প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৫
insia isha chowdhury
চারিদিকে এখনো মেঘের গর্জন থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে। আগের মুষলধারে বৃষ্টি এখন কিছুটা স্তিমিত হলেও আকাশ পুরোপুরি শান্ত হয়নি।এখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাচে টুপটাপ শব্দ তুলে নামছে বৃষ্টির ফোঁটা, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও গভীর করে দিচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা বলছে, এখন প্রায় রাত আড়াইটা বাজে। সূচনা প্রণয়ের গেঞ্জির কাঁধের অংশটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরে রেখেছে। অন্য হাতটা আছে প্রণয়ের পেটের ওপর। সূচনার আঙুলের চাপ যে যথেষ্ট জোরালো, তা প্রণয় ভালোভাবেই টের পাচ্ছিল। তবুও সে কিছু বলল না।
ঠিক তখনই বিদ্যুৎ ফিরে এলো। ঘরজুড়ে আলো ছড়িয়ে পড়তেই চারপাশের অন্ধকার মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। হালকা হলুদ আলোয় একে অপরের অবায়ব দেখা গেল। প্রণয় ধীরে ধীরে সূচনাকে নিজের থেকে আলগা করে সরিয়ে দিয়ে ঘরের মূল লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। আলোকিত ঘরে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে সে দেখতে পেল, একটু দূরে কাচের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। নিশ্চয়ই হঠাৎ ভয় পেয়ে সূচনার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। এরপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সূচনার মুখে। রাতে প্রণয়ের কথা মত সূচনা চুল গুলো বেনি করেছিল। কিন্তু এখন ওর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। বেবি হেয়ার গুলো কপালের উপর পড়ে আছে। এছাড়া মেয়েটার মুখ অস্বাভাবিক রকম ফ্যাকাসে হয়ে আছে। চোখ দুটোতেও এখনো ভয়ের স্পষ্ট ছাপ। অথচ সেই ভয়টা লুকানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে সূচনা।
প্রণয় সূচনার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তারপর কোমল ভঙ্গিতে তার কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
কথাটা শুনেই সূচনা একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজের অস্বস্তিটা আড়াল করার চেষ্টা করে প্রতিবাদী গলায় বলল,
“কে বলেছে আমি ভয় পেয়েছি? আমি কি আপনাকে বলেছি যে আমি ভয় পাচ্ছিলাম?”
প্রণয়ের ভ্রু সামান্য উঁচু হয়ে গেল।
“আচ্ছা! তাহলে তুমি ভয় পাওনি?”
“না, একদম না। একটুও ভয় পাইনি।”
“ও আচ্ছা!”
প্রণয় ধীরে ধীরে সূচনার দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো।
“তাহলে একটু আগে বজ্রপাত হতেই আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে ছিলে কেন?”
সূচনার মুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল।
“আমি… আমি ধরিনি!”
“তাই?”
“না, মানে… আমি শুধু ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলে, তাই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে?”
প্রণয়ের গম্ভীর মুখ দেখে সূচনা উত্তর খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
“ওই সময় অন্ধকার ছিল। আর আমি…”
সূচনার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রণয় বলে উঠল
“হুম, বুঝেছি তোমার বিষয়টা।”
সূচনা ভ্রু কুচ কে জিজ্ঞাসা করল,
“কী বুঝেছেন?”
প্রণয় ঠোঁট চেপে হাসল। আর তারপর একটু মজা নিয়ে বলল,
“যে তুমি খুব সাহসী। এতটাই সাহসী যে ভয় পেলে সরাসরি আমার কাছেই চলে আসো! এতে অবশ্য আমার সমস্যা নেই। কেননা আমার বউ ভয় পেলে আমার কাছেই তো আসবে। তাই না? তাহলে বউ তুমি দিনে তিন থেকে চারবার এমনভাবে ভয় পাও ঠিক আছে।”
প্রণয়ের মুখের চাপা হাসিটা দেখে সূচনা আরও বিরক্ত হয়ে গেল। পাশে রাখা একটা বালিশ তুলে প্রণয়ের দিকে ছুড়ে মেরে বলল,
“এভাবে হাসছেন কেন? আমি কোন কিছুতেই ভয় পাই না। আমি যথেষ্ট সাহসী।”
কথাটা শেষ করে সূচনার নাকের পাটা ফুলিয়ে রাগে ফুঁসতে থাকা মুখটা দেখে প্রণয়ের বেশ মজা লাগল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি টেনে সে বলল,
“ও আচ্ছা, তাই নাকি?”
