৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩
রুপান্জলি
সেহরির পর বিছানায় গা হেলিয়ে দিতেই পল্লবের চোখে ঘুমেরা হানা দিলো। সেহরির আগ পর্যন্ত জেগে ছিলো সে,, ঘুম হয়নি,, কোনো এক টানাপোড়েনে তার রাতে ঘুম হয়না। তাই সকালে উঠতে লেইট হয়ে যায়,, যার ফলে প্রতিদিন বাবার কাছ থেকে তাকে ঝারি খেতে হয়। মাঝে মধ্যে কয়েক ধরনের খোটাও হজম করতে হয়,, ওসব কোনো ব্যাপার না। পল্লবের গা সহ্যা হয়ে গিয়েছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পল্লব হুট করেই অনুভব করলো তার দম নিতে কষ্ট হচ্ছে,, ফাপরের ন্যায় শ্বাস টেনেও নিশ্বাস নিতে পারছে না, গলায় দমটা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। সে চোখ মেলে তাকাতে চাইলো কিন্তু পারছে না। অনুভব করলো তার নাক মুখ কেউ বালিশ দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে হয়তো মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে। পল্লব শক্তি খাটিয়ে বালিশে ধাক্কা মারলো সাথে সাথে ওপাশের আনারি, শক্তিহিন ব্যাক্তি ছিটকে গিয়ে পল্লবের পায়ের কাছে পরলো। মুখ থেকে বালিশ সরিয়ে রাত্রিকে পায়ের কাছে পরে থাকতে দেখে অবাক হলো পল্লব,, শুয়া থেকে উঠে বসে রাত্রির মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করলো — রাত!! তুই আমাকে মারতে চাচ্ছিলি? বাট হোয়াই?
,,, রাত্রি উত্তরটা মুখে দিলো না, এগিয়ে এসে পল্লবের কলার চেপে ধরে চাপা চুপা, বুকে ইচ্ছামতো কিল ঘুসি, থাপ্পর দিতে লাগলো। হঠাৎ আক্রমণে ভরকে গেলো পল্লব,, রাত্রি মারতে মারতে ক্লান্তি ভরা কন্ঠে বললো — তকে আমি মেরে ফেলবো,, তুই আমাকে টাকার খোটা দিয়েছিস। আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছিস,, রাগ করে কথা বলিস না। তর মতো বন্ধু আমার লাগবে না,, তুই মরে যা,, আমি তকে এখন মেরেই ফেলবো।
,,, মার গুলোতে যথেষ্ট জোর ছিলো,, পল্লব বার বার ব্যাথায় কেকিয়ে উঠে রাতের হাত ধরে আটকাতে চাইলো কিন্তু মেয়েটার থামার নাম নেই। সে মারছে তো মারছেই,, বহু চেষ্টার পর ওর দুটো হাত হাতের মুঠোয় বন্দি করতে পারলো পল্লব। তবুও হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় মত্ত রাত,, ছাড়াতে না পেরে পল্লবের হাতে কামর বসালো। ব্যাথায় চিৎকার উঠলো পল্লব,, বেয়াদব মেয়েটা ঝগড়া না পারলে বরাবর এই কাজটা করে। পল্লব ঝাড়া মেরে হাত ছেড়ে ধমকে উঠলো — এই জলাতঙ্কের রুগি!! তর প্রবলেম কি? মারতে চাচ্ছিস কেনো? আমি মরলে আমার বাপ মাকে কে দেখবে? তুই?
,,, এই পর্যায়ে আরও ফুঁসে উঠলো রাত্রি। পল্লবের মাথার চুল খামচে ধরে বললো — তুই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিস, তার জন্য মাফ চা।
,,, বল্লব চুল থেকে রাতের চুল ছাড়াতে চেয়ে বললো– তুই ও তো করেছিস,, করিসনি? তুই বলেছিস আমি নাকি তর জীবন নষ্ট করে দিবো। তো যে জীবন নষ্ট করে দেয় তার সাথে কথা না বলাই ব্যাটার।
,,, দমে গেলো রাত্রি, কিন্তু দমলে চলবে না। চিন্তা ভাবনা করে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে বললো — আমি কার ফ্রেন্ড?
,,,পল্লব সরল স্বীকারোক্তি দিলো– আমার!!
,,, দোষ কার?
,,, আমার?( বিষয়টা বুঝতেই) কুত্তার বউ, তুই আমাকে কথার জালে ফাসাতে চাচ্ছিস?
,,, রাত্রি একটা সয়তানি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ালো। মানে সত্যি ই সে কথার জালে পল্লবকে ফাসাতে চাচ্ছে। পল্লব তা দেখে নাক সিটকালো, চুল থেকে রাতের হাত সরিয়ে চুল ঠিক করতে নিতেই আবারও ওর চুল টেনে ধরলো রাত্রি। পরপর ঝাকাতে ঝাকাতে বললো –তুই সরি বলবি কিনা বল?
,,, পল্লব ফের ব্যাথায় ককিয়ে উঠে বললো– ওমাগো!! চুল ছাড়। আচ্ছা সরি!! সরি।
,,, আর রাগ করবি?
,,, করবো না।
,,, আমাকে আর ইগনর করবি?
,, করবো না।
,,, আমাকে মুড়ি কিনে দিবি?
,,, দিবোনা।
,,, কি বললি?
,,, আল্লাহ!! দিবো, দিবো।
,,, একশোবার সরি বল।
,,, একশোবার তর জামাইর ঘরের কথা? পারবোনা।
,,,, তাহলে আমি অর্পনাকে বলে দেই? তুই যে সিগারেট খাস?
,,, না না!! এটা করিস না,, ও আমার সাথে কখনো কথা বলবে না।
,,, তাহলে সরি বল।
,,,আচ্ছা সরি টু দ্যি পাওয়ার একশো।
,,, তর নানির খালি ঘর,, একটা একটা করে সরি বল।
,,, এটা কই থেকে শিখেছিস?
