এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫২
নুসরাত ফারিয়া
সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর আজ বাপের বাড়িতে এসেছে আলো। আধার রেখে গিয়েছে এবং সাবধানে থাকতে বলেছে। ভার্সিটিতে ক্লাস থাকার জন্য সে থাকতে পারেনি, তবে ভার্সিটি শেষে রাতে আসবে। আলো আসার পর থেকে খেয়াল করেছে, ওর ছোট বোন কিছুটা পাল্টেছে। তার সাথেও ভালো করে কথা বলছে না, সারাক্ষণ নিজেকে রুম বন্দী করে রাখছে। হুট করে হাসিখুশি থাকা মেয়েটার কি হলো সেটা জানতে মায়াকে চেপে ধরে। কারণ এরা দুজন একে অপরের সাথে সবকিছু শেয়ার করে। নিশ্চয়ই ছায়ার এমন পরিবর্তনের কারণ মায়া জানে। কয়েক দিন আগে মৃন্ময়ের রাখা ইভেন্টের শেষে কি কি হয়েছিল এবং দেখেছে, সবকিছু মায়া বলে দেয় বড় আপুকে। সবটা শুনে আলো কিছুক্ষণের জন্য থম মে’রে ছিল। পরপরই ছোট বোনের কাছে ছুটে যায়।
-“ছায়া?”
ছায়া মনম’রা হয়ে ছাঁদের একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন বড় বোনের ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। আলো বোনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমরা যেটা খুব করে চাই, সেটা সবসময় পাই না। এক জীবনে যদি সবকিছুই পেয়ে যাই, তাহলে আর আফসোস কিসের থাকবে?”
বোনের কথার মানে বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ছায়ার। মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই আপুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল এবং বলল,
-“কেন, কেন আপু? কেন হলো এমন? আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছি? শুধু আমার গায়ক সাহেব কে চেয়েছিলাম। কিন্তু…কিন্তু উনি আমারে না, অন্য কাউকে চায়। যে মেয়ে অতীতে উনাকে ধোঁকা দিয়েছে, উনি সেই মেয়েকেই চান। ভালোবাসা এত নিষ্ঠুর কেন আপু? জানো? আমার না অনেক কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা করছে। তোমার বোন এই ব্যথা কীভাবে সইবে আপু? কীভাবে?”
আলো বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখদুটো বুজে নিল। সে কি বলে সান্ত্বনা দিবে মেয়েটাকে? তার যদি সাধ্য থাকত, তাহলে এক্ষুনি ছুটে গিয়ে মৃন্ময়কে এনে দিত। কিন্তু, তার যে এই ক্ষমতা নেই। তবে এই কষ্টের থেকে বোনকে বের করার একটা উপায় রয়েছে। আলো কিছু একটা ভেবে নিজেকে সামলিয়ে বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,
-“কষ্ট পাস না বোন! জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না। আমাদের ভাগ্যে যা নেই, তা আমরা হাজার চাইলেও পাবো না।”
ছায়া কিছু বলল না, শুধু আপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল।
মৃন্ময় একটা কফিশপে এসেছে। মূলত একজনের সাথে দেখা করতে। ওর পরণে কালো হুডি, জিন্স, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাক্স! সেলিব্রিটি হলে এই এক জ্বালা, যেখানে সেখানে যাওয়া যায় না। সে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসল। কিছুক্ষণ পর সেখানে তিশা হাজির হয়। আজ মেয়েকে নিয়ে আসেনি, বাড়িতে ন্যানির কাছে রেখে এসেছে। পরনে মৃন্ময়ের পছন্দের রঙের নীল জর্জেট শাড়ি৷ সে হেলেদুলে মৃন্ময়ের সামনে গিয়ে বসল।
-“এখানে না এসে আমার বাড়িতে আসতে পারতে।”
মৃন্ময় শান্ত গলায় জবাব দিল, -“আমি যেখানে সেখানে কম্ফোর্ট ফিল করি না। যাইহোক, কি খাবে বলো?”
