Tell me who I am 2 part 21 (3)
আয়সা ইসলাম মনি
ফাতিমা বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, তার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা দৃশ্যমান। বেশ ঝাঁঝালো গলায় তিনি বললেন, “মিরা যদি না বুঝাইত তাইলে আমি তো টেনশনে পা’গলই হইয়া যাইতেছিলাম। এই রকম কইরা হুট কইরা কেউ চইলা যায়, তরু?”
“হ, এখন তো দুনিয়ার সব দোষ আমার ঘাড়ে! আর তোমার ওই সোনার টুকরা জামাই যে আমারে একরকম জোর কইরা গাড়িতে তুইলা নিয়া গেল, তার বেলায় তো কিচ্ছু দেখলা না!”
“জামাইয়ের দোষ দিবি না, ছেমরি। আমি জানি, জামাই ঠিকই আসবার চাইছে, তুই-ই ড্যাং ড্যাং কইরা শহরে ঘুরতে গেছোস! সেইদিনই তো নিজেই বললি, এইবার ফারহান আসলে ঘুরবার যামু, আম্মা। সে তুমি গেলে কি আমরা ধইরা রাখতাম? তাই বইলা মাঝরাতে কেউ যায়? কত আয়োজন করছিলাম, সব জলে গেল। না জামাইটারে দেখতে পারলাম, না দুইটা রাঁইধা খাওয়াইতে পারলাম।”
“উফফ আম্মা, এমন করতেছ যেন সারা জনমের লাইগা পালাইছি। আসুম তো নাকি। কয়টা দিন ওয়েট করো না। এত হাইপার হও কেন?”
ফাতিমার বাম হাতের আঙুলগুলো তখন কোলের ওপর শুয়ে থাকা মিরার রেশমি চুলের মাঝে বিলি কাটছিল। মা-মেয়ের এই চিরায়ত রমরমা ঝগড়া শুনে মিরার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। বাইরে তখন নিশুতি রাতের ঝিঁঝি পোকার ঐকতান চলছে।
ফাতিমা এতক্ষণ তার স্বামী আকবরের যৌবনকালের নানা রোমাঞ্চকর উপাখ্যান শুনিয়েছেন। মূলত মিরা এ ঘরে এসেছিল একটা জরুরি বার্তা দিতে—কারান বলেছে সবকিছু গুছগাছ করে নিতে, তারা খুব দ্রুতই এই স্থান ত্যাগ করে শহরে ফিরে যাবে। কিন্তু ফাতিমা মিরাকে একা পেয়ে একরকম গল্পের জাল বুনে আটকে ফেলেছেন। আসলে এই বিশাল বাড়িতে এখন তারা ব্যতীত তেমন প্রাণচঞ্চল কেউ নেই, আর ফাতিমার স্বভাবটাই এমন, একটু কথা বলার মানুষ পেলে নিজের ভেতরের একাকীত্বকে শব্দের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে ভালোবাসেন।
কারান আর আম্বিয়া এই মুহূর্তে বাড়ির পেছনের আমবাগানের দিকে গেছেন নিভৃতে কথা বলতে। কারান যাওয়ার আগে মিরার গালে আলতো করে হাত ছুঁয়ে বলে গেছে, “আই উইল বি রাইট ব্যাক, সুইটহার্ট।”
মিরাও তাকে আটকায়নি। কারণ দীর্ঘ সময় দুবাইয়ে থাকার কারণে আম্বিয়া তার এই আদরের নাতিকে একদমই কাছে পাননি।
মিরা এবার শোয়া থেকে উঠে সোজা হয়ে বসল। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে ফাতিমার হাত থেকে ফোনটা নিজের হাতে নিল।
“ফারহানকে পেয়ে যে আমাদের একেবারে ভুলে গেছ, সেটা কিন্তু বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। দু-দিনে একটা বার তো কল দিয়ে খোঁজ নিতে পারতে!”
“ওমা! ছি ছি, কি যে কও না ভাবি! তোমাগো ভুইলা যামু ক্যান? এই জায়গায় নেটওয়ার্কের এমন সমস্যা যে একটা কলই যাইতে চায় না। নইলে তোমাগো তো আমি সেকেন্ডে সেকেন্ডে মিস করি, সত্যি।”
মিরা হালকা হেসে মাথার পেছনে বালিশটা একটু টেনে নিল।
“বুঝলাম। তা কি এমন বাদশাহী জায়গায় গেলে যে নেট পাওয়া যায় না? মোগল আমলের কোনো গোপন কেল্লায় নাকি?”
ফোনের ওপাশ থেকে পাহাড়ি বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ হালকা ভেসে আসছিল। তারান্নুম কিছুটা রোমাঞ্চিত গলায় উত্তর দিল, “লাদাখ না জানি কি নাম কইল ব্যাডায়। জায়গাটা কিন্তু ভয়ংকর লেভেলের বিউটিফুল, জানো ভাবি? চারপাশে শুধু ধূসর পাহাড় আর পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নাকি প্রায় এগারো হাজার ফুট উঁচুতে এই কোল্ড ডেজার্ট! আমি ফোনে সব ভিডিও শুট কইরা রাখতেছি, বাড়িতে আইসা তোমাগো সব দেখামু।”
“আচ্ছা। এখন তবে ফুললি এনজয় করো। তা কবে আসছ শুনি? আর তোমার সেই ডেডিকেটেড পারসন, ফারহান কোথায়?” মিরা বিছানায় আরেকটু আরাম করে হেলান দিয়ে বসল।
“ওই ব্যাডার কথা বাদ দাও! আমার এমন যত্ন নিতেছে যে মাঝেমাঝে আমিই বিরক্ত হইয়া যাই। ঠান্ডার জন্য একটু পরপর গরম থুকপা আর লেমন-হান্টি টি আইনা হাজির করে। কবে বাসায় নিয়া যাইবে তা তো স্পষ্ট কইরা বলে নাই, জিজ্ঞেস কইরা দেখবনে। আর শুনো ভাবি, কারান ভাইয়ের সাথে কথা হইছিল। সে বলছে এই কয়দিনে যেন নিজেদের ভালো মতন আন্ডারস্ট্যান্ড কইরা নেই। পরে বিয়ের পর যদি বলি ছেলে পছন্দ হয় নাই, তাইলে নাকি আমার পিঠের উপর আস্ত বাঁশের ছড়ি ভাঙবে! তোমার জামাইটা আস্ত খাচ্চোর, ভাবি!”
মিরার ঠোঁটের কোণ ফুঁড়ে একটা খিলখিল হাসি বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে মুখের অবয়বটা কৃত্রিম কাঠিন্যে মুড়িয়ে বলল, “হয়েছে, আমার স্বামীর আর বদনাম করতে হবে না। কিন্তু মাঝেমধ্যে কল দিয়ে এদিকের খবর নিতে আবার ভুলো না যেন। নাহলে এবার আসার পর তোমার পিঠের ছাল আমিই তুলে নিব, বুঝলে?”
“হ হ, দেখুমনে কার জোর বেশি!” তারান্নুম হাসতে হাসতে ফোনের ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকল তুব্বা। তার দুই বগলের নিচে চেপে ধরা একটি লুডুর কোট আর একটা কাচের বয়াম, যার ভেতরে প্লাস্টিকের ঘুঁটিগুলো নড়াচড়ার সাথে সাথে ঝনঝন শব্দ তুলছিল। ফাতিমা এতক্ষণ খাটের এককোণে বসে মৃদু হাসিমুখে দুই তরুণীর কথোপকথন শুনছিলেন। তুব্বার এই আচমকা আগমন দেখে তারা দুজনেই তার দিকে তাকাল।
তুব্বা ডাগর ডাগর চোখ দুটো গোল গোল করে এক গাল হেসে বলল, “নানি যখন কথার খাতা খুলছে, মনে করো মাঝরাইতেও সেই চ্যাপ্টার শেষ হইবে না! তাই চলো আমরা এখন লুডু খেলবার বই। শুনো ভাবি, আমি কিন্তু এমনি এমনি খেলুম না। প্রাচীন পারস্যের রাজারা যেমন পাশা খেলায় বাজি ধরত, আমিও তেমন বাজি ধরলাম। এইবার আমি জিতলে মেলা বড়ো একখান গিফট চাই কিন্তু!”
ফাতিমা বিছানার চাদরটা সোজা করতে করতে মুখটা জোর করে গম্ভীর করে বললেন, “হইল? আদিখ্যেতা শেষ আপনার? তা আপনার পড়াশোনা কে করবে, রানিসাহেবা? সামনে পরীক্ষা খেয়াল আছে? যাইয়া পড়তে বহেন, আমি রান্নাঘরের কাজটা সাইরা আসতাছি একটুপরই।”
তুব্বার মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা আকাশের মতো কালো হয়ে গেল। মিরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ফাতিমার খসখসে হাতের ওপর নিজের নরম হাতটা রাখল। মায়ের মতো এই হাতটার স্পর্শে অদ্ভুত প্রশান্তি আছে।
“আহা ফুপি! এতটা এক্সাইটমেন্ট নিয়ে বেচারি এসেছে, এক দান খেলেই না হয় যাক। এরপর আমি নিজে ওকে নিয়ে পড়াতে বসব। সত্যি।”
তারপর সে তুব্বাকে হাতের ইশারায় ডাকল। সে এগিয়ে আসতেই মিরা তার গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল, “আর ছোট মরিচ তুমি, বেশ চটপটে হয়ে যাচ্ছ দিনে দিনে! গিফট না হয় একটা দিব। কিন্তু পড়াশোনায় যে ফাঁকিবাজি করো, তাতে যদি পরীক্ষায় নম্বর কমে, তবে গিফটের মানও কিন্তু নিচে নামবে!”
তুব্বা চট করে বিছানার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার পরনের ফ্রকটা খাটের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। সে লুডুর ছক্কাটা হাতের তালুতে নিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “ওইটা তুমি চিন্তাই কইরো না, ভাবি! টিচার যদি হও তুমি, তাইলে আমি এক চান্সে ১০০ পাব। তাতে বামদিকের ওই ১ সংখ্যাটা না থাকলেও বা কি আসে যায়!”
ফাতিমা তুব্বার এই অতি-চালাকি মার্কা কথা শুনে তুব্বার পিঠে একটা স্নেহমাখা চাপড় বসিয়ে দিলেন। “শয়তান মাইয়া! চল, দান দে!”
