নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬১
জান্নাতুল ফেরদৌ
গভীর রাত। দুর্গের চারপাশ নিস্তব্ধ। মূল ফটকের সামনে মশাল জ্বলছে বটে, তবে দুর্গের পেছনের দিকটায় আলো প্রায় নেই বললেই চলে। এত রাতে চন্দ্রা কোথ থেকে যেন ফিরলো। সুনেহেরা কে খাইয়ে কক্ষে পাঠিয়েই আলগোঋে বেড়িয়ে গেছে। কোথায় গিয়েছিল, সেটা কেউ জানে না।
অবশ্য মাঝেমধ্যেই তাকে এভাবে উধাও হতে দেখা যায়। আবিদ অত গুরুত্ব দেয় না তাই। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
কালো চাদরে শরীর মুড়ে দুর্গের পেছনের সরু পথ দিয়ে ফিরছিল সে। তার হাতে একটা ছোট হারিকেন। হারিকেনের হলদেটে আলোয় সামনে কয়েক হাতের বেশি দেখা যায় না। ঠিক তখনই তার পা থেমে গেল সামনের দৃশ্য দেখে। দুর্গের পেছনের পুরোনো আমগাছটার নিচে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। নড়ছে, চড়ছে না।
শুধু দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রার বুক ধক করে উঠলো।
এই গভীর রাতে এখানে কে? সে দ্রুত কোমরে গোঁজা ছোট ছুরিটার হাতল চেপে ধরলো। তারপর হারিকেনটা একটু উঁচু করে ধরলো। কিন্তু আলো এত দূর পৌঁছালো না। মুখ দেখা গেল না। শুধু কালো একটা ছায়ামূর্তি। চন্দ্রার গলা শুকিয়ে এলো। এমনিতে সে এসবে ভয় পায় না। তবে অবয়ব টা স্বাভাবিক মানুষ বা শত্রুর মত লাগছে না তার কাছে। তবুও নিজেকে সামলে বললো,
“কে ওখানে?”
কোনো উত্তর এলো না। চন্দ্রা আবার বললো,
“কে? কথা বলুন! দেখুন আপনি সাড়া না দিলে কিন্তু আমি আক্রমণ করে বসব। ভালো চাইলে পরিচয় দিন নিজের”
অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো একটা ভারী পুরুষালী কণ্ঠ।
“আমি সাহাবাদের ছোট শাহজাদা”
চন্দ্রার ভ্রু কুঁচকে গেল। কণ্ঠটা আবার বললো
“অরণ্য শাহ্।”
হারিকেনটা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল চন্দ্রার।
তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। অরণ্য শাহ্? অসম্ভব।
১৫ বছর আগে তার মৃত্যুর খবর পুরো রাজ্য জানে। সকলের সামনে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। কবরও দেওয়া হয়েছিল। সাহাবাদের ইতিহাসে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে বহু আগেই। চন্দ্রা কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
“কে আপনি? নামটা আবার বলুন!”
ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তিটা সামনে এগিয়ে এলো।
হারিকেনের আলো এবার তার মুখ স্পর্শ করলো।
চন্দ্রার হাত কেঁপে উঠলো। চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল যেন আতঙ্কে। লোকটার মুখ সেই পুরোনো প্রতিকৃতির সঙ্গে ভয়ংকর রকমের মিল। যেগুলো একসময় সাহাবাদ প্রাসাদের দেওয়ালে আজও ঝুলে। তীক্ষ্ণ চোয়াল, গভীর চোখ, উঁচু নাক এ যেন বাইজিদ এর দ্বিতীয় অবয়ব। লোকটা স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো চন্দ্রার দিকে।
তারপর হিসহিসিয়ে বললো,
“মনে হচ্ছে তুমি ভূত দেখেছো।”
চন্দ্রা কিছু বলতে পারলো না। তার কথা খৈই হারিয়েছে। লোকটা মৃদু হাসলো।
“ভয় পাচ্ছো বুঝি? আরও একটু কাছে এসো, ভয় কাটিয়ে দিই”
চন্দ্রার মনে হলো তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। যে মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যের ইতিহাস বদলে গেছে। যার জন্য প্রতিশোধ এর তাড়নায় মরিয়া জমিদার পরিবার। এত বছর পর সে স্ব শরীরে এসে দাড়ালো? তার হাতে ধরা হারিকেনটা কাঁপছে। শিখাটাও কাঁপছে তার হাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। লোকটার মুখ আলোয় স্পষ্ট হওয়ার পর থেকেই তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। অরণ্য কে কখনো বাস্তবে দেখেনি চন্দ্রা। কেবল আঁকা ছবি তেই দেখেছে। ভয়ে ভয়ে বলল
“দে…দে..দেখুন। আ..আমি…”
কথাটা শেষও করতে পারলো না। মুহূর্তের মধ্যে লোকটা ঝড়ের বেগে সামনে এগিয়ে এসে একটা শক্ত হাত চন্দ্রার গলায় চেপে ধরলো। হারিকেনটা হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। আলোটা দুলে উঠলো। চন্দ্রার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
দুই হাতে লোকটার কবজি সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু শক্তির তুলনাই হয় না। লোকটার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে জ্বলছে। বহু বছরের জমে থাকা ক্রোধে। দাঁত চেপে সে বললো,
“কেন?”
