Mad for you 2 part 26
তানিয়া খাতুন
রাত অনেক দূর গড়িয়ে গেছে।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
জানালার কাঁচ ভেদ করে চাঁদের আবছা আলো ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে।
সেই মৃদু আলোয় ঘরটা যেন এক স্বপ্নময় আবহে ঢেকে আছে।
রুহি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
কিন্তু ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন খুব কাছে আছে।
এতটাই কাছে যে তার উষ্ণ নিশ্বাস এসে লাগছে রুহির মুখে।
প্রথমে সে ভেবেছিল হয়তো স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সেই অনুভূতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙতে শুরু করল।
হঠাৎই ধড়ফড় করে উঠে বসল সে।
চোখ খুলতেই দেখতে পেল, ক্ৰিশ তার মুখের উপর ঝুঁকে আছে।
গভীর মনোযোগে যেন তাকে দেখছিল।
অপ্রস্তুত হয়ে ক্ৰিশও সামান্য সরে গেল।
রুহি প্রথমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতর জমে থাকা অকারণ ভয়টা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই।
কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা।
ক্ৰিশের রাগ।
তার কণ্ঠের কঠোরতা।
আর সেই থাপ্পড়…
গালের ব্যথা হয়তো অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু মনের কষ্ট এখনো তাজা।
মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের কোমলতা মিলিয়ে যায়।
চোখ দুটো রাগে জ্বলে উঠে।
পাশে রাখা বালিশটা তুলে নিয়ে কোনো সতর্কতা ছাড়াই সজোরে ছুড়ে মারে ক্ৰিশের দিকে।
অপ্রস্তুত ক্ৰিশ বালিশের আঘাতে খানিকটা পিছিয়ে যায়।
আর সেই দৃশ্য দেখে রুহির মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হয় না।
বরং আরও রাগ হয়।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
সে মাথা নিচু করে হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
রুহি তা দেখে ফেলেছে।
আর সেই হাসি যেন তার রাগের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিল।
— আপনি হাসছেন?
ক্ৰিশ দ্রুত মাথা নাড়ল।
— না তো।
— আমি কি পাগল যে হাসব?
রুহি চোখ রাঙিয়ে বলে,
— আমার সঙ্গে মজা করছেন?
— বেরিয়ে যান।
— এখনই বেরিয়ে যান আমার সামনে থেকে।
ক্ৰিশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সে বুঝতে পারছে, আজকের ভুল এত সহজে ক্ষমা পাওয়ার মতো নয়।
ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলে,
— আচ্ছা, সরি।
— বাটারফ্লাই…
ক্ৰিশ এবার দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে।
— এই দেখো, কান ধরেছি।
— সত্যি বলছি, আর কখনো এমন হবে না।
রুহি মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো যেন ক্ৰিশের অস্তিত্বই তার কাছে নেই।
ক্ৰিশ অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কান ধরে উঠবস শুরু করে।
— এক…
— দুই…
— তিন…
— চার…
— পাঁচ…
উঠবস করতে করতেই বলে,
— দেখো, শাস্তিও নিচ্ছি।
— আমার বাটারফ্লাই যদি বলে, আমি একশোবারও উঠবস করব।
তার গলায় এমন এক করুণ সুর ছিল যে সাধারণ সময়ে রুহির হয়তো হাসি পেয়ে যেত।
কিন্তু আজ তার মন নরম হলো না।
বরং ক্ৰিশের প্রতিটি কথাই তাকে আরও বিরক্ত করে তুলছিল।
শেষ পর্যন্ত সে বিরক্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
ক্ৰিশের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নেয়।
যেন ঘরে সে একাই আছে।
— আমি তোমার পাশে শুই?
রুহি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
— না।
— একদম না।
— আপনি নিচে ঘুমাবেন।
ক্ৰিশ হতভম্ব হয়ে বলে,
— নিচে?
— হ্যাঁ, নিচে।
— যতক্ষণ না আমার রাগ কমছে, ততক্ষণ আমার কাছ থেকে দূরে থাকবেন।
ক্ৰিশ বিরবির করে বলে,
— কী দজ্জাল মেয়ে রে বাবা…
রুহি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকায়।
চোখ দুটো সরু হয়ে এসেছে।
— কিছু বললেন?
এক নিমিষে মুখের ভাব পাল্টে ফেলে ক্ৰিশ।
— না না!
— আমি কিছু বলব কেন?
— আমার কি এত সাহস আছে যে আমি বউয়ের সঙ্গে তর্ক করব?
