Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৮৮

জাহানারা পর্ব ৮৮

জাহানারা পর্ব ৮৮
জান্নাত মুন

প্যারিস, ফ্রান্স।।
মাহিন জুইকে নিয়ে একটি পেন্টহাউজে ওঠেছে। এই পেন্ট হাউজটি প্যারিসের প্রধান শহরে অবস্থিত। বারো তলার এই ভবনে ব্ল্যাক ভেনম মাফিয়া গ্রুপ সদস্যের অনেক পরিবার বসবাস করে। তবে তাদের আসল পরিচয়ে নয়, ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের মতো। পেন্টহাউজের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইফানের করপোরেট সাম্রাজ্যের প্রধান কার্যালয়। দিনের আলোয় এই মাফিয়া সদস্যরা সেখানে টাই-স্যুট পরে ফাইলের স্তূপে ডুবে থাকে, যেন তারা নিয়মতান্ত্রিক সভ্য সমাজেরই অংশ। তাই তাদের কেউ সন্দেহ করতে পারে না। আবার অনেকে জেনেও চুপ থাকে, যেন কিছুই জানে না।

তাদের এই ভবন জুড়ে রয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। জুইয়ের নিরাপত্তার জন্য এর চেয়ে সুরক্ষিত কোনো অভয়ারণ্য হতে পারত না বলেই মাহিন তাকে এখানে এনেছে। তাছাড়া ভেনম গ্রুপ সদস্যরা একটা পরিবারের মতো। একে অপরের বিপদ-আপদে সবসময় পাশে থাকে। নি’ষ্ঠুরতার মাঝেও এই অদ্ভুত একতা ও আনুগত্যই ইফানের মাফিয়া গ্রুপকে অনন্য করে তুলেছে। এখানে বিশ্বাসঘাতকতা শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, যারা একসময় বসের চোখের দিকে তাকিয়ে অবাধ্যতার বি’ষ ছড়াতে চেয়েছিল, তাদের পরিণতি হয়েছিল যমদূতের চেয়েও ভয়াবহ। বসের সেই নি’র্মম শাস্তির ইতিহাস মনে রাখেই এখানে কেউ আর কখনো অবাধ্য হওয়ার দুঃসাহস দেখায় না।

গ্যাংস্টার বসের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী এখানে আসায় সকলে জুইকে খুব স্নেহ করছে। খুব অল্প দিনেই সমবয়সী বেশ কয়েকজনের সঙ্গে জুইয়ের মনের একটা সহজ সেতু তৈরি হয়ে গেছে। মাহিনও তাই চেয়েছিল, সকলের সাথে থাকলে জুই সুস্থ অনুভব করবে। প্যারিস আসার পর প্রথম দুদিন মাহিন জুইকেই সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরপরই শুরু হলো মাফিয়া জীবনের জটিল অঙ্ক। এখন সারাদিন পাশের ফ্ল্যাটের সমবয়সী মেয়েরা এসে জুইকে ঘিরে রাখে, একাকীত্বের বি’ষণ্ণতা তাকে ছুঁতেও পারে না। মাহিন যথাসাধ্য চেষ্টা করে রাতে বাসায় ফিরতে খুব একটা দেরি না করার। ততক্ষণ অব্ধি মেয়েরা জুইয়ের সাথেই থাকে। ইদানীং নানান ঝামেলায় রাতে খুব একটা তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে পারে না মাহিন। এই যেমন আজকেও খুব রাত করে বাসায় ফিরেছে। ততক্ষণে কিশোরী বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিন ঠাহর করতে পারে স্বামীর উপস্থিতি। তবে আজ অনেক রাত পর্যন্ত স্বামীর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমে ঢলে পড়েছিল। যখন ঘুম হালকা হয় তখন অনুভব করে সে কারো বাহুবন্ধনে আবব্ধ। প্রথম প্রথম ভয় পেলেও এখন মানিয়ে নিয়েছে। তাই আর চমকায় না। তখন ফজরের নামাজের সময় হওয়ায় ওঠে গিয়ে নামাজ আদায় করে আবারও বিছানার এক পাশে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়েছে।

মাহিন ঘুমের মধ্যেও বিছানায় নাড়াচাড়া অনুভব করতে পারছে। ঘুমের ঘোরেই হাত বাড়িয়ে জুইয়ের খুঁজ করল। হাতের নাগালের মধ্যে কাউকে পেল না। সহসা তন্দ্রা ছুটল যুবকের। ঘুমে আচ্ছন্ন ক্লান্ত অক্ষিপট আলগা করতেই চতুর্দিকে শুধু ঘন কালো অন্ধকারই দেখতে পেল। হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বালাতেই সারা ঘর আলোকিত হয়ে উঠল। মাহিন পাশে তাকিয়ে জুইকে দেখতে না পেয়েই বিচলিত হয়ে গেল। ধরফরিয়ে ওঠে বসতেই লক্ষ্য করল তার পায়ের কাছে অবচেতন জুই গড়াগড়ি খাচ্ছে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মাহিন। এগিয়ে গিয়ে জুইয়ের উপর ঝুঁকে পড়ল। লক্ষ্য করল কিশোরী কি যেন বিড়বিড় করছে, পরক্ষণেই আবার চোখমুখ বিকৃত করে ফেলছে। কপালে ভাঁজ পড়ল মাহিনের। সে আলতো করে জুইয়ের রেশমি চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হাস্কি কণ্ঠে ডাকল,

–“ইনোগার্ল, হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
আচমকা জুইয়ের বমির উদ্রেক হলো। ওঠে বসে ওয়াক তুলতে লাগল। মাহিন দ্রুত এক গ্লাস পানি মেয়েটার মুখের কাছে ধরল। জুই এক ঢোক পানি খেল। চোখ সামনে তুলতেই উদ্বীগ্ন মাহিনকে দেখতে পেল। মাহিনের সুগঠিত, পেশিবহুল উদোম বুক আর টালমাটাল চওড়া কাঁধ আর নিচে টাউজার। স্বামীর বলিষ্ঠ পেটানো সুগঠিত দেহ দেখে ল’জ্জায় রাঙা হয়ে উঠল তরুণী। এভাবে প্রতিদিনই নিজ স্বামীকে সে দেখতে পায়, তখন মেয়েটা ভারী ল’জ্জায় পড়ে যায়। জুই সহসা দৃষ্টি নত করে নিল। মাহিন জুইয়ের দুই বাহু চেপে ধরে চিন্তিত গলায় শুধালো,
–“কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ? ডাক্তার ডাকব?”
মাহিনের একের পর এক প্রশ্নে জুই কিছু বলতে পারল না। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বাসার ভেতর চার দেয়ালের মধ্যে থাকতে থাকতে মেয়েটার একঘেয়ে লাগছে। তাই এই একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনটাই তার ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর গা-গুলানো ভাবের জন্ম দিচ্ছে। মাহিন ফের অধীর গলায় শুধালো,

–“বেইব, টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
–“ভালো লাগছে না। কেমন যেন গা গুলিয়ে আসছে।”
–“আমি এক্ষুনি ডক্টরকে কল করছি।”
মাহিনকে জুই মানা করে বলল,“না ডাক্তার লাগবে না।”
জুই থামল। মাহিনের তীক্ষ্ণ চোখ এড়ালো না যে, মেয়েটা মনের ভেতর কোনো একটা দ্বিধা বা সংকোচ পুষে রাখছে। সে শান্ত ভঙ্গিমায় জুইকে কাছে টেনে আনল। মখমলের মতো নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
–“কি বলতে চাও বল।”
জুই মাহিনের স্পর্শে ইতস্ততবোধ করে। সেভাবেই মলিন চেহারায় মৃদু গলায় বলল,“একটু বাইরে নিয়ে যাবেন? ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
মাহিনের কপালের ভাঁজ সোজা হলো। সে আলতো করে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেল। হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,“ঠিক আছে নিয়ে যাব। ফ্রেশ হয়ে নাও।”

