মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০ (২)
jannatul firdaus mithila
মার্বেলের তকতকে মেঝের মসৃণতা ছাপিয়ে রুক্ষ ঘর্ষণে এগোচ্ছে দু’জোড়া ধাতব চাকার একখানা খাবার ট্রলি। তুলছে গড়গড় শব্দ! নিরবতার নির্মলতায় ডুবে থাকা প্রশস্ত করিডরে ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে ধাতব চাকার রুক্ষ শব্দ! ধীরে ধীরে সে শব্দ ক্ষীণ হচ্ছে। এগোচ্ছে সপ্তদশীর কক্ষের পানে। একজোড়া গৌরবর্ণা নরম হাত শক্ত করে চেপে রেখেছে ট্রলির কাঁধ। হাতদুটোর মালিক নিজ শক্তির কামাল দেখিয়ে মৃদু ধাক্কায় ঠেলে আনছে নির্জীব ট্রলিটাকে। তার বিবর্ণা মুখখানায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট! গৌরবর্ণা বিদেশি গায়ের ত্বকে ভাটি পড়েছে বেশ। তার গায়ে একখানা মলিন মেইড ড্রেস। সম্পূর্ণ কালো রঙা একখানা ফ্রক, যার দৈর্ঘ্য পায়ের টাখনু ছুঁই ছুঁই। ফ্রকের পেটের ধারে আবার খোঁচা খোঁচা সফেদ রঙা সুতোর কাজ, বোতামও লাগিয়েছে বেশক’টা। তৈরী করেছে কৃত্রিম পকেট! তরুণীর হলদেটে সোনালী রঙা চুলগুলো পোনিটেল করে রাখা। মাথার ওপর থেকে সফেদ রঙা ছোট স্কার্ফ পেঁচিয়ে ঘুরিয়ে এনেছে পোনিটেলের নিচে। সে যেন পুরনো ব্রিটিশ আমলের গৃহপরিচারিকা! তরুণীর মুখাবয়বে তেমন কোনো উজ্জ্বলতা নেই। পায়ের গতি বড়ো ক্ষীণ। মলিন মুখে গন্তব্যস্থলের নিকট এসে পাদু’টো থামাতেই তার পথ আটকালো দু’জন কক্ষরক্ষী। বলিষ্ঠ পুরুষদ্বয় কেমন সরু চোখে তাকিয়ে আছে তরুণী মিলার পানে। তাদের চোখদুটোতে একরাশ জিজ্ঞাসা! মুখগহ্বরের জিভের উপস্থিতি না থাকায় মানব দ্বয় চোখ দিয়েই জেরা করছেন মেয়েটাকে। অভ্যন্তরে ঘাবড়াল মিলা। মলিন মুখখানায় টানলো কপট শুদ্ধতার ছাপ। নতমুখে খানিক ঢোক গিলে শুধালো,
“ মুনলাইটের খাবার নিয়ে এসেছি! চিন্তা করবেন না, মনস্টারের পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী এ খাবার চেখে দেখা হয়েছে।”
যথার্থ উত্তর পেয়ে তক্ষুনি দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়ালেন দেহরক্ষী দু’জন। আলগোছে তীক্ষ্ণ নজর জোড়া হটালেন তরুণীর ওপর থেকে। তটস্থ তরুণী ফের গতি টানল পায়ের। ধীরেসুস্থে ট্রলি ঠেলে আলগোছে ঢুকল কক্ষে। আনমনা দৃষ্টি জমিন হতে হুট করে উপরে উঠতেই এক অদৃশ্য ঝটকা খেল মিলা। চোখদুটো তার অজান্তেই ছুঁয়ে নিলো কপাল। বিস্ময়ে দুরত্ব বাড়ল গোলাপের পাপড়ির ন্যায় তুলতুলে অধরযুগলে। তার বিস্ময়াহত দৃষ্টিযুগল সম্মুখে নিবদ্ধ! পাঁচ দুরত্বের মেঝেতে অবহেলিত ফুলের শেষ পাপড়ির ন্যায় পড়ে আছে মাহি। নিশ্বাস চলছে কি-না কে জানে! মিলা বিচলিত হলো। এক অজানা ভয়ে মুচড়ে উঠল তার বুক। হাত-পা দু’টো হতবিহ্বলতায় হারিয়েছে কর্মক্ষমতা। সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে হতভম্বতার রেশ। সে-ই রেশ কাটতে লেগে গেল প্রায় মিনিট দুয়েক। অতপর তরুণীর সম্বিৎ ফিরতেই সে ছুট লাগাল মাহি’র পানে। দু-লাফে এগিয়ে এসে তক্ষুনি হাঁটু গেঁড়ে বসল অচেতন সপ্তদশীর মাথার পাশে। দু’হাতে তড়িঘড়ি করে মাহি’র মাথাটা আলগোছে নিজের কোলে তুলে নিয়ে, অস্থির মানবী কেমন বিচলিত কন্ঠে ডাকল,
“ মুনলাইট? মুনলাইট শুনতে পাচ্ছো? কি হলো তোমার?”
