Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৭

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৭

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৭
রিক্তা ইসলাম মায়া

সময় ৪ঃ১৫। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে বসার ঘরে বৈঠক বসেছে। মারিদ-নূরজাহানের বিয়ের আলোচনা। বসার ঘরে সকলেই উপস্থিত। দুই পরিবারের ছোট-বড় থেকে কাজের লোক পর্যন্ত বাদ যায়নি, সকলেই বসার ঘরে শুয়ে-বসে দাঁড়িয়ে। যে যেখানে জায়গা পেয়েছে দাঁড়িয়ে গেছে। কথাবার্তা হচ্ছে হাসান, তারানূর, আলেহা, মাহবুব, মকবুল ও খালেদের মাঝে। বাকিরা চুপ করে তাদের কথা শুনছে। মারিদ, রিফাত, রাদিল ডাইনিংয়ে বসে তাদের কথা শুনছে। নূরজাহান এখানে নেই। নূরজাহানকে ঘরে বসে থাকতে বলেছে তারানূর। নূরজাহানের বিয়ের কথা হচ্ছে, তাই নূরজাহানের আপাতত এখানে থাকার দরকার নেই। শাহানা নিজের ঘরেই শুয়ে ছিল। মেহমানদের দেখে কী মনে করে উঠে আসল সেই জানে।

মারিদের পরিবারের সঙ্গে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়ে কথা বলছে, কাজ করছে হাসিখুশিতে। এই যে এখানে নূরজাহানের বিয়ে আইনিভাবে রেজিস্ট্রেশনের কথা হচ্ছে, সেখানেও শাহানা উপস্থিত তারানূরের সঙ্গে বসে আছে। মারিদ-নূরজাহানের বিয়ে ধর্মীয় মোতাবেক পড়ানো হয়েছিল, এখনো পর্যন্ত বিয়ের আইনিভাবে কাবিননামা কিংবা রেজিস্ট্রেশন হয়নি। সেজন্য মারিদ উকিল দিয়ে নূরজাহান আর তার বিয়ের রেজিস্ট্রেশন পেপার বানিয়ে এনেছে। সেটাতে মারিদ আর নূরজাহানের সিগনেচার লাগবে। সেদিন বিয়েতে দুই পরিবারের সম্মতি কিংবা উপস্থিতি দুটোই ছিল না। পরিস্থিতির দায়ে পড়ে বিয়েটা কতটা পরিপক্ব, শুদ্ধ হয়েছিল তাও জানা নেই কারো। সেজন্য মাহবুব বিয়ের রেজিস্ট্রেশন পেপারের সঙ্গে দুজন হুজুর ডেকে আবারও নূরজাহান এবং মারিদের বিয়ে পড়ানোর আবদার রাখে হাসানের কাছে। সমাজ কিংবা ধর্মীয় মোতাবেক যেন বিয়েটা শুদ্ধ হয়। হাসান, তারানূর, আলেহা বেশ অবাক চোখে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। হাসান বেশ ভাবুক হয়ে পড়লেন। যেখানে মেয়ে নিয়ে উনার এসব বিষয়ে চিন্তা করার কথা, সেখানে ছেলের পরিবার উনাদের সকল মুশকিল আসান করে দিচ্ছে। নূরজাহানের কাবিন হয়নি। সেদিন রাতে গ্রামবাসী মারিদ-নূরজাহান দুজনের বিয়ে দিলেও সেটা কতটা শুদ্ধতম আর জায়েজ হয়েছে, সেই সংশয়ে হাসান প্রথমদিন মারিদকে জামাতা হিসেবে নূরজাহানের ঘরে পাঠাতে পারেনি- এই চিন্তা করে।
অথচ এই একই চিন্তা দূর করতে মারিদই এগিয়ে আসল। নিজের থেকে কাবিননামা এবং বাবাকে দিয়ে নূরজাহানকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করার প্রস্তাব রাখল হাসানের নিকট। হাসান ভাবুক হয়ে টলমল চোখে বামে ঘাড় ঘুরিয়ে ডাইনিংয়ে মারিদের দিকে তাকাতেই মারিদ হাসানের মনোভাব বুঝে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে রাজি হতে। হাসান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয় মাহবুবকে। কিন্তু হাসানের কথা বলার বাক্য হারিয়ে গেছে। আলেহা হাসানের মনোভাব বুঝে মাহবুবকে বলে—

‘ নূরজাহান এখন আপনাদের বাড়ির বউ। আপনারা যদি ছেলে-মেয়েদের পুনরায় বিয়ে পড়াতে চান, তাহলে এতে আমাদের কারো আপত্তি নেই। বরং এটা একটা উত্তম চিন্তাভাবনা হবে। ওদের বিয়েটা পরিপক্ব ছিল না। কাবিন বাকি ছিল। দুই পরিবারের অনুপস্থিতিতে বিয়েটা হয়েছিল, সেক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েদের পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব রাখাটা উত্তম চিন্তা। আমাদের সবার এতে সম্মতি আছে।
মাহবুব আলেহার কথায় সন্তুষ্ট হয়ে বলে—
‘ তাহলে বেশ, আমরা তো বিয়ের রেজিস্ট্রেশন পেপার সঙ্গে করে নিয়েই এসেছি। আপনারা দুজন হুজুর ডেকে আনুন। আজ রাতেই কাজটা শেষ করে ফেলি না-হয়?
হাসান এবার কথা বলল। সে আপত্তি জানিয়ে বলেন—
“বিয়ের কামটা কাইল করলে হইব না ভাইসাব?
“কেন ভাইসাব, কোনো সমস্যা?
হাসান ভারী শ্বাসে নমনীয় গলায় বলে—
‘ আগেরবার মাইয়াডার বিয়া ঝামেলার মধ্য দিয়া হইছিল হের লাইগা কিছু করবার পারি না। এহনো কিছু করমু না। তয় আপনেরা হোগলে আছেন, হের লাইগা চাইছিলাম কয়েকজন হুজুর ডাইকা তাগোরে খাওয়াই হেরপর বিইয়াডা পড়াইতে।
হাসানের কথায় কেউ আপত্তি করল না। মাহবুব তৎক্ষনাৎ সম্মতি দিল। পাশ থেকে মকবুল বলল—