ধরিত্রীতে এখন সবেমাত্র সূর্যদেব উঁকি দিতে শুরু করেছে। দিগন্তের ক্যানভাস জুড়ে আলতো করে ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যুষের সোনা-রঙা, কমলা আর গোলাপি আভার মিশ্রণ। প্যারিসের সবচেয়ে পরিচিত সেন নদীর পঁ দ্য বির-হাকেইম ব্রিজের উপর একের পর এক পাঁচটি কালো রঙের লিমুজিন এসে থামল। গাড়িগুলো থামতেই পেছনের চারটি গাড়ি থেকে ক্ষিপ্র গতিতে বেরিয়ে এলো কালো পোশাকে মোড়া একদল সশস্ত্র বডিগার্ড। তাদের কয়েকজন দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে একদম সামনের ল্যাম্বরগিনি গাড়িটির দরজা খুলে বিনীতভাবে দাঁড়াল। তৎক্ষনাৎ ভেতর থেকে দর্পের সাথে বেরিয়ে এলো মাহিন। পরনে তার রাত-কালো লং কোট, পুরো অবয়বটাই যেন অন্ধকারের চাদরে ঢাকা। চোখে ডার্ক সানগ্লাস আর মুখে কালো মাস্ক থাকায় তার ভেতরের অভিব্যক্তি বোঝার সাধ্য কারো নেই। মাহিন নিজেই এগিয়ে গিয়ে গাড়ির অপর পাশের দরজাটি খুলে দিল। নিজের বলিষ্ঠ হাতটি বাড়িয়ে দিতেই ভেতর থেকে একরাশ জড়তা নিয়ে নেমে এলো জুই। তার পরনে হালকা গোলাপি আর সাদার মেলবন্ধনে তৈরি এক স্নিগ্ধ থ্রি-পিস, মাথায় যত্নে ওড়না টানা। মাহিন এক হাতে জুইয়ের বাহু জড়িয়ে ধরল। চারপাশের এই থমথমে পরিবেশ দেখে জুই কিছুটা ইতস্তত হয়ে আড়চোখে দৃষ্টি বুলালো। চারপাশের গার্ডরা জ্যান্ত রোবটের মতো উদ্যত অস্ত্র হাতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে কালো চশমা সেঁটে থাকায় তারা ঠিক কোন দিকে তাকিয়ে আছে, সেই চতুর চাউনি কিশোরী ধরতে পারল না। পুরো ব্রিজে কোনো সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, একটা কাকপক্ষীরও অস্তিত্ব নেই। যেন জুইয়ের জন্যই পুরো প্যারিসকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন থমথমে দাম্ভিকতায় কিছুটা কাচুমাচু হয়ে সে মাহিনের পা মিলিয়ে এগিয়ে গেল নদীর রেলিঙের দিকে।

দিনের আলো বাড়তেই যে ব্রিজ মুখরিত হয়ে ওঠে হাজারো পর্যটকের কোলাহলে, ভোরের এই প্রহরে তা যেন এক নিস্পন্দ শ্মশান। রূপসী সেন নদীর বুকে মাথা রেখে পুরো প্যারিস শহর তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাহিনের বলিষ্ঠ বাহুডোরে আবদ্ধ জুইকে এই মুহূর্তে নিতান্তই এক অবোধ বালিকা মনে হচ্ছে। মাহিনের দীর্ঘ ও চওড়া দেহের সামনে জুইয়ের উচ্চতা যেন এক লতানো গাছের মতো, যদিও নিজের বয়সের তুলনায় তার এই গড়ন এক্কেবারে নিখুঁত। জুই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ এক ঝলক দমকা হাওয়া এসে তার অবাধ্য চুল আর গা ছুঁয়ে গেল, এক অপার্থিব আবেশে তার চোখ দুটো বুজে আসতে চাইল। ব্রিজের প্রাচীন ল্যাম্পপোস্টগুলোর হলুদ আলো এখনো পুরোপুরি নিভে যায় নি, যা ভোরের আলোর সাথে মিশে এক রোমান্টিক আবহ তৈরি করেছে। মাহিন জুইকে বলল সামনে তাকাতে। জুই তাকাল। মূহুর্তেই তার অধরযুগল একে অপরের থেকে খানিকটা আলগা হয়ে গেল। কারণ, কুয়াশার পর্দা ভেদ করে সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং আইফেল টাওয়ার!

ভোরের এই শান্ত সময়ে নদীর অববাহিকায় হালকা বাষ্পের মতো কুয়াশা ভেসে বেড়ায়। সেই মিহিন কুয়াশা ভেদ করে ভোরের প্রথম রশ্মি যখন আইফেল টাওয়ারের লোহা-ঝালাইয়ের শরীরকে স্পর্শ করল, তখন পেছনের ক্যানভাসে তৈরি হলো এক অলৌকিক আলো-ছায়ার খেলা। টাওয়ারের সুদীর্ঘ ছায়াটি অবলীলায় এসে পড়েছে নদীর শান্ত জল আর ঘুমন্ত রাজপথে। সেন নদীর জল এখন এতটাই স্থির যে, তাকে নিখুঁত এক আয়না মনে হচ্ছে। আর সেই তরল আয়নার বুকে ভেসে উঠেছে আইফেল টাওয়ারের এক চমৎকার উল্টো প্রতিচ্ছবি। জুই মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রকৃতির এই রূপ দেখছিল, আর নিস্প্রভ গভীর নয়নে কিশোরীকে দেখছে মাহিন। প্রকৃতির চেয়েও এই কিশোরীর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি গ্যাংস্টার বসকে এক নিমেষে বেসামাল করে দিল। এই মূহুর্তে কিশোরীর ঠোঁট জোড়া তাকে চৌম্বকের মতো ভীষণ কাছে টানছে। মনের অবাধ্য খেয়ালের বশবর্তী হয়ে সে ধীরে ধীরে জুইয়ের রক্তিম মুখের দিকে ঝুঁকে এলো। জুই তখনো প্রকৃতির রূপসুধা পানে ব্যস্ত। হঠাৎ যখন সে অনুভব করল কারো এক রাস তপ্ত নিশ্বাস তার গালের নরম চামড়ায় আঁচড়ে পড়ছে, তখন সে চমকে দৃষ্টি ফেরাল। মাহিনকে এতখানি বুভুক্ষু চাউনিতে নিজের একদম কাছে আবিষ্কার করে সে যেন এক ঝটকায় ছিটকে দূরে সরে গেল। অপ্রস্তুত জুই নিজের ভেতরের কাঁপন আড়াল করতে এক কৃত্রিম ভনিতা নিয়ে আমতা আমতা করে শুধাল,

–“ক..কি করছিলেন?”
জুইয়ের আকস্মিক প্রশ্নে মুহূর্তেই মাহিনের মোহাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। নিজের অবাধ্য আচরণের কথা উপলব্ধি করতেই সে অপরাধীর মতো চোখ দুটো বুজে ফেলল। মনে মনে নিজেকে তীব্র ভর্ৎসনা করল। অতঃপর জুইয়ের আতর্কিত চেহারা পানে তাকাল। মেয়েটাকে সে কথা দিয়েছে, যতদিন পর্যন্ত জুই চাইবে না ততদিন পর্যন্ত সে জুইকে জোর করবে না কাছে আসার জন্য। মাহিন ঢোক গিলে আওড়াল,
–“সরি।”
জুই কিছু বলল না। সে নিজেকে আড়াল করতেই যেন আবারও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সামনের আইফেল টাওয়ারের সুউচ্চ চূড়ার দিকে। মাহিন আলতো পায়ে জুইয়ের ঠিক পাশটিতে এসে দাঁড়াল। রেলিঙে রাখা জুইয়ের এক হাতের উপর নিজের হাত রাখতেই জুই মাহিনের দিকে দৃষ্টি ঘুরাল। মাহিন মুচকি হেসে জুইয়ের হাতের উল্টো পিঠে ছোট্ট করে নিজের খড়খড়ে অধরযুগল ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,

–“আমি এতটাও আত্মসংযমহীন নই ইনোগার্ল। তোমাকে কথা দিয়েছি তো সীমা অতিক্রম করব না। আপাতত না হয় আমরা বন্ধু হয়েই থাকি, ভালোবাসা বিনিময় করার জন্য তো এখনও গোটা একটা জীবনই পড়ে আছে।”
ফের জুই কোনো উত্তর দিল না, তবে তার নিস্পাপ চেহারায় এক লহমার জন্য পুরোনো কোনো সুক্ষ্ম ক্ষতের য’ন্ত্রণাদায়ক ছাপ ভেসে উঠল। বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘশ্বাস। ভোরের আলো ফুটতেই ব্রিজের ওপর প্রাতভ্রমণকারীদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। তাদের অনেকের হাতেই দামী ক্যামেরা। প্রকৃতির এই অলৌকিক মুহূর্তগুলোকে তারা লেন্সে বন্দী করতে ব্যস্ত। চারপাশের এই জাগরণ দেখে জুইয়ের একটু আগের সেই হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা নিমেষেই মলিন আর ভারী হয়ে গেল। মৃদু গলায় বলল,

