Home কাছে আসার মৌসুম কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৪

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৪

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৪
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

ইউশা ঘরে ঢুকতে গিয়েও থমকে যায়। অয়নকে তখন যতই স্বাভাবিক দেখতে লাগুক,ও জানে তুশির মা হওয়ার খবরে মানুষটার খারাপ লেগেছে,কষ্ট হয়েছে। অবশ্য হওয়াই তো স্বাভাবিক। শত হলেও একটা সময় ভালোবেসেছিল। ইউশা দোনামনা করল ভেতরে যাবে কিনা! অয়ন ভাইকে কি ওর একটু একা থাকতে দেয়া উচিত?
অয়ন খাটে শুয়েছিল। সেখানে থেকেই দেখতে পেলো,মেয়েলি একটা ছায়া ফ্লোরে ভেসে আছে। ডাকল সঙ্গে সঙ্গে,
“ কী? ভেতরে এসো।”
নড়ে উঠল ইউশা। চোখদুটো কাঁপল বিস্ময়ে। অয়ন ভাই ওর উপস্থিতিও বুঝতে পারে আজকাল? ত্বরিত ঢুকল ও। ঘর অন্ধকার দেখে বলল,

“ আলো জ্বালাওনি?”
“ না, মাথা ব্যথা করছে?”
অয়ন চোখের ওপর থেকে হাতটা নামাল। ইউশা চিন্তিত মুখে এগিয়ে আসে।
“ সে কী! বললে না তো।”
“ সেজন্যেই তো ডেকেছি। টিপে দিতে পারবি?”
“ কেন পারব না?”
অয়নের মাথার কাছে এসে বসল ইউশা। কপালের দুপাশ পেলব আঙুল দিয়ে চেপে চেপে খুব সুন্দর ভাবে মালিশ করে দিচ্ছে যখন,হঠাৎ ডাকল অয়ন
“ ইউশা!”
“ হুঁ?”
“ আমার খারাপ লাগছে না।”
হাত দুটো তত্র থেমে গেল ইউশার। থতমত খেয়ে বলল,
“ আমি তো মানে…”
“ কিছু বলিসনি। কিন্তু ভেবেছিস। আমার সত্যিই খারাপ লাগছে না। আমি আর তুশিকে নিয়ে ভাবি না। আমি সারাক্ষণ এখন তোকে নিয়ে ভাবি,তোকে দেখি, তোকে নিয়ে থাকি! একজনকে নিয়ে ভাবতে বসলে,অন্যজন মাথা থেকে বেরিয়ে যায়। তেমন আমার মস্তিষ্ক থেকে তুশিও চলে যাচ্ছে। আর ওর বিয়ে হয়েছে,সংসার করছে,একদিন মা হবে জানা কথা। খারাপ লাগবে কেন? সিম্পল ভাবে নিয়েছি। যাক গে, কথাগুলো মোটেই তোকে খুশি করতে বলিনি।”

ইউশা চুপ করে রইল। কাচুমাচু চেহারা নত হয়ে গেছে। অয়ন ভাই রেগে গেছে হয়ত। আবার তো তুই করে বলল। এখন উত্তর দেয়ার মতো মুখ ওর নেই। কেন ও ভাবল ওসব? অয়নের মাথা টিপতে বসায় ইউশা একটু কাত হয়ে গেছিল। অয়ন মূহুর্তে ওর ঝুঁকে বসা শরীরের দিকে এগিয়ে মাথাটা বুকে গুজে দিলো। বজ্রের ন্যায় কেঁপে উঠল ইউশা। বিস্ময়ে চোখ ছড়াল,নিস্তব্ধ হয়ে রইল সারা মুখ। তার শীর্ণ দেহের এই তরঙ্গের ন্যায় কাঁপুনি টের পেলো অয়ন।
হাসল চোখ বুজে। কপালের একটা দিক ছুঁয়ে দেখাল,
“ ,এখানে বেশি ব্যথা করছে।”
ইউশা ঢোক গেলে। হাত তো চলবে না এখন। অয়নের সরু নাকটা ওর গলার কাছে। শ্বাস-প্রশ্বাস সব বুক ছুঁয়ে দিচ্ছে। কাঁপছে- টলছে শরীর। এভাবে হয়? মিনমিন করে বলল,
“ একটু সরলে ভালো হত না?”
“ কেন?”
“ না মানে,ওই…”
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“ ওইদিন না বাচ্চা চাইলি? বাচ্চা নিতে হলে তো আরো অনেক কিছু সহ্য করতে হবে। তখন?”
লজ্জায় ইউশা চোখ খিচে নিলো।
খোদা,কোন আক্কেলে ওইদিন ও ওরকম কথা মুখে এনেছিল? কোন শয়তানের উষ্কানিতে? ওকে এখন কেউ জুতো দিয়ে মারো!

