Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৫১

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫১

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫১
সুমাইয়া ইসলাম নূর

রাত অনেকটাই গভীর এখন চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা, আর সেই তারাভরা আকাশের নিচে ছাদের দোলনায় বসে আছে ইউভি। তার বুকের মাঝে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে ইনায়া। এক হাতে ইনায়াকে আগলে রেখেছে সে, অন্য হাতে আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে কপালের উপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো।
এই মাঝেই একবার ছাদে এসেছিল পিয়াসা।

— ভাইয়া আর বেবি, নিচে আসো। সবাই অপেক্ষা করছে…কথাটা বলতে বলতেই চোখ পড়ে দুজনের দিকে। নিজের প্রিয় বান্ধবী আর ভাইয়াকে এভাবে দেখে মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে তার।
— থাক, ডাকার দরকার নেই।মুচকি হেসে নিচে নেমে যায় পিয়াসা।নিচে গিয়ে রেশমা চৌধুরীকে বলল,মা, ভাইয়া আর বেবি ঘুমিয়ে পড়েছে। ওরা পরে খেয়ে নিবে।
রেশমা চৌধুরী স্নেহভরা হাসি দিয়ে বললেন,
— ঠিক আছে মা।এরপর তিনিও নিজের রুমে চলে গেলেন।অন্যদিকে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কারও সাথে ধাক্কা খেল পিয়াসা।
— উফফ!
মাথা তুলে তাকাতেই দেখে রেদোয়ান।
পিয়াসা তাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে বলল, এই মশাই, বিয়ে করছেন কবে?
রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে তার দিকে এগিয়ে এলো।
— কেন? আমার রুমে যাওয়ার জন্য খুব তাড়া নাকি? তুই বললে কালই বিয়ে করে ফেলি, কী বলিস?পিয়াসা রেগে গিয়ে বলল,

— বলি কী আর বোঝে কী! শোনো, দ্রুত বিয়ে করো। না হলে আমি তোমাকে না, অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলবো।
রেদোয়ান এক পা এক পা করে এগোতে এগোতে বললো কি বললি
এই দিকে পিয়াসা কথা শেষ না করেই জোরে রেদোয়ানের পায়ে পারা দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
রেদোয়ান হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ মেয়েটার এমন রাগের কারণ কিছুই বুঝতে পারল না।তবে পরক্ষণেই নিজের মনে হেসে বলল,
— এই মেয়ে নাকি আমাকে বিয়ে করতে চায়! পাগলি একটা। এখনও ভালোবাসা মানে কী, সেটাই বুঝল না।
অন্যদিকে ছাদের নীরবতা ভাঙল হঠাৎ একটি ফোনকল।ইনায়ার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার নাম ভেসে উঠল স্ক্রিনে।
ইউভি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো গম্ভীর কণ্ঠ স্যার, আপনি ঠিক বলেছিলেন।
ইউভির চোখ মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

— বলো।
— রবার্ট… তিয়া চৌধুরীর ভাই। আর তিয়া চৌধুরীর মা রুমি চৌধুরীর, রাইহান চৌধুরীকে বিয়ে করার আগেই আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এছাড়াও আরও কিছু তথ্য হাতে এসেছে…
রিতা একে একে সব তথ্য জানিয়ে ফোন কেটে দিল।
ফোনটা নামাতেই ইউভির ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি।এতদিন ধরে যে ধাঁধার উত্তর খুঁজছিল, তার প্রথম সূত্র আজ হাতে এসেছে।খুশিতে সে ইনায়াকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।কিন্তু ততক্ষণে ইনায়া নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়— ইউভির বুকের মাঝে মাথা রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
ইউভি মুগ্ধ চোখে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বলল, আদর, তোকে আমি এতটাই শক্তিশালী করে তুলব যে একদিন তোর শত্রুদের তুই নিজেই শাস্তি দিবি। কেউ তোকে দুর্বল ভাবার সাহস পাবে না।