–“চলুন বাসায় ফিরে যাই।”
–“এখনই! এই তো সবে এলে। চল আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। মাইন্ড ফ্রেশ হবে প্লাস বেটার ফিল করবে।”
জুই মাথা নেড়ে নাখোশ করল। হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগল গাড়ির দিকে। পিছু নিল মাহিন। জুই হঠাৎ থেমে পড়ল। পিছু ফিরে মাহিনের দিকে তাকিয়ে শুধাল,
–“আমরা কি আর বাংলাদেশ যাব না?”
–“কেন? যেতে ইচ্ছে হচ্ছে?”
জুই মাথা নেড়ে না করল। তারপর মাথা নত করে একটু চুপ থেকে ফের বলল,“নোহা আপুর জন্য খুব কষ্ট লাগছে।”
বলতে গিয়ে মেয়েটার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মাহিন জুইকে কাছে টেনে নিল। জুই ভাঙা তরল গলায় শুধাল,“নোহা আপু কি সত্যি আর বাঁচবে না?”
মাহিন জুইকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। এই মূহুর্তে কি জবাব দিব বুঝে উঠতে পারছে না।

ঢাকা, বাংলাদেশ।।
অটোরিকশা এসে থামল ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে। তন্নি, সুমাইয়া এবং নাফিয়া গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তন্নি আর নাফিয়া গাড়ি থেকে শপিং ব্যাগগুলো নামাতে নামাতে সুমাইয়া চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিল। অতঃপর তিন বান্ধবী হাসপাতালের ভেতর প্রবেশ করল। রিসিপশনে গিয়ে তারা দায়িত্বরত মহিলার কাছে ১২৩ নম্বর কেবিনে যাওয়ার অনুমতি চাইল। মহিলাটি ইন্টারকমে ভেতরের কারো সাথে কথা বলে অনুমতি নিশ্চিত করলেন এবং তাদের হাতে তিনটি ভিজিটর পাস তুলে দিলেন। তন্নিরা ভদ্রতাসূচক ধন্যবাদ জানিয়ে স্থান ত্যাগ করল। সিঁড়ির কাছে এসে তন্নির পাদচারণ থমকে যায় অতি পরিচিত একটি পুরুষালি কণ্ঠস্বর শুনে। তন্নি ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁ দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে৷ যে কিনা পিছন দিকে ফিরে কারো সাথে ফোনকলে কথা বলতে ব্যস্ত। সুমাইয়া আর নাফিয়া এগিয়ে গেল, কিন্তু তন্নি গেল না। বেশ কিছুক্ষণ শান্ত নয়নে পরখ করল কালো ব্লেজার এবং প্যান্ট পরিহিত যুবকটিকে। তন্নি বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ভোঁতা একটা ব্যথা অনুভব করতে পারছে৷ সেই সাথে দ্রুত গতিতে হৃদস্পন্দনের ধুকপুক আওয়াজ।
ইনান ইফানের সাথে খুব জরুরি কথাবার্তা বলছে। হঠাৎ পিছনে ফিরতে নিলেই থমকে দাঁড়াল। নিজের অজান্তেই ইনানের মুখ থেকে এক শব্দ বেরিয়ে এলো,

–“তুমি?”
বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল রমণীর। এক লহমায় গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে বসল এক রাশ কান্না। চোখের কোণ দুটো আচমকা এক তীব্র অভিমানে জ্বালা করে উঠল। তন্নি শত চেষ্টা করেও নিজের মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করতে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক চেনা মেয়েলি কণ্ঠের ডাক তার ঘোর ভাঙল,
–“তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস?”
আমার গলার স্বর শুনে চমকে উঠল তন্নি। চকিতে চোখ ঘুরাতেই সিঁড়ির উপর আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। ইনানও সেইদিকে দৃষ্টি ঘুরাল। আমি নিচে নামতেই ইনানকে লক্ষ্য করি। তাকে শুধালাম,
–“ব্যবস্থা করেছ?”

ইনান আমার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও দিল না। ওর কানে ফোন ধরে রাখা। সেখানে ফোনকলের অপর প্রান্তের ব্যক্তি কিছু বলছে। ইনান মনযোগ দিয়ে শুনল। অতঃপর ফোন আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল। আমি ভ্রুকুটি করে ফোন হাতে নিলাম। সহসা ইনান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“ভাবি, ভাই আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে।”
মূহুর্তেই আমার চেহারায় কাঠিন্য চলে আসল। ফোন এগিয়ে ধরে কঠিন কণ্ঠে বললাম,“একই কাজ বারবার করার মানে কি ইনান? বলেছি তো আমার কোনো কথা নেই তোমার ভাইয়ের সাথে। তাহলে এসব কি?”
ইনান শান্ত গলায় প্রত্যুত্তর করল,“ভাবি ইট’স আর্জেন্ট।”
আমার মন গলল না। বরং চোয়ালে আরও কাঠিন্য এসে হানা দিল। ধারালো গলায় কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই ফোন থেকে ইফানের সম্মোহনী কণ্ঠধ্বনি কর্ণকুহরে এসে ধাক্কা খেল,
–“জারা…

আমার দেহের অভ্যন্তরীণ এক সত্তা বলছে একদম কথা বলবি না জাহান। কিন্তু অন্য সত্তাটি যেন সেই চেনা ডাকেই সায় দিতে চাইল। আমি মনের বাকদন্ডিতার মধ্যে হেঁটে অন্যদিকে যেতে লাগলাম। আমার প্রস্থান দেখে ইনান সামনের রমণীর পানে তাকাল। তন্নি ঠোঁটে মেকি হাসি টেনে শুধাল,
–“কেমন আছেন?”
_“ভালো, তুমি?
–“আলহামদুলিল্লাহ।”
এরপর দু’জনই চুপ হয়ে গেল। যেন সকল কথা ফুরিয়ে গেছে। ইনান জমিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ধরল। একটু ভেবে বলল,
–“আপনার জন্য নিশ্চয়ই সকলে ওয়েট করছে। আপনার যাওয়া উচিত।”
তন্নি সহাস্যে বলে উঠলো,“আমাকে তাড়ানোর জন্য দেখছি খুব তাড়া!”
–“এক্সকিউজ মি!”
ভ্রুকুটি করল ইনান। তন্নি নড়েচড়ে দাঁড়াল। হেসে বলল,“শুনেছিলাম আপনি দেশে নেই। আজ হঠাৎ দেখা হয়ে ভালো লাগল।”
ইনান প্রত্যুত্তর করল না। সামনের মেয়েটিকে এক পলক দেখে বলল,“বাই দ্য ওয়ে, আমার কিছু কাজ ছিল। আমি আসি তাহলে।”
–“বিরক্ত করলাম বুঝি?”
–“এমনটা কেন মনে হলো?”
সপাটে জিজ্ঞেস করল ইনান। তন্নি সহাস্যে বলল,“না, এমনি। আপনি যে আমাকে চিনতে পেরেছেন এটাই অনেক। আমি তো ভেবেছিলাম ভুলেই গিয়েছেন।”
তন্নির কথাবার্তা ইনানের কাছে অস্বাভাবিক লাগল৷ যদিও তার কাছে শুরু থেকেই অদ্ভুত এক মেয়েমানুষ তন্নি। তাই সে কথা বাড়াল না। প্যান্টের পকেটে এক হাত গুঁজে স্থান ত্যাগ করল। পিছন থেকে এক দৃষ্টিতে নিষ্প্রভ পলকহীন তাকিয়ে রইল তন্নি। মেয়েটির চোখ দুটো ছলছল করছে।

নোহার এক্সিডেন্টের আজ আটদিন হয়ে গেল। মেয়েটা এখনো আইসিইউর যান্ত্রিক চাদরে ঢাকা পড়ে মৃ’ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তার শারীরিক অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক যে, চিকিৎসকেরাও দমে গেছেন। এখন অলৌকিক কিছু না ঘটলে নোহার বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা মাত্র এক শতাংশ। আর যদি পরম করুণাময় সহায় হন এবং সে প্রাণ ফিরেও পায়, তবে বাকি জীবনটা তাকে কাটাতে হবে পঙ্গুত্বের অন্ধকারে, প্যারালাইসিস হয়ে। চিকিৎসকদের মতে, তার না বাঁচার সম্ভাবনাই নব্বই-নয় শতাংশ। ইফান দেশের বাইরে থেকেও নিজের ক্ষমতার সর্বোচ্চটা দিয়ে নোহার জন্য সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেছে। কিন্তু নোহার বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, তাকে এই মুহূর্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো সময় বা সুযোগ—কোনোটাই নেই। তাই দেশের মাটিতেই চলছে আপ্রাণ চেষ্টা। এদিকে নুলক চৌধুরী আর পলক কাইসার এখনো জানেনই না যে তাদের কলিজার টুকরো মেয়েটা মৃ’ত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। নুলক চৌধুরী এমনিতেই নিজের ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে আছেন। তাই প্রতিবার নোহার কথা উঠলেই মিথ্যা কোনো অজুহাত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। জানি না নিয়তি সামনে আর কী ভয়ঙ্কর দিন জমিয়ে রেখেছে। যেদিন এই বাবা-মা জানতে পারবেন তাদের আদরের একমাত্র কন্যা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তখন কি আমাদের ছেড়ে দিবেন!
আমি ধীর পায়ে বারান্দায় এসে লোহার শক্ত রেলিঙের ধার ঘেঁষে দাঁড়ালাম। পুরো বারান্দাটাই নিশ্ছিদ্র গ্রিল দিয়ে আবৃত। এখান থেকে নিচের গার্ডেন খুব সুন্দর দেখা যায়। ওপারে কেবলই এক নিরেট নীরবতা। কিছুক্ষণ পর সেই স্তব্ধতা ভেঙে ইফান হাস্কি কণ্ঠে ডেকে উঠলো,