ঘরের একমাত্র ল্যাম্পের আলোটাকে আর একটু বাড়িয়ে দেওয়া হলো। তিনজনে মিলে খাটের মাঝখানে গোল হয়ে বসল। শুরু হলো লুডুর ঘুঁটি চালার চিরচেনা সেই ঘরোয়া শব্দ।
শামসুজ্জামান যখনই রিভলবারটি বের করতে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই আম্বিয়ার ধারালো বঁটিটা আড়াআড়িভাবে নেমে এল। শামসুজ্জামান গগনবিদারী আর্তনাদ করে উঠলো। তার ডান হাতের চারটি আঙুল সমূলে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুলোবালির ওপর আছড়ে পড়ে জ্যান্ত কই মাছের মতো ছটফট করতে লাগল। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া উষ্ণ, গাঢ় লাল র*ক্ত আম্বিয়ার ধবধবে সাদা সুতির শাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা আম্বিয়া শামসুজ্জামানের ডান হাঁটু লক্ষ্য করে আবার এমন এক মোক্ষম কোপ দিলেন যে, তার হাঁটুর বাটি এবং লিগামেন্টগুলো ছিঁড়ে হাড় ভেঙে কুণ্ডলী পাকিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
তীব্র যন্ত্রণায় শামসুজ্জামানের চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠেছিল। সে বাম হাত দিয়ে পাশে থাকা টেবিলের ওপর থেকে আস্ত একখানা ভারী স্কচের বোতল তুলে নিল। বোতলের তলাটা টেবিলের কোণায় মেরে ভেঙে, সেই ধারালো কাচের চোখা ফলা দিয়ে আম্বিয়ার ঘাড় বরাবর মারতে গেল। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা শক্ত হাত তার বাম হাতটা ধরে ফেলল। কারানের অবয়বে কোনো উত্তেজনা নেই, চোখ দুটো নিস্পৃহ, শান্ত। কারান সেই হাতটা উল্টোদিকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে মুচড়ে দিল। ফোরআর্মের হাড় দুটো মটমট শব্দে ভেঙে চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। শামসুজ্জামান যন্ত্রণায় মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, তার মুখ দিয়ে লালা আর রক্ত ঝরতে লাগল।
ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ওসি প্রদীপ আর শৌভিক ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে, এরা সাক্ষাৎ যমদূত। শামসুজ্জামানের বাকি সাত-আটজন সশস্ত্র গুন্ডাও বঁটি আর রক্তের এই তাণ্ডব দেখে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে দেশি শটগান উঁচিয়ে ধরছিল। ওসি প্রদীপ তার চর্বিযুক্ত কোমরের চামড়ার হোলস্টার থেকে সরকারি থার্টি-টু বোরের পিস্তলটা বের করার জন্য হাত বাড়াতেই কারান তার হুডির পকেট থেকে কালো রঙের ছোট একটা ডিম্বাকৃতির গ্রেনেড সদৃশ ডিভাইস বের করল। সে ঘরের ঠিক মাঝখানে ওটা ছুঁড়ে দিল।
মেঝেতে পড়তেই ওটা বনবন করে ঘুরতে লাগল, এবং ঘরভর্তি ফিসসস শব্দে অদৃশ্য সায়ানাইড-ভিত্তিক কেমিক্যাল গ্যাস ছড়িয়ে পড়ল।
কারান আর আম্বিয়া কিন্তু একদম স্বাভাবিক, অটল রইলেন। কারণ এই চালকলে পা রাখার ঠিক আধা ঘণ্টা আগে কারান আম্বিয়ার হাতের ডেলটয়েড পেশিতে একটা ছোট সিরিঞ্জ ফুটিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু বাকি নরপশুদের সেই ভাগ্য ছিল না। বাতাস বুক ভরে নিতেই প্রথমে ওসি প্রদীপের হাত অবশ হতে লাগল। তার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বিকল হতে শুরু করায় চোখের মণি দুটো সম্পূর্ণ উল্টে গিয়ে সে ধপ করে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। শৌভিক দেয়াল ধরে কোনোমতে নিজেকে সোজা রাখার শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু ফুসফুসে সেই হাওয়া ঢুকতেই তার মস্তিষ্ক অক্সিজেনহীন হয়ে গেল, সে বমি করতে করতে লুটিয়ে পড়ল। চালকলের কোণায় কোণায় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শামসুজ্জামানের গুন্ডা-পান্ডাগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই একে একে লাটিমের মতো ঘুরে মাটিতে ধপাস ধপাস করে পড়তে লাগল। মেঝেতে নিজের আঙুল আর হাড় হারিয়ে গোঙাতে থাকা শামসুজ্জামানও এক ঝটকায় নিস্তেজ হয়ে গেল।
ঘরের ভেতর এখন কেবল দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে। একজন কারান চৌধুরি, আর অন্যজন র*ক্তভেজা শাড়ি পরা আম্বিয়া জমাদ্দার। কারান তার সিল্কের রুমাল দিয়ে নিজের বুটের ওপর লেগে থাকা র*ক্তের একটা ফোঁটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মুছল। তারপর পিছনের ব্যাগের ভেতর থেকে এক গোছা মোটা নাইলনের প্যরাকর্ড দড়ি বের করল।
সে লাশের মতো পড়ে থাকা শামসুজ্জামানের বুকের ওপর ভারী বুট জুতোটা চেপে ধরে চামড়ার গ্লাভস পরা হাতটা টানটান করল। ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে গভীর, ভারী কন্ঠে বলল, “দ্য শো হ্যাজ জাস্ট বিগান, দিদা। আমার বোনটার শরীর ওরা যেভাবে ছিঁড়েছিল, ওর প্রতিটি অঙ্গ যেভাবে কেটেছিল… আই উইল মেক সিওর, এদের শরীরের প্রতিটি জয়েন্ট আমি জীবন্ত অবস্থায় আলাদা করব। এবার এদের হাত-পাগুলো শক্ত করে বাঁধার ব্যবস্থা করতে হবে। রাতটা আমাদের জন্য অনেক লম্বা, আর এদের জন্য অনেক… অনেক যন্ত্রণার হতে চলেছে।”
আম্বিয়া তার র*ক্তভেজা শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজলেন। তিনি কারানের দিকে তাকিয়ে চাপা, গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “ওগো জ্ঞান ফিরতে আর কতক্ষণ লাগব, মানিকচাঁদ?”
“ম্যাক্সিমাম দেড় থেকে দুই ঘণ্টা!”
আম্বিয়া বঁটিটা একপাশে রেখে চুন-সুরকি খসে পড়া দেয়ালটায় হেলান দিয়ে বসলেন।
“তাইলে শকুনের মাংস কাটার আসল খেলা এইগুলার জ্ঞান ফেরার পরেই শুরু হইব।”
কারান ততক্ষণে ঘরের ভেতর যতগুলো নরপশু অবশ হয়ে পড়েছিল, সবাইকে নিখুঁত ক্যাটস ক্র্যাডল নটে দড়ি দিয়ে হাত, পা এবং মুখ এমনভাবে বেঁধে ফেলেছে যে জ্ঞান ফিরলেও তারা এক ইঞ্চি নড়াচড়া করতে পারবে না। পুরো ঘরের মধ্যে কেবল একজন মানুষ অবিন্যস্ত অবস্থায় পড়ে রইল, সেই নর্তকী মেয়েটা।
পরবর্তী দুই ঘণ্টা সময় কারান আর আম্বিয়া ঘরের যাবতীয় ধারালো অস্ত্রগুলো এক জায়গায় জড়ো করলেন। আম্বিয়া ঘরের এক অন্ধকার কোণায় পিঁড়ি পেতে বসেছেন। তাঁর সামনে রাখা একটি প্রাচীন, মরিচা পড়া তরবারি। তিনি একটা শাণ দেওয়ার পাথরে তরবারির ফলাটা ঘষছেন। অন্ধকারের বুকে আগুনের ফুলকি ছুটে যাচ্ছে, আর সেই ক্ষণিক আলোয় তার মুখের হিংস্রতা মূর্ত হয়ে উঠছে।
ওদিকে কারান ব্যাগ থেকে একটি ট্যাকটিক্যাল টর্চার কিট বক্স আর ফ্ল্যাস্ক বের করল। ফ্ল্যাস্ক থেকে কফিটা ওদেরই টেবিলের উপর রাখা গ্লাসে ঢেলে এক চুমুক ব্ল্যাক কফি গলায় ঢালল।
ঠিক তখনই মেঝের একপাশ থেকে একটা মৃদু গোঙানির শব্দ শোনা গেল। ওষুধের তীব্রতা কেটে যাওয়ায় ঘাতকদের দু-একজনের আঙুল নড়ে উঠল, আর একই সাথে সেই নর্তকী মেয়েটারও জ্ঞান ফিরে এলো।
মেয়েটা চোখ মেলে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করল। যখনই তার চোখে পড়ল চারদিকের র*ক্ত, বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা শামসুজ্জামানের আঙুলগুলো আর হাত-পা বাঁধা জল্লাদদের অবয়ব, সে আতঙ্কে ককিয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই যখন সে দেখল তার ঠিক দু-হাত দূরে লম্বা, চওড়া কাঁধের কারান চৌধুরি নিস্পৃহভাবে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তখন তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মেয়েটা ডুকরে কেঁদে ফেলল।
মেয়েটা কাঁপতে কাঁপতে মুখ ফুটে কিছু বলার জন্য ওষ্ঠাধর আলগা করতেই কারান শুধু একটা শব্দ ছুঁড়ে দিল, “কলগার্ল?”
মেয়েটা পাগলের মতো ডানে-বামে মাথা নাড়াতে লাগল। তার চোখের জল গালের সস্তা মেকআপ ধুয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। সে হাত দুটো জোড় করে বলল, “না, খোদার কসম না! আমারে তারা জোর করে তুলে আনছে। আমার বুড়া বাপ-মারে মেরে ফেলার ভয় দেখাইয়া এই নরকে আনছে। আমি কিচ্ছু জানি না। আল্লার দোহাই, আমারে মা’রবেন না!”
কারান হাঁটুর উপর ভর দিয়ে তার মুখের ওপর ঝুঁকে এলো। ফিসফিস করে বলল, “আপনি এখানে কখনো আসেননি, মিস। মনে থাকবে?”
কারানের হুমকির ভাষা মেয়েটা এক চান্সে বুঝে গেল। মেয়েটা দ্রুত উপর-নিচ মাথা নাড়ল। সে উঠে একছুটে দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই দরজার মুখে এসে দাঁড়ালেন আম্বিয়া জমাদ্দার। তার হাতে তখন সেই সদ্য শাণ দেওয়া চকচকে তরবারি।
বৃদ্ধাকে ওভাবে যমের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা ভয়ে আবার কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পড়ল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আম্বিয়া তরবারিটা একপাশে নামিয়ে রেখে মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন, এবং পরম মমতায় তার জট পাকানো চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। মেয়েটার চোখ থেকে এবার আর আতঙ্কের নয়, পরম আশ্রয়ের এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
আম্বিয়া নিজের দুই হাত থেকে নিরেট সোনার তৈরি, প্রাচীন নকশার দুটো মোটা বালা খুলে মেয়েটার অবশ হাতের তালুর ওপর জোর করে গুঁজে দিলেন।
“শোন কন্যা, তেজস্বিতাই নারীর আসল আভিজাত্য। নিজের আত্মা আর এই অমূল্য শরীরটারে কক্ষনো সস্তা হইতে দিস না। নিজের ব্যক্তিত্বের ওজন এতখানি ভারী আর সুউচ্চ করবি, যেন খোদ তোর সোয়ামীও তোর অঙ্গে হাত ছোঁয়াইবার আগে দশবার আত্মজিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হয়, এই মহার্ঘ্য রত্ন স্পর্শ করবার যোগ্যতা তার আছে কিনা! মওত আইলে মরবি, আখেরি দম তক লড়াই ছাড়বি না। তবুও নিজের এই গা-গতর কাউরে মাগনা বিলাইয়া তামশা দেখাইতে যাইস না!”