━━━━━━━━ ফ্ল্যাশব্যাক ━━━━━━━
লন্ডন।
ইউভির পক্ষ থেকে ইনায়া আর পিয়াসার জন্য বরাদ্দকৃত বিশাল ম্যানশনের বাগানে
রঙিন ফুলে ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে বসে আছে ইনায়া আর পিয়াসা। সামনে খোলা ল্যাপটপ, বই আর নোটস।দুজনই নিজেদের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত।হঠাৎ দূরে কয়েকজন সন্দেহজনক লোককে দেখা গেল।ওরা ছিল ভাড়াটে হামলাকারী।
ধীরে ধীরে ইনায়া আর পিয়াসার দিকে এগিয়ে আসছিল তারা।কিন্তু ওরা দুজনের কাছে পৌঁছানোর আগেই চারপাশ থেকে বেরিয়ে এলো ইউভির নিযুক্ত এলিট সিকিউরিটি টিম।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
একজনও পালাতে পারেনি।

কেউ গুরুতর আহত,হয়েছে কেউ মাটিতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে পুরো অপারেশনটি পরিচালনা করেছিল রিটা।সবকিছু এত নিখুঁতভাবে সামলানো হয়েছিল যে ইনায়া আর পিয়াসা কিছুই টের পায়নি।
তারা তখনও নিজেদের পড়াশোনায় ব্যস্ত।
তবে একজনকে জীবিত ধরা হয়েছিল।
রিতা তাকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
প্রথমে মুখ না খুললেও শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে লোকটি বলে দেয় সেই নাম যে তাদের সাথে ডিল।করেছিলো
রবার্ট।
নামটা শোনার পর রিতার চোখ সরু হয়ে আসে। সাথে সাথে ইউভি কে সব জানানো হয় ইউভির কাছে তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়—
ইনায়ার বিরুদ্ধে সাজানো খেলাটা যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
সাপের গর্তে হাত দিয়ে সাপ বের করতে গিয়ে যেন নেকড়ের সন্ধান মিলেছে।

━━ বর্তমানে
ইউভি আবারও ইনায়াকে নিজের বুকে টেনে নিল।
তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— আমি থাকতে তোকে কেউ আঘাত করতে পারবে না, আদর। তোর শাহজাদা সারাজীবন তোকে আগলে রাখবে, আমার বেয়াদব আহ্লাদী বউ।
এরপর ফোন বের করে রেদোয়ানকে কল দিল সে।
কল রিসিভ হতেই সব ঘটনা খুলে বলল।
সব শুনে কিছুক্ষণ নীরব রইল রেদোয়ান।
ইউভি ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
— চল ব্রো, এবার আমাদের আসল রূপটা সবাইকে দেখিয়ে দিই। মানুষ শুধু আমাদের হাতে কলম আর ল্যাপটপই দেখেছে এবার দেখুক, প্রয়োজন হলে আমরা আর কী করতে পারি।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো রেদোয়ানের দৃঢ় কণ্ঠ—
— রেডি, ব্রো। যারা আমাদের কলিজায় হাত দিয়েছে, এবার তারা বুঝবে কত বড় ভুল করেছে

রাত তখন ১টা বাজে।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
ইনায়া ঘুমের মধ্যেই একটু নড়েচড়ে উঠল।
ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই বুঝতে পারল সে ইউভির বুকের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
আর ইউভি?সে মুগ্ধ হয়ে নিজের আদরকে দেখছে।
যেন ঘুমন্ত মেয়েটাকে দেখেও তার মন ভরছে না।
ইনায়া চোখ মেলে তাকাতেই ইউভি আলতো করে নিজের নাকটা ইনায়ার নাকে ছুঁইয়ে দিল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
— কী ম্যাডাম? — নিজেও খাবেন না আবার আপনার হাজব্যান্ডকেও না খাইয়ে রাখবেন?
এই আপনি আমার খেয়াল করবেন?
ইনায়া ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে রইল।
তারপর আস্তে করে বলল আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ডাকেননি কেন?ইউভি একটুও দেরি না করে উত্তর দিল—
বেশি না রাত ১টা বাজে।