সাত মাস পর….
তুশির আজ ক্লাস ফোরের শেষ পরীক্ষা। পেটটা এখন ভীষণ ভারি আর বড়ো হয়েছে। বাচ্চার ওজনও ভালো। একইরকম ফ্রেশ রিপোর্ট। নরমাল ডেলিভারিতে আশঙ্কাই নেই। তবে এখনো জানা যায়নি ছেলে না মেয়ে!
জন্মের আগে এই তথ্য দেয়া আইনত অপরাধ। সাথে তুশিও জানতে চায় না। ও ভেবেই নিয়েছে ওর মেয়ে হবে। সারাক্ষণ মেয়ে মেয়ে করছে। খেলনা পুতুল কিনছে। মেয়েদের জামাকাপড়, জিনিসপত্র এখনই কামরায় ভরতি।
পরীক্ষা আরো আগে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকা জুড়ে একটা গ্যাঞ্জামের দরুণ সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের কাজ পিছিয়ে গিয়েছিল প্রায় তিন মাসের মতোন। সেজন্যেই তো পিছিয়ে গেল তুশিও।
ওর পরীক্ষার সব গুলো দিন সাথে মা, অথবা বড়ো মা এসেছে। ইউশা ক্লাস রেখে ফুরসত পেয়েছে আজ। তাই আজ এসেছে ও। তুশির এখন হাঁটতে একটু সমস্যা হয়। সেই ছিপছিপে শরীরটা পানি নেমে ফুলেছে কিছুটা। আপাদমস্তক ঢাকতে ও একটা বিশাল ঘেরের আনারকলি পরেছে। ওরনাটা পিঠ থেকে এনে দুই কাঁধে মেলে দেয়া।
গাড়িতে উঠতে গিয়ে ওর হঠাৎ চোখ পড়ল ফুটপাতে।
ফুচকার ভ্যান দেখেই বলল

“ খাবে,ইউশা?”
“ জি না। এই সময় এসব বন্ধ। সোজা গাড়িতে উঠুন।”
তুশি গাল ফুলিয়ে বলল,
“ তুমি দেখছি তোমার ভাইয়ের মত করছো।”
“ আমার ভাই আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছে,আপনি এসব খেতে চেয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়লেও আপনাকে যেন না দেয়া হয়।”
তুশি বুঝল,উপায় নেই। মলিন চোখে আরেকবার ফুচকায় চেয়ে উঠে বসল ভেতরে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
“ থাকো ফুচকা, আর কিছু দিন পর আমাদের আবার দেখা হবে!”
ইউশা নিজের শাঁড়ির আঁচল দিয়ে তুশির মুখচোখের ঘাম মুছে দেয়। বলে,
“ মনে হচ্ছে না যে হবে। বাচ্চা হওয়ার পরেও খাবার দাবারে অনেক নিয়ম থাকে। মাকে দেখতাম,মিন্তু হওয়াতে কত কী খেতো না! যাক গে, তুশি তোমার ডেলিভারির তারিখ তো বারো তারিখ পড়েছে। আজ ১ তারিখ। আর মাত্র এগারো দিন। কী মজা,তারপর বাবু আসবে! আমি ওকে সারাদিন কোলে নিয়ে বসে থাকব।”
তুশি মুখ ভার করে বলল,

“ আমার মেয়েকে আমি কোনো বজ্জাত খালার কাছে দেব না।”
“ তোমার দেয়ার আশায় কে থাকবে? ও তোমার একার মেয়ে? ও তো আমারও।”
তুশি অমনি ঘুরে বসে হাসিহাসি চেহারায় বলল,
“ তাহলে চলো ইউশা ফুচকা খাই।”
“ আবার! ভাইয়াকে ফোন করছি দাঁড়াও।”
“ এই না না। বকবে… আল্লাহ! ”
ইউশা কল দিয়ে ফেলেছে। ফোন রিসিভ হতেই তুশি জিভ কাটল। গম্ভীর স্বরটা শোনা গেল স্পিকারে,
“ হ্যালো!””
“ মেজো ভাইয়া তোমার বউ ফুচকা ফুচকা করছে, কী করব?”
সার্থ স্থুল স্বরে ডাকল,
“ তুশিইইই!”
তুশি মিনমিন করে বলল
“ মজা করেছি। দেখছিলাম ইউশা আপনার কথা শুনছে কিনা!”
“ চুপচাপ বাসায় গিয়ে রেস্ট নাও।”
“ আচ্ছা।”
লাইন কাটতেই
ইউশার মাথায় চড় মারল তুশি। রেগেমেগে বলল,

“ নিজে যখন মা হবে না? আমিও শোধ নেব। হুহ!”
ইউশা হাসছিল। বাচ্চার কথা উঠলেই ও শুধু হাসে। অয়ন কবে ওকে ভালোবেসে ছোঁবে তারই ঠিক নেই! সেই আশায় ও না বুড়ো হয়ে যায়। ফোনের সাইড টিপল মেয়েটা। স্ক্রিনে জ্বলে উঠল দুজনের ছবি। এই ক মাসে একটা চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে,অয়নের সাথে কিছু সুন্দর সুন্দর কাপল পিকচার তোলা হয়েছে তার। প্রতি সপ্তাহে অয়ন ওকে নিয়ে ঢাকার আনাচে-কানাচে ঘুরেছে। না চাইতেও বাইরে খেতে নিয়ে গিয়েছে। অফ ডে তে রাত জেগে ওর সাথে লুডু খেলেছে,গিটার বাজানো শিখিয়েছে। সঙ্গ দিয়েছে বন্ধুর মতো! মাঝেমধ্যে কপালে চুমু দিয়েছে,জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছে।
শুধু স্বামীর ঐ অন্তরঙ্গ ছোঁয়া টুকু ইউশার এখনো পাওয়া হয়নি। হবে কিনা কে জানে!
তুশি খেয়াল করল, ইউশা অন্যমনস্ক চিত্তে অয়নের ছবিতে আঙুল স্লাইড করছে। মিটিমিটি হেসে বলল,
“ মিস করছো বুঝি?”
ইউশা হাসে,মাথা নাড়ে একটু।
তুশি বলল,