বলতে বলতে আম্বিয়া পরম মমতায় মেয়েটার গায়ের অবিন্যস্ত শাড়িটা টেনে টেনে তার কাঁধ আর কোমরের উন্মুক্ত অংশগুলো ঢেকে দিলেন। পুরুষতান্ত্রিক লালসার এই ভাগাড়ে মেয়েটি যে এমন এক মাতৃত্বের স্পর্শ পাবে, তা তার কল্পনাতীত ছিল। সে তীব্র আবেগে উদ্বেলিত হয়ে আম্বিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আম্বিয়াও তার পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলেন। এরপর মেয়েটি অশ্রুসজল চোখে, এক বুক কৃতজ্ঞতা নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মেয়েটি মিলিয়ে যেতেই আম্বিয়ার দৃষ্টি পুনরায় ধারালো হয়ে উঠল। তিনি ধীর পায়ে এসে ঘরের মাঝখানে রাখা একটি জরাজীর্ণ কাঠের চেয়ারে পা তুলে বসলেন। তার বসার ভঙ্গিটা ছিল কোনো প্রাচীন সাম্রাজ্যের দণ্ডদাত্রী রানির মতো। তিনি এক খিলি জর্দা-পান মুখে পুরে চাবাতে লাগলেন।
ততক্ষণে মেঝেতে পড়ে থাকা নরপশুদের জ্ঞান ফিরে এসেছে। মুখের ভেতর কাপড় গুঁজে শক্ত করে প্যারাকর্ড দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকায় তারা কেবল ‘উম উম’ শব্দে ছটফট করছে।
কারান এবার এগিয়ে এসে খুব সুন্দর করে, এক হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে শৌভিকের ঠিক সামনে বসল। কারানের ডান হাতে তখন ঝুলছে সেই কুঠারটি। শৌভিকের তীব্র মদের নেশা মূহুর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেছে।
কারান তার দিকে কিছুক্ষণ নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে রইল। যেন কোনো পরম প্রিয়জনকে আদর করছে, এমন ভঙ্গিতে কারান শৌভিকের অবিন্যস্ত চুলের মধ্যে নিজের বাম হাতের আঙুলগুলো বোলাতে থাকল। তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলতে থাকল, “ছোটবেলায় তরু একবার আমার চুলে এভাবে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল, বুঝলি? আমি তখন বেডে ঘুমাচ্ছি। আমার একটা সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম আছে, খুব অল্প নাড়াচাড়াতেও আমার ঘুম ভেঙে যায়। ও যখন আলতো করে বিলি কাটছিল, আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। ও কিন্তু মোটেও অন্য কোনো ইন্টেনশন নিয়ে আমার চুলে হাত দেয়নি। শি জাস্ট স মাই ফেস, দেখল ভাইয়া ঘুমাচ্ছে, তাই তার অশান্তির ঘুমটা শান্তির করার জন্য ও চুলে হাত বুলিয়েছিল। কিন্তু আমি কী করেছি জানিস? হুট করেই উঠে ওর হাতটা খপ করে ধরেছি। আর এত জোরে স্কুইজ করেছিলাম যে, ওর ফরসা নরম চামড়াটা একেবারে র’ক্তবর্ণ হয়ে লাল হয়ে গিয়েছিল। আই ওয়াজ সো ইরিটেটেড দেন। পরে যখন ওর চোখের কোণে হালকা পানি দেখলাম, আই রিয়ালাইজড মাই মিস্টেক। আই ফেল্ট সো ড্যাম গিল্টি, যদিও মুখে কখনো আমি সরি বলিনি। তবে সেই ভুলের তোফা হিসেবে পরদিনই আমি ওর জন্য একটা পার্সিয়ান ক্যাট কিনে এনে দিই। কারণ আমি জানতাম, ও পশুপাখি বড্ড ভালোবাসে। অথচ বিড়ালের লোমে আমার মারাত্মক অ্যালার্জি আছে, তাও এনে দিয়েছিলাম। আর ওই বোকা মেয়েটা কী ভেবেছিল জানিস?”
গল্পের এই পর্যায়ে শৌভিক নিজের হাত খোলার জন্য পা দুটোকে মেঝেতে অনবরত আছড়ে যাচ্ছিল।
কারানের কপালে একটা সূক্ষ্ম কুঞ্চন দেখা দিল। সে এত সুন্দর, ইমোশনাল একটা মেমোরি শেয়ার করছে, আর এই কীটপতঙ্গটা সেখানে ডিস্টার্ব করছে?
কারান অকস্মাৎ কুঠারটা দিয়ে শৌভিকের ডান পায়ের গোড়ালির ওপর একটা ক্ষিপ্র কোপ বসিয়ে দিল। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে টলমল করে র*ক্তের ধারা মেঝেতে বইতে থাকল। কারানের এই হঠাৎ আক্রমণ দেখে বাকিদের চোখ চড়কগাছে উঠল। ওদিকে আম্বিয়া নির্বিকারচিত্তে চেয়ারে বসে পানের পিক ফেললেন।
কারান কুঠারটা একপাশে রেখে একটি ধারালো সার্জিক্যাল স্ক্যালপেল বের করল। সে শৌভিকের উরুর মাঝ বরাবর চামড়া কাটতে কাটতে নিচের দিকে নামতে লাগল। ভেতরের চর্বি আর র*ক্তনালীগুলো উন্মুক্ত হতে লাগল। কারান সেই যন্ত্রণার উৎসব করতে করতেই শান্ত গলায় বলল, “আমার বোকা বোনটা ভেবেছিল ওর ওপর বিরক্ত হয়ে আমি বিড়ালটা দিয়েছি, যাতে ও আমার চুলে হাত না বুলিয়ে বিড়ালের লোমে বোলাতে পারে! শি ওয়াজ টু ইনোসেন্ট, বড্ড বেশি বোকা ছিল মেয়েটা! এরপর একদিন যখন বিড়ালটা ইনফেকশনে মা’রা গেল, আমি তখন আমেরিকাতে। ও আমাকে কল দিয়ে সে কী কান্না! ও বলল, ‘ভাইয়া, আমার সবথেকে পছন্দের একটা জিনিস আজ হারিয়ে ফেলেছি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম কী? বলল, ‘তোমার দেওয়া বিড়ালটা।’ আমি ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম, ‘আমি তো আর হারাইনি তরু, আমি আবার এনে দিব।’ অথচ আমি ভাবিনি আমার এই কথার ইমপ্যাক্ট ও ভালোবাসার দিকে টেনে নিবে…”
কারান হঠাৎ থেমে সরাসরি শৌভিকের চোখের দিকে তাকাল। শৌভিকের অশ্রুসিক্ত চোখদুটো ততক্ষণে পুরোপুরি র’ক্তাভ হয়ে গেছে। কারান উঠে দাঁড়াল।
টেবিলের ওপর একটি আধখোলা স্কচের বোতল রাখা ছিল, যাতে অ্যালকোহল রয়েছে। কারান বোতলটা হাতে নিয়ে আবার শৌভিকের সামনে এসে বসল। এবার সে স্ক্যালপেলটা দিয়ে তার বাম পায়ের প্যান্টের ওপর থেকেই মাংসটাকে এমনভাবে চারকোণা করে কাটল, যেন একটা পাপড়িযুক্ত ফুল ফুটছে। র*ক্তে নিমিষেই ভিজে গেল প্যান্টের সেই অংশ। শৌভিক মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বেঁকিয়ে বারবার শরীরটাকে ওপরে তোলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পেছনে দড়ির বাঁধন এতটাই টাইট ছিল যে তার কাঁধের জয়েন্টগুলো মটমট করে উঠছিল।
কারান এক ঝটকায় শৌভিকের প্যান্টের সেই কাটা অংশটা চামড়াসহ টেনে ছিঁড়ে ফেলল। ভেতরের তাজা, কাঁচা মাংসটা টকটক করছে। কারান সরাসরি ওই উন্মুক্ত, র*ক্তাক্ত ক্ষতের ওপর পুরো স্কচের বোতলটা উপুড় করে দিল।
বিশুদ্ধ অ্যালকোহল যখন কাটা স্নায়ু আর মাংসের সংস্পর্শে এল, তখন শৌভিকের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভেতরের র*ক্ত ধুয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু শৌভিক উরুর দিকে তাকিয়ে দেখল, মাংসের ভেতর থেকে আবার গলগল করে গাঢ় লাল র*ক্ত বেরচ্ছে।
কারান তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা আনল। তার চোখের মণি দুটো হিংস্র হায়েনার মতো চকচক করে উঠল। “তোরা আমার সেই অবলা বোনটার শরীরটা এভাবেই ছিঁড়েছিলি না? হুম? ওকে ভোগ…”
কারান বোতলটা মেঝেতে আছড়ে ভেঙে এক টুকরো কাচ হাতে নিয়ে শৌভিকের গালে চেপে ধরে বলল, “সো টেল মি, ইজন্ট দ্য গেম বিউটিফুল, শৌভিক?”
শৌভিকের চোয়াল সহ পুরো মুখটা তখন অনিয়ন্ত্রিত স্পন্দনে কাঁপছিল। কারান সেই রক্তাক্ত উরুর ওপর আঁকা পাপড়িযুক্ত মাংসের ফুলের মাঝখানেই স্ক্যালপেলের ফলাটা আবার বসাল। এবার আরও গভীরে ব্লেডটা আড়াআড়িভাবে টেনে দিল। এক নিমেষে উরুর পেশিগুলো দু-পাশে আলগা হয়ে ছড়িয়ে গেল, এবং সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে নতুন গাঢ় র*ক্তধারা নেমে এসে মেঝের ধুলোবালিতে মিশে গেল।
ঠিক তখনই কারানের চোখ পড়ল এককোণে রাখা ঘাতকদের নিজস্ব অস্ত্রের বাক্সের দিকে। কারান এগিয়ে গিয়ে কর্ডলেস ড্রিল মেশিন যন্ত্রটি হাতে তুলে নিল। তার ডান হাতের আঙুলগুলো যখন ড্রিল মেশিনের ট্রিগারের ওপর হালকা চাপ দিল, তখন ভনভন শব্দে বিটটি ঘুরতে শুরু করল।
কারানের হাতে এটা দেখে শৌভিকের চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে এলো। দড়ির বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার জন্য সে তার শরীরের শেষ বিন্দু শক্তি দিয়ে মোচড় দিতে থাকল, কিন্তু কারানের দেওয়া গিঁটগুলো তার মাংসের ভেতর আরও গভীরভাবে বসে গেল।
কারান পুনরায় এসে শৌভিকের সামনে বসল। শৌভিক কারানের দিকে পরম আকুতিভরা চোখে তাকাল, এমন এক চাহনি, যা দেখলে জগতের যেকোনো সাধারণ মানুষের বুকে করুণার উদ্রেক হতো।
কারান ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ফুটিয়ে ড্রিল মেশিনের ঘূর্ণন গতিটা আরও বাড়িয়ে দিল। “উঁহুঁ, তুই যা ভাবছিস তা একদমই না। মুখ খুলব না তো। না খুলেই তোর ডেন্টাল অবস্থার একটা কুইক চেকাপ করব।”
এমন নয় যে ওরা সবাই একসাথে আক্রমণ করলে কারান একা ওদের নিকেশ করতে পারত না। একজন ব্ল্যাক-বেল্ট কমব্যাট স্পেশালিস্ট হিসেবে সে এদের কয়েক মিনিটের মধ্যেই লা’শ বানিয়ে দিতে পারত। কিন্তু দ্রুত মৃ*ত্যু এদের জন্য এক পরম উপহার হতো। আর কারান চায় এই নরপশুদের শরীরের প্রতিটি কোষ যেন প্রতি সেকেন্ডে মৃ*ত্যুর স্বাদ আস্বাদন করে।
কারান চলন্ত ড্রিল মেশিনের তীক্ষ্ণ ফলাটি শৌভিকের থুতনির নিচ দিয়ে, ম্যান্ডিবল হাড় ফুঁড়ে ভেতরের মাড়ির দিকে পুশ করে দিল। শৌভিকের মুখের কাপড় ভেদ করে র*ক্ত ছিটকে এসে লাগল কারানের ফর্সা মুখমণ্ডল আর কপালের ওপর। প্রতিবারই র*ক্ত চিবুক বেয়ে শৌভিকের গলার কলার ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
এরপর কারান একই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি করল ঘরের বাকি প্রতিটি সদস্যদের সাথে। প্রথমে উরুর মাংসে স্ক্যালপেল দিয়ে পাপড়ি আঁকা, আর তারপর ড্রিল মেশিন দিয়ে দাঁতের নিচের চোয়াল ফুঁড়ে দেওয়া।
অবশেষে কারান সোজা হয়ে দাঁড়াল। সবার মুখমণ্ডল তখন র*ক্তাক্ত, থুতনি বেয়ে র*ক্ত জমাট বেঁধে মেঝেতে মিশে যাচ্ছে। কারান তার হাতের র*ক্তমাখা ড্রিল মেশিনটা একপাশে রেখে ঘরের বাইরে অন্ধকারের দিকে চলে গেল। ঘরের অবরুদ্ধ নরপশুরা ভাবল, বোধহয় নরকযন্ত্রণা একটু স্তিমিত হলো।
কিন্তু তাদের সেই ভুল ধারণা ভাঙতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। হুট করে আম্বিয়া কাঠের চেয়ারটা এক প্রবল ধাক্কায় একপাশে ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে সরাসরি শামসুজ্জামানের সামনে গিয়ে বসলেন। শামসুজ্জামানের শার্টের বুকের ওপরের দুটো বোতাম আটকাতে আটকাতে হিমশীতল কণ্ঠে বললেন, “আম্বিয়া জমাদ্দারের রাজত্বে ক্ষমার কোনো আইন নাই। আমার কাছে পাপের শাস্তি একটাই—জান কবজ! তয় তোর ম’রণ এত সোজা হইব না। তুই চাইলি আর আজরাইল আইসা তোরে এই আজাব থেইকা বাঁচাইয়া নিয়া গেল, এত সুখ তোর কপালে নাই! আমার কলাবতীর প্রতিটা পশম ছেঁড়ার হিসাব না চুকাইয়া তোরে আমি মর’তেও দিমু না।”
শামসুজ্জামান তীব্র আতঙ্কে ছটফটিয়ে উঠলেন। আম্বিয়া মুখটা শামসুজ্জামানের কানের খুব কাছে নিয়ে এলেন, “জুয়ান নাতনিটা আমার… তোরে চাচা মানত, নিজের বাপের মতন সম্মান করত রে পাপিষ্ঠ। আমার পরীর মতন নাতনীটার ওই পবিত্র চেহারাটার দিকে তাকাইয়াও তোর বুকের ভিত্রের পিণ্ডটা একটা বারও কাঁপল না?”
