নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৩
জান্নাতুল ফেরদৌ
গতকাল পাহাড় থেকে ফেরার পর সুনেহেরার গা কাঁপিয়ে জ্বর আসে। এদিকে রাজ্য দখলের পায়তারা। সব মিলিয়ে আওলা ঝাওলা সাহাবাদ। বাইজিদ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। অঙ্কুরের বিশাল বহরের কাছে তারা নস্যি এখন। কারণ বেশির ভাগ সৈন্য তাদের কাছে বন্দি। হুট করে কি এক চিন্তা এলো বাইজিদ এর মাথায়। টেবিল থেকে কাগজ নিয়ে দোয়াতে কালি লাগিয়ে লিখতে বসলো। এক খানা চিঠি লিখে ফেলল তৎক্ষনাৎ। এই তার শেষ চেষ্টা। এটা ফলপ্রসূ না হলে রাজ্য ত্যাগ করতে হবে স্ত্রী সন্তান নিয়ে। চিঠি খানা একটা লোহার চার আঙ্গুল সমান ছোট্ট বাক্সে ভরে তার শ্বেত অশ্ব সিমুর্গের গলায় বেধে দিল। ঘোড়ার পিঠে দুটো বাহবা মূলক থাপ্পড় মারতেই হ্রেষা ধ্বনি তুলে ছুটে গেল। বাইজিদ অদূরে আনমনে চেয়ে। বাচ্চারা এখানে থাকতে চাইছে না। কী এক মুসিবত। এদিকে হেকিম জানালো সুনেহেরার অবস্থা ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। বাইজিদ ভাবলো আর সুনেহেরা কে এভাবে রাখা যাবে না। জানাতে হবে সবটা। বড় বড় পা ফেলে হেঁটে গেল হেকিমের ঘরে। দাসীদের বাইরে যাওয়ার নির্দেশ দিল? সুনেহেরার জ্বরে পোড়া কপাল টায় হাত রেখে বলল
“অনুশোচনা হচ্ছে বোন? ঠিক কি নিয়ে অনুশোচনা হচ্ছে বলতো? যাকে বাবা বলে সম্মান দিতি ভালো বাসতি নিজের আদর্শ মানতি, সে এমন জানোয়ার বেরোলো সেটা শুনে? নাকি বিনা অপরাধে নিজের ভালোবাসা কে হত্যা করলি সেই অপরাধ বোধে?”
সুনেহেরার আগুনের মত দপদপে চোখ জোড়া দিয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে পানি। বাইজিদ মৃদু হেসে বলল
“মাহাদি বেচে আছে সুনেরাহহ। তোর ওটুকু তলোয়ার এর খোচায় ওর কিছুই হয় নি। হ্যা তবে বড় সর ক্ষত হয়েছে, এখন বিশ্রামে আছে”
বাইজিদ উঠে যেতে নিলে সুনেহেরা হাত ধরলো
“ভাইজান…”
বাইজিদ ফের নিজের জায়গায় বসে। সুনেহেরা ক্লান্ত চোখ দুটো টেনেটুনে খুলে বাইজিদ কে বলে
“সে রাতে আমি আরেক জন বর্ম পরিহিত পুরুষ কে জাহাজের ডিঙিতে দেখেছিলাম। সে কে?”
