Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২২

নূর ই মহব্বত পর্ব ২২

নূর ই মহব্বত পর্ব ২২
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

– তোকে না মানা করেছিলাম আযলানের সাথে সম্পর্ক না রাখতে? ছেলের জীবনের মায়া নেই তোর? বড্ড স্বার্থপর তো তুই!
নওমি শক্ত কণ্ঠে বললো,
– কে আপনি? কেন বারবার কল দিচ্ছেন আমাকে?
– আমি কে সেটা তোর জানার দরকার নাই। তুই কালকেই তোর ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যাবি ওই সংসার থেকে। কোথা থেকে যে তুই আহিলের চোখে পড়েছিলি!! কেন পড়েছিস হ্যাঁ? পড়েছিস তো পড়েছিস এই ছেলেটাকে নিয়ে পড়তে হলো তোর! ছেলেটা কি আসলেই আহিলের? নাকি…
নওমি রেগে কর্কশ কণ্ঠে বললো,

– মুখ সামলে কথা বলবেন! আমার ছেলেকে নিয়ে বাজে কথা বললে জিভ টেনে ছি’ড়ে ফেলবো!
ওপাশ থেকে হাসির আওয়াজ শোনা গেল।
– আগে ছেলেকে বাঁচা তারপর! আহিলের কাছে গিয়ে তো তেজ বেড়ে গিয়েছে দেখছি!
নওমিকে কিছু বলতে না দিয়েই কল কেটে দিলো। নওমি দোটানায় পড়ে গেল। কি করবে কিচ্ছু যেন মাথায় আসছে না। এর মধ্যে বাইরে থেকে আহিলের গলার স্বর শোনা গেল,
– নওমি? আসছো না কেন? খাবে না?
নওমি বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ডাইনিং রুমে ওরই জন্য অপেক্ষা করছিল আহিল আর নয়না বেগম।
– আয় বোস। খেয়ে নে। আদনান উঠলে তো আবার ওকে খাওয়াতে গিয়ে তুই খেতে পারবি না।
নওমি কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে চেয়ার টেনে বসতে বসতে হেসে বললো,
– না আম্মা। আদনান খাওয়ার নিয়ে ডিসটার্ব করে না।
নয়না বেগম নওমির পাতে গরম ভাত বেড়ে দিতে দিতে স্নেহের সুরে বললেন,
– তা তো করবেই না। আমার নাতিটা যেমন আদুরে, তেমনই শান্ত হয়েছে। কিন্তু তোর তো নিজের শরীরের দিকেও তো একটু তাকাতে হবে? কেমন শুকিয়ে গিয়েছিস!
পাশ থেকে আহিল বললো,

– দেখতে হবে তো! আমার ছেলে আমার মতোই হয়েছে। একদম ডিস্টার্ব করে না!
নয়না বেগম আড়চোখে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বললেন,
– হ্যাঁ বাবা তুই তো একদম শান্ত ছিলি তাই তো এলাকার সবাই তোর নামে নালিশ আনতো তাই না? সকালে খাবার খাওয়াতে দুপুর আর দুপুরের খাবার খাওয়াতে রাত হতো?
আহিলের মুখ চুপসে গেল। সে নাহয় একটু আধটু দুষ্টমি করতো তাই বলে বউয়ের সামনে এভাবে প্রেস্টিস পাংচার করে দিবে? সে ভোঁতা মুখে বললো,
– ওটা তো অনেক আগের কথা বাদ দাও না!
– কেন বাবা? তুমি যে কত ভালো ছিলে সেটা বলবো না? জানিস নওমি? এই ছেলে যে কত কি করতো! এক সময় তো রাজনীতিতে অব্দি চলে গিয়েছিল।
নওমি অবাক হয়ে আহিলের দিকে তাকালো। এই ছেলে রাজনীতিও করতো? আহিল বোকা বোকা হাসি দিল। নয়না বেগম থামলেন না।