শামসুজ্জামান ঢোক গিলে আম্বিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে আম্বিয়া নিজের স্বামীসহ অতীতে আট-আটটি খু*ন করে এই জনপদে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন, সে যে আজ তাকে কীভাবে টুকরো টুকরো করে কাটবেন, তা ভাবতেই শামসুজ্জামানের বুকের পাঁজরের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা বারবার আছড়ে পড়তে লাগল, তাঁর নিশ্বাস ঘন থেকে ঘনতর হয়ে এলো।
আম্বিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “আইজ আমি দেখমু আমার প্রতিটা পদক্ষেপে তোর বুক কেমনে কাঁপে না! ওই বুকের চামড়া আমি নিজে এই বঁটি দিয়া ছিঁড়্যা দেখমু রে, জা*নোয়ার।”
কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আম্বিয়া বঁটিটা দিয়ে এক ঝটকায় শামসুজ্জামানের বুকের মাঝ বরাবর এক মোক্ষম কোপ মারলেন। তবে তিনি ফলাটা বেশি গভীরে ঢুকতে দিলেন না, কারণ একে অনেকগুলো ধাপে, জীবন্ত রেখে মা’রতে হবে। শার্ট কেটে চামড়া ফুঁড়ে বুক বেয়ে গলগল করে র*ক্ত নেমে এলো। শামসুজ্জামান মুখ বন্ধ অবস্থাতেই নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে এক গগনবিদারী চিৎকারের চেষ্টা করে পিঠ বাঁকিয়ে ছটফট করতে লাগলেন।
আম্বিয়া মুখে থাকা পানের রসটুকু চাবাতে চাবাতে, বঁটির ডগা দিয়ে শামসুজ্জামানের বুকের উপরিভাগের চামড়াটা ধীরে ধীরে আলু ছোলার মতো ছিলতে লাগলেন। তিনি বেশ নিস্পৃহ গলায় বলতে থাকলেন, “তুই যখন ওইবার আমার পাও ধইরা হাত জোর কইরা ক্ষমা চাইছিলি, আমি তোরে ক্ষমা করবার চাই নাই রে শামসু। শুধু তোর নিষ্পাপ বউ আর তোর ওই ছোট ছোড়া দুইটার মুখের দিকে তাকাইয়া মনটা নরম হইছিল, ক্ষমা কইরা দিছিলাম। অথচ তুই তো জাত জানো’য়ারই ছিলি, নিজের ওই দুইটা ছোড়ারেও নিজের মতনই কু’ত্তা বানাইলি! এইবার তাইলে জাহান্নামে একসাথে বাপ-পোলা তিনজন যাইয়া নায়িকাগো নাচন দেখিস। তোর জাহান্নামে যাওয়ার পাকা ব্যবস্থা আমি নিজেই করতেছি বাপ, এক্কেরে চিন্তা করবি না।”
তিনি এবার বঁটিটা ঘুরিয়ে শামসুজ্জামানের ডান পায়ের গোড়ালি লক্ষ্য করে এক প্রচণ্ড কোপ দিলেন। পায়ের পেছনের শক্ত রগ আর মাংস কেটে পুরো আলাদা হয়ে ঝুলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া র*ক্তে মেঝেটা পুনরায় লাল সমুদ্রে পরিণত হলো। আম্বিয়া এগিয়ে গিয়ে মেঝের ওপর ছটফট করতে থাকা বাকিদের পায়ে ও বুকেও একই পৈশাচিক কায়দায় গভীর ক্ষ’ত তৈরি করতে থাকলেন।
হঠাৎ কবাট ঠেলে কারান আবার গুদামঘরে প্রবেশ করল। সে বাইরে পার্ক করে রাখা তার বুগাটি শিরনের সামনের স্টোরেজ বগি থেকে ওয়াটারপ্রুফ ক্যানভাস ব্যাগটা নিয়ে এসেছে।
আম্বিয়া র*ক্তমাখা বঁটিটা শামসুজ্জামানের পাঁজরের ওপর চেপে ধরেই একবার কারানের দিকে তাকালেন। কোনো কথা না বলে তিনি আবার নিজের কাজে মন দিলেন।
কারান আবার শৌভিকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। কারানের এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন এবং মুখের সেই হিমশীতল অভিব্যক্তি দেখেই শৌভিক এবার অবচেতনেই তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। কারান তার ব্যাগ থেকে একটি স্টেইনলেস স্টিলের সিরিঞ্জ বের করল।
সে শৌভিকের সুনির্দিষ্ট কিছু অ্যানাটমিক্যাল পয়েন্টে ইনজেকশনের নিডলটা পুশ করে দিল। এই ফ্লেশ ইটিং ব্যাকটেরিয়া শৌভিকের ত্বকের নিচের নরম টিস্যু আর ফেসিয়াগুলোকে জ্যান্ত অবস্থায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে, তার চোখের সামনেই তার হাত-পা পচে খসে পড়বে, কিন্তু তার কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে সচল রাখবে যাতে সে সহজে মা’রা না যায়। কারান তাকে ওভাবেই রেখে পাশের গুন্ডাটার দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে ইতোমধ্যেই শৌভিক তার র*ক্তনালীর ভেতরে অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করল, যেন হাজারটা জ্যান্ত পোকা তার চামড়ার নিচে কামড়ে বেড়াচ্ছে।
ওদিকে আম্বিয়া প্রদীপ কুমারের দিকে এগিয়ে গেলেন। দুর্নীতির টাকায় চর্বি জমানো সেই পুলিশ অফিসারটি ভয়ে এবং আতঙ্কে ইতোমধ্যে নীল হয়ে গেছেন। তিনি জানতেন আম্বিয়া সাহসী নয়, বরং চরম দুঃসাহসী; কিন্তু নিজের চোখের সামনে তার এই সাক্ষাৎ রণরূপ দেখতে হবে, তা তিনি কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। আম্বিয়া তার নিজের কবজিতে থাকা একটি সুতো দিয়ে প্রদীপের মেদযুক্ত বাহুটি মেপে দেখলেন।
“উঁহুঁ! তিন গিরা মাংস কাটলে এই পাপের দাগ কাটব না রে, বাপ। চার গিরা কাটা লাগবো, এক চুল কম হইলেও নরকের খাতায় তোর নাম কাটা যাইব।”
কারান শৌভিকের উরু এবং মেরুদণ্ডের নিচের অংশের চামড়া লম্বালম্বি ছিলে ফেলল। শৌভিকের পা দুটো ধনুকের মতো বেঁকে অবশ হয়ে গেল। সে চোখের মণি দুটো টিনের চালের দিকে তুলে মনে মনে হয়ত প্রার্থনা করল, এই অসহ্য যাতনার চেয়ে যেন একবারে মৃ*ত্যু নেমে আসে! চামড়া পুরোপুরি সরিয়ে ফেলার পর ভেতরে যে লাল-সাদা রঙের দীর্ঘতম স্নায়ুর গোছা দেখা গেল, কারান পকেট থেকে একটি দীর্ঘ ফোর্সেপ ও সুঁইয়ের ডগা বের করে সেগুলোকে পার্শ্ববর্তী পেশিতন্তু থেকে আলাদা করে সুতোর মতো ওপরে তুলে আনতে থাকল।
ঠিক এই চরম মুহূর্তে কারানের পকেটে থাকা আইফোনটি ভাইব্রেশনে বেজে উঠল। শৌভিকের র*ক্তাভ, জলভরা চোখ দুটো এক বুক আশা নিয়ে কারানের দিকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল, এই অসময়ের কলটি হয়ত কোনো অলৌকিক মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, হয়ত এই নরকযজ্ঞ এবার থামবে। কারান ফোনটি বের করল। কলার আইডিতে জ্বলজ্বল করছে ‘মহারানি ভিক্টোরিয়া’ নামটি।
মিরার এই আচমকা ফোন পেয়েও কারানের কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে ফোনটি একহাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে শৌভিকের র*ক্তভেজা শার্টের বুক পকেটে হাত দিল। সেখান থেকে শৌভিকের আইফোনটি বের করে স্ক্রিনের পিন-লক পাসওয়ার্ড দেখে সে নিজের ঠোঁট দুটো উল্টে বলল, “পাসওয়ার্ড?”
শৌভিক ভাবল, পাসওয়ার্ড বলার বাহানায় অন্তত তার মুখের এই দমবন্ধ করা কাপড়টা খোলা হবে। কিন্তু কারান তাচ্ছিল্যের শব্দ করে ফোনটা শৌভিকের পেছনে নিয়ে গেল, যেখানে তার হাত দুটো প্যরাকর্ড দিয়ে শক্ত করে লক করা ছিল। কারান যখন তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরে টাচ করার জন্য শৌভিকের ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা ধরতে গেল, শৌভিক তীব্র আক্রোশে ফুঁসতে ফুঁসতে আঙুলটা ভেতরের দিকে গুটিয়ে নেওয়ার শেষ চেষ্টা করল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আঙুল সোজা করতে প্রবলেম হলে আমি ওটা গোড়া থেকেই কেটে নিচ্ছি। মাই ওয়াইফ ইজ ওয়েটিং ফর মি, শৌভিক। আর তুই তাকে ওয়েট করাচ্ছিস! তোর এই ক্রাইমের জন্য শাস্তি এবার ডাবল হবে। লেটস মডিফাই দ্য প্ল্যান।”
এই হিমশীতল হুমকি শোনা মাত্রই শৌভিক নিজের আঙুলটা সোজা করে মেলে দিল। তার চোখ থেকে তখন নোনা জলের ধারা নামছে। কারান ফিঙ্গারপ্রিন্ট ইউজ করে ফোনটা আনলক করে নিল। শৌভিক, ওসি প্রদীপ এবং বাকি ঘাতকগুলো অত্যন্ত উৎকণ্ঠা আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল—এই সাইকো লোকটা এখন এই ফোন দিয়ে কী কুখ্যাত চাল চালবে? কোনো পুলিশি মেসেজ নাকি অন্য কিছু?