,,, চুপ!! একটা বেশি কথা বললে অর্পনাকে গিয়ে সত্যিটা বলে দিবো।
,,,, ঘাবরে গেলো পল্লব,, কোনো উপায় না পেয়ে গুনে গুনে একশোবার সরি বললো। এতে মহা খুশি রাত্রি, ভিতরটা শান্তি শান্তি লাগছে। এমন নয় যে তাদের বন্ধু মহলে আজ ঝামেলা হয়েছে,, নাহ!! এই সারে তিন বছরে তাদের মাঝে বহুবার ঝগড়া হয়েছে। একসাথে থাকতে গেলে এরকম টুকটাক হয় ই কিন্তু ওইযে ছেরে যাওয়ার অপশন নেই, তাই কেউ কখনো কাউকে ছাড়তে পারেনি। তাদের এই চুক্তিগুলো মৌখিক নয় একেবারে লিখিত এবং সাক্ষর করা। একবার অরুন আর অর্পনার মাঝে বেশ ঝামেলা হয়েছিলো। ঝামেলার মূল কারন অরুনের বাবা মা অর্পনাকে অপমান করেছে,, মা বাবার সেপারেট লাইফ নিয়ে বাজে বাজে কথা বলেছে। অর্পনা চেয়েছিলো অরুনকে ছেড়ে দিতে এমনকি তাদের সবাইকে ছেড়ে ভার্সিটি ছেড়ে চলে যেতে কিন্তু তারা যেতে দেয়নি। অর্পনা বেশ কয়েকদিন কারোর সাথে কথা বলেনি, একা ঘুরেছে, ক্লাসে একা বসেছে, একপ্রকার সবাইকে ইগনর করেছে। তারপরেও যখন দেখলো কেউ তার পিছু ছাড়ছে না তখন সে ভার্সিটিতে আসাই বন্ধ করে দিলো। তার কিছুদিন পর আরশাদ জামান এলেন টিসি নেওয়ার জন্য,, সেটা জানতে পেরে তারা পুরো বন্ধু মহল অর্পনার বাড়িতে গিয়ে ওকে ইচ্ছামতো ধোলাই দিয়েছিলো। সেই ধুলাই খেয়ে ঠিক হয়েছিলো মেয়েটা,, আজ পল্লবের সাথে ঐটাই করেছে রাত। পল্লব যেহেতু তার সাথে রাগ করেছে তাই সে একাই পিটিয়েছে ওকে,, ভবিষ্যতে এমন করলে আরও পিটাবে।
,,, নিজের উপর অনেক গুলো মানুষ ঝুকে আছে এমন অনুভুত হতেই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা সাথে সাথে ভ্রু কুচকে নিলো। তার সামনে ইরাদ, রাত, পরশী, মেধা ঝুকে আছে,, অর্পনা নাক কুঁচকে জানতে চাইলো এভাবে মটকা মেরে দাড়িয়ে থাকার কারন কি? কেউ উত্তর করলো না উল্টো ওকে টেনে তুললো। পরশী তাড়াহুড়ো করে বিছানার এক কোনায় রাখা বড়ো বক্সটা খুললো। সেখান থেকে বেড়িয়ে এলো আকাশি রঙা গাউন। অর্পনা হামি দিতে দিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলো, এটা তো রুপান্জেল নামক কার্টুনটার মতো গাউন, এখানে কি করছে? অর্পনাকে আর ভাবার সময় দিলোনা কেউ, ড্রেসটা পরার জন্য জোর পূর্বক ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিলো। অর্পনা ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে ড্রেসটা পরে ওয়াসরুম থেকে বের হতেই সবাই আবার ওকে নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিলো। অর্পনা বিষয়গুলোতে বিরক্ত,, এমনি রাতে মির্জা বাড়ির বড়ো ছেলে তাকে ঘুমাতে দেয়নি।
উনার হাজারটা ঢং,, কখনো গান শুনাও, কখনো গল্প বলো,, কখনো উল্টাপাল্টা আচরন,, তার মধ্যে সকাল হতেই ওরা এসব শুরু করে দিয়েছে। এখানে সবচেয়ে ভালো সাজতে এবং সাজাতে পছন্দ করে রাত,, অর্পনাকে সেই সাজাচ্ছে। আহামরি সাজ নয় তবুও অর্পনা বার বার মানা করছে। তার সাজতে ভালো লাগেনা,, অতিতের সেই দুদিন বাদে সাজেওনি কোনোদিন। রাত্রি ধীরে ধীরে ওর চুলগুলো তিন ভাগ করে দিলো, একটা সে নিজে বেনি করছে আর দুটো মেধা আর ইরাদকে দিয়েছে। তিনটে বেনি সম্পন্ন হলে সেই বেনি গুলো দিয়ে আবারও বেনি করার প্রয়াস চালালো রাত । অর্পনার চুল বর্তমানে হাটু ছুঁই ছুঁই,, অতিরিক্ত ঘন হওয়ায় বেনিটা অসম্ভব সুন্দর হয়েছে৷ তিনজন মিলে ফুলের ঢালিতে থাকা সকল তাজা ফুল নিয়ে একটা একটা করে অর্পনার চুলের মোটা বেনিতে গুজে দিলো। পরশী অর্পনার সামনে বসে গালে হাত দিয়ে বার বার প্রশংসা করছে,, তার ভাবি রুপানজেল সাজছে বলে কথা,, প্রশংসা তো করতেই হবে। অর্পনা এতোক্ষণে এটুকু খুব ভলো করেই বুঝে গিয়েছে তাকে ফেইরি ট্যারেস এর রুপসন্জেল সাজানো হচ্ছে। চুলে ফুল লাগানো শেষ হতেই সে কিছুটা দম নিয়ে বললো — শেষ? আরও সাজাবি? কে সাজাতে বলেছে? উনি? কোথায় উনি? আমায় রাজকন্যা সাজিয়ে কি লাভ হলো? উনি কি ঘোড়ায় চড়ে ফ্লাইন রাইডার হয়ে আসবেন?
,,, মেধা অর্পনাকে আগা গোড়া পরখ করে পরশীর চোখ থেকে একটু কাজল নিয়ে অর্পনার কানের পিছনে দিয়ে দিলো। অর্পনা চরম বিরক্ত,, হুট করে চোখ থেকে কাজল নেওয়ায় খেপে গেলো পরশী কিন্তু পরোক্ষনেই বড়ো ভাবির জন্য মেনে নিলো। মেধা অর্পনাকে বসা থেকে উঠিয়ে দিয়ে বললো — জানালা দিয়ে একবার উঁকি দিয়ে দেখোতো তোমার ফ্লাইন রাইডার আসে কিনা।
,,, অর্পনার বিরক্তি ভরা মুখ নিয়ে এগিয়ে গেলো,, লোকটা আবার কোন পাগলামিতে মেতেছে কে জানে? অর্পনা দুহাতে গাউনের দুই প্রান্ত ধরে ঝানালা দিয়ে উঁকি দিতেই সাথে সাথে চোখ জোড়া শীতল হয়ে এলো। সমুদ্রের কোল ঘেসে ঘোড়ার রেস ধ্বনি ছুটিয়ে এগিয়ে আসছে মির্জা বাড়ির বড়ো সন্তান, অর্পনার পারশোনাল মির্জা। দ্বীপ ঘোড়ার লাগাম টেনে ওর দিকেই তাকিয়ে। দুজনার চোখাচোখি হতেই লজ্জা পেলো অর্পনা,, দ্বীপ এগুতে এগুতে অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। দুজন দুজনকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে,, দ্বীপ ইশারায় ওকে নিচে নামতে বললো অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করলো। দ্বীপ ভ্রু উচিয়ে প্রশ্ন করলো কেনো আসবেনা? অর্পনা ফের মাথা ঝাকালো মানে বলবেও না আসবেও না। রাত্রি এগিয়ে এসে অর্পনার সাথে সাথে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বললো —
রুপান্জেলকে এভাবে পাওয়া যাবেনা,, আগে মন্ত্র বলুন তারপর যেতে দিবো।