মিলা বড়ো অস্থির! মেয়েটার এহেন অবস্থায় তার নিজেরই নিঃশ্বাস আঁটকিয়েছে গলার কাছে। অস্থিরতায় কাঁপছে বুক! অসহায়ত্ব ছেয়ে গিয়েছে সম্পূর্ণ মুখাবয়বে। কাকে ডাকবে সে? কাকে বলবে সাহায্যের কথা? তরুণীর উচাটন ভাব বাড়ছে ক্রমশ। অস্থিরতায় স্বভাব বশত কামড়াচ্ছে ঠোঁট! হন্যে চোখে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই হুট করে দৃষ্টি আটকালো খাবার ট্রলির দিকে। তৎক্ষনাৎ তরুণীর ফাঁকা মস্তিষ্ক বোধহয় কার্যক্ষমতা বাড়াল। বিচক্ষণী কায়দায় তার নিকট প্রস্তাব ছুড়ল —
“ মেয়েটার মুখে পানির ঝাপ্টা দেয়া উচিত।”
যে-ই ভাবা, সে-ই কাজ! বিচলিত মিলা তৎক্ষনাৎ অচেতন সপ্তদশীর ক্ষুদ্র মাথাটা নিজ থেকে নামালো। অতঃপর কোনরূপ কালবিলম্ব না করে তক্ষুনি হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছালো ট্রলির দ্বারে। একহাতে পানিভর্তি গ্লাসখানা তুলে এনে ফের শরীর ঘুরিয়ে ছুটে এলো মাহি’র কাছে। ক্ষুদ্র দেহটা বড্ড কাঁপছে তার। হাতদুটোর অবস্থাও বেগতিক! তবুও সাহসী তরুণী হার মানেনি। ডানহাতের তিনটে লম্বা আঙুল একযোগে পানিভর্তি গ্লাসে ডুবিয়ে অচেতন সপ্তদশীর মুখে ঝাপটা দিতে লাগল বেশক’বার। কিন্তু কান্ড দেখো! সপ্তদশীর গভীর নিদ্রা যে ভাঙছেই না। মিলার উচাটন বাড়ল ফের। সরু দৃষ্টে একপলক তাকাল হাতে থাকা গ্লাসের পানে। অতঃপর মেয়েটার ওপর কোন ভূত চাপলো কে জানে! সে কেমন বোকার ন্যায় পানিভর্তি গ্লাসটা সম্পূর্ণ উল্টে ধরল ঘুমন্ত মাহি’র মুখের ওপর। আর ওমনি এক পশলা পানির বহর আছড়ে পড়ল সপ্তদশীর নরম মুখপানে। এরূপ কান্ডে মাহি’র ঘুমন্ত মস্তিষ্ক বোধহয় মুহুর্তেই সচল হলো। বদ্ধ চোখদুটো ধরে নিলো আবারও অতীতের রূপ! মস্তিষ্কে বোঝাল — বৃষ্টি পড়ছে। তক্ষুনি চৈতন্য ফিরল সপ্তদশীর। মনের কোণে জমে থাকা ভয়েরা বুঝি লাফিয়ে উঠল একযোগে। মেয়েটা কেমন চোখ খিঁচে রেখে হড়বড়িয়ে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল,
“ না! চলে যান, চলে যান আপনি। আসবেন না আমার কাছে। আমি….. ”
বাকিটা ঠোঁটের আগায় এসে আনমনেই আঁটকে গেল মাহি’র। চোখের পর্দা সরিয়ে সম্মুখে তাকাতেই ধ্যান ফিরল তার। ঘোলাটে দৃষ্টি অতি পরিচিত মানুষটার নির্মল মুখখানার ওপর পড়তেই থমকায় সপ্তদশী। ভয়ের আশঙ্কায় ভাটি পড়ল কিছুটা। নেত্র হলো ছলছল! কাঁপা কাঁপা বদনখানিতে একটু-আধটু নজর বুলিয়ে নেয় সপ্তদশী। বোঝার চেষ্টা চালায় — তার বর্তমান উপস্থিতি। এদিকে মিলা কেমন হতবাক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। কপালে পড়েছে গোটাকতক ভাঁজ! দ্বিধায় জর্জরিত সপ্তদশীর নরম কাঁধে আলগোছে হাত ঠেকিয়ে, সে কেমন সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ আর ইউ্য ওকে মুনলাইট?”