কিন্তু ঘরের সবাইকে চরম হতভম্ব এবং স্তব্ধ করে দিয়ে কারান শৌভিকের ফোনের স্পটিফাই অ্যাপে ঢুকে ফুল ভলিউমে একটা ক্লাসিক ওয়েস্টার্ন ট্র্যাক প্লে করে দিল।
“Evil, I’ve come to tell you that she’s evil, most definitely…
Evil, ornery, scandalous and evil, most definitely…
The tension, it’s getting hotter
I’d like to hold her head underwater…”
কারান ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে শৌভিকের কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, “The background score is perfect, isn’t it?”
তীব্র যন্ত্রণায় শৌভিকের মুখ দিয়ে বের হওয়া গোঙানি আর বাকিদের বাঁচার আকুতির বীভৎস আওয়াজ যেন মিরা টের না পায়, মূলত এই কারণেই কারান এই হাই-ভলিউম মিউজিকের দেওয়ালটি তৈরি করেছিল।
কারান স্ক্রিনে ভাইব্রেট হতে থাকা মিরার দ্বিতীয় কলটি রিসিভ করল। ওপাশ থেকে মিরার ধারালো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “আমি কি জানতে পারি, দুজন অতি জ্ঞানী আর অভিজ্ঞ মানুষ রাত সাড়ে এগারোটা অবধি বাইরে কী করছে?”
“আমার বউ তো কানে কালা না, তার শোনার কথা যে তার স্বামী এখন ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার একটা গান শুনছে!”
“তোমার কি মনে হচ্ছে আমি তোমার সাথে মজা করছি, কারান? বাসায় মাত্র তিনজন মেয়ে মানুষ আছে, সে খেয়াল আছে তোমার?”
কারানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। অতীতের সেই একটি মারাত্মক ভুল, যা তার কলিজার টুকরো বোন তরুর জীবন কেড়ে নিয়েছিল—সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি কারান চৌধুরি এই জন্মে আর দ্বিতীয়বার করবে না। সে ইতোমধ্যে তার পার্সোনাল স্কোয়াডের দুজন অত্যন্ত দক্ষ অ্যাসাসিনকে ছায়ার মতো পুরোনো চৌধুরি বাড়ির চারপাশের পেরিমিটারে গার্ড হিসেবে মোতায়েন করে রেখেছে। সামান্যতম কোনো অস্বাভাবিক মুভমেন্ট দেখলেই তারা সাইডলাইন থেকে অ্যাকশনে যাবে এবং কারানকে ডিরেক্টলি সিগন্যাল পাঠাবে।
সে তার হাতের র*ক্তমাখা ব্লেডটা একটু ঘুরিয়ে বেশ কৌতুকের সুরে বলল, “মেয়ে? তুমি শিওর তিনজনই মেয়ে?”
“কী সব আজেবাজে কথা বলছ? মাথা ঠিক আছে তোমার?” মিরার মেজাজ এবার সত্যি চটে গেল, “আর এই! তুমি আগে ওই ফালতু গানটা বন্ধ করো তো! মেজাজ এমনিতেই বিগড়ে আছে, আর সে বসে বসে গান শুনছে!”
কারান বেশ রসিয়ে রসিয়ে সেই গানের লাইনের সাথে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠল, “Evil, I’ve come to tell you that she’s evil, most definitely…”
মেঝের ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা শামসুজ্জামানের গুন্ডারা আর ওসি প্রদীপ তাদের তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ছাপিয়ে বিস্মিত চোখে সামনে তাকিয়ে রইল। তাদের অপরাধী মস্তিষ্ক কোনোভাবেই এই সমীকরণ মেলাতে পারছে না, একটা মানুষ কীভাবে একজনের জীবন্ত পায়ের রগ টেনে ছিঁড়তে ছিঁড়তে, এমন র*ক্তের হোলি খেলার মাঝখানে দাঁড়িয়েও নিজের স্ত্রীর সাথে এত স্বাভাবিক, রোমান্টিক প্রেমালাপ করতে পারে!
কারান আবার বলে উঠল, “বাকিরা মেয়ে হলেও আমার বউ তো আর সাধারণ মেয়ে না, আস্ত একটা জল্লাদনি সে। নাহলে মাঝরাতে বরকে ফোন করে শুরুতে একটা মিষ্টি চুমু না খেয়ে কেউ এভাবে সরাসরি কোল্ড থ্রেট দেয়?”
“আমি জল্লাদনি? তাহলে তুমি কী? জল্লাদ?”
কারান মনে মনে ভাবল—হ্যাঁ মিরা, আই অ্যাম আ ড্যাম জল্লাদ। আর এই জল্লাদের আসল রূপ যদি তুমি এখন দেখতে, তবে হয়ত এই হিংস্রতাকে আরও বেশি ভালোবাসতে।
কারান ফোনের স্পিকারটা চেপে ধরে শৌভিককে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসে গলায় বলল, “এই যে নারীর সাথে কথা বলছি না? এই মেয়েও কিন্তু মোটেও সুবিধার না। একেবারে আমার ফিমেল ভার্সন। সেই রকম ডেঞ্জারাস মাল নিয়ে সংসার করি, ব্রো!”
ঠিক সেই মুহূর্তে পাশ থেকে শামসুজ্জামানের গোঙানির শব্দ ফোনের স্পিকারে চলে যাওয়ার উপক্রম হলো। কারান নিজের ঠোঁটের ওপর বাম হাতের র*ক্তমাখা তর্জনীটি রাখল—”হুশশ!”
সে এক সেকেন্ডের জন্য ফোনটা মিউট করল। পরক্ষণেই তার হাতের ভারী ফোর্সেপের উল্টো পিঠ দিয়ে শামসুজ্জামানের কপালের ঠিক মাঝখানে একটা জোরালো বারি মারল। কারান হিংস্র চোখ দুটো শামসুজ্জামানের ওপর স্থির করে অত্যন্ত নিচু স্বরে সাবধান করে দিল, “ডোন্ট ইন্টারাপ্ট মাই কল, ওল্ড ম্যান। পরেরবার সাউন্ড করলে জ্যান্ত জিহ্বাটা টেনে বের করে নেব।”
ফোনটা আনমিউট করতেই ওপাশ থেকে মিরার অস্থির কণ্ঠ শোনা গেল, “তুমি ফোনটা দাদিজানকে দাও তো। তোমার শাস্তি পরে হচ্ছে।”
কারান ফোনটা বাড়িয়ে দিল আম্বিয়ার দিকে। আম্বিয়া তখন শামসুজ্জামান আর ওসি প্রদীপের সদ্য কাটা, উন্মুক্ত কাঁচা মাংসের ক্ষতের ওপর দেশি লঙ্কা আর কাঁচা নুন নিজ হাতে ভালো করে মাখিয়ে দিচ্ছেন। নুন-মরিচের তীব্র রাসায়নিক দহনে নরপশুদের চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় ফেটে বের হয়ে আসছিল। আম্বিয়া মুখের জর্দা-পান চাবাতে চাবাতে একগাল হেসে কারানের হাত থেকে ফোনটা নিলেন। নাতবউয়ের উদ্দেশে বেশ নরম গলায় বললেন, “তোমরা কোনো চিন্তা না কইরা ঘুমাইয়া পড়ো, নাতবউ। অনেকদিনের কথা জইমা আছে আমার মানিকচাঁদের লগে। আইজ রাতে সব হিসাব নিকাশ চুকাইয়া আমরা ঘরে ফিরুম। তুমি ঘুমাও, মা।”
“তা কি বাসায় বসে কথা বলা যেত না, দাদিজান? আপনাদের ছাড়া যে আমাদেরও একদম ভালো লাগছে না।”
আম্বিয়া বেশ রসিয়ে রসিয়ে বললেন, “আমগো ছাড়া নাকি আমার এই চান্দের টুকরা নাতিডারে ছাড়া? কোনটা, নাতবউ?”
ফোনের ওপাশ থেকে মিরার লাজুক, অপ্রস্তুত কণ্ঠ ভেসে এলো, “না… ইয়ে মানে, দাদিজান…”
আম্বিয়া বেগম খিলখিল করে হেসে উঠে কারানের দিকে তাকালেন, “নাতবউ তো আমার কথায় জুতসই লজ্জা পাইতেছে রে, মানিকচাঁদ!”
ঠিক তখনই কারান আম্বিয়ার হাত ধরে তাকে এক ঝটকায় সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। বৃদ্ধা আম্বিয়া থতমত খেয়ে গেলেন। কিন্তু কিছু বলার আগেই গুদামঘরে বাজা সেই গানের তালের সাথে মিলিয়ে কারান আম্বিয়াকে নিয়ে এক ক্লাসিক নাচের স্টেপ দিতে শুরু করল। সে আম্বিয়ার হাত ধরে তাকে নিজের অক্ষের ওপর একবার আলতো করে ঘুরিয়ে নিল। আম্বিয়াও নাতির এই আকস্মিক উন্মাদনায় বিরক্ত না হয়ে বেশ মজাই পেতে লাগলেন। ওদিকে মেঝেতে দড়ি দিয়ে বাঁধা নরপশুরা এই পরাবাস্তব দৃশ্য দেখে সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল। এ কেমন পা’গলের জাত!
কারান নাচের মাঝেই ফোনটা মুখের কাছে এনে ডার্ক-ফ্লার্টি সুরে বলল, “লজ্জা না দেওয়াতেই এতখানি লজ্জা পাচ্ছ, সুইটহার্ট? জাস্ট ইমাজিন, সামনে থাকলে কী হতো!”
“আমি ফোন রাখছি, অসভ্য কোথাকার!” মিরা ওপাশ থেকে চরম রেগে গিয়ে দ্রুত বলল, “দাদির সামনে সেই কখন থেকে আবুলতাবুল বকে যাচ্ছে! আস্ত একটা নির্লজ্জ লোক তুমি!”
“ওকে সুইটহার্ট, বাসায় গেলে নাহয় তোমার এই সব ঝাল মিটিয়ে নিও। লাভ ইউ। উম্মাহ!”
মিরা ওপাশ থেকে চরম রেগে থাকার ভান করলেও কারানের এই শেষ কথাটিতে লাজুক হাসি হেসে কলটা কেটে দিল।
ফোনটা ডিসকানেক্ট হওয়ার সাথে সাথেই কারান আর আম্বিয়া তাদের নাচের স্টেপ থামিয়ে দিলেন। তাদের দুজনের মুখাবয়বে আবার সেই আগের হিমশীতল গম্ভীরতা ফিরে এলো। থিয়েটারের নাটক শেষ হলে অভিনেতারা যেমন মুখোশ খুলে ফেলে, তাদের রূপান্তরটা ছিল ঠিক ততটাই প্রফেশনাল ও ভৌতিক।
কারান একটি বিশেষ এয়ার-টাইট পলিথিন প্যাকেট বের করল। সেই স্বচ্ছ প্যাকেটের ভেতরে কিলবিল করছে শত শত মাংসখেকো ও রেনাল ক্যাডভেরিক লার্ভা এবং কিছু বিষাক্ত আফ্রিকান বুশ-পোকামাকড়। কেন জানি বন্দি নরপশুরা এই কীটপতঙ্গগুলো দেখেই নিশ্চিত বুঝতে পারল, এবার তাদের জন্য কী ভয়ংকর নরক অপেক্ষা করছে।
কারান শৌভিকের সেই ছিলে ফেলা উরুর কাঁচা, লাল-সাদা মাংসের ক্ষতের ওপর পোকা আর লার্ভাগুলোকে ছেড়ে দিল। পোকাগুলো জ্যান্ত ও উষ্ণ র*ক্তের ছোঁয়া পেয়েই শৌভিকের টিস্যু আর স্নায়ুমণ্ডলীর ভেতরে কামড়ে কামড়ে আরও গভীরে ঢুকতে শুরু করল। শৌভিকের ছটফটানি এবার মানুষের সীমা ছাড়িয়ে গেল।
আম্বিয়া দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত কঠিন চোখে অবলোকন করলেন। তিনি ভারী ও পাথুরে কণ্ঠে বললেন, “মানিকচাঁদ, এইবার আমার আসল কাজ!”