দ্বীপ কিছুক্ষন ভাবলো,, রুপান্জেলকে ডাকার মন্ত্রটা যেনো কি ছিলো? মনে করতে পারছেনা।সে বিহানকে কল করলো,, ওরা ছেলে পার্টিরা সব ভিলার ভিতরে কারন অর্পনার ড্রেসটা স্বাভাবিক নয়। কাধ, বাহুতে পাতলা আবরন থাকায় দ্বীপ ব্যাতিত অন্য কারোর নজর আটকানো লোভনীয় হবে না। বিহানকে কল দিলে সে জানালো তার মনে নেই,, অরুন আর পল্লবকে জিজ্ঞেস করলে তারাও বলতে পারলো না। দ্বীপ বিরক্ত হলো,, এতোক্ষণ ওদের সাথে সময় নষ্ট না করে যদি নেট সার্চ দিতো, ঠিকি পেয়ে যেতো। কল কেটে নেটে সার্চ দিতেই মন্ত্রটা দেখে সুক্ষ হাসলো। মন্ত্রের আগা মাথা সব পরিবর্তন করে নিজের মন মতো একটা মন্ত্র বানিয়ে চিৎকার করে ডাকলো — হেই রাপানজেল!! আই ওয়ানা স্মেল ইউর হেয়ার’স ফ্রেগরেন্স। কাম টু মি অ্যান্ড লেট মি বি ক্লোজ টু ইউ।”
,,, অর্পনা হেসে ফেললো,, তার জীবনটা কেমন সিনেমাটিক হয়ে যাচ্ছে,, এতোটা ভালো মোমেন্ট আসাটা কি সত্যিই উচিৎ? সবসময় যদি এক্সিস্ট না করে? ইরা অর্পনার অন্য পাশ দিয়ে উঁকি মেরে বললো — ইউ আর রং ফ্লাইন রাইডার!! আমাদের মনে হচ্ছে আপনাকে ডাইনি পাঠিয়েছে আমাদের রুপানজেল এর ক্ষতি করার জন্য,, আগে ঠিক মন্ত্র বলুন তারপর যেতে দিবো।
,,, দ্বীপ ঠোঁট কামরে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইলো,, অর্পনাকে কাছে থেকে দেখার জন্য, ভিতরটা কেমন নিসপিস করছে। কিন্তু বউয়ের বান্ধবীদের জন্য পারছেনা,, দ্বীপ ক্ষানিক ভেবে উত্তর করলো – আমি রোজা আছি, পাঠিয়ে দাও। চাইলেও কোনো ক্ষতি করতে পারবো না।
,,,, দ্বীপের কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়ে সরে গেলো দুজন,, পরশী আর মেধা খিলখিল করে হেসে উঠলো৷ অর্পনাও কিছুটা লজ্জা পেলো। লোকটা নির্লজ্জতার সীমা ছাড়াচ্ছে দিনদিন। দ্বীপ অর্পনার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাতেই অর্পনা মাথা হেলিয়ে শায় জানালো,, মানে সে এখনি আসছে।
,,,অর্পনা গাউনের দুই প্রান্ত দুহাতে আগলে নিয়ে রুম, বারান্দা, সুইমিং এরিয়া পেরিয়ে সিরি বেয়ে নিচে নেমে দৌড়ে দ্বীপের কাছে পৌছালো। অর্পনা কাছাকাছি আসতেই ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নিচে নামলো দ্বীপ,, সৌষ্ঠব মানবের পরনে সাদা শার্ট, গ্রে পেন্ট। বরাবরের ন্যায় শার্টের তিনটে বুতাম খোলা যার ফলে ভিতরে থাকা সেন্ডো গেঞ্জির অনেকাংশই দৃশ্যমান সাথে প্রসস্থ বুক, গলা। বাতাসের ঝাপ্টায় শার্ট সরে গেলে কাধের কিছুটা অংশ অর্পনার নজরে ঠেকছে,, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে বাতাসের সাথে সাথে এলোমেলো হচ্ছে বারংবার। ধূসর বিড়ালের মতো চোখে মাদকের বিস্তর,,ঝাম রঙা ফিনফিনে ঠোঁট জোড়া শুকনো। অর্পনার অন্তর জুরে মুগ্ধতার বসবাস,, সে বোকার মতো লোকটার সৌন্দর্য আহরন করছে। অর্পনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ ভ্রু নাচালো,, অর্পনা মাথাটা হালকা কাত করে দ্বীপের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বললো — আপনাকে পুরো কোচওয়ানের মতো লাগছে,, আপনাকে আমার পছন্দ হয়নি,, আপনার ঘোড়ায় আমি চড়বো না।
,,, দ্বীপ মাথা নিচু করে ভ্রু চুলকে কয়েকপা এগিয়ে এসে অর্পনার কোমর জড়িয়ে আকষ্মিক টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো — হেই রুপানজেল!! তোমার মন জয় করতে নয়,, তোমায় হরন করতে এসেছি। তুলে নিয়ে মন কুঠুরিতে আজীবন বন্দী করে রাখবো।
,,, অর্পনা গাউন ছেড়ে দ্বীপের গলা জড়িয়ে ধরে বললো — ওপ্স ভয় পেয়েছি,, আমায় তুলে নিবেন না প্লিজ,, আমি বড্ড অসহায়।
,,, দ্বীপ অন্যদিকে মুখ সরিয়ে হেসে ফেললো,, অর্পনাও হাসলো। দ্বীপ মুখ নামিয়ে অর্পনার উন্মুক্ত কাধে চুমু খেতেই অর্পনা মৃধু শিহরণে দ্বীপের শার্ট খামচে ধরে চোখ বুঝে নিলো। দ্বীপ বাকা চোখে অর্পনার শিহরিত মুখটা অবলোকন করলো। কখনো লজ্জা কিংবা আবেগ প্রকাশ করা মানুষ যখন এগুলো প্রকাশ করে তখন সামনে থাকা ব্যাক্তিটি বাক হারা হয়ে পরে। দ্বীপ এক হাতে অর্পনাকে আটকে রেখে অন্যহাতে গাল ছুলো। মুখে এক টুকরো সাজ নেই,, তবুও হলুদ রঙা মুখটা অসম্ভব সুন্দর লাগছে। অর্পনার ঠোঁটের মধ্যভাগের পাশাপাশি নাকেও কয়েকটা তিল রয়েছে। তিলগুলো খুব শরু তবে সবসময় নাক হালকা লাল হয়ে থাকায় তিলগুলো খুব সুন্দর লাগে। বুঝে রাখা চোখের পাপড়ি গুলো তিরতির করে কাপছে। দ্বীপ সেখানে চুমু খেলো,, পরপর অধ্বপ্রান্ত অর্পনাকে পর্যবেক্ষণ করে মৃধু কন্ঠে দুটো লাইন আওড়ালো –
,,, তুমি মানুষ নাকি পরি,,
আমি ভেবে ভেবে মরি।
যতো দেখি মন ভরে না,,
তুমি মানুষ নাকি পরি,,
আমি ভেবে ভেবে মরি।
যতো দেখি চোখ সরে না,,
,,, অর্পনা তখনো চোখ বুঝে রেখেছে,, মুলত সত্যি ই তার লজ্জা করছে। ড্রেসের হাতাটা নেট কাপরের হওয়ায় বড্ড নার্ভাস ফিল করছে,, হুট করেই অর্পনাকে ছেড়ে দিলো দ্বীপ,, ওকে টেনে ঘোড়ার সামনে দাড় করালো,, ঘোড়াটা বেশ বড়ো,, অর্পনার সমান। দ্বীপ ঘোড়াতে উঠানোর জন্য অর্পনাকে কোলে নিতে চাইলে অর্পনা মানা করে দিলো । ভাব নিয়ে বললো সে নিজেই পারবে। দ্বীপ মানলো,, জোর করলো না। অর্পনাও ভাব নিয়ে সাড্ডেল এ পা দিয়ে উঠতে চাইলো কিন্তু ঘোড়াটা সাইজে তার সমান হওয়ায় পিঠে ভর দিতে পারছে না। দ্বীপ পকেটে হাত গুজে অর্পনার দিকে তাকিয়ে। অর্পনা কিছুক্ষণ থম মেরে ঘোড়াটাকে পর্যবেক্ষণ করলো,, ভাব এমন যেনো সে ঘোড়ায় উঠার মারাত্মক একটা কৌশল বের করবে। কিছুক্ষণ ভেবে দ্বীপের দিকে অসন্তুষ্ট নজরে তাকালো অর্পনা,, মুখে ব্যাঙ্গাক্তক ভাব এনে বললো — প্রিন্সেস এর মতো সাজালেই হয়না,, প্রিন্সেস এর মতো রাখতে হয়। আমি উঠতে পারছিনা,, ব্যাবস্থা করুন।
,,, দ্বীপ কিছু বললো না,, নিরবে বালিতে হাটু গেড়ে বসে পরলো পরপর নিজের কাধের দিকে ইশারা করে বললো– এখানে পা দিয়ে উঠুন।
( বাহুবালি মুভির এমন একটা সিন আছে,, প্রভাস যখন দেবসেনাকে সম্মান করে কাধে ভর দিয়ে জাহাজে উঠতে বলে তখনি আমি প্রভাসের প্রেমে পরে যাই,, ঐ প্রেম এখনো কাটেনি,, আমি এখনো প্রভাসের প্রতি উইক 🙈)