বাইজিদ অকপটে উত্তর দিল
“আমি”
সুনেহেরা অবাক হয়ে তাকায়। বাইজিদ কাঁথা টা সুনেহেরার গায়ে টেনে দিয়ে বলে
“বিশ্রাম নে। খুব শিঘ্রই আমাদের রাজ্য জয় করতে হবে। তোকে ছাড়া হবে নাকি পাগলী? তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ।”
ফিরে যেতে নিয়ে দরজার সামনে থেকে আবার ফিরে বলে
“আর হ্যা। রাজ্য জয় করার পর কিন্তু তোর দায়-ভার আমি ওই পাথর মানব কে দিয়ে দিব। মা কে কথা দিয়েছিলাম তো।”
বাইজিদ চলে যায়। সুনেহেরার চোখ ভরে ওঠে আনন্দ অশ্রু তে। গত রাতে বাইজিদ এর কাছে সবটা শুনে পাজরের হাড় গুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে তার। এত বছর ধরে অঙ্কুর কে বাকের শাহ্ ই প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। এমন কি মেহেরুন্নেসা কে কয়েকবার হত্যা করার চেষ্টা করেছে। বাইজিদ কে হত্যার চেষ্টা করেছে। এমনকি নিজের স্ত্রী মাইমুনা শেখ কেও বাকের শাহ্ ই হত্যা করিয়েছে। ভালো মানুষের আড়ালে থাকা এই নোংরা মুখ খানা কে এত কাল নিজের আদর্শ মেনে এসেছে সে। ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপরেও।
বিশাল ভবন টার বারান্দায় মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা এসে কাধে হাত রাখলো। বাইজিদ চোখ বন্ধ রেখেই মেহেরুন্নেসা কে টেনে এনে কোলে বসালো। বিবাহের পর থেকেই একের পর এক ঝড় তাদের জীবনে স্ত্রী কে সময় দিয়ে উঠতে পারে না। মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর পাঞ্জাবির বোতাম আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করে। মিনমিন করে বলে
“খালি যুদ্ধ জয় করলেই হবে? প্রেমিকার মন জয় করতে হবে না?”
বাইজিদ : মানুষের মন জয় করার চেয়ে যুদ্ধ জয় করা সহজ প্রিয়তমা।”
মেহেরুন্নেসার অভিমান হয়। উঠে যেতে নিলে বাইজিদ ফের টেনে কোলে বসায়। কানের পাশে থাকা চুল গুলো গুজে দেয় আলগোছে। প্রিয়তমার চোখে পানি খেয়াল করে বাইজিদ বলে
“কাচের জানালায় পানি জমেছে। চোখেও আছে নাকি একটু?”
মেহেরুন্নেসা জবাব দেয় না। বাইজিদ আরো কাছে আনে মেহেরুন্নেসা কে। রাশভারি গলায় বলে
“দূরের ওই পাহাড় দেখতে পাচ্ছো মেহের?”
“পাচ্ছি”
“অথচ পাহার সম ব্যাথা নিয়ে আমি তোমার পাশে বসে আছি! তা দেখতে পাচ্ছো না? তবে তোমার মন জিতলাম কই?”
মিশর। সূর্য আর বালুর দেশ। দিগন্তজোড়া সোনালি মরুভূমি যেন আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে। দিনের বেলা উত্তপ্ত বালুকণা ঝলসে ওঠে সূর্যের আলোয়, আর সন্ধ্যা নামলে সেই একই মরুভূমি রক্তিম আভায় রূপকথার মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। তবে মিশর মানেই শুধু মরুভূমি নয়।
এই রাজ্যের প্রাণ হলো মহান নদী নীলনদ।
নীলনদের দুই তীর জুড়ে সবুজ শস্যক্ষেত্র, খেজুরের বাগান, আঙুরলতা আর অসংখ্য গ্রাম। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সোনালি মরুভূমির বুকে কেউ সবুজ রেশমের ফিতা বিছিয়ে দিয়েছে।
নদীর বুক চিরে ভেসে চলে বিশাল পালতোলা জাহাজ।
বন্দরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে বণিকদের নৌযান। মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। বাজারগুলো সুগন্ধিতে ভরা। দারুচিনি, কোথাও জাফরান, কোথাও বা গোলাপজল আর আগরকাঠের গন্ধ। মিশরের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদ। সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত সেই প্রাসাদ দূর থেকেই চোখে পড়ে।