তিনি ঘরের কোণ থেকে সেই শাণ দেওয়া রাজকীয় তরবারিটি টেনে নিলেন। এক কোপে প্রত্যেকের বাম পা হাঁটু থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। এতক্ষণ কারান যে লার্ভা আর পোকাগুলো ছেড়েছিল, সেগুলো ছিল তাদের ডান উরুর ক্ষতে; তাই সেই অংশে পোকাগুলো এখনো স্নায়ুর ভেতর কিলবিল করে মাংস খাচ্ছে, আর অন্যদিকের বাম পা কাটার ফলে র*ক্তের ফোয়ারা ছুটছে।
তিনি এবার ফুটন্ত, তরল সিসা সরাসরি প্রদীপ কুমার আর শামসুজ্জামানের বাম পায়ের সেই সদ্য কাটা উন্মুক্ত হাড় ও মাংসের ওপর ঢেলে দিলেন। এতক্ষণ তারা মুখের কাপড়ের ভেতরেই বোবা চিৎকারে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সিসার এই চরম রাসায়নিক দহনে তাদের চোখের মণি দুটো উল্টে গেল। মনে হলো তাদের জীবনের অন্তিম মুহূর্ত চলে এসেছে। কিন্তু না, কারানের কড়া অ্যান্টিডোট ড্রাগের কারণে তারা চাইলেও সহজে জ্ঞান হারাতে পারছিল না।
কারান তাদের এই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া, ছটফটে শরীরগুলোর দিকে একপলক তাকাল। ঠিক ওই মুহূর্তে কারানের চোখের কোণটা হঠাৎ করেই নোনা জলে ভিজে উঠল। তার অবচেতনেই মগজের নিউরনে ভেসে উঠল তরুর সেই নিষ্পাপ মুখটা। সে বুঝতে পারল, এই পুরো পৃথিবীকে টুকরো টুকরো করে কাটলেও সে আর কোনোদিন তার সেই আদরের ছোট বোনটাকে জীবিত ফেরত পাবে না। আর তার একমাত্র কারণ হলো সামনে পড়ে থাকা এই জঘন্য জা’নোয়ারগুলো।
কারানের চোয়াল করাতের মতো ধারালো দেখাল।
কারান এক ঝটকায় তার কোমর থেকে একটি কার্বন-স্টিল নানচাকু বের করল। সে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে শৌভিক আর শামসুজ্জামানের কলার ধরে পশুর মতো হিঁচড়ে টেনে এনে মেঝের ঠিক মাঝখানে এক জায়গায় জড়ো করল। কারান নানচাকুটা ঘুরিয়ে তাদের র*ক্তাক্ত মুখে, বুকে ও পাঁজরের হাড়ে একের পর এক আঘাত করতে লাগল। কারান অবদমিত চিৎকারে বলতে থাকল, “কেন? কেন আমার নিষ্পাপ বোনটাকে ছিনিয়ে নিলি তোরা? ওর অপরাধটা কী ছিল? আজ তোদের পাপের প্রতিটি হিসাব আমি র*ক্তে র*ক্তে আদায় করব, শু*য়ারের বাচ্চারা! তোদের শরীরে শেষ র*ক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত তোদের জন্য ক্ষমা নেই, মুক্তি নেই, নিস্তার নেই!”
কারান দাঁতে দাঁত চেপে, চরম আক্রোশে কথাগুলো বলতে বলতেই ওদের ওপর তাণ্ডব চালাতে লাগল। কার্বাইড-স্টিল চেইনের সেই অমানুষিক প্রহারে ওদের চামড়া ফেটে মাংসের কুচি মেঝের ধুলোয় ছিটকে পড়তে থাকল।
ক্রমাগত এই কায়িক পরিশ্রমে কারানের কপাল আর চওড়া বুক বেয়ে ঘামের কালচে ধারা নেমে এল, তার কালো হুডিটা ঘাম আর র*ক্তের মিশ্রণে লেপ্টে গেল শরীরের সাথে। তবুও তার থামার কোনো লক্ষণ নেই।
এককোণে দাঁড়িয়ে আম্বিয়া কারানের এই ক্ষ্যাপাটে রূপের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই ভেতর থেকে ভীষণ আবেগী হয়ে উঠলেন। ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই কেন এত ধকল, এত মানসিক ক্ষত একাকী সয়ে যাচ্ছে? কেন নিয়তি বারবার ওর কপালেই এতখানি র*ক্তপাত লিখে রাখছে?
কারান এক ঝটকায় শামসুজ্জামান আর ওসির গায়ের র*ক্তভেজা শার্টগুলো টেন হেঁচড়ে ছিঁড়ে একপাশে ফেলে দিল। উন্মুক্ত, থেঁতলে যাওয়া চামড়ার ওপর সে তার জমানো রাগের দ্বিতীয় দফা বহিঃপ্রকাশ ঘটাল। একপর্যায়ে কারান তার ভারী বুট জুতোটা দিয়ে শামসুজ্জামানের র*ক্তাক্ত মুখের ওপর সজোরে পাড়া দিয়ে পিষে ধরল। “আমি আমার ফুপিকে কী জবাব দেব, হ্যাঁ? মিরাকে কী বলব? ওর ওই ছোট্ট নিষ্পাপ বোনটার সামনেই বা কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াব আমি? আর আমার বন্ধু… আমার জানের থেকেও প্রিয় যে বেস্ট ফ্রেন্ডটা এখন হসপিটালে শুয়ে আছে, তাকে কীভাবে সামলাব আমি, জা*নোয়ারের বাচ্চারা?”
আম্বিয়া বুঝলেন, এভাবে আর কিছুক্ষণ চললে কারান নিজেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বে। তিনি ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে এসে কারানের সেই উত্তোলিত, র*ক্তমাখা ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন।
কারান লাল হয়ে ওঠা, জলভরা কাঁদো-কাঁদো চোখ দুটো তুলে আম্বিয়ার চোখের দিকে তাকাল। সে অত্যন্ত ভাঙা, অসহায় কণ্ঠে বলল, “যখন মনস্টারই হব, তখন পুরোপুরি কেন হলাম না, দিদা? আমার ভেতরে এই সামান্য মানুষের ইমোশন কেন রয়ে গেল? আমি কেন তোমাদের এত পা’গলের মতো ভালোবাসি? তোমরাই বা কেন এই কারান চৌধুরির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলে?”
আম্বিয়া নিজের র*ক্তাক্ত দুই হাত বাড়িয়ে কারানকে শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন। কারানও তার দীর্ঘ শরীরটা নিয়ে দাদির কাঁধের ওপর ভেঙে পড়ল, কান্নাভেজা চোখে তাঁকে আঁকড়ে ধরল। তার চিবুক আর থুতনি অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপছিল।
মিনিট দশেক পর কারান গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সম্পূর্ণ সংবরণ করে নিল। শৌভিকের অবস্থা ততক্ষণে আশঙ্কাজনক; অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর সায়াটিক নার্ভের যাতনায় সে যেকোনো সময় মা’রা যাবে বলে মনে হচ্ছে। কারান মেঝেতে শুয়ে থাকা শৌভিকের আধা-মরা শরীরটার কলার ধরে এক হেঁচকা টানে সোজা করে বসিয়ে দিল।
কারান শৌভিকের প্যান্টের পকেট থেকে রুমালটা বের করল। নিজের হাতের আঙুল আর নখের কোণে লেগে থাকা র*ক্তগুলো মুছতে মুছতে বলল, “খুব তৃষ্ণা পেয়েছে, তাই না? টু মাচ ডিহাইড্রেশন? এক গ্লাস ফাইন ওয়াইন দেব তোকে?”
শৌভিক দ্রুত মাথা নাড়ল। কারান পাশ থেকে একটা কাচের ক্রিস্টাল গ্লাস তুলে নিল। তারপর শৌভিকেরই কাটা পায়ের মাংসের গভীর ক্ষত থেকে গলগল করে বের হওয়া গরম র*ক্ত গ্লাসে ধরে সেটাকে একদম কানায় কানায় পূর্ণ করে তার সামনে ধরল। শৌভিক সম্পূর্ণ বোকার মতো, কুৎসিত চাহনিতে সেই র*ক্তভর্তি গ্লাসের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চেহারা ইতোমধ্যেই আর মানুষের পর্যায়ে নেই—নুনচাকুর আঘাতে নাকটা থেবড়ে গেছে, ঠোঁট কেটে দাঁতগুলো বের হয়ে আছে।
কারান এক বুক নিশ্বাস টেনে টেবিল থেকে নিজের জন্য একটা দামি কাচের গ্লাসে লাল ওয়াইন ঢেলে নিল। এরপর সে শৌভিকের হাতে থাকা র*ক্তের গ্লাসের সাথে নিজের ওয়াইনের গ্লাসটি আলতো করে ঠুকে বলল, “চিয়ার্স, মাই বয়!”
কারান অন্য হাত দিয়ে এক ঝটকায় শৌভিকের মুখের বাঁধনটা সম্পূর্ণ খুলে দিল। শৌভিক ব্যথায় তীব্র চিৎকার করে ওঠার আগেই কারান র*ক্তের গ্লাসটি তার মুখের ভেতর উপুড় করে সম্পূর্ণ ঢেলে দিল। নিজেরই কাঁচা র*ক্ত পেটে যেতেই শৌভিক মেঝের ওপর র*ক্ত বমি করতে থাকল।
শৌভিক কোনোমতে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জড়ানো গলায় বলল, “ভা… ভাই! আমারে দয়া করে ছাড়েন, খোদার কসম আমি কিছু করি নাই, আমারে ছাইড়া দেন! যা করার, তা তো ওই ওই শৌর্য করছে। ও-ই তারান্নু…”
শৌভিক তারান্নুমের পুরো নামটি শেষ করার আগেই কারান ধারালো স্ক্যালপেলটি বের করে শৌভিকের গালের এক পাশে কেটে দিল। “উঁহুঁ, ওই পবিত্র নাম তোর এই নোংরা মুখে আর একটা বারও নিলে, মাই নেক্সট স্ট্রোক উইল বি ডিরেক্টলি বিটউইন ইয়োর লেগস।”
শৌভিক চরম আতঙ্কে কোনোমতে তোতলামো গলায় বলল, “আম… আমারে ছাইড়া দে… দেন ভাই! শৌর্যই মাইয়াটার পবিত্র শরীরে প্রথম হাত দিছিল। ও একটা সাইকো, ভাই! ও এই অঞ্চলের চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের মেইন এজেন্ট। ও ঢাকা গেছে ওই চক্রের গডফাদারের কাছে এই ঘটনার সব এভিডেন্স আর মেমোরি কার্ড ডেলিভারি দিতে, যাতে পুলিশ কেস ধামাচাপা দেওয়া যায়! ধ*র্ষণের মেইন আইডিয়াটাও ও-ই শুরু…”
শৌভিক তার বাক্যটি আর শেষ করার আগেই তার দুটো ঠোঁটই কেটে সম্পূর্ণ আলাদা করে মেঝেতে ফেলে দিল কারান। শৌভিকের ঠোঁট বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সে যখন নিজের প্রস্রাবের ওপর আছাড় খেয়ে কাঁপছে, কারান তখন তার কিট থেকে একটি ছুরি বের করল। তারান্নুমের ওপর করা প্রতিটা অমানবিক অত্যাচারের হিসাব মেলাতে সে একে একে ওদের সবার একটি করে চোখ উপড়ে নিল, এবং রেনাল আর্টারি ক্ল্যাম্প করে জীবন্ত কিডনি শরীর থেকে বের করে আনল।
ওদের সবার অন্য চোখ দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল। কারান বুঝল, এরা এখন দ্রুত অবধারিত মৃ*ত্যুর দিকেই এগোচ্ছে। কারান সেই কেস থেকে দুটো প্রি-লোডেড সিরিঞ্জ বের করল। সবার শরীরে হাই-ডোজ এপিনেফ্রিন এবং সাইকোঅ্যাক্টিভ মেথামফেটামিন ইনজেক্ট করে দিল। এই ড্রাগ কম্বিনেশন মানুষের হৃৎস্পন্দন এবং র*ক্তচাপকে কৃত্রিমভাবে সচল রাখে; ফলে যেকোনো মানুষ যন্ত্রণার চরমতম শিখরে পৌঁছেও পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ সচেতন ও জ্যান্ত থাকবে।
কারান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ”মুক্তি চাই তোদের?”