,,, অর্পনা মানা করলো না,, বুক ভরা আত্মবিশ্বাস আর অহমিকা নিয়ে দ্বীপের কাধে পা রাখলো,, অর্পনা পা রাখতেই কিছুটা উচু হলো দ্বীপ,, অর্পনা ঘোড়ার পিঠে ভর দিয়ে উঠে বসলো। অর্পনা উঠতেই সাড্ডেলে ভর দিয়ে লাফিয়ে ঘোড়ায় উঠলো দ্বীপ। এক হাতে লাগাম ধরে অন্যহাতে অর্পনার পেট জড়িয়ে ধরলো। পরপর লাগামে টান দিতেই দ্বীপের বুকের সাথে মিশে গেলো অর্পনা, ঘোড়া ধীরে ধীরে ছুটছে তবুও কখনো না চড়ার দরুন ভয় পেলো পেয়েটা। দ্বীপের শার্টের এক কোনা ধরে শঙ্কিত কন্ঠে আওড়ালো– ভয় লাগছে,, পরে যাবো মনে হচ্ছে।
,,,সাথে সাথেই লাগামটা একটু আলগা করে দিলো দ্বীপ। ঘোড়াটা ধীরে ধীরে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে থেমে দাঁড়ালো। ঘোড়া থামতেই অর্পনা ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকালো, তার চোখে মুখে হালকা বিস্ময়, লোকটা কি করতে চাচ্ছে কি? অর্পনার প্রশ্নবোধক চাহনির উত্তর স্বরুপ দ্বীপ পরনের শার্টটা খুলে ফেললো। পরপর সেটা ধীরে ধীরে পেঁচিয়ে রশির মতো বানিয়ে অর্পনাকে নিজের সাথে বেধে নিলো। অর্পনা অবাক হলো, লোকটা এতো রোমান্টিক? সে তো বুঝতেই পারেনি। এই বিষয়গুলো অর্পনার বেশ ভালো লাগছে।
,,, ঘোড়ার লাগামে এখন তীব্রতা বিরাজ করছে,, দ্বীপ অর্পনাকে নিয়ে বিচের পাড় ধরে ছুটে চলেছে। অর্পনা প্রথমে ভয়ে কাবু হয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে নিজের আসল সত্তায় ফিরে এসেছে। সে এবার দুদিকে দুহাত মেলে দিলো। ঘোড়াটি খুব দ্রুত গতিতে চলার দরুন অর্পনার বেনি থেকে কয়েক গোছা চুল বেড়িয়ে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। চুলে বাটারফ্লাই কাট দেওয়া থাকলে এই এক ঝামেলা,, একটু বাতাস হলেই ছোট ছোট চুলগুলো চোখে মুখে পরে বিরক্ত করে। তবে অর্পনার চুলগুলো খুব বাধ্য,, তারা তাদের মালিককে নয় বরং মালিকের হাসবেন্ডকে বিরক্ত করার পায়তারা করছে। দ্বীপ অবশ্য এতে বিরক্ত হচ্ছে না,, একটু পর পর চুলে মুখ গুজে চোখ বন্ধ করে অর্পনার চুলের ঘ্রান নিচ্ছে,, মুখের উপরে উড়ে আসা চুলগুলোকে সাদরে গ্রহণ করছে। অর্পনা দুদিকে হাত ছড়িয়ে রেখেই দ্বীপের উদ্দেশ্যে বললো — আপনি তো খুব ভালো ঘোড়ার লাগাম টানতে পারেন,, আ’ম ইম্প্রেস্ড!!
,,,, অর্পনার কথায় প্রতিউত্তর করলো দ্বীপ — এগুলো নতুন কিছু নয়,, কিশোর বয়স থেকেই আমি আর বিহান হর্স রাইডে এক্সপার্ট।
,,, অর্পনা মাথা নাড়ালো মানে বুঝেছে,, পরপর ঠোঁটে দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটিয়ে বললো– আপনি এখন কোন বয়সে আছেন? যুবক তো নেই,, বেশ বয়স হয়েছে আপনার।
,,, দ্বীপের স্বাভাবিক মুখটা গম্ভীর হয়ে এলো — বয়স হয়েছে বলতে? আমাকে তোমার বুরো মনে হয়?
,,, খুব।
,,,, নো!! আ’ম স্টিল ইয়্যং,, মাত্র ৩২ চলে।
,,, অথচ আমার ২৩। নয় বছরের বড়ো আপনি,, ঠকে গেলাম।
,,, আমাকে পেয়ে তুমি ঠকে গিয়েছো?
,,, অনেকটা।
,,, ঘোড়ার গতি ধীরে ধীরে কমে এলো,, দ্বীপ পিছনে হাত দিয়ে শার্টের গিট খুলে অর্পনাকে মুক্ত করে দিয়ে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে কোনোদিক না তাকিয়ে সামনের দিকে হাটা দিলো। বোকা বনে গেলো অর্পনা,, কি হলো লোকটার? রাগ করেছে নাকি? অর্পনা তাড়াহুড়ো করে ঘোড়া থেকে লাফ দিলো,, এই দ্বীপ মির্জার জন্য তাকে যে আর করো লাফালাফি করতে হবে,, আল্লাহ মালুম। কখনো এক তলা থেকে লাফ দিতে হচ্ছে আবার কখনো ঘোড়া থেকে,, কবে না জানি পাহাড় থেকেও লাফ দিতে হয়। এদিকটাতে সারি সারি ঝাও গাছ রয়েছে। জায়গাটা বেশ নির্জন ,, তাদের পারশোনাল বিচ থেকে অনেকটা দূরে। অর্পনা দৌড়ে দ্বীপের সামনে গিয়ে দাড়ালো,, দ্বীপ চোখ মুখ শক্ত করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে,, অর্পনা ভ্রু কুচকে বললো — কি হলো, আমায় ফেলে কোথায় যাচ্ছেন?
,, দ্বীপ উত্তর করলো না, অর্পনাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। অর্পনা চোখ ছোট ছোট করে দ্বীপের প্রস্থান দেখছে,, এটুকু কথায় এতো রাগ করার কি হলো? আজব তো। অর্পনা আবারও দৌড়ে দ্বীপের কাছে গিয়ে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো,, থমকালো দ্বীপ,, কয়েকপল দাড়িয়ে থাকার পর আবারও অর্পনার হাত ছাড়িয়ে হাটা ধরলো। এই পর্যায়ে অর্পনার ঘাড়ের বাকা রগটা আরও একটু বেকে গেলো,, সে কখনো কারোর রাগ ভাঙায় না। ভাঙাবেও না,, এই লোক তাকে ইগনর করছে তো? করুক। তার কিছু এসে যায়না।
,,, অনেকটা পথ হাটার পরেও যখন পিছনে কারোর পায়ের শব্দ পেলো না, অবাক হলো দ্বীপ। পিছনে তাকিয়ে যতোটা দেখা যায় পুরোটা জায়গায় চোখ বুলালো,, অর্পনা কোথাও নেই।ওকে দেখতে না পেয়ে বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠলো। কার সাথে রাগ করেছিলো সে? এই ঘারত্যারার সাথে রাগ করা আর পাথারের বুকে মাথা ঠুকা,, একই ব্যাপার। দ্বীপ উল্টো ঘরে পেরিয়ে আসা পথে অর্পনাকে খুজতে লাগলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে অর্পনার নাম ধরে ডাকলো কিন্তু অর্পনা কোনো সারা শব্দ দিচ্ছে না। পুরো দশ মিনিট খোজাখুজির পরেও যখন অর্পনার খোজ পেলো না,, দ্বীপ অনুভব করলো তার মাথা ব্যাথা করছে,, শ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখোনি অর্পনাকে দেখতে না পেলে সে মরে যাবে। দ্বীপ এক হাতে মাথা চেপে ধরে অসহায় কন্ঠে ডাকলো–
,,, ভেলোরা!! কোথায় তুই? আমার মাথায় খুব কষ্ট হচ্ছে। বেড়িয়ে আয় সোনা,, আমি সরি, আর রাগ করবো না। ভেলোরা!! কাম হেয়ার,প্লিজ!!