উঁচু গম্বুজে খোদাই করা স্তম্ভ। রঙিন কাঁচের জানালা। ফোয়ারা আর বাগানে ঘেরা বিশাল অঙ্গন।
বিকেলে রাজপ্রাসাদের পশ্চিম বাগানে বসেছিলেন রাজকুমারী জাহরা আল-আমিরা।
মিশরের মানুষ তাকে ডাকত “নীলনদের চাঁদ”।
একটি সাদা মার্বেলের চৌকিতে বসে ছিলেন তিনি। তার সামনে ছোট্ট ফোয়ারা। ফোয়ারার জলে সূর্যের আলো চিকচিক করছে। চারপাশে গোলাপ, জুঁই আর নীল শাপলার বাগান।
খেজুর গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে নীলনদের জল।
জাহরা আল-আমিরার সৌন্দর্যের কথা মিশরের সীমানা পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত সুনাম রয়েছে।
কোমর ছাপিয়ে যাওয়া ঘন কালো চিল যেন অমাবস্যার রাত। চোখ দুটো দীর্ঘ, গাঢ় বাদামি।
চোখের পল্লব এত দীর্ঘ যে নিচে ছায়া পড়ে গালে।
গায়ের রং উজ্জ্বল সোনালি গমের মতো। নাক তীক্ষ্ণ ঠোঁট গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল।
হাসলে ডান গালে ছোট্ট টোল পড়তো।
কিন্তু শুধু রূপের কারণেই তিনি বিখ্যাত ছিলেন না। তিনি ছিলেন জ্ঞানী সাহসী অশ্বচালনায় পারদর্শী ধনুক চালাতে জানতেন রাজনীতি বুঝতেন। আর প্রয়োজন হলে সভাকক্ষে প্রবীণ মন্ত্রীদেরও ভুল ধরিয়ে দিতে পারতেন।
বিকেলে তিনি হাতে একটা পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসেছিলেন। প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর লেখা একটি বই। কিন্তু বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মন ছিল অন্য কোথাও। তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল নীলনদের দিকে। হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার ক্ষিপ্র খুরের শব্দ ভেসে এলো।
একজন প্রহরী দ্রুত এগিয়ে এলো। তার পেছনে একটি ঘোড়া। শ্বেতবর্ণ। দীর্ঘকায়, রাজকীয়। ঘোড়াটিকে দেখেই জাহরার বুক ধক করে উঠলো।
“ সিমুর্গ…”
ফিসফিস করে বললেন তিনি। ঘোড়াটিকে তিনি চিনলেন। কীভাবে চিনবেন না? বহু বছর আগে সাহাবাদে তিনি এই ঘোড়ার পিঠেই বাইজিদকে ছুটতে দেখেছিলেন। তিনি তরুণী ছিলেন।
আর বাইজিদ ছিলেন সুদর্শন টগবগে যুবক।
তার চোখের সামনে হঠাৎ বহু বছরের পুরোনো দৃশ্য ভেসে উঠলো। এক তরুণ শাহজাদা। সবুজাভ চোখ। দৃঢ় মুখশ্রী। অহংকারহীন ব্যক্তিত্ব।
জাহরা দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। প্রহরী মাথা নত করে চামড়ার নলটি এগিয়ে দিল। তার আঙুল কেঁপে উঠলো। সাহাবাদের রাজমোহর, বাইজিদের স্বাক্ষর। বহু বছর পরও সেই স্বাক্ষর তিনি ভুলেননি। চিঠি খুলতেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো। এই মানুষটাকে তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। বিয়ে ওবদি করেন নি আজও।
যৌবনের প্রথম সময় টাতে তিনি এমন একজন পুরুষকে দেখেছিলেন, যে তার রূপের প্রশংসা না করে তার মতামতের প্রশংসা করেছিল। যেখানে নিজের ছোট চাচার কলুষিত স্পর্শের শিকার হয়েছিল জাহরা ,সেখানে বাইজিদ এর নজর ছিল মারাত্মক সংযত। আত্মসম্মান এর সাথে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেছিল। কখনো তাকে তোষামোদ করেনি। অজান্তেই হৃদয়ের একটা অংশ তার জন্য রেখে দিয়েছিলেন তিনি।
যদিও জানতেন বাইজিদের হৃদয়ে অন্য একজনের স্থান আছে।
তবুও মাঝে মাঝে রাতে প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে তিনি ভাবতেন, যদি জীবনটা অন্যরকম হতো?
যদি তাদের প্রথম দেখা অন্য কোনো সময়ে হতো? বাইজিদ ও তার প্রেমে পড়ত?