-“কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তোমাকে দেখে মন, পেট দুটোই ভরে গেছে।”
-“রায়া কেমন আছে?”
-“ভালো, তোমাকে পাপা হিসেবে পেলে আরো ভালো থাকবে। তা আমরা কবে বিয়ে করছি, রাজ?”
মৃন্ময় প্যান্টের পকেট থেকে একটা চেক বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, -“মেয়েকে মানুষ করতে তোমার যত টাকা প্রয়োজন, সেটার এমাউন্ট এখানে লিখে ব্যাংক থেকে তুলে নিও৷ আমি সাইন করে দিয়েছি।”
তিশা অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“মানে?”
-“মানে এই যে, আমি তোমার জীবনে ফিরছি না। তুমি আমার অতীত ছিলে, কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অন্য কেউ। আমি শুধু রায়ার জন্য সময় চেয়েছিলাম, মেয়েটাকে পৃথিবীর সব সুখ এনে দিতে পারলেও পিতার সুখ দিতে পারব না। তুমি চাইলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো, যে তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে ভালোবাসবে।”
-“কিন্তু….আমি তোমাকে চাই রাজ!”
-“আমি কোনো বেইমানকে চাই না তিশা।”
মৃন্ময়ের সোজাসাপ্টা জবাব শুনে তিশা অসহায় কণ্ঠে বলল, -“অতীত ভুলে আবার নতুন করে জীবন শুরু করা যায় না?”
-“না যায় না, অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
-“তুমি যতই আমার সামনে নিজের আত্মসম্মান দেখাতে চাও না কেন, তবুও আমি জানি তুমি আজও আমাকে ভালোবাসো।”
-“যদি তাই হতো, তাহলে ওইদিনই তোমার কাছে ছুটে যেতাম, যেদিন তোমার সো কোল্ড স্বামী তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিল। আমি আমার অতীত ভুলে জীবনে এগিয়ে গেয়েছি, আর এখন এই মৃন্ময়ের জীবনে অতীতের কোনো চিহ্ন নেই। আমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তুমিও নেই। তুমি শুধুই ছিলে আমার খারাপ অতীত মাত্র৷ এ নতুন জীবনে তোমার কোনো ঠাঁই নেই, তিশা৷ অতীতে যেভাবে আমাকে ভুলে গিয়েছিলে, এখনো সেভাবে ভুলে যাও। কারণ এখন আমি তোমার রাজ নই, শুধু গায়ক মৃন্ময় আহমেদ ওরফে এমএ!”
-“এতটা না পরিবর্তন হলেও পারতে রাজ..!”
মৃন্ময় তাচ্ছিল্যের সুরে আওরাল, -“এই তুমিই আমাকে বদলাতে বাধ্য করেছিলে।”
তিশা চেক বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল, -“শেষ বারের মতো তোমার প্রথম ভালোবাসা কে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”
মৃন্ময় চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, -“মৃন্ময় কাউকে সেকেন্ড চান্স দেয় না!”
-“তাহলে বিয়ে করছো না কেন?”
মৃন্ময় চলে যেতে চেয়েও থেমে গেল। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তিশার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,
-“আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে৷ তোমার দাওয়াত রইল। অবশ্যই আসবে কিন্তু! সঠিক সময়ে বিয়ের কার্ড পৌঁছে যাবে তোমার বাড়িতে।”
আলো দুপুরের দিকে গোসল করে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল টেবিলের ওপর একটা বিয়ের কার্ড রাখা রয়েছে। এটা দেখে কপাল কুঁচকে গেল। গলা উঁচিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,
-“এটা কার বিয়ের কার্ড, মা?”