— আমি তো অত্যন্ত ভদ্র, শান্তশিষ্ট আর নিরীহ একজন মানুষ।
কথাগুলো এমন গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলে যে অন্য কেউ হলে হয়তো বিশ্বাসই করে ফেলত।
কিন্তু রুহি তাকে খুব ভালো করেই চেনে।
সে সন্দেহভরা চোখে কিছুক্ষণ ক্ৰিশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
ক্ৰিশও আর কিছু বলে না।
ধীরে ধীরে নিচে একটি চাদর পেতে শুয়ে পড়ে।
তবে শোয়ার আগে একবার আড়চোখে বিছানার দিকে তাঁকায়।
চাঁদের আলোয় রুহির মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
রাগে মুখ গম্ভীর করে রেখেছে সে।
ক্ৰিশের ঠোঁটে অজান্তেই একটুকরো ম্লান হাসি ফুটে উঠল।
এটুকু তেই এত অভিমান বাটারফ্লাই, সত্যি টা জানার পর আমাকে ভালোবাসবি তো?
সারাটা দিন কেটে যায়, তবুও রুহির অভিমান ভাঙাতে পারেনা ক্ৰিশ।
সকাল থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সে রুহির পিছু ছাড়েনি।
কখনো মিষ্টি কথায় মানানোর চেষ্টা করেছে, কখনো নিজের ভুল স্বীকার করেছে, আবার কখনো কান ধরে উঠবস পর্যন্ত করেছে।
কিন্তু রুহি যেন এবার পণ করেই বসেছিল—সহজে ক্ৰিশ কে ক্ষমা করবে না।
ক্ৰিশ যতবার তার সামনে গিয়েছে, ততবারই রুহি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
তার কোনো কথারই জবাব দেয়নি। ফলে দিনের শেষে ক্ৰিশের অবস্থাও বেশ করুণ হয়ে উঠেছে।
অবশেষে সে নতুন এক উপায় বের করে।
রুহিকে আয়েশার কাছে রেখে নীলকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
উদ্দেশ্য একটাই—রুহির প্রিয় সব খাবার আর চকলেট কিনে আনা।
হয়তো সেগুলো দেখলে মেয়েটার মন কিছুটা নরম হবে।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল।
ঘড়ির কাঁটা তখন আটটা ছুঁইছুঁই।
ড্রয়িংরুমের টেলিভিশনে একটি সিনেমা চলছিল ।
সোফার ওপর পাশাপাশি বসে রুহি আর আয়েশা গভীর মনোযোগে সিনেমাটি দেখছিল।
পর্দাজুড়ে তখন এক অতি রোমান্টিক দৃশ্য।
দুজনেই এতটাই ডুবে গিয়েছিল সেই দৃশ্যে যে আশপাশে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে প্ৰবেশ করে ক্ৰিশ আর নীল।
ভেতরে ঢুকেই টেলিভিশনের পর্দার দিকে চোখ পড়তেই দুজনেই থমকে দাঁড়ায়।
বিস্মিত দৃষ্টিতে একবার পর্দার দিকে, আরেকবার একে অপরের দিকে তাকায়।
ক্ৰিশ চোখের ইশারায় নীলকে কিছু একটা বলতেই নীল দুষ্টু হেসে আয়েশার কাঁধে হাত রাখে।
এমন সুন্দর একটি দৃশ্যের মাঝে হঠাৎ এমন বিরক্তিকর বাধা পেয়ে আয়েশা ভ্রু কুঁচকে নীলের হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
নীল বড় বড় চোখ করে আবারও কাঁধে হাত রাখে।
এবার আয়েশা বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাতেই নীলকে দেখে একেবারে থতমত খেয়ে গেল।
মুহূর্তেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। কোনো কথা না বলে সে দৌড়ে নীলের ঘরের দিকে পালাল।
নীলও হেসে তার পেছন পেছন ছুটে গেল।
অন্যদিকে রুহি এখনও হা করে টেলিভিশনের দিকেই তাকিয়ে আছে।
যেন পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়ায়।
তারপর কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
— “খুবই রোমান্টিক দৃশ্য, তাই না?”
রুহি অবচেতনভাবেই বলে উঠে,
— “হ্যাঁ, খুব…”
কথা শেষ করেই চমকে উঠল সে।
— “আ… আপনি! আপনি কখন এলেন?”