মনের কথা গিলতে পারার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে সপ্তদশীর। যে ক্ষমতার জেরে সে এখনো সবার কাছ থেকে লুকিয়ে এসেছে গত তিনবছর আগের সে-ই অভিশপ্ত দিনটির কথা। মাহি আজও তাই করল! আলগোছে ঢোক গিলে হজম করে নিলো নিজ মনের রহস্য। মুখাবয়বে কপট ভাব জড়িয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
“ হুম!”
শঙ্কিত মিলা! কুঁচকে নিয়েছে ভ্রুযুগল। কপালের চামড়া আগের চেয়ে আর-ও খানিকটা গুছিয়ে গেল তার। মুখাবয়বে ফোটালো সন্দিগ্ধতার ছাপ। কন্ঠে একরাশ সন্দিহান ভাব বজায় রেখে মেয়েটা আচমকা জিজ্ঞেস করে বসে,
“ সত্যি?”
নিরবে মাথা ঝাকায় সপ্তদশী। ধীরে ধীরে চিবুক নামিয়েছে কন্ঠায়। তার ওমন প্রসঙ্গ এড়ানোর বিষয়টা বোধহয় ভালো লাগল না মিলার। মেয়েটা কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টে এখনো তাকিয়ে আছে। হয়তো বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে সপ্তদশীর এরূপ বাহানার কারণ!
ঘড়ির কাঁটারা জানান দিচ্ছে — বেলা ১০টা বেজে ১২ মিনিট! পেন্টহাউজের লাউঞ্জে আপাতত ভুমিকম্প হচ্ছে। তবে সে ভুমিকম্প প্রকৃতির নয় বরং শ্যাডো মনস্টারের। বেপরোয়া লোকটার আজ কি হয়েছে কে জানে! ভোরের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথার র ক্ত গরম হয়েছে ৪০ ডিগ্রির ওপরে। পান থেকে সামান্য চুন খসলেই চালিয়ে যাচ্ছেন ভুমিকম্প। পেন্টহাউজ ভর্তি গার্ডস এবং মেইডস বেচারারা আপাতত ভয়ে কুণ্ঠিত। হাউজ চিফ এলেক্সের নির্দেশে সবাই অবস্থান করছেন — দ্য শ্যাডো মনস্টারের নাগাল হতে দশ হাত দুরত্বে।
নিরবতায় মুদে থাকা প্রশস্ত করিডরখানা কিছুক্ষণ আগ অব্ধি নিস্তব্ধ থাকলেও আপাতত সেথায় ছড়িয়ে পড়েছে একজোড়া দাম্ভিক কদমের ধুপধাপ শব্দ। পদযুগলের মালিক আজ বড্ড উত্তপ্ত! মুখাবয়বে সে-কি রাগ তার। রোজ কায়দা করে ক্লিনশেভ করা দৃঢ় চোয়ালখানা যেন ধারালো ব্লেডের ন্যায় চকচক করছে। নিখাঁদ সৌন্দর্য্য মন্ডিত বাদামী চোখদুটোয় যেন আগুন লেপ্টে আছে। গোছালো কপালের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে কুঞ্চিত ভ্রু-দ্বয়। মুগ্ধ হাঁটছে! তার পাদু’টোর ধুপধাপ শব্দও যেন জানান দিচ্ছে — যুবক আজ বড়ো উত্তপ্ত। তার বলিষ্ঠ দেহে আঁটসাঁট হয়ে আঁটকে আছে একখানা ফিনফিনে কালো রঙা শার্ট। শার্টের হাতা দুটো গোটাতে গোটাতে এগোচ্ছে মুগ্ধ। ফলে উম্মুক্ত হয়েছে তার ট্যাটু শোভিত শক্তপোক্ত হাতদুটো। যুবকের ডান কানে একখানা এয়ারপোড। ওপাশ থেকে কেউ বুঝি মিনমিনে স্বরে বলে যাচ্ছে কিছু। অথচ রূঢ় মানবের সেদিকে পাত্তা নেই। তার অবচেতন বেয়াদব মনটা বারবার কুপ্রস্তাব দিয়ে বলে যাচ্ছে,
“ মেয়েটা এখন কি করছে? একটু চোখের দেখা দেখে আসা উচিত নয় কি?”
মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া এহেন কুপ্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করছে মনস্টারের উত্তপ্ত মস্তিষ্ক! ধিক্কার দিয়ে তাকে বারবার বলছে,
“ লজ্জা করে না? স্বয়ং রুশদী কিং হয়ে একমুখে দুধরণের কথা বলতে! ছিহঃ লোকে শুনলে কি বলবে?”
মস্তিষ্কের এরূপ ধিক্কার যেন সঙ্গে সঙ্গে গায়ে লাগল মনস্টারের। কঠোর হলো হৃদয়! নিজের উপচে পড়া হেলেদুলে আবেগের রশিতে টান বসিয়ে, জনাব শক্ত হলেন পরক্ষণেই। সিদ্ধান্ত নিলেন — মেয়েটাকে দেখবেনা। মোটেও দেখবেনা! মুগ্ধ যখন নিজ ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তখনি এয়ারপোডের ওপাশ থেকে ভেসে এলো কোনো এক জনৈকের কন্ঠ!
“ মনস্তার! তাহলে কি বলেন? ডিল ফাইনাল করব?”
ভাবনার ডোরে আকস্মাক বাগড়া পড়তেই কপালের রগ ফুলল রূঢ় মানবের। চোয়াল তুলল কটমট শব্দ! সে তক্ষুনি কটমটিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বলে বসল,
“ ফা’ক অফ বাস্টার্ড!”
থতমত খেলেন জনৈক! কিসের ভিত্তিতে কি উত্তর পেল তা ভাবার আগেই ওপাশ থেকে টুট টুট করে ডিসকানেকট হলো কল। জনৈক কেবল হা করে তাকিয়ে রইলেন ফোনের স্ক্রিনের পানে।
পেন্টহাউজের বিস্তৃত এবং রাজকীয় ডাইনিং রুমের সে-কি অপরুপ সৌন্দর্য! মেঝে জুড়ে চকচকে কাঁচের ফ্লোর, সিলিংয়ে ঝুলছে স্ফটিকের বিশাল ঝাড়বাতি। পুরো কামরা জুড়ে বিশালাকৃতির রাজকীয় ওক কাঠের ডাইনিং টেবিল। টেবিলের দু’ধারে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছেন পুরুষ মেইডস, করছেন মনস্টারের অপেক্ষা! প্রায় মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ডাইনিংয়ের স্বচ্ছ কাঁচের মেঝেতে পা পড়ল মনস্টারের। গটগটিয়ে হেড অফ দ্য চেয়ারের পানে এগোচ্ছেন তিনি। একজন দক্ষ মেইড তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে নতমুখে চেয়ার টেনে দিলেন আলগোছে। দাপুটে মনস্টার বসলেন সেথায়। পাশ থেকে আরেকজন গার্ড তক্ষুনি এগিয়ে এসে একখানা সফেদ রঙা রুমাল বিছিয়ে দিলেন মনস্টারের কোলে, আরেকজন তার চেয়ে একধাপ এগিয়ে! কাঁপা কাঁপা হাতে বেশ দ্রুততার সাথে তুলে দিলেন সম্মুখের প্লেট, চামচ। নিজেদের কাজে পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে পিছু হটলেন তারা। পরবর্তীতে কিচেন থেকে সারিবদ্ধভাবে একযোগে এগিয়ে এলেন বেশ কিছু মহোদয়। প্রত্যেকের হাতে নানান ধরনের কুইজিন। দেশি-বিদেশি, কন্টিনেন্টাল! মনস্টার কখনোই বলেননা তিনি কোনটা খাবেন, যার দরুন আলাদা খাটুনি খেটে বেচারারা বানিয়ে বসেন নানান ধরনের কুইজিন।
ইতালিয়ান শেফ আজ এক নতুন আঙ্গিকে বানিয়েছেন রিসোট্টো। তিনি আগ বাড়িয়ে এগিয়ে এসে মাথা ঝুঁকে দাঁড়ালেন। অনুমতি চাইবার প্রয়াসে নতমুখে বললেন,
“ মনস্তার! আপনাকে একটু রিসোট্টো দিব?”