–“বুলবুলি।”
আমি নিশ্চুপ রইলাম। ইফান আজও হতাশার নিশ্বাস ছাড়ল। ক্লান্ত কণ্ঠে বললো,“জান তোর কি হয়েছে আমাকে না বললে কি করে বুঝব? বল আমায় কি হয়েছে?”
আমি সপাটে প্রশ্ন ছুড়লাম,“নোহাকে চিকিৎসার জন্য বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন কবে?”
–“আমি বিষয়টি দেখছি। তাছাড়া বাইরে থেকে এক্সপার্ট ডক্টর সহ সকল কিছু পাঠাচ্ছি তো। আপাতত দেশেই ট্রিটমেন্ট চলুক। কিছুটা রিকোভার করলেই বাইরে আনার ব্যবস্থা করব। আপাতত রিক্স নিতে চাইছি না।”
–“যা ভালো বুঝেন। ফোন রাখছি।”
ইফান তৎক্ষনাৎ বারণ করে বলল,“নো, নো জারা। কথা আছে তোমার সাথে।”
–“আপনার সাথে আমার কি কথা থাকতে পারে?”

ইফান কল কেটে দিল। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা যান্ত্রিক ‘টুটটুট’ শব্দটা কানে আসতেই বুকের ভেতর চেপে রাখা এক দীর্ঘশ্বাস অলক্ষ্যে বেরিয়ে এলো। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যখনই ফোনটা নামাতে যাব, ঠিক তখনই জ্বলে উঠল ডিসপ্লে। ইফান ভিডিও কল করেছে। ধরব না, ধরব না বলেও ফোন রিসিভ করলাম। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল ইফানের সুদর্শন চেহারা। উদোম গা, ঘাড় ছুঁয়ে থাকা চুলগুলো বড্ড উষ্কখুষ্ক আর এলোমেলো হয়ে অসময়ে কপাল জুড়ে লেপ্টে আছে। আমি আড় দৃষ্টিতে এক পলক দেখে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। এই লোক আবার দারুণ ম্যানিউপুলেট করতে পারে। আমি কিছুতেই ওর নিয়ন্ত্রণে যাব না। ইফানের নিষ্প্রভ চোখ দুটো দিয়ে অপলক আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমার মাথায় কালো ওড়না টানা। কিছুদিন যাবৎ নিজের যত্ন নিতে পারছি না। তাই চুলও আঁচড়ানো হয় না। কোনো মতে আলগোছে খোপা করে রাখি। কিছু ছোট চুল কপালের দু’দিকে বেড়িয়ে আছে। মোটেও আমাকে এলোমেলো লাগছে না। বরং এক অন্যরকম বিষণ্ণ সৌন্দর্যে ঘেরা লাগছে। কিন্তু কোথাও যেন তা ফিকে লাগছে। চেহারার গমরঙা দুধে-আলতা রঙ যেন বড্ড ফ্যাকাসে ঠেকছে। এটা কেন মনে হচ্ছে জানি না! বোধহয় খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো হয় না তাই।

–“জান, শরীর কি খুব খারাপ?”
ইফানের গলা শুনে ভ্রম ছুটল। সংবিৎ ফিরতেই নড়েচড়ে দাঁড়ালাম। আড় চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে শুধালাম,“এমন মনে হলো কেন?”
–“এ কদিনে কতটা শুকিয়ে গেছ! চেহারাটা বাচ্চাদের মতো এইটুকু হয়ে গেছে।”
কেন যেন মনটা আরও ভার হয়ে গেল। বেখেয়ালি মনে শুধালাম,“এখন বুঝি আমায় আর ভালো লাগে না আপনার? সব আকর্ষণ বুঝি ফিকে হয়ে গেছে?”
ইফানের দৃষ্টি এলোমেলো। নিশ্চয়ই নেশায় বোধ হয়ে আছে! আমার ধারণায় ঠিক হলো। এই তো হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকে ঘষল। নিশ্চয়ই ছাইপাঁশ গিলেছে। ভাবনার মধ্যেই ইফানের কণ্ঠ ভেসে আসল,
–“তুমি নিজেও জান না, আমার চোখে তুমি ঠিক কতটা সুন্দর! তোমার উপর তো আমি প্রতিদিনই নতুন করে প্রেমে পড়ি। তুমি তো ড্রাগসের থেকেও কড়া জিনিস, যত দিন যাচ্ছে ততই আসক্তি বাড়ছে। আমাকে তো উন্মাদ বানিয়ে ছাড়ছ। কবে জানি তোমার এই অত্যাধিক নেশায় ডুবে মরি!”
বলেই ইফান হেসে উঠল। ওর ভরী দেহ সেই হাসির তোড়ে কম্পিত হলো। এক মূহুর্তের জন্য ওর ওপর সব পুঞ্জীভূত রাগ গলে পড়ল। কিন্তু যখনই দেখলাম ফের হাতের উল্টো পিঠ নাকে ঘষছে তখনই মস্তিষ্ক দাউদাউ করে জ্ব’লে উঠলো। দাঁত কিড়মিড় করে আওড়ালাম,
–“জা’নো’য়ার!”
–“তোমারই তো, মানিয়ে নাও।”
সপাটে ইফানের থেকে নির্ল’জ্জ জবাব আসল৷ আমি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। শরীরটা যেন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, বড্ড অবসন্ন লাগছে। এমনিতেই খাওয়ায় অনিয়ম করছি। মীরা আছে বলেই খাওয়ার প্রতি যা একটু খেয়াল হয়। মেয়েটা জোর করে হলেও অল্প কিছু খাইয়ে ছাড়ে। এদিকে সকাল থেকে মীরা ইনানের সাথে নোহার জন্য ছুটাছুটি করছে। আমারও খাওয়া নেই। বাইরের খাবার খেতে পারি না বলে মাঝেমধ্যে তন্নিরা রান্নাবাড়া করে আনছে। আজও এনেছে। এখন কিছু খাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি। পেটে খিদেই ইদুর দৌড়াচ্ছে যেন! আমার বেখেয়ালি, উদাস, মলিন চেহারা দেখে ইফান ডেকে উঠল,

–“জান!”
–“হু?”
–“শরীর খারাপ লাগছে খুব?”
–“একটু।”
–“সকাল থেকে নিশ্চয়ই কিছু খাওনি!”
আমি কোনো জবাব দিতে পারলাম না। ইফান তৃষিত নয়নে শুধু আমাকে তাকিয়ে দেখল। অতঃপর আচমকা, একদম হঠাৎ করেই ফোনে ঠোঁট ছুঁইয়ে শব্দ করে চুমু খেলো। এক মূহুর্তের জন্য আমি নিশ্বাস নিতে ভুলে গেলাম। বুকের ভেতর ধুকপুক আওয়াজ হতে লাগল। ইফান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকাতেই আমি চারপাশের শূন্যতায় এলোমেলো দৃষ্টি ঘুরালাম। ইফান আদুরে কণ্ঠে ডাকল,
–“বুলবুলি!”
–“হু?”
–“যাও খেয়ে একটু রেস্ট নাও। খুব শীগ্রই আমাদের আবার দেখা হবে৷ প্রমিজ, আর তোমাকে একা রেখে কোথাও যাব না। সবসময় নিজের কাছে রাখব। আর মন খারাপ করে থেকো না জান।”

কিছু বললাম না আমি। মাঝেমধ্যে কি যেন হয়ে যায় আমার! আচ্ছা রোকেয়া বেগমের কালো জাদুর প্রভাব কি এখনো আমার মধ্যে আছে? না হলে কেন এত দুর্বল হয়ে গেছি আমি? কই বিয়ের আগ অব্দি তো সব ঠিকই ছিল। বিয়ের পর থেকেই ধীরে ধীরে কি যেন হলো আমার! মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলে না। অজান্তেই চোখ দুটো অশ্রুকণায় টইটম্বুর হয়ে উঠল। তা দেখে ওপারে থাকা পরাক্রমশালী মাফিয়া বস মুহূর্তেই বিচলিত হয়ে পড়ল। সহসা ব্যাকুল গলায় শুধালো,
–“জান, কি হয়েছে?”
বোধ আসতেই পলক ফেললাম। আর পলক ফেলতেই অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ঝাপসা চোখে ফোনের স্ক্রিনে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে বসলাম,
–“কেন তুমি সবসময় এমন কর?”
–“কি করেছি আমি?”