– ও যে কত মা’রপিট করেছে আর এই নিয়ে আমার কাছে শুধু নালিশই আসতো।
নওমি এসব শুনে একটু হেসে ফেললো। ওর হাসি দেখে আহিলও আড়ালে হাসলো কিন্তু কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললো,
– আম্মু! পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা বন্ধ করবে প্লিজ? তাও আবার কার সামনে বলছ! একে তো যুক্তিতে ওরে কেউ হারাতে পারে না, তার ওপর তুমি যদি এখন আমার এসব উইক পয়েন্ট ওর হাতে তুলে দাও, তবে তো আমার এই সংসারে টিকে থাকাই দায় হয়ে যাবে!
নওমি আহিলের থমথমে কিন্তু আদুরে ফেসটার দিকে তাকিয়ে হালকা রসিকতার সুরে বলল,
– থাক আম্মা, আর বলবেন না। এমনিতেই ওনার ইগোতে লাগছে। পরে দেখা যাবে ইগো বাঁচাতে আবার আমাদের সাথেই রাজনীতি করবে।
নওমি আর নয়না বেগম দুজনই হেসে ফেলল। আহিল নওমির এই চটজলদি জবাব শুনে ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে মনে মনে বলল, “বাহ্ ম্যাডাম! ফর্মে ফিরতে তো বেশি সময় নিলেন না।”
নয়না বেগম উঠে রান্নাঘরে গেলে আহিল খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। একবার রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে নওমি পাশ দিয়ে যেতে যেতে নিচু স্বরে বললো,

– ইগোর জন্য নয়, আমার পরিবারের, স্ত্রী সন্তানের উপর যদি কোনো আঁচ আসে তাদের আগলে রাখতে আমি আবার মা’রপিট বা রাজনীতি করতে পারি!
বলে রুমে চলে গেল। ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো নওমি। কথাটা মনে দোলা দিলো। নয়না বেগম আসতেই নওমি চোখ সরিয়ে নিজের খাওয়া শেষ করলো।
খাওয়া শেষে রুমে এসে দেখলো আদনানকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আদনানের দিকে চেয়ে আছে আহিল। নওমির পায়ের শব্দ শুনে আহিল পেছন ফিরে তাকিয়ে নওমিকে দরজায় দাঁড়ানো দেখল। আহিল নিচু স্বরে বললো,
– ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসে শুয়ে পড়ো, রাত কম হয় নি।
– হুম।

নওমি বিছানার অপর পাশে এসে দেখলো বাপ ব্যাটা এক পাশে শুয়ে ওর জন্য অন্যপাশে জায়গা করে রেখছে। মাঝে আদনান। এতগুলো সময় কেটে গেছে। আবার আহিলের সাথে এক ঘরে ঘুমাতে হবে ভাবলেই অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। কিন্তু আদনানের নিষ্পাপ, ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকাতেই তার ভেতরের সব জড়তা কেমন যেন নিমেষে কেটে গেল। এই তো তার পৃথিবী, তার অস্তিত্ব। সে আদনানের মাথা হাত বুলিয়ে তারপর বিছানায় উঠে আদনানের ওপাশে গা এলিয়ে দিল। আদনানের জন্য ভালো হবে ভাবতেই সে আহিলের কাছেই থাকতে চাই কিন্তু ফোনের কথাগুলো মনে পড়লে দ্বিধায় ভুগতে হচ্ছে তার। কিছুক্ষণের মধ্যে আহিলও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। শুধু ঘুমাতে পারলো না নওমি। এদিক ওদিক করেও ঘুম নামলো না চোখে। মাথার ভেতর চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
মাঝরাতে ও এপাশ ফিরে আহিলের দিকে তাকালো। মানুষটা নিষ্পাপ মায়াবী চেহারা নিয়ে ঘুমাচ্ছে। নওমির খুব ইচ্ছে হলো এই মুহূর্তে ওই অচেনা নম্বরের হুমকিটার কথা আহিলকে এক্ষুনি ডেকে তুলে বলে দিতে কিন্তু পারলো না। হতাশার শ্বাস ছেড়ে সে চোখ সরিয়ে নিলো। উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়লো। চোখ খিঁচে বন্ধ করে দোয়া দুরুদ পরে ঘুমনোর চেষ্টা করলো। খুব একটা সফল না হলেও বিফলও হলো না। অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর তার চোখে ঘুম ধরা দিলো।

