রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২২
মহাসিন
কবিতা আর জেরিন নিঃশব্দে নীলাঞ্জনার ঘরে প্রবেশ করল।
ড্রেসিং টেবিলের পাশে বসে আছে নীলাঞ্জনা। কবিতা গিয়ে তার পাশে বসল, মুখে মৃদু হাসি।
“কিছু লাগবে নাকি?” নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল।
“না ভাবি, কিছু লাগবে না। শুধু তোমার সাথে একটু গল্প করতে এলাম,” কবিতা বলল।
জেরিনও তাল মিলিয়ে বলল,
“হ্যাঁ ভাবি, এই বাড়িতে আসার পর থেকে তেমন কথাই হলো না। ভাবলাম আজ একটু আড্ডা দিই।”
নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
“তাহলে আমি গিয়ে কফি বানিয়ে আনি। কফি খেতে খেতে আড্ডা দিলে ভালোই হবে।”
কবিতা হাত তুলে থামাল।
“না ভাবি, এখন কষ্ট করে কফি বানাতে হবে না।”
নীলাঞ্জনা দুজনের মুখের দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল,
_হঠাৎ এত দরদ দেখাচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই কিছু চায়।_
কবিতা খেয়াল করল নীলাঞ্জনা চুপ হয়ে গেছে।
“কী হলো ভাবি? কোথায় হারিয়ে গেলে?”
নীলাঞ্জনা হেসে বলল,
“কোথায় আর হারাবো। বলো, কী কথা?”
জেরিন সুযোগ বুঝে প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা ভাবি, শাপলার মা-বাবা কি ওর সাথে কথা বলে না?”
“বলে তো,” নীলাঞ্জনা ধীরে বলল,
“তবে খুব কম। ওনারা নাকি খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই শাপলার সাথে তেমন একটা কথা হয় না।”
কবিতা একটু ঝুঁকে এল।
“আচ্ছা ভাবি, শাপলার বোনের সাথে যা হয়েছিল… তুমি কি সব জানো? শাপলা কি তোমাকে কিছু বলেছে?”
নীলাঞ্জনার মুখ গম্ভীর হয়ে এল।
“তোমরা যা জানো, আমিও তাই জানি। শাপলা তার বোনের বিষয়ে আমাকে কখনো কিছু বলেনি। তবে যা হয়েছে, সেটা খুব খারাপ। মেয়েটা অনেক সুন্দর ছিল।”
কবিতা বলল,
“আচ্ছা ভাবি, শাপলা কি তোমার কাছে সব কিছু শেয়ার করে? স্কুলে কী করে, কারা ওর বন্ধু—এসব বলে?”
“হ্যাঁ, বলে তো,” নীলাঞ্জনা বলল।
“অনেক কিছুই শেয়ার করে আমার সাথে।”
কবিতা এবার সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“আচ্ছা ভাবি, শাপলা কি সিয়ামকে পছন্দ করে?”
প্রশ্নটা শুনে নীলাঞ্জনা থমকে গেল। চোখে বিস্ময়।
মনে মনে বলল,
_ও! তাহলে আমার কাছ থেকে এসব জানার জন্যই গল্প করতে এসেছো।_
জেরিন বলল,
“কী হলো ভাবি? চুপ করে গেলে কেন?”
কবিতাও সায় দিল,
“হ্যাঁ, কিছু তো বলো।”
নীলাঞ্জনা আমতা আমতা করে বলল,
“আরে তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি? শাপলা সিয়ামকে পছন্দ করবে কেন?”