‘ তাহলে ভাইসাব, কাল বিয়ে পড়ানোর কাজটা হলে আজকে না-হয় সবাই ওদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের কাজটা সেরে ফেলি। ছেলে-মেয়ে দুজনের থেকে কাবিননামায় সিগনেচার নিয়ে নিই, কী বলেন?
হাসান সম্মতি দিয়ে বলে—
‘ আপনেগোর যেইডা ভালা মনে হয়, তাই করেন।
সবার ঘরে ঠিক করা হলো এখনই নূরজাহানকে ডেকে, মারিদ-নূরজাহানকে একত্রে বসিয়ে বিয়ের সিগনেচার নেওয়া হবে। কিন্তু সৈয়দ বাড়ির মেয়ে-বউরা একত্রে হৈচৈ করে উঠল। নূরজাহানের জন্য শাড়ি-গয়না কিনা হয়েছে, সেসব এখনো নূরজাহানকে দেওয়া হয়নি। তারপর নূরজাহান-মারিদ কাবিননামায় সিগনেচার করবে, দুজন জামাই-বউ না সাজুক, অন্তত ভালো শাড়ি-পাঞ্জাবি তো পরবে, তাই না? সৈয়দ বাড়ির বড় ছেলের কাবিন। উনারা বিয়ের এত শপিং করেও কেন সাদামাটাভাবে ছেলের কাবিন করাবেন? এটা কি মানা যায়? পুরুষরা সবাই সালমা, ফাতেমা, মুনিয়া, শান্তার কথা মেনে নিয়ে কাবিননামার সময় পিছিয়ে দেয়। সন্ধ্যা ৭:০০ টার সময় ধার্য করা হয়। নূরজাহানের বিয়ের জন্য শপিং করা নয়টা লাগেজ নূরজাহানের ঘরে রাখা হয়েছিল। সেগুলো এখনো নূরজাহানকে দেওয়া হয়নি। লাগেজে কী আছে সিকদার বাড়ির কেউ জানে না। সালমা সবাইকে বসতে বলে আলেহাকে নিয়ে উঠে গেল নূরজাহানের ঘরে। আলেহা মান্নান, আহাদ আর শেফালীকে দিয়ে নূরজাহানের ঘর থেকে নয়টা লাগেজ বসার ঘরে রাখাল। সালমা নূরজাহানকে নিয়ে আসল। গোলাপি রঙের শাড়িটায় নূরজাহান লম্বা ঘোমটা দেওয়ায় মুখ দেখা যাচ্ছে না। সালমা নূরজাহানকে নিজের পাশে সোফায় বসালেন। শান্তা অপর পাশে বসে নূরজাহানের ঘোমটা টেনে বলে—
‘ এত বড় ঘোমটা দেওয়ার দরকার নেই বউ। ঘোমটার জন্য তোমার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

মকবুলকে দিয়ে সবগুলো লাগেজ খুলে বসার ঘরে রাখা হলো। যেখানে নূরজাহানের একটা শাড়ি ছিল না পরার জন্য, সেখানে সৈয়দ বাড়ির বউ হিসেবে নূরজাহানকে নয়টা লাগেজের আটটাতেই দেওয়া হয়েছে শাড়ি, চুড়ি, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গাসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু। বাকি একটাতে ছিল নূরজাহানের জন্য কেনা গোল্ডের বক্স। লাগেজ ভর্তি এত এত জিনিসপত্র দেখে সিকদার বাড়ির সকলেই অবাক চোখে তাকিয়ে। আলেহা কপাল কুঁচকায়। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটা গোল্ডের বক্সে কম করে হলেও সত্তর-আশি ভরি ঊর্ধ্বে সোনাদানা হবে— সোনার দাম বিয়াল্লিশ হাজার টাকা ভরিতে হলে আশি ভরি স্বর্ণের জন্য কম করে হলেও চল্লিশ লাখ টাকা লেগেছে সৈয়দ বাড়ির মানুষের। এতো টাকা খরচ করে উনারা প্রথম দেখায় ছেলের বউকে এত গয়নাগাটি দেওয়াতে আলেহার কপাল কুঁচকে যায়। একবার চোখ বুলিয়ে কী মনে করে মারিদকে দেখে নেয়। মারিদ নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে।
ছেলেটা আসলেই কতটুকু ভালো, তিনি এখনো বুঝতে পারছেন না। মারিদের বউ হিসেবে নূরজাহানের জন্য যতটা কেনাকাটা করা হয়েছে, তার সমপরিমাণ রিফাতের বউ তনিমার জন্যও কেনা হয়েছে। দুই বউকে সমপরিমাণ গয়নাগাটি থেকে শুরু করে বাকিসব প্রসাধনীও দেওয়া হয়েছে। তনিমা সুখের পাশে বসে নূরজাহানের শপিংগুলো দেখে খানিকটা অবাক হয়। সমপরিমাণ শপিং তনিমাকেও দিয়েছে ওরা। তনিমা সবার আড়ালে ডাইনিংয়ে বসা রিফাতের দিকে তাকায়। রিফাত মারিদকে ছোট গলায় বলছে—