সহসা কটমট দৃষ্টি তুলল মুগ্ধ! মাথাভর্তি উত্তপ্ত আগুনে ঘি পড়ল কোনো কারণ ছাড়াই। রূঢ় মানব কেমন দাঁত খিঁচে তক্ষুনি নিজের বাহাতের শক্তপোক্ত পাঁচ আঙুলের ছাপ বসাল বেচারা রন্ধনশিল্পীর ফোলা ফোলা গালে। এহেন হুটহাট আক্রমণের আকস্মিকতায় সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে পড়লেন বেচারা শেফ। সঙ্গে নিয়ে পড়লেন নিজের ওতো সাধের রান্নাগুলো! এদিকে রূঢ় মানব কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে গর্জন তুলে বলল,
“ খেতে যেহেতু বসেছি, তাহলে দিয়ে দিবি। আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করার কি আছে বাস্টার্ড?”
এহেন গর্জনে তটস্থ সবাই। এলেক্সও কেমন গা বাঁচিয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ হাত দুরত্বে। মনস্টার হিসহিসিয়ে যাচ্ছে! হাত বাড়িয়ে টেবিলের স্বচ্ছ কাঁচের ওপর পড়ে থাকা ফর্কটা তুলে নিলো আলগোছে। পরক্ষণে ফের গর্জে বলল,
“ খাবার দেয়ার জন্য আলাদা করে বলতে হবে বাস্টা’র্ডস?”
সহসা আঁতকে ওঠেন সবাই। স্বয়ং ক্ষিপ্ত মনস্টারের সম্মুখে যাবার মতো শক্তি পাচ্ছে না বেচারাদের কদম তবে না গেলে যে প্রাণ সংশয় বাড়বে বৈ কমবে না! এহেন চিন্তার পরিক্রমায় রাশিয়ান শেফ এগিয়ে এলেন গুটিগুটি পায়ে। হাতে তার একখানা খাবার ডিশ! সেথায় স্যালেডের মাঝে ডুবে আছে এক টুকরো স্ট্যাক, সঙ্গে ম্যাশড পটেটো। বেচারা এগিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা হাতে খাবারটুকু সার্ভ করতে উদ্যোত হলেন। তবে ওমাহ! এবারে যে তার সঙ্গে ঘটল আরও ভয়ংকর কিছু! নির্দয় মানব কেমন দাঁতে দাঁত পিষে তক্ষুনি হাতে থাকা তীক্ষ্ণ দাঁত সম্পন্ন ফর্কটা এক ঝটকায় ঢুকিয়ে দিলো রাশিয়ান শেফের বাহাতের কব্জিসন্ধি বরাবর। এহেন আকস্মিক ঘটনায় একমুহূর্ত স্থবির রইলেও পরমুহূর্তে এক বিকট চিৎকারে দূরে সিটকে পড়লেন বেচারা রাশিয়ান শেফ। বেচারার আহত হাতখানা থেকে গলগলিয়ে বেরুচ্ছে লোহু। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেচারার বিকট আত্ম চিৎকার। তবে সে চিৎকারে আচমকা রুখ পড়ল মনস্টারের তেজী হুংকারে!
“ আওয়াজ নিচে! আরেকবার চিৎকার দিলে একেবারে মা থা আলাদা করে দিব।”
সহসা দাঁতের রুষ্ট চাপায় ঠোঁট আঁকড়ে ধরেন বেচারা শেফ। যথাসম্ভব নিজের উপচে পড়া কান্নাগুলো আঁটকে রেখে গোঙাচ্ছেন তিনি। অথচ মনস্টার কেমন কটমট করছে দেখো! শক্ত হাতে নিজের ঘাড় ডলে দাঁত কিড়মিড় করে আওড়াচ্ছে,
“ আমার অনুমতি ছাড়া আমার পাতে খাবার সার্ভ করার সাহস পেলি কোথায় বাস্টা’র্ড? প্রাণের মায়া নেই তোদের?”