যদি…
চিঠির শব্দগুলো পড়তে পড়তে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বাইজিদ সাহায্য চেয়েছে। মাত্র কয়েকটি লাইন লিখেছে জাহরার উদ্দেশ্যে। প্রতিটি লাইনের আড়ালে ভয়ংকর সংকটের ছায়া।
জাহরা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতর বহুদিনের চাপা অনুভূতিগুলো আবার জেগে উঠলো।
সেই শ্রদ্ধা, সেই মুগ্ধতা, সেই অসমাপ্ত ভালোবাসা যা নিয়ে সে সাহাবাদ থেকে ফিরেছিল। আর সে মুখো হয় নি। এক ফোঁটা হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে।
“এত বছর পরও তুমি সাহায্য চাইতে আমার কাছেই এলে, বাইজিদ। আমি তো ভেবেছিলাম ভুলেই গেছো আমায়”
তার কণ্ঠে অভিমান। এই অভিমান ও যেন এক ধরনের কোমল সুখ। পৃথিবীর হাজার মানুষের মধ্যে, এই মানুষ টার জন্যই তার নিবা নিশি আক্ষেপে কাটে।
তিনি চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। উচ্চস্বরে বললেন,
“সেনাপতিকে ডাকা হোক।
সেনাপতি আসলে আদেশ দিল
“যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত করো। অশ্বারোহী বাহিনী সমবেত করো”
সেনাপতি অবাক হলো ভিষণ। কোনো রাজ্য কি তাদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে?
“ক্ষমা করবেন মহারানী। কিন্তু বিষয় টা…?”
“সাহাবাদ দখল করেছে এক পৈশাচিক শয়তান। তাদের কাছে বন্দি আমাদের দেশের নামি দামি সকল চিকিৎসক। তারা আমাদের দেশের চিকিৎসক দের অপহরণ করে নিয়ে বিজ্ঞানের ভুল ব্যবহার করছে। শাহজাদা বাইজিদ সাহায্য চাচ্ছে। তাদের সৈন্য ও সেই শত্রু পক্ষের কাছে বন্দি”
সেনাপতি হুকুম পেয়ে গেল। জাহরা আল-আমিরা পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। তার যে হৃদয়ের গভীরে বহুদিনের সুপ্ত অনুভূতি আবার জেগে উঠছে।
এই নারী বহু বছর ধরে নীরবে ভালোবেসে এসেছে এক দূর দেশের শাহজাদাকে।
মিশরের রাজপ্রাসাদে রাজকুমারী জাহরা আল-আমিরার আদেশে অস্ত্রাগার খোলা হয়েছে।
সেনাপতি সহ নৌবহরের তালিকা তৈরি হচ্ছে।
ঘোড়ার খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসক, কামার, রসদ সবকিছুর হিসাব করা হচ্ছে। তবে এসবের আগে জাহরা নিজের কক্ষে ফিরে গেলেন। কক্ষের জানালা খুললেই দূরে নীলনদ দেখা যায়। সন্ধ্যার আলোয় নদীর পানি রুপালি হয়ে উঠেছে।
বাতাসে পর্দা উড়ছে। জাহরা নিজের লেখার টেবিলে বসলেন। তার সামনে খোলা কাগলের কাধি আর কালির দোয়াত। ময়ূরের পালকের কলম। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। কত বছর পর বাইজিদের কাছে লিখছেন? ১৫ – ১৬? হয়তো তারও বেশি। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। তারপর লেখা শুরু করলেন
“সাহাবাদের শাহজাদা বাইজিদ,
তোমার পত্র পেয়েছি। তোমার প্রয়োজনের সময় মিশর নীরব থাকবে না। আমি নিজে বাহিনী নিয়ে রওনা হচ্ছি। আল্লাহ চাইলে খুব শীঘ্রই দেখা হবে।”
-জাহরা আল-আমিরা”
চিঠিটা শেষ করে তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন শেষ লাইনটার দিকে।
“খুব শীঘ্রই দেখা হবে।”
এই কয়েকটা শব্দের মধ্যে কত বছরের না বলা কথা লুকিয়ে আছে, সেটা শুধু তিনিই জানেন। তার এক ঝলক দেখা পাওয়ার জন্য মনটা কতই না আকুপাকু করেছে এতকাল। অবশেষে চিঠিটা গুটিয়ে সিলমোহর লাগানো হলো। এরপর ডাকা হলো সিমুর্গকে। সাদা ঘোড়াটা প্রাসাদের অঙ্গনে দাঁড়িয়ে ছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও যেন ক্লান্ত হয়নি।