চন্দ্রার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। লোকটা আরও জোরে চেপে ধরলো।
“বল! কেন মেরেছিলি আমায়?”
চন্দ্রার চোখে আতঙ্ক নেমে এলো।
“আমি…আমি..”.
কথাই বের হচ্ছে না। লোকটা যেন শুনছেই না। চন্দ্রার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। লোকটা ক্রোধে কাঁপছে।
“কেন এই নোংরা খেলা খেললি সবাই মিলে আমার পরিবার এর সাথে? বল!কেন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলি?
চন্দ্রার চোখে পানি চলে এসেছে। লোকটার হাত ছাড়ানোর খুব চেষ্টা করছে।
“তোর জন্য আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে! তোর জন্য আমার পরিবার ভেঙে গেছে! তোর জন্য আমাকে পরিবার ত্যাগ করতে হয়েছে।”
চন্দ্রার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
কানে শব্দ কমে যাচ্ছে। দূর থেকে একটা পরিচিত গলা ভেসে এলো।
“চন্দ্রা!”
আবিদের কণ্ঠ।
“শাহজাদি আপনি কি এইখানে?”
মুহূর্তের মধ্যে লোকটার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সে দ্রুত চারপাশে তাকালো। আবিদের কণ্ঠ এবার আরও কাছে শোনা গেল।
“শুনছেন?চন্দ্রা!”
লোকটা চন্দ্রার গলা ছেড়ে দিল। চন্দ্রা হাঁটু গেড়ে মাটিতে পড়ে গেল। প্রাণভরে বাতাস টানতে লাগলো। কাশতে লাগলো একটানা। মাথা তুলে তাকালো, লোকটা আর সেখানে নেই। চারপাশে শুধু অন্ধকার। আবিদ হাতে মশাল নিয়ে সেখানে পৌঁছালো। চন্দ্রাকে ওই অবস্থায় দেখে আশ্চর্য হলো ভীষণ।দ্রুত দৌড়ে এলো।
“শাহজাদি? কী হয়েছে? কী হয়েছে আপনার?”
চন্দ্রা এখনও ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না। গলার কাছে লালচে দাগ ফুটে উঠেছে। আবিদ তাকে ধরে দাঁড় করালো। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো,
“কে করেছে এসব? কে ছিল এখানে? আর আপনিই বা এখানে কেন?”
চন্দ্রা আতঙ্কিত চোখে অন্ধকারের দিকে তাকালো।
“আ..আমায় ঘরে নিয়ে চলুন”
রাতের খাবার টুকুও গলা দিয়ে নামেনি কারও। বাকের শাহ্ কে দাফন করা হয়েছে। বাইজিদ এমনই হতভাগা পিতা মাতা কারও জানাজা তে দাড়াতে পারে নি। সুনেহেরা যাচ্ছিলো মহলের দিকে। অনেক কষ্টে তাকে আটকানো হয়েছে।
কক্ষে এসেও পায়চারি করছে অনেকক্ষণ। আর থাকতে পারলো না সুনেহেরা। শীতের চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো। দুর্গের ফটক পেরোতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে লাগলো মুখে। শীতের শেষ দিক। বেশ গাঢ় কুয়াশা পড়েছে। চাঁদটা রুওার থালার মত গোল হয়ে উঠেছে। তার আলোয় পথঘাট মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। সাহাবাদের চারপাশের জঙ্গলটা দিনের বেলা যতটা সুন্দর, রাতের বেলা ঠিক ততটাই রহস্যময়।
সুনেহেরা দ্রুত হাঁটছে। মিরান জানিয়েছে মাহাদি নদীর পাড়ে থাকে এখন। কী কাজে তা জানে না। অবশ্যই অঙ্কুরের কোনো অবৈধ কাজে সহযোগীতা করে। তাছাড়া কেন রাত বিরেত নদীর ধারে থাকতে যাবে। জঙ্গল ফুরিয়ে এলো।
সামনে দেখা দিল সাহাবাদের বিশাল নদী। রাতের অন্ধকারে নদীটাকে মনে হচ্ছে কালো রেশমের চাদর। চাঁদের আলো পড়ে ঢেউ গুলা রুপালি হয়ে ঝিকমিক করছে। নদীর ঘাটে পৌঁছে সুনেহেরা চারপাশে তাকালো। ঘাট প্রায় ফাঁকা। দু-একটা ছোট নৌকা বাঁধা। একজন বুড়ো মাঝি দূরে বসে জাল গুটাচ্ছে। বাতাসে কাঁচা কাদামাটির গন্ধ।
সুনেহেরা ঘাটের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত খুঁজলো। মাহাদির কোনো চিহ্ন নেই। ঘোড়াও না, লোকজনও না। তার বুকের ভেতর বড় সড় হতাশা জমলো। তবে কি ভুল জায়গায় এসেছে?