‘ শোন মারিদ, কবুলটা না-হয় তুই-ই বললি নেভার মাইন্ড। বিয়ের রেজিস্ট্রেশনটা কিন্তু আমার নামে করবি বুঝেছিস?
মারিদ নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে ছিল। সালমা, শান্তা, ফাতেমা, মুনিয়া নূরজাহানকে একে একে গয়নাগাটি পরাচ্ছিল, সে-সব সে দেখছে। পাশ থেকে রিফাত বিটকেল কথায় চোয়াল শক্ত করে মারিদ বলে—
‘ কয় ব্যাগ গাঁজা খাইছিস আজকে?
রিফাত ঝটপট উত্তরে চার আঙুল দেখিয়ে বলে..
‘ চার ব্যাগ খাইছি। তুই খাইবি? চল দুজন মিলে একলগে সুখ টান দিই। আর গান গায়ব….
~ধর কলকি মারো টান, গাঞ্জা বাবার আশেকান,
মইরা গেলে সঙ্গে কিছুই যাইব না। ইল বাবা,
ধর কলকি…
মারিদ ঠাস করে রিফাতের মাথায় ছোট পানির বোতলটা দিয়ে বাড়ি মেরেছে। সিরিয়াস মোমেন্টে মারিদকে রাগানোর জন্য সবসময় রিফাত উস্কে থাকে। রাদিল পাশে বসে হেসে ফেলে। রিফাতকে গুঁতো মেরে উস্কে বলে—
‘ তোর গাঞ্জা বাবা রাগ করেছে রিফাত।
রিফাত রাদিলকে টেবিলের নিচে লাথি মেরে বলে—

‘ সর মীরজাফর।
রাদিল তারপরও হাসে। মারিদ নূরজাহানের দিকে তাকায়। রিফাত মারিদের দৃষ্টি ধরে সামনে তাকাতেই তনিমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়। তনিমা রিফাতকে দেখছে—বিষয়টা লক্ষ করতেই রিফাত শান্ত, ভদ্র ছেলে হয়ে বসল। তনিমাকে দেখে রিফাত কেন ভদ্রলোক সেজেছে সে জানে না, কিন্তু তনিমার সামনে ইমেজ নষ্ট করতে চায় না সে। শত হলেও তনিমা ওর ছাত্রীবউ। এখানে ইমেজ নষ্ট করা যাবে না।
নূরজাহানকে একটা মেজেন্টা রঙের বেনারসি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে আফিয়া ও সুফিয়া মিলে। নূরজাহানের লম্বা চুল ভেজা থাকা সেগুলো খোপা করেনি গন্ধ করবে বলে। সালমা বলেছে বেণি করতে। সুখ মনোযোগ দিয়ে নূরজাহানের ভেজা চুল বেণি করে দেয়। নূরজাহানের চুল নূরজাহানের থেকেও লম্বা হওয়ায় সুখ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেড়ে দিলে ফ্লোরে পরে ময়লা লাগবে তাই।

নূরজাহানের লাগেজে লাল বেনারসি শাড়ি আছে, কিন্তু সেটা কালকের বিয়ের জন্য রেখেছে সবাই। যেহেতু দুই ধাপে বিয়েটা সম্পূর্ণ হবে, তাই কালকের জন্য লাল বেনারসি শাড়িটা রাখা হয়েছে। শাড়ির সঙ্গে নূরজাহানকেও মোটা মোটা নেকলেসের গোল্ডের জুয়েলারি পরিয়ে বউ সাজানো হয়েছে। সৈয়দ বাড়ির সবাই বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল, তাই নূরজাহানকে শাড়ি-চুড়িতে পুরোপুরি বউ সাজানো হয়। নূরজাহানকে বসার ঘরে মাঝের সোফাটায় বসানো হয়। নতুন বেনারসি আর গোল্ডের জুয়েলারিতে যেন নূরজাহানের রূপ ঝলমল করে উঠল। বসার ঘরে সকলেই নূরজাহানের রূপের প্রশংসা করছে। সুখ মারিদের ফোন নিয়ে নূরজাহানের ছবি তুলছে, ভিডিয়ো বানাচ্ছে। আফিয়া, সুফিয়া, তামিম, তাপস, রাদ, রাতুল, মুনিয়া, ফাতেমা, শান্তা, হীরা চৌধুরী, তনিমা সকলেই একে একে নূরজাহানের সঙ্গে বসে ছবি তুলছে। নূরজাহান অস্বস্তিতে কাঁপছে। ওর বুকটা কেমন ভারি লাগছে সেটা কাউকে কীভাবে বোঝাবে? সবাই এই বিয়েতে খুশি, যেন সে একটা পুতুল—সবার কথা মতো কাজ করছে। হয়তো এই বিয়েতে সবার মঙ্গল তাই নূরজাহান চুপচাপ সবকিছু মেনে নিচ্ছে। সালমা মারিদকে ডেকে নূরজাহানের সঙ্গে বসতে বলে। দুজনের কাবিননামা কাগজে সিগনেচার হবে। হীরা চৌধুরী একজন অ্যাডভোকেট। তিনি মারিদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন পেপার বানিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। সেসব কাগজগুলো গুছিয়ে টেবিলের উপর রাখছেন। উপস্থিত সকলেই নূরজাহানের রূপের প্রশংসা করছে, অথচ মারিদ শুধু তাকিয়ে দেখছে নূরজাহানের অস্বস্তিকর মুখটা। মায়ের ডাকে মারিদ নূরজাহানের পাশে ঠাস করে বসার সময় নূরজাহানের চুলের উপর বসে পড়ল। মারিদ এমনভাবে বসেছে যেন সে নিজের অজান্তে নূরজাহানের গায়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। মারিদের ধাক্কায় নূরজাহান ডান হাতের বাহুতে ব্যথা পেয়েছে। খানিকটা সরে বসতে চাইলে মারিদ নড়েচড়ে নূরজাহানের বাহুর সঙ্গে আবার লেগে বসে।

