রাগে অনুরাগে পর্ব ১২
সুহাসিনি ফাতেহা
”এরে স্যার তো এদিকে আসতেছে! নিশ্চিত তোর কথা শুনতে পেয়েছে! গলাটা মাইকের মতো না করলে ও পারতি! এখন বুঝ মজা!
নিধির কণ্ঠে আতঙ্ক!”
তৎক্ষণাৎ সিয়াম তিতলি কে খোঁচা মেরে বলল,
–”পেত্নীদের গলা এমনিতেই বড় হয়! মাইকের মতো করা লাগে না!”
নিধি ধমক দিয়ে বলল,
–“এই তুই থামবি!”
সিয়াম: –“যতদিন গলা আছে ইনশাআল্লাহ্ থামাবো না!”
নিধি: –“তোর গলা আরো বেশি বড়! সারাদিন বকবক করিস।”
সিয়াম: –“তুই কি চুপ থাকিস!’
নিধি: –“বেশি করবি একদম ময়লার ড্রেনে ফেলে দিবো।”
সিয়াম: –“তুকে কি ছেড়ে দিবো।” —– এটা বলে সিয়াম তিতলির কাঁধ ধাক্কা দিয়ে বলল,
–“এই ভুটকি তুই আজ ঝগড়া করছিস না কেন?”
নিধি: –“তিতলি ঠিকই বলে তুই আসলেই রানুমন্ডল ! তিতলি কষ্ট পাচ্ছে দেখছিস না! ফাজলামো করিস কেন?”
সিয়াম: –“আমি ফাজলামো করি? সিয়াম অবাক হওয়ার ভান করলো। আরে আমি তো ওর ভালোর জন্যই বলি!”
নিধি তিতলির পিঠে হাত রেখে বলল,
–“থাক তুই চুপ করতো! ওর জায়গায় তুই থাকলে বুঝতি কেমন লাগতো! ভালোবাসার মানুষ অন্য কারো….”
”ভালোবাসা?। সিয়াম হো হো করে হেসে উঠে বলল,———
–“তেতুল গাছের পেত্নীর একতরফা ভালোবাসা! সিয়াম হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
–” শোন তিতলি ! স্যারেরা বাবার সমান হয় ! ফারাজ স্যার তোরে মেয়ের মতোই দেখে জানিস?”
তিতলির মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। সপ্তদশীর হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আসলে স্যার তাকে মেয়ের মতো জানে। আর সেখানে সে? তিতলি আসলেই একটা নির্লজ্জ! তিতলি ও আজ থেকে “ভাল্লুক ফারাজ” স্যারকে আব্বুর মতো মানবে। আর ওসব বলবে না একদম বলবে না। কথাও বলবে না। উনার তো ফারিন ম্যাডাম আছে। সে কেনো তৃতীয় ব্যক্তি হবে? আর জ্বালাবে না। এতকিছু ভেবে মেয়েটার চোখের কোণে জল জমলো। নাক টানার মধ্যে বলল,
–“আমি বাড়ি যাবো। ভাইয়া আসার আগে চলে যাবো। ”
তিতলির কথার মাঝেই ফারাজ খান সেখানে উপস্থিত হলেন। কেন যে এখানে এসেছে নিজেও জানেন না। ফারাজ আড়চোখে তিতলির ফোলা ফোলা মুখখানার পানে চেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। কেঁদেছে নাকি? নাক মুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন? মুখ উপরে তুলছে না কেন?
ফারাজকে তাদের সামনে এসে দাড়াতে দেখে নিধি-সিয়াম দুজনেই মেরুদণ্ড সোজা করে ফেলল। ভাবখানা এমন যেন তারা কিছুই জানে না।
ছুটি হয়ে যাওয়ায় সবাই ধীরে ধীরে চলে গেছে। স্মৃতি প্রিমা ওরাও চলে গেছে। নিধিরা ও চলে যাবে। কিন্তু তিতলিকে একা ছাড়বে না বলে এখনো দাড়িয়ে আছে। ফারাজ কে তাদের সামনে এসে দাড়াতে দেখে নিধি, সিয়াম সালাম জানালো,
–“আসসালামু আলাইকুম স্যার!”
ফারাজ গম্ভীর কণ্ঠে সালামের জবাব নিলো,
–“ওয়ালাইকুমুস সালাম!” অতঃপর স্রেফ বললো,
–“বাড়ি না গিয়ে এখানে দাড়িয়ে আছো কেন তোমরা?”
নিধি আমতাআমতা করে বলল,
–“তিতলির জন্য স্যার!”
ফারাজের ভ্রু দু’য়ের মাঝখানে সূক্ষ্ম ভাজ পড়েছে।মেয়েটা মনে হয় এ জনমে মুখ আর উপরে তুলবে না। শুধু কিছুক্ষণ পরপর নাক টানছে। তাও মুখ তুলছে না। ফারাজ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। সে আছে বলেই কি তবে এমন করে রেখেছে। ভাবনা বাদ দিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
–“কি হয়েছে ওর?