— কী?
ইনায়া একদম চমকে উঠল ১টা বাজে চলুন ঘুমোতে হবে
কিন্তু ইউভি তাকে নামাল না।
বরং কোলে নিয়েই হাঁটা শুরু করল। আগে খেতে হবে। তারপর ঘুম বুঝছো?
ইনায়া মাথা নেড়ে বলল হুম…
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ইউভি আবার বলল আদর কাল থেকে তোকে আর পিয়াসাকে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।একজন প্রশিক্ষক আসবে বাসায়।সব ধরনের আত্মরক্ষার কৌশল শিখে যাবি।ইনায়া আধো ঘুমের মধ্যেই বলল হুম… শিখব।
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললো আমি আর রেদওয়ান কিছুদিনের জন্য লন্ডন যাচ্ছি।কথাটা শুনে ইনায়া পুরোপুরি জেগে গেল।
— কী? — কেন?ইউভির ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। কাজ আছে, বউ। সোনার ডিম পাড়া হাঁস আনতে যাচ্ছি।ইনায়া কপাল কুঁচকে তাকাল।
কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝল না।তবুও চুপ করে রইল।কারণ ইউভির এই রহস্যময় কথাগুলোর অর্থ সাধারণত পরে বোঝা যায়।নিচে এসে ইউভি আলতো করে ইনায়াকে সোফায় বসিয়ে দিল।
তারপর নিজে কিচেনে চলে গেল।
কয়েক মিনিট পর ট্রে হাতে ফিরে এলো।
গরম খিচুড়ি, হালকা সবজি আর চিকেনের ছোট ছোট টুকরো নিয়ে আসলো ইউভি ইনায়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইউভি চামচে করে খাবার তুলে ধরল।

— মুখ খোলো।
— আমি নিজে খেতে পারব।
— জানি।
— তবুও আজ আমি খাইয়ে দিবো
ইনায়া আর তর্ক করল না।চুপচাপ খেতে লাগল।
ইউভি খুব যত্ন করে এক চামচ খিচুড়ি, এক চামচ সবজি, মাঝে মাঝে পানি এগিয়ে দিচ্ছে।
প্রতিবার খাওয়ানোর সময় এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই সে করছে।ইনায়া মুচকি হেসে বললো আপনি না…খুব অদ্ভুত।ইউভি ভ্রু তুলে বললো। ধন্যবাদ।
— এটা আমি প্রশংসা হিসেবেই নিলাম।
খাওয়া শেষ হলে ইনায়া সোফায় হেলান দিয়ে বসল।
আর ইউভি নিজের জন্য রাতের খাবার তৈরি করতে কিচেনে চলে গেল।কিছুক্ষণ পর সে একটা বাটি নিয়ে ফিরে এলো।সেদ্ধ চিকেন ব্রেস্ট।সঙ্গে তাজা শসা, লেটুস, টমেটো দিয়ে বানানো সালাদ।
আর এক গ্লাস উষ্ণ লেবু পানি।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল এইটা খাবেন?
— হুম।মানুষ এইসব খেয়ে বাঁচে কেমনে?
ইউভি হেসে ফেলল হুম ছেলেরা বাঁচে।
— বিয়াদব।

তারপর নিজের সালাদ খেতে খেতে আড়চোখে তাকাল ইনায়ার দিকে।
আর ইনায়া?সে তখনও সোফায় বসে নিজের হাজব্যান্ডের ডায়েট দেখে মুখ কুঁচকে আছে।
দৃশ্যটা দেখে ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা শান্ত হাসি ফুটে উঠলো
ইউভি আবারও ইনায়াকে কোলে তুলে নিল।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বললো মিস্টার চৌধুরী, কী হয়েছে আপনার? একটু বলবেন? হঠাৎ এতটা ভালোবাসার মানে কী?
ইউভি ইনায়ার প্রশ্নের উত্তর দিল না।
শুধু ছোট করে বললো।আমার অনুপস্থিতিতে তোমার এনার্জি যাতে একটুও না কমে..সেই জন্য আগে থেকেই একটু বেশি বেশি এনার্জি জমা দিয়ে যাচ্ছি। যাতে আমার বেয়াদব বউটার কোনো সমস্যা না হয়।ইনায়া মুচকি হেসে ইউভির গলা জড়িয়ে ধরল।তারপর নরম গলায় বলল—
ইউভি ভাইয়া… — আমি কোনোদিন ভাবতেওপারিনি আপনি আমার হাজব্যান্ড হবেন।
ইউভির চোখের গভীরতা মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল সেটা জানবি কী করে? — তুই তো একসময় ভেবেছিলি রুদ্রই তোর হাজব্যান্ড হবে।
কথাটা শুনে ইনায়া অবাক হয়ে গেল।