,,, দ্বীপ যেখানে দাড়িয়ে আছে তার থেকে অনেকটা দূরে ঝোপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলো। দ্বীপ অসহায়ের ন্যায় অর্পনার দিকে তাকিয়ে, এগুচ্ছে না। অর্পনাও তার কাছে আসছেনা,, দুজন স্টিল দুজনের দিকে তাকিয়ে। অর্পনাকে এগুতে না দেখে মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে পরলো দ্বীপ, অর্পনা আর দাড়িয়ে থাকতে পারলো না। দৌড়ে এসে দ্বীপের পাশাপাশি বসে বিচলিত কন্ঠে সুধালো —
,,, কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? দ্বীপ!! জান!!
,,, দ্বীপ কিছু বললো না, আকষ্মিক টানে অর্পনাকে কাছে টেনে নিলো,, অর্পনাও মিশে গেলো অনেকটা। দ্বীপ কেমন উন্মাদের মতো আচরন করছে,, আরও শক্তি প্রয়োগ করে অর্পনাকে শক্ত বাধনে বেধে নিচ্ছি যেনো বুকের ভিতর ছোট্ট দেহটা লুকিয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে মানব। অর্পনা সবটা মেনে নিলো,, লোকটা এখনো পাগল ই আছে,, আগে সবকিছুর জন্য পাগলামি করতো এখন শুধু তার জন্য করে।
পুরো একটা সকাল দ্বীপের সাথে পুরো বিচ চষে বেড়ানোর পর টানা বিকাল পর্যন্ত ঘুমিয়েছে অর্পনা। আজ শরীরটা বেশ উইক লাগছে,, সারাদিন বালুপারে ঘুরাঘুরি করার কারনেই হয়তো এতোটা খারাপ লাগছে। আপাততঃ দ্বীপ এখানে নেই,, এখানে নেই বললে ভুল হবে সে চট্টগ্রামের কোথাও নেই। কি একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজে ঢাকা গিয়েছে। মির্জাদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে যেতে কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয়না। তারা চলাচলের জন্য হেলিকপ্টার ইউজ করে,, তাদের জন্য বিভাগ চেন্জ করা আর মালিবাগ থেকে সাহাবাগ যাওয়া একই বিষয়। তবে দ্বীপ কথা দিয়েছে সে সন্ধার আগে কিংবা কিছু সময় পর ফিরে আসবে। প্রথমে চেয়েছিলো সবাই মিলে ফিরে যেতে কিন্তু ইরা আবদার জানালো সে আরও একটা দিন এখানে থাকতে চায়। দ্বীপ মানা করেনি,, এটা তাদের পারশোনাল বিচ,, থাকতে চাইলো থাকুক কয়েকদিন। অর্পনা বিছানা ছেড়ে লম্বা চুলগুলো খোপা করে নিলো।
দ্বীপকে খুব মনে পরছে,, একটু কথা বলতে ইচ্ছা করছে। সে ফোন হাতে নিয়ে অবলীলায় কল করে বসলো, তবে ওপাশের মানবটি বোধহয় সত্যি ই বিজি। দ্বীপ কল কেটে দেওয়ায় অর্পনা আর কল করেনি,, তবে তাকে অবাক করে দিয়ে ওপাশের ব্যাক্তি সরাসরি ভিডিও কল করলো। অর্পনা এর আগে বন্ধু বান্ধব ছাড়া কখনো,, কারোর সাথে ভিডিও কলে কথা বলেনি,, পাপ্পার সাথেও না৷ ভিতরটা হাসফাস লাগছে তাই কল কেটে অডিও কল দিলো, এবার ওপাশে থাকা ব্যাক্তিটি কল কেটে আবারও ভিডিও কল দিলো। এভাই চললো অনেকটা সময়,, না পেরে অর্পনাই কল ধরলো। ফোনটা সামনে ধরতেই রাজনীতি বীদ দ্বীপ মির্জাকে দেখতে পেলো। লোকটা ক্লাবে আছে,, উনার চেহারা দেখে বুঝার উপায় নেই উনার সামনে কে আছে? বা কি হচ্ছে, অথচ অর্পনা স্পস্ট কারোর গুঙানির শব্দ শুনছে। অর্পনা বিচলিত হলো না, সে শান্ত স্বরেই বললো — ক্লাবে মারছেন? খবর হয়ে যাবে,, আলাদা কোথাও নিতে পারতেন,, আমি কিন্তু সত্যি সত্যি কারাগারে গিয়ে সংসার করতে পারবো না। আবার জেলে থাকা হাসবেন্ড ও আমার চাইনা,, সপ্তাহে সপ্তাহে দেখা করে বাচা অসম্ভব । আমার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৪ ঘন্টাই স্বামী প্রয়োজন।
,,,, অর্পনার এহেন কথায় ওপাশে থাকা মানবের গম্ভীর মুখে হালকা হাসি ফুটলো। পায়ের তলায় থাকা লোকটাকে লাত্থি মেরে দূরে সরিয়ে দিতেই লোকটা কেশে উঠলো। দ্বীপ ফোনে নজর স্থির করে বললো — তোমায় অসম্ভব সুন্দর লাগছে,, এই মুহুর্তে কাছে থাকলে অনেকটা সময় নিয়ে এই সৌন্দর্য আহরন করতাম।
,,,অর্পনাও একই ভাবে উত্তর করলো — আপনাকেও রাজনীতি বীদ হিসেবে ভালোই মানায়,, প্রেমে পরার মতো। কাছে থাকলে আহরন করার বেনিফিট আমিও মিস করতাম না। যাই হোক,, দ্রুত ফিরবেন।
,,, দ্রুত ফিরলে ফায়দা কি? কেউ তো আর আমার জন্য স্পেশাল ডিস সাজিয়ে রাখবে না?
,,, কেউ নিজেই যখন কারোর খুব পছন্দের খাবার,, সেহেতু ডিস সাজিয়ে না রেখে নিজেকে সাজানোই প্রেফার করে বেশি। এখন রাখছি, ফিরলে দেখা হবে।
,,,কথাটা বলে ঠাস করে কল কেটে দিলো অর্পনা। ওপাশের ব্যাক্তির বলা পরবর্তী কথাটা শুনতে ইচ্ছা করলো না,, লোকটা পারশোনাল্লি খুব খারাপ,, উল্টাপাল্টা কথা বলে। কল কাটতেই তার রুমে উকি দিলো ইরা, জানে দ্বীপ নেই তবুও ও উকি দিলো। দ্বীপের ভরসা নেই, কখন কোথা দিয়ে চলে আসে। ইরাকে দেখে মুচকি হাসলো অর্পনা, বললো — আয়!! রাত, অরুন, পল্লব কোথায়রে? ওদের দেখিনা বহুক্ষণ।
,,, ইরা ভিতরে প্রবেশ করে অর্পনার পাশাপাশি বসে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো — রাত আর অরুনকে দেখলাম ছাদে গিয়েছে,, হয়তো প্রেমালাপ করবে। পল্লব রুমে,, ঘুমাচ্ছে। পরশী আর মেধাপু ও নিজেদের রুমে ঘুমাচ্ছে। আজকে দিনটা বেশ বড়ো তো তাই সবারই টায়ার্ড লাগছে।
,,, অর্পনা বুঝলো,, সে উঠে দাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চিরুনি খুজলো। লোকটা চিরুনি ব্যাবহার করে এদিক ওদিক ছড়িয়ে রাখে,, তার মেজাজ খারাপ হয়,, আজো তাই করলো। সে চিরুনি খুজে বের করে মাথা আচরাতে নিবে তখনি ইরার বলা কথায় থমকে গেলো–
,,, অর্পন তুই আমাকে কতোটা বিশ্বাস করিস?