–” আসলে ওর ভাই আসবে তো তাই!”
–“ওহ! “শব্দ কম কণ্ঠ নিরেট! ফারাজ এদিক ওদিক তাকিয়ে স্রেফ বললো,
–“তোমরা যাও! আমি এখানে আছি!”
নিধি সিয়াম একজনের দিকে একজন চাওয়াচাওয়ি করলো। ওরা ভদ্র ছেলে-মেয়ের ন্যায় চুপচাপ মেনে নিলো। তিতলিও তাদের সাথে চলে যাবে। নিধি আর সিয়ামদের বাড়ি অন্যদিকে। তিতলি রাস্তায় পুরো একা।
নিধি কানে কানে বলল,
–“তুই চলে যাচ্ছিস কেন? তুষার ভাইয়া এসে তোকে না দেখলে রাগ করবেন।”
তিতলি তাও কোনো কথা শুনলো না। সে এখানে থাকবে না মানে থাকবে না। তাই সে ও বাড়ির পথে পা চালালো।
ফারাজ পেছন থেকে ডাকলো,
–“এই মেয়ে! দাড়াও বলছি!”
কথাটা শুনতেই তিতলি পায়ের গতি বাড়াল৷ সে কেন দাড়াবে? দাড়াবে না। ফারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম করে এখন তাকে ডাকছে! সে একদম দাড়াবে না।
ফারাজ বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করলো,
” এত্ত জেদ!” তৎক্ষণাৎ লম্বা কদমে এসে তিতলির সামনে এসে দাঁড়ালো। বিরক্তির রেশ ধরে বলল,
-‘ কী সমস্যা তোমার ? দাঁড়াতে বলছি আমি কানে শুনছো না?”
তিতলি তাও তাকালো না। এমন যেন সামনের যুবকের দিকে তাকানো তার জন্য হারাম। তাই সে পাশ কেটে চলে যাচ্ছে। সে কীভাবে বলবে তার সমস্যা কোথায়! সমস্যা তো তার মধ্যে। সে না জেনেশুনে প্রেমে পড়েছে। যদি জানতো ফারিন টারিন ম্যাডামের সাথে প্রেম করে তিতলি কখনো এই ব্যাটার দিকে ফিরেও তাকাতো না।
ফারাজের ভ্রু জোড়া এবার মাত্রাতিরিক্ত কুঁচকে গিয়েছে। তার পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ধমক দেবার জন্য। গলায় ধমক আটকে রেখে প্রশ্ন করলো,
” ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছো কেন?”
তিতলি তাও তাকায় না। মেয়েটা বড্ড অভিমানী। একবার যদি অভিমান হয় তা আর সহজে ভাঙবে না। মূলত সে নিজেই ভাঙাবে না তার অভিমান।
ফারাজ রেগে গিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে শুধালো,
–“কথা বলছো না কেন?”
তিতলি এবার হাঁটার গতি দ্বিগুন বাড়িয়ে দেয়। ভাবখানা এমন যেন ফারাজ তাকে কিডন্যাপ করবে।
ফারাজ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। এক অজানা কারণেই মাথার তালু গরম হচ্ছে রাগে। ত্রস্ত পায়ে পেছন হেঁটে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর পাশ দিয়ে বাইক থামতেই তিতলি হকচকিয়ে উঠে। তাকিয়ে দেখে তুষার বাইক থামিয়েছে সবে। তিতলি কে দেখে বলে,
–“ওঠ!”
তিতলি চুপচাপ বাইকের পেছনে বসলো।
তুষার হঠাৎ বলল,
–“কিছু খাবি?”
তিতলি কোনো উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না । কথা বললেই যেন কেঁদে দিবে ওমন ভাবে বলল,
–“না।”
তুষার চিন্তিত হলো। কি হলো আদরের বোনটার। তাও এত কিছু না ভেবে বাইক নিয়ে একটানে চলে গেলো।
———-
সেদিনের পর টানা তিনদিন কলেজে যায় নি তিতলি। গাঁ কাঁপানো জ্বর নিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে শুধু। নিজেই নিজের জ্বর বেঁধেছে মেয়েটা। সেদিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় চুপিচুপি এক ঘন্টা ভিজে এসেছে। ফেসবুকে দেখেছে স্মৃতিকে নাকি বৃষ্টি ধুঁয়ে মুছে ভুলিয়ে দেয় । তাই সেও বৃষ্টিতে ভিজে ফারাজ কে ভুলে যাবে। প্রয়োজনে ওই কলেজেও আর পড়বে না। কিন্তু মন কি আর ভুলে? সপ্তাদশীর মনে গেঁথে গিয়েছে ওই লোক! তাকে ভুলতে ভুলতে মনে হয় তার জীবন টাই ভুল হয়ে যাবে।
আজকে শুক্রবার। সবার ছুটির দিন।
তিতলি সারারাত বালিশে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে নাকের পানি চোখের পানি এক করার পর
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে চোখমুখ ফুলে কলাগাছ৷ আয়নায় নিজেকে নিজেই দেখে লাফিয়ে উঠলো৷ এই চেহারা নিয়ে নিচে গেলে সবাই কি ভাববে? গোসল নিলে নিশ্চয়ই ফোলা ভাব চলে যাবে? তিতলি সকাল সকাল গোসল নিল ৷ নাহ, চোখমুখ ফোলাই রয়ে গেছে৷
বাহির থেকে আলেয়া শেখ দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডেকে উঠলেন,
–“এত দেরি করে কেউ ঘুম থেকে উঠে? রাতেও খাবার না খেয়ে দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিস! এত করে ডাকছিলাম তাও শুনিস নি। আজকে তোর বাপকে সব বিচার দিবো।”
তিতলি বাবাকে ভয় পায়। তাড়াতাড়ি করে দরজা খোলে দিলো।
আলেয়া শেখ মেয়ের কান্ড দেখে বাঁচেন না। চেঁচিয়ে বললেন,
–“এত সকাল গোসল করছিস কেন?”