ঠিক তখনই তার চোখ গেল নদীর ওপারের পাহাড়টার দিকে।
পাহাড়ের চূড়ায় একটা অবয়ব দৃশ্যমান। চাঁদের আলোয় চকচক করছে বর্ম। সুনেহেরার বুক ধক করে উঠলো। এই বর্ম সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনবে। মাহাদির বর্ম এটা। পাহাড়টা খুব উঁচু না।
কিন্তু উঠতে কষ্ট হয়। বিশেষ করে রাতে।
তার ওপর এই পাহাড়ের ঢাল অসমান। পাথর বের হয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। একটু ভুল হলেই গড়িয়ে নিচে পড়তে হবে। সুনেহেরা চাদরটা শক্ত করে জড়িয়ে পাহাড়ের দিকে হাঁটা ধরলো।
পথে প্রথমেই একটা শুকনো ঝর্ণার খাত পড়লো।
নিচে নেমে আবার ওপরে উঠতে হলো। চামড়ার জুতোয় কাদা লেগে একাকার। তারপর শুরু হলো পাথুরে পথ। একটা ধারালো পাথরে পা পিছলে পড়ে গেল। কষ্ট করে নিজেকে সামলে উঠে দাড়ালো আবার। হাতে আঁচড় লেগে চামড়া ছিঁড়ে সামান্য রক্ত বের হচ্ছ।
যত ওপরে উঠছে, বাতাস তত ঠান্ডা হচ্ছে।
চুলগুলো বারবার মুখে এসে পড়ছে। শ্বাসও ভারী হয়ে আসছে। মাঝপথে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো।
উপরে তাকালো। মাহাদি এখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে জানে সুনেহেরা আসছে। আরও কিছুক্ষণ উঠার পর অবশেষে চূড়ায় পৌঁছালো। এতক্ষণে তার নিঃশ্বাস প্রায় ছুটে গেছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। মাহাদি নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে পায়ের শব্দ শুনেও ঘুরলো না। সুনেহেরা ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার চোখ সরাসরি মাহাদির দিকে। আগে পিছে কোনো কথা না বলে সরাসরি প্রশ্ন করলো।
“আপনি আমার আব্বাকল হত্যা করেছেন?
মাহাদি কোনো উত্তর দিল না। সুনেহেরা আবার বললো
“যে যাই বলুক বিশ্বাস করি না আমি। আমি আপনার কাছেই শুনতে চাই সত্যটা।”
এবার মাহাদি মাথা ঘুরালো। চাঁদের আলো এসে পড়লো তার মুখে। তার বর্মে আবৃত মুখ খানা দেখে সুনেহেরার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো। মাহাদির চোখে কোনো অস্থিরতা নেই, কোনো অজুহাত নেই। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই খুব শান্ত গলায় বলল
“হ্যাঁ। আমি আপনার পিতা কে হত্যা করেছি।”
মুহূর্তের জন্য পৃথিবী যেন থেমে গেল সুনেহেরার। ভেবেছিল সে হয়তো বলবে ষড়যন্ত্রের শিকার। নয়তো বলবে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। কিন্তু মাহাদি অকপটে স্বীকার করে নিল। সুনেহেরার চোখ বড় হয়ে গেল।
“আপনি….?”