নূরজাহানের লম্বা ঘোমটার আড়ালে মৃদু কাঁপছে। মারিদের উপস্থিতিতে অস্বস্তি ফিল করছে। নূরজাহানের অপর পাশে শান্তা বসে, সেজন্য আর সরতে পারছে না। দুই পরিবারের সকলেই মারিদ-নূরজাহানকে ঘিরে দাঁড়িয়ে হাতের ফোনে ছবি ও ভিডিও করছে। হীরা চৌধুরী প্রয়োজনীয় কাগজগুলো টেবিলের উপর রেখে মারিদকে দেখিয়ে দিচ্ছেন কোথায় কোথায় সাইন করতে হবে। মারিদ দক্ষ হাতে কয়েক সেকেন্ডে সবগুলো সাইন ঝটপট করে ফেলে। একপাশে শান্তা নূরজাহানকে পাশ থেকে ধরে বসে। অপর পাশে মারিদ নূরজাহানের শরীর ঘেঁষে বসে। অস্বস্তিতে নূরজাহানের কান্না পাচ্ছে। ব্যাপারটা মারিদের একার জন্য নয়। বিয়ে নিয়ে প্রতিটা মেয়েরই স্বপ্ন থাকে, নূরজাহানেরও ছিল; কিন্তু জীবনস্রোতে নূরজাহানের সব স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। ভালোবাসার মানুষকে বুকে চেপে অন্যের নামে নিজেকে সঁপতে যাচ্ছে এই সাইনগুলো করে। নূরজাহানের চোখে পানি, গাল বেয়ে পড়ছে। হীরা চৌধুরী নূরজাহানের হাতে কলম আর কাগজ এগিয়ে দেখিয়ে দেন কোথায় কোথায় সিগনেচার করবে দেখিয়ে দিয়ে। কলম হাতে নূরজাহানের হাত কাঁপছে। নূরজাহানকে কাঁপতে দেখে সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে। সুখ ভিডিও করতে করতে নূরজাহানের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে—

” আমার ভাবি জিন্দাবাদ! মারিদ ভাইকে হারিয়ে তুমি তাড়াতাড়ি সই করে ফেলো তো।
নূরজাহান কাঁদছে, তা দেখে হাসানও কাঁদছে। চোখ দুটো টলমল করছে পানিতে। কাঁধের গামছায় বারবার চোখের পানি মুছছে যেন নূরজাহান দেখতে না পায়। আলেহা হাসানের দিকে তাকিয়ে ছোট গলায় বলে—
‘ তোমার এই দুর্বল মনমানসিকতার জন্য মেয়েটা এখন আরও কাঁদবে তোমাকে কাঁদতে দেখলে। শান্ত হও ভাই। নিজেকে শক্ত করো।
কাবিননামা কাগজে সাইন করতে গিয়ে নূরজাহানের লেখা আঁকাবাঁকা হচ্ছিল। অতিরিক্ত হাতের কম্পনে কলম ঠিক জায়গায় রাখতে পারছে না। মারিদ ব্যাপারটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে টেবিলের নিচে নূরজাহানের এক পা নিজের পায়ে চেপে ধরে। এতে নূরজাহানের কম্পন আরও বাড়ে। এতক্ষণ যাও একটু লেখাটা ঠিক ছিল, মারিদ নূরজাহানের পা চেপে ধরায় নূরজাহানের হাতের কলম কাগজের উপর থেমে যায়। হাত কাঁপছে কিন্তু লিখতে পারছে না। নূরজাহান কয়েকবার নিজের পা টেনেছে মারিদের থেকে ছাড়াতে, কিন্তু মারিদ শক্তভাবে চেপে ধরায় নূরজাহান নিজের পায়ে ব্যথা পাচ্ছে। হীরা চৌধুরী এগিয়ে এসে নূরজাহানের হাত ধরে বাকি সাইনগুলো নেন। কাবিননামায় সাইন শেষ হতেই সকলে “আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ” বলে ওঠে। শেফালী সবাইকে মিষ্টি দিয়ে যায়, সবাই মিষ্টিমুখ করে। হাসান বেরিয়ে গেলে মাজিদ আহাদ বাবার পিছনে যায়। হাসান কাঁদছে মাহবুব বিষয়টা লক্ষ করে তিনি মকবুল খালেদকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যায় হাসানে পিছনে। সাজিদ নিজের ঘরে যায় রেস্ট নিতে।