মেঝের ওপর পড়ে থাকা অর্ধমৃত জা’নোয়ারগুলো চরম আকুতিতে একসাথে পা’গলের মতো মাথা নাড়ল। কারান এগিয়ে গিয়ে তাদের হাত, পা এবং মুখের সমস্ত প্যরাকর্ড ও বাঁধন এক এক করে খুলে দিল। বাঁধন মুক্ত হতেই পুরো গুদামঘর কাঁপিয়ে তাদের গগনবিদারী চিৎকার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
শামসুজ্জামান তখন নিজের ছিন্নভিন্ন দুই হাত আর এক পায়ে ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে সোজা আম্বিয়ার পায়ের কাছে এগিয়ে গেল। তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে র*ক্তবমি করতে করতে বারবার একই অনুনয় করতে লাগল, “ক্ষমা চাই, খালাম্মা! আ…পনে তো দ… দয়ার সাগর… আপনে এই গুনাহগাররে ক্ষমা করেন!”
আম্বিয়া নিজের ভারী ডান পা-খানা সজোরে শামসুজ্জামানের র*ক্তাক্ত বুকের ওপর চেপে ধরলেন।
”যা, তোরে যাইতে দিলাম। তোগো সবাইরে আজ মুক্তি দিলাম। যদি পারিস তো পালা!”
কথাটি শেষ করেই তিনি শামসুজ্জামানের বুকে এক তীব্র লাথি মারলেন। মুক্তির এই মরীচিকা দেখা মাত্রই ওরা অবশিষ্ট শক্তি এক করে, এক পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বনের অন্ধকারের দিকে পালাতে শুরু করল।
গভীর বনের নিশুতি অন্ধকার ফুঁড়ে শৌভিক এক পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে তীব্র আতঙ্কে ছুটে পালাচ্ছিল। তার ডান পায়ের ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়া তাজা র*ক্তে বনের শুকনো পাতা আর মাটি সিক্ত হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কিছুটা দূরে চাঁদের রুপোলি আলোয় এক দীর্ঘ অবয়ব গাছের ছায়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। তার ডান হাতে ঝুলছিল সেই চকচকে কুঠার। কারান মূলত এটাই চেয়েছিল—তারান্নুম যেভাবে সেই অভিশপ্ত রাতে এই বনের অন্ধকারে, তীব্র আতঙ্কে ছুটেছিল, এই নরপশুরাও যেন মৃ*ত্যুর আগে ঠিক সেই একই মর*ণ-ভয় আর ট্রমা প্রতি সেকেন্ডে অনুভব করে। ইতিমধ্যেই কারান বনের অন্য প্রান্তে বাকি ঘাতকদের ওপর তাদের জীবনের নিষ্ঠুরতম ও বীভৎসতম মৃ*ত্যু কার্যকর করে এসেছে।
কারানকে হুট করেই নিজের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শৌভিক এক ঝটকায় থমকে গেল। সে কিছুক্ষণ পিছিয়ে যেতে থাকল, আর কারান এগোতে থাকল। অবশেষে চরম অসহায়ত্বে দুই হাত জোর করে মেঝের কাদার ওপর বসে পড়ল। কারানের বুট জুতো জোড়া জড়িয়ে ধরে সে চোখের জলে জীবনের শেষ ভিক্ষা চাইল।
কিন্তু শৌভিক সুযোগ বুঝে হুট করেই তার প্যান্টের গোপন পকেট থেকে একটি সুচালো সুইচব্লেড বের করে কারানের পায়ের ধমনিতে এক মারাত্মক পোজ দেওয়ার জন্য আঘাত করতে গেল। কিন্তু কারান শরীরটা স্লাইড করে পাশে সরে দাঁড়িয়ে কুঠারের এক কোপে শৌভিকের ব্লেড ধরা ডান হাতটি কবজি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
কারান তাচ্ছিল্যের সাথে দু দিকে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, “ম’রার আগের সেকেন্ডেও তুই তোর জাত কুকুরের স্বভাবটা ছাড়লি না! সো ল্যাম্ব!”
কথাটি শেষ হওয়া মাত্রই কারান তার ভারী বুট দিয়ে শৌভিককে মাতিতে চিত করে ফেলে তার প্যান্টের ঠিক মাঝখানে কুঠার দিয়ে আঘাত করল। শৌভিক শুয়ে পড়ে হা করে চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু জিহ্বা না থাকায় তার সেই গগনবিদারী চিৎকার অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে আওয়াজ হয়ে মিলিয়ে গেল।
কারান এবার পকেট থেকে সেই ধারালো সার্জিক্যাল স্ক্যালপেল বের করে শৌভিকের অ*ণ্ড*কো*ষের থলিটি অক্ষত অবস্থায় ঠিক মাঝখান থেকে লম্বালম্বিভাবে চিরে ফেলল। শৌভিকের চোখ দুটো কোটর থেকে সম্পূর্ণ বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। কারান ভেতরের শুক্রবাহী নালী এবং প্রধান র*ক্তনালীগুলোকে না কেটে অক্ষত রাখল, এবং অ*ণ্ড*কোষ দুটিকে থলি থেকে টেনে বের করে শরীরের বাইরে ঝুলিয়ে দিল।
এরপর কারান তলপেটের নিচের চামড়া কেটে একটি গভীর গহ্বর তৈরি করল। এবার সে সেই ঝুলন্ত অ*ণ্ড*কোষ এবং তার মূল পুরু*ষা*ঙ্গ*টিকে উল্টো করে সেই সদ্য কাটা গহ্বরের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় পুশ করে ঢুকিয়ে দিল, এবং ওপর থেকে তার চামড়া সুঁই-সুতা দিয়ে দিয়ে সেলাই করে দিল।
শৌভিকের পু*রু*ষাঙ্গ এবং অ*ণ্ড*কোষ তার নিজের শরীরের অভ্যন্তরীণ এসিডের কারণে চামড়ার নিচেই পচতে ও গলতে শুরু করল।
সবশেষে, কারান শৌভিককে উপুড় করে তার পিঠের চামড়া মেরুদণ্ডের দুপাশ থেকে কেটে পেশি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিল। চাঁদের আলোয় শৌভিকের পিঠের সেই চামড়ার ডানা দুটোকে পাখনার মতো দেখাচ্ছিল।
কারান উঠে দাঁড়াল। হাতের র*ক্তমাখা গ্লাভস জোড়া এক টানে খুলে শৌভিকের সেই ছটফটে, জীবন্ত লা’শের ওপর ছুঁড়ে মারল।
“খুব এনজয় করেছিলি না আমার তারান্নুমের ওপর ওই পৈশাচিক খেলাটা? দিস ইজ মাই রিটার্ন গিফট। তোদের নোংরা শরীরের চামড়া দিয়ে আমি আজ এমন সুন্দর সুন্দর স্থাপত্য বানালাম, যা দেখে খোদ শয়তানও লজ্জা পাবে। ডানা তো আমি দিয়েই দিয়েছি, এবার উড়ে যা। উড়ে যাহ, মা*দা*রফা*কার!”
প্রচণ্ড আক্রোশে চিৎকার করেই কারান শৌভিকের গলার ক্যারোটিড ধমনি আর শ্বাসনালীর ওপর শেষ মারাত্মক কোপটা বসাল।
ওদিকে পাহাড়ি ঢিবির দিকে এক পায়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে প্রাণপণ শক্তিতে পালাচ্ছিল ওসি প্রদীপ কুমার। তার পিছু পিছু ডান হাতে শাণ দেওয়া বঁটি নিয়ে হেঁটে আসছিলেন আম্বিয়া জমাদ্দার। হঠাৎ করেই প্রদীপ থমকে দাঁড়াল; দেখল তার সামনে প্রসারিত কয়েক শ ফুট গভীর পাথুরে গিরিখাদ। আম্বিয়া এগিয়ে এসে প্রদীপ কুমারকে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলেন সেই উঁচু ঢিবির দিকে।
আম্বিয়ার বয়স সত্তরের কোঠায় হলেও ওনার গায়ের আসুরিক শক্তি যেন এই মুহূর্তে চরম রকমের হয়ে উঠেছিল। প্রদীপের ঘুষি ওনার ইস্পাতসম শরীরকে টলাতে পারছিল না। ওনার হাতের বঁটি ওসির শরীরের একেকটি পেশি থেকে মাংসের ফালি আলাদা করে নিচ্ছিল। ওসির আর্তনাদ ওই জনশূন্য পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে ওসি প্রদীপ ওনার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে ধরাশায়ী করতে গেল। আম্বিয়া যখন পড়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই কারান চোখের পলকে তার নানাচাকুটা দিয়ে সজোরে আঘাত করল ওসির ডান হাতের ওপর। ওসির কবজির হাড্ডির জয়েন্টটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে চামড়ার নিচে ঝুলে গেল। ওসি প্রদীপ যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে ওঠার আগেই কারান তার মুখের ভেতর এক ভয়াবহ লাথি বসাল। ওসির সামনের উজ্জ্বল চারটি দাঁত ভেঙে র*ক্তের তোড় গলার নালী বেয়ে নেমে এল। তখনই কারান কুঠারটা দিয়ে ওসির মাথাটাই শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিল। মাথাটা একটা ফুটবলের মতো ওই পাহাড়ের নীচের গভীর খাদে গড়িয়ে পড়তে থাকল।
এই সুযোগটাই পিছন থেকে হুট করে এসে শামসুজ্জামান নিতে চাইল। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এগিয়ে এসে একটা বিষাক্ত ড্যাগার বের করে কারানের বুকে বসাতে চাইল। কারান এটা টের পেয়ে সরে যেতে গেলেই পায়ের নিচের আলগা পাহাড়ি মাটি ধসে পড়তে থাকল। শামসুজ্জামান কারানকে এক ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিতে চাইল, ঠিক সেই চরম মুহূর্তে আম্বিয়া কারানকে এক প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিলেন এবং নিজে শামসুজ্জামানের সামনে চলে এলেন।
শামসুজ্জামানের সেই প্রচণ্ড ধাক্কাটা সরাসরি এসে লাগল আম্বিয়ার বুকে। কিন্তু পড়ে যাওয়ার ঠিক আগের ভগ্নাংশে পাঁচ আঙুল গিয়ে খামচে ধরলেন শামসুজ্জামানের গলা।
“জাহান্নামে তোর জন্য একটা সিট রিজার্ভ করে রাখছি রে হা*রামজাদা, চল আইজ দুইজনে একসাথে সেই সিটে গিয়া বসি!”