জাহরা নিজ হাতে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন।
“তোমার মালিক কে বলো…”
বলে থেমে গেলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
“না, কিছু বলো না। চিঠিটাই যথেষ্ট।”
চিঠি বাঁধা হলো সিমুর্গের গলায়। কিছুক্ষণ পরই ঘোড়াটা মরুভূমির পথ ধরে ছুটে চলল।অবশেষে সিমুর্গ পৌঁছে গেল সাহাবাদের প্রশিক্ষণ দুর্গে।
বিকেলে বাইজিদ সৈন্যদের সঙ্গে আলোচনা করছিল। একজন প্রহরী হঠাৎ দৌড়ে এসে বললো,
“শাহজাদা! সিমুর্গ ফিরেছে”!
বাইজিদ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো। দুর্গের ফটকের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলো তার প্রিয় অশ্বটা দাঁড়িয়ে আছে। বাইজিদের মুখে বহুদিন পর সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠলো। সে এগিয়ে গিয়ে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরলো।
“ফিরে এসেছিস?”
সিমুর্গ নাক ঘষলো তার কাঁধে। তারপর বাইজিদ চিঠিটা খুললো। পড়তে পড়তে তার চোখে দীর্ঘদিন পর আশার আলো ফুটে উঠলো। মিরান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইজিদ চিঠিটা গুটিয়ে বললো,
“তারা আসছে। তারা আসছে, শোনো সবাই তারা আসছে”
মিরান ভ্রু তুললো।
“কারা?”
বাইজিদের চোখে খুশির ঝিলিক
“মিশরীয় বাহিনী আসছে। এবার আমরা রাজ্য জয় করবো। শয়তানদের শাস্তি দেবে।”
সবাই জানে মিশরের সামরিক শক্তি কোনো সাধারণ রাজ্যের মতো নয়। এদিকে শত মাইল মাইল দূরে মিশরে তখন যুদ্ধ প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। নীলনদের বিশাল ঘাটে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধজাহাজ। কামাররা তলোয়ার ধার দিচ্ছে। ধনুকের ছিলা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বর্ম পালিশ করা হচ্ছে। অশ্বারোহী বাহিনী মাঠজুড়ে মহড়া দিচ্ছে। সৈন্যদের পতাকায় বাতাস লেগে ফটফট শব্দ হচ্ছে। সোনালি মরুভূমির বুক কাঁপিয়ে যুদ্ধের ঢাক বাজছে। রাজকুমারী জাহরা নিজেও প্রস্তুত হচ্ছেন। তার কক্ষে দাসীরা ভ্রমণের পোশাক গুছিয়ে রাখছে। সেনাপতিরা একের পর এক এসে নির্দেশ নিচ্ছে। কিন্তু সবার অগোচরে একসময় তিনি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
দূরে নীলনদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
বহু বছর আগে বিদায়ের দিনে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। কিন্তু ভাগ্য আবার তাদের পথ এক করে দিয়েছে। যদিও কোনো উৎসব বা কোনো সন্ধি চুক্তির জন্য নয়।
যুদ্ধের জন্য। সেই যুদ্ধের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে সাহাবাদের শাহজাদা। জাহরার প্রেমিক পুরুষ।
দুদিন পর বৈশাখ মাস শুরু হলো। শীতের শেষ স্মৃতিগুলো অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। চারদিকে এখন নতুন পাতার সবুজ।
গাছে গাছে কচি পাতা। বনে বুনো ফুলের সমারোহ। গরম এখনও পুরোপুরি চেপে বসেনি, তবে বাতাসে বৈশাখের আগমনী স্পর্শ স্পষ্ট।
প্রকৃতির এই নতুন সাজ কারও চোখে পড়ছে না।
রাজ্য দখন করেছে নরপিশাচ রা। প্রজাদের মনে শান্তি নেই।
প্রশিক্ষণ দুর্গের ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে।