আলেয়া রহমান ডাইনিং টেবিলের ওপর খাবার সাজিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, -“মাহিনের।”
নামটা শুনে আলোর হাত থেকে তোয়ালে পড়ে গেল নিচে। সে ছুটে এসে কার্ড টা খুলে ভালো করে দেখতে লাগল। বরের নামের জায়গায় ‘মাহিন’ লেখা এবং বউয়ের নামের জায়গায় ‘তানিয়া’ লেখা। তাদের আগামী মাসে বিয়ে! আলো পুরো কার্ড পড়তে পারল না, এক দৌড়ে নিজের রুমের ভেতর চলে গেল। তারপর ফোন খুঁজে বের করে সোজা মাহিন ভাইয়াকে কল দিল।
-“কেমন আছিস ছোট্ট কবুতর?”
মামাতো ভাইয়ের কথা শুনে আলো অস্থির গলায় শুধাল,
-“তুমি…তুমি বিয়ে করছো?”
-“হ্যাঁ!”
-“কিন্তু কেন? তুমি না অন্য কাউকে চাইতে? তাহলে?”
ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিশ্চুপ। আলো আবারো বলে ওঠে, -“তুমি চাইলে, আমি এ বিষয়ে মা-বাবার সাথে কথা বলব ভাইয়া। তবুও প্লিজ এই বিয়েটা করো না!”
মাহহিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, -“আমি মা কে ছায়ার কথা বলেছিলাম, কিন্তু মা চায় না ওকে।”
আলো অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কেন? কোনো সমস্যা?”
-“মেঘ মা’রা যাবার পর মা আর চাচ্ছে না রহমান পরিবারের কেউ এ বাড়ির বউ হয়ে আসুক।”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বিরবির করল, -“তারমানে মামি মনে মনে এটা মানে? আমাদের জন্যই উনি উনার স্বামী, মেয়েকে হারিয়েছে? যেখানে আমরাও আমাদের পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। কই, আমরা তো তোমার বোনকে বা তোমার পরিবারকে দোষারোপ করিনি? তোমার হুট করে আমাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে, তবুও আমরা কিছু মনে করিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি এর পিছনের আসল কারণ।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল, -“এখন বলো, তুমি কি চাও?”
-“আমার জীবনে মা বলতে আর কেউ নেই। বাবাকে হারিয়েছি, কিন্তু মাকে হারাতে পারব না আলো৷ তাই আমি আমার মায়ের ইচ্ছেটাকেই মেনে নিয়েছি।”
আলোর কেন জানি খুব কান্না পেল। তার ভাই, বোনের
ভাগ্য এত খারাপ কেন? একজন নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েও হারিয়ে ফেলল, সাথে নিজের প্রাণও। আরেকজন একতরফা ভালোবেসে প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছে। তার কাছে একটা শেষ উপায় ছিল, বোনের কষ্ট কমানোর জন্য। কিন্তু এখন সেটাও আর নেই। সে কোনোমতে কান্না গিলে খেয়ে ধরা গলায় বলল,
-“নতুর জীবনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভাইয়া। দোয়া করি, আগামী জীবন তোমাদের সুখের হোক! আচ্ছা, ভালো থেকো। আল্লাহ হাফেজ।”
একথা বলে লাইন কেটে দিয়ে ফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে মা’রল। দু’হাতে মাথার ভেজা চুল খামচে ধরে নিরবে কেঁদে দিল। তার বোন কি কখনো সুখের মুখ দেখবে না? কেউ কি তাকে একটুও ভালোবাসবে না? মেয়েটার ভাগ্যে কি ভালোবাসা বলে কিছু নেই? তার মতো যদি ওর বোনটাও প্রিয় মানুষটিকে পেত, তাহলে কতোই না ভালো হতো। অন্তত জীবনে ভালোবাসা না পাওয়ার আফসোস থাকত না। তার ভাই-বোনদের ভাগ্য এত নিষ্ঠুর না হলেও পারত!
মৃন্ময় সন্ধ্যা বেলা বাড়িতে ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
-“পাত্রী দেখা শুরু করো, এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে করব।”
ছেলের কথা শুনে মারুফা আহমেদ চমকে উঠলেন। তিনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মিরা ভিডিও কলের ওই পাশ থেকে বলল, -“সতিই তুমি বিয়ে করবে ভাইয়া?”