মাহাদি আবারও বলল,
“হ্যাঁ।”
আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না সুনেহেরা। ঝটকা মেরে মাহাদির কোমরের পাশে ঝোলানো তরবারির কোষ থেকে অস্ত্রটা টেনে বের করলো।
ধাতব শব্দে আতকে উঠলো রাতের পাহাড়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মাহাদি কোনো প্রতিরোধ করলো না। এক পা পিছালও না। তরবারি ধরারও চেষ্টা করলো না। স্থির চোখে সুনেহেরার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন এই মুহূর্তটার জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। সুনেহেরা তেজী হাতে
কোপ বসালো মাহাদির গলা বরাবর। ধারালো তরবারি বর্ম ভেদ করে গলা অর্ধেক কেটে ফেলল।
মাহাদি একবারও বাধা দেয় নি। কোনো আত্মরক্ষার চেষ্টাও করে নি।
তার হৃষ্টপুষ্ট দেহটা টলে উঠলো। ধীরে ধীরে হাঁটু ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। সুনেহেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। হাতে ধরা তরবারিটা কাঁপছে।
শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। মাহাদি যুদ্ধক্ষেত্রে দশজনের সমান যোদ্ধা। সে চাইলে মুহূর্তেই অস্ত্র কেড়ে নিতে পারতো। কিন্তু করেনি। একবারও না।
মাটিতে পড়ে থাকা মাহাদির দিকে তাকিয়ে সুনেহেরার বুকে রক্তক্ষরণ শুরু হলো। হাতে এখনও মাহাদির তরবারি। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো রক্তাভ। মাহাদি মাটিতে পড়ে আঋে। অনেক কষ্টে হাত তুললো। মুখের বর্মের আবরণটা খুলে ফেলতে চেষ্টা করলো। ধাতব আবরণটা সরে গেল। চাঁদের আলো এসে পড়লো তার মুখে। সেই পরিচিত মুখ। যে মুখ খানা দেখতে সুনেহেরা মাঝরাতে সেনা মহলে ছুটে যেত। মাহাদি চোখ তুলে তাকালো তার দিকে।
অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টি। একদম স্থির। কোনো অভিযোগ নেই চোখ জোড়ায়। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুনেহেরার দিকে। যেন শেষবারের মতো তাকে দেখে নিচ্ছে। সুনেহেরা তখনও কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে। তার চোখে ঘৃণা। বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা।
মাহাদি ঠোঁট টেনে হাসলো। এক চিলতে হাসি।
সুনেনেরার পাথর মানব হাসলো। মাহাদির দৃষ্টি একটু ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠতে লাগলো। তবুও তাকিয়ে রইল যেমন করে একজন পথহারা মানুষ শেষ আলোটুকুর দিকে তাকিয়ে থাকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
“এই রাজ্য আমাকে ছাড়বে না শাহজাদি। তাই আমিই ছেড়ে যাচ্ছি। জানতাম তোমাকে পাওয়া হবে না। তুমি দূরের দেখা ওই শ্যামলা আকাশ জাহ্নবী। তোমাকে ছোঁয়ার সাধ্য আমার কই?”
সুনেহেরার বুকের ভেতর জমে থাকা সব শক্তি ভেঙে যাচ্ছে। তরবারিটা হাত থেকে পড়ে গেল।
ধাতব শব্দ তুলে গড়িয়ে গেল পাথরের ওপর।
হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। তারপর হঠাৎ ছোট্ট শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
গগন বিদারি কান্না পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো।
যেন বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় পাহাড়ের চূড়াটা সাক্ষী হয়ে রইলো এক অসমাপ্ত ভালোবাসার। এক প্রেমিক-প্রেমিকার নির্মম বিচ্ছেদ। মাহাদি বর্মের পকেট থেকে নিস্তেজ হাত টা দিয়েই টেনে বের করলো এক খানা তাজা গোলাপ। বাড়িয়ে দিতে গেলে হাতটা ধপাস করে পড়লো মাটিতে।
“কতদিন পর প্রিয়তমার দেখা পাব ভেবে বুকটা বড্ড অস্থির হয়ে ছিল।বুকের জ্বালা জুড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই সামান্য উপহার…। উনি…বলেছিল তু..তুমি আসবে। তাই…”
জিহ্বা বাক ক্ষমতা হারায়। নিভে আসে চোখ জোড়া। চোখ পুরোপুরি বন্ধ হয় না। তাকিয়ে থাকে শূন্যে। যেমন চাতক তাকিয়ে থাকে বৃষ্টির আশায়। সুনেহেরা গোলাপ খানা তুলে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। জাপটে ধরে মাহাদি কে। দু-হাত রক্তে ভিজে একাকার। দু হাতে গাল আগলে নিয়ে ডাকে তাকে
“কেন? কেন আপনি নরপিশাচ দের দলে নাম লেখালেন? কেন আমার ভালোবাসা নিয়ে এভাবে খেললেন? কেনওওওও”
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬০
মাহাদি সাড়া দেয় না। কথা বলে না। শক্ত লোহার বর্মের বুকের অংশ টায় মাথা ঠুকে সুনেহেরা। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে সে অনুভূত করে খোলসের ভিতরেদ দেহ ভীষণ নরম। মাথা তুলে হাত বুলায় বুকে। আচমকা চোখ যায় নদীর দিকে। পাল তোলা বিশাল জাহাজের ডিঙিতে দাঁড়িয়ে আছে বর্ম পরিহিত লম্বা চওড়া এক লোল। হাতে উড়ছে সাহাবাদ এর পতাকা।