সকালে গায়ের উপর ভারী কিছু টের পেয়ে পিটপিট করে চোখ খুললো নওমি। চোখ খুলতেই দেখলো আদনান ওর পেটের উপর বসে ওর দিকে গোল গোল চোখে চেয়ে আছে। ওকে উঠতে দেখে বললো,
– মাআআ… উত চকাল।
নওমি হাসলো ওকে দেখে। পরক্ষণেই আশেপাশে নতুন পরিবেশ দেখে প্রথমে ধারণা করতে পারলো না কোথায় আছে। খানিকক্ষণ বাদে বুঝতে পেরে পাশে তাকালো কিন্তু আহিলও নেই। বালিশের পাশ হাতড়ে খুঁজে মোবাইল নিয়ে সময় দেখল। চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার জোগাড়। সাড়ে নটা বাজে! এত সময় পেরিয়ে গেল। আদনানকে পেটের উপর থেকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। আশপাশ তাকিয়ে দেখলো রুমে কেউ নেই। বিড়বিড় করে বললো, “কত দেরি হয়ে গেছে! আল্লাহ্! আমার স্কুলে যেতে হবে”
যেই মেয়ে সাতটায় উঠে তার সাড়ে নটায় কি করে ঘুম ভাঙল চিন্তা করছে। খট করে শব্দ হলে নওমি সামনে তাকাল। আহিল ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে মাত্র। ওকে দেখে হেসে বললো,

– গুড মর্নিং! ডেকে দিয়েছে তোমায়? আমি বারণ করেছিলাম তোমাকে ডাকতে!
নওমি অবাক হয়ে বললো,
– কেন? কত দেরি হয়ে গেল!
আহিল আলমারির ভেতর কাপড় খুঁজতে খুঁজতে জবাব দিল,
– অত দেরি কোথায়? মাত্র সাড়ে নটা!
– মাত্র?
– হু
– আমার স্কুল আছে! আর আপনি একজন ডক্টর হয়ে লেটে ঘুম থেকে উঠাকে সাপোর্ট করছেন?
আহিল বিছানার সামনে এসে দাঁড়ালো। শান্ত কণ্ঠে বললো,
– একদম না ম্যাডাম! তোমার কালকে সারারাত ঘুম হয় নি আমি জানি। হয়তো পরিবেশ চেঞ্জে তাই আজ দেরিতে উঠে কোনো ভুল দেখছি না!
নওমি একটু আমতা আমতা করে বলল,
– তা নয়। আসলে…
নওমির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আহিল বললো,

– মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে, তাই তো? মুখ ফুটে না বললেও আমি জানি নওমি। চিন্তার তো কিছু নেই ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর স্কুলের জন্য চিন্তা করতে হবে না। তুমি আজকে ছুটি নাও এরপর চাকরি করবে কি না ওটা পরে ভেবে দেখো। এখন যাও চটপট ফ্রেশ হয়ে নাও।
আহিল ততক্ষণে শার্ট পড়ে রেডি হয়ে গিয়েছে। আদনানের দিকে হাত বাড়িয়ে আদুরে গলায় বললো,
– আদনান সোনা, চলো বাবার সাথে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসবে, মাকে ফ্রেশ হতে দিই।
আহিল দুই হাত বাড়িয়ে দিতেই আদনান খিলখিল করে হেসে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওরা রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নওমি বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর বুক চিরে। আহিল ওকে চারপাশ থেকে এমন এক ভালোবাসার জালে জড়াচ্ছে, যা থেকে বের হওয়া অসম্ভব। মিনিটের মধ্যে আরেকটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সে। শুধু প্রয়োগ করার অপেক্ষায়। এই ভেবে সে ওয়াশরুমে চলে গেল।

নওমি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিলো। এখনো আহিল ফিরে নি। নওমি ঘরে পায়চারী করছে। একটু আগে ফিরলে কি হয় ও আবার হাসপাতাল যাবে না? সময় পাবে না তো! ও সবটা আহিলকে বলতে চাই। আগেরবার দুজনের একটা ভুলে তিনটা বছর নষ্ট হয়েছে এইবার আর সে চাই না কিছু লুকিয়ে আবার হিতে বিপরীত হোক!
ঘরজুড়ে অস্থির পায়ে পায়চারি করতে করতে নওমি বারবার নিজের হাত দুটো ডলছিল। ভেতরের ছটফটানিটা কোনোভাবেই কমছে না। ভুল থেকে মানুষ শেখে, আর নওমি খুব কঠিনভাবে শিখেছে। তিন বছরের একাকীত্ব, প্রতিটা রাতের কান্না আর আদনানের বাবা ছাড়া বড় হওয়া এই সবকিছুর মূলে ছিল একেকটা কথা আড়ালে রাখা। এবার আর সেই ভুল নয়। ও আর একা একা সিদ্ধান্ত নিয়ে পালিয়ে গিয়ে শত্রুকে জেতার সুযোগ দেবে না। আহিল যখন বলেছে ও আগলে রাখতে জানে, তবে ওকেই সব সামলাতে দিতে হবে। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে আদনানের খিলখিল হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল। নওমি চট করে দরজার দিকে তাকাল। আহিল আদনানকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকল। আদনানের দুই হাতে দুটো বেলুন, আর আহিলের মুখে হাসি। আহিল আদনানকে বিছানায় নামিয়ে দিল। বেলুন পেয়ে আদনান বিছানাময় গড়াগড়ি খেতে শুরু করতেই আহিল নওমির দিকে এগিয়ে এল।