“ কবে আসবে?”
“ এই সপ্তাহেই বলল।”
“ তোমার অনেক ধৈর্য ইউশা। অয়ন ভাই প্রায়ই ক্যাম্পেইনে যান। তুমি কী সুন্দর অপেক্ষা করতে পারো। আর আমি,সেবার তোমার ভাই মিশনে গেছিল পাঁচ দিনের জন্যে,আমি তাতেই বিছানায় কাত হয়েছিলাম।”
“ কারণ ভাইয়ার কাজটাই অনেক ঝুঁকির। কতবার আহত হয়েছে হিসেব নেই। আর অয়নের পেশা আলাদা। ওতো ক্যাম্পেইনে মানুষের সেবা করতে গিয়েছে। তোমার জায়গায় যে কেউ হলে সেই-ই চিন্তায় এমন করতো।”
“ হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছ। এই যে দেখলে,আমার এই ব্যাপার গুলো তুমি ছাড়া কেউ বুঝলো না।”
ইউশার ফোন বাজল তখনই। অয়নের কল। ও ধরল তড়িঘড়ি করে। ওদের কথার মাঝেই তুশি টের পেলো ওর জামা ছুঁয়ে কিছু স্রোতের মতো নামছে। পেটের নিচ ঘেঁষে চিনচিন করে উঠছে একটা ব্যথা। মেয়ের চেহারার নকশা বদলে গেল অমনি। হাত দিয়ে ইউশার হাতটা ঝাঁকাতেই ফোন কানে রেখে পাশ ফিরে চাইল মেয়েটা। তুশি চোখ বুজে আস্তে করে বলল,

“ লাইন কাটো!”
ইউশা এক কথায় অয়নকে বিদায় দিয়ে ফোনের লাইন কেটে দিলো। ফ্যাকাশে মুখে
ভ্রুয়ের ইশারায় পায়ের কাছে দেখাল তুশি। আঁতকে উঠল ইউশা।
আর্তনাদ করে বলল,
“ আয়ায়া, ওয়াটার ব্রেক করেছে। এ্যাম্বুলেন্স, এ্যাম্বুলেন্স!”
সামনের ড্রাইভার ভড়কে পিছু চাইলেন। তুশি দাঁত-মুখ খিচে সীটে মাথা হেলিয়ে দিলো। ব্যথা বাড়ছে ওর। ফ্যাসফ্যাসে দম টেনে বলল,
“ গাড়ি ঘোরাতে বলো,নির্বোধ!”
ইউশার হুশ ফিরল যেন। ছটফটিয়ে বলল,
“ ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ চাচা গাড়ি ঘোরান। হাসপাতালে, হাসপাতালে যেতে হবে।”
স্টিয়ারিং ধরে মোড় দেয়া হলো। এক লেন পেরিয়ে ত্রস্ত বেগে আরেক লেন ধরল গাড়িটা। তুশি ব্যথা সহ্য করতে চাইছিল। ইউশা প্যানিক করছে ওর চেয়েও বেশি। মেয়েটা অল্পতে এত ঘাবড়ে যায়। কিন্তু দাঁতে দাঁত কামড়ে রইলেও,লেবর পেইন নেয়ার সহ্যক্ষমতা সবার হয়নি। প্রচণ্ড শব্দে ককিয়ে উঠল তুশি।
ইউশা দিশাহারাল আরও। কেঁদে ফেলল ফুঁপিয়ে। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ আরেকটু, আরেকটু। কাকা জলদি করেন,ওর কষ্ট হচ্ছে!”