–“কি করনি তুমি? যতবারই আমি সব ভুলে নতুন করে বাঁচতে চাইছি, ততবারই তুমি আমাকে ভেঙে দিচ্ছ। বুঝিয়ে দিচ্ছ পাপ পবিত্রের কখনো মিল হয় না। বরং তোমার সংস্পর্শে আমি নিজেই পাপী হয়ে উঠছি। এসব বন্ধ কর তুমি। ক্লান্ত লাগে আমার। দোহাই লাগি, বেরিয়ে আস এসব থেকে।”
–“আমি বেরিয়ে আসলেই মারা পড়ব। সাথে তুমিও। আমি বাঁচি-মরি হোয়াটএভার! কিন্তু তোমার কিছু হয়ে গেলে! এটা কক্ষনো হতে দিব না। পারলে তোমার এই নিকৃষ্ট অমানুষটাকে এক্সেপ্ট করে নাও। আর না হলে…
–“আর না হলে?”
–“যেভাবে চলছে, চলতে দাও।”
বড় ক্লান্ত লাগল ইফানের গলার স্বর। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। নাক টেনে নিজেকে সামনে ইফানের মুখের উপর ফোনকল কেটে দিলাম। মুঠোফোন শক্ত করে চেপে ধরে গটগট করে বারান্দা ত্যাগ করলাম।

দেখতে দেখতে আরও একটা দিন নিয়তির খেরোখাতা থেকে গড়িয়ে রাত নামল। পুরো ধরণী যেন এক নিকষ কালো অমানিশার চাদরে ঢাকা পড়েছে। তবে এই যান্ত্রিক, পাথুরে শহরে রাত আর দিনের তফাত বোঝা বড় দায়। সবই একাকার। হাসপাতালের প্রতিটি কোণায় কোণায় কৃত্রিম নিয়ন আলো জ্বলে উঠেছে, যা পরিবেশটাকে আরও বেশি ফ্যাকাসে আর থমথমে করে তুলেছে। আইসিইউ কেবিন থেকে খুব একটা দূরে নয়, কাছাকাছি একটা ওয়েটিং রুমে পরিবারের সবাই ক্লান্ত মুখে উপস্থিত। নাবিলা চৌধুরী রাতের খাবারের থালা সামনে নিয়ে বসে আছেন। বিষণ্ণ চেহারায় পলি খাবার মুখে তুলতে তুলতে বলল,
–“মা, খাবারটা খেয়ে নিন। এভাবে খাবার নিয়ে বসে থাকলে তো খাবারটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। পরে আর রুচি পাবেন না।”
–“আর খাবারের রুচি! গলা দিয়ে খাবার নামলে তো। একটু আগেও মুখ মুছে একগাদা মিথ্যা বললাম দিভাইকে। আল্লাহ মাবুদ জানে, দিভাই এসে সব জানলে কি করবে!”
মীরা এক চামুচ খাবার মুখে তুলে বলল,“বড় মা, এখন ঐসব নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই। পরের বিষয়, পরে দেখা যাবে।”

আমি নিশ্চুপ হয়ে খাওয়ায় মন দিলাম। পলি আমার পাতে আরও এক চামুচ তরকারি তুলে দিতে চাইলে প্লেট সরিয়ে মানা করলাম। নিজের পাতের যৎসামান্য খাবারই যেন গলার খাঁজে এসে আটকে যাচ্ছে, কিছুতেই গিলতে পারছি না। সন্ধ্যার পর জিয়াদ এসে খাবার দিয়ে গেছে। হোটেলের কেনা খাবার আমার একদমই মুখে সয় না। কেমন যেন এক অদ্ভুত খুঁতখুঁতে স্বভাব এসে ভর করেছে আমার ওপর। কে না কে রান্না করে কিভাবে! ভাবলেই গা গুলিয়ে আসে। না হলে নিজেদের এত এত কাজের লোক, এত ভালো মানের শেফ থাকতে কষ্ট করে আমার বাপের বাড়ি থেকে খাবার আনতে যাবে কেন? নাবিলা চৌধুরীও এই নিয়ে তেমন কিছু বলেন নি। কারণ স্বভাবতই আমরা ঘরের মানুষের হাতে খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। কাকিয়া থাকতে নিজ হাতে গোছগাছ করে রান্না করেছেন। কাজের লোকদের তিনি উনানের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিতেন না। তারা স্রেফ জোগাড়যন্ত্র আর ফরমায়েশ খাটার জন্যই সাথে থাকত। উনার অবর্তমানে সেই বিশাল রান্নাঘরের হাল পলি আর আমিই ধরেছিলাম। এখন সেই মন মানসিকতাও নেই। পলির মা আর ভাই প্রতিদিন যাতায়াত করছে হাসপাতালে। অসুস্থ শরীর নিয়ে পলির মায়ের এই কষ্ট করাটা ভালো লাগে না দেখে বহুবার বারণ করেছি। কিন্তু ভদ্রমহিলা সেই কথা কানেই তোলেন না। পরম স্নেহে নিজের অসুস্থতা ভুলে প্রতিদিন সুন্দর সুন্দর পদ রেঁধে নিয়ে আসেন। তাছাড়া আমার বাপের বাড়ি থেকেও এক দুদিন পর পর কেউ না কেউ আসে। এদিকে ইতিকে নিয়ে একটা ছোটখাটো ঝামেলা গেল। এই তো, আমার পাশে চুপটি করে বসে খাবার খাচ্ছে মেয়েটা। আমার বাপের বাড়ির মানুষ খুশি হয়েছে ছেলে নিজ থেকেই বিয়ে করায়। তাছাড়া চেনা-জানা অমন ভালো মেয়েকে বউমা হিসেবে পেয়ে মা, বড় মা তো খুশিতে আটখানা। প্রথমদিন হাসপাতালে এসে এইসব কাহিনি জানতে পারে। তখনই আম্মু আবেগাপ্লুত হয়ে নিজের গলার সোনার চেইন খুলে ইতিকে পরিয়ে দেয়। বড় আম্মু তো আরো মহা খুশি। তিনিও কালবিলম্ব না করে নিজের হাতের একজোড়া নিরেট সোনার মোটা বালা খুলে ইতির ফর্সা দুটি হাতে গলিয়ে দেন। বড় আব্বু তৎক্ষনাৎ সোনার বড় দেখে একটা নাকফুল এনে দেন বউমাকে। আব্বু দিয়েছে কানের দুল।
বাঙালিয়ানা গহনার সেই রাজকীয় উপহারগুলো গা থেকে আর নামায়নি অবোধ বালিকা। ধবধবে ফর্সা দুটি হাতে সেই ভারী সোনার বালা জোড়া, নাকে ঝলমলে বড় নাকফুল, কানে ঝুলতে থাকা দুল—আর মাথার ওপর আলতো করে টেনে রাখা সুতির ওড়না। সব মিলিয়ে মেয়েটাকে এই প্রহরে এক পাক্কা বাঙালি গিন্নি মনে হচ্ছে। কিন্তু বিধি বাম, মেয়েটার শরীরটাও ইদানীং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। আইসিইউর কাঁচের ওপারে নোহার ওই নিস্পন্দ কঙ্কালসার দেহ দেখে কেঁদেকুটে ভাসায়। প্রতিদিন সকালে জিতু ভাইয়া এসে ইতিকে এই হাসপাতালে রেখে যান এবং রাতে এসে নিয়ে যায়।

শুরুর দিকে অবশ্য নাবিলা চৌধুরী নিজের মেয়ের সাথে তেমন একটা কথাই বলেননি। যেদিন তিনি নোহার এই চরম দুঃসাহস আর হঠকারিতার কথা প্রথম জানতে পেরেছিলেন, রাগে-ক্ষোভে নিজের মেয়ের ওপর এক্কেবারে চড়াও হয়েছিলেন। পরে মীরা অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে শান্ত করার পর তাঁর ভেতরের সেই রুদ্রমূর্তি কিছুটা নরম হয়। তবে নিজের আপন গর্ভজাত কন্যার ওপর থেকে মনের ভেতরের পুঞ্জীভূত অভিমানের মেঘ এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। আমি অন্যমনুষ্ক হয়ে আছি দেখে মীরা শুধালো,
–“ভাবি কিছু হয়েছে?”
–“হু?”
বেখেয়ালি হওয়ায় মীরার কথা কর্ণকুহরে ঢুকল না। মীরা ততক্ষণে নিজের পাতের খাবারটুকু শেষ করে ফেলেছে। ও আসলে নিজের শরীর আর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বড্ড সচেতন, সবকিছু মেপেজুপে নিয়ম মেনে চলে। মীরা নিজের খালি প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে আবারও বলল,
–“বলছিলম, তোমার শরীর কি খারাপ লাগছে নাকি?”
–“না ঠিক আছি।
পলি ইতিকে কিছু দাও।”
আমার কথা শুনে ইতি বারন করে বলল,“না আর খাব না।”