আপনি রুদ্রর কথা জানেন? কীভাবে?
ইউভির ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
সে ইনায়ার কপালে আলতো টোকা দিয়ে বললো
মিসেস চৌধুরী তোমার প্রতি মিনিটে কয়বার নিঃশ্বাস পড়ছে, সেটা পর্যন্ত আমার জানা থাকে। আর তুমি ভাবছো তোমার জীবনে কে আসছে, কে যাচ্ছে, সেটা আমি জানি না? তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই তোমাকে নিয়ে অজানা কিছু থাকার প্রশ্নই আসে না।
ইউভি ইনায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ে কমফোর্টার টেনে দিল।এরপর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে নিচু গলায় বললোঘুমিয়ে পড়ো, আদর।কিন্তু ইনায়া ইউভির হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।তারপর আস্তে করে বললো
— ইউভি ভাইয়া..কিছুদিন তো থাকবেন না। আজ না হয় বাকি রাতটুকু আমাকে বুকে জড়িয়ে রাখুন।
ইউভি এক মুহূর্তও দেরি করল না।কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইনায়াকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।
ইনায়াও শান্ত হয়ে মাথাটা তার বুকে গুঁজে দিল।
রুমজুড়ে নেমে এলো নীরবতা।
শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ইউভি আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।যেন এই মুহূর্তটাকে নিজের ভেতরে গেঁথে নিতে চাইছে।

চৌধুরী ভিলার সকালটা আজ অদ্ভুত নীরব।
সকালের নাস্তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ইউভি আর রেদওয়ানও বেশ কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে তারা সবার উদ্দেশ্যে শুধু একটা কথাই বলে গেছে আদরকে কেউ ডাকবে না। ওকে ঘুমাতে দাও।এরপর ইউভি কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলেছিল আমাদের কিছু কাজ আছে। আমরা কিছুদিনের জন্য লন্ডন যাচ্ছি। বাসায় ফিরতে একটু সময় লাগবে।
কথাটা শুনেই রাইহান চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। কী ব্যাপার ইউভি? হঠাৎ লন্ডন? এখন আবার কী কাজ?
ইউভি একবার মাত্র তার দিকে তাকাল।
তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল সময় হলে বলবো তবে চাচ্চু.. সত্যিটা কি সহ্য করতে পারবেন?রাইহান চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন কী বলতে চাও তুমি?
ইউভির ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।
চাচ্চু, সময় থাকতে নিজের যত্ন নিন। আর যতটা সম্ভব নিজের পাপ কাজগুলো থেকে দূরে থাকুন।
একটু থেমে আবার বললো একটা জিনিস বুঝতেচি না।
আপনি এত কিছু করছেন কার জন্য নিজের জন্য? নাকি অন্য কারও জন্য?রাইহান চৌধুরী এবার রাগী কণ্ঠে বলে উঠলেন কীসব বলছ ইউভি? আমি যা করছি আমার মেয়ের জন্য করছি। তিয়ার জন্য করছি। আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য করছি।
ইউভির চোখে তখন রহস্যময় ঝিলিক।

— সন্তান?
শব্দটা ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল সে।
তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি এনে বলল—
আদৌ আপনার সন্তান তো, চাচ্চু?
যাই হোক. কিছু সত্যি কথা সবার পক্ষে হজম করা সম্ভব হয় না।
— বাই।
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না ইউভি।
রেদওয়ানও দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে বড় ভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।দুই ভাইয়ের গম্ভীর হাঁটার ভঙ্গি দেখে পুরো ডাইনিং হল এর সবাই নীরব হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা বেরিয়ে গেল।
তাদের চলে যাওয়া দেখেই রাইহান চৌধুরী রাগে ফুঁসতে লাগলেন।ছি! ভাইয়া, ছেলেকে এই শিক্ষা দিয়েছেন?
বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও শেখাননি?ওদিকে তিয়া রাগে হাতে থাকা কাঁটা-চামচটা টেবিলে শব্দ করে রেখে দিল।
তার চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্থিরতা।মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—ও কি তাহলে কিছু জেনে গেছে?”