কবিতা চোখ সরু করে বলল,
“কেন, তুমি দেখো না? শাপলা কেমন সিয়ামের আশেপাশে ঘুরঘুর করে।”
নীলাঞ্জনা মাথা নেড়ে বলল,
“আমি কিছু জানি না। শাপলা আমার কাছে কখনো এসব বলেনি।”
“হয়তো তোমাকে বিশ্বাস করে না, তাই বলেনি,” কবিতা বলল।
“আমার তো সন্দেহ হয়, শাপলা সিয়ামকে পছন্দ করে।”
নীলাঞ্জনা একটু বিরক্ত হলো।
“তোমার ভুলও তো হতে পারে, তাই না? আচ্ছা, আমি শাপলাকে জিজ্ঞেস করে দেখব।”
তারপর কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল,
“আচ্ছা, রান্না করতে হবে। আমি যাই।”
এই বলে নীলাঞ্জনা উঠে চলে গেল।
নীলাঞ্জনা বেরিয়ে যেতেই জেরিন ফিসফিস করে বলল,
“আমি শিওর, এই নীলাঞ্জনা ভাবি সব জানে। আমাদের সাথে মিথ্যে বলছে।”
কবিতার চোখে চিকচিক করে উঠল।
“ঠিক আছে, যখন বলল না… কিভাবে কথা বের করতে হয়, তা আমার ভালোই জানা আছে। চলো।”
দুজনে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ড্রয়িং রুমে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে শাপলা ও আলো।
ঠিক তখনই সিরাজ এলো। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে শাপলার সামনের সোফায় বসে পড়ল। চোখ তুলে তাকাতেই শাপলার কপাল কুঁচকে গেল।
সিরাজ শাপলার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “কিরে, কথা বলছিস না যে?”
শাপলা চোখ নামিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, “আপনার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছা নেই আমার।”
সিরাজ বাঁকা হাসল। “কেন? ইচ্ছা নেই কেন?”
“সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন,” শাপলার গলায় শীতলতা।
সিরাজ ফিসফিস করে বলল, “আমি কি দেখতে খারাপ? আমার সাথে প্রেম করলে ক্ষতি কী?”
শাপলার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“আপনি দেখতে সুন্দর হতে পারেন, কিন্তু আপনার মন মানসিকতা জঘন্য নোংরা।”
সিরাজ নির্বিকার। “তাতে কী হয়েছে? তোকে অনেক সু*খ দেবো। অনেক স্টা*ইলে রো*মা*ন্স করবো।”
এই নোংরা কথায় শাপলার সারা শরীর ঘৃণায় শিউরে উঠল। চোখ বড় বড় করে সে বলল, “আপনি খুব খারাপ মানুষ। একটা বাচ্চা মেয়ের সামনে এসব কী ধরনের কথা বলছেন?”
সিরাজ আলোর দিকে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বলল, “আলো, তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও। দেখছো না, বড়রা কথা বলছি।”
ছোট্ট আলো ভয় পেয়ে দৌড়ে চলে গেল।
সুযোগ বুঝে সিরাজ শাপলার কাঁধে হাত রাখতে গেল।
চোখের পলকে শাপলা তার গালে সপাটে একটা থা*প্পড় বসিয়ে দিল।
“তোর ওই নোং*রা হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করবি না,” শাপলার গলা কেঁপে উঠল রাগে।
সিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “তুই আমাকে থা*প্পড় দিলি? এর শোধ আমি একদিন না একদিন তুলবোই। মনে রাখিস। তোর উপর আমার ন*জর পড়েছে—মানে তোকে আমার সাথেই রা*ত কাটাতে হবে।”
শাপলা চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
“আমি এখনই বাড়ির সবাইকে ডাকবো।”
সিরাজ হেসে উঠল নির্লজ্জভাবে।
“ডাক তো দেখি, তোর কথা কে বিশ্বাস করে? তোর অনেক অহংকার, তাই না? তোর সাথে রা*ত কাটিয়ে সেই অহংকার ভেঙে দেবো। তখন কাউকে মুখ দে*খাতেও পারবি না।”
কথা শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগোতে এগোতে একবার পেছন ফিরে তাকাল—চোখে হুমকি, ঠোঁটে নোংরা হাসি।
শাপলা পাথরের মতো চুপচাপ বসে রইল। ঘরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে এসেছে।
ঠিক তখনই ড্রয়িং রুমে এসে হাজির হলো কবিতা আর জেরিন। গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে শাপলার সামনের সোফায় বসল দুজনে।
জেরিন শাপলার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
“কী ব্যাপার? একা একা বসে আছো কেন? তোমার সিয়াম কোথায়?”
শাপলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে? আপনি কী বলতে চান?”