,,, অর্পনা চিরুনি রেখে ইরাদের সামনে এসে দাড়ালো। মেয়েটার চোখে মুখে ভয়, কূন্ঠা,, অর্পনা ইরাদের কাধে হাত রেখে বললো — তুই যদি এক বোতল বিষ এনেও বলিস এটা খেলে আমার ভালো হবে,, আমি দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করবো না।
,,, ইরা একটা শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো,, কাধে রাখা অর্পনার হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে সামনে এনে বললো — আমার সাথে এক জায়গায় যাবি? কথা দিচ্ছি,, ভাইয়া ফিরার আগেই দুজন ফিরে আসবো।
,,,, অর্পনা ভাবলো না,, নির্দ্বিধায় জবাব দিলো — আচ্ছা যাবো,, কিন্তু কোথায়? জানতে পারি?
,,, এখন না বলি? শুধু এটুকু জান,, আজ আমার সাথে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার জীবনটা খুব সুন্দর হবেরে,, সাথে তুই ও একটা বোঝা থেকে মুক্তি পাবি। যাবি প্লিজ!! আমার জন্য,, আমার খুশির জন্য?
,,, অর্পনা ইরার হাত শক্ত করে ধরলো,, চুল আচরানোর পরোয়া করলো না। এভাবেই মাথায় ঘোমটা টেনে বাহিরের দিকে হাটা দিলো। বন্ধু বান্ধবের ভালো হবে এমন কিছু করার জন্য যদি তার একটা প্রান চলেও যায় তবুও তার কিছু এসে যায় না। আর সবচেয়ে বড়ো কথা তার স্বামী আর পাপ্পা আছে,, তারা অর্পনার ভরসার জায়গা। সে যদি বিশাল কোনো বিপদেও ফেসে যায় তার ভরসার জায়গাগুলো ঠিক তার কাছে পোছে যাবে,, তাকে আগলে রাখবে।
,,, সমুদ্রের পাড় ধরে হাটছে অর্পনা, ইরা শক্ত করে ওর হাত ধরে রেখেছে। মেয়েটা ক্ষনে ক্ষনে কেপে কেপে উঠছে। অর্পনার মনে হচ্ছে সে ইরার ভরসায় নয় বরং ইরা তার ভরসায় রাস্তা পেরুচ্ছে। টানা এক ঘন্টা যাবত হাটছে তারা,, নিজেদের পারশোনাল বিচ ফেলে এসেছে বহুক্ষণ। সকালে দ্বীপ আর সে যেখানে মান অভিমানে পরশা সাজিয়েছিলো,, সেই জায়গাটাও ছেড়ে এসেছে।
একটা বিষয় অর্পনাকে বেশ ভাবাচ্ছে,, দ্বীপদের বিচ সবসময় গার্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাহিরের মানুষ আসতেও পারেনা আবার ভিতরের মানুষ দ্বীপ কিংবা বিহানের অনুমতি ছাড়া বেরুতেও পারেনা। তবে তারা যখন বেরিয়ে এলো একজন গার্ড ও এগিয়ে আসেনি,, বাধা দেয়নি। এটা কিভাবে সম্ভব? অর্পনার ভয় করছে না তবে কৌতুহল জাগছে। কি হয়েছে ইরার সাথে? ও কোথায় নিয়ে যাছে ওকে? কিসের সূখ? কিসের বোঝা? অর্পনার মোটামুটি তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। অর্পনা একবার ভাবলো দ্বীপকে কল করবে পরক্ষনেই ইরার কথা ভেবে করলো না। বিপদ বুঝলে দ্বীপকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে দিবে। তারা হাটতে হাটতে একটা জঙ্গল মতো জায়গায় এসে থামলো,, এখানে বিশাল বিশাল ঝাউ গাছ,, সাথে আরও অন্যান্য সামুদ্রিক উদ্ভিদ বড়ো বড়ো হয়ে জায়গাটা কেমন ঘিরে রেখেছে। পরিবেশটা একদমি গা ছমছমে,, গাছে গাছে থাকা পাখির ডাক গুলো ও কেমন ভয়ানক ঠেকছে। এইতো বিশ পচিশ মিনিট পরেই মাগরিবের আজান পরবে। অর্পনা ফোন হাতরে সময় দেখতে গিয়ে খেয়াল করলো তার সিম ডিসেবল দেখাচ্ছে,, এই জায়গাটাতে নেট পাওয়া যাচ্ছেনা মেবি। এই পর্যায়ে কিছুটা শঙ্কিত হলো অর্পনা,, ইরার হাত শক্ত করে ধরে কিছু বলতে নিবে তখনি পিছন থেকে ভেসে এলো — জানেম!!!
,,,, অতি পরিচিত কন্ঠ কর্নকূহর হতেই চমকে গেলো অর্পনা। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আদ্রিয়ানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে থমকালো,, আজ কতোগুলো দিন পর সামনাসামনি হলো দুজন,, অর্পনার বুকে হালকা কাপন ধরলো। আদির চোখ মুখ বিবর্ন,,যেনো কতোকাল ধরে এই চোখের ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই। অর্পনার দিকে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আছে আদি,, এই চাহনি অর্পনাকে বিরক্ত করে,, সে চোখ সরিয়ে ইরার দিকে তাকালো। ইরার এখানে আসা,, হুট করে আদির আগমন,, কিছু একটা মিলাতে চাইলো। মিলে যেতেই অবাক দৃষ্টিতে ইরার দিকে তাকালো। ইরা মাথা নত করে অর্পনার হাত ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাড়ালো। অর্পনা ইরার দিকে তাকিয়ে আদির উদ্দশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো — আপনি এখানে?
,,, আদ্রিয়ান দুপা এগিয়ে এলো,, ছোয়ার জন্য হাত বাড়ালে অর্পনা দূরে সরে গেলো। আদির ঠোঁট আর চেখের পাতা কাপছে,, চোখে পানিরা ভীর করেছে সেই কখন। আদি কাপা কাপা কন্ঠে বললো — কেমন আছো জানেম?
,,, অর্পনা মৃধু হাসলো,, আদ্রিয়ানের সাথে তার একটা বোঝাপরা রয়েছে তবে শত্রুতা নয়। সে নিজেকে শান্ত রেখে উত্তর করলো — আলহামদুলিল্লাহ!! আল্লাহ এর রহমতে ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
,,, এই পর্যায়ে আদির চোখ থেকে দুফোটা পানি গড়ালো — তোমায় কতোদিন দেখিনা আমার জান,, তুমি ছাড়া মরে যাচ্ছিলাম গো। আমায় তুমি একটু ও মিস করোনি? আমার কথা মনে পরেনি তোমার?