কামাররা দিনরাত আগুন জ্বালিয়ে অস্ত্র তৈরি করছে। তাদের অস্ত্রাগার ও অঙ্কুরের দখলে।
তাছাড়া সংখ্যায় তারা খুবই কম। অঙ্কুরের বাহিনী বিশাল। তার সঙ্গে রয়েছে অচেনা বিদেশি সৈন্যদল। অসংখ্য অশ্বারোহী, অসংখ্য ধনুর্ধর।
আর তাদের? যুদ্ধ করার ইচ্ছা, সাহস কিন্তু সৈন্য কম। খুবই কম।
দুর্গের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে মেহেরুন্নেসা দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতর অস্বস্তি। বাইজিদ যতই নিশ্চিন্ত দেখাক, সে বুঝতে পারছে পরিস্থিতি কত ভয়াবহ। সে ধীরে ধীরে বললো,
“এত অল্প সৈন্য নিয়ে আমরা কীভাবে যুদ্ধ করবো?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুনেহেরা কোনো উত্তর দিল না। তার মনও অন্য কোথাও পড়ে আছে।
দূর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো।
প্রথমে মনে হলো বজ্রধ্বনি। তারপর শব্দটা আরও স্পষ্ট হতে লাগলো। হাজার হাজার মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ।
-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!
– লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!
-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!
দুর্গের প্রাচীরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকালো। শব্দটা আসছে পূর্ব দিক থেকে। প্রহরীরা দ্রুত সতর্ক হয়ে গেল। ধনুক তুলে ধরলো। মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো।
দিগন্তের কাছে ধুলোর বিশাল মেঘ উঠছে।
মনে হচ্ছে পুরো মাটি কাঁপছে। ধীরে ধীরে দৃশ্যটা স্পষ্ট হতে লাগলো। প্রথমে দেখা গেল পতাকা, অনেকগুলো পতাকা। তারপর দেখা গেল অশ্বারোহী বাহিনী। তারপর আরও,আরও, আরও। যেন শেষই হচ্ছে না। সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে অসংখ্য বর্ম। অসংখ্য বর্শা, অসংখ্য তলোয়ার।
সামনের সারিতে কালো ও সোনালি পতাকা উড়ছে। পতাকার গায়ে সোনালি আরবি হরফে লেখা
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো। এত বিশাল বাহিনী তারা জীবনে খুব কম দেখেছে। এদিকে দুর্গের নিচে ইতিমধ্যে হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। মিরান দ্রুত প্রাচীরে উঠে এলো। তার পেছনে বাইজিদ।
বাইজিদ দূরের সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে রইলো। অনেকদিন পর তার মুখে এমন হাসি ফুটলো। মেহেরুন্নেসা বহু মাস দেখেনি এমন হাসি। আজ মন ভরে দেখলো। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে বললো
“আপনি হাসছেন কেন?”
বাইজিদ দৃষ্টি না সরিয়েই উত্তর দিল,
“কারণ সাহাবাদ এর বিজয় এগিয়ে আসছে বেগম”
সেনাবাহিনীর মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো একটি বিশাল সাদা অশ্ব। অশ্বটির পিঠে বসে আছে সোনালি অলংকরণ করা বর্ম পরা এক নারী। তার পেছনে সারি সারি সেনাপতি। আর তারও পেছনে হাজার হাজার সৈন্য। সূর্যের আলোয় নারীর কালো চুল বাতাসে উড়ছে। তিনি সোজা তাকিয়ে আছেন প্রশিক্ষণ দুর্গের দিকে। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে ফিসফিস করলো,
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬২
“উনি কে?”
বাইজিদের চোখে তখন অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
সে ঠোটে হাসি নিয়ে বললো,
“মিশরের রাজকুমারী। জাহরা আল-আমিরা।”
