Home তাকদীর তাকদীর পর্ব ৮

তাকদীর পর্ব ৮

তাকদীর পর্ব ৮
নিরুর কল্পনারাজ্য

জুনায়েদকে আজ হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। এরই মাঝে তিনটি দিন তথা বাহাত্তর ঘন্টা কেটে গিয়েছে চোখের পলকেই। সময় থেমে থাকেনা, স্রোতের ন্যায় তার বহমানতা। তা কেন্দ্র করেই সময় এগিয়ে গিয়েছে প্রাকৃতিক গতিতে। আজ তাকে শাহরিয়ার কুঞ্জে আনা হয়েছে। মোটামুটি সুস্থ তার শরীর। ফ্যাকাশে আদলে ফিরে এসেছে পূর্বের ন্যায় পূর্ণ-দীপ্ত জ্যোতি। এ’কদিন হসপিটালে পালাক্রমে সৈয়দ রুহানি এবং আয়রা তার খেয়াল রেখেছে; যত্ন করেছে। তবে জুনায়েদ ভুল করে হলেও আর আয়রার সংস্পর্শে যায়নি। তার কারণ কেবলমাত্র একটিই– সেদিনের সেই আচমকা ঝটকা। তবে তিনদিনে সে যা অধিকমাত্রায় উপলব্ধি করেছে তা হলো আয়রার নামাজ-কালামের বিষয়টি। আয়রা-এমন একটি নারী যে কিনা প্রতিটি নামাজের ওয়াক্তে সে নামাজ আদায় করে। সাথে তার চলাফেরাতে সম্পূর্ণ ধর্মের আভাস পাওয়া যায়। জুনায়েদ তা খুব ভালো করেই লক্ষ্য করেছে। আর এই মুহূর্তে জুনায়েদ তার কক্ষে, তার বিছানায় শুয়ে রয়েছে। জুনায়েদ বিছানায় বসে বসে ফোন স্ক্রল করছিলো। সে যে ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে এমন শুয়ে বসে কাটাতে তা তাকে দেখে যে কেও-ই ধারণা করে নিতে পারবে। তখনি কোথা থেকে যেনো আমিরা এলো ছুটে। মেয়েটা শান্ত ঠিক-ই তবে দূরন্তপনাও তার কম নয়। জুনায়েদকে তার বড্ড মনে ধরেছে। তার ওপর জুনায়েদ অসুস্থ। সে কক্ষে প্রবেশ করার পরপরই বাচ্চামো কন্ঠে ডাক দিলো জুনায়েদকে,
— আঙ্তেল, আঙ্তেল!

জুনায়েদ ফোন হতে দৃষ্টি সরিয়ে তার তীক্ষ্ণ-শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আমিরার পানে। আমিরা এই মুহূর্তে জুনায়েদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আবারও সেই একই সমস্যা তার। বিছানা বড্ড উঁচু। আমিরা উঠতে পারছেনা। বহুক্ষণ যাবৎ সে ওঠার চেষ্টা করলো। জুনায়েদ এক নজরে তাকিয়ে রয়েছে তার পানে। নীল সায়রের ন্যায় উজ্জ্বল দৃষ্টিতে কোনোরকম অনুভূতি প্রকাশ পেলোনা।মেয়েটা একবারও সাহায্য চায়ছেনা। জুনায়েদ অবাক না হয়ে পারেনা। ছোট মেয়েটার একনিষ্ঠতা এতোটা? জুনায়েদ এবার নিজের পেশিবহুল হাতের সাহায্যে আমিরাকে একহাতে ওপরে তুলে ফেলে। প্রথম বারেই ওই পাতলা-চিকন গড়নের ছোট তনুখানা শূণ্যে ভাসমান অবস্থাতে রাখলো। দু’হাতে আমিরাকে আঁকড়ে ধরে সে আমিরাকে খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে পর্যবেক্ষণ করা আরম্ভ করলো। ফলস্বরূপ, আমিরা প্রচন্ড হাসতে আরম্ভ করে। সাধারণত, বাচ্চারা এসবে বেশ আনন্দবোধ করে। আমিরাও ব্যতিক্রম নয়। আপাতত সে একটি হাতকাটা লাল ফ্রগ পড়ে রয়েছে। জুনায়েদের কাছে তা এতো সুন্দর মনে হলো। আমিরা আর আয়রা দু’জনের মুখশ্রী হুবহু একই। যেনো মনে হচ্ছে কেও কপি করে তা-ই একদম ছেপে দিয়েছে। ভ্রুদুটি কুঞ্চিত করে সে গম্ভীর আদলে চেয়ে থেকে বিড়বিড় করে,