,,,, বলতে বলতে আবারও কাছে এগিয়ে এলো,, অর্পনা কিছু বলবে তার আগেই ওর মুখে রুমাল দিয়ে চেপে ধরলো আদি,, ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি। চোখে পানি আর ঠোটে পৈশাচীক হাসি বড্ড ভয়ানক দেখালো। অর্পনার মাথা ঘুরছে,, আদির মনোভাব বুঝতে পেরে হাতে থাকা ফোন দিয়ে ঘাড়ে বারি দিতে গিয়েও দিলোনা,, আদিকে সে আঘাত করতে পারবেনা। অর্পনার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো,, হাতে থাকা ফোনটা ফসকে গিয়ে বালির উপরে পরলো। ভেজা বালিতে পরার দরুন কোনো শব্দ হলো না। অর্পনা হুস হাড়িয়ে ঢলে পরতেই ওকে পাজা কোলা করে নিলো আদি। আদির এহেন কান্ডে দূরে দাড়িয়ে থাকা ইরাদ চমকে গেলো,, সে দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে আদির থেকে অর্পনাকে ছাড়াতে চেয়ে বিচলিত কন্ঠে বললো– আল্লাহ!! কি হয়েছে? অর্পন! রোজা রেখে এতো পথ হেটেছে বলে হয়তো মাথা ঘুরে গিয়েছে। চলুন,, সমুদ্রের পড়ে চলুন,, ওখান থেকে চোখে মুখে পানি ছিটালে ঠিক হয়ে যাবে।
,,, ইরাদের বোকা বোকা কথায় বিরক্ত হলো আদ্রিয়ান,, সাথে ওর স্পর্শেও। আদি ঝাড়া মেরে ইরার হাত সরিয়ে দিয়ে বললো — দূরে সরো,, অর্পনা এতোটাও উইক নয় যে রোজা রেখে অজ্ঞান হয়ে যাবে। ওকে আমি সেচ্ছায় অজ্ঞান করেছি।
,,,, আদির কথার মাথা মুন্ডু কিছু বুঝলো না ইরা। তার কানে বাজছে আদি ইচ্ছা করে অর্পনাকে অজ্ঞান করেছে। সে নিজে যে কতো বড়ো একটা ধোকার শিকার হয়েছে সেই ভাবনা ভাবলো না মেয়েটা,, অর্পনাকে ফের আদির থেকে ছাড়াতে চেয়ে বললো — ছাড়ুন ওকে। আমি ওকে নিয়ে যাবো,, ছাড়ুন।
,,, আদি আবারও ইরার হাত ঝাড়া মেরে ওকে দূরে সরিয়ে দিলো,, পরপর কিছুটা তিরস্কার সাথে কিছুটা কৃতজ্ঞতা মিশিয়ে বললো–
,,, আর ইউ মেড? গতো দুইটা মাস যাবত আমি ওকে পাগলের মতো খুজে যাচ্ছি। আর তুমি বলছো ওকে কাছে পেয়ে ছেড়ে দিবো? দূরে থাকো ইরাদ,, তোমাকে আমি বোনের নজরে দেখি,, বহুবার আমায় হেল্প করেছো এমনকি আজকে নিজের অজান্তে সবচেয়ে বড়ো উপকার করেছো। আমি তোমায় আঘাত করতে চাইনা।
,,, বোনের নজরে দেখি!! এই কথাটা ইরার কানে ঝঙ্কার তুললো। সে এবার আদ্রিয়ানের বাহু চেপে ধরে বিস্মিত কন্ঠে সুধালো– আপনি কি বলছেন এসব? আপনি না বলেছিলেন আজ লাস্ট বারের মতো অর্পনার সাথে দেখা করিয়ে দিলে আর কখনো আপনি ওর খোজ করবেন না? ওর জন্য কষ্ট পাবেন না? সব ভুলে আমায় বিয়ে করবেন? আপনি তো আমায় ভসলোবাসেন আদি। আমিও বাসি,, অসম্ভব ভালোবাসি আপনাকে।
,,,,নির্দয় আদি আবারও ইরাদকে ধাক্কা মারলো,, এই পর্যায়ে ধাক্কাটা বেশ জোরেই ছিলো যার ফলে ঝীর্ন শীর্ন শরীরটা বালিতে আছড়ে পরলো। আদি মেয়েদের বারাবাড়ি সহ্য করতে পারেনা। তাকে কেউ স্পর্শ করবে এটা তো হতেই পারেনা। সে শুধু অর্পনার,, শুধুই অর্পনার। কত থেকে যেনো দৌড়ে এলো সিদ্ধার্থ,, সিদ্ধার্থকে আসতে দেখে ইরার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো–
,,, সিদ্ধার্থ!! সামলাও একে,, আমি দেশ ছাড়ার আগে যেনো ও কোনোভাবেই দ্বীপ মির্জার কাছে পৌঁছাতে না পারে,, মাইন্ড ইট!!
,,, সিদ্ধার্থ এসে ইরাকে ধরার আগেই ইরা উঠে দাড়ালো,, কাদতে কাদতে আদির পথ আটকালো,, অর্পনাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো —
,,, আপনি ওকে ছাড়ুন,, অর্পনা আমাকে বিশ্বাস করে এখানে এসেছে। আমি ওর কাছে বিশ্বাস ঘাতক হয়ে যাবো। ভ,ভাইয়া জানতে পারলে আপনাকে মেরে ফেলবে,, আপনি ভাইয়াকে চিনেন না,, পাগলের মতো ভালোবাসে অর্পনাকে। আ,আপনি ওকে ছাড়ুন না। আমরা তো একে অপরকে ভালোবাসি, তাইনা বলুন? আমার সাথে এমনটা করবেন না,, প্লিজ আদি!! ( আদ্রিয়ান ফের ধাক্কা মারলো ইরাকে। সিদ্ধার্থ সাথে সাথে আগলে নিলো ওকে। অর্পনাকে নিয়ে আদি চলে যাওয়ার জন্য হাটা ধরতেই শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলো ইরা) আদি!! আদি!!! ছাড়ুন সিদ্ধার্থ! ” আমি ওনার কাছে যাবো। উনি আমায় কথা দিয়েছিলেন অর্পনাকে একবার দেখে সারাজীবনের মতো ভুলে যাবে। আমি অর্পনাকে বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে এখানে এনেছি,, ও একটাবার কোনোরুপ প্রশ্ন করেনি। আমি ওর কাছে বিশ্বাস ঘাতক হয়ে যাবো। আল্লাহ!! সিদ্বার্থ ছাড়ুন না ,, আদি!! যাবেন না, ওকে ছেড়ে দিন।
,,,, ইরা সিদ্বার্থের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সিদ্বার্থ ওকে দুহাতে ঝাপটে ধরে শান্ত করার প্রয়াস চালাতে চালাতে বললো — ইরাদ!! ভাইয়া কখনোই অর্পনাকে ভুলে যাবেনা। ভাইয়া শুধু অর্পনাকে ভালোবাসে,, শুধুই ওকে। এই পৃথিবীতে আর এমন একটি রমনির ও জন্ম হতে পারেনা যাকে ভাইয়া ভালোবাসবে। বাচ্চামি করবেন না,, শান্ত হোন। আমার কথাটা শুনুন,, ইরাদ।
— ইরা নিজেকে ছাড়াতে না পেরে ডুকরে উঠলো— মিথ্যা বলছেন আপনি,, উনি বলেছিলেন আমাদের সংসার হবে,, বার বার বলেছিলেন” ভালোবাসি”। ওসব মিথ্যা হতে পারেনা। একটা মানুষ কখনো এতোটা ভালো অভিনয় করতে পারেনা। আমি মানবো না এসব,, আপনি মিথ্যা বলছেন। ছাড়ুন না , আমি উনার কাছে যাবো। উনি আমাকে ঠকাতে পারবেনা,,
,,, ইরা আবারও ছোটার চেষ্টা করলে ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সিদ্ধার্থ — ভাইয়া আপনাকে ঠকায়নি ইরাদ,, ওটা ভাইয়া ছিলোনা। ওটা আমি ছিলাম,, প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলেছেন আপনি। আমি নিরুপায় ছিলাম ইরাদ!! ভাইয়া আমায় বাধ্য করেছে আপনার সাথে এমনটা করতে,, নয়তো ও সুইসাইড করতো। আমি আমার বড়ো ভাইকে কি করে মরতে দেই বলুন? আমার ভাই তো!! ও ভালো খারাপ যাই করুক,, আমি ওর সাথ দিতে বাধ্য।