প্রণয়ের কথা শেষ হতেই বিরক্তিতে গজগজ করতে করতে সূচনা তার দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু হঠাৎই পায়ের নিচে কোনো কিছুর অস্তিত্বের স্পর্শ পেতেই সূচনার সমস্ত সাহস মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। আতঙ্কে বুক ধক করে উঠতেই আর কিছু না ভেবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রণয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে প্রণয় নিজেও প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ এমন আক্রমণে সে খানিকটা পিছিয়ে গেল। এক হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে সূচনার পিঠে জড়িয়ে তাকে আগলে রাখল, আর অন্য হাতটা পিছনে থাকা টেবিলের উপর রেখে নিজের ভারসাম্য সামলাল।
সূচনার নরম শরীরটা পুরোপুরি তার বুকে সেঁটে আছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটা মুখ গুঁজে রেখেছে তার কাঁধে। উষ্ণ নিঃশ্বাসগুলো বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রণয়ের গলা। হঠাৎ এমন ঘটনায় প্রণয় কিছুটা অবাক হলেও, পরমুহূর্তেই তার কানে ভেসে এল সূচনার উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,
“প্রণয়… আমাকে বাঁচান।”
মাত্র কয়েকটা শব্দ। কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দই প্রণয়ের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ঝড় তুলে দিল।
সাইকোলজি বলে, নিজের নাম শুনতে মানুষ ভীষণ পছন্দ করে। কিন্তু প্রণয় কখনো বুঝতে পারেনি একটি নাম এতটা সুন্দরও শোনাতে পারে।
অনেকেই তাকে নাম ধরে ডেকেছে। অসংখ্যবার শুনেছে সে নিজের নাম। কিন্তু আজ…আজ সূচনার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত “প্রণয়” শব্দটা তার হৃদয়ের গভীরতম কোনো জায়গায় গিয়ে আঘাত করল।
প্রণয়ের মনে পড়ে গেল তাদের বিয়ের রাতের কথা।
সেদিন সে নিজেই বলেছিল, সূচনা কে স্বামীর মতো করেই ডাকতে, চাইলে নাম ধরেও ডাকতে পারে। কিন্তু সূচনা একরকম জেদ করেই জানিয়ে দিয়েছিল, সে কখনো তাকে নাম ধরে ডাকতে পারবে না। অথচ আজ…ভয়ের মুহূর্তে সমস্ত দ্বিধা ভুলে কী অপূর্ব সহজতায় মেয়েটা তার নাম উচ্চারণ করল! কেন জানি না, প্রণয়ের আবার শুনতে ইচ্ছে করল। শুধু নিজের নামটা।
শুধু সূচনার মুখে। তাই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে খানিকটা ঝুঁকে এসে সে নিচু, ভারী স্বরে বলল,
“কী বললে? আরেকবার বলো তো।”
সূচনা এবার মাথা তুলে তাকাল। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক, বিরক্তি আর অস্থিরতার মিশ্রণ।
“আমি বললাম, আমাকে বাঁচান!”
প্রণয় মাথা নেড়ে না সূচক ভঙ্গি করল।
“না। এর আগে কী বলেছিলে, সেটা বলো।”
সূচনা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। এই মানুষটার কি সত্যিই মাথা খারাপ? এমন সময়েও মজা করছে! বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে সে বলল,
“আপনার কি কানে সমস্যা নাকি? আমি তো বললাম, প্রণয়… আমাকে বাঁচান!”
আবার আরও একবার নিজের নামটা সূচনার মুখে শুনে প্রণয়ের বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে সূচনা আর সেদিকে খেয়াল না করে সতর্কভাবে নিচের দিকে তাকাল। আসলে কী এমন জিনিস ছিল যার জন্য সে এতটা ভয় পেয়ে গেল? দৃষ্টি পড়তেই সে থমকে গেল। মেঝেতে পড়ে আছে ছোট্ট একটা লকেট। রাতে টেডি বিয়ারগুলো বিছানা থেকে সরানোর সময় সম্ভবত ওটার গলা থেকে খুলে পড়ে গিয়েছিল। আর সেই লকেটেই পা পড়ে আতঙ্কে সে ভেবেছিল কোনো পোকা-মাকড় কিংবা অন্য কিছু!