সৈয়দ নিবাস থেকে হাসপাতাল কাছে। কিন্তু তুশির স্কুল থেকে ওই হাসপাতাল দূরে ছিল। প্রেগন্যান্সির সময়টায় তুশির নিয়মিত চেইক আপ ওখানেই হতো। সাই বেগে একেকটা হাল পেরিয়ে হাসপাতালের গেইট ছুঁতে আধঘন্টার ওপরে লেগে গেল প্রায়।
ততক্ষণে ইউশা বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে। শওকত কুমিল্লায় গিয়েছেন ব্যবসার কাজে। ওখানকার কিছু ক্লায়েন্টদের সাথে একটা মুখোমুখি মিটিং বসার কথা। সাইফুলও যেতেন,কিন্তু মেয়ের জন্যে থেকে গেছিলেন ওখানে। অয়ন যশোরে, সার্থ নতুন কেস নিয়ে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছে-আসছে। বাড়িতে সর্বক্ষণ পুরুষ কাউকে দরকার। ডাক্তার শেষ চেইক আপে বলেই দিয়েছিলেন,ন মাস শেষ হলেই যে কোনো সময় ব্যথা উঠতে পারে। সেজন্যেই ভাইকে রেখে গিয়েছিলেন শওকত। আর আজ দরকারও পড়ল। হাসপাতালের ছোটাছুটি সব ভদ্রলোকই করলেন। তুশিকে নেয়া হয়েছে ইমার্জেন্সি লেবর রুমে। হাসনা করিডোরে বসে আল্লাহর নাম নিচ্ছেন। তনিমা,রেহণূমা সবাই অস্থির চিন্তায়। ইউশা সার্থকে কয়েকবার ফোন করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ধরছেও না।
শেষ কলটা দেয়ার ঠিক আগ মূহুর্তে একটা বাচ্চার চিৎকারে হাতটা থেমে গেল ওর। চকিতে ফিরল ইমার্জেন্সি রুমটার পথে। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সবাই। মূহুর্তে একজন নার্স বেরিয়ে এসে হইহই করে জানালেন,
“ আলহামদুলিল্লাহ, মা ও বাচ্চা দুজনেই সুস্থ আছে।”

সার্থ নারায়নগঞ্জে গিয়েছিল। কদিন ধরে এখানকার একটা কেসের খুব চাপ। তুশি হাসপাতালে শুনেই, পঙ্খিরাজের মতো ছুটতে ছুটতে রওনা করল অমনি।
ঘেমেনেয়ে দিগভ্রম সে। ইউনিফর্ম ভিজে চপচপ করছে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এসেও সার্থর চিন্তায় সব এলোমেলো লাগল। কোন দিকে যাবে ও? কোন ফ্লোরে? চাচাকে কল করতে পকেটে হাতাল,স্ক্রিনে দেখল আগে দেখেই অসংখ্য মিসড কল উঠে আছে। বাইকে থাকায় ও টের পায়নি। মুখচোখে হাত ডলতে ডলতে কল ব্যাক করল সার্থ।
সাইফুল ধরতেই শুধাল,
“ হ্যা-হ্যালো,কোন দিকে তোমরা?”
“ আমি তো মিন্তুকে নিয়ে একটু বাইরে এলাম। বেবি শপে! তুই লিফটের তিনে যা।”
সার্থ ছুটল ফের।
লিফটে এত ভীড়! দেশের সব রোগী একদিনেই কি এখানে এলো? নাকি সার্থর চোখে এই পাঁচজন মানুষই বেশি বেশি লাগছে?
একজন পুলিশ অফিসার লিফটে উঠেছে,ঘামছে দরদর করে,বাকিরা একটু কেমন কেমন চোখে চেয়ে চেয়ে দেখলেন। চতুর্থ তলা আসতেই সার্থ সবার আগে নেমে গেল। পরপর থমকে দাঁড়াল পা জোড়া। এটা তো কেবিন ফ্লোর। এখানে কেন বলল চাচ্চু? তুশিকে কি কেবিনে শিফট করে দিয়েছে? বাবু হয়ে গেছে ওদের?
বিস্ময়ের সাথে সাথে সার্থর মুখেও অন্ধকার নেমে এলো। চ সূচক শব্দ করল চোখ বুজে। ওর ইচ্ছে ছিল,বাবুকে ও সবার আগে কোলে নেবে। বারো তারিখের সব কাজ ও আগেভাগে সারছিল সেজন্যে। আর সেটাই হলো না? কিন্তু কোন কেবিনে সবাই? সব গুলোর দরজাই একই রকম।
সার্থ এদিক-ওদিক তাকানোর মাঝেই,ইউশা বেরিয়ে এলো ১২নং দরজাটা খুলে। ফোন হাতে,বাইরে কথা বলতে যাচ্ছে। তবে
সার্থকে দেখেই এক চিৎকার দিয়ে ছুটে এলো সে,