মৃন্ময় ল্যাপটপের সামনে বসতে বসতে বলল, -“হুম, সত্যিই।”
-“আমার পছন্দের একজন রয়েছে ভাইয়া। তবে একটু বয়স কম এই!”
-“ক্লাস টেনের হলেও চলবে, বাট…ফিডার খাওয়া বাচ্চা না হলেই হবে।”
মিরা শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল, -“আরেহ না না, এত ছোট না। এই উনিশ, বিশ বছর। মজার ব্যাপার হলো ওই পুঁচকে তোমাকে হেব্বি ভালোবাসে।”
মৃন্ময় এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, -“তুই কীভাবে জানলি?”
-“কেউ একজন বলেছে আমায়। ধরে নাও, তোমার কাছের মানুষ।”
মৃন্ময়ের মাথা ব্যথা করছে, তাই সে অত ভাবল না। শটকার্টে শুধু মায়ের উদ্দেশ্যে এইটুকু বলল, -“তোমাদের যাকে পছন্দ হয় তার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক করো৷ আর সেটা এই সপ্তাহের মধ্যেই! নয়তো সারাজীবন কুমার থেকে যাবো বলে দিলাম।”
রাত দশটার দিকে আধার শ্বশুর বাড়িতে এল। গাড়ি পার্ক করে ডোর খুলে ভেতরের দিকে যেতেই দেখতে পেল, মতিউর রহমান একজন ডক্টরের সাথে বাইরে আসছেন। এসময়ে ডাক্তারকে দেখে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। কারোর কিছু হয়েছে নাকি? প্রশ্নটা মনের মাঝে উঁকি দিতেই সে বড় বড় পা ফেলে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“সব ঠিক আছে আব্বু?”
মতিউর রহমান ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, -“বড় মেয়েটা হঠাৎই জ্ঞান হারিয়েছিল, তাই ডাক্তারকে ডেকেছিলাম। তুমি ভেতরে এসো!”
বউ জ্ঞান হারিয়েছে জানতে পেরে আধার হাঁটতে হাঁটতে অস্থির গলায় জানতে চাইল, -“ডাক্তার কি বললেন? ও সুস্থ আছে তো?”
-“কিছুটা।”
আধার থেমে গিয়ে অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কিছুটা মানে? ওর কি হয়েছে?”
-“ভেতরে চলো, তারপর বলছি।”
শ্বশুরের থমথমে মুখ দেখে আধার বেশ চিন্তিত হয়। সে শ্বশুরকে রেখেই তড়িঘড়ি করে ছুটে চলে যায় ভেতরে। আলো বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে ছিল। কেঁদেকুটে চেহারার বারোটা বাজিয়েছে। অর্ধাঙ্গিনীর এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে আধারের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ছুটে এসে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
-“কি হয়েছে? তোমার এই অবস্থা কেন?”
রুমের ভেতর সবাই উপস্থিত ছিল। হুট করে এইভাবে জড়িয়ে ধরার ফলে আলো কিছুটা লজ্জা পেল। তড়িঘড়ি করে স্বামীর বুক থেকে মাথা তুলে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“কিছু হয়নি, ছাড়ুন আমাকে।”
-“কিছু না হলে ডাক্তার কেন এসেছিল? তুমি আমার থেকে কিছু লুকানোর চেষ্টা করছো?”
পাশ থেকে ছায়া বলে উঠল, -“এটা লুকিয়ে রাখা যায় না ভাইয়া। তিন-চার মাস পর এমনিই বেরিয়ে আসবে।”
আধার বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, -“মানে? কি বেরিয়ে আসবে?”