মারিদ-নূরজাহানের সামনে কয়েক রকমের মিষ্টি রাখা হয় ওদের মিষ্টিমুখ করানোর জন্য। মারিদ নিজেই নিজের মুখে মিষ্টি তুলে চিবোতে লাগে, সে কারো অপেক্ষায় নেই। মুনিয়া চামচে মিষ্টি তুলে নূরজাহানের হাতে দেয় মারিদকে খাওয়াতে। নূরজাহান ঘোমটা দিয়ে শক্ত কাঠ হয়ে বসে। নূরজাহান কাঁদছে, সেটা বারবার নূরজাহানের নাক টানায় বোঝা যাচ্ছে। নূরজাহানের হাত ধরে মারিদের মুখে মুনিয়া মিষ্টি তুলে দিলে মারিদ সেটি মুখে নিয়ে খেতে শুরু করে; অথচ নূরজাহানের পা তখনো মারিদ ছাড়েনি। কাবিননামা সম্পন্ন হয়েছে দেখে আলেহা নদীকে নিয়ে রান্নাঘরে যায়। পিছনে শাহানাও যায়। শান্তা বাদে, সালমা, মুনিয়া, ফাতেমা, হীরা চৌধুরী সকলেই সবার ঘর খালি করে তারানূরের সঙ্গে ভাতঘরে চলে যায় বাচ্চাদের একা ছেড়ে দিয়ে যাতে সবাই নতুন বউ জামাইকে নিয়ে আনন্দ করতে পারে।
সবাই চলে যেতে রাদিল রিফাতের পাশ থেকে সরে সুখের পিছনে দাঁড়ায়। তনিমা রাদিলের জায়গায় রিফাতের পাশে দাঁড়ায়। রিফাত তনিমাকে লক্ষ করেনি। মনে করেছে পাশে রাদিলই আছে। রিফাত মারিদ-নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে তনিমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলে—

‘ কিরে ভাই, আজ কি মারিদ আমার আগে বাসরও সেরে ফেলবে? ওর যে ভাবমূর্তি দেখছি, শালায় আমার আগে বাপ হবে নিশ্চিত। তুই আর আমি কি পিছনে পড়লাম? ভাই, আমার তো সেই হিংসে হচ্ছে। হিসাব মতে বিয়ে কিন্তু সবার আগে আমার হইছে, এখন বাসরটা কিন্তু সবার আগে আমার হওয়া দরকার। মারিদ কিন্তু মাঝে গিঁটু লাগাইতাছে। তুই কিছু কর তো ভাই, ওর বাসরটা আটকা।
তনিমা হা করে রিফাতের মুখের দিকে তাকিয়ে। রিফাত সম্পূর্ণ কথাগুলো মারিদ-নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলে। রাদিলের সাড়াশব্দ না পেয়ে রিফাত তনিমার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতে চাইল—
“কিরে ভাই? কথা বলিস না যে… আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ!
রিফাত চেঁচিয়ে উঠে ছিটকে দূরে সরে তনিমার থেকে। রিফাতের চিৎকারে সকলেই রিফাতের দিকে তাকায়। শান্তা রাগান্বিত গলায় বলে—

‘ তোর আবার কী হইছে? চিৎকার করছিস কেন?
উপস্থিত সকলে রিফাতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে, রিফাত কথা কাটাতে চেয়ে বলে—
‘ আরে কী জানি কামড় দিয়েছে আম্মা, সেজন্য চিৎকার করছি। তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও তো। এইদিকে তাকিয়ো না।
তাড়াহুড়োয় তনিমার পাশ থেকে সরে রিফাত রাদিলকে খোঁজে। রাদিল সুখের পিছনে দাঁড়িয়ে। রিফাতের চিৎকারে সুখ রিফাতের দিকে ফোন নিয়ে তাকিয়ে ছিল। রিফাত রেগেমেগে রাদিলের পাশে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল—
“হারামি, আমার পাশ থেকে সরে আসলি কেন? তোর জন্য আমার মান-ইজ্জত শেষ।
রাদিল কিছু বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে রিফাতকে শুধিয়ে বলে…
‘ আমি আবার কী করলাম?
সুখ রাদিলের কন্ঠ পেয়ে পিছন ঘুরতে চোখাচোখি হলো রাদিলের সঙ্গে। রাদিল যে সুখের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা এতক্ষণ লক্ষ করেনি সুখ। রাদিলের উপস্থিতি দেখে চট করে সুখ এগিয়ে গিয়ে মারিদের সামনে দাঁড়ায়। রাদিলের সরল দৃষ্টি ফের তীক্ষ্ণ হয় সুখের উপর। এখন সে ক্লিয়ার হয়েছে, সুখ আসলেই তাকে ইগনোর করছে। কিন্তু কেন? সে এমন কী কাজ করে ফেলেছে যে সুখের তাকে ইগনোর করতে হচ্ছে? রাদিল পরে আর মারিদ-নূরজাহানের মিষ্টি মুখে কনসেন্ট্রেট করতে পারেনি। অমনোযোগী, অন্যমনস্ক মস্তিষ্কে জুড়ে শুধু সুখের ইগনোর করার ব্যাপারগুলোই ঘুরতে থাকল।

মারিদ-নূরজাহানের মিষ্টিমুখ শেষে শান্তা আফিয়া ও সুফিয়াকে বলে—
‘ যা তো আফিয়া, সুফিয়া তোরা, মারিদের বউকে ঘরে নিয়ে যা। মেয়েটা অস্বস্তি ফিল করছে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।
‘ আচ্ছা ফুফি।
আফিয়া ও সুফিয়া এগিয়ে আসে। শান্তা মারিদের মধ্যস্থে থেকে নূরজাহান উঠে দাঁড়াল। মারিদ পা ছেড়েছে কিন্তু নূরজাহানের চুলে এখনো বসে। নূরজাহান মাথার লম্বা ঘোমটা ফের টেনে নিল। হাতের চুড়িগুলো ঝনঝন করে ওঠে। মারিদের কানে নূরজাহানের হাতের চুড়ির শব্দ গেছে। কিন্তু সে নত মস্তকে টেবিলের উপর ঝুঁকে মিষ্টি খাচ্ছে, যেন সে জীবনের প্রথম এত ভালো মিষ্টি খাচ্ছে। মিস হয়ে গেলে শেষ। নূরজাহান উঠে দাঁড়িয়েছে সেই কখন, অথচ মারিদ সাইড দিচ্ছে না। নূরজাহানও কিছু বলছে না, সে বোবার ন্যায় দাঁড়িয়ে। মারিদ নিজ থেকে সরে বসলে সে যাবে। আফিয়া দু-তিনবার মারিদকে ডেকে বলেছে নূরজাহানকে সাইড দিতে। অথচ মারিদ শুনছে না দেখে সুখ উচ্চ গলায় মারিদকে ডেকে বলে—