“ মেজো ভাইয়া!”
সার্থ ঘুরে চাইল, ইউশা হইহই করে বলল,
“ অভিনন্দন,অভিনন্দন,তুমি বাবা হয়ে গেছ। আমি ফুপি আর খালামণি হয়েছি।”
সার্থ ইউশার মতো খলবলিয়ে হাসতে পারল না। ঠোঁটের কোণ সাবলীল রইল,জিজ্ঞেস করল
“ তুশির কী অবস্থা? ও কোথায়?”
“ ওই তো, ওদিক যাও।”
সার্থ সবেগে এগোলো সেদিক। কেবিনের ভেতর হাসনা,আর রেহণূমা আছেন। দুটো চিকণ বেড দুইপাশে। এক পাশের দেওয়ালে এসি ঝুলছে। পরিচ্ছন্ন, সুন্দর কেবিন। তুশি মিশে আছে একটা বেডের তোষকের সাথে। ঘুমোচ্ছে বোধ হয়! সার্থর ভেতরটা আরো হুহু করে উঠল স্ত্রীর ক্লান্ত আনন দেখে। না জানি কত ব্যথা পেয়েছে তুশি। কত যন্ত্রণা হয়েছে ওর। এই ন-মাসে,সার্থ তো কম কিছু দেখেনি। সাত মাস পর থেকেই মেয়েটা ঘুমোতে পারতো না। কাত হয়ে শুতে পারতো না। মাঝেমধ্যে শ্বাসকষ্টও হতো! লেবর পেইনেও নিশ্চয়ই অনেক ব্যথা! আর সার্থ,এই সময়টায়ই পারল না পাশে থাকতে?
তুশি কি ওকে খোঁজেনি? খুঁজেছে তো। চোরটা ও ছাড়া এক পা-ও এগোতে চায় না। অথচ সন্তানকে পৃথিবীতে আনার যুদ্ধটা তুশি শুধু একা একা লড়ল।
রেহণূমা কেবিনের জামাকাপড় গোছাচ্ছিলেন। হঠাৎ চোখ পড়ল দরজায়। সার্থকে দেখেই বললেন,

“ ওমা, সার্থ এসে গে..”
সার্থ ঠোঁটে আঙুল চেপে কথা বলতে মানা করল। পাছে,তুশির ঘুম ভেঙে যায়! এরপর আস্তেধীরে এসে বসল স্ত্রীর কাছে। রেহণূমা বললেন,
“ আরে সমস্যা নেই। ওকে এখনই ডেকে তুলতাম। আমরা তো আজই রওনা করব। কেবিন তো তুশি খুব ক্লান্ত থাকায় নিতে হয়েছে।”
সার্থ জবাব দেয় না। নিষ্পলক চেয়ে থাকে তুশির ঘুমন্ত,অবসন্ন মুখে। নরম স্পর্শ দিয়ে মাথায় হাত বোলানোর মাঝেই
হাসনা বললেন,
“ পোলারে কোলে লইবা না?”
চমকে ফিরল সার্থ। হাসনার কোলের ভেতর হলুদ তোয়ালেতে একটা ছোট্ট প্রাণ নজরে এলো তখনই।
অবাক হয়ে বলল,
“ ছেলে হয়েছে?”
“ হ। তোমার বউ তো মাইয়া মাইয়া করতাছিল। বাইর হইল নাঙ্গোল নিয়া। দেহো,এক্কারে তোমার নাহান হইছে।”
হাসনা উঠে এসে ওর সামনে দাঁড়ালেন। বাবু ঘুমোচ্ছে।
সার্থ চেয়ে রইল,চেয়েই রইল। কী সুন্দর একটা মুখ! ভোরের আলোর মতো ক্ষুদ্র শরীর। মাথা ভরতি কালো চুল।
ফুলকো দুটো কাল। আধবোজা চোখ। নিঁখুত গড়নের সরু নাক,একদম ওর মতো। ঠোঁটটাও সার্থর মতো নিঁটোল। নিজের মতো আরেকজনকে দেখে সার্থর মলিন মুখটায় হাসি ফুটল অমনি। দুহাত বাড়িয়েও থামল ও। হাসনার দিকে চেয়ে বলল,

“ না। আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। সারাগায়ে জার্মস,ওকে নেয়া ঠিক হবে না।”
“ জার্মস আবার কীতা!”
“ আছে,আপনার নাতনির মতো দেখতে।”
“ আমি বুচ্ছি,জীবাণু না?
এট্টুক ইংরিজি শিখছি টিভি দেইখ্যা। নাতিন উঠলেই কইতাছি তুমি ওরে জীবাণু কইছো।”
বাচ্চাটা জোরে কেঁদে উঠল তক্ষুনি।
সার্থ জিজ্ঞেস করল,
“ ওর কি খিদে পেয়েছে?”
“ একটু আগেই তো খাইল। কান্দে ক্যা?”
সার্থর ইচ্ছে করছিল ছেলেটাকে এক্ষুণি টেনে বুকে এনে রাখতে। হাত নিশপিশ করছিল খুব। কিন্তু ওর সারা শরীরের যা অবস্থা। গোটা কেবিনে একবার চক্কর কাটল ওর নজর জোড়া। না, পরিষ্কারকের জন্যে কিছু নেই।
হাসনা কোলে নিয়ে দোলাচ্ছিলেন বাবুকে। রেহণূমা বললেন,
“ আমার কাছে দিন, খালা। দেখি থামে কিনা!”
এর মাঝেই তুশির ঘুম ভেঙে গেল। একটু নড়তে দেখে সার্থ কানের কাছে ঝুঁকে ডাকল,
“ অ্যাই যে,আমার বাচ্চার মা!”
মেয়েটা খুব আস্তে চোখ মেলে তাকায়। যেন দুটো বুজে রাখা পাঁপড়ি আলাদা করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মাথার পাশে সার্থকে দেখেই চমকাল খুব। হড়বড়িয়ে বলল,