— তুমি হুবহু তোমার মায়ের মতো দেখতে!
অতঃপর সে আমিরাকে শূণ্য থেকে নামিয়ে নিজের উদরের ওপর বসায়। সে তো চায়লেই আমিরাকেও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারে। অথচ সে করছেনা। অথবা সে করতেই পারছেনা। তার কারণ? পরিবর্তে তার এই বাচ্চা মেয়েটাকে প্রচন্ড রকমের ভালো লাগছে। অথচ সে-তো বাচ্চাপ্রেমী নয়। তার ভাবনা-চিন্তার মাঝেই আমিরার খিলিখিলিয়ে হাসতে হাসতে বলতে থাকা আদো আদো স্বর ভেসে এলো,
— আঙ্তেল, আলেকবার তরবে?
জুনায়েদ ফিক করে হেসে ফেলে এ’পর্যায়ে। জিজ্ঞেস করে,
— তুমি এত্তো আদুরে কেনো?
আমিরা নিজের সবকয়টি দাঁত বের করে হাসে। দু’হাতে তা আবার আড়াল ও করে নেয়। জুনায়েদ এই মুহূর্তে খেয়াল করলো– আমিরার দু’গালে দুটো টোল ও রয়েছে। তার মস্তিষ্কে আপনাআপনি কল্পনা চলে এলো– এমন টোল কী আয়রার থাকতে পারেনা? পারে বোধহয়। সে তো আর কখনো তাকে হাসতে দেখেনি তাকে। জুনায়েদ ভাবুক হলো এ বিষয়টিকে ঘিরে। আমিরা তার পানে চেয়ে সুর টেনে জবাব দিলো,

— আম্মিও বোলে তোও!
এটুকু বলেই আবারও সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। জুনায়েদ এবারে আধশোয়া থেকে উঠে বসলো। ফোনটা পাশে রেখে আমিরাকে উল্টো ঘুরিয়ে আমিরাকে কোলে রাখলো। আমিরার কুন্তলবৃন্দ বেশ ঘন এবং সাথে মসৃণ। সেথায় হাতের বিচরণ চালালেই শান্তি শান্তি অনুভূত হয়। কৃষ্ণগহ্বরের ন্যায় কুচকুচে কালোরঙা সেই কেশদ্বয় হতে একপ্রকার সুগন্ধি জুনায়েদের নাসারন্ধ্রে এসে বারি খেলো। জুনায়েদ তা চোখ বুজে শুষে নিলো। বাচ্চাদের গায়ে বুঝি অন্যরকম এক সুভাস থাকে? জুনায়েদ আমিরার ছোট ছোট হাতগুলো নিজের দু’হাতের ওপর রাখলো। ছোট হাতগুলোতে বিচরণ চালিয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করলো। অতঃপর জুনায়েদ পাশে অবহেলায় ফেলো রাখা যান্ত্রিক ফোনখানা তুলে তার বিশাল পুরুষালি হাতের থাবার ওপর ওই ছোট; একরত্তি মেয়েটার এক হাত রেখে একখানা সুন্দর ছবি তুললো। ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলে উঠলো। আমিরার কাছে তা আশ্চর্য কোনো জাদু মনে হলো। সে কখনো ফোন ব্যবহার দেখেনি কিনা। সে অবাক হয়ে শুধালো,