জেরিন হেসে বলল,
“আরে একা কেন বসে আছো? সিয়ামকে ডেকে এনে কথা বলতে তো পারো।”
কবিতা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এসব কথা রাখো তো।”
এরপর শাপলার দিকে ফিরে ধীরে শুধালো,
“আচ্ছা শাপলা, একটা কথা বলবি?”
শাপলা মাথা নেড়ে শুধালো,
“কী কথা বলবো?”
“যাই বলিস না কেন, সত্যি বলবি কিন্তু,” কবিতা আগেই শর্ত দিল।
“আচ্ছা, সত্যি বলব,” শাপলা মৃদু স্বরে বলল।
কবিতা একটু ঝুঁকে এল,
“এই যে তুই স্কুলে যাস, পড়াশোনা করিস… স্কুলের কোনো ছেলেকে ভালো লাগে?”
শাপলা মাথা নাড়ল,
“না, তেমন কাউকে ভালো লাগে না।”
জেরিন চোখ টিপে বলল,
“আচ্ছা শাপলা, কখনো কাউকে দেখে ক্রাশ খাসনি?”
শাপলা একটু থেমে বলল,
“হ্যাঁ, ক্রাশ খেয়েছি তো।”
জেরিন বলল,
“কে সে?”
ঠিক তখনই নীলাঞ্জনা ড্রয়িং রুমে চলে এলো।
“একি! তোমরা আমাকে রেখেই আড্ডা শুরু করে দিলে? আমি তো রান্নাঘরে ছিলাম। ডাক দিলেই তো হতো।”
জেরিনের মুখে বিরক্তির ছায়া পড়ল।
নীলাঞ্জনা দ্রুত এসে শাপলার পাশে বসল।
কবিতা শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিরে শাপলা, বল না… কে সে?”
শাপলা বলতে যাবে, তার আগেই নীলাঞ্জনা বলে উঠল,
“এই, তোমরা কী নিয়ে কথা বলছো? আমাকেও একটু বলো। আমিও শুনি।”
এরপর শাপলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কিছুতেই সিয়ামের কথা বলবি না। এরা কিছু একটা করতে চাইছে। আমার কাছেও জিজ্ঞেস করেছে তুই কারো সাথে প্রেম করিস কি না। এমনকি সন্দেহ করছে তুই সিয়ামকে পছন্দ করিস কি না।”
কবিতা ভ্রু তুলে বলল,
“একি ভাবি! শাপলার কানে ফিসফিস করে কী বলছো?”
নীলাঞ্জনা হেসে উড়িয়ে দিল,
“আরে না, তেমন কিছু না। আচ্ছা, আগে বলো তো তোমরা কী নিয়ে কথা বলছিলে?”
জেরিন শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“শাপলা কাকে দেখে ক্রাশ খেয়েছে, সেটাই জানতে চাইছিলাম।”
এরপর শাপলাকে জিজ্ঞেস করল,
“শাপলা, বলো তো ছেলেটা কে?”
শাপলা আমতা আমতা করে বলল,
“আমাদের স্কুলের গেটের সামনে বাদাম বিক্রি করে একটা ছেলে… ওকে দেখেই ক্রাশ খাইছি।”
জেরিন মুখ বাঁকাল,
“ছিঃ ছিঃ! শেষমেশ কি না বাদামওয়ালা!”
কবিতা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“শাপলা, তোর রুচি অনেক ভালো। ঠিক নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষকে পছন্দ করেছিস।”
একটু থেমে আবার বলল,
“জেরিন, চলো। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
এই বলে দুজনে উঠে চলে গেল।
ঘর নিঃশব্দ হতেই নীলাঞ্জনা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২১
“শাপলা, তুমি যে সিয়ামকে ভালোবাসো—এটা কবিতা সন্দেহ করছে।”
শাপলার মুখ শুকিয়ে গেল।
“এখন কী করবো?”
নীলাঞ্জনা ধীরে বলল,
“খুব সাবধানে থাকবে। আর যদি কবিতা সব জেনে যায়, তাহলে নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটাবে।”
এর পর দুজনে আরো অনেক কথাবার্তা বলতে লাগলো।
জেরিন কে নিয়ে এতো রাগ করার কিছু নেই। তবে একটা কথা বলে রাখি জেরিন এর শেষ পরিণতি খুব খারাপ হবে।