হাওয়ায় ভাসমান অবস্থাতেই মৃ*ত্যুভয়হীন আম্বিয়া তার হাতের বঁটি দিয়ে শামসুজ্জামানের ঘাড় বরাবর হাড়-কাঁপানো কোপ বসালেন। শামসুজ্জামানের কলিজা কাঁপানো আর্তনাদ আর আম্বিয়ার অকুতোভয় অট্টহাসি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। তারা দুজন একসাথে কয়েক শ ফুট নিচে পাথুরে খাদে পড়ে গেলেন।
কারান ঢিবির প্রান্তে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “দিদাআআআ!”
ওর গলার স্বর ওই খাদের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। ও নিচে তাকিয়ে দেখল, পাথরের ওপর শামসুজ্জামানের দেহটা ছিন্নভিন্ন, মাংসের দলা হয়ে পড়ে আছে। আর আম্বিয়া জমাদ্দার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শামসুজ্জামানের টুঁটি চেপে ধরে আছেন। ওনার মুখে বিজয়ী, প্রশান্ত হাসি। ওনার আত্মা এখন শান্ত, তারান্নুমের আত্মা এখন শান্ত।
কারান অন্ধকার শয়নকক্ষের কাঠের টেবিলে এসে নিঃশব্দে বসল। টেবিলের ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে সে তার আইফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিন সোয়াইপ করে ফারহানের ইনবক্সে ঢুকল। শৌর্যের একটি নিখুঁত, হাই-রেজোলিউশন প্রোফাইল পিকচার অ্যাটাচ করে একটি মেসেজ টাইপ করল, “মূলত তারান্নুমকে মারার সবথেকে বড় মাস্টারমাইন্ড আর এক্সিকিউটর ও-ই। এখন বাকিটা তোর ওপর ছেড়ে দিলাম!”
বার্তাটি পাঠিয়েই কারান ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের কিং-সাইজ বিছানাটার দিকে তাকাল। সেখানে সাদা চাদরের ওপর মিরা পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। ওর বুকটা হালকা ওঠানামা করছে। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে কারানের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস বেরিয়ে এল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ঘুমে আচ্ছন্ন মিরাকে সে অপলক চোখে অনেকক্ষণ দেখল।
সে কিছুটা ঝুঁকে এসে মিরার মসৃণ কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল। কারান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে আওড়ালো, “নিজের সেই অন্ধকার অতীতে প্রবেশ করতে চলেছি, মহারানি। আমার জন্য একটু দোয়া করো, আমাকে শক্তি দাও। আমার ভেতরের যে অংশটা পাথর হয়ে গেছে, সেই পাথরটা যেন আজ এই ইতিহাসের ছাইয়ে হাত দিয়ে আবারও কাচের মতো গুঁড়ো হয়ে না যায়।”
আরও কিছুক্ষণ সেই নিস্তব্ধ শয়নকক্ষে মিরার পাশে নিঃশব্দে অতিবাহিত করল সে। এরপর আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। আম্বিয়ার দিয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন কাঠের বাক্সটা হাতে তুলে নিল। একই সাথে আলমারির এক গোপন লকারে সে যে ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো অতি যত্নে লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলোও বের করে আনল। এগুলো সেই কাগজের টুকরো, যেগুলো অসাবধানে আম্বিয়ার শাড়ির নীচ থেকে পড়ে গিয়েছিল। ড্রয়ার থেকে এক রোল ট্রান্সপারেন্ট স্কচটেপ নিয়ে কারান নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে তখন শেষ রাতের ম্লান চাঁদের আলো। কারান হেঁটে গিয়ে বসল ঠিক সেই নির্দিষ্ট ঘাসের চত্বরটায়, যেখানে দাঁড়িয়ে একদিন দাদি আম্বিয়া তার হাত থেকে এই গোপন চিঠিগুলো কেড়ে নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। কারান ঘাসের ওপর পদ্মাসন হয়ে বসল। বনের দিক থেকে আসা এক ঝলক হিমশীতল বাতাস তার র*ক্তমাখা শরীর ছুঁয়ে গেল। আজ রাতেই সে কতগুলো নৃশংস খু*ন করল, অথচ তার মুখাবয়ব এখন গ্রানাইট পাথরের মতো নিস্পৃহ। সেখানে কোনো অপরাধবোধের ভাব নেই, কোনো উল্লাসের হাসি নেই, এমনকি দাদির জন্য কান্নাও নেই।
কারান নিপুণ হাতে মনোযোগ দিয়ে ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলোকে স্কচটেপ দিয়ে একটা আরেকটার সাথে জুড়তে শুরু করল। বাতাসে যেন কাগজগুলো উড়ে না যায়, সেজন্য তার ভারী মেটাল লাইটারটা কাগজের এক কোণে চাপা দিয়ে রাখল। এই কাজে মোটামুটি বিশ মিনিটের মতো সময় খরচ হলো। অতঃপর কারান গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই চিঠিটা পড়তে শুরু করল।
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলছিল একটি বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ। কানে ব্লুটুথ এয়ারপড লাগানো অবস্থাতেই শৌর্য গম্ভীর ও ভাবলেশহীন মুখে স্টেয়ারিং হুইল ধরে ছিল। ড্যাশবোর্ডের নিওন আলোয় তার ধারালো চোয়ালজোড়া আরও নিষ্ঠুর দেখাচ্ছিল।
শৌর্য ঠান্ডা কণ্ঠে ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আমার কাজ তো আমি পারফেক্টলি ডান করে ফেলেছি। বডি থেকে লাইভ অর্গান হার্ভেস্টিং করে কোল্ড-চেইনে ঢাকায় পাঠানো পর্যন্তই আমার প্রোটোকল ছিল। এখন সেই লিভার আর কিডনিগুলো আপনারা দুবাই স্মাগল করবেন নাকি লোকাল ব্ল্যাক মার্কেটে চড়া দামে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করবেন, দ্যাটস টোটালি ইয়োর বিজনেস।”
“ঠিক আছে। যদিও তোমায় নতুন করে বলাটা সময় নষ্ট, তাও আরেকবার ওয়ার্ন করছি—আমাদের এখন এক্সট্রিম লেভেলের সাবধানে থাকতে হবে। ইব্রাহিম যেহেতু আর সিন্ডিকেটে নেই… আমার যদিও পার্সোনালি মনে হয় না যে সাধারণ আগুনের কারণে ওর মৃ*ত্যু হয়েছে। ইব্রাহিমের মতো ধূর্ত আর ইন্টারন্যাশনালি কানেক্টেড মানুষের জাহাজে কীভাবে এত বড় ক্যাটাস্ট্রফি ঘটল, আমি ভেবে পাচ্ছি না। মোট কথা, এই অর্গান ট্রাফাকিংয়ের রুটের খবর যেন কোনোভাবেই বাইরে লিক না হয়।”
শৌর্য অন্ধকার হাইওয়ের দিকে সোজা তাকিয়ে ডান হাত দিয়ে নিজের সিল্কি চুলগুলো একবার ব্যাকব্রাশ করে নিল। বাম হাতটা স্টেয়ারিং হুইলে রেখেই শান্ত ও অহংকারী ভঙ্গিতে বলল, “শৌর্যের ডিকশনারিতে ‘ইনফরমেশন লিক’ বলে কোনো শব্দ নেই, এটা এতদিনে আপনার বুঝে যাওয়ার কথা ছিল, স্যার। আর সাবধানতা অবলম্বন করার হলে সেটা আপনার দিক থেকে করুন। ওয়াদা খেলাপের মতন চিপ কাজ আমার পলিসিতে নেই।”
“হ্যাঁ, জানি জানি। তাই তো খু*ন করে হলেও নিজের প্রফেশনাল রেসপন্সিবিলিটি মেইনটেইন করো।”
শৌর্য ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি ফুটিয়ে বেশ উপহাসের সুরে বলল, “আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনি খুব জলদি একটা শক খেতে চলেছেন। যদিও আপনার র*ক্তে অনুশোচনা বলে কোনো ইমোশন আছে বলে আমার মনে হয় না। না থাকাই ভালো, আই জাস্ট পার্সোনালি হেইট দিস ইমোশন।”
“তুমি ঠিক কী মীন করছ, শৌর্য?” ওপাশের কণ্ঠটা এক ঝটকায় বেশ সতর্ক ও গম্ভীর শোনাল।
“রাখছি। নেক্সট শিপমেন্ট আর ডেলিভারির টাইমটা আমাকে ইমেইলে ড্রপ করে রাখবেন। বাই।”
কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করা বা ফালতু গসিপ করা শৌর্য তীব্রভাবে ঘৃণা করে। সে এক ক্লিকেই কলটা ডিসকানেক্ট করে দিল। এরপর সে ড্যাশবোর্ডের টাচস্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে তার প্রিয় ডার্ক প্লে-লিস্টটা প্লে করল।
“Dirty, dirty boy
You know everyone is talking on the scene
I hear them whispering ’bout the places that you’ve been
And how you don’t know how to keep your business clean…
Mummy don’t know daddy’s getting hot
At the body shop, doing something unholy…”
শৌর্য গানের তালের সাথে স্টিয়ারিংয়ে হালকা আঙুল ঠুকছিল। ঠিক তখনই একটা হেডলাইটের তীব্র আলো তার মার্সিডিজের উইন্ডশীল্ডে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল। কোনো হর্ন না দিয়ে, উল্টো দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি তার গাড়িতে প্রলয়ঙ্কারী ধাক্কা মারল। শৌর্যের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। মার্সিডিজের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে এয়ারব্যাগ খোলার আগেই গাড়িটি হাইওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে পাশের এক গভীর খাদে তিনটে ডিগবাজি খেয়ে আছাড় পড়ল।
ঢাকার এক প্রাইভেট ক্লিনিকের করিডোরে দাঁড়িয়ে ফারহান কর্তব্যরত সার্জনের হাতে টাকার বান্ডিলগুলো তুলে দিচ্ছিল। এতগুলো মোটা অঙ্কের কড়কড়ে বান্ডিল দেখে ডাক্তার নিজেও কিছুটা অপ্রস্তুত ও অবাক হয়ে গেলেন। তিনি টাকা থেকে চোখ তুলে ফারহানের দিকে তাকালেন।
ফারহানের চোখ দুটো তখন সম্পূর্ণ নিস্প্রাণ, পাথরের মতো স্থির। ডাক্তারকে ওমন অবশ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফারহান বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “টাকা নিয়ে ভাববেন না, ডক্টর। ও যেন কোনোভাবেই এখন মা’রা না যায়। ওর লাইফ সাপোর্ট সচল রাখুন এবং যত দ্রুত সম্ভব ওকে সুস্থ করে তুলুন।”
Tell me who I am 2 part 21 (2)
ডাক্তার দ্রুত সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে আইসিইউর ভেতরের দিকে চলে গেলেন। ফারহান পেছনে ঘুরল। ওখানকার অপারেশন থিয়েটারের বড় কাচের দেওয়ালের ওপাশে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শৌর্যকে। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখে ভেন্টিলেটরের পাইপ গোঁজা আর মনিটরে তার হৃদস্পন্দন বিপ বিপ শব্দে ওঠানামা করছে।
ফারহান কাচের দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে তার পকেটে দুই হাত গুঁজে দিল। সে ভেতরের নিস্পন্দ শৌর্যের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সবে তো ফার্স্ট রাউন্ড শেষ হলো। গেম অন!”