— ওয়াআআআও! আঙ্তেল, এতা তীইইই?
জুনায়েদ আমিরার আদলে চমকের পরিবর্তন দেখে তীর্যক হাসলো। অতঃপর ফোনের লক খুলে ছবিখানা বের করে তাকে দেখালো। পুরুষালি মোলায়েম স্বরে প্রত্যুত্তর করলো,
— সী, আমরা আমরা!
এবারে আমিরা জুনায়েদের কথায় হেসে ফেললো। জুনায়েদের পানে গোলগোলে লোচনে চেয়ে হাস্যোজ্জ্বল আদলে জবাব দিলো,
— আমরা আমরা?
জুনায়েদের ঠোঁটের কোণ হতে হাসির ঝিলিক যেনো সরছেই না। সে আমিরার বা’গালে ওষ্ঠের উষ্ণ পরশ ছুঁইয়ে জবাব দিলো,
— হু, আমরা আমরা!
আমিরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সে আবারও সেই ফোনে থাকা ছবিটির পানে তাকালো। জুনায়েদ ছবি স্লাইড করতেই সেখানে ভেসে উঠলো একটি কালো বাইক। বিএমডব্লিউ’র নীল-সাদা লগু। সাথে বাইকের ওপর হ্যালমেট পরিহিত এক যুবক। আমিরা ভ্রু কুঁচকালো। দ্বিধান্বিত স্বরে শুধালো,

— এতা তী?
জুনায়েদ ধীরলয়ে তার জবাব দিলো,
— এটা হলো বাইক।
— বাইত?
— হু, বাইক।
— এতা দিয়ে তী করে?
— এটা হলো বাইক। এটা একটা গাড়ি।
— দাড়ি? আমার যে তেলনা আছে? ওতার মতো দেততে একদম।
— তাই?
আমিরা ওপর নিচ মাথা নাড়লো। জুনায়েদ পরিবর্তে ভাবুকের ন্যায় মুখাভঙ্গি করে প্রশ্ন করলো,
— উমমম, বাইকে চড়বে?
আমিরার মুখে মুহূর্তেই অন্ধকার আকাশে প্রজ্ব্যোলিত সেই চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল দিপ্তীর ঝিলিক দেখা গেলো। জুনায়েদের পানে চেয়ে উচ্ছাসের সহিত উত্তর করলো,

— সত্যি?
জুনায়েদ ওপর-নিচ মাথা নাড়লো। আমিরা তা দেখে দু’হাত একত্র করে ছোট ছোট শব্দে তালি দিলো। জুনায়েদ তাকে বিছানার ওপর বসিয়ে বিছানা থেকে নামলো। সাথে কড়া সুরে আদেশ দিয়ে গেলো,
— বিছানা হতে একদমই নামবেন না, ম্যাডাম? ওকে? আঙ্কেল এক্ষুনি আসছি।
জুনায়েদ চলে গেলো ক্লজেট রুমে পোশাক পরিবর্তন করতে। বিলাশবহুল সেই কক্ষে শুধু পোশাক-আশাক অথবা জুতোর-ই নয়; রয়েছে নামী-দামী সকল বিশ্বের ব্র্যান্ডের ওয়াইন। সাথে আরও নানাবিধ সংকলন। জুনায়েদ তার চিরচারিত পোশাকে আবৃত হলো। গলাতে থাকা সেই লকেট যার ভেতরে গোলগাল একটি অঙ্গুরি। তাতে ছোট ছোট অক্ষরে খোদিত –JUNAYED। সাথে সেই সিলভার রঙের চেইনটি তো রয়েছেই। কেশদ্বয়ের অগ্রভাগ আছড়ে পড়েছে কপালে। তার মতে নিজের ফ্যাশন সেন্স অধিকতর ভালো এবং রিচ সোসাইটিতে এর জন্য সে বিখ্যাত।
সে বেরিয়ে দু’টো হ্যালমেট নিয়ে। একটি তার জন্যআর অন্যটি আমিরার জন্য। সেই ছোট হ্যালমেটটি নেয়া হয়েছিলো বাইকের একটি ভিডিও শ্যুট করার জন্য যেখানে হ্যালমেটটি বিড়ালের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। তবে তা বিড়ালের মাথার চেয়ে খানিলটা বড় ছিলো এবং তা জুনায়েদের কাছেই রয়ে গিয়েছিলো। সেই সুবাদে সে এটা আমিরার জন্য এনেছে। সে গিয়ে আমিরাকে ইশারা করলো,