“ আপনি, আপনি কখন এলেন?”
সার্থ মুচকি হেসে বলল,
“ এখন কেমন আছো?”
“ আমি ভালো আছি। শুধু একটু মাথা ঘুরছে। জানেন,আমাদের মেয়ে হয়নি।”
“ জানি।”
“ আপনার কি মন খারাপ লাগছে?”
“ না।”
“ লাগা উচিত। এতদিন মেয়ের কথা ভেবে, ছেলে পেয়ে গেলেন যে!”
“ আমি তো প্রথম দিনই বলেছি,আমাদের ছেলে হবে?”
“ এর মানে এতদিন আমাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন?”
“ হ্যাঁ। এজন্যেই বড়োদের সাথে তর্কে যেতে নেই। সব সময়ের মতো আমিই জিতলাম!”
তুশি ঠোঁট ফুলিয়ে কিছু বলতে চাইল, তবে
হাসনা নাতনির এত নাড়াচাড়া দেখে ধমকে বললেন,,
“ ছেমরি এত কতা কস ক্যা? শুকরিয়া কর,তোর প্যাট চিড়া লাগেনাই। আমার তো চিন্তায় দুম বাইর হইয়া গেছিল,মাগো।”
তুশি ছেলের দিকে চাইল। থেমে থেমে কাঁদছে। বলল,
“ মা, ওকে আমার কাছে দাও না।”
উঠে বসতেই, রেহণূমা ঝুঁকে দিলেন ওর কোলে। তুশি একটু বুকের সাথে মেলাল ছেলেকে,বাচ্চার কান্না থেমে গেল অমনি। হাসনা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ দ্যাখছো,মায়ের কুল চিনছে ক্যামনে?”
তুশি বাবুকে কোলে নিয়ে বসে৷ সার্থ পুরোটা সময় বিস্ময়াভিভূত হয়ে চেয়ে রয় ওই দুজনের দিকে। তুশির চুলটা বেনি করা। গায়ে সাদা জামা। কোলে বাবু। পৃথিবীতে সার্থ অনেক কিছু দেখেছ,কিন্তু এমন আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য ওর কাছে নতুন! এই দৃশ্য ও এর আগে দেখনি। প্রিয় নারীর কোলে,নিজের সন্তান! কজনের ভাগ্য হয় এটুকু দেখার?
তুশি তাকাল তখনই। সার্থকে ওইভাবে চেয়ে থাকতে দেখে মা,দাদির সামনে লজ্জা পেলো একটু। মিহি স্বরে শুধাল,

“ কোলে নিয়েছেন?”
“ না,ভয় লাগছে।”
ও তাজ্জব হয়ে বলল,
“ আপনার ভয় লাগছে,আপনার?”
সার্থ কেমন এলোমেলো শব্দে বলল,
“ ও অনেক ছোট তুশি। আমি ধরলে ব্যথা পাবে না?”
তুশি শব্দ করে হেসে ওঠে। হাসেন,রেহণূমা হাসনা প্রত্যেকে। সেই মূহুর্তে কথা শেষ করে ইউশা ঢুকল ভেতরে।
বলল নিজেই, “ অয়ন কাল আসবে। আজ খুব ব্যস্ত!”
রেহণূমা বললেন,
“ ও যাক,তাহলে ভালোই হলো। ভাইজান তো রওনাও করে দিয়েছেন।”
সার্থ বলল,
“ মা,দিদুন নেই কেন?”
“ আমিই পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন কত গেস্ট আসবে বাবু দেখতে। একটা গোছগাছের ব্যাপার আছে না? আর আমরাও তো এখনই বের হব। শুধু তুই রাস্তায় বলে,অপেক্ষা করছিলাম!”
এর মাঝেই সাইফুল আর মিন্তু ঢুকল। সাইফুল এক গাদা কেনাকাটা করে এনেছেন। মিন্তু একটা বড়ো সাইজের হাঁস এনেছে। এক লাফে বাবুর ওপর ঝুঁকে গিয়ে দেখাল,
“ এই দেখো মামা,তোমার জন্যে কী এনেছি!”
সাইফুল বললেন,

“ কী ব্যাপার ছেলের বাপ! সবাইকে ট্রীট কবে দিচ্ছিস?”
“ আগে তো কোলে নিই। তারপর না!”
“ ওমা কোলেই নিসনি? সে কী রে!”
“ বাইরে থেকে এসেছি। কেবিনে একটা স্যোপ পর্যন্ত নেই।”
মিন্তু বলল,
“ আরে এই ব্যাপার? মেজো ভাইয়া,যেখানে আছে মিন্তু -সেখানে নেই কিন্তু।”
থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের পকেট থেকে স্যানিটাইজারের স্প্রে বোতলটা বের করে দিতেই,সার্থ বোধ হয় চাঁদ পেলো হাতে। চটজলদি সারা গায়ে স্প্রে করল,হাতে মাখল। এরপর অধৈর্য হয়ে বাহুদুটো বাড়াল ছেলের দিকে।
তুশি কোলে তুলে দেয়। ছোট্ট শরীরটাকে নিজের বলিষ্ঠ গড়নের কাছে আনতে আনতে সার্থ টের পেলো,ওর হাত-পা,মাথা, গোটা দেহই অবশ হয়ে যাচ্ছে। এই অনুভূতি ওর আরো একবার হয়েছিল,যেদিন প্রথম টের পেয়েছে,জেনেবুঝে ও একটা চোরকে ভালোবেসে ফেলল!
ছেলেকে একটু ওপরে তুলে কপালের তারায় চুমু খেল সার্থ। বাচ্চাটা এখনো চোখ খুলতে শেখেনি। চুপ করে আছে। সার্থ বলল,
“ হ্যালো জুনিয়র সার্থ আবরার, আমি আপনার পাপা!”
বাচ্চার কোনো উত্তর এলো না। ভ্রু কুঁচকে চুপ করে রইল। তুশি বলল,
“ দেখেছেন,আপনার ছেলে আপনার মতো হয়েছে। শুধু কপাল কুঁচকে রাখে!”
পরপর মন খারাপ করে বলল,
“ আমার মতো কিছুই পেলো না,ধুর!”