আমি আর কিছু বললাম না। নাবিলা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললাম,“মা আপনি শুধু শুধু কষ্ট করে হাসপাতালে আছেন। বাসায় ফিরে যান পলিকে নিয়ে। আমি আর মীরা থাকলেই হবে। হাসপাতালে এত মানুষ থেকে কি আর হবে?”
মীরা সায় দিয়ে বলল,“ভাবি ভুল কিছু বলেনি বড় মা। তোমার নিশ্চয়ই এখানে থাকতে সমস্যা হচ্ছে। পলিকে নিয়ে বাসায় চলে যাও।”
নাবিলা চৌধুরী মুখে অল্প খাবার তুলতে তুলতে বললেন,“ঐ ভুতুড়ে বাড়ি গিয়ে কি আর করব! উল্টো যতটুকু দাঁড়িয়ে আছি তাও আর থাকতে পারব না।”
আমি থালায় হাত ধুতে ধুতে বললাম,“থাক, একা করে দুজনকে বাড়ি যেতে হবে না। এখানেই সকলের সাথে থাকেন। কাল না হয় আমি আর পলি এক ঘোরান বাড়ি গিয়ে সব দেখে আসব। আজকাল কাউকে ভরসা করা যায় না। মেইডগুলো অনেক ফাঁকিবাজ হয়েছে।”
পলি সায় দিয়ে বলল,“যা বললেন। সবকটা ফাঁকিবাজ। গিয়ে দেখবেন, বাড়িঘর ভুতুড়ে হয়ে আছে। আজ তো গিয়ে এক ঝলক নমুনা দেখেই আসলাম। ধুলোবালির আস্তর পরেছে।”

কথাবার্তার এক পর্যায়ে সকলের খাওয়া শেষ হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল বাড়িতে এক ঘোরান আমিও যাব। প্রতিদিন কেউ না কেউ এক ঘোরানের জন্য হলেও বাড়ি গিয়ে দেখে আসে। এত এত কাজের লোক, গার্ডরা থাকা সত্ত্বেও আজকাল চৌধুরী বাড়ির অন্দরমহল ভুতুড়ে লাগে। লাগবেই না কেন? এ ক’দিনে যা যা ঘটে গেল!
রাত আরও বেড়েছে, সাথে অন্ধকারের ঘনত্বও। নাবিলা চৌধুরী সিঙ্গেল বেডে গা এলিয়েছেন। মীরা খেয়ে বেরিয়েছে অফিসের দিকে। যেহেতু ইনান আছে, তাই দু’জনে সেদিকে একটু নজরদারি করবে। পলি সোফায় বসে ঝিমচ্ছে। আমি আমাদের দু’জনের বিছানাটা ঝাঁট দিচ্ছি। ক্লান্ত লাগছে ঘুমিয়ে পড়ব। ইতি গায়ে কালো রঙা বোরকা জড়াচ্ছে। জিতু ভাইয়া নাকি কিনে দিয়েছে তাকে। আর বলেছে এখন থেকে যেন বাসা থেকে বের হলে বোরকা পরে বের হয়। লক্ষী বউয়ের মতো ইতি স্বামীর সব কথা মেনে চলে। হঠাৎই দরজায় টোকা পড়ল। আমি বুকে ওড়না জড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুলাল। আমাকে দেখেই বলল,

–“ভাবি জিতু স্যার এসেছেন। ইতিমণিকে যেতে বলেছেন।”
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে ইতিকে ডেকে দিলাম,“রেডি হয়েছ তুমি? ভাই এসেছে।”
ইতি নাবিলা চৌধুরীর বেডের কাছে গিয়ে মায়ের হাতে আলতো ছুঁইয়ে নিচু গলায় ডাকল,“মম।”
ঘুম ঘুম ক্লান্ত চোখে নাবিলা চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকালেন। ইতি বলল,“উনি এসেছেন নিতে। যাচ্ছি আমি।”
নাবিলা চৌধুরী মেয়ের আদুরে মুখখানা দেখলেন। কত বড় হয়ে গেছে এইটুকু মেয়েটা। তিনি ইতির হাতে আলতো পরশ বুলিয়ে দিয়ে মৃদু গলায় বললেন,“সাবধানে থেকো।”
–“আচ্ছা। তুমি বেশি চিন্তা করো না কিন্তু। তাহলে শরীর খারাপ করবে।”
ইতি রেডি হয়ে বেরিয়ে আসল। আমার থেকে বিদায় নিয়ে দুলালের সাথে যাওয়া ধরল। নিশ্চিন্ত হয়ে ভেতর এসে দরজা এঁটে দিলাম।

আইসিইউ কেবিনের সামনে সটান দাঁড়িয়ে আছে জিতু ভাইয়া। অবজারভেশন উইন্ডো দিয়ে নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বেডে অবচেতন হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে। নোহার শিয়রে ও চারপাশে এখন মানুষের কোনো অস্তিত্ব নেই, সবটা জুড়েই রাজত্ব করছে যান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক সব চিকিৎসা সরঞ্জাম। তার নিস্পন্দ মুখে চেপে বসেছে কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্ক, মাথায় জড়িয়ে আছে জটিল সব তারের জাল। পাশে থাকা ইসিজি মনিটরের স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নোহার জীবনের স্পন্দন—হৃদরঙ্গম তরঙ্গের সেই আঁকাবাঁকা রেখাগুলো বড্ড ধীরলয়ে, বড্ড ক্লান্ত পায়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। মনিটরের সেই মরণ-তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে জিতু ভাইয়ার শক্ত চোয়াল আজ বড্ড কাতর, বড্ড অসহায় দেখাল। প্রতিদিন দু’বেলা হাসপাতালে আসে ইতিকে দেওয়া-নেওয়ার জন্য। তখন ঠিক এইখানে দাঁড়িয়ে শয্যাশায়ী রমণীকে অবলোকন করে।

সে তো কখনো নোহার খারাপ চায়নি। বরং নোহার থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিল বলে বারবার দূরত্ব বজায় রাখত। আসলে জিতু ভাইয়া আন্দাজ করেছিল নোহা একজন স্পাই, যার কারণে দূরত্ব তৈরি করা। তাছাড়া আরেকটা কারণও ছিল, তা হলো নোহার গায়ে পড়া স্বভাব। কিন্তু আজ নোহার এই কঙ্কালসার ও মুমূর্ষু অবস্থার জন্য কি তবে কোথাও সে নিজেই দায়ী? নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেও তিনি কোনো সঠিক উত্তর খুঁজে পায় না। মন একবার বলে, তোমার কি দোষ? তুমি তো কিছু করে নি। কেউ যদি তোমার অজান্তে ভুল কিছু অনুভব করে তাতে তোমার কি করার আছে? আবার কখনো মনে হয় কথাও একটা তারই দোষ ছিল!
মনের ভেতরের এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ যখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনই এই বজ্রকঠিন, শক্ত ধাঁচের মানুষটা কেমন যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, বড্ড দুর্বল হয়ে যায়। আজকাল জিতু ভাইয়া বড় বেশি উদাস, বড় বেশি খাপছাড়া। নোহার জীবনের এই অপ্রকাশিত, রহস্যময় ট্র্যাজেডি সে কিছুতেই নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। ঠিক তখনই তার ভাবনার জাল ছিঁড়ে পেছন থেকে এক কোমল, মিহি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো,
–“মন খারাপ করবেন না, ভাবি বলেছে সুস্থ হয়ে যাবে আপু।”
জিতু ভাইয়া সেদিকে তাকাল। অমন পুতুলের মতো মেয়েটাকে দেখলেই যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে। আহা কি মায়াবী নিষ্পাপ মুখাবয়ব! জিতু ভাইয়া অধর কোণে স্মিত হাসি টেনে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। অতঃপর দুলালকে বলে হাসপাতাল থেকে বিদায় নিল।