– নাস্তা করেছো? আমি একটু হাসপাতালে যাব। রাউন্ডসগুলো শেষ করে দুপুরের আগেই চলে আসব। তুমি আদনানকে নিয়ে আম্মুর সাথে গল্প করো, একা লাগবে না।
বলে আলমারির দিকে গেল। নওমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
– আপ… আপনার সাথে আমার কথা আছে আহিল!
আচমকা এহেন স্বরে থমকে দাঁড়াল আহিল। ওর নাম ধরেই ডাকলো নওমি! ঠিক আগের মতো! ও পিছন ফিরে নওমির দিকে তাকালো যে ওর দিকেই চেয়ে ছিলো। নওমির ফ্যাকাশে চেহারা দেখে ও এগিয়ে এসে নওমির গালে হাত দিয়ে বললো,
– কি হয়েছে তোমার? এনি প্রবলেম নওমি?
নওমি চোখ নামিয়ে নিলো। ছলছল করে উঠল চোখজোড়া। আহিল ওর মুখ দু হাতের আজলায় নিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখের কোণ মুছে দিয়ে আকুলতার সহিত অত্যন্ত নরম কণ্ঠে বললো,
– কি হয়েছে বলো আমায়? কিছু হয়েছে? কি বলবে? আমি শুনছি বলো! কিন্তু কাঁদবে না প্লিজ!
নওমি নিজেকে সামলালো। আহিলের ভালোবাসায় যেন সে আরো নরম হয়ে যাচ্ছে। নওমি বড় একটা শ্বাস নিল। বুকের ভেতর চেপে থাকা পাথরটা এবার নামিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। সে চোখ তুলে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললো,
– একটু সময় দেন আমার আপনার সাথে কথা আছে।
আহিল একইরকমভাবে বললো,

– আমি শুনছি তো!
নওমি যেন ভরসা খুঁজে পেল। সে আহিলের হাতের আজলা থেকে নিজের মুখটা সরিয়ে আদনানের দিকে একবার তাকাল তারপর আবার আহিলের দিকে তাকিয়ে সে বলতে শুরু করলো,
– আপনি আমাদের খোঁজ পেয়েছেন অব্দি আমার কাছে কয়েকটা আননোন নম্বর থেকে কল আসা শুরু হয়েছে। যেদিন আম্মাকে আমাদের বাসায় নিয়ে গেলেন সেদিনের পর থেকে।
আহিল বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে বলল,
– আননোন নম্বর থেকে কল?
– হু।
– কি বলছে?
– আপনার সাথে যাতে কোনো রকম যোগাযোগ না রাখি তা বলছিল। আপনার সাথে ফিরে আসলে বা আদনানের পরিচয় বা অধিকার নিয়ে যেন কোনো দাবি না করি। তাহলে বড় কোনো ক্ষতি করে দিবে।
– হোয়াট? এসব কে বলছে?

– আমি জানি না। আমি চিনি না ওনাকে। কালকে… কালকে রাতে এখানে আসার পর কল এসেছিল। হুমকি দিচ্ছে!
নওমি সব খুলে বললো ওকে। আহিলের ভাব বোঝা গেল না। সে কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলো,
– শুধু আমার সাথে যোগাযোগ রাখতে বারণ করেছে? এর বেশি কিছু বলেছে? একটু মনে করার চেষ্টা করো!
নওমি চেষ্টা করলো মনে করার কিন্তু এরকম কিছুই মাথায় আসছে না তার। সে মাথা নেড়ে বললো,
– না এরকম কিছুই মাথায় আসছে না আমার। আর কিছুই বলে নি।
আহিল কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। কি ভেবে যেন বললো,
– তুমি যে আমার কাছে এসেছো এটা কেউ জানবে কি করে? কাল এসেছো আর সাথে সাথেই ফোন? স্ট্রেঞ্জ!
নওমি ভাবল, তাই তো! কে জানবে? ও তো কাউকে জানিয়ে আসে নি! ও তো নিজেই জানতো না! ও চিন্তিত কণ্ঠে বললো,