বিকেল….
সৈয়দ নিবাসে এখন উৎসবের জোয়ার। আত্মীয়রা আসছেন,সার্থর পরিচিত কলিগরা এলেন,শওকতের চেনাশোনা লোকেরাও এলেন বাবুকে দেখতে। এইত,একটু আগে শরিফের পুরো পরিবার এসে দেখে গেল। একটা ছোট্ট কুটু আংটি উপহার দিয়েছেন তারা। ফলমূল এনেছেন তুশির জন্যে৷ ডেনমার্ক থেকে ভিডিও কল দিয়ে বাচ্চা দেখেছেন রোকসানা। যদিও আইরিন আসেনি সামনে। এই বাচ্চা সে দেখবে না। জামিলও ফোন করে কথা বলেছে। বাচ্চার জন্যে উপহার পাঠিয়েছে। সবাই ঘিরে বসেছে সৈয়দ বাড়ির ছোট রাজকুমারকে।
বসার ঘরের একটা আঙিনা জুড়ে একটা দোলনা রাখা হলো। এক পাশে মিন্তু,আরেক পাশে ইউশা বসে বসে বাবুকে দোল দিচ্ছে। মিন্তু মাঝেমধ্যে গাল টিপে দিচ্ছে। ইউশা আবার বকছে সে নিয়ে! বারবার চোখ রাঙাচ্ছে,ধরিস না। বাচ্চাদের গাল ধরতে নেই।

ও মুখ বেঁকিয়ে বলছে – ধরব,তোর কী? বাবু কি তোর একার?
দু ভাইবোনের এত ঝগড়াঝাঁটিতে তুশির মন নেই। ও গপাগপ কাটলেট মুখে পুড়ছে। মা বলেছেন বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিড করাতে গেলে ঝাল, মশলা খাওয়া বন্ধ। আজকেই খেয়ে নিক তাহলে! তারওপর আজ ওর ভীষণ শীত করছে। এত মেহমান আসছেন-যাচ্ছেন,মা শাড়ি পরতে বলেছিলেন। পরেওছে তুশি। শুধু আগের মতো ফ্যাশন করে চুল খুলে রাখতে পারছে না। খোপা করতে হচ্ছে। বাবুর মুখেচোখে লাগবে।
বাবু ঘুমোচ্ছে এখন! খেয়েছে একটু আগে। পরনে নানাভাইয়ের কিনে দেয়া জামাকাপড়। কিন্তু ওর মাথায় একটা হেয়ারব্যান্ড পরিয়ে রেখেছে ইউশা। এসব তো তুশি মেয়ে হবে ভেবে কিনে রেখেছিল,ফেলে তো দেয়া যায় না!
সার্থ হূলস্থূল পায়ে ওপর থেকে নামল তক্ষুণি। পুরোদস্তুর ফ্রেশ হয়ে,লম্বা গোসল সেড়ে বাসার জামাকাপড় পরেছে। এসে দোলনা থেকে বাচ্চাকে তুলে কোলে নিলো ও। তনিমা অবাক হয়ে বললেন,
” এত তাড়াহুড়ো করে নিচ্ছিস কেন? বের হবি নাকি!”
“ না। তখন হাসপাতালে মন ভরে নিতে পারিনি।”
“ বাবাহ, এখনই কী টান!”
সেসময় কলিংবেল বাজল। তনিমা উঠে যেতে যেতেই আসমা খুলে দেয়। শওকত হন্তদন্ত ভঙ্গিতে এলেন। মাথার ওপর এত্তগুলো বেলুন উড়াতে উড়াতে এক রকম ছুট্টে এসে দাঁড়ালেন মাঝে। হড়বড়িয়ে বললেন,