— বার্বিডল, স্ট্যান্ড আপ।
জুনায়েদ এই মুহূর্তে তার নতুন ডাকনাম দিতে দিতে তাকে বললো। আমিরা বিনা বাক্যে দাঁড়িয়ে যায়। জুনায়েদ হাত এগিয়ে আমিরাকে ওই ছোট হ্যালমেটখানা পড়িয়ে দিলো। আমিরা সেই হ্যালমেটের দিকে তেড়চা চোখে চায়তে চাইলো। তার চোখদুটো কেমন ট্যারা হয়ে গেলো। তবু সে দেখতে পেলোনা। সে জোরে জোরে শব্দ করে শ্বাস নেওয়া আরম্ভ করলো। জুনায়েদের ঘন ভ্রু দুটি কুঞ্চিত হয়ে গেলো। উদ্বীগ্ন স্বরে শুধালো,
— কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে?
আমিরা দু’পাশে মাথা নাড়লো। জবাবে বললো,
— আঙ্তেল, এতানে তো শ্বাস ও নেওয়া যায়।
জুনায়েদ যেনো হাঁফ ছেড়ে বাছলো। সে দ্রুততর নিজেও হ্যালমেট পড় নিলো। অতঃপর রুম ত্যাগ করতে করতে সে একবার ভাবলো সে আয়রাকে জানিয়ে যাবে অথচ তার মস্তিষ্ক বেমালুম তা ভুলেই বসলো। তারা বেরিয়ে গেলো বাইক রাইডে।

আয়রা সবেই কিচেনের কাজগুলো সেরে আমিরাকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে তাকে খুঁজতে এসেছিলো। সে প্রথমে তাকে ড্রইং রুম অতঃপর তাকে দোতলার প্রত্যেকটি কক্ষে খুঁজে ফিরলো। অথচ তার দেখা পেলোনা। আয়রা ভীত হলো। সে দ্রুত সৈয়দ রুহানির কক্ষে গেলো। এহমাদ শাহরিয়ার এসময়ে বাড়িতে থাকেনা। সে তার কক্ষে ছিলোনা। কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি আয়রার সাথে কিচেনের সকল কাজে হাত লাগিয়েছেন। আয়রা ভাবলো আমিরা নিশ্চয়ই তার সাথে হতে পারে। সে কেবল ভীত মনে বারংবারং দোয়া করতে লাগলো তা-ই,
— মাবুদ, আমিরা যেনো আম্মুর সাথে হয়।
অথচ ঘটলো তার বিপরীত। তিনি ছিলো বাগানের দিকে। অথচ আমিরা সেখানে ছিলো না। সে তার কাছে গিয়ে মিহি কন্ঠে শুধালো,

