের ধীরে ধীরে আইরার কাঁধে হাত রাখলেন।
“তুমি আমার আলো, আইরা। যেদিন তুমি এলে,আমার জীবনে, অন্ধকার সরে গিয়েছিল।আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না,কিন্তু জেনে রাখো,আমি তোমাকে ঠকাচ্ছি না।’
আইরা এবার মাথা তুলে তাকাল।তার ছলছল চোখ দেখতেও মাহেরের ভালো লাগছে।পারলে এখুনি কেঁদে দিবে।
“আমি কষ্ট পেয়েছি, আপনি বিয়ে করে অন্য কোথায় সংসার পাতবেন,বাচ্চা হওয়াবেন আমি কীভাবে মানবো?”
মাহের কিছু না বলে, শুধু একটুখানি হাসলেন।
“তোমার তো ডিস্টার্ব হচ্ছে না?আমার ওই পক্ষের বাচ্চারা তো আর তোমাকে জ্বালাচ্ছে না।”
আইরা তৎক্ষনাৎ কেঁদে দিলো।এতোটা দিন পরে হলেও,তার সন্দেহ টা সত্যি হলো।তার প্রিয় পুরুষের প্রিয় নারী অন্য কেউ!
আইরা কান্না সামলে উঠে গেলো।তার আর এখানে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব না।বাকি জীবন টা সে একা কাটাবে।বুঝিয়ে দিবে তাঁর অনুভূতিতে কোনোদিন কোনো খাদ ছিলো না।মাহের তার পিছুপিছু এসে জিজ্ঞেস করলেন ,

“কোথায় যাচ্ছো?”
“যেখান থেকে এসেছি।”
“সিরিয়াসলি?তাহলে কি আমি তাদের এ বাসায় আনতে পারবো,
‘ফাইনালি! বলেই মাহের যেনো দায়মুক্ত হলেন।আইরা আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।শুধু ব্যথাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আমাকে যতোটা কষ্ট দিয়েছেন ,আল্লাহ যেনো আপনাকে ততটুকু না দেন।”
মাহের এমন ভাব করলেন যেনো আইরাকে এগিয়ে দিতে প্রস্তুত তিনি।আইরা উবার কল করলো।এত রাতে সে ভাইয়া বা আব্বুকে জাগাতে চাচ্ছে না।শরীরে বড় হিজাব জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘর ছেড়ে রোডের পাশে এসে দাঁড়ালো সে।মাহেরও দূ পকেটে হাতগুজে পিছুপিছু আসলেন।শেষ বিদায় দিতে খুব আনন্দিত তিনি।
আইরার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যে তার জীবনটা এতোটা বদলে যাবে সে চিন্তা ও করতে পারেনি।উবার এসে দাঁড়ালে আইরা পিছু না তাকিয়েই গেট খুললো।ড্রাইভার কেমন আড়চোখে তাকালো।সে হয়তো ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছে ,এটা ঝগড়ার কেস।তাই আগে থেকেই হুশিয়ার হতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপা,ভাড়াটা এডভান্স দেওয়া লাগতো!”

আইরা পড়লো বিপাকে।তার কাছে কিছুই নেই।দেখলো মাহের এসে দরজা খুলে তার পাশের সিটেই বসলেন।উনার চোখমুখ গম্ভীর,কিন্তু তাতেও যেনো খুশি চিকচিক করছে।আইরা উপায় না পেয়ে একটা রিং খুললো।সিম্পল রিং,আম্মুর থেকে উপহার পাওয়া।এ মুহুর্তে কোনোকিছু ই আর প্রিয় নেই।গন্তব্য পাল্টাতে পারলেই একটু শান্তি পাওয়া যাবে বোধহয়।
আইরার চোখে প্রশ্ন।মাহের গম্ভীর ভাবসাব বজায় রেখে বললেন , ‘রাতকাল একা ছেড়ে দিতে পারি না।পৌঁছে দিয়ে আসি।কি বলো?’
আইরা উত্তর দিলো না।ড্রাইভার হাত বাড়ালো রিং লুফে নিতে।কিন্তু মাহেরের কড়া দৃষ্টিতে আটকে নিজেকে দমিয়ে নিলো।
গাড়ি চলতে লাগলো।আইরার ইচ্ছে হলো না,শেষমুহুর্তে কোনো দায় রাখতে।নিচুস্বরে সে বলল, ‘ভাড়াটা দিয়ে দিন।বাসায় পৌঁছেই দিয়ে দিব।”
“ওকে।”