ঘড়ির কাঁটা তার চিরচেনা নিজস্ব গতিতে অলক্ষ্যে ঘুরে চলল। একঘেয়ে ‘টিকটিক’ আওয়াজ তুলে রাতের অন্ধকার যখন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, ঠিক তখনই একসময় তা রাতের শেষ প্রহরে এসে পৌঁছাল। শেষ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘড়ির কাঁটা যখন ভোর চারটার ঘর ছুঁল, অমনি জিতু ভাইয়ার মুঠোফোনে তীব্র সুরে অ্যালার্ম বেজে উঠল। কিন্তু সারা দিনের ক্লান্তি আর অবসাদে তিনি এতটাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন যে, সেই কর্কশ আওয়াজ তাঁর শ্রুতিগোচর হলো না। তবে অ্যালার্মের সেই আকস্মিক শব্দে পাশের বালিকার কাঁচা ঘুমটা নিমেষেই টুটে গেল। সারারাত ধরে সে তার স্বামীর চওড়া বাহুডোরে এক পরম নিরাপদ আশ্রয়ে আবদ্ধ ছিল। স্বামীর সেই উষ্ণ বক্ষ আর পুরুষালি দেহের এক মাদকতাময় সুঘ্রাণে সে এতক্ষণ রূপকথার কোনো এক ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এই ভোরবেলা মিঠে ঘুমে এমন তীব্র বাধার সৃষ্টি হওয়ায় ইতির মনে মৃদু একটু অভিমানের রাগ জমা হলো। সে আলতো করে চোখ মেলতেই আবিষ্কার করল, সে এখনো স্বামীর বুকের চেনা ওমেই লেপ্টে আছে। ইতি আর নিজের অবাধ্য মনকে ধরে রাখতে পারল না। জিতু ভাইয়ার বুকে বেড়ে ওঠা লোমশ অরণ্যে নিজের নরম আঙুল দিয়ে আলতো করে খেলা করতে করতে মৃদু সুরে ডেকে উঠল,

–“এই যে জেন্টালম্যান, শুনছেন?”
ঘুম ঘুম গলায় জিতু ভাইয়া প্রত্যুত্তর করল,“হুম।”
স্বামীর এই ঘুম-ভাঙা বুদবুদ কণ্ঠের মাদকতায় বালিকার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণের কাঁপন বয়ে গেল। কী এক অপার্থিব ভালোলাগায় লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল ইতির তুলতুলে দু’গালে। সে নিজের গলার স্বর আরও খানিকটা নিচু করে, লাজুক কণ্ঠে বলে উঠল,
–“আপনি অ্যালার্ম দিয়েছিলেন তো। ঐ যে বলেছিলেন, আজ কোথায় একটা যাবেন কাজের জন্য!”
সহসা তন্দ্রা ছুটল জিতু ভাইয়ার। অ্যালার্ম বন্ধ করে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। চতুর্দিক থেকে ভেসে আসছে আযানের সুমধুর, সুরেলা ধ্বনি। জিতু ভাইয়া ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখে বিছানা ছাড়ল। ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার আগে ইতিকে বলল,
–“নামাজের সময় হয়ে গেছে। ওঠে পড় লজ্জাবতী। নামাজ পড়ে আবার ঘুমিয়ে যেও।”
ইতি নিজের শরীরের সমস্ত অলসতা ঝেড়ে ফেলে এক ঝটকায় বিছানা ছাড়ল। বিয়ের আগে থেকেই সে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। আসলে চৌধুরী বাড়ির প্রায় প্রতিটি রমণীই ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়েছে, তাই ইতির ভেতরও এই পুণ্যময় অভ্যাসটি ছোটবেলা থেকেই গড়ে উঠেছে। আর বিয়ের পর থেকে তো প্রতিদিনের ভোরবেলাটি তার কাটে এক অন্যরকম অপার্থিব সুখে। বিয়ের পর থেকে জিতু ভাইয়ার সাথে একসাথ ফজরের নামাজ আদায় করে।

ইতি দ্রুত ওজু শেষ করে এসে ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি দুটি মখমলের জায়নামাজ বিছিয়ে দিল। তারপর শ্রদ্ধায় স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল যেন এই প্রতীক্ষাটুকু তার জীবনের সবচেয়ে মধুর ও অলিখিত এক রোজকার দায়িত্ব। কিছুক্ষণের মধ্যেই জিতু ভাইয়া ফ্রেশ হয়ে এসে জায়নামাজে দাঁড়ালেন। ভোরের সেই শান্ত ও নিস্তব্ধ প্রহরে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে দু’জনে মিলে স্রষ্টার দরবারে সিজদাবনত হলো। বিশালদেহী ও সুগঠিত কাঠামোর জিতু ভাইয়ার পাশে ইতিকে অনেক ছোট মনে হয় তার দেহের ছিমছাম গরনের জন্য। যেন সত্যি একটা জীবন্ত পুতুল। নামাজের শেষ সালাম ফিরিয়ে এই যুগল পরম আকুলতায় আল্লাহর দরবারে হাত তুললো। আল্লাহর নিকট মনের সকল প্রার্থনা জানাতে লাগল। জিতু ভাইয়ার প্রার্থনা শুনা যায় না। তিনি মনে মনে করেন। কিন্তু ইতির দোয়া মুটামুটি শুনা যাচ্ছে, যেহেতু দুজন খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। ইতি ফিসফিস করে প্রার্থনা করছে,

–“আমার আল্লাহ, তুমি আমাদের সকলকে রক্ষা কর। হে আল্লাহ, আমাদের সকলকে সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে ঢাল হয়ে বাঁচিয়ে রাখো। আমার আম্মুকে সুস্থ রেখো। আল্লাহ তুমি আমার আব্বুকে আমার কাছে খুঁজে এনে দাও। আল্লাহ আমার ছোট ভাইয়াকে জান্নাতবাসী কর। আল্লাহ তুমি আমার নোহা আপুকে সুস্থ করে দাও। আমার অর্ধেক হায়াত নোহা আপুকে দিয়ে হলেও বাঁচিয়ে দাও। আর অর্ধেক হায়াত আমার জেন্টালম্যানকে দিয়ে দাও। হে আল্লাহ, তুমি আমার মতো এই অবোধের দোয়া কবুল করো। আমি জানা-অজানায় কোনো ভুল করে থাকলে আমার সব গুনাহ মাফ করে দাও….

মুনাজাত করতে করতে বালিকার গলা ভিজে এলো। চোখ দুটো থেকে অশ্রুকণা কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। এভাবে মুনাজাত করা কাকিয়ার থেকে শিখেছে, বালিকা। প্রতিদিন নামাজ শেষে এভাবেই মুনাজাত করে মেয়েটা। তার মুনাজাতে আপন একটা মানুষও বাদ যায় না। জিতু ভাইয়া সবসময় এত লম্বা সময় মুনাজাত করে উঠতে পারেন না। আজ কেন যেন ইচ্ছে হলো দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে৷ আজ ইতির মতো সুদীর্ঘ মোনাজাত করল জিতু ভাইয়া। মোনাজাত যখন শেষ হলো, তখন প্রত্যুষের প্রথম কাঁচা আলো দিগন্তের ক্যানভাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরের জানালা গলে বাইরে থেকে ভেসে আসছে নাম না জানা পশুপাখির মিষ্টি কিচিরমিচির ডাক। জিতু ভাইয়া দীর্ঘ মোনাজাত শেষে জায়নামাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই, ইতি খুব যত্নে ও ভালোবাসায় দুটি জায়নামাজ সুন্দর করে ভাঁজ করে গুছিয়ে তার নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিল।

বিয়ের পর থেকে এই ছোট সংসারের হেঁশেলের পুরো দায়িত্বটা জিতু ভাইয়াই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। নিজ হাতেই সব চমৎকার রান্না করে। ইতি পাশে দাঁড়িয়ে টুকটাক জোগাড়যন্ত্র করে দেয়, আর বড় বড় চোখে মুগ্ধ হয়ে স্বামীর হাতের জাদু অবলোকন করতে করতে চুপচাপ রান্না শেখে। অবশ্য গত কয়েকটা দিন ঝড়ের বেগে কেটে যাওয়ার মাঝেও বালিকা ঘরের অনেক কাজই রপ্ত করে ফেলেছে। কিন্তু ঘরের আসবাব গোছানো আর আলতো করে ঘর ঝাঁট দেওয়া ছাড়া জিতু ভাইয়া নিজের এই পুতুল বউটাকে ভারী কোনো কাজ ছোঁয়াতেই দেন না। একজন কাজের মহিলা আছেন, যিনি প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে রান্নাবান্না সহ সকল কাজ করে দিয়ে যায়। তবে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়ায় জিতু ভাইয়া নিজ হাতে দু’জনের জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। তিনি ধীর পায়ে রান্নাঘরে এসে গ্যাসের নীল উনানে কেটলি চড়িয়ে সুগন্ধি চা বসিয়ে দিলেন। এরপর খুব অল্প সময়েই ভালোবেসে দু’জনের জন্য তৈরি করে নিলেন মুচমুচে স্যান্ডউইচ। ভোরের আলোয় মুখোমুখি বসে সেই হালকা নাস্তা শেষ করল দু’জনে।