— আম্মু, আমিরাকে দেখেছেন কী?
সৈয়দ রুহানির ভ্রু কুঁচকে গেলো। তিনি চিন্তিত লোচনে চেয়ে জবাব দিলেন,
— কই, সে-তো আমার কাছে আসেইনি।
মুহূর্তের মাঝেই আয়রার বুক ধড়ফড়িয়ে উঠলো। মাতৃমনে সকল ধরণের কু’চিন্তা আসা শুরু করলো। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কত খারাপ তা আয়রার খুব ভালো করেই জানা। তার হাত আপনাআপনি বুকের বা’পাশে চলে গেলো। আহত স্বরে বললো,
— আম্মু, আমিরাকে তো পাচ্ছিনা আম্মু!
তার দুই চোখে ইতোমধ্যেই জলের সম্ভার ঘটেছে। সৈয়দ রুহানি ও অবাক হলেন। বিস্মিত কন্ঠে শুধালেন,
— কী বলছো আয়রা? কোথায় যাবে? শাহরিয়ার কুঞ্জ থেকে তো বের হওয়া যাবেনা। চলো, আরেকবার খুঁজে দেখি।
অতঃপর তারা আরও একবার শাহরিয়ার কুঞ্জ তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলো। কোথাও পেলোনা। আয়রার মন ছটফট করছে। ইতোমধ্যেই সে কেঁদেকুটে অস্থির হয়ে পড়েছে। সৈয়দ রুহানি একবার দারোয়ান কে ফোন করে দেখলেন। দারোয়ান ফোন ধরতেই জবাব দিলো,

— ম্যাডাম, আমি তো তহন নামাজে আছিলাম। আর মঞ্জিলে গেইট পাহাড়া দিতেসিলো।
সৈয়দ রুহানি এবার দ্বিতীয় নাম্বার দারোয়ানকে ফোন করলেন। সে জবাবে বললো,
— ম্যাডাম, মার্জনা করবেন। আমি একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। তাই জানিনা আমিরা মামণি বেরিয়ে ছিলো কিনা।
ব্যস! আয়রা কান্নাকাটি প্রকোপ আরও বেড়ে হলো তিনগুণ। সে কেবল কেঁদে কেঁদে এটিই দোয়া করতে রইলো,
— ইয়া আল্লাহ, আমার রত্ন আমার মেয়েকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন আল্লাহ।
সৈয়দ রুহানি অস্থির হয়ে পড়লেন। বিপদের সময় মাথা কাজ করেনা। তাদের ও বোধ-হয় তাই হলো। ভুলে গেলো সিসিটিভি পরখ করার কথা। মঞ্জিল-ই নিজের থেকে ফোন দিলো,
— হ্যালো, ম্যাডাম!
— জ্বী, কোনো খবর পেলে?
তিনি গম্ভীর স্বরে জবাব দিতে দিতে বললেন।
— জ্বী ম্যাডাম। আমিরা মামণি হয়তো জুনায়েদ স্যারের সাথে বেরিয়েছেন। তার সাথে আমরা সিসিটিভি ফুটেজে একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখেছি। সৈয়দ রুহানি অবাক হলেন। জুনায়েদ? তাও আমিরার সাথে? এ তো তিনি কল্পনাতেও ভাবতে পারেন না। আর না-তো আয়রা এ’কথা মেনে নিতে পারলো। এবং এই প্রথম বারের মতো আয়রার জুনায়েদের ওপর প্রচন্ড রাগ হলো। তার মনে হলো– জুনায়েদ যদি এমুহূর্তে তার সম্মুখে থাকতো সে নিশ্চয় এবং নিঃসন্দেহে আয়রার ভিন্নরূপী; রুদ্র-রাগিণী এক মাতৃ সত্ত্বার সাথে পরিচয় ঘটতো।