,,,,একমুহূর্তের জন্য থমকে গেলো ইরা,, চোখে কান্না নেই, শরীরে জোর নেই,, অবাক চোখে সিদ্বার্থের দিকে তাকিয়ে। সিদ্ধার্থ ইরাদের গাল ছুলো,, কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো— ইরাদ!! আমি আপনাকে ভালোবাসি,, আমি সত্যি ই আপনাকে ভালোবাসি। এটা আজকে থেকে নয়,, যখন আমার সাথে একই হসপিটালে ভাইয়ার অপেক্ষায় দিন রাত পরে থাকতেন,, আমি তখন থেকেই আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তাই ভাইয়ার সার্থে আপনার সাথে কথা বলার লোভটা সামলাতে পারিনি। আ’ম সরি!! আমায় ভুল বুঝবেন না।
,,,, ইরা ধপ করে বালির উপর বসে পরলো,, ইরার এই ভঙ্গুর মুখশ্রী দেখে মাথা নিচু করে নিলো সিদ্ধার্থ। তার মন জুরে অনুতপ্ততা বিরাজ করছে। সে জানে কাজটা ঠিক করেনি। সিদ্বার্থ নিজে জানতো ইরাদের সাথে সে কথা বলছে কিন্তু ইরাদ তো জানতো না। ইরা জানতো সে আদির সাথে কথা বলছে,, আদি ওকে ভালোবাসে,, সংসার করার স্বপ্ন দেখিয়েছে। এই বিষয়টাতে বড্ড নিরুপায় ছিলো সিদ্ধার্থ,, এই কটাদিনে এক প্রকার পাগল হয়ে গিয়েছিলো আদ্রিয়ান। যখন অর্পনা অস্ট্রেলিয়া চলে যাবার কথা ভাবে,, মনে মনে বেশ খুশি হয়েছিলো আদি,, সে খুব শীগ্রই অর্পনার কাছে চলে যেতো কিন্তু ওখানে বাধা হয়ে দাড়ায় দ্বীপ। সকল প্লানে জল ঢেলে অর্পনাকে তুলে নিয়ে গেলো। এরপর টানা তিন সপ্তাহ পাগলের মতে বিহেব করেছে আদি,, একবার অর্পনাকে সামনাসামনি দেখার জন্য বাচ্চাদের মতো কান্না করেছে। এই মুহুর্তেও যে আদির অবস্থা খুব একটা ভালো এমন নয়,, দিনে কয়েকবার মাথা ঘুরে পরে যায়,, অর্পনাকে হেলোসোলেট করে।
এই দুই মাসে অর্পনাকে কাছ থেকে একটা পলক দেখার সুযোগ পায়নি আদ্রিয়ান। অর্পনা জানে সে স্বাভাবিক ভাবে জীবন ঝাপন করছে,, তার সাথে ভার্সিটিতে যাবার সময় কিছু গার্ড যায় আবার ফিরার সময় তারাও ফিরে আসে কিন্তু বিষয়টা এই পর্যন্তই থেমে নেই। দ্বীপ অর্পনাকে এমন একটা সিকিউরিটির মধ্যে রেখেছে যে আদি ড্রোন সেট করেও অর্পনাকে এক পলক দেখতে পারেনি। ভার্সিটি থেকে আদি জব ছাড়েনি বরং আদিকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মির্জা বাড়ির সামনের এক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বড়ো মাপের একটি গাছ ও আস্তো রাখেনি,, সব কেটে ফেলেছে। কজ অফ আদ্রিয়ান অর্পনাকে এক পলক দেখার জন্য সারারাত গাছের উপর বসে থাকতো। দ্বীপের করা নিয়মটা এমন ছিলো যে,, অর্পনাকে সবাই দেখতে পারবে কিন্তু আদি না,, ওকে দেখার কোনো স্কোপ রাখেনি দ্বীপ। বহু চেষ্টার পরেও যখন অর্পনাকে দেখার কোনো ওয়ে পেলো না,, তখনি বড়ো ভাই হয়ে সিদ্ধার্থের পা জড়িয়ে ধরলো আদি,, ওর কথা না মানলে সুইসাইড করবে বলে হুমকি ও দিলো। বড়ো ভাইয়ের এহেন অবস্থা দেখে ঠিক থাকতে পারেনি সিদ্ধার্থ,, যার ফল স্বরুপ ইরাকে ব্যাবহার করা। সম্পূর্ণ বিষয়টা ইরাকে খুলে বলতেই খিল খিল করে হেসে উঠলো মেয়েটা পরোক্ষনেই বাচ্চাদের মতো শব্দ করে কেদে ফেললো । একবার সিদ্ধার্থের দিকে আঙুল তাক করে আরেকবার আদি যেই পথ দিয়ে গিয়েছে সেই পথের দিকে ইশারা করে বললো —
,,, আপনি,, আপনারা দুভাই মিলে আমার সাথে নাটক করেছেন? আমায় ট্রাম কার্ড হিসেবে ব্যাবহার করেছেন? বাহ!! ভালো তো। এখন তো আপনাদের নাটক শেষ তাইনা? অর্পনাকে পেয়ে গিয়েছেন। এবার ইরাদ মরুক বাচুক কিছু আসে যায়না। ইরাদের কোনো দাম নেই,, ইরাদের কোনো মন নেই,, সে একটা পাথর। তাকে নিয়ে খেলা যায়,, খেলে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়। আমি এটা কি করলাম? কাকে বিশ্বাস করলাম? ওফফ!! ইশ্বর!! আমি মরছি না কেনো? আপনারা আমায় ব্যাবহার করে নিজেদের সার্থ সিদ্ধি করে নিলেন? আমায় এভাবে বোকা বানালেন? হ্যা!! ইরাদ তো একটা বোকা,, নাহ!! বোকা না,, সে একটা বিচ,, স্রেফ অ্যা বিচ। বিশ্বাস ঘাতক,, বাজে, জঘন্য, নর্দমার কীট সে,, তার মরে যাওয়া উচিৎ।
,,, বলতে বলতে নিজের গালে নিজেই চর থাপ্পড় মারতে লাগলো,, সিদ্বার্থ তাড়াহুড়ো করে ইরার পাশে বসে ওর হাত ধরে আটকাতে চাইলো কিন্তু পেরে উঠলো না। ইরা একের পর এক নিজেকে আঘাত করছে আর নিজেই নিজেকে বাজে ভাষায় গালি দিচ্ছে। সিদ্ধার্থ ওকে থামাতে না পেরে মেয়েদের নরম করার সর্বোচ্চ অস্ত্রটা প্রয়োগ করলো। মাথাটা শক্ত করে ধরে উষ্ঠযুগল দখল করে নিলো। তবে সিদ্ধার্থের ভাবনাটা ভুল,, সব মেয়ে এইভাবে কাবু হয়না। সময়টা সেকেন্ডের কাটা ছাড়ানোর আগেই তীব্র শক্তি দিয়ে সিদ্ধার্থের কন্ঠনালি চেপে ধরলো ইরাদ।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২ (২)
সাথে সাথে দূরে সরে গিয়ে কাশতে লাগলো সিদ্ধার্থ,, এই সুযোগে ইরা উঠে দাড়িয়ে যেই পথে এসেছে সেই পথে ছুট লাগালো। সিদ্ধার্থের সাথে ধস্তাধস্তি করার বেলায় ফোনটা পরে গিয়েছে ওখানেই,, ইরা আর ফিরে তাকালো না। তাকে যতো দ্রুত সম্ভব দ্বীপের কাছে খবর পাঠাতে হবে। ইরাদের ছুটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো সিদ্ধার্থ,, আজ রাত তিনটায় তাদের ফ্লাইট,, টিকেট কাটা হয়েছে চারটা। ইরাদ যদি পালিয়ে যায়,, তাহলে চতুর্থ সিটটা ফুলফিল হবে কি করে?