“না… এটা হতে পারে না।”
“আমার এখনও সব কাজ শেষ হয়নি।”
তিয়ার চোখে তখন এক অদ্ভুত জেদ দেখা গেলো।
“ইউভি চৌধুরী আমি তোমাকে এত সহজে ছাড়ব না।”
অন্যদিকে লিখন চৌধুরী চুপচাপ বসে আছেন।
বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি একটা বিষয় লক্ষ্য করছেন।ইউভি… রেদওয়ান… ইনায়া… পিয়াসা…
চারজনই রাইহান চৌধুরী আর তিয়ার সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না ।যেন কিছু একটা হয়েছে
কিন্তু কী?
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।
লিখন চৌধুরী ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারে হেলান দিলেন।তার মনে আজ অদ্ভুত এক অস্বস্তি।
মনে হচ্ছে ঝড় আসার আগে যেমন চারপাশ অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যায়…
চৌধুরী ভিলাতেও ঠিক তেমন কিছু ঘটছে।

সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় দুপুর হতে চললো
রোদের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে ইনায়ার রুমে এসে পড়েছে।বাইরে পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে ।হালকা বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে।
ইনায়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
ঘুম ভাঙতেই পুরো শরীরে ব্যথা অনুভব করল।
বিছানার উপর উঠে বসে সময় দেখল।
ঠিক তখনই ফোনে মেসেজ আসার শব্দ হলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
বালের শেহজাদা
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ খুলল।
ইউভি লিখেছে—
“আদর,পাশেই ওষুধ রাখা আছে। খেয়ে নিও।
আর ঘুম থেকে উঠেই শাওয়ার নেবে না। কিছুক্ষণ পরে নেবে।আরেকটু পর একজন প্রশিক্ষক আসবে। তোমাদের আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল শেখাবে।বোনুকে নিয়ে রেডি থাকবে।যত দ্রুত সম্ভব শেখার চেষ্টা করবে।আমি খুব দ্রুত ফিরে আসব।
চৌধুরী পরিবারকে কিছু শয়তানের হাত থেকে সেভ করতে হবে।আশা করি বুঝেছ।
নিজেকে কখনো কারও সামনে দুর্বল প্রমাণ করবে না।আর হ্যাঁ…আদর…একটা অনুরোধ।
হাতের নখগুলো এত ধারালো না করলেও পারতে।”
মেসেজটা পড়ে ইনায়া ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিল—

— কেন? —
আমি আবার কী করলাম? — নখ তো ঠিকই আছে!কয়েক সেকেন্ড পরই ইউভি একটা ছবি সেন্ড করলো ছবিটা খুলতেই ইনায়া থমকে গেল।
তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে বলল—
— হায় আল্লাহ!ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—
গতরাতে অজান্তেই সে ইউভির পিঠে নখের দাগ বসিয়ে দিয়েছে একটা না শত খানা
ইনায়া চোখ বড় বড় করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর তাড়াতাড়ি লিখল আমি এটা কখন করলাম?আমি তো কিছুই জানি না!
— সরি ইউভি ভাইয়া.

কিছুক্ষণ পরই আত্মরক্ষার প্রশিক্ষক চৌধুরী ভিলায় এসে পৌঁছালেন।ইনায়া আর পিয়াসাও স্পোর্টস ড্রেস পরে গার্ডেনে চলে গেল প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য।ঠিক তখনই তিয়া সামনে এসে দাঁড়াল।দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো আরও কত কী করবি বল তো?
এই তিয়া চৌধুরীর লেভেলে আসতে গিয়ে সবই কপি করছিস। আমি যা যা পারি, তোকে ও তাই শিখতে হবে? কপিবাজ
কথাটা বলে তিয়া ভিলার ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
ঠিক তখনই ইনায়া নিখুঁত কৌশলে তিয়ার পায়ের মাঝে নিজের পা আটকে দিল।পরের মুহূর্তেই—
ধপ!
তিয়া ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্য হারিয়ে তিয়া ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল।পিয়াসা হাসতে হাসতে প্রায় লুটোপুটি খেতে লাগল।আর ইনায়া সে সম্পূর্ণ গম্ভীর মুখে বললো একটু আগে কে যেন বলছিল সে কারাতে পারে?
এই তো নমুনা।এইভাবে নিজেকে রক্ষা করবে?
তারপর ধীরে ধীরে তিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