হাফসা আগের তুলনায় সুস্থ।তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখা হয় আজকাল।আরহাম খেয়াল করলেন,তাঁর স্বভাবে বেশ পরিবর্তন এসেছে।ম্যাটার্নিটি টাইম খুব ডেন্জারাস।এই যেমন,হাফসা কখনো নিজ থেকে আসে না,আরহামের পাশ ঘেষে না।কিন্তু গতকাল সে হুট করে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আবদার করলো,আরহামের সাথে ঘুমাবে সে।আরহাম তখন নিজের রুমে।আম্মুর ফোন পেয়ে হুলস্থুল করে নিচে নেমে বললেন কি হয়েছে।
তোমার সাথে শোবে,সে।
ঠিক আছে।

হাফসার জন্য সিঁড়ি বেয়ে দোতলা উঠা এমতাবস্থায় অসম্ভব।আরহাম তাকে কোলে নিতে চাইলেন তাতেও তার অসম্মতি।নিচের গেস্টরুমে থাকতেও সে নারাজ।নিজের রুমেই থাকা চাই।আরহাম তাকে উঠে আসতে সাহায্য করলেন।সিঁড়ি বেয়ে আসতে গিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো।লম্বা করে শ্বাস ফেলতে লাগলো,আরহাম বুঝলেন সে কাঁপছে।আরহামের ওপর হেলে পড়ার আগেই আরহাম তাকে তুলে নিলেন।অচেনতনের মতো অবস্থায় থেকেও হাফসা লক্ষ্য করল আরহাম কোনো কথাই বলছেন না।রুমে এসে তাকে শোয়াতেই আরহামের হাত আটকালো সে।
‘আপনার কি হয়েছে ‘ বলতে না বলতেই সে ঘুমে বিভোর।আরহাম কোনোরূপ কথা বললেন না।হালকা মোডে এয়ার কন্ডিশনার ছেড়ে তিনি তার পাশে বসে থাকলেন।পেটে খুব অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে হাত চালাতে থাকলেন যেন বাচ্চাটার অবস্থান আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন।একসময় নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।ঘুমের ঘোরে সে হাত ছড়িয়ে আরহামের কোলের ওপর রাখলো।আরহাম হালকা করে সরিয়ে রাখতেই আবারও আক্রমণ করলো।এবার আরহাম আর সরালেন না।হাফসার কমফোর্ট জোন নিশ্চিত করে তাকে ঝাপটে ধরে শুয়ে পড়লেন।ঘুম আসার আগ পর্যন্ত পেটের ওপর হাত রেখে মৃদু স্বরে তিলাওয়াত করতে লাগলেন।
আরহামের চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু মনে মনে বারবার একটি দোয়া আওড়াচ্ছেন—

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৪

“রাব্বি হাব লি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যেবাতান, ইন্নাকা সামি’উদ দু’আ।”
(হে আমার প্রতিপালক, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে এক পবিত্র সন্তান দান করুন।নিশ্চয় আপনি দোয়া শ্রবণকারী।)
রাত গভীর হতে থাকল। ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো এক অব্যক্ত প্রশান্তি।এই রাতে, ভালোবাসা শব্দে প্রকাশিত না হলেও, স্পর্শে, নিরবতায়, আর হৃদয়ের গভীরে তা হয়ে রইলো চিরন্তন।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here