“ কই আমার দাদুভাই কই? তুশি মা,কেমন আছিস এখন?”
“ ভালো আছি, বাবা! তুমি কেমন আছো?”
“ আমি ভালো থাকব না? আমার নাতি এসছে এখন। তনিমা,বেলুন ধরো। আমি চট করে হাত মুখ ধুয়ে আসি বুঝলে। এভাবে তো নেয়া যাবে না।”
শওকত ঘর থেকে ফিরে এলেন চোখের পলকে। একেবারে স্যুট-কোট বদলে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি পরেছেন।
নেমে এসে দাঁড়ালেন,ছেলে তখনো সার্থর কোলে। ভদ্রলোক হাত পাততে গিয়েও বিব্রত চোখে থামলেন। তাকালেন তনিমার দিকে। চোখের ইশারায় অনুনয় করলেন,
“ একটু দিতে বলো না!”
তনিমা চাইলেন শাশুড়ির দিকে।
জয়নব গলা ঝেরে বললেন,
“ দাদুভাই,বাবার কাছে একটু দাও।”
“ কে বাবা?”
একটা থমথমে,দরাজ জবাবে পরিবেশ বদলে যায়। সবার হাসি হাসি মুখচোখ কমার সাথে সাথে শওকতের চেহারার রং হারায় অমনি। মন খারাপ করে,মাথা নুইয়ে শ্বাস ফেললেন তিনি।
সার্থর সাথে কথা হয় না,সম্পর্ক নেই,তাই বলে নাতিটাকেও ছুঁতে পারবেন না?
ভদ্রলোক খুব কষ্ট পেলেন। ঘরের দিকে ফিরতে নিলে,সার্থ হঠাৎ বলল,

“ নিন।”
চটক কাটার ন্যায় চাইলেন ভদ্রলোক। বাকিরাও বিস্মিত বনে গেল।
সার্থ ছেলেকে বাড়িয়ে দিলো। তবে আরেকদিক ফিরে রইল তখনো। শওকত হাঁ করে চেয়ে আছেন, দেখে বলল,
“ কী? নেবেন না?”
“ তুমি আমার সাথে কথা বলছো?”
“ হ্যাঁ নিন।!
অমনি পাঞ্জাবির গায়ে দুহাত ভালো করে মুছে নাতিকে লুফে নিলেন শওকত।
আহ্লাদে ভেসে গেলেন কথা বলতে গিয়ে,
“ দাদুভাই,আমার দাদুভাইটা কই রে!”

এদিকে সবাই সার্থর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে। তুশিও তাই। তবে কি বাবার সাথে বিরোধ মিটল ওর? ও কি তবে এখন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে? সার্থর নরম দৃষ্টি তখন ছেলের ওপর। এক সেকেন্ড দুই সেকেন্ড করে কিছু সময় যায়। সার্থ কত কী ভাবে! ঢোক গেলে কয়েকবার। হুট করে মুখটা শক্ত করে বলে,
“ তুশি চাইছিল,ছেলে এসে আপনার আর আমার এই দ্বন্দ্ব না দেখুক। আমিও তা চাই না। তাই,কথা বললাম। কিন্তু মনে রাখবেন,আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না।
আমার বাবা আপনি নন,হবেনও না।”
শওকত চুপ করে রইলেন। এ কথা তার কাছে নতুন কী?
সার্থ ঘরে যেতে নিলো,সাইফুল টেনে ধরলেন।
“ আজকের দিনে আর রাগ করে চলে যাস না বাবা। ছাড় না এসব!”
তুশি দেখল কারোর মুখচোখ ঠিক নেই। উল্লাসে উদ্বেল থাকা পরিবেশটা হুট করেই কেমন ভারি হয়ে এসছে। ও প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,

“ আচ্ছা মা,আমি তো মেয়ের নাম ভেবে রেখেছিলাম। ছেলের কী নাম রাখব এখন? আমার ছেলের তো নামই ঠিক হয়নি।”
হাসনা বললেন,
“ আক্কাস আলী রাখ। দাদার লগে মিলাইয়া!”
ইউশা নাক সিটকে বলল,
“ ইউউউ না! এসব বাদ দিয়ে দাদি। কী যে নাম বলেন!”
“ আমগো সময় তো এইডিই রাখতো। আইচ্ছা,তাইলে তুমরাই কও। কী রাখবা?”
মিন্তু হাত তুলে বলল,
“ অনুমতি দিলে আমি একটা নাম বলতে পারি?”
তুশি বলল,
“ অবশ্যই!”
“ দেখো তুশিপু, তুমি ওর নাম যখন আগে ভাবোনি,এখন ওর নাম রাখার অধিকার তোমার নেই। ওর নাম রাখার অধিকার শুধু আমার,মানে ওর একমাত্র মামার।”
“ তুই কি ঝাক্কাস আলী বলবি?”
“ উফ,তুই চুপ কর পেত্নি। ওর নাম হবে আমার সাথে মিলিয়ে। আমার ভালো নাম,রায়হান.. আমার ভাগ্নের নাম হবে, রায়ান।”

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৩

নামটা তুশির পছন্দ হলো। বাকিরাও প্রশংসা করল খুব। তবে শওকত বললেন,
“ নাম ভালো। কিন্তু পুরো নাম কী?”
মিন্তু মাথা চুলকায়।
সার্থ ছেলের দিকে চাইল। ছেলেটা শুধু ভ্রু কুঁচকেই রাখে। চোখ মেলে না,হাসেও না।
ও মুচকি হেসে বলল,
❝ আবরিশাম রায়ান রাফিদ….❞

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here