বাইরে ঝড়-বৃষ্টির শব্দ, চারপাশের অদ্ভুত পরিবেশ
সব মিলিয়ে সে না বুঝেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
বিষয়টা বুঝতে পেরে সূচনার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এতক্ষণ সে যে প্রণয়ের কোলে বসে আছে, সেই হুঁশও এখন ফিরে এল। তাড়াতাড়ি নেমে যাওয়ার জন্য নড়তেই প্রণয়ের বাহু আরও দৃঢ় হয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে।
পরক্ষণেই তার কানের কাছে ভেসে এল প্রণয়ের মুগ্ধ, মোহাবিষ্ট কণ্ঠস্বর,
“তোমাকে আর কীভাবে বাঁচাবো, মেয়ে?”
সূচনা অবাক দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকালো। আর প্রণয় একটু থেমে গভীর দৃষ্টিতে সূচনার চোখের দিকে তাকাল। তারপর হাস্কিস্বরে বলল,
“আমার নাম নিয়ে তো তুমি নিজেই নিজের সর্বনাশ করে ফেললে।”
কথাটা শুনে সূচনার বুকটা কেঁপে উঠল।
আর প্রণয়? সে এখনও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
সূচনার দৃষ্টি ভালোমতো প্রণয়ের দিকে পড়তেই সে খেয়াল করল, প্রণয় একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি আজ অন্যরকম। অচেনা, গভীর, আর অদ্ভুতভাবে মায়াময়। সূচনার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। এই দৃষ্টির অর্থ সে বুঝতে পারছে না, আবার না বুঝেও যেন বুঝে ফেলছে।
সূচনা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই প্রণয়ের ঠোঁট নড়ল।
খুব আস্তে, প্রায় অস্ফুট স্বরে প্রণয় বলল,
“ক্যান আই টেল ইউ হাউ মাচ আই এডোর ইউ?”
কথাটা শুনে সূচনার সমস্ত শরীর যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেল সে। কী উত্তর দেওয়া উচিত, সেটাও যেন মনে পড়ছে না। শব্দগুলো বাতাসে ভেসে রইল, অথচ চারপাশে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ, দূরে মেঘের গর্জন।সবকিছু যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। শুধু রয়ে গেল দুটো মানুষের দ্রুত বয়ে চলা হৃদস্পন্দন। সূচনার ঠোঁট কাঁপল সামান্য। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু নিঃশব্দে প্রণয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই নীরবতাকেই সম্মতি ভেবে প্রণয়ের চোখে মৃদু এক কোমলতা নেমে এল। খুব
ধীরে সে ঝুঁকে এলো।
তারপর প্রথমবারের মতো নিজের সমস্ত ভালোবাসা আর মুগ্ধতা মিশিয়ে সূচনার কপালে এঁকে দিল এক গভীর, স্নিগ্ধ চুম্বন। স্পর্শটা ছিল অবিশ্বাস্য রকম কোমল। তবুও সেই কোমলতার ভেতর লুকানো ছিল এক অদ্ভুত তীব্রতা।সূচনার চোখ দুটো আপনাতেই বন্ধ হয়ে এল। তার আঙুলগুলো অজান্তেই প্রণয়ের কাঁধের কাছে থাকা গেঞ্জিটা শক্ত করে খামচে ধরল।
মনে হলো বুকের ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। প্রণয় কপাল থেকে মুখ সরাল না।
বরং আরও কিছুটা সময় সেই স্পর্শটাকে অনুভব করল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ভালোবাসার ছোঁয়া নামিয়ে আনলো সূচনার বন্ধ চোখের পাতায়। একবার। তারপর আরেকবার মায়ায় ভরা দুটি নরম স্পর্শ। এরপর সেই আদুরে ছোঁয়া গিয়ে থামল তার উষ্ণ গালের ওপর। প্রতিটি স্পর্শে সূচনার বুকের ভেতর কেমন ভালোলাগার অনুভূতি তাকে ছুঁয়ে গেল।