তিতলি কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না।
তাই আমতাআমতা করে বলল,
–“কি গরম! গরম যে।”
–“এসি কি তাহলে তোকে শীতের বদলা গরম দিচ্ছে? তোর আব্বু সে কখন থেকে বসে আছে তোর সাথে নাস্তা করবে।”
তিতলি চুপচাপ মায়ের পেছন পেছন গেলো। ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে। তুষার, তৌসিফ শেখ, তিতলির দাদি ফরিদা বানু।
তিতলি চেয়ার টেনে বসলো।
চুপচাপ নাস্তা খাচ্ছে।
তৌসিফ শেখ মেয়েকে বললেন,
–“শরীর কেমন আম্মু?”
–“ভালো আব্বু।”—— তিতলি ফের বললো,
–“আব্বু আমি কলেজ চেঞ্জ করতে চাই। আমি ওই কলেজে আর পড়বো না।”
তুষার ভ্রু কুঁচকে বোনের মতিগতি বুঝার চেষ্টা করলো। ধমকের সুরে বলল,
—“আবার কোন নাটক করেছিস? ওই কলেজে কি হয়ছে?”
—“ওই কলেজে ভাল্লুক আছে! আমার অনেক ভয় করে! ”
তোসিফ শেখ খুক খুক করে কেশে উঠলেন! মেয়ে যে তাকে মিথ্যা বলছে সেটা আর বুঝার বাকি নেই। তিনি তাও বুঝিয়ে বললেন,
–“ভাল্লুক কোথায় থেকে আসবে আম্মু! সবাই তো ওখানে পড়ে।”
তুষার গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল,
–“ভাল্লুক তোর ঘাড় মটকায় দেয় নাই। পরিক্ষা যে সেটার খেয়াল আছে? জ্বর বাঁধিয়ে বিছানায় পড়ে থাকার কাহিনী ক্লোস কর।”
তিতলি কেঁদ দিবে। এমনিতে ফারাজের জ্বালা বাঁচে না। এমন হলে তো সে অল্প বয়সেই মারা যাবে। তিতলি মরতে চাই না! অসহায় মুখ করে বলল,
–“তোমরা কেউ আমাকে ভালোবাসো না।”
তৌসিফ শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
–“এখন পরিক্ষা টা হয়ে যাক তারপর না হয় ভেবে দেখবো আম্মু্।”
তুষার কিছুতেই এই কলেজ থেকে তিতলি কে অন্য কলেজে ছাড়বে না। সেও এই কলেজে পড়েছে। তাই তিতলি কেও পড়তে হবে।
তাই বলল,
–“আমি ফারাজ ভাইয়ের সাথে কথা বলে দেখবো। তুই কেমন ভাল্লুক দেখেছিস সব জেনে তারপর অন্য কলেজের ভাবনা মাথায় আনবো ।”
তিতলি কিছুতেই ভাইকে ফারাজের সাথে কথা বলতে দিবে না। যদি তার কথা গুলো বলে দেয়। এটা কিছুতেই হতে পারে না। একদম না!
সে ও কাকুতিমিনতি করে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ১১
–“না..না ভাইয়া প্লিজ স্যারের সাথে কথা বলার দরকার নেই।”
–“দরকার আছে। তুই বেশি কথা না বলে চুপচাপ খা! না খেয়ে শুটকি মাছ হয়ে গেলে তখন কেউ বিয়ে করবে না।”
তিতলির খুব করে কান্না পেলো। সে খাবে না। যার জন্য কলেজে চেঞ্জ করবে বলছে তার গুনধর ভাই নাকি তার সাথে কথা বলবে। তিতলি এই দুঃখ এখন কোথায় রাখবে? মনেও তো কোনো জায়গা নাই।