দ্বিধায় পড়লেন বাকিরা। আকাশের রঙের চাইতেও অতিদ্রুত রঙ বদলায় মাফিয়া মনস্টারের মন। কখন কোনটা বলবেন, করবেন — সে সিদ্ধান্ত যেন তার একারই। এলেক্স এবার সুযোগ বুঝে এগিয়ে আসে দু-কদম। মাথাটা বরাবরের ন্যায় নুইয়ে রেখে শান্ত কন্ঠে আওড়ায়,
“ মনস্তার! সাউথ কোরিয়ার ডিল এখনো প্যান্ডিং। আমার মনে হচ্ছে এবার আমার নিজের যাওয়া উচিত!”
নাকের পাটা ফুললো মুগ্ধের। মসৃণ ললাটের চামড়ার অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা রগগুলো ফুলে উঠল ধপধপিয়ে। ট্যাটু শৈলীতে অঙ্কিত শক্তপোক্ত হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হলো নিমিষেই। চোয়ালের রেখা হলো টানটান। যুবক তক্ষুনি উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। বলিষ্ঠ দেহ আচমকা চেয়ার ছাড়তেই নির্জীব চেয়ারখানা দুলে উঠল বেশ। সেদিকে থোড়াই পাত্তা দিবে মনস্টার! সে উল্টো কটমট কন্ঠে গর্জন তুলে বলল,
“ জেট রেডি কর!”
আঁতকে উঠে এলেক্স! মনের কোণে একরাশ সংশয় নিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে বসে,
“ মনস্তার! আপনি…. ”
বাকিটা বলার ফুরসত হয়নি এলেক্সের। তার আগেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মনস্টারের হুংকার!
“ আই সেইড, গেট দ্য জেট রেডি!”
তুলতুলে ফোমে ভরা বিন ব্যাগে গা ছড়িয়ে বসে আছে মুগ্ধ! ফোমের আড়ালে দেবে আছে তার বলিষ্ঠ দেহ। মাথাটা হেলে আছে পেছনে। শরীরের ভঙ্গিমা বড্ড এলোমেলো তার। একপা হালকা গুটিয়ে রাখা, তো আবার অন্যপা ছড়িয়ে আছে অন্যত্র। বাহাতটা অবহেলিত আকারে ঝুলছে ব্যাগের পাশে। বাহাতের কনুইয়ের অভ্যন্তরীণ মাংসল জায়গা হতে নির্বিকারে চুইয়ে পড়ছে লোহু। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেশকিছু ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, শূন্য কাঁচের ছোট ছোট শিশি। যুবকের ঠিক সম্মুখে দাঁড় করানো একখানা টেবিল। যেথায় এলোমেলো ভঙ্গিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বিদেশি এলকোহলের বোতল। তন্মধ্যে সবচেয়ে স্ট্রং এলকোহলের কাঁচের বোতলখানা মুঠোয় চেপে রেখেছে মুগ্ধ। ক্ষনে ক্ষনে বোতলের ডগায় বসাচ্ছে চুমুক! সদ্য ড্রা গ স নেওয়ায় শরীরটা বড়ো দূর্বল লাগছে তার। মস্তিষ্ক চলছে ধীর গতিতে। যুবক চোখবুঁজে মাথা হেলিয়ে রেখেছে। পরনের শার্টখানার সবগুলো বোতাম হা করে খুলে রাখা! ফলে ঘর্মাক্ত লোমহীন পেটানো বক্ষ স্পষ্ট দৃশ্যমান। মুগ্ধ যখন নিজ স্বস্তিতে নিগূঢ়ভাবে মত্ত ঠিক তখনি তার কর্ণকুহরে হুট করে ভেসে এলো এক অতিপরিচিত রিনরিনে কন্ঠ!
“ আপনি আবারও ড্রা গ স নিয়েছেন?”
আচমকা চোখদুটোর পর্দা সরালো মুগ্ধ। শিথিল কপালের চামড়া সামান্য গুছিয়ে রয়েসয়ে ঘাড় সোজা করে তাকাল সম্মুখে। তার ঝাপ্সা দৃষ্টে ধরা পড়েছে সপ্তদশী! অভিমানীনি নাক ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। যুবক হাসল! ক্যানাইন দাঁতের রুষ্ট স্পর্শে পিষ্ট করল পিয়ার্সিং করা ঠোঁটের অংশ। সম্মুখে আলগোছে বাহাত খানা বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে বলল,
“ কাছে আয় চাশমিস!”