ছায়া কিছু বলতে যাবে তখনই আলো চোখ রাঙায়। ওইদিকে আধার অধৈর্য্য হয়ে আবারো জিজ্ঞেস করল,
-“কি হয়েছে আমাকে বলবে কেউ? শুধু শুধু হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার কোনো মানেই হয় না।”
আলেয়া রহমান ও নীলিমা রহমান ঠোঁট টিপে হেঁসে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। উনার পিছু পিছু ছায়া, মায়াও চলে যায়। সবাইকে চলে যেতে দেখে আধার চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“কিছু না বলে সবাই চলে যাচ্ছে কেন? আশ্চর্য!”
আলো শুকনো ঢোক গিলে ফিসফিস করে বলল, -“সবটা বলব আপনাকে, তবে রাগারাগি করতে পারবেন না।”
-“দোষ করলে অবশ্যই রাগারাগি করব।”
-“আমার শুধু দোষ নেই, আপনারও আছে।”
-“আমি আবার কি করলাম?”
-“সবকিছু তো আপনিই করেছেন।”
-“ত্যাড়ামি না করে পরিষ্কার করে বলো, কি হয়েছে?”
-“আপনি যেটা চাননি, ওটাই হয়েছে। অবশ্য এর পিছনে আমারই হাতপা রয়েছে। কারণ আমি তাকে খুব করে চেয়েছি।”
আধারের মেজাজ খারাপ হলো। এই মেয়েটা সবসময় কথা ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলে কেন?
-“কাকে চেয়েছো? নিজের প্রেমিক কে?”
আলো দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“না। আমাদের দুজনের ভালোবাসার ফল কে চেয়েছি।”
-“তা কি ফল পেলে? আর ফল-টা টক না মিষ্টি?”
স্বামীর এহেন কথা শুনে আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“মজা করছেন আপনি?”
-“হ্যাঁ।”
আলো রেগেমেগে স্বামীকে দূরে ঠেলে চিল্লিয়ে উঠল,
-“আপনি আপনার মজা নিয়েই থাকুন, আমার কাছে আসতে হবে না। চলে যান এখান থেকে।”
-“ঠিক আছে।”
একথা বলে আধার উঠে দরজার দিকে যেতে লাগল। আর আলো ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল। সে তো এমনি বলল কথাটা। তাই বলে লোকটা চলে যাবে? এমনিতেই সে দ্বিধায় পড়ে আছে৷ খবরটা পেলে মানুষটা কেমন রিয়াক্ট করে কে জানে। তার এসব ভাবনার মাঝেই দরজা লাগানোর শব্দ পেয়ে, চট করে সামনে তাকায়।
আধার ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে আসতে আসতে হিসহিসিয়ে বলল, -“তুমি যতবার আমাকে দূরে যেতে বলবে, ঠিক ততবারই তোমার আরো কাছে আসব আমি।”
আলো ভয় পেয়ে খানিক পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, -“এখন এসব করা কিন্তু ঠিক নয়, স্যার।”
আধার শার্ট খুলে এগিয়ে এসে, অর্ধাঙ্গিনীর পা চেপে ধরে এক ঝটকায় কাছে নিয়ে এল।
-“কেন? তোমার পিরিয়ড হয়েছে?”
আধার ঝুঁকে মেয়েটার ঠোঁটের কোণে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল। আলো চোখ বুজে ঘাড় কাত করে বিরবির করল, -“ওটার থেকেও অনেক বড় কিছু হয়েছে।”
আধার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে জানতে চাইল, -“কি?”
আলো নিশ্বাস আঁটকে রেখে বলে উঠল,
-“আ…আমি প্রেগন্যান্ট!”
অর্ধাঙ্গিনীর বলা ছোট বাক্যটা কর্ণপাত হতেই আধারের হৃদয় থমকে গেল। সে তড়াক করে মাথা তুলে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল, -“কি বললে তুমি?”
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫১
আলো পিটপিট করে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে আওরাল,
-“আপনি বাবা হতে চলেছেন, মি. খান। আপনার অংশ, আপনার র’ক্ত, আমাদের দুজনের ভালোবাসার পূর্ণতার ফল, খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে আসতে চলেছে।”