‘ ভাই সরে বসো। ভাবিকে সাইড দাও। দেখছ না ভাবি দাঁড়িয়ে আছে?
মারিদ শেষ মিষ্টিটা মুখে তুলতে তুলতে সোফায় গা এলিয়ে বসে। যেন সে মাত্রই শুনেছে সুখের কথাটা। মারিদ সরে তো বসল, কিন্তু পা বাড়িয়ে রেখেছে নূরজাহানের যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে। আফিয়া নূরজাহানের হাত টানছে মারিদকে পাশ কাটিয়ে আসতে, কিন্তু মারিদ দু-পা মেলে দেওয়ায় নূরজাহান তার উপর দিয়ে ডিঙিয়ে যেতে পারছে না।
‘ পা টেনে বসো ভাই। তোমার পায়ের জন্য ভাবি যেতে পারছে না এখন।
সুখ ফের বলে। হাতের আঙুলের লেগে থাকা মিষ্টির রস মারিদ চুষে হেয়ালি করে মিষ্টি বলে—
‘ আমি সাইজে বড় মানুষ, তাই আমার জায়গা বেশি লাগবে। লিলিপুট মানুষ অল্প জায়গাতে যাওয়া যায়।
মারিদ কাকে লিলিপুট বলল? নূরজাহানকে? নূরজাহান রাগে চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে। এখন মারিদ জায়গা না দিলেও মারিদের উপর দিয়ে চলে যাবে নূরজাহান। মারিদ সোফায় সোজা হয়ে বসল। মারিদ অল্প করে পা সরিয়েছে নূরজাহানকে যেতে দিতে। এই অল্প জায়গাতে রাদ-রাতুলের মতো ছোট মানুষ গুলোও যেতে পারবে না, সেখানে নূরজাহান যাবে কীভাবে? মোট কথা নূরজাহানের যেতে হলে মারিদের সঙ্গে ঘেঁষেই যেতে হবে। সুখ নূরজাহানের হাত ধরে টেনে বলে—

“ভাবি তুমি আমার সাথে এসো। ভাই তোমাকে সাইড দিবে না। আমি সাহায্য করছি, তুমি ভাইয়ের পাশ কাটিয়ে এসো।
সুখ নূরজাহানের বাহু চেপে ধরে। নূরজাহান নত মস্তকে মারিদকে পাশ কাটাতে চাইলে হঠাৎ চুলের বেণির টানে পড়ে যায় মারিদের কোলে। নূরজাহান মৃদু চিৎকার করে উঠে। সেসঙ্গে নূরজাহানকে পড়ে যেতে দেখে সকলেই হৈ হৈ করে চিৎকার করে ওঠে। আলেহা, মুনিয়া, ফাতেমা, হীরা, সালমা সকলেই তারানূরের সঙ্গে ভাতঘরে ছিল। তারানূর উনাদের কিছু বলছিলেন। বাচ্চাদের সকলের হৈচৈয়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে এসে দেখে নূরজাহান মারিদের কোলে বসে। আফিয়া, সুফিয়া, সুখ ‘হায় হায়’ করে উঠে নূরজাহানকে ধরতে চেয়ে বলে—
“ভাবি আপনি ঠিক আছেন? ব্যথা পেয়েছেন কোথাও?
নূরজাহান লজ্জা-শরমে তৎক্ষণাৎ মারিদের কোল থেকে উঠতে চাইলে ফের চুলের বেণিতে টান খেয়ে পুনরায় বসে যায় মারিদের কোলে। এবার মারিদ ঠাস করে নূরজাহানকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে—
‘ তোর ভাবি আমার কোলে উঠতে চাচ্ছে, সুখ।
এই যে নিলাম কোলে।
রিফাত মারিদের ব্যাপারটা দেখে এগিয়ে আসে, কপাট রাগ দেখিয়ে বলে—

‘ জাউরামি করবি না মারিদ, নামা আমার নূরজানকে।
তনিমা রিফাতের কথা শুনছে ভেবে জিভে কামড় পড়ল রিফাতের। সে নিজেই নিজের কথার সংশোধন করে ফের বলে—
‘ আসলে মারিদ নূরজাহান তোকে ভয় পাচ্ছে। নূরজাহানকে রাদিলের কোলে দে।
রিফাত রাদিলের নাম বলতেই রাদিল পিছন থেকে ঠাস করে রিফাতের পিঠে থাপ্পড় মেরে বলে—
‘ শালা, আমার নাম বলিস কেন? নিজে মর গিয়ে, আমাকে ফাঁসাবি না এসবে।
সালমা, শান্তা, মুনিয়া, আলেহা, তারানূর, ফাতেমা, শাহানা সবার সামনে দিয়ে নূরজাহানকে কোলে করে মারিদ নূরজাহানের ঘরে যায়। সুখ, আফিয়া, সুফিয়া, রাদ, রাতুল, তামিম, তাপস সকলেই মারিদের পিছনে যাচ্ছে। রাদ-রাতুল মারিদের নূরজাহানকে কোলে নেওয়ার বিষয়টা বেশ এনজয় করছে। দুজন একে অপরকে বলছে—
‘ মারিদ ভাই সুন্দর ভাবিকে কোলে নিয়েছে। রিফাত ভাই ডাক্তার ভাবিকে কবে কোলে নিবে।
কথাটা রাদ বলেছে। রাতুল নিজের মতো করে উত্তর দিয়ে বলে—
‘ রিফাত ভাই ডাক্তার ভাবিকে রাতে কোলে নিবে।
‘ আমরা দেখব না তখন?