প্রণয়ের মুগ্ধ স্পর্শ ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে আসতেই সূচনার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল। অজানা এক লজ্জা আর সংকোচে সে অজান্তেই মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিল। মুহূর্তেই দুজনের মাঝখানে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। প্রণয়ের উষ্ণ নিঃশ্বাসের স্পর্শে সূচনার শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। সে চোখ বন্ধ করেই রইল। কী বলবে, কী করবে? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
অবশেষে কাঁপা কাঁপা স্বরে ফিসফিস করে সূচনা বলল,
“আ…আমি…”
কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই প্রণয় বুঝে গেল, মেয়েটা ভয় পাচ্ছে। নতুন অনুভূতি, নতুন সম্পর্ক, নতুন এক আবেগ সব মিলিয়ে সূচনা এখনও নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারেনি। প্রণয়ের চোখের গভীরতা এক মুহূর্তেই কোমল হয়ে এল। সে আর কিছু বলল না। বরং সূচনাকে কোলে নিয়েই ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। বিছানার কাছে পৌঁছে অত্যন্ত যত্নে তাকে শুইয়ে দিল। তারপর নিজেও পাশে শুয়ে পড়ে দুহাতে জড়িয়ে নিল সূচনাকে। এমনভাবে, যেন পৃথিবীর সব ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে আড়াল করে রাখতে চায়।
প্রণয়ের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে থাকা সূচনা কয়েক মুহূর্ত পর কোনোমতে মাথা তুলে নিঃশ্বাস নিল। তারপর নরম গলায় অভিযোগের সুরে বলল,
“এভাবে কেউ জড়িয়ে ধরে? আমি তো ঠিকমতো নিঃশ্বাসই নিতে পারছি না। এমন করে কেউ ঘুমায়?”
কথাটা শুনে প্রণয়ের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“কেউ না ঘুমালে তুমি ঘুমাবে। আর আজ থেকেই অভ্যাস করো।”
সূচনা জিজ্ঞাসা করল,
“কেন?”
“কারণ এখন থেকে তোমার ঘুম ভাঙবে আমার বুকে, আর ঘুম আসবেও আমার বুকেই।
কথাটা শুনে সূচনার গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
বাইরে তখনও টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে।
রাত পার হয়ে গেছে। সকালে ভোরের আলো ফুটেছে এবং অভ্যাসগত স্বভাব থেকেই নিলুফা খাতুন সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠেছেন।
এই বয়সেও তিনি যথেষ্ট রুটিন মেনে চলতে পছন্দ করেন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং স্কিন কেয়ার এসব কিছুই তিনি মেনে চলেন।
সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে তিনি গার্ডেনটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। বলতে গেলে তিনি এখন হাঁটাচলা করছিলেন। আজ সকালে এই জিনিসটা মিস হয়ে গিয়েছিল, এজন্য তিনি ব্রেকফাস্টের পরই হাঁটা শুরু করে দিয়েছেন। তখনই নিলুফা খাতুনের ফোনে একটি মেসেজ এলো। মেসেজটা দেখতেই তার মুখটা মুহূর্তেই বিরক্তিতে ভরে গেল। অথচ মেসেজটা কিন্তু খুবই খুশির, কেননা রাফিই মেসেজটা পাঠিয়েছে। রাফির মেসেজ অনুযায়ী সে আজকেই বিডিতে চলে আসবে।
নিলুফা খাতুন ভেবেছেন ছেলে এই জন্যই মেসেজ পাঠিয়েছে, যাতে করে তিনি এয়ারপোর্টে গিয়ে রাফিকে রিসিভ করতে পারেন। সব চিন্তা-ভাবনা একদিকে রেখে তিনি এই বিষয়টাতে একটু খুশি হলেন যে এত বছর পর তার ছেলে আসছে।
আর সত্য তো কখনো চাপা থাকে না। রাফি তো একসময় ঠিকই জানতে পারবে যে সূচনার বিয়ে হয়ে গেছে। সেটা হয়তো আজ বাদে কালই জানবে, তাতে কী হয়েছে? তাই তিনি সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন এবং নিজেকে সেইভাবে তৈরি করতে শুরু করলেন। কারণ একটু পরেই তিনি এয়ারপোর্টে যাবেন এবং রাফিকে রিসিভ করবেন।