অভিমানীনির অভিমানের পারদ বড্ড উঁচু। অতো সহজে গলল না যুবকের ডাকে। যুবক ঠায় বাড়িয়ে রেখেছে হাত। ধীরে ধীরে কাত করছে ঘাড়। শান্ত কন্ঠে আবারও বলল,
“ কাছে আয় পিচ্চি!”
সহসা অভিমানীনির রাগী চোখদুটো আছড়ে পড়ল যুবকের পানে। মুখখানায় কৃত্রিম রাগী ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে সে আলগোছে এগিয়ে এসে চেপে ধরল মুগ্ধের বাড়ন্ত হাত। ঠিক তখনি এক হেঁচকা টানে মেয়েটাকে নিজের উম্মুক্ত বক্ষের ওপর আছড়ে ফেলল মুগ্ধ। আশ্চর্য! সপ্তদশী ভড়কায়নি। উল্টো চোখেমুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব ফুটিয়ে যুবকের বুক থেকে আলতো করে সরে এসে বসল তার বাড়িয়ে শক্ত উরুর ওপর। মুগ্ধ কেমন নিষ্পলক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। সপ্তদশী মুচকি হাসছে! গভীর দৃষ্টে অবলোকন করে যাচ্ছে সুদর্শনকে। মুগ্ধ ফের বাঁকা হাসল। মাথাটা আবারও পেছনে হেলিয়ে দিয়ে গমগমে গলায় বলল,
“ ইউ্য আর মা’ই হ্যালুসিনেশন রাইট? তোর জায়গায় সত্যি সত্যি আমার বান্দীর মেয়ে হলে এতক্ষণে তাকে ছোঁয়ার অপরাধে আমাকে তুলোধুনা করে ছাড়ত! বাট সি! ইউ্য আর লাফিং। ইউ্য নো হোয়াট? নো ওয়ান ক্যান বিট মা’ই বান্দির মেয়ে। নট ইভেন মা’ই হ্যালুসিনেশন। শি হিট’স ডিফরেন্ট।”
সপ্তদশীর প্রতিচ্ছবি এখনো হাসছে। নিজ উদ্যোগে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে চাইছে যুবকের কন্ঠনালীর অতীব সুন্দর উঁচু হাড়খানা। সেথায় আলতো করে আঙুল ছোঁয়াতেই সপ্তদশীর কব্জিসন্ধি খপ করে চেপে ধরে মুগ্ধ। তৎক্ষনাৎ ঘাড়ের হাড় সটান করে ক্ষুদ্র চোখে চাইলো মেয়েটার পানে। অতঃপর সপ্তদশীর নিগূঢ় রহস্যভেদী চাহনিতে ডুব দিয়ে নিজেকে রাঙাতে তৎপর যুবক। সিক্ত জিভ ঠেলে শুষ্ক অধরজোড়া খানিক ভিজিয়ে নিয়ে গভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ আগে তুই শুধু আমার স্বপ্নে আসতি বান্দীর মেয়ে! তাও মাঝেমধ্যে। তবে যেদিন থেকে তোকে আমি নিয়ে এলাম নিজ কারাগারে বন্দী করতে, সেদিন থেকে তুই আমার শয়নেস্বপনে, ইভেন জেগে থাকা অবস্থায় কল্পনাতেও ভাসছিস। এমনটা কেনো করছিস বান্দীর মেয়ে? হোক তুই আমার নেশা, তাতে কি? তুই যে আমার শত্রুর দূর্বলতা এটা তো চিরন্তন সত্য। তোকে কষ্ট দিলে তোর বাপ ম’রবে! তিলে তিলে ম’রবে, একটু একটু করে ম’রবে। ঠিক যেমনটা আমার শৈশব ম’রেছে, আমার মা ম’রেছে। তোকে মা’রতে এনেছি বিশ্বাস কর! আমি তোকে কষ্ট দিতে এনেছি। হ্যাঁ মানলাম — আমি ৩ বছর আগে তোর চলে যাওয়া দেখে বলেছিলাম,
— আমি আবারও ফিরব! তবে পরেরবার তোর সকল সম্পর্ক ছিন্ন ভিন্ন করে তোকে একমাত্র নিজের করে নিয়ে যাব।