দেখতে দেখতে ঘড়ির অলস কাঁটা সকাল ছয়টার ঘর ছুঁয়ে ফেলল। ঘুমন্ত নগরী আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে তার চিরচেনা ব্যস্ত রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। ঘরের কোণে থাকা বড় ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করে নিতে লাগল জিতু ভাইয়া। শুভ্র সাদা শার্টের কাফলিং আর বুকের বোতামগুলো পরম অভ্যাসে লাগাতে লাগাতে তিনি আয়নার প্রতিচ্ছবিতেই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ইতির দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর অথচ আদুরে কণ্ঠে বললো,
–“টাই’টা দাও তো।”

ইতি দ্রুত টাই হাতে তুলে জিতু ভাইয়ার কাছে এসে দাঁড়াল। জিতু ভাইয়া ইতির হাত থেকে টাই নিবে তার আগেই ইতি পায়ের দু আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াল। দু’হাত বাড়িয়ে দিল জিতু ভাইয়াকে টাই পরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু উচ্চতায় অনেক ছোট হওয়ায় নাগাল পাচ্ছে না। জিতু ভাইয়া ইতির কোমরে ধরে তার দু’পায়ের উপর ইতিকে দাঁড়া করাল। অতঃপর ঝুঁকে পড়ল। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল মেয়েটা। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে জিতু ভাইয়ার গলায় টাই গিট দিয়ে পড়িয়ে দিল। কিন্তু অনভিজ্ঞ হাতের সেই বাঁধন শেষে দেখা গেল—টাইটি পারফেক্ট হওয়ার বদলে অদ্ভুতভাবে দুই খণ্ডে ঝুলে আছে! জিতু ভাইয়া ঠোঁটে ঠোঁট টিপে ভেতরের উপচে পড়া হাসি সংবরণ করতে মরিয়া হয়ে উঠল। ইতি যখনই আশ্বস্ত হয়ে চোখ তুলে তাকাল, অমনি তার নজরে এলো স্বামীর সেই চাপা হাসির ঝিলিক। এবার আর লজ্জার সীমা রইল না। মনে হলো পারলে এখনই মাটির নিচে লুকিয়ে পড়ে সে। ইতির এই চরম লাজুক ও অপ্রস্তুত মুখাবয়ব দেখে জিতু ভাইয়া নিজের ভেতরের বাঁধভাঙা হাসি আর চেপে রাখতে পারল না। পুরো ঘর কাঁপিয়ে সশব্দে হেসে উঠলেন তিনি। লজ্জার এই চরম মুহূর্তে আর সেখানে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা ইতির ছিল না। সে এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে ছুটে পালাতে চাইল, কিন্তু তার আগেই এক বলিষ্ঠ বাহুর তীব্র টানে তার সেই চেষ্টা মাঝপথেই থমকে গেল।

সে গতি হারিয়ে উল্টো এসে আছড়ে পড়ল জিতু ভাইয়ার চওড়া, শক্ত বক্ষের ওপর। ইতি লজ্জায় চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নুয়ে রইল, নিজের মাথাটা কিছুতেই তুলতে পারল না। ওদিকে জিতু ভাইয়া এক হাতে মেয়েটার কোমর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, অপর হাতের আঙুল দিয়ে বালিকার নরম থুতনিটা আলতো করে ওপরে তুলে ধরলেন। তবু সে চোখ মেলল না, বন্ধ চোখের পাতায় লেগে রইল একরাশ অবাধ্য মায়া। জিতু ভাইয়া অপলক চোখে স্ত্রীর সেই স্নিগ্ধ মুখাবয়ব অবলোকন করতে করতে হঠাৎ করেই আটকে গেলেন ইতির মৃদু কাঁপতে থাকা গোলাপি দুটি অধরে। এই প্রথম বারের মতো শক্ত ধাঁচের এই পুরুষটার মনের গহীনে এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে নিজের স্ত্রীর ঠোঁটে একটা গাঢ় চুম্বন আঁকতে চায়। নিজের অবাধ্য মনের সেই খেয়াল উপেক্ষা না করে তিনি ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলেন এবং ইতির সেই নরম, গোলাপি অধরে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন। মুহূর্তের জন্য ইতির পুরো সর্বাঙ্গ যেন অসাড় হয়ে গেল, স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশের পৃথিবীটা। সে আকস্মিক এক ঘোরে চকিতে চোখ মেলতেই দু’জনের অবাধ্য দৃষ্টির মিলন হলো। জীবনের এই প্রথম কোনো পুরুষের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া তার ঠোঁটে লাগায় মেয়েটার নিশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে আসার উপক্রম হলো। জিতু ভাইয়া যখনই টের পেলেন বালিকার নিশ্বাসের গতি স্তব্ধ হয়ে আসছে, তখনই তিনি আলতো করে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। মুক্ত হতেই ইতির বুকটা এক তীব্র আবেগে আর অক্সিজেনের তাড়নায় ওঠানামা করতে লাগল। চুম্বনটি খুব একটা দীর্ঘ বা গভীর ছিল না, আবার বড্ড হালকাও ছিল না। তা ছিল প্রথম প্রেমের এক সিলমোহর। জিতু ভাইয়া মাত্র কিছু একটা বলতে মুখ খুলবেন, ঠিক তখনই ইতি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে এক ভোঁ দৌড় লাগাল। এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে ঢুকে সে খটখট শব্দে ভেতরের দরজা আটকে দিয়ে নিজের কাঁপতে থাকা বুকে হাত রাখল।

জিতু ভাইয়া সম্পূর্ণ পরিপাটি হয়ে ব্লেজারটা গায়ে চাপিয়ে ইতিকে আলতো করে ডাক দিলো। সেই ডাক শুনে ইতি অতি ধীর পায়ে, জড়তা মাখানো পদক্ষেপে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তবে এবার তার মাথার ওপর টানা রয়েছে বিশাল এক ওড়নার ঘোমটা। লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা নিজের এই মুখচ্ছবি সে আজ আর কোনোভাবেই তার স্বামীকে দেখতে দেবে না। জিতু ভাইয়াও বালিকার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন, তাই জোর করে তাকে আর নতুন কোনো লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে দিলেন না। তিনি ফ্ল্যাটের সদর দরজার দিকে পা বাড়ালেন। ইতি দরজার পাল্লাটা শক্ত করে ধরে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। জিতু ভাইয়া নিজের বাঁ হাতের ঘড়ির বেল্টটা টেনে ঠিক করতে করতে গম্ভীর অথচ সতর্ক কণ্ঠে বললো,
–“এখন শুয়ে পড়। নয়টার দিকে বোয়া আসবে। তিনিই সব কাজ করে দিয়ে যাবেন। আর বাসা থেকে একদম বের হবে না। পরিচিত কেউ না ডাকলে একদম দরজা খুলবে না, কেমন?”
ইতি মাথা নাড়িয়ে বলল,“ঠিক আছে।”

জিতু ভাইয়া আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ইতির ওড়নাঢাকা মাথায় পরম ভালোবাসায় একটি বিদায়ী চুমু এঁকে দিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু তিনি মাত্র কয়েক পা বাড়াতেই পেছন থেকে এক মিহি সুতোর মতো মিষ্টি কণ্ঠের ডাক তাঁর পথ আগলে দাঁড়াল,“এই যে শুনন?”
জিতু ভাইয়া পিছু ফিরে তাকাল। ইতি ততক্ষণে নিজের মাথার সেই সুদীর্ঘ ঘোমটাটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়েছে। মিহি লাজুক বলে উঠলো, “রাত বারোটার আগে কিন্তু বাসায় ফিরে আসবেন। আমি অপেক্ষায় থাকব।”
স্বামীর বুকে এই প্রথম কোনো আবদার ছুড়ে দিয়ে কিশোরী যেন নিজেই নিজের সাহসে চমকে গেল। ওদিকে জিতু ভাইয়ার ঠোঁটের কোণে এক ভুবনজয়ী স্মিত হাসি খেলে গেল। তিনি কপালে হাত ঠেকিয়ে রসিকতার সুরে বললেন,“ যথাআজ্ঞা মহারাণী।”

জাহানারা পর্ব ৮৭

ইতির বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন অলৌকিক সুখে তোলপাড় হয়ে উঠল, সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে এক চিলতে লাজুক হাসি উপহার দিল স্বামীকে। জিতু ভাইয়াও সেই হাসির রেশ মনে মেখেই লিফটে চড়ে গেল। ইতি ততক্ষণ স্বামীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না স্বামীর দীর্ঘ অবয়বটি চোখের আড়াল হলো।

জাহানারা পর্ব ৮৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here