– আমি তো কাউকে বলি নি! এমনকি তুহি কিংবা আবরার ভাইয়াও জানে না! ওদের সাথে ও কথা হয় নি!
– হু তাহলে এর মধ্যে গোলমালটা কিসের! আচ্ছা তুমি আমাকে নম্বরটা দাও। আমি দেখছি। ভয় পেও না। ভুলেও এই ভয়ে আবার পালানোর চিন্তা মাথায় আনবে না নয়তো বেঁধে রেখে দেবো মাইন্ড ইট! বিষয়টা আমি দেখবো তোমার এত কিছু ভাবতে হবে না। তুমি চিল থাকবে। তোমাকে আর আদনানকে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার। কিন্তু তুমি যদি পাকনামি করে দূরে যেতে চাও পা ভে’ঙ্গে রেখে দেবো কিন্তু!
আহিলের মুখে শেষ লাইনের শাসনমিশ্রিত আশ্বাস শুনে নওমির বুকের ওপর চেপে থাকা মস্ত বড় পাথরটা নিমেষে হালকা করে দিল। নওমি ভেজা চোখেও ফিক করে হেসে ফেলল। ওর হাসি দেখে আহিলও স্বস্তির হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে ওর ভেজা চোখ মুছে দিয়ে বললো,

– এই তো, হাসলে তোমাকে ভালো দেখায়।
আর শোনো, এখন থেকে ওই নম্বরের কোনো কল বা মেসেজ আসলে একদম রিসিভ করবে না। কোনো দরকার নেই।
নওমি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। আহিল রেডি হওয়ার জন্য জামা কাপড় নিয়ে এগোতে গিয়েও আবার পিছিয়ে আসলো। নওমি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালে বলল,
– তুমি এই জন্যেই আমার থেকে দূরে যেতে চাইছিলে তাই না? কিন্তু কারণ দেখিয়েছো সমাজ।
ধরা পড়ে গিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো নওমি। ছোট্ট করে বললো,
– সমাজের কথা না বললে আপনি মানতেন না। এটা বললে হয়তো হিতে বিপরীত হতো।
– সমাজের কথা বলেও তো আমাকে মানতে পারলেন না ম্যাডাম? সমাজ হুমকি এসব আমি তোয়াক্কা করি না, আমাকে এসব দেখালে আমিও বুড়ো আঙুল দেখাবো!

– হুম বুঝলাম।
আহিল দ্রুত রেডি হয়ে নিলো। ড্রয়ার থেকে নিজের স্টেথোস্কোপ আর ওয়ালেটটা তুলে নিয়ে নওমির খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া এবার নওমির চোখের ওপর স্থির হলো। বেশ নরম গলায় গম্ভীর স্বরে বলল,
– আমি তাহলে এখন বের হচ্ছি। রাউন্ডসগুলো শেষ করেই যত দ্রুত সম্ভব ফেরার চেষ্টা করব।
আহিল ঘর থেকে বের হওয়ার আগে বিছানায় বেলুন নিয়ে খেলতে থাকা আদনানকে কোলে তুলে নিয়ে ওর কপালে একটা চুমু খেল। আদর করে বললো,

– টাটা আব্বু। বাবা চকলেট আনবো কেমন?
চকলেট শুনে চকচক করে উঠল আদনানের চোখ। সে খুশি হয়ে বলল,
– তকলেত
আহিল হেসে ওর ফোলা গালে চুমু দিয়ে তারপর ওকে আবার বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নওমির দিকে এক পলক গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেল।

নূর ই মহব্বত পর্ব ২১

আহিল চলে যাওয়ার পরও নওমি বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। আজ এত দিন পর ওর মনে হচ্ছে, সত্যিই তো, সব ঝড় তো একা একা সামলানোর প্রয়োজন নেই। যখন পাশে এমন একটা শক্ত খুঁটি থাকে, তখন কিছুটা ভার তার ওপর ছেড়ে দেওয়াই যায়! আজ মনে হচ্ছে আহিলের কাছে ফিরে আসা ওর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো না!

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here