তবে তখন তো জানতাম না তুই কে! জানলাম সেদিন — যেদিন প্রথম রেহানের বাড়িতে তায়েফ এহসানের মেয়েকে মা’রতে গিয়ে আমার ঘুমন্ত পিচ্চিকে দেখলাম! ঠিক একই নাকমুখ, যা আমি স্বপ্নে দেখতাম। নেশায় বুদ থাকলে দেখতাম! এসবকিছুই কি ভাগ্য পিচ্চি? এটা কেমন ভাগ্য? তুই কি জানিস? আমি কতোটা নির্দয়? আমি নিজের প্রতিশোধ নিতে তোর মতো হাজারটা নেশাকে বলিদান দিতে ন্যানো সেকেন্ডও ভাবব না। বিশ্বাস কর, ভাবব না। শুধু সমস্যা একটাই — তোকে মা’রতে গেলে হাত কাপেঁ। বুক মোচড় দেয়! ”
বাক নেই সপ্তদশীর ঠোঁটের গোড়ায়। সেথায় এবার থমথমে ভাব স্পষ্ট! যুবক থামল। চোখদুটো আলগোছে বুঁজে নিয়ে নিশ্বাস টানলো জোরালো ভঙ্গিতে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবারও চোখদুটো খুলে ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করল,
“ কল্পনা হওয়া স্বত্বেও সারাদিনে একটিবারও সামনে এলি না কেনো বান্দীর মেয়ে?”
মাহি’র চোখেমুখে আঁধার নেমেছে। চিবুক নেমেছে কন্ঠায়! মেয়েটা কেমন উদাসমুখে বলল,
“ আপনি আমায় দেখতে চাননি তাই।”
ঠোঁট পিষে হাসল রূঢ় মানব। বাহাতে আলগোছে চেপে ধরল সপ্তদশীর বাঁকানো কোমর। সেথায় মৃদু টান বসিয়ে মেয়েটাকে নিজের বড্ড কাছে এনে, তার নির্মল মুখপানে গভীর দৃষ্টে তাকাল মুগ্ধ। বাঁকা কন্ঠে বলল,
“ তুই আবার কবে থেকে আমার বাধ্য হলি? এতোবার না করা স্বত্বেও যখন-তখন সামনে চলে আসতি, আর আজ কি-না আমার এককথায় চুপসে গেলি? তা বল শুনি, কবে থেকে এতোটা বাধ্য হলি?”
সপ্তদশী নিখাঁদ চোখে চাইলো এবার। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ টেনে আওড়াল,
“ যেদিন থেকে আপনার মন আপনার অজান্তেই অবাধ্য হয়ে আমার প্রতি বাধ্যতা প্রকাশ করেছে, ঠিক সেদিন থেকে।”
মেয়েটার এহেন মোটা বাক্যে আনমনেই শরীর দুলিয়ে হেসে ওঠে মাফিয়া বিস্ট। এই প্রথম বোধহয় এতো সুন্দর করে হাসল সে। হাসির তোড়ে মুখ দিয়ে যেন মুক্ত ঝরছে। সুদর্শন হাসির মাঝেই হুট করে দৃষ্টি থমকে তাকাল মেয়েটার পানে। কিয়তক্ষন চুপ থেকে হঠাৎ বলল,
“ তোকে দেখলে ইদানিং আমার এমন লাগে কেনো চাশমিস?”
অবোধের ছাপ ফুটেছে সপ্তদশীর মুখে। কপাল গুটিয়েছে নিমিষেই। সে কেমন অবোধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ কেমন লাগে?”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০
মাফিয়া বিস্ট সময় নিলো না। তক্ষুনি মাথাটা এগিয়ে এনে আলগোছে রাখল সপ্তদশীর বুকের কাছে। সেথায় পরম শান্তিতে মুখ গুঁজে পড়ে রইল কিয়তক্ষন। নাক টেনে নিশ্বাস নিলো জোরালো। অতঃপর ভাঙা ভাঙা গলায় আওড়াল,
“ ঠিক যেমনটা প্রথম দর্শনে লেগেছিল! একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধ অনুভূতি। নাম না জানা অনুভুতি! এককথায় — সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি!”