‘ আরে বোকা, তুই দেখবি কীভাবে? দরজা লাগানো থাকবে। রিফাত ভাই তো দরজা খুলবে না।
রিফাত রাদ-রাতুলকে থামাতে পিছন থেকে দুজনের মাথায় ঠাস করে দুটো থাপ্পড় মেরে বলে—
‘ এই পাকনার দল, চুপ করে হাঁটা ধর। নয়তো নদীতে ফেলে দিয়ে আসব।
রাদ-রাতুলের কথায় উপস্থিত সকলেই মুখ লুকিয়ে হাসছে। তনিমা-রিফাত দুজনই অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তনিমা লজ্জা এড়াতে দ্রুত মাথার ঘোমটা টেনে সুফিয়ার সঙ্গে যায়। রাদিল বেশ মজা নিচ্ছে ব্যাপারটায়। সে রিফাতকে টেনে নিজের সঙ্গে বসার ঘরে রেখে দিয়ে বলে—
‘ তুই দরজা লাগিয়ে এসব করিস? রাদ-রাতুল না বললে তো আমরা জানতামই না তুই যে ভাই এত দুষ্টু!
রিফাত গা ঝাড়া দিয়ে রাদিলের হাত ফেলে বলে…
‘ হ, দুষ্টামির করলাম না কিছুই, বদনাম হলাম ষোলো আনা।
নূরজাহান মারিদকে ধরেনি। মারিদ কোলে নেওয়ার পর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিল নেমে যাওয়ার, কিন্তু মারিদ ছাড়েনি। নূরজাহানকে ওর খাটের ওপর নামিয়ে দিতে দিতে মারিদ ফিসফিস করে বলে—
‘ আমার দেখা সব থেকে স্বার্থপর মানুষ আপনি, নূরজাহান।

সিকদার বাড়িতে এত আনন্দ, এত হৈচৈ বিগত কয়েক বছর পর আজ হচ্ছে। যে আহাদকে বাড়িতে ফেরানো যেত না, সে বেশ হৈচৈ করছে মারিদের পরিবারের সঙ্গে মিশে। তামিম তাপস আহাদের সঙ্গে ঘুরছে। স্বার্থপর সাজিদও বেশ আনন্দ পাচ্ছে সবার সাথে হৈচৈ করে কথা বলে। হাসান, মকবুল খালেদ মাহবুবকে নিয়ে নিজেদের বাড়ির আশপাশটায় হাঁটতে বেরিয়েছেন। আকাশে মস্ত বড় থালার ন্যায় চাঁদ উঠেছে। প্রকৃতিতে ঠান্ডা বাতাস বইছে। কাল নূরজাহান-মারিদের পুনরায় বিয়ে পড়ানো হবে, তাই আজ রাতে নূরজাহানের হাতে মেহেদি দিতে বসেছে সুফিয়া। তনিমার হাতে আফিয়া দিচ্ছে। আশনূর, রাদ আর রাতুলের হাতে মুনিয়া মেহেদি পরাচ্ছে। সুখ নিজের হাতে নিজেই মেহেদি পরছে। সে কারো সাহায্য নিচ্ছে না। শান্তা, ফাতেমা, তারানূরও নূরজাহানের ঘরে বসে সবার মেহেদি পরা হাত দেখছে। সালমা আলেহার সঙ্গে রান্নাঘরে বসে কথা বলছে। তনিমা মেহেদি পরতে চায়নি, সারাদিনের জার্নিতে সে ক্লান্ত। একটু ঘুমাতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু তনিমার শ্বশুরবাড়ির মানুষের কারো চোখে ঘুম কিংবা শরীরে ক্লান্তি দেখা যাচ্ছে না। মারিদের বিয়ে, নতুন বউকে নিয়ে হৈচৈ করছে সবাই। তনিমা ছোটবেলা থেকেই একক পরিবারে বড় হয়েছে। মা-বাবা আর দুই ভাইকে নিয়ে ওদের সংসার। এত হৈচৈ, এত হাঙ্গামা তনিমা দেখে অভ্যস্ত না। তনিমার অস্বস্তিকর লাগছে এই পরিবেশে। মনে হচ্ছে একটু একা থাকতে পারলে ভালো হতো।

রিফাতের সঙ্গেও তনিমার কথা বলা দরকার। বিয়ে হয়েছে অনেকদিন হলো অথচ দুজনের এখনো সরাসরি কথা হয়নি। রিফাত তনিমাকে কেন এড়িয়ে যাচ্ছে সেটা জানা দরকার। রিফাত তো তনিমার চিঠিওয়ালা ছিল, দুজনের মাঝে সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল; তাহলে এখন রিফাত তনিমাকে ইগনোর করছে কেন? নাকি রিফাত চিঠিতে তনিমার সঙ্গে মজা নিচ্ছিল, বাস্তবে এসে তনিমাকে মানতে পারছে না সেজন্য এড়িয়ে যাচ্ছে? ব্যাপারটা যা-ই কিছু হোক না কেন, রিফাত তনিমাকে স্বীকার করুক কিংবা অস্বীকার, তনিমা কখনোই রিফাতকে ছাড়বে না। রিফাত ছেড়ে দিতে চাইলেও তনিমা ছাড়বে না। তনিমার সঙ্গে প্রেম যখন করতে পেরেছে, তখন বিয়েটাও মানিয়ে নিতে হবে রিফাতের। তনিমা হেরে গিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। রিফাতের নামে যখন বদনাম হয়েছে, তখন রিফাতের সঙ্গেই সংসার করবে তনিমা। ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সোজা কথায় না শুনলে রিফাতকে তাবিজ করে বশ বানিয়ে তারপর তনিমা সংসার করবে, তারপরও রিফাতকে ছাড়বে না। তনিমা কি কোনো অংশে কম নাকি? যে রিফাত ওকে রিজেক্ট করতে চাইলে তনিমা সেটা মেনে নেবে? তনিমা শান্তাকে ডেকে নরম সুরে বলে—