মিস তিয়া চৌধুরী…এইসব বাল ছাল এর কথা আমাদের শেখাতে হবে না।আমরা আগে থেকেই এসব জানি।
আর এই ইনায়া নূর চৌধুরী কী কী পারে. সে সম্পর্কে তোর কোনো ধারণাই নেই। প্রতিদিন বিকালে তিন ঘণ্টা করে নিজেকে সময় দিয়েছি। নিজেকে তৈরি করেছি।আমি ঠিক কী কী পারি… সময় হলেই জানতে পারবি।ইনায়ার চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা দেখা গেল আর হ্যাঁ…তুই আমার অহংকারে আঘাত করেছিস, তিয়া চৌধুরী। এখন খুব ভালো করেই বুঝতে পারবি… আমি ইনায়া নূর চৌধুরী ঠিক কতটা ভয়ংকর জাওরা হতে পারি।
তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল—
— বেবি, চল।
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
দুজন হাসতে হাসতে গার্ডেনের অন্যদিকে চলে গেল।হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ দুজনের চোখ গিয়ে পড়ল গেটের দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন রিমঝিম আর রাশেদ মির্জা।কিহহহ!ফুপিমণি!একসাথে চিৎকার করে উঠল ইনায়া আর পিয়াসা।দুজনই দৌড়ে গিয়ে রিমঝিমকে জড়িয়ে ধরল।ইনায়া অভিমানী গলায় বললো। ফাইনালি ফুপিমণি!তোমার আমাদের কথা মনে পড়ল?

পিয়াসাও মুখ ফুলিয়ে বললো আমরা তো ভাবছিলাম তুমি আমাদের ভুলেই গেছো।
রিমঝিম হেসে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ গল্প করার পর ইনায়ার হঠাৎ খটকা লাগল। রিমঝিমকে কেমন যেন দুর্বল লাগছে।
মুখটাও একটু ফ্যাকাশে।ইনায়া চিন্তিত হয়ে বলল—
ফুপিমণি. তুমি অসুস্থ নাকি?রাশেদ মির্জা মুচকি হেসে বললেন ভেতরে চলো সব বলছি।
ডাইনিং রুমে ঢুকতেই সবাই একসাথে জড়ো হলো।
রিমঝিমকে ঘিরে বসেছে সবাই।হঠাৎ রাশেদ মির্জা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন আসলে.. তোমাদের জন্য একটা সুখবর আছে।সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকাল। রিমঝিম মা হতে চলেছে।
পুরো ডাইনিং রুম বাচ্চাদের চিতকারে কেঁপে উঠল।
— কিহহহহহ!!!

আয়াত, আতিকা আর রিদ একসাথে চিৎকার করে উঠল।পিয়াসা খুশিতে লাফিয়ে উঠল।
ইনায়া তো সরাসরি রিমঝিমকে জড়িয়ে ধরল।
সত্যি ফুপিমণি সত্যি?রিমঝিম লজ্জা পেয়ে মাথা নেড়ে হেসে দিল।রেশমা চৌধুরীর চোখ আনন্দে ভিজে উঠল।তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে লিখন চৌধুরীকে কল দিলেন।কল ধরতেই বললেন—
শুনছো? সব কাজ ফেলে এখনই বাসায় আসো!
আর আসার সময় অনেক মিষ্টি নিয়ে আসবে!
ওপাশ থেকে লিখন চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন—
কেন?
রেশমা চৌধুরী খুশিতে প্রায় চিৎকার করে বললেন—
কারণ আমি মামী হতে চলেছি!আর তুমি মামা!
রিমঝিম মা হতে চলেছে! তাড়াতাড়ি আসো!
ওপাশ থেকে লিখন চৌধুরীর হাসির শব্দ ভেসে এলো।এইদিকে তিয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকছে।পায়ে এখনও ব্যথা।মনে মনে বলছে—

“নাটক দেখলে বাঁচি না!”একটা খবর নিয়ে সবাই এমন করছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে তবুও সবার সামনে ভদ্রতার মুখোশ পরে বলল কনগ্র্যাচুলেশন ফুপিমণি
রিমঝিম মুচকি হেসে ধন্যবাদ জানাল।
কিন্তু তিয়ার মুখের ভেতরের জ্বালা কেউ বুঝতে পারল না।ওদিকে আয়াত, আতিকা আর রিদ খুশিতে পুরো হলরুম মাথায় তুলে ফেলেছে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫০

আমরা বড় আপু হব! আমরা বেবিকে নিয়ে খেলব!
আমি আগে কোলে নেব! না, আমি আগে!
তিনজনের ঝগড়া দেখে পুরো ডাইনিং রুমে সবার হাসিতে ভরে উঠল।
রিমঝিম লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।
রাশেদ মির্জার মুখেও তৃপ্তির হাসি।
আর চৌধুরী ভিলা?

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here