মাঝারির চেয়ে হালকা উচ্চ বেগে জুনায়েদের কালো বাইকটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাইওয়ে। যে পথ সে চলে এসেছে সে পথেই যেনো সকলের দৃষ্টি নিজের দিকেই আকর্ষণ করে এসেছে। আমিরা চুরুতে ভীত হলেও পরে সে নিজেই আনন্দে মেতে উঠেছে। জুনায়েদ নিজের সামনে আমিরাকে রেখে বাইক চালাচ্ছে। তার ভাবনায় এলো জ্বরের বিষয়টি। হঠাৎ এতো জ্বর কেনো হলো তার? এটা ছিলো অস্বাভাবিক। তার মনে হলো তাদের সেই প্রথম দেখা। কই, তখন তো সে এমন অনুভব করেনি। অথচ বিয়ের পর প্রথম তাকে দেখার পর সে অস্থির হয়েছে; নিঃশ্বাস থমকে এসেছে; সম্পূর্ণ রাত সে তার কথা ভেবেছে। কেবলই কী একরাত? পতিতালয়ের সেই মেয়েটির পানে তাকানোতে সে এতোটা বিরক্তি এবং অস্বস্তিবোধ করেছিলো যে তার মাথা ব্যাথা উঠে গিয়েছিলো। সেই সাথে চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছিলো। জুনায়েদ নিঃসন্দেহে বলতে পারে সে আগে কখনোই কাওকে অথবা কিছু নিয়ে এতোটা ভাবেনি যতটা সে ওই দু’দিনে আয়রাকে নিয়ে ভেবেছিলো। সেখান থেকে তীব্র মাথা ব্যথা। আর যখন সে আয়রার কন্ঠ শুনলো? তখন..তখন কিছু তো একটা হয়েছিলো যার দরুণ সে একদম অজ্ঞান হয়েই পড়ে যায় আর পরক্ষণেই তার ১০৫° জ্বর চলে আসে। এরই মাঝে সেখানে একটা আইসক্রিম স্টল দেখতে পেলো জুনায়েদ। সেদিকটাতে সে বাইকটি থামালো। আমিরাকে কোলে তুলে সেদিকপানে এগিয়ে গেলো। সেখানে কয়েকটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। জুনায়েদকে দেখে যেনো তাদের হুশ-ই উড়ে গেলো। বিশেষ করে সেই নীল চোখ যা হ্যালমেটের ভেতর উজ্জলভাবে ফুঁটে উঠেছিলো। জুনায়েদ আইসক্রিমের কার্ড দেখিয়ে আয়রাকে শুধালো,

— কী খাবে, বার্বিডল?
আমিরা ছোট ছোট চোখ করে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বড় দেখতে সেই আইসক্রিমটির ছবির পানে নির্দেশ করলো। জুনায়েদ আমিরার হ্যালমেট খুলে দিলো। বিনাবাক্যে সেই আইসক্রিমটি কিনে দিয়ে হ্যালমেটটা নিজের হাতে রাখলো। তখুনি একটা মেয়ে আসলো। তার কাছে নাম্বার চায়তে চায়তে শুধালো,
— হেই হ্যান্ডসাম, ক্যান আই গেট ইউর নাম্বার?

জুনায়েদ মনোযোগ দেওয়া তো দূর চোখ তুলে তাকালোনা অব্দি। রুক্ষ আদলে পেমেন্ট করে বাইকের কাছে এসে দাঁড়ালো। এটা ছিলো একটি ব্রিজ যার নিচে সম্পূর্ণ নদী দৃশ্যমান। আকাশ তখন মেঘলা। মৃদুমন্দ হাওয়া। সাথে জুনায়েদ আর আমিরা। জুনায়েদ এটাকেও স্মৃতিবন্দি করে রাখলো। আমিরা এবং তার বাইকের সাথে একটি ছবি তুললো। জুনায়েদ তখন ট্রাওজারের সাথে একটি টি-শার্ট পড়েছিলো যা ছিলো টানটান। যার দরুণ তার পেশিবহুল পেটানো শরীর দৃশ্যমান ছিলো। আমিরা জুনায়েদের কোলে বসে আইসক্রিম খেলো। জুনায়েদ তা সন্তপর্ণে পরখ করলো। মুখের এ’পাশ ও’পাশ লেগে জবুথবু অবস্থা হয়েছে আমিরার। আনমনেই সে হেসে ফেলে। মেয়েটার মুখটা রুমালের সাহায্যে মুছে দিতে দিতে বললো,

তাকদীর পর্ব ৭

— বার্বিডল, আস্তে আস্তে খাও।
আমিরার তার পানে চেয়ে ফিক করে হেসে ফেললো।
তখুনি ভেসে এক পুরুষালি গম্ভীর স্বর। সেই পুরুষটি তাদের পানে চেয়ে বলছিলো,
— আমিরা?

তাকদীর পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here