ক্ৰিশ মুচকি হেসে হাতে থাকা কয়েকটি প্যাকেট তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— “অনেকক্ষণ আগেই এসেছি। কিন্তু তুমি তো এই ‘হট সিন’ দেখতে এতটাই ব্যস্ত ছিলে যে আমায় দেখতে পাওনি।”
ক্ৰিশের কথায় রুহির মুখ মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে গেল।
লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার।
কিন্তু পরক্ষণেই চোখ পড়ল ক্ৰিশের হাতে থাকা প্যাকেটগুলোর দিকে।
এতগুলো চকলেট একসঙ্গে দেখে তার সব লজ্জা, অভিমান আর রাগ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য উধাও হয়ে গেল।
এক ঝটকায় প্যাকেটগুলো ক্ৰিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সে বুকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে দৌড় দিল।
রুহির এমন কাণ্ড দেখে ক্ৰিশ হেসে মাথা নাড়ে।
— “খাও, বাটারফ্লাই, মন ভরে চকলেট খাও। সারাটা দিন আমাকে অনেক জ্বালিয়েছো।
এখন এই চকলেটগুলো খেয়ে যখন আমার কাছে আসবে, তখন হিসাবটা আমি বুঝে নেব।”
তুমি যদি বাসর করার জন্য পাগল হয়ে আমার কাছে আসবে আর আমি খেলবো আসল খেলা…..
সামনেই পরীক্ষা। তাই বইপত্র নিয়ে পড়ার টেবিলে বসেছিল সিমরান।
অনেকদিন ধরেই ঠিকমতো পড়াশোনা করা হচ্ছিল না, তাই আজ অন্তত মনোযোগ দিয়ে কিছুটা পড়ার চেষ্টা করছিল সে।
ঠিক সেই সময় পাশে রাখা ফোনটি বেজে উঠল।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বর দেখেই সিমরান বুঝে গেল কে কল করেছে।
আমান প্রায় প্রতিদিনই তিন-চারবার করে তাকে ফোন করে।
প্রথম দিকে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও এখন তা বেশ বিরক্তিকর লাগতে শুরু করেছে।
সিমরান বহুবার জানতে চেয়েছে, ঠিক কী কারণে সে এত ঘন ঘন ফোন করে।
কিন্তু আমান কখনোই কোনো স্পষ্ট উত্তর দেয় না।
প্রতিবারই নতুন কোনো অজুহাত এনে দাঁড় করায়। আর সেই অস্পষ্ট আচরণ সিমরানের বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ফোনটি কেটে দেওয়ার কথা ভেবেও শেষ পর্যন্ত সে রিসিভ করল।
কানে ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে আমানের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল,
— “এতক্ষণ কোথায় ছিলে?”
সিমরান শান্ত স্বরে বলে,
— “কেন? কোনো দরকার ছিল?”
আমান কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলে,
— “না… মানে… ওই, কাল যদি একটু দেখা করতে পারতে! কিছু কথা ছিল।”
সিমরান বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়েই উত্তর দেয়,
— “আমি তো হোস্টেল থেকে বাসায় চলে এসেছি। এখন সরাসরি পরীক্ষা দিতে যাব। তার আগে দেখা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
কথাটা শুনে আমান যেন কিছুটা অস্থির হয়ে উঠল।
— “কোথায় যেতে হবে বলো। আমি নিজেই চলে আসব।”
সিমরান এবার স্পষ্ট গলায় বলে,
— “তার কোনো প্রয়োজন নেই। কাল আমার পক্ষে দেখা করা সম্ভব নয়।”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।
তারপর হালকা হাসির সুরে আমান বলে,
— “এভাবে বলছো যেন কাল তোমার বিয়ে!”
কথাটা সে নিছক মজা করেই বলেছিল।
— “হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন।”
— সিমরান মাথা নেড়ে বলে “কাল আমাকে দেখতে আসবে, ইনশাআল্লাহ।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সামনেই বিয়ে হবে।”
তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না, ছিল শুধু একরাশ স্থিরতা।
— “আমার জন্য দোয়া করবেন।”
কথাগুলো বলেই সিমরান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না।
— “আল্লাহ হাফেজ।”
ফোনটি কেটে দিয়ে সে ধীরে ধীরে সেটি টেবিলের ওপর রেখে দেয়।
ঘরজুড়ে আবার নীরবতা নেমে এল।
খোলা বইয়ের পাতাগুলো বাতাসে সামান্য দুলছিল, অথচ সিমরানের মন আর পড়ার পাতায় ছিল না।
আর ফোনের ওপাশে বসে থাকা আমান…
Mad for you 2 part 25
সে যেন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না, কয়েক মুহূর্ত আগে শোনা কথাগুলো সত্যি ছিল। তার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—
“হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন… কাল আমাকে দেখতে আসবে…”