‘ আম্মু, আপনার ছেলে কোথায়?
শান্তা তারানূর ও ফাতেমার সঙ্গে কথা বলছিল। তনিমার কথার উত্তরে বলে—
‘ রিফাত উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। সুখ, তোর ভাবিকে নিয়ে যা তো রিফাতের কাছে। আর তাপস, তামিমকে বলিস আমি ডাকছি, কেমন?
“আচ্ছা ফুফু।
সুখ হাতের মেহেদিটা রেখে তনিমাকে নিয়ে উঠে গেল। কাঠগোলাপের মেহমান ঘরটার সামনে কাউকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুখ ও তনিমা দুজনই মনে করল রিফাত ফোন স্ক্রোল করছে। তনিমাকে নিয়ে সুখ সেদিকে এগিয়ে ডাকল রিফাতকে। বলল—
‘ রিফাত ভাই, তোমার বউকে নিয়ে এসেছি। আমাকে বকশিশ দিতে চাইলে বিকাশে পাঠিয়ে দিয়ো।
সুখের কণ্ঠ পেয়ে রাদিল ঘুরে দাঁড়াল। সুখের সাথে তনিমাকে দেখে রাদিল ভদ্রভাবে বলে—
‘ রিফাত ঘরে আছে। তুমি যাও।
তনিমা রিফাত ও রাদিল দুজনেরই ছাত্রী হয়। রিফাত স্বামী হলেও রাদিলকে তনিমা স্যারের চোখেই দেখে। রাদিল তনিমাকে রিফাতের ঘরের ঠিকানা বলছে দেখে তনিমা লজ্জায় ও অস্বস্তিতে পড়ে যায়। মাথার ঘোমটা আরও খানিকটা টেনে ‘জি স্যার’ উত্তর করে রিফাতের ঘরে যায়। সুখ তনিমাকে চলে যেতে দেখে সেও চলে যেতে নিলে পিছন থেকে ডাকে রাদিল—

‘ তুই দাঁড়া সুখ?
সুখ থামে না। সে চলে যাচ্ছে দেখে রাদিল রেগে শক্ত গলায় ধমকে ওঠে সুখকে—
‘ সুখ দাঁড়া, নয়তো এখন থাপ্পড় খাবি।
ভদ্র রাদিলকে রেগে যেতে দেখে সুখ পিছন ফিরে তাকায়। চোখে-মুখে উদাসীন ভাব। কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে সুখ বলে—
‘ কি বলবেন রাদিল ভাই?
‘ কিছু না বললে তুই দাঁড়াবি না?
‘ অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন দেখছি না।
সুখের সোজাসাপটা উত্তরে রাদিল কপাল কুঁচকে বলে…
‘ তুই আমাকে ইগনোর করছিস?
‘ আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতো। আপনাকে ইগনোর করে আমার লাভ কী হবে?
রাদিল সুখের চোখে এখন একজন বড় ভাইয়ের মতোন? আর কিছু না?
‘ তুই সবাইকে তুমি আর আমাকে আপনি করে সম্বোধন করছিস কেন? আগে তো তুমি করে কথা বলতি, এখন বলিস না কেন?
‘ আপনি একজন ভদ্র মানুষ। আপনার সাথে তুমি করে কথা বলা আমার সাজে না। ব্যাপারটা বেয়াদবি দেখায়। আমি যাদের আপন ভাবি, তাদের সাথে তুমি করে কথা বলি।
সুখের কথাটা যেন রাদিলের কাছে অবিশ্বাস্য শোনাল। রাদিল এতদিনে সুখের আপন কেউ হতে পারল না! রাদিল ভারী আশ্চর্য গলায় শুধাল—

‘ আমি তোর আপন কেউ না, সুখ?
“না।
সুখের সোজাসাপটা উত্তরে রাদিল কথা বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। হুট করে ভীষণ বুক ভারী লাগছে। প্রকৃতির মাঝে থেকেও অক্সিজেনের অভাব ফিল করছে। রাদিল চঞ্চল হাতে নিজের বুকের পাশের শার্টের দুটো বোতাম খুলে বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে সুখকে বলে—
‘ তুই যা সুখ।
সুখ আর পিছন ঘুরে তাকায়নি। দেখতেও চায়নি রাদিলের কী হয়েছে। রাদিল অস্থিরতায় ঘন ঘন শ্বাস টানছে। চঞ্চল দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে কিছু খুঁজছে। মারিদ কলপাড়ে গিয়েছিল। রাদিলকে অস্থির, উত্তেজিত হয়ে শ্বাস নিতে দেখে সে দ্রুত এগিয়ে এসে জানতে চেয়ে রাদিলকে বলে—

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৬

‘ কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?
রাদিল অস্থিরতায় বলে…
‘ তোর বোন আমাকে ভীষণ পেইন দিচ্ছে, মারিদ। আমি পাগল হয়ে যাব। এই দেশে আমার জন্য কিছু নেই। আমি আম্মুকে নিয়ে খুব দ্রুত লন্ডনে শিফট হয়ে যাব।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here