অবশ্য তিনি তৈরি হওয়ার আগে বাড়ির সার্ভেন্টদের বলে দিয়েছেন, রাফির জন্য সব রকম মজাদার খাবার বানানো যেন হয়, যেগুলো রাফির পছন্দ। এখন প্রায় অনেকটাই বেজে গেছে এবং সময়মতো নিলুফা খাতুন বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসে পড়েছেন। তিনি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়ি গিয়ে এয়ারপোর্টে থামল। তার হাতে অবশ্যই ছেলেকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ফুলের তোড়া ছিল। কিন্তু বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল, রাফির কোনো খোঁজ নেই। তিনি প্রথমে বিরক্তি বোধ করলেও ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে তার আর কোনো সমস্যা হলো না। তিনি সময় ব্যয় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। এবার বেশ অনেকটা সময় কেটে গেল। কিন্তু এবার আর নিলুফা খাতুনের ধৈর্য ধরে রইল না। তিনি এবার ছেলেকে ফোন দিলেন। কিন্তু রাফি ফোনটা রিসিভ করছে না। এটা দেখে আরও বেশি বিরক্ত হলেন নিলুফা খাতুন।
তারপর আবার ছেলের ফোনে ফোন দিলেন।
কিছুক্ষণ পর রাফি ফোনটা রিসিভ করল।
আর তারপরেই নিলুফা খাতুন রাফিকে রীতিমতো ঝাড়ি দিয়েই বললেন,
“রাফি, এখন কোথায় আছো? আমি কতক্ষণ ধরে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছি!”
ওপাশ থেকে রাফির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“সরি মা, আসলে আমি এখন বিডিতে আছি।”
“বিডিতে আছো মানে? আমি এয়ারপোর্টে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি, তোমাকে রিসিভ করব বলে। তুমি আমাকে যেই টাইম বলেছ, আমি সেই টাইমেই এসেছি। আর সব থেকে বড় কথা, এখন তুমি কোথায়?”
“মা, আমি এখন সিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। এবং তাদের সবার সঙ্গে দেখা করে আমি বাড়ি চলে যাব। তুমি প্লিজ রাগ করো না।”
কথাটা শুনে নিলুফা খাতুন বেজায় পরিমাণ রেগে গেলেন। কিছু বললেন না, ফোনটা কেটে দিলেন।
তারপর গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে বললেন গাড়ি স্টার্ট দিতে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, রাফি সিকদার বাড়িতে যাবে আর সবকিছু জেনে বাড়ি চলে আসবে। কিন্তু কিছু একটা মনে করে তিনি তার ননদকে ফোন দিলেন। ওদিকে সূচনার মা আর তামান্নার বেশ রকমের রান্নাবান্নার জোর চলছে। কেননা নতুন জামাই, তাদের বাড়িতে তো সেইভাবে আপ্যায়ন করতে হবে।
এমন সময় তার ভাবির ফোন দেখে তিনি কিছুটা অবাক হয়ে গেলেন। ফোনটা রিসিভ করে রোকসানা খাতুন বললেন,
“আরে ভাবি, কেমন আছো?”
“আমি ভালো আছি রোকসানা। তোমাকে একটা কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি।”
“হ্যাঁ বলো ভাবি, কী কথা?”
“রাফি দেশে এসেছে। আর ও এখন তোমাদের বাড়িতে যাচ্ছে।”
রাফি দেশে এসেছে শুনে রোকসানা খাতুন অনেক অবাক হয়ে গেলেন। কবে আসল? আর আজকে তাদের বাড়িতে আসছে? কই, তারা তো কোনো কিছুই জানল না। তিনি কিছু বলবেন, তার আগেই নিলুফা খাতুন আবার বলে উঠলেন,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৪
“সূচনা তো বাড়িতে নেই, তাই না? আমিও না, কেমন পাগল হয়ে গেছি। ও তো অবশ্যই এখন শ্বশুরবাড়িতে।”
রোকসানা খাতুন এবার একটু হেসে বললেন,
“না ভাবি। তুমি তো বৌভাতের অনুষ্ঠানের দিন যাওনি। ভাইয়ার থেকে শুনলাম। সূচনা আর জামাই এখন আমাদের বাড়িতেই আছে।”
নিলুফা খাতুনের মাথায় যেন বাজ পড়ল। তিনি একদমই চান না যে তার ছেলের সঙ্গে সূচনার দেখা হোক।
